
এই গ্রন্থের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হল আধুনিক সমাজের গতির অর্থনৈতিক নিয়ম প্রকাশ করা। কাল মার্কস
পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের অভ্যুদয়ের পর থেকে পৃথিবীতে। শ্রমিকদের জন্য এর মতো এমন গুরুত্বসম্পন্ন একটি বইও। বের হয় নি, যেটি আমাদের সামনে উপস্থিত করা হয়ে এরা হয়েছে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে সম্পর্ক-এটা সেই অঞ্চ অক্ষদণ্ড যার চারিপাশে আবর্তিত হচ্ছে আমাদের কালে চালের সমস্ত।
সামাজিক বাবস্থা সর্বপ্রথম তা এখানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। -এঙ্গেলস
মার্কস যদি ‘যুক্তিবিদ্যা’ না-ও রেখে যান, তিনি রেখে গেছেন ‘পুঁজি’-র যুক্তি… ‘পুঁজিতে প্রযুক্ত হয়েছে একই বিজ্ঞানের প্রতি যুক্তিবিদ্যা, দ্বন্দ্বতত্ত্ব এবং বস্তুবাদের জ্ঞানতত্ত্ব।-লেনিন
কমিউনিস্ট পার্টি সমালোচনাকে ভয় করে না, কারণ আমরা মার্কসবাদী, সত্য আমাদের পক্ষে এবং জনসাধারণ শ্রমিক ও কৃষকেরা আমাদের পক্ষে। -মাও সেতুঙ
সকল দেশের শ্রমিকশ্রেণী একতাবদ্ধ হও।
“একশো বছর আগের মতোই এখনো সমাজের নিচুতলার শ্রমিকরা উদ্বৃত মূলা তৈরী করছে আর সমাজের মাথার উপর বসে উঁচুতলার লোকগুলি তাই আত্মসাৎ ক’রে মোটা হয়ে উঠছে। এই আত্মসাৎ করার ব্যাপারটা ঠিক সাবেক দিনের মত এক পদ্ধতি ধরে যে চলেছে তা নয়, তবে উদ্বৃত্ত মূল্য উদ্বৃত্ত মূল্যই।”
“যারা অপরের শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে, শ্রমিকশ্রেণী তাদের উৎখাত করবেই। কার্ল মার্কস বার্কস
– কার্ল মার্কস
‘ক্যাপিটাল’ প্রথম খণ্ড।
লেখক-জীবনী
প্রকৃত নাম সুধীর ভট্টাচার্য- যদিও তিনি লেখক হিসাবে ‘সুপ্রকাশ রায়’ নামেই সুপ্রসিদ্ধ। তিনি আরও দুটো ছদ্মনামে পরিচিত কাফি খাঁ এবং বিজন সেন। জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল। ছাত্র জীবনেই তিনি ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বৈপ্লবিক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে কলকাতায় এসে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ব্রিটিশ পুলিশের নেক্-নজরে পড়েন। ফলে ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তাঁকে ‘হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প’ এবং ‘বহরমপুর ডিটেনশন ক্যাম্প’-এ থাকতে হয়। এই জেল জীবনে তিনি ভারতের সংগ্রামের ইতিহাস লেখায় নিজেকে নিয়োজিত করে গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিজের নৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি ট্রাম শ্রমিকদের আন্দোলনে পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৬৪ সালে পার্টি দু-টুকরো হয়ে গেলে তিনি ইতিহাস লেখায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন- যে কাজে তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ব্রতী ছিলেন। ‘মাও সেতুঙ’-এর জীবনীকার সুপ্রকাশ রায়ের শেষ জীবনের ইচ্ছা ছিল স্তালিনের জীবনী- শুক করেও ছিলেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেন নি।
১৯৯০ সালের ২১ ডিসেম্বর ৭২ বছর বয়সে মারা যান সুপ্রকাশ রায় অভাবনীয় দারিদ্রকে সাথী করে। আগেই ওনার স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছিল- যিনি নিজেও ছিলেন একজন স্কুল-শিক্ষিকা। এক পুত্র, এক কন্যা- পুত্র দুর্ঘটনায় অপ্রকৃতস্থ, কন্যাও কিছুটা। পেশায় তিনি ছিলেন শিক্ষক- ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার ‘হেয়ার স্কুলে’ শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ সালে সুপ্রকাশ রায় ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হিসাবে তাম্রপত্র পান-যা পরবর্তীকালে ওনার কন্যা অভাবের তাড়নায় কাগজওয়ালার কাছে দশ টাকা মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
ভূমিকা
“শ্রমিকশ্রেণীর প্রয়োজনীয় গ্রন্থসমূহের মধ্যে ক্যাপিটাল-এর মত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় নি।” – ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্স
যাঁরা ‘ক্যাপিটাল’ পড়তে চান তাঁরা শুরুতে অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে কিছু প্রাথমিক বই পাঠ করে নেবেন। ‘ক্যাপিটাল’ প্রাথমিক পাঠের গ্রন্থ নয়। পাঠক অত্যন্ত মনোযোগসহকারে প্রথমে ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ এবং সেই সঙ্গে ‘প্রিন্সিপলস অব কমিউনিজম’ পুস্তিকাটি পড়বেন, পড়বেন এঙ্গেলস্-এর ‘সমাজতন্ত্র: কাল্পনিক ও বৈজ্ঞানিক’ বইখানা যার মধ্যে মার্কস-এর ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব’ বা Theory of Surplus Value আলোচিত হয়েছে। মার্কসের লেখা দুটি পুস্তিকা, ‘শ্রম-শক্তি ও মূলধন’ ‘মূল্য, দর ও মুনাফা’ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পড়বেন লেনিনের পুস্তিকা ‘কার্ল-মার্কস-এর শিক্ষা, এঙ্গেলস্-এর ‘কার্ল মার্কসের সমাধিস্থানে বক্তৃতা’ ও ‘কাল-মার্কস্ এবং তাঁর ক্যাপিটাল প্রসঙ্গে’ বা On Capital বইটি। পড়বেন লেনিনের ‘জনগণের বন্ধু কারা,’ ও ‘কৃষি বিষয়ক প্রশ্নাবলী’র উপর, বই দুটি।
পলিটিকাল ইকোনমি বা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির বিজ্ঞান ভিত্তিক বনিয়াদটি রপ্ত করে পাঠক এবার ‘ক্যাপিটাল’ পড়তে শুরু করবেন।
‘ক্যাপিটাল’ পাঠের প্রাথমিক অসুবিধার কথা মার্কস্ নিজেই উল্লেখ করে বলেছেন যে, এ ব্যাপারে কিছু সাহায্য করতে তিনি অপারগ। কারণ “বিজ্ঞানের পথ সহজ নয় এবং যাঁরা সত্যিই গিরিশৃঙ্গে উঠবার খাড়াইয়ের কথা মনে করে ক্লান্তিতে ভীত হয়ে পড়বেন না, তাঁরাই শুধু (খাড়াই উৎরিয়ে) আলোকোদ্ভাসিত শৃঙ্গচূড়া দেখতে পাবেন।” [‘ক্যাপিটাল, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২১, মস্কো সংস্করণ]
সব দেশেই বিপ্লবী সংগ্রামের অগ্রবর্তীতার সূচকচিহ্ন হিসাবে ‘ক্যাপিটাল’ মহাগ্রন্থের প্রকাশনটি বিচার হয়ে থাকে। চীন, ভিয়েৎনাম, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে ‘ক্যাপিটাল-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে বহুপূর্বে। কারণ শ্রেণীসংগ্রামের এই অমোঘ অস্ত্রখানা শ্রেণীসচেতন শ্রমিকদের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিকদের পরিচালকের ভূমিকায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে সর্বাধিক। সুবৃহৎ গ্রন্থখানা শ্রমিকদের কেনা অসুবিধা হতে পারে বলে বহুদেশেই প্রথমে এর ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
