প্রথম পর্ব

হিন্দুত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ যোগসাজশ ১৯৩০-র দশক মারিয়া কাসোলরি
উগ্র হিন্দুত্বকে বুঝতে হলে এর দেশীয় উৎসের সঙ্গে বিদেশি প্রভাবটাও ধরতে হবে। ১৯৩০-এর দশকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ইউরোপের ফ্যাসিবাদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় ‘নিজেদের থেকে আলাদা’ লোকজনদের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতারা স্বৈরতন্ত্রী শাসকবর্গ, যেমন মুসোলিনি ও হিটলার এবং ফ্যাসিস্ত ধাঁচের সমাজকে বারবার প্রশংসা করেছিলেন। এই ধারা আজও অব্যাহত। আর তাই ভারতীয় জনজীবনে আশঙ্কার কালো মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। ফ্যাসিস্ত-প্রবণতা রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমস্ত স্তরে শিকড় নামাবার কাজে উদ্যোগী হয়েছে। আর তারই পাশাপাশি চলেছে মৌলবাদী ভাবাদর্শকে ন্যায্যতা দেবার কারসাজি। জাতীয়তাবাদের ধারণার সাথে ফ্যাসিবাদের সর্বগ্রাসিতাকে মিশিয়ে এমন বোধ নির্মাণের চেষ্টা চলছে, যেখানে সযত্নে লালিত হচ্ছে বিভেদের বিষগাছ। হিন্দুত্ববাদীদের অন্ধকার দিকটা আলোয় টেনে আনার জরুরি কাজটা করছেন মারিয়া কাসোলরি। Economic and Political Weekly-র ২২ জানুয়ারি, ২০০০ সংখ্যায় তাঁর মূল নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং ইউরোপীয় ফ্যাসিস্তদের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ গড়ে ওঠে ১৯৩০-এর দশকে। বি.এস. মুঞ্জে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেবার সময় ইউরোপে থাকাকালীন ইতালিতে যান ও স্বয়ং মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করেন। এই সাক্ষাৎকারের বিস্তৃত বিবরণ মারিয়া তার নিবন্ধে দিয়েছেন। ১৯৩৪-এ Italian Institute for the Middle and Far East এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ’ ছিল। শ্যামাপ্রসাদ এর কিছুদিন পর ১৯৩৮ এ হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। ১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে ‘Hindu Outlook’ এবং ‘Mahratta’ পত্রিকায় জেনারেল ফ্রাঙ্কো, মুসোলিনি ও হিটলারের প্রশংসাসূচক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। গোলওয়ালকর ‘রাষ্ট্র-মীমাংসা’ পুস্তিকায় হিটলারের ভাবাদর্শের থেকে অনুপ্রেরণার কথা স্পষ্ট করে বলেছেন। বিশেষ করে যেটা তার কাছে আকর্ষণের বিষয় ছিল, তা হলো সেমিটিক জাতি, নির্দিষ্টভাবে ইহুদিদের প্রতি নাৎসিদের নির্মম আচরণ। ইহুদিদের উৎখাতের ঘটনার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতবর্ষের তুলনা টানেন এবং একই ভাবে মুসলিমদের এদেশ থেকে বিতাড়নের কথা জোর গলায় বলতে থাকেন।
মারিয়া ইতালিয় ফ্যাসিবাদ ও জার্মান নাৎসিবাদের সঙ্গে প্রথম সারির উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের, যেমন মুঞ্জে এবং বিনায়ক সাভারকারের যোগসূত্রের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার প্রতিটি তথ্যের সমর্থনে রয়েছে ভারতীয় ও বিদেশি মহাফেজখানার নথিপত্র। এতে সামগ্রিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা দৃঢ় হয়েছে। একই সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদের ভাবাদর্শগত তথা সাংগঠনিক কাঠামোর উৎস সম্পর্কে বহু অজানা তথ্য আমাদের সামনে এসেছে। এই নিবন্ধ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে আর এস এস ও তার সহযে। গীরা কোন ভয়ংকর উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। ভাষান্তরের কাজে যথাসম্ভব মূলানুগ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পাদটীকা (চিহ্নিত) সংযোজিত হয়েছে পাঠকদের সুবিধার্থে। অ-ভারতীয় নাম ও তথ্যসূত্রের ক্ষেত্রে ইংরাজিই বজায় রাখা হয়েছে। পরিশিষ্ট অংশে মহারাষ্ট্রের থানে’র যোশি-বেদেকর কলেজে’র ইতিহাসের অধ্যাপক ইউজিন ডি’ সুজা’র একটি প্রাসঙ্গিক নিবন্ধের অংশবিশেষ যুক্ত করা হলো। এ বিষয়ে মৌখিক অনুমতি প্রদানের জন্য অধ্যাপক ডি’ সুজা-কে কৃতজ্ঞতা জানাই।
হিন্দুত্বের বিদেশি যোগসূত্র-১৯৩০-র দশক ।। । মহাফেজখানার সাক্ষ্য।। মারিয়া কাসোলরি
হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনগুলোর ভাবাদর্শ ও কার্যাবলিকে চিহ্নিত করার জন্য ‘ফ্যাসিস্ত’ শব্দটির ব্যবহার ইদানীংকালে শুধু হিন্দু মৌলবাদের বিরোধীরাই করছেন তা নয়, যাঁরা এদের সমালোচনা করেন অথচ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন না, তাঁরাও এতে শামিল হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং সাধারণভাবে হিন্দুত্ববাদের জঙ্গি সংগঠনগুলো (১) অগণতান্ত্রিকতা, স্বৈরাচারী, আধাসামরিক, উগ্র ও হিংসাত্মক প্রবণতা এবং ফ্যাসিস্ত ভাবাদর্শ ও কর্মসূচি সম্পর্কে এদের সহমর্মিতা-এ সমস্ত বিষয়ে রাজনীতিমনস্ক লেখক ও পণ্ডিতেরা বেশ গভীর চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। একই ব্যাপার লক্ষ করা যায় বেশ কিছু লেখায়, যার সূত্রপাত গান্ধী হত্যার সময় থেকে। এই ধারা আজও অব্যাহত।’ এই সমস্ত প্রয়াসের সূত্র ধরে হিন্দু মৌলবাদের ফ্যাসিস্ত ভাবাদর্শগত পৃষ্ঠভূমিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু, এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে। এর কারণটা বোধহয়,
