Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

বাংলায় বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে

ভূমিকা

এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম নানান অর্থেই বৈচিত্রময়। নানান বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। ব্রিটিশ শাসনে সংগ্রামের বিভিন্ন স্তরের আলোচনায় অধুনা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ তো বটেই এমনকী আফগানিস্তানের কাবুল কিংবা বার্মার রেঙ্গুন, মান্দালয়কে বাদ দিয়ে তা পূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু অগ্নিযুগের বাংলার ভূমিকা সন্দেহাতীতভাবেই এই পর্বে বিশেষ গুরুত্ব দাবি করতে পারে। তখন যুক্ত বাংলা। ব্রিটিশরা সব ধরনের চেষ্টা করেও ‘বঙ্গভঙ্গ’ কার্যকরী করতে পারেনি। দ্বীপান্তরের সেলুলার জেলের বন্দি দশায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার মানুষ। বিপুল সংখ্যায় বিপ্লববাদী এবং কমিউনিস্টরা। মুচলেকা দিয়ে অনুগ্রহ লাভের ভাবনা ছিল এদের স্বপ্নের অতীত।

স্বাধীনতার লড়াইয়ের তিনটি ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। জাতীয় আন্দোলন, বিপ্লববাদী আন্দোলন এবং সংগঠিত গণআন্দোলন। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ৩৫ বছর পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। ইতিমধ্যে বাংলায় অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর সহ নানান বিপ্লববাদী অথবা ভিন্ন মতে বিপ্লবী-সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বিস্তার লাভ করেছে। ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব ক্রমশই বাড়ছে। নিখাদ দেশপ্রেমের আগুন শিক্ষিত যুব মনে। বরং প্রতিটি ধারারই সংগ্রামী চেতনা ক্রমশ পৃষ্ট হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের চেতনা এবং সমাজ বদলের মননে। বিভিন্ন ধারার সংগ্রামী এবং দেশপ্রেমিক কর্তব্যবোধের স্বাভাবিক পরিণতিই যেন কমিউনিস্ট চেতনায়। জাতীয় কংগ্রেসের বিনয় চৌধুরী, বঙ্কিম মুখার্জি, প্রভাস রায়ের মতো সে সময়ের নেতারা এ রাজ্যের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠিত নেতা। কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির অভিজ্ঞতালব্ধ সংগ্রামী চেতনা সঙ্গে নিয়েই তৎকালীন ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ কিংবা হরকিষাণ সিং সুরজিৎরা স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়কেরা মাস্টারল সূর্য সেনের ছাত্র গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তী, সুবোধ রায়দের স্বাভাবিক গন্তব্য কমিউনিস্ট পার্টি। অনুশীলন সমিতির গোপেন চক্রবর্তী, ধরণী গোস্বামী, গোপাল বসাকরা মুজফফর আহমদের হাত ধরে বামপন্থী গণআন্দোলনে। বিপ্লবী ভগৎ সিংদের সহকর্মী শিব বর্মা কমিউনিস্ট। নেতাজীর সহকর্মী আজাদ হিন্দ ফৌজের লক্ষী সায়গলরা সংগ্রামী দেশপ্রেমিক চেতনায় জীবন্ত হয়েই কমিউনিস্ট চেতনার প্রতীক। সংগ্রামী সমস্ত স্রোতগুলো ফল্গুধারার মতোই সংগঠিত গণআন্দোলনে বহমান।

শ্রী গৌতম রায় সুলেখক। প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং গবেষক। ইতিহাসের, বিশেষত যুক্ত অথবা দুই বাংলার নানান ঘটনাবলী এবং বিকাশের প্রতিটি প্রশ্নে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই বিশ্লেষণ করে থাকেন। সংগ্রামী এবং বিপ্লববাদী চেতনা স্বাধীনতার লড়াইতে কখন এবং কীভাবে কমিউনিস্ট চেতনায় উত্তরণ ঘটাল, তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্রের প্রামাণ্য নথি সঙ্গে নিয়েই অদ্ভুত মুন্সীয়ানায় তার ছবি তুলে ধরেছেন ‘বাংলায় বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে’ বইতে। অনুসন্ধিৎসু মানুষের কাছে বইটি অত্যন্ত জরুরি।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় যখন বাংলায় বিপ্লববাদী নানান প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তাতে স্কুল কলেজের ছাত্র শিক্ষক সহ মধ্যবিত্ত যুবকদের অংশগ্রহণই ছিল সর্বাধিক। বিদ্রোহীরা রোমান্টিক কিন্তু নিখাদ দেশপ্রেমী। বিশ এবং তিরিশের দশকে ঘটনাবলীর ঘনঘটা। বিপ্লববাদীদের একটা বড়ো অংশ জেলেতে অথবা বিচ্ছিন্ন। অনেকেই ভাবতে থাকেন- এত অসংখ্য বিপ্লবী প্রাণের বিনিময়ে কী পাওয়া গেল? পথের অস্পষ্টতা যেন ছায়া ফেলেছে বিপ্লববাদী কার্যক্রমে। আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়াস তখন ক্রমশই বাড়ছে। পথের সন্ধানে যেন আত্মানুসন্ধান। ইতিমধ্যে সোভিয়েতের নভেম্বর বিপ্লব। সমাজ পরিবর্তনের স্পৃহা। ব্রিটিশ মালিকাধীন স্টেটসম্যান পত্রিকা কমিউনিস্ট মনোভাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে ঔৎসুক্য বাড়িয়ে তুলল বিপ্লবী মনে। ১৯২০ সালে গড়ে উঠল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করল কমিউনিস্টরা। ইস্তেহার বিলি করতে থাকল অধিবেশনগুলিতে। ১৯২৮ সালে পার্ক সার্কাসে কংগ্রেস অধিবেশনে প্রায় ঘেরাও করে ফেলল ৪৫ হাজার শ্রমিক। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ঘোষণার জন্য চাপ সৃষ্টি করল। এ যেন এক অভূতপূর্ব ঘটনা। নাড়া দিয়ে গেল সংগ্রামী চেতনায়। ছাত্র-যুব মনে ঝড় বইতে থাকল। ব্রিটিশ শাসকেরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা এবং গ্রেপ্তারি জারি করতে থাকল। নির্ভীক কমিউনিস্টরা মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার সুযোগে স্বাধীনতার আসল লক্ষ্য কী তা প্রচার করার সুযোগকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করল কমিউনিস্টরা। অনুরণন তৈরি হল বিদ্রোহী মনে। যেন স্বপ্ন দেখতে থাকল, যেন পথের সন্ধান পেতে থাকল। তারই ধাক্কায় আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, মার্কসবাদী চর্চার প্রসার ঘটতে থাকল জেল থেকে জেলে। কমিউনিস্ট কনসলিডেশন তৈরি হল আন্দামানের সেলুলার জেলে। দেউলি, হিজলি, বক্সার জেলে। জেল জীবনে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পেলেন বিপ্লববাদী সংগ্রামী চেতনার দেশপ্রেমিক কর্মীরা। মতাদর্শের লড়াই। মার্কসীয় চর্চার কেন্দ্র। কমিউনিস্ট হিসাবে গড়ে তোলবার কারখানা যেন।

মনের মধ্যে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে অজস্র সংগ্রামী চেতনার উত্তরণের পথ খুঁজছে এই সময়কাল জুড়ে। ওদিকে মীরাট বড়যন্ত্র মামলায় মুক্তিলাভের পর কমিউনিস্ট নেতারা বিপ্লববাদীদের মধ্যে সঞ্চিত বিরটি শক্তিকে সংগঠিত আন্দোলনের বিস্তারে ব্যবহার করতে চাইছেন। তিরিশের দশকেই যেমন চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহ, তেমনই গাড়োয়ানদের ধর্মঘট। রেল শ্রমিকদের লড়াই। সংগঠিত আন্দোলনের বিস্তারে ছাত্র ফেডারেশন কিংবা কৃষক সভার সংগঠন। মেলবন্ধন ঘটতেই থাকল। মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত যুব মনের বিপ্লববাদী মনোভাবের সাথে শ্রমিক-কৃষকের সংগঠিত আন্দোলনের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের চেতনা। প্রকৃত অর্থেই একটা উত্তরণ। নানাবিধ চেতনা আর সংগ্রামের ফল্গুধারায় সব কিছু উজাড় করে দিয়ে শ্রেণি চেতনায় উত্তরণ। এটা বাদ দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিশ্লেষণ বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না। স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থার এবং কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখাবার যে প্রয়াস, গবেষক গৌতম রায়ের এই পুস্তিকা তাকে যথাযথভাবেই জবাব দিতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস।