গ্রন্থটিতে লেনিন লিখিত কার্ল মার্কসের জীবনী যুক্ত করলাম যা গ্রন্থটিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
র্যাডিক্যাল প্রকাশিত লেখকের অন্যান্য বই:
ভারতের জাতীয়তাবাদী বৈপ্লবিক সংগ্রাম (১৮৯৩-১৯৪৭)
মহাবিদ্রোহ ও তারপর
সাঁওতাল বিদ্রোহ
তেভাগা সংগ্রাম
তেলেঙ্গানা বিপ্লব
গান্ধীবাদের স্বরূপ
জাতিসমস্যায় মার্কসবাদ
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো সংগ্রামের দিশা
মাও সেতুঙ
চীন বিপ্লব ও চীনের কৃষক
শ্রেণী-সংগ্রামের অমোঘ অস্ত্র: কার্ল মার্কসের মহাগ্রন্থ
ক্যাপিটাল
।। এক।।
মার্কস বলেছিলেন ক্যাপিটাল (মূলধন) গ্রন্থখানি তাঁর সারা জীবনের কর্মসাধনারই ফল। কেবল এই গ্রন্থখানি রচনা করতেই তাঁর লেগেছিল দীর্ঘ সতের বছর। রচনার আয়োজন চলেছিল আরও বহু বছর ধরে।
ক্যাপিটাল গ্রন্থ বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভার মহত্তম কীর্তি। এই মহাগ্রন্থের প্রকাশনার পর থেকেই ধনতান্ত্রিক শোষণ আর দাসত্ব থেকে শ্রমিকশ্রেণী তার মুক্তিলাভের সংগ্রামে এক সুদূরপ্রসারী বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে এসেছে। মার্কস তাঁর এই মহাগ্রন্থেই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর বজ্রকণ্ঠে ধনতন্ত্রের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন। সেই বজ্রধ্বনি আজও সারা বিশ্বময় প্রতিধ্বনিত হয়ে বুর্জোয়াশ্রেণীকে মৃত্যুভয়ে কাঁপিয়ে তুলছে, আর ধনতন্ত্রের উপর শেষ আঘাত হানবার জন্য আহ্বান করছে শ্রমিকশ্রেণীকে।
ধনতন্ত্রেরই গর্ভ চিরে জন্ম নিয়েছে শ্রমিকশ্রেণী। শ্রমিকশ্রেণীরই ইতিহাস নির্দিষ্ট কর্তব্য মানবসমাজের বুক থেকে ধনতন্ত্রের মূলোৎপাটন। বৈপ্লবিক সংগ্রাম দ্বারা শ্রমিকশ্রেণী যাতে ধনতন্ত্রের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলতে পারে তার জন্যই মার্কস তাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থরূপ মহাস্ত্রখানি।
।। দুই।।
মার্কসের মতাদর্শ ব্যাখ্যাত ও প্রমাণিত করা হয়েছে মার্কসের ক্যাপিটাল গ্রন্থে। এই গ্রন্থে বিশ্লেষিত ও প্রমাণিত মার্কসবাদের আলোচনা প্রসঙ্গে লেনিন লিখেছেন:
মার্কসের ক্যাপিটাল
“মার্কসীয় মতাদর্শে কঠোর ও চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিকতা আর বৈপ্লবিকতার সমাবেশ ঘটেছে। এ সমাবেশ কোন আকস্মিকতার ফল নয়। এ সমাবেশের কারণ কেবল এই নয় যে, মার্কসীয় মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতার চরিত্রে বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবীর গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিল, এর আরও কারণ এই যে এই মতাদর্শের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসাবেই এর মধ্যে এই গুণের সমাবেশ ঘটেছে।
[V.1. Lenin, Collected Works, Vol. I., P. 308] মার্কসীয় মতাদর্শের মত মার্কসের ক্যাপিটাল গ্রন্থের মধ্যেও লেনিন-বর্ণিত “কঠোর ও চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিকতা আর বৈপ্লবিকতার” পূর্ণ সমাবেশ ঘটেছে। এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যই গ্রন্থের প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সুষ্পষ্ট এবং গ্রন্থখানি বিজ্ঞান-ভিত্তিক আলোচনার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ধনতন্ত্রের ধ্বংস সাধন আর সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা- এই দুই মহান কর্তব্যভার ইতিহাসই ন্যস্ত করেছে শ্রমিকশ্রেণীর উপর। এক সময় সামন্ততন্ত্র সৃষ্টি করেছিল বুর্জোয়াশ্রেণীকে। বুর্জোয়াশ্রেণী এই সামন্ততন্ত্রকে ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠা করেছিল ধনতন্ত্রের। শ্রমিকশ্রেণী এই ধনতন্ত্রেরই সৃষ্টি। এখন শ্রমিকশ্রেণীরই কর্তব্য ধনতন্ত্রের ধ্বংস সাধন আর সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ক’রে মানবসমাজকে চিরতরে শোষণ-উৎপীড়ন থেকে মুক্তিদান। এই হল শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি ইতিহাসের নির্দেশ।
শ্রমিকশ্রেণী ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী শ্রেণী। শ্রেণী-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেইভাবেই নিজেকে গড়ে তুলতে হবে শ্রমিকশ্রেণীকে। তার জন্যই তাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে সমাজ-বিবর্তনের সূত্র আর ধারাটিকে। কিভাবে সমাজ বিভিন্ন স্তর অতিক্রম ক’রে বর্তমান ধনতন্ত্রের স্তরে এসে পৌঁছাল, কিভাবে সমাজে শোষণ-উৎপীড়নের সৃষ্টি হল, কিভাবে শ্রমিকশ্রেণী তার সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মূলধনীদের শোষণের শিকারে পরিণত হল, সেই শোষণের রূপ কি, কেন শ্রমিকশ্রেণীকেই তার নিজের এবং সমগ্র মানবসমাজের মুক্তির জনাই ধ্বংস করতে হবে ধনতন্ত্রের ভিত্তি আর কাঠামোটাকে, মূলটাকে উপড়ে ফেলতে হবে সমস্ত রকমের শোষণ-ব্যবস্থার, আর কেনই বা এসব হল শ্রমিকশ্রেণীর ইতিহাস-নির্দিষ্ট কর্তব্য- এসবই জানতে হবে, বুঝতে হবে তাদের। শ্রমিকশ্রেণীকে সেই শিক্ষা, সেই বৈপ্লবিক দৃষ্টি ও বিশ্বচেতনা দেবার ভার নিলেন কার্ল মার্কস্। এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি হল তাঁর মহাগ্রন্থ ক্যাপিটাল। মার্কস্ আবির্ভূত হলেন শ্রমিকশ্রেণীর তত্ত্বকার, শিক্ষক আর নায়ক রূপে।
এঙ্গেলস্-এর সহযোগিতায় মাকর্স সৃষ্টি করলেন এক নতুন বিশ্বদৃষ্টি। সেই বিশ্বদৃষ্টি হল বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী জনসাধারণের মূল স্বার্থের তত্ত্বগত প্রকাশ, আর সেই স্বার্থরক্ষার সংগ্রামের রক্তরঞ্জিত পথের নির্দেশ। এই বিশ্বদৃষ্টিই শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে সৃষ্টি করেছে এক দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়। শ্রমিকশ্রেণীর রক্তপতাকা সেই বিশ্বদৃষ্টি, সেই স্বার্থরক্ষার পথ আর আত্মপ্রত্যয়ের উজ্জ্বলতম প্রতীকরূপে উড্ডীয়মান। তাই স্তালিন লিখেছেন:
“মার্কসবাদ কেবল সমাজবাদেরই তত্ত্ব নয়, মার্কসবাদ হল এক সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি, এক নতুন দার্শনিক পদ্ধতি। সেই বিশ্বদৃষ্টি বা দার্শনিক পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে এসেছে মার্কসের শ্রমিক-সমাজবাদ।”
[J.V. Stalin, Works, Vol. 1., P.297] এই বিশ্বদৃষ্টির মূল তত্ত্বই সমগ্র ক্যাপিটাল গ্রন্থের বিষয়বস্তু। সামগ্রিক বিচারে এই গ্রন্থ হল সমাজবাদের এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ। ধনতান্ত্রিক সমাজ-জীবনের প্রত্যেকটি দিকের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা রয়েছে এই গ্রন্থে। এতে আছে সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন-ধারা এবং সামাজিক জীবনের মূল নিয়মাবলীর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ। মার্কস্ এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে এক অজেয় ও অব্যর্থ অস্ত্র তুলে দিয়েছেন শ্রমিকশ্রেণীর হাতে।
ক্যাপিটাল গ্রন্থের আর এক নাম অর্থাৎ দ্বিতীয় শিরোনাম ‘এ ক্রিটিক অফ্ পলিটিকাল ইকোনমি’ (A Critique of Political Economy- বা ‘রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির তত্ত্ববিচার’)। ধনতন্ত্রের গোড়ার দিকের সকল বুর্জোয়া আর্থনীতিক তত্ত্বকারদের সকল তত্ত্বের কঠোর ও গভীর বিচার বিশ্লেষণের পরেই মার্কস্ শ্রমিকশ্রেণীর তত্ত্বকার রূপে সমগ্র রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির (আধুনিক পরিভাষায় শুধু ‘অর্থনীতি’) বিচার করতে বসেছেন। এই আর্থনীতিক তত্ত্ব বিচারের ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োগ করেছেন ‘দ্বন্দ্ব-প্রগতিমূলক বস্তুবাদ’ (Dialectical Materialism) এবং ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ (Historical Materialism)। এই দ্বন্দ্ব-প্রগতিমূলক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদও মার্কসের নিজস্ব সৃষ্টি। এইভাবে তত্ত্ববিচার করতে গিয়ে মার্কস্ ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার মূল কাঠামোর যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তার তুলনা মানবসমাজের ইতিহাসে এখনও পাওয়া যায়নি। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি রহস্যভেদ করেছেন সমগ্র ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার, উদঘাটিত করেছেন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার মূল, ধনতন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক, আর ধনতান্ত্রিক পদ্ধতির নিয়মাবলীর গভীর রহস্য।
এই অতিকায়, মহাগ্রন্থ ক্যাপিটাল মানবজাতির ইতিহাসের এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অর্থনীতি-বিজ্ঞানে আর সাধারণভাবে মানবসমাজের বিজ্ঞান-সম্মত ধারণা সৃষ্টিতে মার্কস্ যে এক সম্পূর্ণ দুঃসাহসিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন তারই স্পষ্টতম সাক্ষ্য বহন করে এই মহাগ্রন্থ। সর্বপ্রথম মার্কসই তাঁর এই মহাগ্রন্থে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অতি জটিল গঠন-পদ্ধতির বিশ্লেষণ করেছেন, বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারা শ্রমিকশ্রেণীর শোষণের সংগুলি প্রকাশ্য পথ আর চোরাগলিকে অনাবৃত ক’রে সপ্রমাণ করেছেন ধনতন্ত্রের ধ্বংস অনিবার্য, অন্তিমকাল আসন্ন। স্তালিন লিখেছেন:
“শ্রমিকশ্রেণীর দুই মহান শিক্ষক, মার্কস্ আর এঙ্গেলস্ই সর্বপ্রথম কাল্পনিক সমাজবাদীদের সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সমাজবাদ স্বপ্নবিলাসীদের কোন আবিষ্কার নয়; সমাজবাদ হল আধুনিক ধনতান্ত্রিক সমাজের বিকাশধারার সুনিশ্চিত পরিণতি। তাঁরা মার্কসের ক্যাপিটাল দেখিয়েছেন, একদিন যেমন দাস-প্রথামূলক সমাজের পতন ঘটেছিল, ঠিক তেমনি পতন হবে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার। তাঁরা দেখিয়েছেন, ধনতন্ত্র নিজেই তার কবরখননকারীদের সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকশ্রেণীই তার সেই কবর খননকারী।”
[স্তালিন রচনাবলী, ঐ লেনিন লিখেছেন, মার্কস্ই সর্বপ্রথম সমাজের বিভিন্ন আর্থনীতিক গঠনের স্তরবিন্যাসকে নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থাসমূহের যোগফল রূপে ব্যাখ্যা করেছেন এবং প্রমাণিত করেছেন যে, সেই আর্থনীতিক গঠনের স্তর-বিন্যাস ইতিহাসের স্বাভাবিক বিকাশ-ধারারই পরিণতি। এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই মার্কস্ সমাজ-বিজ্ঞানকে সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
লেনিন আরও লিখেছেন: মার্কসবাদ এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, প্রথমত ও প্রধানত সমাজের উৎপাদন-ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের বিকাশধারার ইতিহাসই সমগ্র মানবসমাজের ইতিহাস। মার্কস্বাদ আরও শিখিয়েছেন যে, প্রত্যেকটি স্তরের উৎপাদন-ব্যবস্থাই কতকগুলি বিশেষ নিয়মে বিকাশ লাভ ক’রে থাকে, অর্থাৎ তার বিকাশের পথ নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা।
বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের প্রতিষ্ঠাতারা বিভিন্ন শ্রেণীর মুক্তি-সংগ্রামের মূলভিত্তিরও স্বরূপ উদঘাটন করে দেখিয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন প্রকারের শোষণ মূলক সমাজ-ব্যবস্থার উদ্ভব, বিকাশ আর ধ্বংস সম্বন্ধীয় নিয়মাবলী ব্যাখ্যা ও সপ্রমাণ করেছেন। তা করতে গিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন যে,-
“শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের (Dictatorship of the Proletariat) জয় এবং এর প্রতিষ্ঠাই ধনতান্ত্রিক সমাজের শ্রেণী-সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি। তাঁরা ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন, শ্রমিকশ্রেণীই আনবে নতুন এক সমাজ-ব্যবস্থা কমিউনিস্ট সমাজ ব্যবস্থা।” [লেনিন, ঐ]
মার্কসের ক্যাপিটাল মহাগ্রন্থ সেই নতুন সমাজ-ব্যবস্থায় পৌঁছাবারই পথ-নির্দেশ।
মার্কসের ক্যাপিটাল বা ‘রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির তত্ত্ববিচার’)। ধনতন্ত্রের গোড়ার দিকের সকল বুর্জোয়া আর্থনীতিক তত্ত্বকারদের সকল তত্ত্বের কঠোর ও গভীর বিচার বিশ্লেষণের পরেই মার্কস্ শ্রমিকশ্রেণীর তত্ত্বকার রূপে সমগ্র রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির (আধুনিক পরিভাষায় শুধু ‘অর্থনীতি’) বিচার করতে বসেছেন। এই আর্থনীতিক তত্ত্ব বিচারের ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োগ করেছেন ‘দ্বন্দ্ব-প্রগতিমূলক বস্তুবাদ’ (Dialectical Materialism) এবং ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ (Historical Materialism)। এই দ্বন্দ্ব-প্রগতিমূলক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদও মার্কসের নিজস্ব সৃষ্টি। এইভাবে তত্ত্ববিচার করতে গিয়ে মার্কস্ ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার মূল কাঠামোর যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তার তুলনা মানবসমাজের ইতিহাসে এখনও পাওয়া যায়নি। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি রহস্যভেদ করেছেন সমগ্র ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার, উদঘাটিত করেছেন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার মূল, ধনতন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক, আর ধনতান্ত্রিক পদ্ধতির নিয়মাবলীর গভীর রহস্য।
এই অতিকায়, মহাগ্রন্থ ক্যাপিটাল মানবজাতির ইতিহাসের এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অর্থনীতি-বিজ্ঞানে আর সাধারণভাবে মানবসমাজের বিজ্ঞান-সম্মত ধারণা সৃষ্টিতে মার্কস্ যে এক সম্পূর্ণ দুঃসাহসিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন তারই স্পষ্টতম সাক্ষ্য বহন করে এই মহাগ্রন্থ। সর্বপ্রথম মার্কসই তাঁর এই মহাগ্রন্থে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অতি জটিল গঠন-পদ্ধতির বিশ্লেষণ করেছেন, বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারা শ্রমিকশ্রেণীর শোষণের সংগুলি প্রকাশ্য পথ আর চোরাগলিকে অনাবৃত ক’রে সপ্রমাণ করেছেন ধনতন্ত্রের ধ্বংস অনিবার্য, অন্তিমকাল আসন্ন। স্তালিন লিখেছেন:
“শ্রমিকশ্রেণীর দুই মহান শিক্ষক, মার্কস্ আর এঙ্গেলস্ই সর্বপ্রথম কাল্পনিক সমাজবাদীদের সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সমাজবাদ স্বপ্নবিলাসীদের কোন আবিষ্কার নয়; সমাজবাদ হল আধুনিক ধনতান্ত্রিক সমাজের বিকাশধারার সুনিশ্চিত পরিণতি। তাঁরা দেখিয়েছেন, একদিন যেমন দাস-প্রথামূলক সমাজের পতন ঘটেছিল, ঠিক তেমনি পতন হবে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার। তাঁরা দেখিয়েছেন, ধনতন্ত্র নিজেই তার কবরখননকারীদের সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকশ্রেণীই তার সেই কবর খননকারী।”
[স্তালিন রচনাবলী, ঐ লেনিন লিখেছেন, মার্কস্ই সর্বপ্রথম সমাজের বিভিন্ন আর্থনীতিক গঠনের স্তরবিন্যাসকে নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থাসমূহের যোগফল রূপে ব্যাখ্যা করেছেন এবং প্রমাণিত করেছেন যে, সেই আর্থনীতিক গঠনের স্তর-বিন্যাস ইতিহাসের স্বাভাবিক বিকাশ-ধারারই পরিণতি। এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই মার্কস্ সমাজ-বিজ্ঞানকে সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
লেনিন আরও লিখেছেন: মার্কসবাদ এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, প্রথমত ও প্রধানত সমাজের উৎপাদন-ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের বিকাশধারার ইতিহাসই সমগ্র মানবসমাজের ইতিহাস। মার্কস্বাদ আরও শিখিয়েছেন যে, প্রত্যেকটি স্তরের উৎপাদন-ব্যবস্থাই কতকগুলি বিশেষ নিয়মে বিকাশ লাভ ক’রে থাকে, অর্থাৎ তার বিকাশের পথ নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা।
বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের প্রতিষ্ঠাতারা বিভিন্ন শ্রেণীর মুক্তি-সংগ্রামের মূলভিত্তিরও স্বরূপ উদঘাটন করে দেখিয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন প্রকারের শোষণ মূলক সমাজ-ব্যবস্থার উদ্ভব, বিকাশ আর ধ্বংস সম্বন্ধীয় নিয়মাবলী ব্যাখ্যা ও সপ্রমাণ করেছেন। তা করতে গিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন যে,-
“শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের (Dictatorship of the Proletariat) জয় এবং এর প্রতিষ্ঠাই ধনতান্ত্রিক সমাজের শ্রেণী-সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি। তাঁরা ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন, শ্রমিকশ্রেণীই আনবে নতুন এক সমাজ-ব্যবস্থা কমিউনিস্ট সমাজ ব্যবস্থা।” [লেনিন, ঐ]
মার্কসের ক্যাপিটাল মহাগ্রন্থ সেই নতুন সমাজ-ব্যবস্থায় পৌঁছাবারই পথ-নির্দেশ।
মার্কসের ক্যাপিটাল
।। তিন ।।
লেনিন ক্যাপিটাল গ্রন্থখানিকে মার্কস্বাদের “গভীরতম, সর্বব্যাপক ও সম্যক প্রয়োগের অখণ্ড রূপ” বলে অভিহিত করেছেন। মার্কস্ তাঁর গ্রন্থে ধনতান্ত্রিক সমাজের গতিধারার আর্থনীতিক নিয়মাবলী উদঘাটিত করেছেন। এই নিয়মাবলী হল ধনতান্ত্রিক সমাজের উদ্ভব, বিকাশ আর ধ্বংসেরই নিয়মাবলী।
লেনিন ক্যাপিটাল গ্রন্থের বিষয়বস্তুর পরিচয় দিয়ে লিখেছেন:
“মার্কস্ তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে সমগ্র ধনতান্ত্রিক সমাজ-গঠনকে একটি জীবন্ত জিনিসরূপে দাঁড় করিয়েছেন। সেই সমাজগঠনের বিশ্লেষণে তিনি উদঘাটিত করেছেন এর বিভিন্ন প্রাত্যহিক দিক, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্বন্ধের মধ্যে তার সহজাত শ্রেণী-বিরোধের সামাজিক প্রকাশের বাস্তব রূপ; এবং নগ্ন ক’রে দেখিয়েছেন সেই বুর্জোয়া রাজনীতিক বহির্গঠনগুলিকে (Super-structure অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রভৃতিকে) যে বহির্গঠন স্বাধীনতা, সাম্য প্রভৃতি বুর্জোয়া ভাবধারা ও বুর্জোয়া পারিবারিক সম্বন্ধের সাহায্যে মূলধনীশ্রেণীর প্রভুত্ব বাঁচিয়ে রাখে।”
#
*
[লেনিন রচনাবলী, পৃঃ ১২৪, ৬ষ্ঠ খণ্ড]
*
মার্কস তাঁর গভীর ও তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য দীর্ঘকাল ধরে বিশ্লেষণ ক’রে বুর্জোয়া সমাজের গঠনকে চিরে চিরে, খণ্ড খণ্ড ক’রে এর সমস্ত রহস্য উদ্ঘাটিত করেছেন। তিনি তাঁর এই বিশ্লেষণ ক্যাপিটাল গ্রন্থের তিনটি বিশাল খণ্ডে সন্নিবেশ করেছেন। প্রথম খণ্ডে (Capital, Vol. 1) রয়েছে মূলধনের উৎপাদন-ধারার বিশ্লেষণ, দ্বিতীয় খণ্ডে (Vol. II) রয়েছে মূলধনের প্রচলন-ধারার (Circulation) বিশ্লেষণ এবং তৃতীয় খণ্ডে (Vol. III) রয়েছে সমগ্রভাবে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ধারার বিশ্লেষণ।
মার্কস্ তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে সমগ্র অর্থনীতিকে ঢেলে নতুন ক’রে সাজিয়ে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন, আর তা করতে গিয়ে নানা রকমের নতুন ও সম্পূর্ণ মৌলিক আর্থনীতিক তত্ত্বের সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকটি নতুন তত্ত্বই মার্কসের এক-একটি মহৎ কীর্তি। সবার প্রথমে তাঁর যে মহৎ কীর্তিটির উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল মূলোর শ্রমতত্ত্বের পুনর্গঠন। ইংলণ্ডের বনিয়াদী অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো পূর্বেই শ্রমতত্ত্ব গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই তত্ত্বের কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। রিকার্ডো কেবল দেখিয়েছিলেন যে, শ্রমিকের দৈহিক শ্রমই একমাত্র সৃজনী-শক্তি এবং কেবলমাত্র শ্রমিকের দৈহিক শ্রমই পণ্যের মূল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু তিনি তাঁর শ্রমতত্ত্বের দ্বারা মূলধনীদের মুনাফা প্রভৃতির উৎস বিশ্লেষণ করতে পারেন নি। সুতরাং শ্রমতত্ত্বটি ছিল অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। মার্কস্ট্র সর্বপ্রথম ‘মূল্যের শ্রমতত্ত্ব’কে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এর বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং বহু তথ্যের দ্বারা প্রমাণিত সত্যে পরিণত করেছেন।
মার্কস তাঁর মূল্যের শ্রমতত্ত্বের বিশ্লেষণ ক’রে দেখিয়েছেন যে, কেবল এক বিশেষ ঐতিহাসিক অবস্থাতেই শ্রম (labour) মূল্যের (value) রূপ গ্রহণ করে। তিনি পণ্যের নাম দিয়েছেন ‘বুর্জোয়া সমাজের আর্থনীতিক একক’ (Economic Unit of the Bourgeois Society)। এই পণ্যের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব আছে তা হল এর ব্যবহারিক মূল্য (use-value) ও মূল্য (value) এই দুইয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান করতে গিয়ে মার্কস আবিষ্কার করেছেন যে, পণ্যের মধ্যে যে শ্রম নিহিত আছে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দুইটি। মার্কসের এই আবিষ্কারটির তাৎপর্য অসাধারণ। মার্কস নিজেই বলেছেন, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আসল ব্যাপারটি বোঝবার এ হল একমাত্র উপায়।
মার্কসের তৈরি-করা ‘মূল্যের শ্রমতত্ত্ব’ দিয়েই শুধু পণ্যের উৎসট বোঝা যায়। তাঁর শ্রমতত্ত্ব অনুসারে, পণ্যের মধ্যে নিহিত সামাজিক শ্রমের (socially necessary labour) পরিমাণের দ্বারাই পণ্যের মূল্য স্থির হয়; এবং কেবল এই শ্রমতত্ত্ব দিয়েই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার সমস্ত রহস্যের উদঘাটন সম্ভব। এই জন্যই মার্কস তাঁর শ্রমতত্ত্বটিকে সমস্ত ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার শোষণ ক্রিয়াটি বোঝবার ‘চাবিকাঠি’ বলে অভিহিত করেছেন।
ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থায় পণ্যের মূল্য কিভাবে সৃষ্টি হয় তা মার্কস্ তাঁর নতুন করে গড়া ‘মূল্যের শ্রমতত্ত্ব’ দিয়ে বিশ্লেষণ ক’রে দেখিয়েছেন। তারপর তিনি শ্রমতত্ত্ব দিয়েই পণ্যের এই মূল্য সৃষ্টির ভিত্তিতে সমগ্র ধনতান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থার রহস্য ভেদ করলেন। মার্কস এই শোষণ-ব্যবস্থার যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তা নিম্নরূপ:
নির্দিষ্ট মজুরিতে মূলধনীর কাছে শ্রমিক তার শ্রম-শক্তি (labour-power) বিক্রয় করে। শ্রমিকের দেহের এই শ্রম শক্তিই কলকারখানায় যন্ত্রপাতির সাহায্যে শ্রমে (labour) পরিণত হয়, অর্থাৎ পণ্যের রূপ ধারণ করে। একটি পণ্য তৈরি করতে যতখানি সময় আবশ্যক। হয় সেই সময় দিয়েই পণ্যের মধ্যেকার শ্রমের পরিমাণ স্থির করা হয়। সমাজের পণ্য উৎপাদনের চলতি ব্যবস্থা অনুসারে কোন পণ্যের উৎপাদনের জন্য যত সময়ের শ্রম প্রয়োজন হয় তত সময়ের শ্রমই হল ঐ পণ্যের মূল্যের মাপকাঠিস্বরূপ। কোন পণ্যের মূল্য কখনও নিজে নিজে প্রকাশিত হতে পারে না। যখন ভিন্ন জাতীয় এক বা একাধিক পণ্যের সঙ্গে ঐ পণ্যের বিনিময় ঘটে, কেবল তখনই প্রথম পণ্যটির মূল্য ঐ ভিন্নজাতীয় এক বা একাধিক পণ্যের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এরূপ বিনিময় হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত প্রথম পণ্যটি অন্তর্নিহিত মূল্যও প্রকাশিত হবে না। ঐ বিভিন্নজাতীয় এক বা একাধিক পণ্যকে বলা হয় প্রথম পণ্যটির মূল্যের (বা আপেক্ষিক মূল্যের) রূপ। মূল্যের বিভিন্ন রূপ বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মধ্য দিয়ে ক্রমবিকাশ লাভ করেছে এবং ধনতান্ত্রিক সমাজে এসে মূল্যের মুদ্রা-রূপে (moncy-forin of value) স্থায়িত্ব লাভ করেছে। মুদ্রাই এখন সকল পণ্যের মূল্যের সর্বসম্মত রূপ। মূলধনীরা তাদের পণ্য বাজারে নিয়ে গিয়ে তার অন্তর্নিহিত শ্রম বা মূল্যকে টাকার সঙ্গে বিনিময় অর্থাৎ বিক্রয় ক’রে টাকায় পরিণত করে। তা থেকেই তারা লাভ করে টাকার আকারে উদ্বৃত্ত-মূল্য। সেই উদ্বৃত্ত-মূল্যকে খাজনা, সুদ ও মুনাফা হিসেবে ভাগ ক’রে জমিদার, ব্যাঙ্ক-মালিক ও শিল্পপতি নিজ নিজ ভাগ গ্রহণ করে। সুতরাং শ্রমিক তার শ্রমের দ্বারা যে মূল্য সৃষ্টি করে, তারই একটা ক্ষুদ্র অংশ মজুরি হিসাবে শ্রমিককে দিয়ে বাকি সমস্ত অংশ বিভিন্ন নামের মূলধনীরা ভাগ ক’রে নেয়। মার্কস্ তাঁর অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণের দ্বারা প্রমাণ ক’রে দেখালেন যে, এই উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাৎ করবার জন্যই মূলধনীরা কল-কারখানায় পণ্য উৎপাদন করে এবং এরই নাম ‘মূলধনীদের দ্বারা। শ্রমিক-শোষণ’। আর এই শোষণই হল ধনতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি। সংক্ষেপে এই হল মার্কসের ‘মূল্যের শ্রমতত্ত্বের’ মূল কথা।
উদ্বৃত্ত-মূল্যই (surplus value) হল ধনতান্ত্রিক শোষণের মূলভিত্তি। মার্কস এর বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন ক্যাপিটাল গ্রন্থে। কেবল এই উদ্বৃত্ত-মূল্য বোঝাবার জন্যই তিনি ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব’ (Theory of Surplus Value) নামে একখানা বিপুল আয়তন গ্রন্থ রচনা করেছেন।
উদ্বৃত্ত মূল্যের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে মার্কস দেখিয়েছেন, শ্রমিকের শ্রমশক্তির মূল্য (শ্রমিকের জীবন ধারণের পক্ষে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য) অর্থাৎ তার মজুরির সমান মূল্য ছাড়া আরও যতখানি মূল্য (পণ্যের আকারে) শ্রমিক তৈরি করে, তাকেই বলা হয় উদ্বৃত্ত-মূল্য (surplus value)। দৃষ্টান্তস্বরূপ, একটি শ্রমিক কারখানায় একমাসে যে পণ্য (অর্থাৎ মূল্য) তৈরি করে তার দাম ধরা যাক, ৫০০ টাকা। শ্রমিকটি মাসিক মজুরি বাবদ ১০০ টাকা পেলে উদ্বৃত্ত-মূল্য হবে ৪০০ টাকার সমান। মূলধনীরা এই ৪০০ টাকার উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাৎ করে। এই উদ্বৃত্ত মূল্যই সমগ্র মূলধনী-শ্রেণীর আয়ের একমাত্র উৎস। জমিদার, ব্যাঙ্ক-মালিক ও শিল্পপতি খাজনা, সুর ও মুনাফা হিসাবে উদ্বুত্ত-মূল্য নিজেদের মধ্যে ভাগ ক’রে নেয়।
মার্কস্ ক্যাপিটাল গ্রন্থে মূল্যের নিয়মটির স্বরূপ উদঘাটন করে। দেখিয়েছেন, মূল্যের নিয়মটি হল আসলে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির বিকাশধারারই স্বতঃস্ফূর্ত নিয়ম। তিনি নিয়মটির বহুমুখী ক্রিয়ার বিশ্লেষণ করেও দেখিয়েছেন।
মূলধনীরা পণ্যের উপর অসাধারণ গুরুত্ব আরোপ ক’রে পণ্যকে এক উৎকট রহস্য দিয়ে ঘিরে রাখে। মূলধনী-ব্যবস্থার মধ্যে উৎপাদন ও শোষণের বীভৎস চেহারাটাকে ঢেকে রাখাই তাদের উদ্দেশ্য। বুর্জোয়াদের দালাল অর্থনীতিবিদগণ একাজের জন্যই নিযুক্ত হয়ে থাকে। শ্রমিক-শোষণকে আড়াল করে রাখার জন্যই তারা প্রচার করে যে পণ্যের সম্পর্ক কেবল জিনিসের সঙ্গে জিনিসের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে পণ্যের কোন সম্পর্ক নেই। মার্কস্থ তাঁর শ্রমতত্ত্ব দিয়ে সর্বপ্রথম পণ্যের সেই রহস্যময় আবরণটাকে ছিন্নভিন্ন ক’রে এর স্বরূপ খুলে ধরেছেন। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে, পণ্যের উৎপাদনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, শোষক-শোষিতের সম্পর্ক- মূলধনীশ্রেণীর সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর সম্পর্ক।
আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি, মূল্যের শ্রমতত্ত্বের ভিত্তিতেই মার্কস্ উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন। উদ্বৃত্ত-মূল্য খাজনা, সুদ ও মুনাফায় যে ভাগ হয় সেই প্রত্যক্ষ ভাগ-বাটোয়ারার ব্যাপার ছাড়াও মার্কস্ উদ্যত্ত-মূল্য সম্বন্ধে গভীর ও ব্যাপক অনুসন্ধান করেছেন। তারপর মূলধনের গতিবিধি ও ক্রিয়া-কলাপ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে উদ্বৃত্ত-মূল্য খাজনা, সুদ ও মুনাফায় পরিণত হয়।
এরপর এল মুদ্রা সম্বন্ধে আলোচনা। মুদ্রা কি ক’রে মূলধনে পরিণত হয় তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মার্কস্। তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পপতিরা টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে একটি বিশেষ ধরনের পণ্য ক্রয় করে। এই পণ্যটির ব্যবহারিক মূল্যের মধ্যে নিহিত থাকে নূতন মূল্য সৃষ্টির উপাদান। এই বিশেষ ধরনের পণ্যটিই হল শ্রমিকের শ্রমশক্তি (labour-power)। শিল্পপতিরা এই পণ্যটি অর্থাৎ শ্রমিকের শ্রমশক্তি টাকা দিয়ে কিনে নেয়, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই আরম্ভ হয়ে যায় মুদ্রার মূলধনে পরিণতির কাজ।
এই পণ্যটি অর্থাৎ শ্রমশক্তি থাকে শ্রমিকের দেহের মধ্যে। শ্রমিকই টাকা ব্যয় করে খেয়ে-পরে তার দেহের শ্রমশক্তিকে সৃষ্টি করে এবং জীবিকা নির্বাহের জন্যই, অর্থাৎ তার দেহের মধ্যে নতুন শ্রমশক্তি উৎপাদন করবার জন্যই শ্রমিক তার শ্রমশক্তি শিল্পপতির নিকট বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। শিল্পপতি টাকা দিয়ে (অর্থাৎ মজুরি দিয়ে) শ্রমিকের শ্রমশক্তি ক্রয় করে এবং তা কারখানায় পণ্য উৎপাদনের জন্য নিয়োগ করে। তখনই সেই শ্রমশক্তি দ্বারা পণ্যের আকারে শ্রমের (labour) সৃষ্টি হয়। এই শ্রমই পণ্যের মূল্য সৃষ্টি করে, আর শিল্পপতি সেই পণ্য বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে। পণ্য বিক্রয় করে শিল্পপতি টাকার অঙ্কে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য পায় তাই আবার মূলধনের আকারে কারখানায় পণ্য উৎপাদনের কাজে নিয়োগ করে। এইভাবে শিল্পপতি যে টাকা দিয়ে শ্রমিকের শ্রমশক্তি ক্রয় করে সেই টাকাই আবার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে উদবৃত্ত-মূল্যের আকারে শিল্পপতি অর্থাৎ মূলধনীদের হাতে ফিরে আসে। সেই উদ্বৃত্ত মূল্যের টাকাই আবার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জমি প্রভৃতির আকারে পণ্যোৎপাদনের কাজে নিযুক্ত হয়ে মূলধনে পরিণত হয়। এই হল মুদ্রার মূলধনে পরিণতির ধারা।
পণ্য উৎপাদন করতে যে জমি, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি প্রভৃতির প্রযোজন হয়, তা কোন নতুন মূল্য সৃষ্টি করে না। একমাত্র শ্রমশক্তিই মূল্য সৃষ্টি করে। কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি যে পরিমাণ টাকা (অর্থাৎ যে দাম) দিয়ে ক্রয় করা হয়ে থাকে, সেই পরিমাণ টাকাই (অর্থাৎ সেই দামই) পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। সুতরাং কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি দ্বারা কোন নতুন মূল্য সৃষ্টি হয় না। সোজা কথায়, সেই সব জিনিস কিনে এবং ব্যবহার করে শিল্পপতি একটি পয়সাও আয় করতে পারে না। কিন্তু শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্নরূপ। শিল্পপতি যখন শ্রমশক্তি ক্রয় করে তখন তা থাকে শ্রমিকের দেহের মধ্যে, আর কারখানায় সেই শ্রমশক্তি পণ্যের মধ্যে প্রবেশ ক’রে নতুন রূপে অর্থাৎ পণ্যের আকারে শ্রমে পরিণত হয়। শ্রমশক্তির এই বাস্তব রূপই পণ্য। ক্রয় করবার সময় শ্রমশক্তি যে অবস্থায় থাকে, কারখানায় কাজের মধ্য দিয়ে তাকে তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। শ্রমশক্তির এই পরিবর্তিত অবস্থাই মূল্য ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎস। আর উদ্বৃত্ত-মূল্য থেকেই আসে নূতন মূলধন। সুতরাং স্পষ্টই দেখা যায়, শ্রমশক্তির ক্রয়ের জন্য ব্যয়িত টাকাই বেড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মূলধনে পরিণত হয়। মার্কস্ এর নাম দিয়েছেন ‘মুদ্রার মূলধনে পরিণতি’ (transformation of money into capital) |
মার্কসের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদনের সমস্ত রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। এতদিন বুর্জোয়াশ্রেণী আর তাদের দালাল অর্থনীতিবিদগোষ্ঠী শ্রমিক-শোষণের এই স্বরূপ ঢেকে রেখে শ্রমিকশ্রেণীকে ধাপ্পা দিতে এবং প্রতারণা করতে সক্ষম হয়েছিল। মার্কসের আবিষ্কার তাদের ধাপ্পাবাজির মুখোস খুলে দিয়েছে, মূলধনীদের শ্রমিক-শোষণের কৌশলটিকে নগ্ন করে দিয়েছে।
শেষ বিচারে দেখা যায়, শ্রমশক্তিকে পণ্যে রূপান্তরিত করার মধ্যেই সমস্ত ধনতান্ত্রিক শোষণ-ব্যবস্থার মূল নিহিত। শ্রমশক্তিকে পণ্যে রূপান্তরিত করা কেবল মূলধনের মালিকদের ধনতান্ত্রিক ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকদের পক্ষেই সম্ভব।
“কেবল মূলধনীরাই শ্রমিকদের শ্রমশক্তি ক্রয় করে কেন?”- এই প্রশ্নটি তুলেছেন স্তালিন, আর তিনিই তার উত্তর দিয়ে বলেছেন:
“মূলধনীরাই শ্রমিকের শ্রমশক্তি ক্রয় করে তার কারণ, উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপাদানগুলি রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানায়, আর এই হল ধনতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি; তার কারণ কল-কারখানা, জমি এবং অন্যান্য ধন-সম্পদ, বন, রেলপথ,
মার্কসের ক্যাপিটাল যন্ত্রপাতি প্রভৃতি উৎপাদনের বিভিন্ন উপাদান মূলধনীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে; তার কারণ, এসব ধন-সম্পদ ও উৎপাদনের সকল উপাদান থেকে শ্রমিকশ্রেণীকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে।”
[Stalin; ibid, P. 322-23] ঠিক এই কারণেই মূলধনীরা যে উদ্বৃত্ত পণ্যের (অর্থাৎ শ্রমের) মূল্য বাবদ শ্রমিককে এক পয়সাও দেয় না সেই উদ্বৃত্ত পণ্যসমষ্টি অর্থাৎ উদ্বৃত্ত-মূল্য তারা গ্রাস করতে সক্ষম হয়।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের দ্বারা মার্কস্ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদনের জন্য মূল্যের মূল সূত্রটি কোন ক্রমেই পাল্টে যায় না, বরং তার বিপরীত কথাই প্রমাণিত হয়। উৎপাদনের উপকরণসমূহের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত থাকায় পণ্যের উৎপাদন-ব্যবস্থার মধ্যেই উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির নিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই দেখা দেয়। এই নিশ্চয়তা ক্রমশঃ বিকাশ লাভ করে। এই বিশ্লেষণের পর মার্কস্ দেখিয়েছেন, যে “উদ্বৃত্ত মূল্য হল বুর্জোয়া সমাজের নিষ্কর্মা আর অলসদের আয়।” মার্কস্ মূলধনকে রক্তচোষা বাদুড়ের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন যে এই বাদুড়-
“বাঁচে কেবল জীবন্ত শ্রমকে (অর্থাৎ শ্রমিককে লেখক) শুষে খেয়ে, আর যত বেশী সে বাঁচে তত বেশী সে জীবন্ত শ্রমকে শুষে খেয়ে থাকে।”
[Capital, Vol. I, P. 238] ধনতান্ত্রিক শোষণের সমস্ত রূপটি সবচেয়ে সংহত হয়ে উঠেছে মজুরির মধ্যে। ধনতান্ত্রিক উপাদান-ব্যবস্থায় মজুরির তাৎপর্যের পূর্ণ বিশ্লেষণ ক’রে মার্কস্ মজুরির শোষণমূলক চরিত্রটি ও এর সমস্ত রহস্য উদঘাটিত করেছেন। মূলধনীরা শ্রমিকের মজুরির ব্যাপারটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যেন শ্রমিকের প্রতিদিনের কাজের পূর্ণ দামই তারা দিয়ে থাকে- অর্থাৎ এক পুরো দিনে শ্রমিক যত পণ্য উৎপাদন করে, তার পূর্ণমূল্যই তারা শ্রমিককে দিয়ে দেয়। তারা দেখায় যেন কারখানায় কাজের মধ্য দিয়ে তারা শ্রমিককে একটুও শোষণ করে না।
মার্কস্ ক্যাপিটাল গ্রন্থে মূলধনীদের সেই অপচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিয়েছেন। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ধনতান্ত্রিক সমাজের মজুরি-প্রথার মধ্যেই লুকানো রয়েছে শ্রমিক-শোষণের সমগ্র কৌশলটি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ধরা যাক, একটি শ্রমিক কোন কারখানায় ৮ ঘণ্টা কাজ করে। এই ৮ ঘণ্টার মধ্যে ২ ঘণ্টার শ্রম দ্বারা সে একদিনের পূর্ণ মজুরির সমান মূল্য উৎপাদন করে। তাহলে শ্রমিকটি তার ৮ ঘণ্টার শ্রমের মধ্যে ২ ঘন্টার শ্রমের দাম মজুরি রূপে পায়, কিন্তু ৬ ঘন্টার শ্রমের দাম বাবদ সে এক পয়সাও পায় না। এই ৬ ঘণ্টার শ্রমের মূল্যই মূলধনীরা আত্মসাৎ করে। শ্রমিকটির ২ ঘন্টার শ্রম হল, মার্কসের ভাষায় ক্রীত-শ্রম (paid labour) এবং বাকি ৬ ঘন্টার শ্রম হল অক্রীত-শ্রম (unpaid labour)। কারণ শ্রমিকটি ২ ঘন্টার শ্রমের মূল্য মজুরিরূপে পেয়েছে আর বাকি ৬ ঘন্টা শ্রমের মূল্য বাবদ তাকে কিছুই দেওয়া হয় নি। অক্রীত-শ্রমই উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করে এবং এই উদ্বৃত্ত-মূল্য থেকেই মূলধনীরা পায় খাজনা, সুদ আর মুনাফা। তাই মার্কস্ বলেছেন যে, ধনতান্ত্রিক শোষণের সমগ্র রূপটিই মূলধনীরা মজুরির কৌশল দিয়ে আড়াল করে রাখে। কারখানার কাজের দিন যে ক্রীত-শ্রম আর অক্রীত-শ্রম এই দুই ভাগে বিভক্ত তার সমস্ত চিহ্নই তারা মজুরির কৌশল দিয়ে মুছে দেয়। তাই মার্কস্ বলেছেন, মজুরির এই কৌশলটিই- “ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির সমস্ত রহস্যের, (শ্রমিকের-লেখক) স্বাধীনতা সম্বন্ধে সমস্ত ধাপ্পাবাজির, দালাল অর্থনীতিবিদদের আত্মপক্ষ সমর্থনের মূলভিত্তি।”
[Capital, Vol. 1., P-542] শেষ বিচারে দেখা যায়, উদ্বৃত্ত-মূল্যই ধনতান্ত্রিক শোষণের মূল উৎস। তাই লেনিন উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বটিকেই মার্কসের অর্থনীতির মূলভিত্তি বলে অভিহিত করেছেন। উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার, বুর্জোয়াশ্রেণীদ্বারা শ্রমিক-শোষণের মূল রহস্য উদঘাটিত করেছে। উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই তত্ত্বই আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে কিভাবে মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ এবং শ্রমশক্তির ক্রয়-বিক্রয়ের মারফত অগণিত মিল-ফ্যাক্টরি আর জমির মুষ্টিমেয় মালিক কোটি কোটি শ্রমিককে অমানুষিক শোষণ আর মজুরি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। এই তত্ত্বই দেখিয়েছে কিভাবে শ্রমিকশ্রেণী সামান্য মজুরিতে তাদের শ্রমশক্তি বিক্রয় ক’রে বুর্জোয়াশ্রেণীর চিরদাসত্ব বরণ করে নিতে বাধ্য হয়; আর কি করে বুর্জোয়াশ্রেণী তাদের এই শয়তানী শোষণ ক্রিয়াকে ধাপ্পাবাজির আড়াল দিয়ে ঢেকে রাখে তাও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এই তত্ত্বটি। উদ্বৃত্ত-মূল্য গ্রাস করেই ধনতন্ত্র ক্রমশ বেড়ে উঠেছে, সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডকে গ্রাস করেছে।