Amartya Sen: India at Risk (The New York Review of Books, April, 1993); Christophe Jaffertot: The Hindu Nationalist Movement in In dia (Viking, New Delhi, 96) Khaki Shorts and Saffron Flags (Orient Longman, New Delhi:93) পাদপূরণে উল্লিখিত লেখকরা বেশিরভাগই সমাজবিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক নন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংলগ্ন সময়ে উগ্র-হিন্দুবাদী শক্তির গঠন যাঁরা লক্ষ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে তখনই সঙ্ঘ পরিবারের ফ্যাসিস্ত দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিলেন। হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনগুলোর প্রতি, বিশেষ করে কংগ্রেসের মনোভাব ছিল তীক্ষ্ণ। নেহরু প্রথম থেকেই এদেরকে বিভেদকামী ও ফ্যাসিস্ত বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তবে, যেটা সবার জানা নেই তা হলো, গান্ধী হত্যার পর আর এস এস প্রথমবার নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার সময় কংগ্রেসের মধ্যে প্রচারিত গোপন প্রতিবেদনে আর এস এস-র চরিত্রের সঙ্গে ফ্যাসিস্ত সংগঠনগুলোর সাদৃশ্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল যে,
(১) আর এস এস-এর সূচনা নাগপুরে একধরনের হিন্দু বয়েজ স্কাউট আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। ধীরে ধীরে তা সাম্প্রদায়িক জঙ্গি ও হিংস্রপ্রবণতা সম্পন্ন হয়ে ওঠে।
(২) আর এস এস পুরোদস্তুর মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ প্রভাবিত সংগঠন ছিল। তাই মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের অধিবাসীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-ব্রাহ্মাণদের এর প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই।
(৩) এমনকি অন্য প্রদেশগুলোতেও প্রধান সংগঠক ও পুরো সময়ের কর্মীরা নিশ্চিতভাবেই ছিলেন মহারাষ্ট্রীয়।
(৪) আর এসএস-এর মাধ্যমে মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণরা ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ভারতে ‘পেশওয়া রাজ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। আর এস এস-র পতাকা হলো পেশওয়াদের ‘ভগওয়া ধ্বজা’।* পেশওয়ারা ব্রিটিশের কাছে সবার পরে হার মেনেছে। তাই, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের এই ধ্বজা বা পতাকা নাকি প্রথমে ছিল রামচন্দ্রের আর পরে তা ব্যবহার করেন শিবাজি। পর মহারাষ্ট্রীয়দের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা আসা উচিত।
(৫) আর এস এস ফ্যাসিবাদকে লালন-পালনের উদ্দেশ্যে গুপ্ত, হিংসাত্মক পদ্ধতি চর্চা করে। সত্যনিষ্ঠতা এবং সাংবিধানিক পথকে এরা পরোয়া করে না।
(৬) এই সংগঠনের কোনো সংবিধান নেই। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত নয়। সাধারণ মানুষকে শুধু এটুকুই জানানো হয় যে, আর এস এস-এর একমাত্র লক্ষ্য হলো শরীর-চর্চা। আসল উদ্দেশ্যটা এমনকি এর সক্রিয় কর্মীদের থেকেও আড়াল করে রাখা হয়। একমাত্র ‘অভ্যন্তরীণ বৃত্তে’র মুষ্টিমেয় লোকের গোচরে থাকে সংগঠনের প্রকৃত পরিকল্পনা।
(৭) আর এস এস-এর কোনো নথি বা কার্যবিবরণী নেই। সদস্য তালিকাও রাখা হয় না। এছাড়া আয়-ব্যয়েরও কোনো হিসাব নেই। অর্থাৎ সংগঠনগত দিক থেকে আর এস এস-এর কার্যকলাপের মধ্যে গোপনীয়তা রয়েছে। তাই একে… [National Archives of India (NAI), Sardar Patel Correspondence, Microfilm, reel no 3, A Note on the RSS, undated].
দুর্ভাগ্যবশত, এই দলিল আচমকা এখনেই থেমে গেছে। তবে এর থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ১৯৪০-র দশকের শেষার্ধে আর এস এস কী ধরনের ‘সুনাম’ অর্জন করেছিল।
উল্লিখিত দলিলটি কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন নয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো, তাদের বিরোধীরা এবং পুলিসের বিভিন্ন নথিপত্র থেকে অনুধাবন করা যায় হিন্দুত্ববাদী সমিতিগুলোর ইতালিয় ফ্যাসিবাদের যোগসূত্রের ব্যাপ্তি ও তাৎপর্যকে। হিন্দুত্ববাদীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলো শুধু যে সচেতনভাবে ও স্বেচ্ছায় ফ্যাসিস্ত ভাবধারাকে গ্রহণ করেছিল তাই নয়, প্রথম সারির হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফ্যাসিস্ত ইতালির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল।
এই বিষয়টাকে বোঝানোর জন্য প্রয়োজন, ১৯২০-র দশকে গোড়া থেকে উগ্র-হিন্দুত্ববাদের ইতালিয় ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে কীভাবে আগ্রহ তৈরি হলো- সেই প্রেক্ষাপট জানা। এই আগ্রহের উৎসভূমি মহারাষ্ট্র। ১৯৩১-এ বি এস মুঞ্জের ইতালি ভ্রমণের সূত্রে একটা উৎসাহের সঞ্চার হয়। এখন দেখা দরকার কীভাবে মুঞ্জে ফ্যাসিস্ত ধাঁচকে হিন্দুসমাজে আরোপ এবং তাকে ফ্যাসিস্ত আদর্শে সমর-সজ্জিত করার চেষ্টা করেছিলেন। আরও বোঝা যাবে যে, ১৯৩০-র দশকের শেষে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারাগুলো এবং প্রথম সারির হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসোলিনি শাসিত ইতালি সম্পর্কে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রধান হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো কখনও ব্রিটিশের প্রতি সমঝোতার নীতি নিয়েছে, আবার কখনও একনায়কদের প্রতি দুর্বলতা দেখিয়েছে। এই দোদুল্যমানতায় অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। প্রাসঙ্গিক বছরগুলোতে মারমুখী হিন্দু সংগঠনগুলো নিজেদের সশস্ত্র করছিল তথাকথিত ‘ঘরের শত্রু’দের সঙ্গে সংঘাতের জন্য, ব্রিটিশদের বিপক্ষে লড়াইয়ে তাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। এই নিবন্ধে, আরও দেখাবার চেষ্টা করা হয়েছে, Christophe Jaffrelot-র এই তত্ত্ব যে, জাতি এবং নেতৃত্বের কেন্দ্রিকতার ধারণার প্রশ্নে আর এস এস এবং নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে, এ বক্তব্য ঠিক নয় (২)।