সুজন চক্রবর্তী ২রা জানুয়ারি, ২০২৩

প্রথম পর্ব বাংলায় বিপ্লববাদ

অগ্নিযুগের অমর মানুষগুলিকে ঠিক কী নামে সংজ্ঞায়িত করা হবে তা বহুদিন ধরেই হয়ে আছে এক বিতর্কের বিষয়। বাংলায় বিপ্লববাদীদের যখন রমরমা তখন টানা আট বছর যিনি কোলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন-সেই কুখ্যাত চার্লস টেগার্ট এদের বলেছেন ‘খুনীর দল”। বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ, অভাবনীয় দেশপ্রেম কিছুই তার নজরে পড়েনি। টেগার্ট আরও বলেন, এরা ছিলেন বিবেকহীন ও নিষ্ঠুর হত্যাকারী-বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করাই ছিল এদের উদ্দেশ্য।

প্রাক্তন পুলিশ কমিশনারের এই অভিমত সঠিক নয়। কারণ, দেখা গেছে, বাংলার হাজার হাজার মানুষের সমর্থন ও সহানুভূতি এরা অর্জন করেছিলেন। ক্ষুদিরামের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে অনেক সঙ্গীত রচনা হয়েছিল, কানাই দত্তের ফাঁসির পর তার মৃতদেহ নিয়ে শোক মিছিলে উপস্থিত হয়েছিলেন কাতারে কাতারে মানুষ। ৬৩ দিন অনশনের পর লাহোর জেলে যতীন দাসের মৃত্যু হলে তার শবাধার নিয়ে কোলকাতায় লক্ষ মানুষের মিছিল হয়। বস্তুত, বিপ্লববাদীদের এই বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল বৃটিশ সরকারের অস্বস্তির কারণ।

যদিও, একথা ঠিক আক্ষরিক অর্থে বিপ্লবী এরা ছিলেন না। কারণ, এরা স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই করলেও প্রচলিত অর্থে বিপ্লবীদের মত সমাজ পরিবর্তনের কোন কর্মসূচি এদের ছিল না। তাছাড়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষ ছিল এই আন্দোলনের বাইরে। পরবর্তীকালে অবশ্য গোপাল হালদার বা সুমিত সরকারের মত বুদ্ধিজীবীরা এদের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী বলে সম্বোধন করেছেন। এরা বিপ্লবী এই অর্থে যে এরা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে দেশবাসীর মুক্তি চেয়েছিলেন এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গ্রহণ করেন সন্ত্রাসবাদের পথ। সেই জন্যে এরা বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী।

বৃটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ফাইলে বিপ্লববাদীদের সম্পর্কে প্রদত্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, একেবারে ব্যক্তিস্তরের সন্ত্রাসবাদ যা কমিউনিজম বা গদর আন্দোলন থেকে আলাদা-তা এরা গ্রহণ করেছিলেন। তারা মনে করতেন, ধারাবাহিকভাবে এই ধরণের সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড ঘটিয়ে বৃটিশ অফিসারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে। তাছাড়াও এরা সন্ত্রাসের আশ্রয় নিতেন অস্ত্র সংগ্রহের জন্যে, বোমা তৈরির জন্যে এবং দলের দৈনন্দিন ব্যয়-নির্বাহের উদ্দেশ্যে ডাকাতির জন্যে। এদের আশা ছিল দেশবাসী হয় ভয় পেয়ে অথবা অনুপ্রাণিত হয়ে সামিল হবে এই আন্দোলনে। বলাবাহুল্য, এই বিবরণ বিপ্লববাদীদের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী হিসেবেই চিহ্নিত করে।

আবার বাংলায় বিপ্লববাদের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব ছিল অন্য সব প্রদেশের চেয়ে বেশি। বাংলা ছাড়াও মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব বা উত্তর প্রদেশেও বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ঠিকই কিন্তু বৃটিশ সরকারের দমন পীড়নের মুখে তা শীঘ্র অবদমিত হয়। কেবল বাংলাতেই এই আন্দোলন ছিল ধারাবাহিক এবং এর পিছনে জনসমর্থনও ছিল ব্যাপক। বস্তুত, বিপ্লবীরা তখন ঘরে ঘরে বীর হিসেবে পূজিত হতেন। তবে বাংলার বিপ্লববাদে প্রাদেশিক সংকীর্ণতার কোন স্থান ছিল না। বাংলার বিপ্লববাদ ছিল কার্যত সারা ভারতেরই বিপ্লববাদ। বিপ্লবীরা জানতেন, গোটা দেশজুড়ে বিপ্লব সংঘটিত করা না গেলে বৃটিশ বিতাড়ন সম্ভব নয়। তাই তারা বিভিন্ন সময়ে বাংলার বাইরে অন্যান্য প্রদেশেও বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।

বিপ্লববাদের একটি বৈশিষ্ট্য হল, এই আন্দোলনে বাংলার যুব সম্প্রদায়ের ব্যাপক উপস্থিতি। রাউলাট রিপোর্টের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে ১৯০৭থেকে ‘১৭ সালের মধ্যে যে ১৮৬ জন ব্যক্তি বিপ্লববাদী কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত বা নিহত হয়েছেন তার মধ্যে ৮২ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ এর মধ্যে। আবার এর ৮৯ শতাংশ হল ব্রাহ্মণ, বৈদ্য বা কায়স্থ সম্প্রদায়ের। এদের ৪৫ শতাংশ স্কুল ও কলেজের ছাত্র অথবা শিক্ষক। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, অসংখ্য উদাহরণ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে প্রধানত মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি স্কুল এবং কিছুটা কম হলেও কলেজগুলি ছিল সেই সময় বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির কর্মী সংগ্রহের পীঠস্থান।

প্রসঙ্গত, সেই সময় স্কুলের ছাত্র ও কলেজের শিক্ষকেরা ছিলেন মূলত বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের প্রতিনিধি। ইতিহাসবিদদের মতে, ভদ্রলোক হলেন বৃটিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী শ্রেণী। এরা ছিলেন সামাজিক উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং মধ্যস্বত্বাধিকারী হিসেবে জমি থেকে উদ্ভূত খাজনার ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পেলে এই মধ্যস্বত্বাধিকারীরা শহরে নিচু পদের সরকারি চাকরি ও বৃটিশ শিল্পসংস্থাগুলিতে কেরানির পদে যোগ দেয়। সাধারণভাবে এরা ছিলেন উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। সংখ্যার হিসেবে এরা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও উচ্চশিক্ষা ও সংস্কৃতির কারণে সমাজে জনমত গঠনে এদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

বৃটিশের তীব্র শোষণ ও জনবিরোধী নীতির ফলে উনিশ শতকের গোড়া থেকেই এই ভদ্রলোক শ্রেণীর আর্থিক সংকট বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে প্রতি বছর শ’য়ে শ’য়ে ছাত্র স্কুল ও কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়ে সৃষ্টি করে অসংখ্য শিক্ষিত বেকারের। ভারতবর্ষ বিশেষ করে বাংলাদেশে বহু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও সেগুলিতে শিক্ষকের পদ পূর্ণ হয়ে যায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় কার্যত প্রায় দ্বিগুণ। বৃটিশ ইতিহাসবিদ ভেরিনি লোভেট লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্কুল, কলেজগুলিতে বিপ্লবী ভাবধারা এমন ছড়িয়ে পড়ার একটা অন্যতম কারণ হল, এইসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অতি সামান্য বেতন। ভয়াবহ দারিদ্র ও জ্বালাময়ী ভাষায় লিখিত সাহিত্য তাদের এই মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। অনেক সময় তারা আবার সাংবাদিকতা বৃত্তি গ্রহণ করে এবং পত্রপত্রিকায় এই ভাবধারা প্রচার করতে থাকে সামান্য জীবিকা উপার্জনের জন্যে।