ধনতন্ত্রের বিকাশধারার বিশ্লেষণ করে মার্কস্ দেখিয়েছেন, ধনতন্ত্রের বিকাশের ফলেই ক্ষুদ্র শিল্প মানব-সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে। ধনতান্ত্রিক বৃহৎ শিল্প তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে। ধনতন্ত্রের সর্বাত্মক বিকাশের ফলেই বুর্জোয়াশ্রেণী আর শ্রমিকশ্রেণীর দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ক্রমশ চরম রূপ ধারণ করেছে এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমশ অধিক পরিমাণে উদ্বৃত্ত মূল্য গ্রাস করে ধনতান্ত্রিক সমাজ কল্পনাতীতভাবে স্ফীত হয়ে এখন ফেটে পড়ছে, আর তার ফলেই মানব-সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর এখন আর কেবল সম্ভব নয়, অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। সেই সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরেরই ভিত্তি রচনা করেছে মার্কসের যুগান্তকারী উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বটি। শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক সংগ্রাম চালনা, বুর্জোয়াশ্রেণীর উদ্বৃত্ত-মূলা গ্রাস ও মূলধনের শাসনের উচ্ছেদ সাধন এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠা মার্কসস্বাদ-লেনিনবাদ মার্কসের এই উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বটির দৃঢ় ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
মার্কস্ তাঁর অতুলনীয় বিশ্লেষণের দ্বারা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, উদ্বৃত্তমূল্য আরও বিপুল পরিমাণে গ্রাস করবার জন্যই বুর্জোয়ারা যন্ত্রের প্রবর্তন ক’রে সমগ্র সামাজিক উৎপাদন-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। পণ্যোৎপাদনে যন্ত্রের প্রবর্তন করে তারা সমগ্র সমাজব্যবস্থায়ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। যন্ত্রের দ্বারা ধনতন্ত্র এক বিরাট বিপ্লব এনে দিয়েছে সমাজের দিকে দিকে। যন্ত্রের দ্বারাই মূলধন, মার্কসের ভাষায়, ‘শ্রমিকশ্রেণীকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে।” এরই সঙ্গে সঙ্গে মার্কস্ দেখিয়েছেন যে, মূলধনীদের দ্বারা যন্ত্রের ব্যবহারের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে, আর তার আভ্যন্তরিক দ্বন্দ্বও আছে। এই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই আরও বেশী করে উদ্বৃত্ত-মূল্য গ্রাসের জন্য মূলধনীরা যন্ত্রকে আরও বেশী ক’রে ব্যবহার করে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়ে তোলে তার দ্বন্দ্বকে। মার্কস আরও দেখিয়েছেন, মূলধনীদের দ্বারা ব্যবহৃত এই যন্ত্রই শ্রমিকশ্রেণীকে তার জোয়ালে, শ্রমবিভাগের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে, আর শ্রমিকশ্রেণী এই শ্রমবিভাগের শৃঙ্খলে বাঁধা প’ড়ে বরণ করে নিতে বাধ্য হয় যন্ত্রের দাসত্ব শতগুণ বেড়ে যায় মূলধনীদের দ্বারা শ্রমিকদের শোষণ-উৎপীড়ন।
মার্কস্ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, মূলধনীদের দ্বারা যন্ত্রের এই প্রকার শ্রমিক-শোষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ফলে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, তার অবসান হবে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংসে আর সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায়। সেই সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার কোন সীমা থাকবে না; সমাজতান্ত্রিক সমাজের উৎপাদনশক্তির বিকাশ হবে অসীম সম্ভাবনাময়।
মার্কসের আর একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ অবদান হল ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মূলধনের সঞ্চয় বা স্তূপীকরণের তত্ত্ব। তিনি দেখিয়েছেন, উদ্বৃত্ত মূল্যেরই একটি অংশ পরিণত হয় মূলধনে। এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই মার্কস আবিষ্কার করেছেন ধনতান্ত্রিক সমাজে মূলধনের সঞ্চয় বা স্তূপীকরণের সাধারণ সূত্রটি। মার্কসের আবিষ্কৃত এই সূত্রের মূল কথা- একদিকে ধনসম্পদের কল্পনাতীত স্তূপসৃষ্টি, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে অপর দিকে সীমাহীন দারিদ্রের আবির্ভাব।
মার্কসের ক্যাপিটাল
।। চার ।।
ক্যাপিটাল গ্রন্থের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক তথ্য। এসব তথ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে শ্রমিক আর শ্রমজীবী জনসাধারণের রক্ত আর অস্থি দিয়েই সমগ্র ধনতান্ত্রিক সমাজের গঠন, তাদের রক্ত শুষে আর অস্থি চিবিয়েই এই সমাজের বৃদ্ধি। মার্কসের ভাষায়:
“মূলধনের মাথা দিয়ে, পা দিয়ে আর প্রত্যেকটি রস্ত্র দিয়েই ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, বেরোচ্ছে অসহ্য পুতিগন্ধ।”
[Capital, Vol. 1, P. 467] মূলধনের এই চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কস্ গ্রেট ব্রিটেনের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন। তাঁর সময় ব্রিটেন ছিল বিশ্বের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার শীর্ষমণি। এই জন্যই মার্কস্ তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থের পাতায় পাতায় ব্রিটেনের ধনতান্ত্রিক সমাজ, ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের দ্বারা শ্রমিকশ্রেণীর নির্মম শোষণ এবং ঔপনিবেশিক জনসাধারণের লুন্ঠন প্রভৃতিকে তীব্রতম আঘাতে জর্জরিত করেছেন। মার্কসের সেই তীব্র আঘাতের প্রভাব আজও কিছু মাত্র ক্ষুণ্ণ হয় নি। তিনি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখিয়েছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনতন্ত্রও ব্রিটেনের সেই পুতিগন্ধময়, রক্তাক্ত ধনতন্ত্রেরই সৃষ্টি।
ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ধারা বিশ্লেষণ করে মার্কস্ দেখিয়েছেন যে, ধনতন্ত্রের প্রধান অন্তর্থদুটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। ধনতন্ত্রের এই অন্তদ্বন্দ্বটি হল পণ্যোৎপাদনের সামাজিক রূপ গ্রহণ এবং ব্যক্তিগতভাবে মূলধনীদের দ্বারা উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাৎকরণ- এই দুইয়ের মধ্যেকার অন্তর্দ্বন্দ্ব। মূলধনীদের পণ্যোৎপাদন এখন আর কেবল তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার না থেকে ক্রমশ সমগ্র সমাজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেই পণ্যোৎপাদন থেকে পাওয়া সমস্ত মুনাফাই আত্মসাৎ করছে ব্যক্তিগতভাবে মূলধনীরা। এটাই হল ধনতান্ত্রিক পণ্যোৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান অন্তর্দ্বন্দ্ব। মার্কস্ দেখিয়েছেন যে, এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলেই দেখা………………………

@সুপ্রকাশ রায়
@freemang2001gmail-com