হিন্দু-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ও ইতালিয় ফ্যাসিবাদ
হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে ফ্যাসিস্ত জমানার প্রতিনিধিবর্গ, এমনকি স্বয়ং মুসোলিনির প্রত্যক্ষ সংযোগ নিয়ে এর আগে কোনো আলোচনা হয়নি। এখন এটা পরিষ্কার যে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শ ও ব্যবহারিক দিকগুলো সম্পর্কে হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের আগ্রহ নিছক নির্বস্তুক ছিল না। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনি সম্পর্কে অনুরাগকে শুধুমাত্র সাময়িক কৌতূহল বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা মুষ্টিমেয় কিছু বাক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল-এ ধারণাও ঠিক নয়। বরং তা ছিল, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের, ইতালিয় স্বৈরতন্ত্র ও তার সর্বেসর্বা সম্পর্কে গভীর মনোযোগের চূড়ান্ত ফলশ্রুতি। এই, হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ফ্যাসিবাদ ছিল রক্ষণশীল বিপ্লবের নমুনা। এই ধারণা মারাঠি পত্র-পত্রিকায় আলোচিত হয়েছে মুসোলিনির আমলের গোড়া থেকেই।
১৯২৪ থেকে ১৯৩৫-র মধ্যে ‘কেশরী’ পত্রিকা ইতালি, সেখানকার ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনি সম্পর্কে নিয়মিত সম্পাদকীয় ও নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। মারাঠি সাংবাদিকদের মনে সবচেয়ে বেশি ছাপ ফেলেছিল ফ্যাসিবাদের সমাজতান্ত্রিক উৎস এবং মুসোলিনি যেভাবে আপাতদৃষ্টিতে ইতালিকে এক পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে প্রথম সারির শক্তিতে পরিণত করেছিলেন সেই ঘটনা। সেই সময়ে, ভারতীয়দের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে ফ্যাসিস্তদের বাগাড়ম্বরের আড়ালে, আসল ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। তাছাড়া ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস ছিল যে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন পার হয়ে ফ্যাসিবাদ ইতালিতে স্থিতি ফিরিয়ে এনেছে। ‘কেশরী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একগুচ্ছ নিবন্ধে উদারপন্থী শাসন থেকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অতিক্রমণকে নৈরাজ্য থেকে এমন এক শৃঙ্খলার পরিবেশে উত্তরণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেখানে সামাজিক দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। (৩) এই মারাঠি সংবাদপত্রে মুসোলিনির রাজনৈতিক সংস্কারসমূহ, বিশেষত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের বদলে মনোনয়নের প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছিল (‘কেশরী’, জানুয়ারি ১৭, ১৯২৮)। মারাঠি সাংবাদিকরা দারুণ উৎসাহী ছিলেন মুসোলিনির সংসদকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ‘গ্র্যান্ড কাউন্সিল অফ ফ্যাসিজম’ তৈরির ঘটনায়। মুসোলিনির ধ্যানধারণা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ ছিল। তার নীতি ছিল- “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় একনায়কতন্ত্র জাতির পক্ষে অনেক বেশি উপযোগী ও সংহতি-সহায়ক” (‘কেশরী’, জুলাই ১৭, ১৯২৮)। (৪) আর এস এস-র আদর্শ ‘এক চালক অনুবর্ত্তিত্ব’, অর্থাৎ ‘এক নেতার প্রতি আনুগত্য’-র কথা এ-প্রসঙ্গে মনে আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
১৯২৯-র ১৩ আগস্ট ‘কেশরী’-তে ছাপা হয় একটি দীর্ঘ নিবন্ধ-‘ইতালি এবং নতুন প্রজন্ম’। এর বক্তব্য ছিল, তরুণ প্রজন্মের হাতে ইতালির নেতৃত্ব যাওয়ার ফলে সবক্ষেত্রে সে দেশ এগিয়ে চলেছে। ফ্যাসিস্ত ধাঁচে ইতালিয় সমাজের পুনর্গঠন নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা করা হয়। ইতালির যুব সমাজের নিয়মানুবর্তিতার প্রধান কারণ জোরালো ধর্মীয় আবেগ পরিবারের প্রতি অনুরাগ এবং চিরাচরিত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা: বিবাহবিচ্ছেদ বা নারীদের একা জীবন কাটানো চলবে না, নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকারও থাকবে না, তাদের একমাত্র কর্তব্য বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে থাকা। উল্লিখিত নিবন্ধে ফ্যাসিস্ত যুব সংগঠন ‘Balilla’* এবং ‘Avanguardisti’-র ওপরেও আলোকপাত করা হয়।