অনুশীলন সমিতির জন্ম ও বিস্তার

অনুশীলন সমিতি হল বাংলার যুবকদের প্রথম সংগঠিত বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান। এই সমিতি গঠিত হয় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, ১৯০২ সালে। কংগ্রেসের নরম ও আপসপন্থী মনোভাব সম্পর্কে হতাশাই এই সমিতি গঠনের প্রাথমিক কারণ। প্রসঙ্গত, এক্ষেত্রে বরোদানিবাসী বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তার বাল্যকাল কাটে লন্ডনে, সেখানে কিংস কলেজ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন তিনি। পিতৃইচ্ছায় আই. সি. এস. পরীক্ষা দিয়ে তিনি লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্যও হয়েছিলেন কিন্তু অশ্বারোহণে ব্যর্থ হওয়ায় ওই পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্বে বাদ পড়ে যান। তিনি বহু ভাষাবিদ ছিলেন এবং ভারতীয় ভাষার মধ্যে বাংলা, হিন্দি ও সংস্কৃত ছিল তার আয়ত্ত্বে। ইউরোপের ইতিহাস, জোয়ান অফ আর্ক ও ম্যাটসিনির জীবন কাহিনী তাকে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

বস্তুত, ভারতীয় রাজনীতিতে অরবিন্দের উত্থান ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। লন্ডনে বসেই তিনি ভারতে বৃটিশের অপশাসন, কংগ্রেসের ভূমিকা ইত্যাদি ঘটনার ওপর নজর রাখছিলেন। তিনি লেখেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া স্বরাজের কথার কোন অর্থ হয়না।… অথচ কংগ্রেস একটা ভুল পথ ধরেছে, যে পথে ভারতের মুক্তি নেই’।

প্রসঙ্গত, অরবিন্দ যখন ভারতে আসার জন্য উদ্‌গ্রীব তখন তার পরিচয় হয় লন্ডন সফররত বরোদার রাজা সয়াজিরাও গাইকোয়াডের সঙ্গে। মনেপ্রাণে স্বাধীনচেতা এই রাজা অরবিন্দের পান্ডিত্য ও স্বদেশভাবনায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে তার রাজ্যের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে একটি চাকরি দিয়ে বরোদায় নিয়ে আসেন। চাপেকার ভাইদের মৃত্যুর পরেও ওই প্রদেশে বিপ্লবীরা তখন ছিল খুবই সক্রিয়। উল্লেখ্য, ওই ১৯০২ সালেই ঠাকুর রাম সিং নামে এক উদয়পুরবাসী রাজপুত অরবিন্দকে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা দেন। একই সঙ্গে তাকে গুজরাটের সমিতিগুলি দেখভালের দায়িত্বও দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, ঠাকুর সাহেব তখন ছিলেন পশ্চিম ভারতের গুপ্ত সমিতিগুলির সর্বজনমান্য নেতা। তার লক্ষ্য ছিল, ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে গোপন প্রচারের মাধ্যমে সিপাই বিদ্রোহের ধাঁচে সারা দেশে আর একটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো। অরবিন্দ লিখেছেন, অন্তত তিনটি রেজিমেন্টে তিনি প্রভাব বিস্তারে সফল হয়েছিলেন। তার একটি অরবিন্দ পরিদর্শনও করেন। ঠাকুর সাহেবের অধীনে পশ্চিম ভারতের গুপ্ত সমিতিগুলির একটি নেতৃত্বদানকারী পরিষদ তৈরি হয় এবং বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন তার এক সদস্য।

আবার ওই একই বছরে বরোদায় আসেন বর্ধমানের চান্নি গ্রামের এক যুবক যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বস্তুত, অরবিন্দের সঙ্গে তার স্বদেশ ভাবনায় বিশেষ ফারাক ছিল না। স্বাস্থ্যবান ও উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী যতীন্দ্রনাথ মনে করতেন বৃটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব অনিবার্য এবং তার জন্যে বাঙালির সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামরিক শিক্ষা। যেহেতু বাঙালিদের তখন সরকারি সেনাবাহিনীতে ভর্তি নেওয়া হোত না, তাই তিনি যতীন্দর উপাধ্যায় নাম নিয়ে বরোদার সৈন্যদলে নাম লেখান। তিনি দু’বছর বরোদায় ছিলেন কিন্তু তারপর অরবিন্দের পরামর্শে বিপ্লবী সমিতি গঠনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় ফিরে আসেন।

ওই সমিতির এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অবিনাশ ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘যতীনবাবু ১০৮ এ অথবা বি আপার সার্কুলার রোড-এই ঠিকানায় একটি বাড়ি ভাড়া করে বাস করতে শুরু করেন। তার বাসার সংলগ্ন ভূমিতে একটি আখড়া স্থাপন করা হয়। সেখানে সাঁতার কাটা, লাঠি খেলা, ঘোড়ায় চড়া, বক্সিং ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হইত। ইহা ছিল আমাদের বাইরের আবরণ। এই সঙ্গে বিশ্বস্ত ছেলেদের সামনে গ্যারিবী, ম্যাটসিনির জীবনী এবং অন্যান্য বিপ্লবী আন্দোলন কীভাবে পরিচালিত হইয়াছিল তাহা নিয়া বক্তৃতা করা হইত। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পি. মিত্র, সখারাম গণেশ দেউস্কর প্রধানত বক্তৃতা দিতেন। বই পড়িয়া সব বুঝাইয়া দেওয়া হইত। ২০ এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি ছিল বিপ্লবী সমিতি নামে।

এদিকে কলকাতার জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশনের (বর্তমানে স্কটিশচার্চ কলেজ) জিমন্যাসিয়ামে লাঠি খেলা শিক্ষার অনুমতি না দেওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের এক ছাত্র সতীশ বসু মদন মিত্র লেনে একটি ছোট লাঠিখেলার ক্লাব তৈরি করেন। সতীশবাবু বিবেকানন্দের বই পড়ে ও বক্তৃতা শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বিবেকানন্দের আইরিশ শিষ্যা নিবেদিতাও তাকে উৎসাহ দেন। স্থানীয় নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলের প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যকে ওই আখড়ার নামকরণের জন্যে অনুরোধ করা হলে তিনি তার নাম দেন ভারত অনুশীলন সমিতি।১৪ এই নামটি ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্ব, অনুশীলন নামে প্রবন্ধ থেকে গৃহীত। সতীশবাবুর অনুরোধে ওই সমিতির দায়িত্বভার নিতে এগিয়ে আসেন হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ও চিত্তরঞ্জন দাশের সহকর্মী প্রমথনাথ মিত্র বা পি. মিত্র। সতীশবাবু তার সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণে লিখেছেন ‘ইত্যবসরে তেঘরিয়ার শশী চৌধুরি আমাদের ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরির কাছে লইয়া যান।… আমি শশীদাকে বলি, আমাদের সভাপতি বা নেতা নেই। আশুতোষবাবু ক্লাবের কথা শুনিয়া বলিলেন এই কর্মের উপযুক্ত লোক হইতেছেন ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র। চৌধুরি নিজের নামে পত্র দিয়া তাহার কাছে আমাদের পাঠাইয়া দেন। তাহাকে সব কথা বলিলে তিনি excited হইয়া আমাকে জাপটাইয়া ধরিলেন, পরে তিনি ক্লাবের পরিচালক (Commander-In-Chief) হইলেন।

এই একই সময়ে বা তার সামান্য আগে নিবারণ ভট্টাচার্য নামে এক যুবক তৈরি করেন আত্মোন্নতি সমিতি। বিশিষ্ট বিপ্লবী ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি প্রমুখ ছিলেন এর সদস্য।১৬ অনেক বিপ্লবী তখন একইসঙ্গে এই দুটি সমিতিরই সদস্য ছিলেন।

