সাভেরা

আদিবাসীদের জমি লুঠের সঙ্গে সঙ্গে, তাদের আরও অনেক আশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বিজেপির সরকারগুলি। এগুলোর মধ্যে পড়ে এফআরএ ও পিইএসএ কার্যকর করা। এগুলো কার্যকর হলে জমির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ত। একইভাবে, প্রিভেনশন অফ অ্যাট্রোসিটিজ অ্যাক্ট (পিওএ), এবং প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস অ্যাক্ট (পিসিআরএ) শম্বুক গতিতে কার্যকর করার ফলে যারা আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার চালায় কিংবা তাদের অপমানিত করে, তাদেরই কিছু কিছু অংশ রক্ষাকবচ পেয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণ কখনই পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি এবং এভাবে যে একটা সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা ধারাবাহিক ভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে সে বিষয়ে বিজেপির সরকারগুলির কোনও হেলদোল পর্যন্ত নেই। ট্রাইব্যাল সাব প্ল্যান খাতে (টিএসপি) অর্থ বরাদ্দে ঘাটতি রয়েছে এবং সেই টাকা খরচ করা হচ্ছে এমন সব প্রকল্পে যেগুলি আদিবাসীদের জন্য নয়।
Powered by Translate

সরকারি মদতপুষ্ট ‘জনজাতীয় গৌরব বর্ষ’ (ট্রাইবাল প্রাইড ইয়ার) শেষ হচ্ছে ২০২৫ এর ১৫ নভেম্বর। ওই দিনটি বিরসা মুন্ডার ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। বীরসা মুন্ডা সেই মহান আদিবাসী নেতা যিনি ঊনবিংশ শতকের শেষে জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আদিবাসী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং জেলের কুঠুরিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সঙ্ঘ পরিবার এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপিশাসিত রাজ্য সরকারগুলি বীরসা মুন্ডা ও অন্য আদিবাসী নেতাদের নিয়ে বিরাট করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়কে নিজেদের পক্ষে আনার জন্য এটা তাদের কৌশলের একটা অঙ্গ। স্বাধীনতার পর থেকেই যখন আরএসএসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তখন থেকেই আরএসএস তাদের প্রচারকদের (সর্বক্ষণের সংগঠক) মধ্য ভারত এবং দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী এলাকায় পাঠিয়েছে। এই সব প্রচারকদের পাঠানো হয়েছে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করার জন্য, তাদের শিক্ষা,স্বাস্থ্যের মতো পরিষেবা দেওয়ার জন্য এবং আদিবাসীদের মধ্যে হিন্দু রীতিনীতি ও প্রথাগুলি চালু করে দেওয়ার জন্য। তাদের কৌশল কার্যকর করার জন্য আরএসএস নিজেদের সংগঠনের জাল ভাল রকম বিস্তার করেছে। কয়েক দশক ধরে এই কাজ করে যাওয়ার ফলে তাদের সমর্থনও বেড়েছে। কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের এই সব প্রয়াস আরও জোরদার হয়েছে। তবে অতি সম্প্রতি বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলি যাতে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারে এবং শিল্প গড়তে পারে, সেজন্য আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার কাজে মদত দিচ্ছে বিজেপির সরকারগুলি। এর ফলে আদিবাসীদের মধ্যে আরএসএসের যে সমর্থন গড়ে উঠেছিল তা দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বস্তুত ‘বনবাসী’দের– আদিবাসীদের বনবাসী অভিধাই দিয়েছে আরএসএস— ‘সেবা’ করার বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের মূলস্রোতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করার প্রয়াস মাত্র যাতে তাদের জমি ও অরণ্য গ্রাস করে মুনাফা কামাতে পারে কর্পোরেট সংস্থাগুলি। আরএসএস ও তাদের সহযোগীরা এভাবে আদিবাসীদের সঙ্গে নীতিহীন ভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
আদিবাসীদের কোন দৃষ্টিতে দেখে আরএসএস
আরএসএসের মূল তাত্ত্বিক এবং দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক (সুপ্রিমো) এম এস গোলওয়ালকার অনেক আগেই বনবাসীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন ও তাদের কথা বলেছিলেন। তিনিই জোর দিয়ে বলেছিলেন আদিবাসীদের আদিবাসী না বলে ‘বনবাসী’ হিসাবে উল্লেখ করতে হবে (ফরেস্ট ডয়েলার)। যদিও আদিবাসী মানে প্রাচীন বা আদি বাসিন্দা। আরএসএস একথা মানে না যে, আর্যদের আগেও ভারতে লোকের বসবাস ছিল। গোলওয়ালকার জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘বনবাসী’দের বাকি সমাজ অবহেলা করেছিল, তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছিল এবং তাঁরা ছিলেন কুসংস্কারের শিকার। কারণ তাঁদের মধ্যে ‘ধর্ম’-এর জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া হয়নি। তাই তিনি লিখেছেন, বাকি হিন্দু সমাজকে তাদের কাছে যেতে হবে, তাঁদের শিক্ষা দিতে হবে, তাঁদের জীবনধারণের ও সংস্কৃতির মান উন্নয়ন করতে হবে, এবং তাদের প্রতি যে অবহেলা করা হয়েছে সেবিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। (শ্রী গুরুজি সমগ্র, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৪৭)
‘বনবাসী’দের সমাজ অবহেলা করেছে, এই সব আক্ষেপের আড়ালে আসলে আরএসএসের শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টিভঙ্গীকে আড়াল করা যায় না। আদিবাসীরা পশ্চাদপদ, অশিক্ষিত, কুসংস্কারে ডুবে রয়েছে, তাই যারা আদিবাসী নন কিন্তু আলোকপ্রাপ্ত তাদের আদিবাসীদের মধ্যে যেতে হবে এবং তাঁদের নানা ভাবে উদ্ধার করতে হবে। ভারতের ১১ কোটি আদিবাসীদের প্রতি এটাই আরএসএসের মূল দৃষ্টিভঙ্গী।
পশ্চাদপদ আদিবাসীদের ‘ধর্ম’ শিক্ষা দিতে গোলওয়ালকর আরএসএস প্রচারকদের এখনকার দিনের ছত্তিশগড়ের যশপুরে এবং উত্তর পূর্বের অসমে আরএসএস প্রচারকদের পাঠিয়েছিলেন।যশপুরে ১৯৫২ সালে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম (ভিকেএ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। দুটি অঞ্চলেই কৌশল ছিল একইরকম: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরিষেবা দিয়ে এবং আয়বৃদ্ধির জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দিয়ে ‘বনবাসী’দের আস্থা অর্জন করা। একাজে আরএসএস অনুকরণ করছিল খ্রিস্টান মিশনারিদের পথ যারা ওই জায়গাগুলিতে আরও অনেক বেশি সময় আগে থেকে সক্রিয় ছিল। গোলওয়ালকার ও অন্যরা বারে বারে একথা বলছিলেন যে, মিশনারিদের কাজকর্মের জন্য ‘বনবাসী’রা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছে এবং এটা বন্ধ করতে হবে। বস্তুত, ১৯৫০ সালে এই ধরনের কাজকর্ম শুরু করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টান মিশনারিদের কাজ বন্ধ করা। একাজে যে সব এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল তাতেও একথা স্পষ্ট হয় যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে বাধা দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। একথা অবশ্যেই খেয়াল করতে হবে যে, আরএসএসের আদর্শে অনুপ্রাণিত সংগঠনগুলি কখনই আলাদা আলাদা অংশ হিসাবে কাজ করে না — বরং তাদের কাজগুলো একটার সঙ্গে একটা জড়িয়ে থাকে এবং কখনও কখনও মিলেও যায়। সেবা ভারতী দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ও রিলিফের কাজ করে। বিদ্যা ভারতী স্কুল চালায় (আদিবাসী এলাকায় একল বিদ্যালয় ও হস্টেল চালানো সহ)। সংস্কার ভারতী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কাজকর্ম চালায়। অন্য সংগঠনগুলি আদিবাসী এলাকায় ভিকেএ-র লাইনে কাজ করে। এসবের বাইরে আরএসএসএর দিক থেকে বড় ভূমিকা নেয় বিবেকানন্দ কেন্দ্র (কন্যাকুমারী)। এটি তৈরি করেছিলেন আরএসএস নেতা একনাথ রানাডে। এই কেন্দ্রটি কয়েক দশক ধরে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে কাজ করছে। এরা স্কুলও চালায় এবং বিভিন্ন নামে নানা ধরনের সংগঠন চালায়।
কৌশল বদলে বদলে যায়
আজকের দিনে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম একটা বিরাট ভাবে ছড়িয়ে থাকা সংগঠন যা আদিবাসীরা বসবাস করেন এমন বেশির ভাগ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে রয়েছে। এরা চালায় হস্টেল, প্রাথমিক ও মিডল স্কুল, নন-ফর্মাল শিক্ষাকেন্দ্র (এগুলিতে সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়), মেডিক্যাল সেন্টার, ক্রীড়া কেন্দ্র, এবং ‘শ্রদ্ধা জাগরণ’ কেন্দ্র (এগুলিতেও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে)। এই সব ধরনের কার্যকলাপ করা হয় ১৭,০০০টি এলাকায়। এমনটাই জানা যাচ্ছে ভিকেএ ওয়েবসাইট থেকে।
১৯৫০ সালের গোড়া থেকে ১৯৮০ সালের শেষ দিক পর্যন্ত ভিকেএ এবং অন্য সংগঠনগুলি গুজরাট ও দক্ষিণ রাজস্থান থেকে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডের মধ্যে দিয়ে ওড়িশা ও দক্ষিণ বঙ্গে ধীর কিন্তু অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছিল। এই সব অঞ্চলে দেশের দুই তৃতীয়াংশ আদিবাসী বাস করেন। ‘সেবা’ কার্য চলছিল, চলছিল ‘সাংস্কৃতিক জাগরণ’ কর্মসূচি। তবে এই কাজে তেমন অগ্রগতি কিছু ঘটছিল না। একই পরিস্থিতি ছিল উত্তর পূর্বাঞ্চলে। সেখানে আরএসএস প্রচারকেরা আসছিল অন্য রাজ্য থেকে এবং সেখানে কাজ করত দু থেকে তিন বছর। ১৯৮০ সালে রাম জন্মভূমি আন্দোলনের উত্থানের সময় থেকে এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) প্রতিষ্ঠার পর আরও নতুন ধরনের আগ্রাসী হিন্দুত্বের উত্থান হয়। এর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল আসামের অনুপ্রবেশ বিরোধী আন্দোলন। এর ফলে এবং আরও অনেক ভিন্ন কারণে দুটি অঞ্চলেই আগ্রাসী হিন্দুত্ব দ্রুত বেড়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষোভের কারণে কংগ্রেসের সমর্থনের ভিতে ভাঙন ধরার রাজনৈতিক পরিবেশ এই পরিস্থিতিতে আরও মদত যুগিয়েছিল, মদত যুগিয়েছিল পরিচয় সত্তা ভিত্তিক আন্দোলনের উদ্ভবও।
উত্তর পূর্বে আরএসএস ও তাদের ফ্রন্টাল সংগঠনগুলি কৌশল বদলে বিভিন্ন জাতিগত এবং জাতি-তথা-ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলির পরিচিতি সত্তাভিত্তিক কাজকর্মে মদত দেওয়াকে তাদের সাংগঠনিক কাজের বিষয় করে ফেলেছে। এ সব কাজের মধ্যে রয়েছে এই সব গোষ্ঠীর বীরদের মহত্ত্ব প্রচার করা, মহাভারতের মতো প্রাচীন ঐতিহ্য ও কাহিনিগুলির সঙ্গে এই সব গোষ্ঠীর পুরাকথার সংযোগ তৈরি করা, সনাতন প্রথা ও রীতিনীতি এবং দেবদেবীদের ধারণা চালু করা এবং পরিচিতি সত্তা ভিত্তিক দাবিগুলি নিয়ে মাঠে নেমে পড়া। এভাবে অরুণাচলের ডনই-পোলো সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করেছে আরএসএএস। কাজ করেছে মেঘালয়ের সেঙ খাসি আন্দোলনে, জেলিয়ানগ্রঙ নাগাদের মধ্যে। এই নাগারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেনি এবং তাদের আইকন রানি গাইদিনলিউ (১৯১৫ থেকে ১৯৯৩)কে জনপ্রিয় করে তুলেছে আরএসএস। কাজ করেছে আসামের ডিমা হাসাও জেলার ডিমাসা কাছারিদের মধ্যে। আসামে বিজেপি সরকার নামঘরগুলি নতুন করে সংস্কারের অনুমতি দিয়েছে। এগুলি ১৫ ও ১৬ শতকের নব্য বৈষ্ণবপন্থী সাধু শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের অনুগামীদের প্রার্থনার জায়গা। একই সঙ্গে আরএসএস ঘোষণা করেছে সাধু শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের জন্মস্থান সাজিয়ে তোলা হবে। উত্তর পূর্বের বিভিন্ন উপজাতির দাবি সমর্থন করে আসছে আরএসএস ও বিজেপি, যাদের মধ্যে রয়েছে আসামের বড়ো ও কোচ-রাজবংশীরা, রয়েছে ত্রিপুরার আদিবাসীরা এবং আরও অনেক গোষ্ঠী। অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতবাদীদের সঙ্গে যোগ রয়েছে এমন সংগঠনগুলির সঙ্গেও জোট বাঁধতে পিছপা হয়নি আরএসএস। এবং এ সবকিছুর লক্ষ্য ছিল নিজেদের সমর্থনের ভিত গড়ে তোলা। এর পাশাপাশি, আরএসএস ও তাদের অনুমোদিত সংগঠনগুলি বিশেষ করে ভিকেএ, ভিএইচপি এবং বিবেকানন্দ কেন্দ্র, হিন্দুত্বের পক্ষে আগ্রাসী প্রচার করেছে। এজন্য তারা কাজে লাগিয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাবেক রীতিনীতি ও প্রথা, শোভাযাত্রাকে এবং সনাতন ধর্মের সঙ্গে দীর্ঘকাীন সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়েছে এমন কল্পকথা তৈরি করে (যেমন আরএসএসের দাবি কৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিণী ছিলেন অরুণাচল প্রদেশের রাজকন্যা)। খ্রীষ্টধর্মের প্রভাব ঠেকাতে এগুলিকে কাজে লাগানো হয়েছে এবং কাজে লাগানো হয়েছে মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে শত্রুতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে এবং এর পাশাপাশি হিন্দু অভিবাসীদের সঙ্গে নেওয়ার পক্ষে মত গড়ে তুলতে। ফলে ১৯৭০এর দশকের শেষের দিকে আসাম আন্দোলনের সময় যে অভিবাসী বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে উঠেছিল সেগুলিকে মূলত পরিণত করা হয়েছিল মুসলিম অভিবাসী বিরোধী মনোভাবে, এবং এই বিরোধের মনোভাব জাগিয়ে তোলা হয়েছিল শুধুমাত্র অহোম এবং বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেই নয়, জাগিয়ে তোলা হয়েছিল বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেও।২০১২ সালে বড়োরা বাঙালি হিন্দু অভিবাসীদের যে গণহত্যা করেছিল তাদের পিছনে উগ্র হিন্দু শক্তিগুলির পূর্ণ মদত ছিল।
মধ্য ভারতের আদিবাসী এলাকাগুলিতেও পরিচিতি সত্তা ভিত্তিক আন্দোলন ও ঘটনাগুলিকে কাজে লাগানোর একই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। এই কাজ করা হয়েছিল আদিবাসী গোষ্ঠীগুলিকে হিন্দু করে তোলার বৃহত্তর কর্মসূচির আওতায়। এর পাশাপাশি, ভিকেএ অরণ্যের অধিকার আইন (এফআরএ) কিংবা পঞ্চায়েত (তপশিলি জাতি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন কার্যকর করার দাবি সমর্থন করেছিল। যদিও আদিবাসীদের পক্ষে লাভজনক এই গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলি কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারগুলির গতি ছিল খুবই শ্লথ এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিজেপির সরকারগুলি এই দাবি সম্পর্কে চোখ বুজে থাকাই পছন্দ করে। এর আগের পর্বের খ্রিস্টান বিরোধী প্রচারই ছিল প্রধান গুরুত্বের বিষয় ( মনে করুন গুজরাটের ডাং জেলায় ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালের সাম্প্রদায়িক হিংসা, ১৯৯৯ সালে ওড়িশার কেওনঝড়ে গ্রাহাম স্টেইনস ও তার দুই শিশু সন্তানকে হত্যা, এবং ২০০৪ সালে ওড়িশার কন্ধমালে খ্রিস্টানদের ওপর আক্রমণ)। তবে সম্প্রতি মুসলিম অভিবাসী বিরোধী বক্তব্যই হয়ে উঠেছে তাদের প্রচারের মূল হাতিয়ার। বিশেষ করে এটা কার্যকর করা হচ্ছে ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ের মতো পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে।
পরিচিতি সত্তা ভিত্তিক স্বীকৃতি আদায়ের বিভিন্ন দাবিকে সমর্থন করার কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে আরএসএস/বিজেপি। যেমন তপশিলি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গলমহল অঞ্চলের কুর্মিদের দাবিকে তারা সমর্থন করছে। কিংবা ভাষা অষ্টম তপশিল অন্তর্ভুক্ত করা, এমনকি এলাকাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতির দাবিতে কোচবিহার আন্দোলনকে সমর্থন করছে। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও নির্লজ্জ উদাহরণ হল আসামের ৬টি উপজাতিকে (থাই অহোম, মোরান, মাতাক, চুতিয়া, কোচ রাজবংশী এবং চা উপজাতি) তপশিলি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি । এর ফলে আসামের নির্বাচনগুলিতে এই উপজাতিগুলি বিজেপিকে সমর্থন করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এই সব প্রতিশ্রুতি পূরণে কার্যত কিছুই করা হয়নি এবং তার ফলে গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বাসঘাতকতা
সাংবাদিক ও শিক্ষা জগতের লোকেদের একাংশ আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে কাজ করা আরএসএস ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির সাংগঠনিক বিস্তারে মুগ্ধতাবোধের পরিচয় দিচ্ছেন। লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার বেশির ভাগ তপশিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলিতে বিজেপি প্রার্থীদের জয়কে তাঁরা সাফল্য হিসাবে দেখাচ্ছেন। কিংবা দেখাতে চাইছেন যে বিজেপি দেশের উত্তর পূর্বের সমস্ত রাজ্যগুলিতে জোট গড়ে তুলেছে এবং সরকারের অংশীদার হয়েছে। তবে এটা সীমাবদ্ধ দৃষ্টি। এই দৃষ্টিভঙ্গীতে বৃহত্তর বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়। ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক ভাবে বিজেপি ভালই এগিয়েছিল। তবে শেষ বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে দেখা গেছে এসব কেন্দ্রে অভিবাসন বিরোধী প্রচার তুঙ্গে তোলা সত্ত্বেও, তপশিলি উপজাতিদের আসনগুলি তাদের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও রাজস্থানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন অন্য সম্প্রদায়ের লোকেদের মতোই ভোট দিয়েছেন — অর্থাৎ মূলত তাঁরা বিজেপিকেই সমর্থন করেছেন। এই সব রাজ্যে আদিবাসীদের পছন্দ নির্ধারিত হয়েছে রাজ্যগুলির রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে। দেখানোর মতো এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, যারা আদিবাসী নন তাদের চেয়ে আদিবাসীরা বিজেপিকে বেশি পছন্দ করেন। এখানে একথা বলা হচ্ছে না যে আদিবাসীদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন শেষ হয়ে গেছে কিংবা সমর্থনে ভাটা এসেছে। শুধু পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরার স্বার্থে একথা বলা হচ্ছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির কথা বলতে গেলে, সেখানে বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত একটা প্রবণতা রয়েছে যে, কেন্দ্রে যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদেরই সমর্থন করে আঞ্চলিক দলগুলি। এর প্রধান কারণ হল এসব রাজ্যের শাসক অভিজাতরা কেন্দ্রের টাকা পাওয়াটা চালিয়ে যেতে চায়। এসব রাজ্যের রাজস্ব আদায় কম, তেমন কিছু শিল্পায়ন হয়নি, কঠিন জমিতে মূলত কৃষি অর্থনীতিই ভরসা, এসব জায়গায় সর্বদাই উগ্রপন্থী হানার ভয় থাকে, তাই কেন্দ্রের টাকার ওপর নির্ভরতা এই সব রাজ্যগুলির শাসক অভিজাতদের পক্ষে আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেকারণেই আঞ্চলিক দলগুলি এখন বিজেপির সঙ্গে জোট করে রয়েছে। এর মানে এটা নয় যে,এই সব রাজ্যের সব মানুষ এখন বিজেপি বা আরএসএসের সমর্থক।
কর্পোরেটের জমি লুঠ
ওপরে যা কিছু বলা হল, তার পরেও এ বিষয়টা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে আরএসএসের বিভিন্ন সংগঠন যে কাজ করেছে তার ফলে সমর্থন ও সুনাম তৈরি হয়েছিল তার লাভ গুছিয়ে নিজেদের ঘরে তুলেছে বিজেপি। এবং সেটা করেছে আদিবাসী এলাকায় তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। সেটা হল মূল্যবান সম্পদের দখলদারি— তা সে জমি কিংবা খনিজ যাই হোক না কেন। এর আগে পিপলস ডেমোক্রেসির নিবন্ধে বলা হয়েছে, আসামের বিজেপি সরকার কার্বি আংলঙ জেলার ৬০০০ একর জমি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য আম্বানিদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। কোকড়াঝাড় জেলায় ১১৩৪ একর জমি আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য আদানিদের দিতে চেয়েছিল, এবং ডিমা হাসাও জেলায় ৬৬৭ একর জমি একটি সিমেন্ট কারখানার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। প্রথম দুটি প্রকল্পই ঝুলে রয়েছে কারণ স্থানীয় আদিবাসীরা এই প্রকল্পগুলির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তৃতীয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে গুয়াহাটি হাই কোর্টে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার আসাম জুড়ে নির্মম উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে জবরদখল তুলে দেওয়ার অজুহাতে এবং বলা হচ্ছে জবরদখলকারীরা নাকি ‘বেআইনি অভিবাসী’। আদিবাসী সহ অন্যদের জমি অধিগ্রহণ করার ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ক্রোধের সঞ্চার হয়েছে। এরই মধ্যে শর্মা সরকার টাটাদের সঙ্গে একটি মউ স্বাক্ষর করেছে, পুনর্নবীকরণ যোগ্য শক্তি প্রকল্প নির্মাণের জন্য যে প্রকল্পে দেওয়া হবে ২০ হাজার একর জমি।
ল্যান্ড কনফ্লিক্ট ওয়াচ সংস্থা সারা দেশে যত জমি সংক্রান্ত সঙ্ঘাত রয়েছে তার হিসাব রাখে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, আসামে জমি নিয়ে সঙ্ঘাতের সংখ্যা ১২৪ যাতে জড়িয়ে রয়েছেন ১ লক্ষ ৮৯ হাজার মানুষ। উত্তর পূর্বের অন্য রাজ্যগুলিতে জমি সঙ্ঘর্ষের ঘটনা এরকম: অরুণাচল প্রদেশ (১৭টি সঙ্ঘাতে প্রভাবিত ১৩ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ), মণিপুর (২৪টি সঙ্ঘাতে জড়িত ২৪ হাজার ২০০ মানুষ), মেঘালয় (৩০টি সঙ্ঘাতে জড়িত ১ লক্ষ ২৮ হাজার মানুষ), মিজোরাম (৪টি সঙ্ঘাতে জড়িত ১২ হাজার ২০০ মানুষ), নাগাল্যান্ড (১৮টি সঙ্ঘাতে জড়িত ৩৬ হাজার ৪০০ মানুষ, সিকিম (৪টি সঙ্ঘাতে জড়িত ৪ হাজার ৭০০ মানুষ) এবং ত্রিপুরা (১৮টি সঙ্ঘাতে জড়িত ৯৩, ৫০০ মানুষ)।
একইভাবে, মধ্য ভারতে হাতে নেওয়া একগুচ্ছ প্রকল্প মূলত সেই সব অরণ্য এলাকায় যেখানে আদিবাসীরা থাকেন।এই প্রকল্পগুলিতে আদিবাসীদের জমি গ্রাস করে নিয়ে সেগুলি তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কর্পোরেট হাউসের হাতে যাদের মধ্যে রয়েছে আদানি, বেদান্ত ইত্যাদিরা। বেশি সংখ্যায় আদিবাসীরা বাস করেন এই ধরনের কয়েকটি রাজ্যে জমি নিয়ে সঙ্ঘাতের একটা হিসাব দিয়েছে ল্যান্ড কনফ্লিক্ট ওয়াচ। ছত্তিশগড় (৪২টি সঙ্ঘাতে জড়িত ১ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষ), গুজরাট (১১৬টি সঙ্ঘাতের ঘটনায় জড়িত ৩ লজ্ক্ষ ৪৮ হাজার মানুষ), ঝাড়খণ্ড (১৯টি সঙ্ঘাতে জড়িত ২ লক্ষ ১ হাজার মানুষ),মধ্যপ্রদেশ (৪৩টি সঙ্ঘাতে জড়িত ৪ লক্ষ ১৭ হাজার মানুষ), এবং ওড়িশা (৫৮টি সঙ্ঘাতে জড়িত ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার মানুষ)।
স্বপ্ন ভেঙে খান খান
আদিবাসীদের জমি লুঠের সঙ্গে সঙ্গে, তাদের আরও অনেক আশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বিজেপির সরকারগুলি। এগুলোর মধ্যে পড়ে এফআরএ ও পিইএসএ কার্যকর করা। এগুলো কার্যকর হলে জমির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ত। একইভাবে, প্রিভেনশন অফ অ্যাট্রোসিটিজ অ্যাক্ট (পিওএ), এবং প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস অ্যাক্ট (পিসিআরএ) শম্বুক গতিতে কার্যকর করার ফলে যারা আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার চালায় কিংবা তাদের অপমানিত করে, তাদেরই কিছু কিছু অংশ রক্ষাকবচ পেয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণ কখনই পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি এবং এভাবে যে একটা সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা ধারাবাহিক ভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে সে বিষয়ে বিজেপির সরকারগুলির কোনও হেলদোল পর্যন্ত নেই। ট্রাইব্যাল সাব প্ল্যান খাতে (টিএসপি) অর্থ বরাদ্দে ঘাটতি রয়েছে এবং সেই টাকা খরচ করা হচ্ছে এমন সব প্রকল্পে যেগুলি আদিবাসীদের জন্য নয়। গত পাঁচ বছরে টিএসপি খাতে মোট বরাদ্দ ৫.৫৭ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ১.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের এক তৃতীয়াংশ) আদিবাসীদের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পে খরচ করা হয়েছে। একটি বিশ্লেষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এগুলি সবই প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। সারা দেশের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে এই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার। বিশেষ করে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে তরুণ, শিক্ষিত প্রজন্মের সঙ্গে যারা চাইছেন নিরাপদ চাকরির সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং উন্নত মানের জীবনযাত্রা। গেরুয়া পতাকার নীচে আদিবাসীদের ঘাস-বিচালির সৈনিক হিসাবে জড়ো করার যে পরিক্লপনা, তাতে এখন ফাটল তৈরি হচ্ছে।
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তরঃ সুচিক্কণ দাস
@freemang2001gmail-com