এটা কৌতূহলের যে ভারতীয় সাংবাদি-দের পক্ষে সমকালীন ইতালির ১৯২৬-এ ফ্যাসিস্ত যুব সংগঠন Balilla সরকারি স্বীকৃতি ও অনুদান পেতে শুরু করে। কয়েকটি ক্যাথলিক যুব সংগঠনকে বাদ দিলে বাকি সব বিরোধী সংগঠনগুলিকে ভেঙে দেওয়া হয়। ১৯২৯-এ Balilla-কে ফ্যাসিস্ত শিক্ষামন্ত্রকের অধীনে নিয়ে আসা হয়। অভিভাবকদের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকে, এখানে সন্তানদের ভরতি করানোর ব্যাপারে। যখন ১৯৩২-এ Starace ফ্যাসিস্ত পার্টি সচিব হন, তখন থেকে Balilla-র সদস্য হওয়া ইতালিয় শিশুদের কাছে বাধ্যতামূলক হয়। ১৯৩৭-এ যুব সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তরুণ ফ্যাসিস্তদের Gioventa del Littorio-র আওতায় অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এতসব তথ্য কী করে সংগ্রহ করা সম্ভব হলো। মনে হয়, তাদের আকরের মধ্যে ছিল ১৯২৮-এ, একজন ইতালিয় সম্পাদক দ্বারা প্রকাশিত একটি ইংরেজি ভাষার পুস্তিকা “The Recent Laws for the Defence of the State’ (অনুলিপি রয়েছে ভারতীয় জাতীয় মহাফেজখানার বৈদেশিক ও রাজনৈতিক শাখায়, 647G, 1927)। গোড়া থেকেই জোর দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মিলিশ্যার (militia) ওপর। একে বলা হয়েছিল-‘বিপ্লবের দেহরক্ষী’। পুস্তিকাতে ফ্যাসিস্ত জমানায় ইতালিতে দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়: বিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা, সংবাদপত্র, পত্রিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, ‘ফ্যাসিস্ত মতাদর্শ মানতে নারাজ’ লোকজনদের সরাকরি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সর্বোপরি মৃত্যুদণ্ড। উল্লেখযোগ্য, এই পুস্তিকায় যেভাবে উদারপন্থী পর্ব থেকে ফ্যাসিবাদে উত্তরুণকে বর্ণনা করা হয়েছে, উদ্ধৃত মারাঠি সংবাদপত্রের নিবন্ধের বিশ্লেষণের সঙ্গে তা বেশ মিলে যায়:
‘এই পদক্ষেপ (ফ্যাসিবাদে সরে আসা) ইতালিয় উদারপন্থার সূক্ষ্মাতি-সুক্ষ্ম ধারণার অবসান ঘটিয়েছে। ধারণাটা ছিল এইরকম যে, সার্বভৌম রাষ্ট্র সমস্ত রাজনৈতিক সমিতি এবং দলের প্রতি কঠোর পক্ষপাতবিহীনতার নীতি মেনে চলবে। এই তত্ত্বের জন্যই ইতালিতে আজ রাষ্ট্রের জাহাজ ঝড়ের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হয় সামাজিক বিলয়ের ঘূর্ণিপাকে তার সলিল-সমাধি হবে, নয় আর্থিক বিপর্যয়ের পাথরে ধাক্কা খেয়ে তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।’
নিয়ে আসা হয়। চোখ-ধাঁধানো সাজ পোশাক ও কুচকাওয়াজের জন্য ফ্যাসিস্ত যুব সংগঠনগুলো ইতালিয় শিশুদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল, ১৯৩০ ও ৪০-র শকে (দ্রঃ T. Koon-Believe, Obey and Fight; Political Socialisation of Youth in Fascist Italy, 1922-1943: 1989, পৃঃ ৮০-৮২, উদ্ধৃত হয়েছে-John Pollard-The Fascist Experience in Italy, London 1998, পূঃ ৬৯-90 ‘কেশরী’তে প্রকাশিত আর একটি লেখা যার রচয়িতা ছিলেন পত্রিকার লন্ডন সংবাদদাতা এবং মুসোলিনির গুণমুগ্ধ ডি ভি তামাস্তকার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯২৭-এ তামাঙকার ইতালিয় একনায়কের একটি জীবনী প্রকাশ করেন: ‘Mussolini and Fascisim’। এখানে ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের সংগঠন, সামাজিক ব্যবস্থা, ভাবাদর্শ ও ইতালির সাম্প্রতিক অতীত নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়। একটা পুরো অধ্যায় তামাঙকার লেখেন ফ্যাসিস্ত সমাজ এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে যুব সংগঠনগুলো সম্পর্কে।
এরকম একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ১৯২০-র দশকের শেষ নাগাদ ইতালির ফ্যাসিস্ত জমানা এবং মুসোলিনি মহারাষ্ট্রে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ফ্যাসিবাদের যে দিকটা হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল, তা হলো সমাজের সশস্ত্রীকরণ এবং রূপান্তর অর্থাৎ নৈরাজ্য থেকে শৃঙ্খলায় উত্তরণ। গণতন্ত্র-বিরোধী ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সদর্থক পরিবর্ত হিসেবে ধরা হয়েছিল। আলোচ্য মারাঠি পত্র-পত্রিকায় ফ্যাসিবাদ ও ইতালিয় Risorgimento-র মধ্যে পরোক্ষ তুলনা করা হয়েছিল। Risorgimento ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, নরম ও চরমপন্থী উভয় গোষ্ঠীর ওপর বড়ো রকমের ছাপ ফেলেছিল। (৫) কিন্তু, ফ্যাসিবাদ মুগ্ধ করেছিল উগ্র-জাতীয়তাবাদীদের, যারা মনে করেছিল এটা Risorgimento-র ধারাবাহিক প্রবাহ এবং রাষ্ট্রের যৌক্তিক সংগঠন।
ফ্যাসিস্ত শাসন এবং এর একনায়কের সঙ্গে প্রথম যে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী যোগাযোগ স্থাপন করেন, তিনি হলেন বি এস মুঞ্জে। তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন আর এস এস-এর সঙ্গে। একথাও বলা হয় যে, মুঞ্জে ছিলেন আর এস এস-এর আদিপর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
* ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইতালিয় ঐক্য আন্দোলনকে ‘পুনর্জাগরণ’ বা Risorgimento বলা হতো। বিশেষ করে মাৎসিনির নাম এর সাথে জড়িত। ব্যক্তিত্ব হেডগেওয়ারের মন্ত্রগুরু। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল প্রগাঢ়। মুঞ্জের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আর এস এস-কে শক্তিশালী করা এবং একে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া। ১৯৩১-এর ফেব্রুয়ারি ও মার্চের মাঝামাঝি সময়ে মুঞ্জে ইউরোপ সফরের সময় বেশ কিছুসময় ইতালিতে কাটান। সেখানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিক্ষাকেন্দ্র ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন। মুঞ্জে স্বয়ং মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে মুজের রোজনামচায়। (৬)
মুঞ্জে ১৯৩১-র ১৫-২৫ মার্চ রোমে ছিলেন। ১৯ মার্চ, সেখানে তিনি Military College, Central Military School of Physical Education, Facist Academy of Physical Education এবং সর্বোপরি Balilla এবং Avanguardisti সংগঠনগুলোর কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেন। শেষোক্ত দুটি ছিল ইতালিয় যুবকদের ফ্যাসিস্ত আদর্শে দীক্ষিত করার প্রধান যন্ত্র। এদের কাঠামোর সঙ্গে আর এস এস-এর আশ্চর্য মিল রয়েছে। ছয় থেকে আঠারো বছর বয়সি ছেলেদের সংগঠনে ভরতি করা হতো; প্রত্যেককে সাপ্তাহিক সভায় যোগ দিতে হতো, যেখালে চলত শরীর চর্চা, দেওয়া হতো আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবকদের ড্রিল ও কুচকাওয়াজ করা ছিল বাধ্যতামূলক।
আর এস এস ও অন্যান্য হিন্দু-মৌলবাদী সংগঠন ও দলগুলোর প্রচার পুস্তিকায় বলা হয়েছে, আর এস এস-এর কাঠামো হেডগেওয়ারের কল্পনা ও শ্রমের ফল। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, মুঞ্জে আর এস এস-কে ইতালিয় ফ্যাসিস্ত ধাঁচে গড়ে তুলতে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ত
১৯২৫-র বিজয়া দশমীর দিন আর এস এস-র গঠন হয়। এদিনের সভায় হাজির ছিলেন এল ভি পরাঞ্জপে, বিবি খলকর, হেডগেওয়ার এবং বিনায়ক সাভারকারের ভাই বাবুরাও সাভারকার।
সংগঠনের ছাপ মুঞ্জের ওপর যে গভীরভাবে পড়েছিল, এর প্রমাণ রয়েছে তাঁর রোজনামচায়:
“Balilla প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সামগ্রিক সাংগঠনিক ধারণা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছে। মুসোলিনি পুরো ব্যাপারটা ভেবেছেন ইতালির সামরিক শক্তির পুনর্জাগরণের কথা মাথায় রেখে। ভারতীয়দের মতো ইতালিয়রাও সাধারণভাবে স্বাচ্ছন্দ্য-প্রিয় এবং যুদ্ধবিমুখ। শান্তির চর্চা করতে গিয়ে, ভারতীয়দের মতো, ইতালিয়রাও যুদ্ধবিদ্যাকে অবহেলা করেছে। মুসোলিনি তাঁর দেশের এইসব দুর্বলতা লক্ষ করে Balilla সংগঠনের কথা ভেবেছেন।… ইতালির সামরিকীকরণে এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়া সম্ভব নয়।… ফ্যাসিবাদের ধারণা জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার ভাবনাকে স্পষ্ট প্রকাশ করে।… ভারত এবং বিশেষ করে হিন্দু ভারতের এইরকম সংগঠন প্রয়োজন হিন্দুদের সামরিক পুনর্জন্মের জন্য। এতে হিন্দুদের মধ্যে যোদ্ধা এবং অ-যোদ্ধা গোষ্ঠীর যে কৃত্রিম বিভাজন ব্রিটিশরা করেছে, তা দূর হয়ে যাবে। আমাদের প্রতিষ্ঠান নাগপুরের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ অনেকটা এইরকম, যদিও এটা স্বাধীনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। আমি আমার জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো ডাঃ হেডগেওয়ারের এই প্রতিষ্ঠানকে আরও বড়ো করতে ও মহারাষ্ট্র তথা অন্যান্য প্রদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাব।”
মুঞ্জে ড্রিল ও কুচকাওয়াজ সম্পর্কে লিখেছেন: “আমি ছেলেমেয়েদের নৌ ও স্থলবাহিনীর পোশাকে সুসজ্জিত অবস্থায় শরীর চর্চার কিছু সাধারণ ব্যায়াম ও ড্রিল করতে দেখে মুগ্ধ হয়েছি।”
অবশ্যই আরও বেশি অর্থবহ হলো মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ। ১৯৩১-র ১৯ মার্চ বেলা ৩টের সময় ফ্যাসিস্ত সরকারের প্রধান কেন্দ্র-Palazzo Venezia-তে মুঞ্জে মুসোলিনির মুখোমুখি হন। এর পূর্ণ বিবরণটি উদ্ধৃতিযোগ্য:
“… যে মুহূর্তে ঘরের দরজায় আমি পৌঁছলাম, তিনি (মুসোলিনি) চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। করমর্দন করে আমি নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি আমার সম্বন্ধে সবকিছুই জানতেন এবং মনে হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে তিনি বেশ খোঁজখবর রাখেন। গান্ধীর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি চেয়ার টেনে আমার সামনে বসলেন এবং প্রায় আধঘণ্টা আমাদের ভেতর কথাবার্তা চলল। তিনি গান্ধী ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে আমার কাছে জানতে চাইলেন এবং প্রশ্ন করলেন ‘গোলটেবিল বৈঠক ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে শান্তি আনতে পারবে কি?’ আমি বললাম, যদি ব্রিটিশরা, তাদের সাম্রাজ্যের অন্যান্য ডোমিনিয়নগুলোর সমান মর্যাদা আমাদের দিতে ইচ্ছুক হয়, তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতর শাস্তিতে ও অনুগত হয়ে থাকতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই; অন্যথা নতুন করে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম শুরু হবে। ভারত যদি তার প্রতি বন্ধুমনোভাবাপন্ন ও শান্তিকামী হয়, তবেই ব্রিটেনের লাভ এবং সে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে থাকতে পারবে। আর সেটা সম্ভব ভারত ডোমিনিয়ন মর্যাদা পেলেই। মনে হল সিনর মুসোলিনির আমার কথাটা মনে ধরেছে। এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখেছি কিনা। আমি জানালাম, আমার আগ্রহ ছেলেদের সামরিক প্রশিক্ষণে আর তাই ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানির সামরিক স্কুলগুলো দেখার পর ইতালিতে এসেছি এই একই উদ্দেশ্যে। আমি কৃতজ্ঞ যে, বিদেশ ও যুদ্ধবিভাগ এগুলো দেখানোর চমৎকার বন্দোবস্ত করেছিলেন। আমি আজই সকালে আর বিকেলে Balilla এবং অন্যান্য ফ্যাসিস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে চমৎকৃত হয়েছি। দেশের বিকাশ ও প্রগতির জন্য ইতালির এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। খবরের কাগজে এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সিনর আপনাকে নিয়ে অনেক ‘বিরূপ মন্তব্য পড়েছি। কিন্তু, আমি এদের মধ্যে কোনো আপত্তিকর বিষয় দেখিনি।
“সিনর মুসোলিনি: এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্বন্ধে আপনার অভিমত কি?
“মুঞ্জে: হে মহামহিম, আমি যথেষ্ট মুগ্ধ হয়েছি। প্রতিটি উন্নতিকামী জাতির এগুলো দরকার। সামরিক পুনরুত্থানের জন্য, বিশেষ করে ভারতের এর প্রয়োজন আছে। বিগত দেড়শ বছরে ব্রিটিশ আধিপত্যে থাকাকালীন, ভারতীয়দের সামরিক পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, ভারত এখন নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব পালনে প্রস্তুতি নিতে চায়। আমি সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমি নিজের একটা সংগঠনও তৈরি করেছি। সুযোগ এলে, ভারত ও ইংল্যান্ড- দু জায়গাতেই প্রকাশ্য মঞ্চে আমি জোর গলায় আপনার Balilla এবং ফ্যাসিস্ত সংগঠনগুলোর প্রশংসা করব। আমি এদের শুভেচ্ছা জানাই এবং সাফল্য কামনা করি।
“সিনর মুসোলিনি (যাকে বেশি খুশি লাগছিল) বললেন, ‘ধন্যবাদ, কিন্তু আপনার কাজটা যথেষ্ট কঠিন। যাই হোক, আমিও আপনার সাফল্য কামনা করি।’ কথা শেষ করে আমরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।” মুঞ্জের ইতালি ভ্রমণের বর্ণনায় ফ্যাসিবাদের ইতিহাস, ফ্যাসিস্ত ‘বিপ্লব’ এবং আরও সংশ্লিষ্ট তথ্য লিবিপদ্ধ ছিল।
মুঞ্জে আর এস এস-এর অনুষঙ্গের বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা জানি যে, তিনি হেডগেওয়ারের প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন। (৭) উভয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব এবং মুঞ্জের আর এস এস-ও শক্তিশালী ও সর্বভারতীয় সংগঠনে পরিণত করার ঘোষিত লক্ষ্য তার সঙ্গে আর এস এস জোরালো যোগসূত্রকে প্রমাণ করে। এটা বলা ভুল হবে না যে, উগ্র হিন্দুবাদের সম্পূর্ণ চক্রটাই মূঞ্জের ইতালিয় অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সামরিকীকরণে মুঞ্জের পরিকল্পনা
ভারতে ফিরে আসার পরেই মুঞ্জে তার রোজনামচায় উল্লিখিত সামরিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং মহারাষ্ট্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের জঙ্গি রূপান্তরে আত্মনিয়োগ করেন। পুনেতে পৌঁছেই তিনি The Mahratta পত্রিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। (৮) হিন্দু সম্প্রদায়ের সামরিক পুনর্গঠনে মুঞ্জে জোর দেন সৈন্যবাহিনীর ‘ভারতীয়করণে’র প্রয়োজনীয়তার ওপর। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের ভার একজন ভারতীয়ের হাতে তুলে দেওয়া হবে। মুঞ্জে শেষ পর্যন্ত ইতালি ও জার্মানি প্রসঙ্গ টেনে বলেন।
“আমাদের নেতাদের জার্মানির যুব আন্দোলন এবং Balilla ও ইতালির অন্যান্য ফ্যাসিস্ত সংগঠনগুলোকে অনুকরণ করা উচিত। এগুলো ভারতে প্রয়োগ করার পক্ষে পুরোপুরি উপযোগী বলে আমার মনে হয়।”
খুব দ্রুত ফ্যাসিবাদ প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং হেডগেওয়ার নিজে ফ্যাসিস্ত ধাঁচে হিন্দু সমাজের সামরিকীকরণের সপক্ষে অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। ১৯৩৪-এর ৩১ জানুয়ারি কভড়ে শাস্ত্রী আয়োজিত ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনি সংক্রান্ত একটি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। মুঞ্জে দেন সমাপ্তি ভাষণ। এর কয়েকমাস পরে, ৩১ মার্চে, মুঞ্জে, হেডগেওয়ার এবং লালু গোখলে হিন্দুদের জার্মান ও ইতালিয় পথে সামরিক সংগঠন গড়ে তোলা নিয়ে আলোচনায় বসেন।
লালু- আপনি (মুঞ্জে) হিন্দুসভার প্রধান এবং হিন্দুদের সংগঠনের প্রচারক। হিন্দুদের পক্ষে কী কখনো সংগঠিত হওয়া সম্ভব?
মুঞ্জে- আমি হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের ভিত্তিতে একটি কার্যক্রমের কথা ভেবেছি। ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী সারা ভারতে হিন্দু ধর্মের একটা সাধারণ মানদণ্ড তৈরি করা সম্ভব… কিন্তু আসল কথা হলো এই আদর্শকে বাস্তবায়িত করা ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না আমাদের স্বরাজ অর্জিত হচ্ছে এবং সেখানে পুরোনো দিনের শিবাজি আর অধুনা হিটলার বা মুসোলিনির মতো একজন হিন্দু একনায়ক আসছেন।… কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, যতদিন এরকম একজন একনায়কের আবির্ভাব না ঘটছে, ততদিন আমরা হাত গুটিয়ে বসেথাকব। আমাদের বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করে এর জন্য প্রচার চালাতে হবে (Moonje Papers, NMML, Moonje Papers, microfilm, Diary, rm2, 1932-36)1
মুঞ্জে এবং আর এস এস-এর মধ্যে নিবিড় নৈকট্য এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির ফ্যাসিস্ত স্বরূপ ব্রিটিশ সূত্রের দ্বারাও সমর্থিত হয়েছে। ১৯৩৩-এ প্রকাশিত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে (Note on the Rashtriya Swayam Sewak Sangh) জানা যাচ্ছে যে, ১৯২৭-এ মধ্যপ্রদেশ ও মারাঠি ভাষাভাষী অঞ্চলে মুঞ্জে আর এস এস-কে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। উল্লিখিত নথি আর এস এস-এর কার্যকলাপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনার সূত্রে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে:
“এটা বলা বোধ হয় বাড়াবাড়ি হবে না যে, আর এস এস ভারতে ভবিষ্যতে ঠিক সেই ভূমিকা নিতে চায়, যেমনটা ইতালিতে ‘ফ্যাসিস্ত’ এবং জার্মানিতে ‘নাৎসি’রা নিয়েছে।” (NAI, Home Pol., Department. 88/33, 1933)
সব মিলিয়ে এটা পরিষ্কার যে, হিন্দু-জাতীয়তাবাদীরা একজন ক্ষমতাশীল নেতার ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছিল। তাছাড়া, তারা তাদের সংগঠনকে একটি জোরদার কেন্দ্রাভিমুখী চরিত্র দিতেও আগ্রহী ছিল।
ইতালির ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে মুঞ্জের যোগাযোগ ভাবাদর্শ তথা সাংগঠনিক স্তরে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। মুঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের সামরিকীকরণের কাজে তাঁকে সাহায্য করতে পারেন, এমন লোকজনদের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। ১৯৩৪-এ তিনি তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান-Bhonsla Military School তৈরির উদ্যোগ শুরু করেন। (৯) এই লক্ষ্যে একই বছরে মুঞ্জে কেন্দ্রীয় হিন্দু সামরিক শিক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন। সমিতির লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের সামরিক পুনর্জাগরণ ঘটানো এবং হিন্দু তরুণদের মাতৃভূমি রক্ষার দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত করে তোলা। ‘সনাতন ধর্মে’ তাদের দীক্ষিত করা। “আত্মরক্ষা ও স্বদেশ রক্ষায় বিজ্ঞান ও কলায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।” (Moonje Papers-পূর্বোল্লিখিত)
মুঞ্জের কার্যক্রম তাই সম্পূর্ণভাবেই হিন্দু সমাজের প্রতি নিবেদিত, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সমাজের প্রতি নয়। তাঁর পরিকল্পিত ‘স্কুল’ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করতে পারে এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো একটি দলিলে মুঞ্জে ফ্যাসিস্ত ইতালি ও নাৎসি জার্মানির প্রসঙ্গ টেনেছেন খোলামেলাভাবেই। এতে লেখা হয়েছিল:
“এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য আমাদের ছেলেদের গণহত্যার খেলায় যোগ্য করে তোলা। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধজয়ে নিজেদের রক্তপাত যত কম আর বিপক্ষের লোকক্ষয় বেশি হয়, ততই ভালো।” (Moonje Papers – পূর্বোল্লিখিত)
মুঞ্জে ‘শত্রুপক্ষ’ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দেননি। ‘শত্রু’ বাইরের অর্থাৎ ব্রিটিশ কিনা অথবা তা ‘ঐতিহাসিক’ ভেতরের দুশমন-মুসলিমরা। আলোচ্য দলিলে হিংসা ও অ-হিংসার মধ্যে সম্পর্ককে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। ভারতের ইতিহাস এবং হিন্দুদের শাস্ত্র থেকে অজস্র উদাহরণ তুলে সংগঠিত হিংসাকে (জঙ্গিবাদের চেহারায়) যথার্থতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। অপরদিকে অ-হিংসাকে সংসার-বিমুখীনতা ও কাপুরুষোচিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মুঞ্জের মতামত মুসোলিনির ধারণার সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়:
….এই ধরনের চিন্তা সিনর মুসোলিনিও ব্যক্ত করেছেন, তবে আরও জোরালো ও সরাসরি ভাষায়, যখন তিনি বলেন: “ইউরোপের সঙ্গে আমাদের শান্তি ও সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা নির্ভর করে আছে লক্ষ লক্ষ ইস্পাতের বেয়নটের ওপর।”
মুসোলিনির ‘Doctrine of Fascism’ থেকে আবার উদ্ধৃত করা যায়-
“আমি চিরস্থায়ী শাস্তিতে বিশ্বাস করি না। এটা মানুষের মৌলিক গুণাবলির পরিপন্থী। কারণ, একমাত্র সংঘাতের মধ্যে দিয়েই এই গুণগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
“একমাত্র যুদ্ধই মানুষের সমস্ত শক্তিকে তার চরমতম উত্তেজনার স্তরে নিয়ে যেতে পারে। যাদের সাহস আছে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার তাদের মহত্ত্ব সুনিশ্চিত স্বীকৃতি পায়।
“ফ্যাসিবাদ চিরস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কিংবা উপযোগিতা কোনোটাতেই বিশ্বাস রাখে না। এতে শান্তিবাদের (pacifism) স্থান নেই, কারণ শান্তিবাদের উৎস সংঘাত পরিত্যাগ এবং আত্মত্যাগের বদলে কাপুরুষ মানসিকতা।”
মুঞ্জে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলেছিলেন যে, এইসব ভাবনাচিন্তার লক্ষ্য গৃহযুদ্ধের বাতাবরণকে যথার্থতা দেওয়া নয়। শান্তি উঠে আসবে সামরিক দিক থেকে সংগঠিত একটি জাতির আত্মরক্ষার প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে। এ প্রসঙ্গে ইতালি ও জার্মানি থেকে আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে:
ইতালির রাজা বলেছেন, “ইতালি সুদীর্ঘ সময়ের জন্য শান্তি চায়, কিন্তু শান্তির সবচেয়ে বড়ো রক্ষাকবচ হলো ইতালিয় সৈন্যবাহিনীর সক্ষমতা। সরকার সামরিক বাহিনীর দক্ষতা বাড়াতে সর্বতোভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দক্ষতা নির্ভর করছে ক্যাডার, অস্ত্রশস্ত্র ও সেনানায়কদের একতার উপর। ইতালির তরুণদের স্বাস্থ্য আরও ভালো করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সৈনিক হিসেবে তাদের দক্ষতার মান আরও বাড়াতে হবে।”
জার্মানি প্রসঙ্গে মুঞ্জে একটি পুস্তিকা থেকে উদ্ধৃতি দেন (‘Military Science’ লেখক নহিবক টেকনিক্যাল হাই স্কুলের অধ্যাপক Ewald Banse)
“পুস্তিকাটির প্রারম্ভিক বক্তব্য হল যুদ্ধ অনিবার্য ও নিশ্চিত। তাই এটা যতদূর সম্ভব জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিজেকে সাধ্যমত তৈরি রাখা… জাতির মনকে বাল্যকাল থেকেই যুদ্ধের ধারণার সঙ্গে সম্যক পরিচিত হতে হবে, কারণ লিখছেন, মৃত্যু পথযাত্রী যোদ্ধা অনেক নিশ্চিন্তে মরণকে বরণ করতে পারে, যদি সে জানে যে তার রক্ত ঝরছে তার জাতির ঈশ্বরের জন্য।”
উদ্ধৃতির শেষ লাইনটির অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের সারমর্মের আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।