১৯১০ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পি. মিত্র ছিলেন অনুশীলন সমিতির প্রশ্নাতীত নেতা। তিনি ছিলেন নৈহাটির কাঁঠালবেড়িয়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিবেশী এবং তার রচনার এক অনুরাগী পাঠক। ছেলেবেলা থেকেই তিনি লাঠি খেলার ভক্ত ছিলেন। তার অভিভাবকেরা তখন পরিহাস করে বলতেন এ ছেলে বড় হয়ে ডাকাত দলের সর্দার হবে। ” অতিকায় চেহারার এই মানুষটি ছিলেন আইনজীবী মহলে সকলের শ্রদ্ধাভাজন। এর আগে তিনি চারবার গুপ্ত সমিতি গড়তে গিয়ে ব্যর্থ হন। ১৯০১ সালে কোলকাতায় এসে তাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন অরবিন্দ। পি. মিত্র ছিলেন সাধারণ ভাবে গুপ্ত হত্যা, ডাকাতি ইত্যাদির বিরোধী। তার মত ছিল, সারা দেশে এক সঙ্গে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বৃটিশ শাসকদের হঠাতে হবে। কিন্তু সেই সময় এখনও আসেনি।

প্রসঙ্গত, পি. মিত্র সরলাদেবী মারফত আপার সার্কুলার রোডে বরোদা থেকে অরবিন্দ প্রেরিত এক বিপ্লবীর একটি গুপ্ত সমিতি তৈরি করার খবর পান। তার আহ্বানে সাড়া দিতে যতীন্দ্রনাথের কোন দ্বিধা ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৯০২ সালের ২৪ মার্চ দোল পূর্ণিমার দিনে তৈরি হয় দুটি দল মিলে পূর্ণাঙ্গ আকারে অনুশীলন সমিতি। ভারত শব্দটি পি. মিত্র বাদ দেন। তিনি হলেন এই দলের সভাপতি এবং সহ সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাস ও অরবিন্দ ঘোষ, কোষাধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সিস্টার নিবেদিতা হলেন এই দলের পঞ্চম পরিষদীয় সদস্য। সমিতির খরচপত্রের সিংহভাগই অরবিন্দ বহন করতেন। প্রসঙ্গত, যতীনবাবুর প্রস্তাব মত তখন দুটি আখড়াই একসঙ্গে চালু রাখা হয়। কমবয়সীদের জায়গা হল মদন মিত্র লেনে এবং বয়স্ক সভ্যরা যতীনবাবুর নেতৃত্বে আপার সার্কুলার রোডের আখড়ায় প্রশিক্ষণ নিতে লাগলেন।

১৯০৪ সালের গোড়ার দিকে যতীন্দ্রনাথকে সাহায্য করার জন্যে অরবিন্দ তার ছোট ভাই বারীন ঘোষকে কলকাতায় পাঠান। বারীন্দ্র প্রথমে যতীনের সঙ্গেই থাকতেন। পরে তিনি গ্রে স্ট্রীটে একটি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে উঠে যান। কার্যত, এরা দুজন একত্রিত হওয়ার পরেই অনুশীলন সমিতির তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন কলকাতা কেন্দ্রের দায়িত্বে এবং বারীন জেলায় জেলায় ঘুরে, সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন। কিন্তু অচিরেই দুজনের মনোমালিন্য হয়। যতীনের বিরুদ্ধে অমিতব্যায়িতার অভিযোগ আনেন বারীন্দ্র।২০ এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ভার দেওয়া হয় প্রবীণ বিপ্লবী যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণকে। এ সময় ক্ষুব্ধ যতীন্দ্রনাথ দল ছেড়ে সীতারাম ঘোষ স্ট্রীটের একটি মেসে গিয়ে উঠেছিলেন, পরে যোগেন্দ্রনাথ অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে রায় দিলে তিনি আবার ফিরে আসেন। কিন্তু বারীন্দ্র ১৯০৪ সালের অক্টোবরে আবার একটি অভিযোগ আনেন যতীনের বিরুদ্ধে। তখন অরবিন্দ কোলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। বারীনের আচরণে তিনি যে খুব সন্তুষ্ট ছিলেন তা নয়, কিন্তু কার্যত এই বিরোধ জোড়া লাগানোর আর কোন উপায় ছিলনা। এদিকে এইবার চূড়ান্ত বিরক্ত ও হতাশ হয়ে যতীন্দ্রনাথ দল ছেড়ে নিরালম্ব স্বামী নাম নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যান। তিনি সাধুবেশে হিমালয়ে যাবার পথে অজিত সিং ও কিষাণ সিং নামে দুই শিখ যুবককে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। উল্লেখ্য, এই কিষাণ সিং ছিলেন শহিদ ভগত সিং এর বাবা এবং পরবর্তীকালে আমেরিকায় গদর পার্টির প্রতিষ্ঠিাতা লালা হরদয়াল ছিলেন তার ভাবশিষ্য।

অনুশীলন সমিতির বিশিষ্ট নেতা ও বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, প্রথমে আমাদের দলে মুসলমান সম্প্রদায়ের ছেলে লওয়া হইত কিন্তু এ সময়ে জনাকতক ছাড়া মুসলমান বিপ্লববাদী বেশি পাওয়া যায় নাই। পরে কিছুদিনের জন্যে মুসলমান সভ্য লওয়া বন্ধ করা হইয়াছিল, কিন্তু শীঘ্র আবার লইবার হুকুম হইয়াছিল। তবে পরস্পরের স্বাভাবিক অবিশ্বাসের জন্যেই হউক বা অন্য যে কোন কারণেই হউক, পরে মুসলমান সভ্য আর পাওয়া যায় নাই। এমনকি পাওয়া যায় নাই ব্রাহ্মা সমাজের লোকও। কাজেই বিপ্লববাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদে পরিণত হইল। এই জন্যে মুসলমান বিপ্লববাদীরা বলেন যে হিন্দুরা তাহাদের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচার না করিয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রচার করিতেন।

পুলিনবিহারী দাস ও ঢাকার অনুশীলন সমিতি

‘০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বৃটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সাতদিন পরে পি. মিত্র ও বিপিনচন্দ্র পাল ঢাকায় আসেন। বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন অগ্নিবর্ষী ভাষণ দিতে দক্ষ আর ঘরোয়া সভায় যুবকদের বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করায় পি. মিত্রের জুড়ি ছিলনা। ঢাকার বাবুবাজারে মিটফোর্ড হাসপাতালের উল্টোদিকে একটি দোতলা বাড়ির উপরের তলায় তাদের বাসস্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল। এই বাড়ির নিচে ছিল পুলিশ ব্যারাক। বিপিনবাবু ও পি. মিত্র এসে পৌঁছোন সন্ধ্যের দিকে। ছাত্র, যুবক ও কতিপয় উকিল তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন-এবং তারা আসার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই সভা শুরু হয়। প্রসঙ্গত, আলোচনার একপর্যায়ে পি. মিত্র বলেন, কেবল স্বদেশি আর বয়কটে ইংরেজ যাবে না, তাদের মেরে তাড়াতে হবে’।

এরপর পুলিনবিহারীর ভাষ্যে, একটি দল আমরা ভাই এসবের ভিতরে নাই, বলিতে বলিতে একসঙ্গে বাহির হইয়া গেল। কেহ বা ফিসফিস করিয়া নানারূপ বিদ্রুপ করিতে লাগিল, কিন্তু কতিপয় ছাত্র ও যুবক (সংখ্যায় তারা প্রায় ৮০ জন) পি. মিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িল। ২৪ আরও দুদিন দীর্ঘ আলোচনার পর ঢাকায় অনুশীলন সমিতি নামেই সমিতি গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। পুলিনবিহারী দাস সর্বসম্মতভাবে সমিতির পরিচালক নিযুক্ত হন।

এই স্বনামধন্য বিপ্লবীর জন্ম ১৮৭৭ সালে ফরিদপুর জেলার লোনসিং গ্রামে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট কাদম্বিনী বসুর স্বামী দ্বারকানাথ গাঙ্গুলিও ছিলেন এই গ্রামের লোক এবং তাদের প্রতিবেশী। পুলিনবিহারীর গৃহটি ডেপুটি বাড়ি নামে পরিচিত ছিল কারণ এই পরিবারের অন্তত ২০ জন পুরুষ ছিলেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ডেপুটি পদে চাকুরিরত। পুলিনবিহারীর বাবা নবকুমার দাস এক সময় মাদারিপুর আদালতের সেরা উকিল ছিলেন। ২০ ১৯০৮ সালে জনৈক বৃটিশ গোয়েন্দা অফিসার তার প্রদত্ত রিপোর্টে বলেছেন, পুলিনবিহারী তার কাকা অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি চন্দ্রকুমার দাসের সঙ্গে কলহের পর তার অংশের বিষয়সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে ঢাকায় চলে যান। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ. পরীক্ষা দিলেও ইংরেজিতে ফেল করায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সেই সময় কলকাতায় সরলাদেবীর আখড়ার বিখ্যাত অস্ত্রবিশারদ মুর্তজা ঢাকায় এসেছিলেন এবং পুলিনবিহারী তার সঙ্গী হন। মুর্তজা নিজে মুসলমান ছিলেন কিন্তু কোন মুসলিমকে তিনি লাঠি খেলা শেখাতেন না। পুলিনবাবু তার সঙ্গে প্রায় তিন বছর কাটিয়ে নানা রকম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তারপরেও তিনি বর্ধমান, নদীয়া ও যশোরের বিভিন্ন লেঠেল সর্দারের কাছ থেকে লাঠি খেলা শিক্ষা করে ঢাকায় ফেরেন।২৬ এই প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হওয়ার পর পরেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় পি. মিত্রের।

প্রসঙ্গত, পুলিনবিহারী ছিলেন সেই সময় ঢাকার যুবকদের কাছে এক কিংবদন্তি চরিত্র। তার অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা দিয়ে তিনি গোটা পূর্ব বাংলা এমনকি আসামেও অনুশীলন সমিতির শাখা তৈরি করেন। শুধু ঢাকা জেলাতেই অন্তত ৬০০টি সমিতির শাখা গঠিত হয়েছিল। পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে, তার ছিল পাকানো দড়ির মত দীর্ঘ চেহারা, উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি, তার দুই কানে মেয়েদের মত দুল পরার ফুটো ছিল। পরে অনুশীলন সমিতির নেতৃস্থানীয় আরও কয়েকজনের কানে এই ফুটো দেখা যায়। তাছাড়া তার সঙ্গে থাকতো একটি লাল ভেলভেটের কাপড়ে মোড়া নাতিদীর্ঘ ড্যাগার। ঢাকার স্বামীবাগে এক সাধুজীর কাছে তিনি প্রায়ই যাওয়া আসা করতেন। গুজব ছিল, এই সাধু ছিলেন সিপাই বিদ্রোহের আত্মগোপনকারী নানাসাহেব। পুলিনবিহারী দাস তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সাধুজী নিজে অবশ্য এই পরিচয় দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করিতেন। কিন্তু সিপাই বিদ্রোহের বিবরণগুলি তিনি এমন প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করিয়া বলিতেন যেন তিনি নিজে সব কিছু প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ঢাকার বহু উচ্ছৃঙ্খল যুবক সাধুজীর প্রভাবে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল।

পি. মিত্র ও বিপিনচন্দ্র পাল কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই পুলিনবিহারী কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে পি. মিত্রের বাড়ি গিয়ে তার কাছে দীক্ষা নিয়ে আসেন। পুলিনবিহারী লিখেছেন ‘ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য পুষ্প চন্দনাদি সাজাইয়া ছান্দোগ্য উপনিষদ হইতে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করিয়া পি. মিত্র যজ্ঞ করিলেন। পরে আমি আনৌঢ়াসনে বসিলাম, আমার মস্তকে গীতা স্থাপিত হইল, তদুপরি অসি ধরিয়া পি. মিত্র আমার পাশে দণ্ডায়মান রহিলেন… আমি যজ্ঞাগ্নির সম্মুখে কাগজে লিখিত প্রতিজ্ঞাপত্র পাঠ করিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রহিলাম। পরে যজ্ঞাগ্নি ও পি. মিত্রকে নমস্কার করিলাম।

প্রসঙ্গত, পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা ছিল বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে নিদারুণ ক্ষুব্ধ। তাছাড়া ফুলারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে তারা তার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। বস্তুত, এই দুই কারণে দলে দলে হিন্দু যুবক যোগ দিতে থাকে অনুশীলন সমিতিতে। পুলিনবিহারী ঢাকার উপকণ্ঠে সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে এবং আরও অনেক পুরনো মন্দিরে গোপনে এই যুবকদের দীক্ষা দিতেন। ঢাকা শহরে ৫০নং ওয়ারি ছিল সমিতির প্রধান কেন্দ্র। পরে ক্রমশ সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকলে পুরনো ঢাকার দক্ষিণ মৈশন্ডীতে একটি ভূতের বাড়ি ভাড়া করা হয়। ভূতের ভয়ে এলাকাবাসী ওই বাড়ির ধারে কাছে ঘেঁষত না। বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (মহারাজ) লিখেছেন, ‘এখানে প্রায় ২০০ ঘরবাড়িছাড়া সমিতির সভ্য থাকিত। তাহাদের ব্যয়ভার সমিতি বহন করিত।… এখানে একটি বড় লাইব্রেরি ছিল, শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। এখানে লাঠি খেলা ও ড্রিল শিক্ষা করিয়া কর্মীদিগকে মফঃস্বলে যাইয়া শাখা সমিতির সভ্যদিগকে শিক্ষা দিতে হইত।

পুলিনবিহারী দাস তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন,

‘ওই বাড়ির মালিক ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী শিক্ষক। বাড়িটির ওপরে একটি বড় হল এবং অপর দুইটি ঘর ছিল। নিচেও একটি বড় হল ও অন্য একখানা ঘর ও একটি বড় বারান্দা ছিল। রান্নাঘর স্বতন্ত্র ছিল। দ্বিতলে যে কক্ষে আমি বাস করিতাম, সে কক্ষেই সাধারণত দ্বিপ্রহরে রাইফেল, রিভালভার, অসি প্রভৃতির বিভিন্ন রূপ সংস্কারাদি হইত… সীসা গলাইয়া ছাঁচে ঢালিয়া বুলেট তৈয়ারি, শূন্য খোলের মধ্যে বারুদ, কেপ ও বুলেট ভরিয়া মেশিনের চাপে কার্তুজ প্রস্তুতও ওই ঘরেই হইত।… ওই সমস্ত অস্ত্রগুলি বিভিন্ন গুপ্তস্থানে থাকিত এবং সমিতির সভ্যগণ এসম্পর্কে কিছুই জানিতে বা বুঝিতেও পারিত না।

বস্তুত, ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লচাকীর বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার অনেক আগেই পুলিন ও তার অনুগামীরা ঢাকায় বিপুল পরিমাণে বোমার মালমশলা মজুত করে। একসময় ঢাকা কলেজের রসায়নাগারে সহকারি পদে কাজ করার কারণে পুলিনবিহারী নিজেই ছিলেন বোমা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। আবার ১৯০৮ সালে কামারনগর সমিতির প্রধান ও পুলিন-ঘনিষ্ট ব্রহ্মানন্দ গুপ্ত পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন যে একসময় তিনি কোলকাতায় গিয়ে বারীন ঘোষের কাছে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, একথা ঠিক যে স্বল্পসময়ের নোটিশে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বোমা তৈরি সম্ভব কিন্তু কড়া নজরদারির জন্যে তারা তখন তা স্থগিত রাখেন।