মুঞ্জে যখন হিন্দু সমাজকে জঙ্গিকরণের ফলিত উপায়গুলো নির্দেশ করেছিলেন, তখন তিনি আবার ইতালি এবং তার সামরিক ও আধা-সামরিক সংগঠনগুলোর কাছে ফিরে যান। ইতালির অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি-‘She Wolf’s children, Balilla Avanguardisti’-র গঠনের বিস্তৃত বিবরণ দেন। তিনি জানান, এই সংস্থাগুলো ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সের ছেলেদের আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়, এবং তারপর তারা তরুণ ফ্যাসিস্তে পরিণত হয়। ইতালি তাই এখন ৬,০০০,০০০ প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল যুবক নিয়ে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত।
Balillaদের নৈতিক চরিত্র গঠন এবং সৈনিক হওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো শেখানো হয়।
এর ফলস্বরূপ- সাধারণ নাগরিক আর সৈনিকদের মধ্যে কোনো তফাত ভবিষ্যতে থাকবে না।
আজ আমরা জানি, ব্যাপক সংখ্যক সমরবিদ্যায় প্রশিক্ষিত নাগরিক থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালিকে হার মানতে হয়েছিল। মুঞ্জে অবগত ছিলেন না যে এই প্রশিক্ষণের স্তর ছিল নিচু, ছিল সমন্বয়ের অভাব আর ফ্যাসিস্ত আদর্শ ইতালিয়দের মনের গভীরে প্রবেশ করেনি। ফ্যাসিস্ত ধারণা, অন্তত মহারাষ্ট্রে, হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়েছিল। সদ্য উল্লিখিত পাণ্ডুলিপিটি প্রচার পুস্তিকা আকারে মুদ্রিত হয় (অনুলিপি রয়েছে NAI, Jayakar Papers, microfilm fn6 m2)। এই পুস্তিকা শুধু মুঞ্জে যাদের নিজের পরিকল্পনায় শামিল করতে চেয়েছিলেন তাদের মধ্যে নয়, আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদ তখন বেশ কিছুটা জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু তার পরিমাণ আজ আন্দাজ করা কঠিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভকাল
মুঞ্জের ইতালি যাত্রার পর ভারতে প্রধান হিন্দু সংগঠনগুলোর প্রবক্তাদের সঙ্গে ফ্যাসিস্ত সরকারের কোনো সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। তবে, ১৯৩০-র দশকের শেষদিকে ভারতে ইতালিয় প্রতিনিধিরা হিন্দু-জাতীয়তাবাদের চরমপন্থী অংশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। বোম্বের ইতালিয় কনস্যুলেট স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছাকাছি আসার উদ্যোগ নেয়। এই শহরের ইতালিয় কূটনৈতিক মিশন মহারাষ্ট্র ও বাংলার আমূল সংস্কারপন্থী আন্দোলনগুলোর সাথে বোম্বে ও কলকাতার ইতালিয় কনস্যুলেট দুটিকে সংযোগকারী নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। (নিবন্ধ রচয়িতার গবেষণাপত্র পৃ-২৭৬-৭৯)।
১৯৩৮-র জুন থেকে বোম্বে কনস্যুলেট যত বেশি সম্ভব ভারতীয় ছাত্রকে ইতালিয় ভাষা শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ভরতি করাতে শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের ইতালি তথা ফ্যাসিবাদের সমর্থনে দলে টানা। এই কাজের জন্য বোম্বেতে ইতালিয় কার্যকলাপ সামলানোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে রোম থেকে পাঠানো হয় Mario Carelli-কে। Carelli ইতালিয় সরকারের তত্ত্বাবধানে এবং Giovanni Gentile-র সভাপতিত্বে ১৯৩৩-এ রোমে গঠিত Institute for Middle and Far East (ISMEO)-র সচিব ও গ্রন্থাগারিক ছিলেন। (১০) বোম্বেতে ছাত্রদের মধ্যে তার নজরে এসেছিলেন মাধব কাশীনাথ দামলে। শিক্ষকের উপদেশেই দামলে মুসোলিনির Doctrine of Fascism’ মারাঠি ভাষায় অনুবাদ করেন এবং ১৯৩৯-এ তা নিজের প্রতিষ্ঠা করা পত্রিকা লোখান্ডি মোর্চায় (লৌহ জোট) ধারাবাহিক নিবন্ধের আকারে প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাতেই পাঁচ পর্বে ছাপা হয় Antonio Pagliaro-র পুস্তিকা ‘Fascism against Communism’ এবং Carelli-র লেখা ‘The Institution of the House of the Fasci and corporations’ (১১)।
১৯৩৯-র শরৎকালে লোখান্ডি মোর্চায় এমন এক উগ্র নিবন্ধ প্রকাশিত হয় যে, পত্রিকাটি পুলিসের নজরে পড়ে যায়। এর ফলে, ইতিমধ্যেই গোয়েন্দা বিভাগের নজরে থাকা দামলে বাধ্য হন পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ রাখতে ও জরিমানা দিতে। দামলে ছিলেন পুনের চিৎপাবন ব্রাহ্মণ। তিনি থাকতেন বোম্বেতে, যেখানে তাঁর বাবার ছাপাখানা থেকেই মুদ্রিত হতো লোখান্ডি। পুলিসের বিবরণ অনুযায়ী-
দামলে জঙ্গি রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী এবং নিজেকে তিনি বাল গঙ্গাধর তিলকের অনুগামী বলে মনে করেন… দামলে প্রকাশ্যেই বলেন যে তিনি ইতালি ও নাৎসি জার্মানির ইতিহাসের পরম ভক্ত (MSA., Home Special Department, 830(1) 1939, note dated July 11, 1939)। এর চেয়ে আরও অর্থবহ হলো ইতালিয় কনসাল যে চোখে দামলেকে দেখেছেন, তা:
ফ্যাসিস্ত ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ দামলে Iron Guards নামে সংগঠন
দামলের আদি বাসস্থান পুনের ইয়াওত গ্রাম। লেখাপড়া বোল্লাহয়ের উইলসন কলেজে। তার বাবা এখানে গিরগাঁতে ‘Aryan Typewriting Institute’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালাতেন। কাশীনাথ করতেন শিক্ষকতা।
হিন্দুত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ যোগসাজশ ১৯৩০-র দশক মারিয়া কাসোলরি
অনুবাদক: শুভাশিস ঘোষ
এন বি এ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড
প্রথম গণশক্তি প্রকাশনা ৩০ জানুয়ারি, ২০০১ প্রথম এন বি এ সংস্করণ: জুলাই ২০১৬
অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী প্রকাশক ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি. ১২এ, বঙ্কিম চাটার্জি স্ট্রীট
কলকাতা ৭০০ ০৭৩
@freemang2001gmail-com