পুলিশ সূত্রে আরও বলা হয়েছে, ঢাকার সমিতির অনেকের কাছেই রিভলভার ছিল। এদের মধ্যে যারা দুঃসাহসী, তারা সর্বদা অস্ত্রটি সঙ্গে রাখতেন। গেন্ডারিয়ার কোন একটি গুপ্ত স্থানে অনেক গোলাবারুদও মজুত রাখা হয়। এই সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে পুলিশ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ছিলেন কিন্তু সঠিক জায়গাটি অজানা থাকায় তারা তল্লাসি চালানোর কোন সুযোগ পাচ্ছিলেন না।

পুলিনবিহারী ছিলেন কর্তৃত্ববাদী এবং কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ। বস্তুত, সমিতির প্রতিজ্ঞাপত্রেই নেতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের বিষয়টি উল্লিখিত ছিল। তার এই কড়া মনোভাবের জন্যে তিনি অনেকের কাছে অপ্রিয় ছিলেন ঠিকই কিন্তু ঢাকার অনুশীলন সমিতিতে আগাগোড়া ঐক্য অটুট ছিল। এর বিপরীতে যুগান্তরের সংগঠন ছিল অনেক ঢিলেঢালা।

১৯০৯ সালে কোলকাতার অনুশীলন সমিতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। বিশেষ করে ‘১০ সালে পি. মিত্রের মৃত্যুর পর তাদের কাজকর্মও স্তিমিত হয়ে পড়ে। কার্যত, তখন থেকেই অনুশীলন সমিতি শুধুমাত্র পূর্ববাংলার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। পুলিনবিহারীর নেতৃত্বে নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, হবীগঞ্জ, চাঁদপুর, সিলেট ও পাবনায় সমিতির শাখা অফিস গড়ে গঠে। বিশেষত, বিক্রমপুরের প্রতিটি গ্রামেই অনুশীলন সমিতির স্বতন্ত্র শাখা ছিল।

অনুশীলন ছাড়াও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এই সময় আরও কতগুলি ছোট ছোট গোষ্ঠী বা সমিতি তৈরি হয়। যেমন ময়মনসিংহে সুহৃদ সমিতি ও সাধনা সমাজ, খুলনা ও ফরিদপুরে মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতার ব্রতী সমিতি এবং ঢাকা শহরেও পরবর্তীকালে শ্রীসংঘ, হেমচন্দ্র ঘোষের বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স নামে কতগুলি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত, পুলিনবিহারীর গতিবিধির ওপর পুলিশের বরাবরই নজর ছিল। ১৯০৮ সালে প্রথমে তাকে পাঞ্জাবের মন্টোগোমারি জেলে নির্বাসিত করা হয়। ‘১০ সালে মুক্তি লাভের পরেই তাকে আবার ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করে সাতবছরের মেয়াদে পাঠানো হয় আন্দামানে। তার অনুপস্থিতিতে নেতা হন বিক্রমপুরের সোনারং জাতীয় বিদ্যালয়ের কর্ণধার মাখন সেন। কিন্তু তিনি শীঘ্রই পদ থেকে অব্যাহতি নিলে সমিতিতে নরেন্দ্র সেন, অমৃত হাজরা, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী প্রমুখের যৌথ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।

পরবর্তী জীবনে পুলিনবিহারী কলকাতার চালতাবাগানে বঙ্গীয় ব্যায়ামসমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরলে সেই সময়ের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হয়। বিপ্লবী কর্মকান্ডে তিনি আর সক্রিয় ছিলেন না। ১৯৪৯ সালে ৭৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

যুগান্তর পার্টির উদ্ভব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ‘১৪ সালের সেপ্টেম্বরে চম্পকরমণ পিল্লাই নামে এক বার্লিনবাসী তামিল যুবক জার্মান বিদেশ দপ্তরের অধীনে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল পার্টি নামে এক সংগঠন তৈরি করেন। এর সদস্য হন হরদয়াল, তারকনাথ দাস, বরকতুল্লা, চন্দ্রকুমার চক্রবর্তী এবং হেরম্বলাল গুপ্ত। পরে এদের সঙ্গে যোগ দেন হায়দ্রাবাদ নিবাসী সরোজিনী নাইডুর ছোট ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। এই সমিতির কাজ প্রথমে শুধু বৃটিশ বিরোধী সাহিত্য ও পত্রিকা প্রকাশে সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ জোরদার হলে এদের তৎপরতাও বৃদ্ধি পায়। এই সময় জার্মান সরকারের সঙ্গে ভারতীয় বিপ্লবীদের এক চুক্তি হয় যে জার্মান সরকার বিপ্লববাদীদের আগ্নেয়াস্ত্র ও পর্যাপ্ত অর্থ দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটাতে সাহায্য করবে এবং সেই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেবে বাংলায় যুগান্তর পার্টি ও পাঞ্জাবের গদর পার্টি। বস্তুত, এই হল ভারত-জার্মান ষড়যন্ত্রের মূল কথা।

বলাবাহুল্য, বিদেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরই বাংলার বিপ্লবীরা তৎপর হয়ে ওঠেন। সেইসময় তারা সকলেই উপলব্ধি করেন এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির একজোট হওয়া প্রয়োজন। মতিলাল রায় লিখেছেন,

সিদ্ধান্ত হয় ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে উত্তরপাড়ার গঙ্গাতটে যে জোড়া শিবমন্দির আছে, মহারাত্রে সেখানে উপস্থিত হইয়া চরম কর্মসূচি নির্ধারণ করা হইবে। ….. নির্দিষ্ট দিনে ওই সভায় যোগদানের জন্যে একখানা পানসি ভাড়া করিয়া আমি ও শ্রীশচন্দ্র ঘোষ রাতের অন্ধকারে উত্তরপাড়াভিমুখে যাত্রা করি। আমরা মধ্যরাত্রে সেখানে গিয়া উপস্থিত হই। একটা মিটমিটে প্রদীপ জ্বালাইয়া অমরেন্দ্রনাথ প্রমুখ বিপ্লবী নেতৃগণ আমাদের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। আমরা উপস্থিত হইলে সকলের মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার হইল এবং বিপ্লবের কাজে কীভাবে আমরা অগ্রসর হইব সেই কথা লইয়া আলোচনা শুরু হইল।

এই সভায় উপস্থিত ছিলেন অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রামচন্দ্র মজুমদার ও নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ। প্রসঙ্গত, এই সভায় মোট ন’টি দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুগান্তর পার্টি গঠন করে। দলের নেতৃত্বের ভার পড়ে সর্বসম্মতভাবে যতীন্দ্রনাথের ওপর। যে দলগুলি এই সময় ঐক্যবদ্ধ হয় সেগুলি হল পূর্ণ দাসের মাদারিপুর সমিতি, স্বামী প্রজ্ঞানন্দের বরিশাল সমিতি, নোয়াখালির দলে ছিলেন সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, নগেন্দ্র গুহ রায় প্রমুখ। আবার সতীশ চক্রবর্তীর খুলনা সমিতি, ময়মনসিংহের হেমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরির সাধনা সমিতি এবং আত্মোন্নতি সমিতির বিপিন গাঙ্গুলি, অনুকূল মুখোপাধ্যায় প্রমুখও এই ঐক্যে শরিক হন। তবে ঢাকা অনুশীলন সমিতি এই জোটে যোগ না দিয়ে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব বজায় রাখে। চন্দননগর সমিতিও আংশিকভাবে যোগ দেয়। কার্যত, এই সময় থেকেই বাংলার বিপ্লববাদে অনুশীলন ও যুগান্তর দুটি আলাদা দল তৈরি হয়।

বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ও শ্রী সংঘ

উল্লেখ্য, ‘২৮ সালে বাংলায় আরও দুটি বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে যারা ছিল প্রায় অনুশীলন ও যুগান্তর দলের সমশক্তিধর। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ও শ্রী সংঘ নামে এই দুই দলই ছিল আসলে হেমচন্দ্র ঘোষ পরিচালিত মুক্তিসংঘের দুটি স্বতন্ত্র শাখা। হেমচন্দ্র ঘোষের পারিবারিক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার গাভা গ্রামে। কিন্তু তার বাবা মথুরানাথ ঘোষ কর্মসূত্রে ঢাকায় এসে বসবাস করতে থাকেন। কলকাতার ব্যারিস্টার পি. মিত্র ১৯০৬ সালে যখন ঢাকায় অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন তখন বাইশ বছর বয়সী হেমচন্দ্র ওই শহরেই তৈরি করেন মুক্তিসংঘ। তিনি দলের পৃথক সত্তা বজায় রেখেও অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই কাজ করতেন। তার দলে ছিলেন শ্রীশচন্দ্র পাল, হরিদাস দত্ত, প্রমথ চৌধুরি, রাজেন গুহ, আলিমদ্দিন আহমেদ (মাস্টার সাহেব) প্রমুখ। পরে মুক্তিসংঘের শাখা কলকাতাতেও বিস্তৃত হয়। কলকাতা শাখার দায়িত্বে ছিলেন শ্রীশচন্দ্র পাল। যিনি ছিলেন আবার আত্মোন্নতি সমিতির বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির ঘনিষ্ঠ। তাছাড়া রাসবিহারী বসু ও যতীন মুখার্জির সঙ্গেও হেমচন্দ্র পরিচিত ছিলেন। মুক্তিসংঘের কর্মীরা যুগান্তর ও আত্মোন্নতি সমিতির সঙ্গে যুক্তভাবে কয়েকটি বিপ্লবী অ্যাকশনে সামিল হন। হেমচন্দ্র ‘১৪ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ‘১৯ সালে বৃটিশরা সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিলে অন্য সব বিপ্লবীর সঙ্গেই মুক্তিলাভ করেন।

ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায় তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘জেল থেকে বেরিয়ে হেমচন্দ্র দেখেন দল বলতে আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। যদিও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী প্রমথ চৌধুরি ঢাকায় অতি সংগোপনে দলের একটা নিউক্লিয়াস বাঁচিয়ে রেখেছেন। তার সঙ্গে ওই সংগঠনে যুক্ত ছিলেন খগেন দাস, সুরেন বর্ধন, কৃষ্ণ অধিকারী, মাষ্টার সাহেব প্রমুখ। হেমচন্দ্র ও তার দলের নেতৃবৃন্দ ঠিক করলেন দৃঢ় ভিত্তিতে দেশ জুড়ে বৃহৎ দল গঠন করতে হবে। তার আগে কোন প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজ করা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ঢাকা শহরে প্রথমে স্যোশাল ওয়েলফেয়ার লিগ, পরে শ্রীসংঘ, শান্তি সংঘ, ধ্রুব সংঘ নামে কয়েকটি সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এগুলির আড়ালে চলতো গোপন বিপ্লববাদী কাজ। ‘২৪ সালে শ্রী সংঘের নেতৃত্বে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অনিল রায়। তার পরিচালনায় এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এদিকে ‘২৩ সালে হেমচন্দ্র ঘোষ ও ঢাকার প্রবীণ নেতৃত্বের সম্মতিতে দীপালি সংঘ নামে একটি নারী সমিতিও গড়ে ওঠে। এর প্রধান সংগঠক ছিলেন লীলা নাগ। দীপালি সংঘ স্ত্রী শিক্ষা, নারী সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই দীপালি আন্দোলনে আরও অনেক শিক্ষিতা মহিলা এগিয়ে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেথুন কলেজে তারা অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ৩০ সালে লীলা নাগ শুধু মহিলাদের জন্যে জয়শ্রী নামে একটি সাময়িকপত্র চালু করেন। এক পর্যায়ে শ্রী সংঘ ও দীপালি সংঘ যুক্তভাবে কাজ করতে থাকে। উল্লেখ্য, বিপ্লববাদী আন্দোলনে এই প্রথম একটি মহিলা সংগঠন সরাসরি যুক্ত হল।

এদিকে কলকাতায় বসে থাকা প্রাক্তন বিপ্লবীরা রেবর্তী বর্মণের সম্পাদনায় ‘বেণু’ নামে একটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একজোট হন। ‘বেণু’ গোষ্ঠীর সদস্যরা অবশ্য শ্রী সংঘের সমাজসেবার কাজে আগ্রহী ছিলেন না, তারা ছিলেন সরাসরি বিপ্লবী অ্যাকশনের পক্ষপাতী। আবার ‘২৬ সাল থেকেই হেমচন্দ্র ঘোষ ও অনিল রায়ের মতবিরোধ শুরু হয়। ‘২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেসের পরে অবশ্য বাংলার বিপ্লববাদী রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নেয়।

অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর ঐক্য প্রচেষ্টা ও রিভোল্ট গ্রুপ

দুই বড় দলের ঐক্য নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন অনুশীলন সমিতির নিরঞ্জন সেন এবং চট্টগ্রামে যুগান্তর দলের শীর্ষ নেতা সূর্য সেন বা মাষ্টারদা। মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলে বন্দি অবস্থায় তাদের কিছু প্রাথমিক কথা হয়। বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশী তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সূর্য সেনের সঙ্গে আলোচনায় বাইরে গিয়ে একসঙ্গে কাজ করা স্থির করা হয়। সূর্য সেন বলেন, নিরঞ্জনবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।…. মুক্তির পর বাইরে গিয়ে খুব জোরের সঙ্গে একত্র হয়ে কাজে লেগে যেতে হবে এবং এবার একটা কিছু করতে হবে- এমনি ধারা আলাপ-আলোচনা হত প্রায়ই….

আর এক দফা আলোচনা হয় ওই ‘২৪ সালেই মেদিনীপুর জেলে। সেখানে তখন যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতি মিলিয়ে মোট ১৬ জন বিপ্লবী বন্দি ছিলেন। আলোচনায় যোগ দেন যুগান্তরের পক্ষে সুরেন ঘোষ ও যাদুগোপাল মুখার্জি এবং অনুশীলন সমিতির ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ও প্রতুল গাঙ্গুলি। বলাবাহুল্য, এই ঐক্যের সম্ভাবনা নবীন বিপ্লবীদের মনে আশা ও উৎসাহের সঞ্চার করে। ‘২৭সালে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরেই আবার তড়িঘড়ি ঐক্য আলোচনা শুরু হয়। বিপ্লবী নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্য কলকাতার মেসে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর জন বিপ্লবী একত্রিত হয়ে তিনদিন ধরে আলোচনা করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের পক্ষে যাদুগোপাল মুখার্জি, ভূপতি মজুমদার ও মনোরঞ্জন গুপ্ত, মাদারিপুর গোষ্ঠীর পূর্ণ দাস, আত্মোন্নতি গোষ্ঠীর গিরীন ব্যানার্জি, অনুশীলন সমিতির রবি সেন এবং প্রতুল গাঙ্গুলি প্রমুখ। অধিকাংশ নেতাই ঐক্যে আগ্রহী ছিলেন ঠিকই কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে তারা ব্যর্থ হন।

নবীন কর্মীদের চাপে আর এক দফা বৈঠক হয় ‘২৮ সালের আগস্ট মাসে। এবার ঐক্যের পরিসর আরও প্রসারিত করার জন্যে রবি সেন ঢাকায় গিয়ে শ্রী সংঘের অনিল রায়ের কাছে এ বিষয়ে মতামত জানতে চান। কিন্তু অনিল রায় তাকে বলেন, ওই সংযুক্ত দলের কর্মসূচি না জেনে তিনি ঐক্য সম্পর্কে কোন আগাম প্রতিশ্রুতি দেবেন না। আসলে অনুশীলন সদস্যদের প্রতি তার ছিল আস্থার অভাব। বৈঠকে রবি সেন ও অনিল রায় ছাড়াও শ্রী সংঘের হেমচন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়, সত্য গুপ্ত, ভবেশ নন্দী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ঐক্য প্রয়াস বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণ সম্পর্কে অনুশীলন সমিতির বিশিষ্ট নেতা পূর্ণানন্দ দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, প্রথমত, সংযুক্ত দলের একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গঠন করা নিয়ে মতবিরোধ হয়। অনুশীলন সমিতির নেতারা শর্ত দেন, যেসব বিপ্লবীর এর আগে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেবার দৃষ্টান্ত আছে তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাখা যাবে না। বস্তুত, তাদের নিশানা ছিলেন যুগান্তরের অরুণ চন্দ্র গুহ। আবার যুগান্তর দলের কতিপয় নেতা জানান, তারা তাদের সংগৃহীত আগ্নেয়াস্ত্র কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে তুলে দিতে রাজি নন। এইভাবে ঐক্যের বদলে দল দুটির মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। পূর্ণানন্দ দাশগুপ্ত বলেন, কার্যত, পারস্পরিক হিংসা ও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ এই ঐক্যের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

উল্লেখ্য, ২৮ সালের ডিসেম্বরে কলকাতা কংগ্রেসের সময় আর এক দফা ঐক্যের প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু দেখা যায়, নেতারা কোন কেন্দ্রীয় দল তৈরি করার চেয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী। ‘২৯ সালে আবার ঐক্য বৈঠক ডাকা হয় বরিশালের শঙ্কর মঠে। সেখানে যুগান্তর নেতৃবৃন্দ ও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের হেমচন্দ্র ঘোষ উপস্থিত ছিলেন কিন্তু অনুশীলনের নেতারা আসেননি। তবে ওই বৈঠকে যুগান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলি – যেমন মাদারিপুরের পূর্ণ দাসের দল, চট্টগ্রামের সূর্য সেনের দল, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ইত্যাদি যুক্ত হয়ে সারা বাংলা যুগান্তর দল গঠিত হয়।

পুলিস সূত্রে জানা গেছে, এক পর্যায়ে ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতুল গাঙ্গুলি শ্রী সংঘের নেতা অনিল রায়ের কাছে ঐক্যের প্রস্তাব দেন। কিন্তু অনিল রায় বলেন, তিনি ঐক্যে রাজি হতে পারেন যদি অনুশীলন দল তাদের সংগৃহীত অস্ত্রের সমান ভাগ তার দলকে দেয়। স্বভাবতই এরপর আর ঐক্যের আলোচনা এগোয়না। ‘২৯ সালে নেতৃস্থানীয় দাদাদের এই নিষ্ফল ঐক্য প্রচেষ্টায় হতাশ হয়ে অনুশীলনের সতীশ পাকড়াশী, নিরঞ্জন সেন, প্রতুল ভট্টাচার্য, ব্রজেন দাস, জগদীশ চ্যাটার্জি প্রমুখ এবং চট্টগ্রাম যুগান্তরের সূর্য সেনের দল ও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সত্য গুপ্ত প্রমুখ একত্রিত হয়ে খানিকটা ১৯২৫ সালের নিউ ভায়োলেন্স পার্টির আদলে ‘রিভোল্ট গ্রুপ’ নামে এক নতুন গোষ্ঠী তৈরি করেন। বরিশালের সরোজ চক্রবর্তী, রাজশাহীর অনিল বটব্যাল, পাবনার অমূল্য লাহিড়ী, ময়মনসিংহের দক্ষিণা মজুমদার প্রমুখ এই দলে যোগ দেন। জানা যায়, সদ্য প্রকাশিত আইরিশ বিপ্লবী ড্যান ব্রিনের ‘মাই ফাইট ফর ফ্রিডম’ বইটি তাদের অনুপ্রাণিত করে।

বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ, ফিরে দেখা

ঐতিহাসিক লিওনার্ড গর্ডন লিখেছেন, বিপ্লবী সমিতিগুলির প্রাথমিক সংগঠন ছিল দল। এই দল ছিল মূলত এলাকাভিত্তিক অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমার মধ্যেই দলের কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ থাকতো। সাধারণভাবে দলের নেতাকে সম্বোধন করা হত দাদা বলে এবং তার অনুগামীরা ছিল তার চেলা।” বলাবাহুল্য, সেই সময়ের হিন্দু আশ্রমগুলির গুরু-শিষ্য সম্পর্কের সঙ্গে এই দাদা চেলা সমীকরণটির যথেষ্ট মিল দেখা যায়। দাদারা হতেন চেলাদের বয়োজেষ্ঠ্য, অনেকটা কোন পরিবারের বড় দাদার মত। তার কথা অমান্য করা ছিল দলের রীতি বিরুদ্ধ এবং কোন চেলাকে দলে গ্রহণ করার আগে তাকে সে সম্পর্কে শপথ করিয়ে নেওয়া হত। ঢাকার অনুশীলন সমিতির সদস্যরা সকলেই পুলিনবিহারী দাসের যে কোন নির্দেশ বিনা প্রশ্নে, নির্দ্বিধায় পালনের অঙ্গীকার করতেন। পুলিনবিহারী নিজেও তা করেছিলেন দলের সর্বাধিনায়ক পি. মিত্রের কাছে। প্রসঙ্গত, পূর্ব বাংলাতেই এই ছোট দলগুলির সক্রিয়তা ছিল বেশি। যেমন মাদারিপুরে পূর্ণ দাশের দল, বরিশালে সতীশ মুখার্জির স্বদেশ বান্ধব সমিতি, ময়মনসিংহে হেমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরির সুহৃদ সমিতি ইত্যাদি। এই দলগুলির পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ ছিল আবার রেষারেষিও ছিল। কোন বড় অভিযানের সময় দু’তিনটি ছোট ছোট দল একত্রিত হয়ে তাতে সামিল হত। উল্লেখ্য, এই দাদা-নির্ভর সাংগঠনিক কাঠামোর কিছু আভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ছিল। দাদা হঠাৎ গ্রেপ্তার হয়ে গেলে অথবা দাদার মৃত্যু হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমগ্র দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তো। যেমন যতীন মুখার্জির মৃত্যু ছিল যুগান্তর দলের অনেক কর্মীর কাছেই এক বিরাট আঘাত। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের এম. এন. রায় হয়ে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ, তার নেতা যতীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে তিনি দলের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন।

আবার এতবড় দেশে একটা ছোট বিপ্লবী দল নিয়ে যে বিপ্লব সংঘটিত করা সম্ভব নয় দাদারা তা উপলব্ধি করতেন ঠিকই কিন্তু পারস্পরিক বিদ্বেষ আর জেদাজেদির কারণে কোন বৃহৎ ঐক্য গড়ে তোলার জন্যে তারা কেউই উদ্যোগী হতে চাইতেন না। বরং এর বিপরীত ঘটনাটিই ঘটতে দেখা গেছে। কোন এক বিশেষ দলের সদস্য অপর একটি দলের কর্মী বা নেতার সঙ্গে মামুলি সাক্ষাৎ করলেও তাকে তার মূল দাদার তিরষ্কার শুনতে হত। নরেন্দ্র ভট্টাচার্য লিখেছেন, ঘটনাচক্রে একবার আমি একটি দলের দাদা ও চেলার কথোপকথন শুনে ফেলি। দাদা তার চেলাকে অন্য একটি দলের দাদার সঙ্গে সাক্ষাতের কারণ জানতে চেয়ে ভর্ৎসনা করছিলেন। একসময় অধৈর্য হয়ে সেই চেলা বলে ওঠে, ওই দাদার কাছে আমি যাতায়াত করি আপনি কেন তা চাইছেন না। ওই দাদা তো তার দলে যোগ দিতে আমায় বলেননি। আসলে ওই দাদার নিজের কোন দলই নেই।

লিওনার্ড গর্ডন আরও লিখেছেন, বিপ্লবীদের অধিকাংশ কাজ ছিল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ভাবাবেগ ঘটিত। তাতে ক্ষুদ্র লাভ লোকসানের বিষয়গুলিই প্রাধানা পেত। বলাবাহুল্য, তার সঙ্গে সমগ্র দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সম্পর্ক ছিল অতি ক্ষীণ ও ঝাপসা। আবার এর ব্যাতিক্রমও ছিল। কোন ছোট সমিতির কর্মী হয়েও অনেক যুবক এই গোটা দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। সিডিশন কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯১৬ সালের ২৬ জুন কলকাতার গোপী রায় লেনে একটি বাড়ি থেকে ১১,৫০০ টাকা ডাকাতি হয়। দু’দিন পরে ২৮ জুন ওই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মোট ৯,৯৫১ টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি চিঠি পান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating