সারা মহাদেশ (ইউরোপীয় ভূখণ্ড-বাংলা অনুবাদক) জুড়ে এখন বাস্তবিকই সংক্রামক-আকারে ধর্মঘট ও মজুরি বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক সোরগোল চলেছে।
ইংরাজ শ্রমিক জন ওয়েস্টন আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘের সাধারণ সংসদের (General Council of the International Working Men’s Association) সামনে এই অভিমত প্রকাশ করেন যে উচ্চতর মজুরি মজুরদের অবস্থার উন্নতি করতে পারে না এবং ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাব ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করতে হবে।
-(ইংরেজী সংস্করণের সম্পাদক)।
১. উৎপাদন ও মজুরি
সহকর্মী ওয়েস্টনের যুক্তি আসলে নির্ভর করছে দুটি প্রতিজ্ঞার (Premises) উপরে:- প্রথমত, জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ব্যাপার গাণিতিকেরা যাকে বলবেন স্থির (Constant) রাশি বা পরিমাণ; দ্বিতীয়ত, সামগ্রীক মজুরির পরিমাণ, অর্থাৎ যে পরিমাণ পণ্য ঐ মজুরি দ্বারা ক্রয় করা চলে তার হিসাবে মাপা মজুরির পরিমাণ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা, একটা স্থির রাশি।
এখন, তাঁর প্রথম ঘোষণাটি স্পষ্টতই ভুল। আপনারা দেখতে পাবেন বছরের পর বছর উৎপাদনের মূল্য ও পরিমাণ বেড়ে চলেছে। জাতীয় শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি বাড়ছে এবং এই ক্রমবর্ধমান উৎপন্ন প্রচলনের জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন, ক্রমাগতই তার পরিবর্তন ঘটছে সালতামামির পক্ষে যা খাটে আর পরস্পরের তুলনামূলক বিচারে বিভিন্ন বছরের পক্ষে যা সত্য-বছরের প্রতিটি গড়পড়তা দিনের পক্ষেও তাই-ই প্রযোজ্য। জাতীয় উৎপাদনের মাত্রা বা পরিমাণ বদলাচ্ছে অবিশ্রান্তভাবে। এটি স্থির নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল অঙ্ক, আর জন-সংখ্যার পরিবর্তন ছাড়াও পুঁজি সঞ্চয় ও শ্রমের উৎপাদিকা শক্তির ক্রমাগত পরিবর্তনের দরুন সেটিকে তাই হতে হবে। এ কথা পুরোপুরি ঠিক যে, আজ যদি সাধারণ মজুরির হার বৃদ্ধি পায় তবে তার চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন ঐ বৃদ্ধি শুধু নিজের থেকেই অবিলম্বে উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন ঘটাবে না। প্রথম দিকে বর্তমান অবস্থা থেকেই তার সূত্রপাত হবে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির আগে জাতীয় উৎপাদন যদি অপরিবর্তনীয় না হয়ে পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে, তবে মজুরি বৃদ্ধির। পরেও তা অপরিবর্তনীয় না হয়ে, পরিবর্তনশীলই হতে থাকবে।
কিন্তু ধরুন, জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ পরিবর্তনশীল না হয়ে স্থির আছে। সে-ক্ষেত্রে আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন যাকে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করছেন, তা তখনও এক অহেতুক ঘোষণাই থেকে যাবে। যদি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া থাকে, ধরুন আট, তাহলে এই সংখ্যাটির চূড়ান্ত গণ্ডী আছে বলে তার অংশগুলির আপেক্ষিক গণ্ডীর পরিবর্তন ব্যাহত হয় না। মুনাফা যদি ছয় ও মজুরি দুই হয়, তবে মজুরি বেড়ে ছয় ও মুনাফা কমে দুই হতে পারে, কিন্তু তখনও মোট সংখ্যাটা থাকবে আট-ই। কাজেই উৎপাদনের পরিমাণ নির্দিষ্ট হলে পরেই তার থেকে কোনো ক্রমেই প্রমাণিত হয় না যে মজুরির মাত্রাও স্থির। আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন তবে এই অপরিবর্তনীয় মাত্রা প্রমাণ করছেন কি করে? শুধু জোর গলায় ঘোষণা করেই। কিন্তু তাঁর ঘোষণা যদি মেনেও নেওয়া যায় তবে দুদিকেই তা খাটবে, অথচ তিনি শুধু এক দিকেই তাকে খাটাচ্ছেন। মজুরির পরিমাণ যদি একটা স্থির রাশি হয় তবে তাকে বাড়ানোও যাবে না, কমানোও যাবে না। কাজেই যদি সাময়িকভাবে চাপ দিয়ে মজুরি বাড়ানো মজুরদের পক্ষে বোকামি হয়, তবে সাময়িকভাবে চাপ দিয়ে মজুরি কমানো পুঁজিদারদের পক্ষেও কম বোকামি নয়। আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন স্বীকার করেন না যে অবস্থ্য বিশেষে মজুরেরা মজুরি বাড়াতে বাধ্য করতে পারেন বটে, কিন্তু মজুরির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে নির্দিষ্ট থাকার ফলে এর একটা উল্টো প্রক্রিয়া দেখা দেবেই। অপরপক্ষে এও তিনি জানেন যে পুঁজিদারেরা মজুরি কমাতে বাধ্য করতে পারেন, আর তাঁরা অনবরত সে চেষ্টাই করে থাকেন। মজুরির স্থিরতার নীতি অনুসারে এক্ষেত্রেও যতোটুক উল্টো প্রতিক্রিয়া ঘটা উচিত প্রথম ক্ষেত্রেই থেকে তা মোটেই কম নয়। সুতরাং মজুরেরা মজুরি কমানোর চেষ্টার বা মজুরি-কমানো প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে গাঁড়িয়ে ঠিক কাজই করবেন। কাজেই মজুরি বাড়াতে বাধ্য করেও তাঁরা ঠিকই করবেন কারণ, মজুরি কমানোর বিরুদ্ধে প্রত্যেকটি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মজুরি বাড়ানোর স্বপক্ষে সক্রিয়তারই সামিল। অতএব সহকর্মী ওয়েস্টনের নিজস্ব মজুরি-স্থিরতার নীতি অনুসারেই মজুরদের উচিত অবস্থানিশেষে মজুরি বাড়ানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও সংগ্রাম করা। এ সিদ্ধান্ত তিনি যদি না মানেন তবে যে-প্রতিজ্ঞা থেকে এর উদ্ভব সেটাকে অস্বীকার করতে হবে তাঁকে। মজুরিকে একটা স্থিররাশি বলা তাঁর চলবে না, বরং তাঁকে বলতে হবে যে যদিও মজুরি বাড়তে পারে না ও কোনোক্রমেই তা বাড়তে পারে না তবুও পুঁজির তরফ থেকে যখনই মজুরি কমানোর মর্জি হবে তখনই তা কমানো যেতে পারবে ও তাকে কমাতেই হবে। পুঁজিদারের যদি খেয়াল হয় আপনাকে মাংসের বদলে আলু আর গমের বদলে জই খাইয়ে রাখবে, তবে আপনাকে তাঁর সেই খেয়ালকে অর্থনীতির নিয়ম বলে মানতে ও তার কাছে নতি স্বীকার করতে হবে। এক দেশের মজুরির হার যদি আর এক দেশের তুলনায় বেশি হয়, যেমন ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের হার যদি ইংলণ্ডের তুলনায় বেশি হয়, তবে আপনাকে ঐ মজুরির হারের বৈষম্যকে মার্কিন পুঁজিদার ও ইংরেজ পুঁজিদারের মর্জির বৈষম্য বলে ব্যাখ্যা করতে হবে-এ পদ্ধতি শুধু অর্থনৈতিক ঘটনাবলীর নয়, অন্যান্য সব রকম ঘটনার পর্যালোচনাকেও নিশ্চয়ই বহুলাংশে সহজ করে দেবে।
তবুও কিন্তু আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি-মার্কিন পুঁজিদারদের মর্জি ইংরেজ পুঁজিদারদের মর্জির থেকে ভিন্ন হয় কেন? আর সে প্রশ্নের জবাব দিতে হলে আপনাকে যেতে হবে মর্জির আওতার বাইরে। কোনো পাদ্রি হয়ত আমায় বলতে পারেন যে ঈশ্বরের ইচ্ছা ফ্রান্সে এক রকম, ইংলণ্ডে অন্য রকম। দু-দেশে দু-রকম ইচ্ছা কেন, জিজ্ঞেস করলে তিনি হয়ত নির্বিকার ভাবে বলে বসবেন যে দু-দেশে দু-রকম ইচ্ছা থাকাটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। কিন্তু আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন নিশ্চয়ই যুক্তিকে একেবারে জলাঞ্জলি দিয়ে কথা বলার মতো লোক নন। যতদূর সম্ভব আদায় করে নেব-এই হচ্ছে পুঁজিদারদের মর্জি। আমাদের উচিত, পুঁজিদারদের মর্জি সম্পর্কে মাথা না ঘামিয়ে তার ক্ষমতা, সে-ক্ষমতার পরিধি ও সেই পরিধির প্রকৃতি সম্পর্কে তল্লাসী করা।
২. উৎপাদন, মজুরি, মুনাফা
সহকর্মী ওয়েস্টন যে-ভাষণ পড়ে আমাদের শোনালেন তাকে খুব বড়োর সমস্ত যুক্তি দাঁড়াচ্ছে এই রকম: মজুরশ্রেণী যদি মাইনে সংক্ষেপে বলা যেত।
বেলায় চার শিলিং-এর জায়গায় পাঁচ শিলিং দিতে পুঁজিদারশ্রেণীকে বাধ্য করে তবে জিনিসপত্র কেনার বেলায় পুঁজিদারশ্রেণী পাঁচ শিলিং হাতে নিয়ে চার শিলিং দামের জিনিস দেবে। মজুরি বাড়বার আগে মজুরশ্রেণী চার শিলিং দিয়ে যা কিন্ত, এখন তার জন্য তাকে পাঁচ শিলিং খচর করতে হবে। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন পুঁজিদার পাঁচ শিলিং-এর বিনিময়ে মাত্র চার শিলিং দামের জিনিস দেয়? কারণ মজুরির পরিমাণ হচ্ছে নির্দিষ্ট। কিন্তু চার শিলিং মূল্যের পণ্যের কোঠাতেই বা তা নির্দিষ্ট কেন? কেন তিন, দুই বা অন্য কোনো অঙ্কে তা নির্দিষ্ট নয়? পুঁজিদার, মজুর-এই উভয়েরই ইচ্ছা-নিরপেক্ষ এক অর্থনৈতিক নিয়মের দ্বারা যদি মজুরির পরিমাণের গণ্ডী স্থির হয়ে থাকে তবে সহকর্মী ওয়েস্টনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল সে নিয়মকে বিবৃত ও প্রমাণিত করা। তা ছাড়া এও তাঁর প্রমাণ করা উচিত ছিল যে প্রত্যেকটি মুহূর্ত-বিশেষে যে পরিমাণ মজুরি বাস্তবিকই দেওয়া হয়ে থাকে তা সর্বদাই অবশ্য প্রয়োজনীয় মঞ্জিমান পরিমাণের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়-একচুল এদিক ওদিক হয় না। অপর পক্ষে মজুরির পরিমাণের ঐ বিশেষ গন্ডী যদি পুঁজিন্দারের মর্জিমাত্রের উপরে অথবা তার অর্থগৃধু তার গণ্ডীর উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে তবে তা এক মনগড়া গন্ডী। তার মধ্যে অবশ্য-প্রয়োজনীহয়ে থাকে তবে পাজগারের মর্জি হলেই সে গন্ডী বদলে যেতে পারে সব কিছু নেই। বলা চলে যে পুঁজিদারের মর্জি না হলেও এই গণ্ডী বদলাতে বাধ্য করা চলতে পারে।
সহকর্মী ওয়েস্টন তাঁর তত্ত্বের স্বপক্ষে আপনাদের কাছে উদাহরণ দিয়েছেন এই বলে যে একটি গামলায় যখন কয়েকজন লোকের খাওয়ার মতো কিছু-পরিমাণ শুরুয়া থাকে তখন চামচগুলিকে চওড়ার দিকে নাড়ানোর ফলে শুরুয়ার পরিমাণ বাড়ে না। এই দৃষ্টান্তকে যদি আমি জরুরি বলে মনে করি, তবে কিন্তু আমাকে তাঁর মাপ করতেই হবে। নেবারটা সে কথাই মনে পড়িয়ে দেয়। রোমের প্রাকৃতজন যখন সম্ভ্রান্ত নামোনিয়াস এ্যাগ্রিয়া যে উপমা প্রয়োগ করেছিলেন, এটা আমাকে রোমানদের বিরুদ্ধে আঘাত হানে তখন অভিজাতবংশীয় এ্যাগ্রিপা তাঁদের যে রাষ্ট্রদেহে সম্ভ্রান্ত জঠরের মাধ্যমেই প্রাকৃতজন খাদ্য গ্রহণ করে। এ্যাগ্রিপা দেখাতে পারেননি যে একজনের জঠর ভরতি করে আর একজনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুষ্ট করা চলতে পারে। সহকর্মী ওয়েস্টন নিজের বেলায় ভুলে গেছেন যে মজুরেরা যে গামলা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করছেন তা জাতীয় শ্রমের সমগ্র ফলের দ্বারাই পূর্ণ, আর তার থেকে তাঁদের আরো বেশি গ্রহণ ব্যাহত করছে গামলার সংকীর্ণতা নয়, তার ভিতরকার জিনিসের স্বল্পতাও নয়, বরঞ্চ তাঁদের চামচের ক্ষুদ্রতাই।
পুঁজিদার যে পাঁচ শিলিং হাতে নিয়ে চার শিলিং দামের জিনিস ফিরিযে দেয়, তার কৌশলটা কি? সেই কৌশলটা হচ্ছে সে যে পণ্য বিক্রি করে, তার দর বাড়িয়ে দেওয়া তাহলে প্রশ্ন ওঠে, পণ্যের দর বৃদ্ধি, আরো সাধারণভাবে ঐ দরের কোনো পরিবর্তন, অর্থাৎ পণ্যের দর জিনিসটাই কি পুজিদারের ইচ্ছামাত্রের পরেই নির্ভর করে? অথবা ঐ ইচ্ছা ফলপ্রসূ করার পক্ষে বিশেষ কোন অবস্থার প্রয়োজন? নইলে বাজার দরের ওঠানামা, তার অবিশ্রাম জোয়ারভাটা এক অভেদ্য রহস্য হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যখন ধরে নিয়েছি-শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি বা নিয়োজিত পুঁজি ও শ্রমের পরিমাণ বা যে-মুদ্রা মারফৎ উৎপন্ন সামগ্রীর মূল্য নির্ধারিত হয় তার মূল্য, এসবের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, পরিবর্তন ঘটেছে শুধু মজুরির হারেই তখন এই মজুরি বৃদ্ধি কিভাবে পণ্যের দরকে প্রভাবিত করতে পারবে? পারবে শুধু এসব পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ভিতরকার সঠিক অনুপাতের উপর প্রভাব বিস্তার করেই।
এ কথা সম্পূর্ণ সত্য যে সমগ্রভাবে বিচার করলে শ্রমিকশ্রেণী জরুরী সামগ্রী ক্রয়ের খাতে তাঁদের রোজগারের টাকা খরচ করেন-সে খরচ তাঁদের করতেই হয়। কাজেই সাধারণভাবে মজুরি বাড়লে জরুরী সামগ্রীর চাহিদাও বেড়ে যায় এবং ফলে তাদের বাজার দরও বাড়ে। যে বাজারদরের ফলে বাড়তি মজুরির খরচা পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যে-পুঁজিদারেরা এইসব জরুরী সামগ্রী তৈরি করে তারা তাদের পণ্যের চড়তি সব পুঁজিদারেরা জুরুরী সামগ্রী বানায় না তাদের বেলা কি হবে? আর মনে করবেন না যে সংখ্যায় তারা অল্প। একবার ভাবুনতো যে, জাতীয় উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ ভোগ করছে জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ মানুষ [কমন্স সভায় একজন সভ্য সম্প্রতি বলেছেন যে এরা জনসংখ্যার এক-সপ্তমাংশ মাত্র। তা হলে বুঝবেন যে, জাতীয় উৎপাদনের কি বিপুল অংশ বিলাসদ্রব্য হিসাবে তৈরি হয় বা বিলাসদ্রব্যের জন্য বিনিময় করা হয় এবং কি বিপুল পরিমাণ জরুরী সামগ্রীও অপচয় করা হয় সেপাই বরকন্দাজ, ঘোড়া, বিড়াল প্রভৃতির পিছনে; সে অপব্যয় যে জরুরী সামগ্রীর চড়তি দরের সঙ্গে সঙ্গে বহুলাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়-এ কথা আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি।
আচ্ছা, যে সব পুঁজিদার জরুরী সামগ্রী তৈরি করে না তাদের অবস্থা কি দাঁড়াবে? সাধারণভাবে মজুরি বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের মুনাফার হার কমে যায় কিন্তু নিজেদের তৈরি পণ্যের দর বাড়িয়ে তারা সেটুকু পুষিয়ে নিতে পারে না কারণ ঐ সব পণ্যের চাহিদা তো আর বাড়েনি। তাদের আয় যাবে কমে আর ঐ কমতি আয় থেকে আগের মতো পরিমাণে দর-চড়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে গিয়ে আরো বেশি টাকা খরচ হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আয় হ্রাস পায় বলে বিলাসদ্রব্যের খরচার খাতে তাদের টান ধরে আর তাই তাদের নিজ নিজ পণ্যের পারস্পরিক চাহিদা যায় কমে। এই চাহিদা হ্রাসের ফলে তাদের পণ্যের দর কমে। সুতরাং এমশিল্পের এই সব শাখায় মুনাফার হার কমে যায় সাধারণভাবে মজুরির হারবৃদ্ধির সরল অনুপাতে শুধু নয়; সাধারণভাবে মজুরিবৃদ্ধি, জাগরী দ্রব্যাদির দরবৃদ্ধি ও বিলাসদ্রব্যের দরহ্রাসের চক্রবৃদ্ধি হারেও।
শ্রমশিল্পের বিভিন্ন শাখায় নিয়োজিত পুঁজির মুনাফা-হারের এই তারতম্যের ফল কি হতে পারে? এ-প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে এই-যখনই যে-কোনো কারণেই হোক, উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়পড়তা মুনাফার হার যদি জমবেশি হয় তাহলে সাধারণত যা ঘটে থাকে, এ-ক্ষেত্রেও তাই হবে। জয় লাভজনক থেকে বেশি লাভজনক শাখায় পুঁজি ও শ্রম স্থানান্তরিত হবে এবং এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলতে থাকবে যতক্ষণ না শ্রমশিল্পের একটি শাখার পণ্য-সরবরাহ বর্ধিত চাহিদা অনুপাতে বেড়ে উঠবে এবং অন্যান্য শাখার পণ্য-সরবরাহ পড়তি চাহিদা অনুযায়ী কমে যাবে। এই পরিবর্তন ঘটলে পরে বিভিন্ন শাখায় মুনাফার সাধারণ হার আবার সমীকৃত হবে। যেহেতু বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের অনুপাতের সামান্য পরিবর্তন থেকেই গোড়ার অব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, সুতরাং মূল কারণটুকু যদি না থাকে তবে তার ফলাফলও থাকবে না, ফলে দরগুলি আবার তাদের পূরানো স্তরে ও স্থিতাবস্থায় ফিরে যাবে। মজুরি বৃদ্ধির ফলে মুনাফা-হার হ্রাস শ্রমশিল্পের কয়েকটি শাখায় সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে দাঁড়াবে সর্বব্যাপী। যে সূত্র ধরে আমরা অগ্রসর হয়েছি সেই দিক থেকে কথাটা দাঁড়ায় এই শ্রমের উৎপাদন শক্তির কোনো বদল হচ্ছে না, উৎপাদনের মোট পরিমাণেরও বদল হচ্ছে না কিন্তু সেই বিশেষ পরিমাণ উৎপাদনের চেহারা বদলে যাচ্ছে। উৎপাদনের বৃহত্তর অংশ থাকবে জরুরী সামগ্রীর আকারে, ক্ষুদ্রতর অংশ থাকবে বিলাস-দ্রব্যের আকারে; অন্য কথায় বললে দাঁড়ায় যে বিদেশী বিলাস-দ্রব্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্যের বিনিময় আরো কমে যাবে এবং দেশীয় পণ্য দেশেই আরো বেশি ব্যবহৃত হবে; অন্য কথায় বললে দাঁড়ায় যে দেশীয় উৎপাদনের আরো বেশি অংশ বিদেশী বিলাসদ্রব্যের সঙ্গে বিনিময় না হয়ে বিনিময় হবে বিদেশী জরুরী-সামগ্রীর সঙ্গে। সুতরাং মজুরির হার সাধারণভাবে বেড়ে গেলে প্রথম অবস্থায় বাজার-দরের সাময়িক ওঠানামা হয় বটে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্যের কোনো স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে না-শুধু মুনাফার হারকেই সাধারণভাবে কমিয়ে দেয়।
আমাকে যদি বলা হয় যে পূর্ববর্তী যুক্তিতে আমি ধরে নিয়েছি সমস্ত বাড়তি মজুরিই জরুরী-সামগ্রী ক্রয়ের খাতে খরচ হবে, তা হলে আমি জবাব দেব যে আমি সহকর্মী ওয়েস্টনের মতের পক্ষে সব থেকে সুবিধাজনক কল্পনাই করেছি। মজুরেরা আগে ব্যবহার করতেন না এমন জিনিসপত্রের জন্যই যদি বাড়তি মজুরি খরচ করা হয় তবে তাঁদের ক্রয় ক্ষমতা যে সত্য সত্যই বেড়েছে তার আর প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। বলা বাহুল্য, মজুরি বৃদ্ধির ফলে মজুরের ক্রয়ক্ষমতাই আগে বাড়ে, সুতরাং মজুরের ক্রয়ক্ষমতা যতটুকু বাড়ে পুঁজিদারদের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক ততটুক কমে যায়। অতএব পণ্য সম্ভারের মোট চাহিদা বাড়বে না কিন্তু ঐ চাহিদার উপাদানগত অংশগুলির পরিবর্তন ঘটবে। একদিকে বাড়তি চাহিদার তাল সামলাবে অন্য দিকের কমতি চাহিদা। কাজেই মোট চাহিদা – স্থির থাকায় পণ্যসম্ভারের বাজারদরের কোনোরকম পরিবর্তন ঘটতে পারবে না।
সুতরাং আপনারা হাজির হবেন এই উভয় সঙ্কটের মুখোমুখি: হয়, বাড়তি মজুরি সবরকম ব্যবহার্য সামগ্রী ক্রয়ের জন্য সমান ভাবে খরচ হবে; সে-ক্ষেত্রে মজুরশ্রেণীর তরফের চাহিদাস্ফীতি পুঁজিদার-শ্রেণীর তরফের চাহিদা সংকোচনের দ্বারা সমতা বজায় রাখবে। নয়ত, বাড়তি মজুরি খরচ হবে কতগুলি বিশেষ সামগ্রী ক্রয়ের খাতেই-সেক্ষেত্রে সেই বিশেষ বিশেষ সামগ্রীর দর সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পাবে। তখন এর ফলে এমশিল্পের কোনো কোনো শাখায় মুনাফা-হারের বৃদ্ধি ও অন্যান্য শাখায় মুনাফা-হার হ্রাস পুঁজি ও শ্রম বণ্টনের পরিবর্তন ঘটাবে সে পরিবর্তন চলতে থাকবে যতক্ষণ না পণ্য-সরবরাহ শ্রমশিল্পের এক বিভাগের বর্ধিত চাহিদার স্তর অবধি ওঠে এবং শ্রমশিল্পের অন্যান্য বিভাগের হ্রাসপ্রাপ্ত চাহিদার স্তর পর্যন্ত নামে। একটি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুসারে পণ্যের দরের কোনো পরিবর্তন হবে না। অন্য পূর্বসিদ্ধান্ত অনসারে বাজার দরের কিছুটা ওঠানামার পর পণ্যের বিমিময়যোগ্য মূল্য পুরানো স্তরে ফিরে যাবে। উভয় পূর্বসিদ্ধান্ত অনুসারেই মজুরি-হারের সাধারণ বৃদ্ধির ফলে শেষ পর্যন্ত মুনাফা-হারের সাধারণ হ্রাস ছাড়া আর কিছু ঘটবে না।
আপনাদের কল্পনাশক্তিকে উদ্দীপ্ত করার জন্য সহকর্মী ওয়েস্টন ইলেন্ডের কৃষিমজুরী ৮ শিলিং থেকে ১৮ শিলিং পর্যন্ত সাধারণ ভাবে বৃদ্ধি পেলে তার ফলাফল কি রকম অসুবিধাজনক হবে তাই চিন্তা করাতে আপনাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। উচ্চকণ্ঠে তিনি আবেদন জানিয়েছেন-চিন্তা করুন তো জরুরী দ্রব্যাদির চাহিদার বিপুল বৃদ্ধিও তারই ফল হিসাবে সাংঘাতিক দরবৃদ্ধির কথা। এখন, আপনারা সবাই জানেন যে মার্কিন কৃষিমজুরের গড়পড়তা মজুরি ইংরেজ কৃষি- মজুরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি; যদি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি থেকে উৎপন্ন সামগ্রীর দর ইংলন্ডের থেকে কম, যদিও যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজি ও শ্রমের সাধারণ সম্পর্ক ইংলন্ডের মতই এবং যদিও ইংলণ্ডের মতই এবং যদিও ইংলন্ডের থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাৎসরিক উৎপাদনের পরিমাণ অনেক কন। তবে কেন আমাদের বন্ধু এই ‘পাগলা ঘণ্টা’ বাজাচ্ছেন? শুধু আমাদের সামনেকার আসল প্রশ্নটিকে সরিয়ে দেবার জন্যই। হঠাৎ ৯ শিলিং থেকে ১৮ শিলিং মজুরি বাড়া হচ্ছে হঠাৎ শতকরা একশ ভাগ বৃদ্ধি। এখন, ইংলন্ডের সাধারণ মজুরের হার হঠাৎ শতকরা একশ ভাগ বাড়তে পারে কিনা আমরা মোটেই সে প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। বৃদ্ধির পরিমাণের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই-সে পরিমাণ প্রত্যেকটি বাস্তব দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থার উপরে নির্ভর করবে ও তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলবে। আমাদের খোঁজ নিতে হবে শুধু মজুরি-হারের সাধারণ বৃদ্ধি, এমন কি যদি তা শতকরা একভাগের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলেও তার ফল কি হবে।
বন্ধুবর ওয়েস্টনের কল্পনাপ্রসূত শতকরা একশ ভাগ বৃদ্ধির কথা বাদ দিলে আমি গ্রেট বৃটেনে ১৮৪৯ থেকে ১৮৫৯ সালের মধ্যে সত্যসত্যই মজুরির যে বৃদ্ধি ঘটেছিল তার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
আপনারা সকলেই ১৮৪৮ সাল থেকে যে দশ ঘণ্টা বিল অথবা সাড়ে দশ ঘণ্টা (মজুরদের খাটুনির সময়-বাংলা অনুবাদক) বিল প্রবর্তিত হয়েছে তার কথা জানেন। আমাদের কালের বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলির মধ্যে এটি একটি। কোনো স্থানীয় শিল্পব্যবসার ক্ষেত্রে নয়, বরঞ্চ ইংলন্ড দুনিয়ার বাজারের উপরে যার জোরে আধিপত্য করে। এমন সব অগ্রগ্য শ্রমশিল্পের শাখাতেও এ হলো এক আকস্মিক ও আবশ্যিক মজুরি-বৃদ্ধি। এই মজুরি বৃদ্ধি ঘটল চূড়ান্ত রকম অশুভক্ষণেই। ডাঃ উরে, অধ্যাপক সিনিয়র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্যান্য সরকারী অর্থনৈতিক মুখপাত্রেরা প্রমাণ করলেন [এবং আমাকে বলতেই হবে আমাদের বন্ধু ওয়েস্টনের থেকে অনেক জোরালো যুক্তির জোরেই প্রমাণ করলেন] যে এর ফলে ব্রিটিশ শ্রমশিল্পের অন্তিম দশা উপস্থিত হবে। তাঁরা প্রমাণ করলেন যে এ শুধু সহজ সরল মজুরিবৃদ্ধি নয় বরং এ হচ্ছে মেহনতের নিয়োজিত পরিমাণ হ্রাস-জনিত ও তার ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত মজুরিবৃদ্ধি। তাঁরা জোর দিয়ে বললে যে, যে ১২ নম্বর ঘণ্টাটি (অর্থাৎ, নতুন আইনের ফলে যে এক ঘণ্টা সময়ের শ্রম কমে গেল সেই ঘণ্টাটি- বাংলা অনুবাদক) আপনারা পুঁজিদারের কাছ থেকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন সেইটিই হলো একমাত্র ঘণ্টা যার থেকে সে মুনাফা কামায়। তাঁরা ভয় দেখালেন যে এর ফলে সঞ্চয়-হ্রাস দরবৃদ্ধি, বাজার হাতছাড়া হওয়া ও উৎপাদন-সংকোচন দেখা দেবে, সুতরাং মজুরির উপরে প্রতিক্রিয়া আসবে এবং শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ হবে। এমন কি তাঁরা ম্যাক্সিমিলিয়ান রোক্সপীয়েরের “ঊর্ধ্বতম আইনকে” এর তুলনায় তুচ্ছ ঘটনা বলে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন এবং এক হিসাবে তাঁরা ঠিকই করেছিলেন। এখন দেখা যাক্ ফলাফল কি দাঁড়িয়েছিল। খাটুনির ঘণ্টা, কমে যাওয়া সত্ত্বেও কারখানার মজুরদের মাইনে বেড়ে গায় কারখানার নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়ে, উৎপন্ন সামগ্রীর দর ক্রমাগত পড়তে থাকে, মেহনতের উৎপাদনশক্তির চমৎকার বিকাশ ঘটে, আর পণ্যের বাজারে উত্তরোত্তর এমন শ্রীবৃদ্ধি হয় যা এর আগে কখনও শোনা যায়নি। ১৮৬০ সালে ম্যাঞ্চেস্টারে ‘বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির’ সভায় আমি নিজে মিঃ নিউম্যানকে** এ কথা স্বীকার করতে ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লবের সময়ে জ্যাকোবিন সম্মেলন কর্তৃক ৪৭৬৫ সালে প্রবর্তিত। এই আইনের ফলে পণ্যের দরের নির্দিষ্ট সীমানা ও ঊর্ধ্বতম জয়ী স্থির রাখা হয়।
তিনি বলতে চেয়েছিলেন, মার্কলের পক্ষে এটি হচ্ছে একটি ত্রুটি। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ নিউমার্চের শুনেছি যে তিনি, ডাঃ উরে, সিনিয়র ও অর্থনীতি বিজ্ঞানের অন্যান্য সরকারী প্রবক্তারা ভুল করেছিলেন আর জনসাধারণের সহজবুদ্ধিই ছিল সঠিক। অধ্যাপক ফ্রান্সিস নিউম্যান নয়, মিঃ ডব্লিউ, নিউম্যানের উল্লেখই আমি করছি কারণ মিঃ টমাস টুকের বিখ্যাত গ্রন্থ-যাতে ১৭৯৩ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত দরের ইতিহাসের ধারানুসন্ধান করা হয়েছে-সেই দরের ‘দরের ‘ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক ও সম্পাদক হিসাবে তিনি অর্থনীতি-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছেন। মজুরির অপরিবর্তনীয় পরিমাণ, উৎপাদনের অপরিবর্তনীয় আয়তন, মেহনতের উৎপাদনশক্তির অপরিবর্তনীয় মাত্রা, পুঁজিদারদের অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে আমাদের বন্ধু ওয়েস্টনের অপরিবর্তনীয় ধারণা এবং তাঁর অন্যান্য সমস্ত অপরিবর্তনীয়তা ও চরমকথা যদি ঠিক হয় তবে অধ্যাপক সিনিয়রের ভাবী অমঙ্গল চিন্তাই নির্ভুল হতে আর রবার্ট ওয়েন-১৮১৬ সালেই যিনি খাটুনির সময় বেঁধে দেওয়াকে মজুরশ্রেণীর মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং সাধারণ বিরুদ্ধ-সংস্কারের মুখে দাঁড়িয়ে কার্যক্ষেত্রে তাঁর ‘নিউ ল্যানার্কের কাপড়-কলে নিজের থেকেই তার প্রবর্তনও করেছিলেন-তিনিই ভুল প্রতিপন্ন হতেন।
‘দশ ঘণ্টা বিলের’ প্রবর্তন ও তার ফলে মজুরিবৃদ্ধি যে সময়ে ঘটে ঠিক সেই সময়েই গ্রেট বিটেনে কৃষি-মজুরী সাধারণভাবে বৃদ্ধি পায় কি কারণে তা ঘটে এখানে তার আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। আমার বক্তব্যের সঙ্গে সোজাসুজি সম্পর্কিত না হলেও যাতে আপনারা বিপথে চালিত না হন সেজন্য আমি এই প্রসঙ্গে কিছু গোড়ার কথা বলে নেব।
কোনো লোক যদি হপ্তায় দু শিলিং মজুরী পায় আর তাঁর মজুরী যদি বেড়ে চার শিলিং হয় তার হলে তাঁর মজুরির হার বৃদ্ধি হিসাবে দেখালো এটা একটা মস্ত ব্যাপার মনে হবে, যদিও মজুরির আসল পরিমাণ-সপ্তায় চার শিলিং-তখনও একটা শোচনীয় রকম অল্প, না খেতে পাবার মতো মৎসামান্য ব্যাপারই থাকবে। কাজেই মজুরির হারের গালভরা শতকরা হিসাবেই বিচারে আপনারা নিজেদের ভেসে যেতে দেবেন না। সব সময়েই আপনারা প্রশ্ন তুলবেন গোড়ায় পরিমাণটা ছিল কত? তা ছাড়া এ কথা আপনারা বুঝবেন যে, হপ্তায় ২ শিলিং করে পান এমন দশজন, ৫ শিলিং করে পান এমন পাঁচজন ও ১১ শিলিং করে পান এমন পাঁচজন লোক যদি থাকেন তবে কুড়ি জন লোক মিলে সপ্তাহে পাবেন ১০০ শিলিং বা ৫ পাউন্ড এখন ধরুন যদি তাদের মোট সাপ্তাহিক মজুরির পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগ বেড়ে যায় তা হলে ৫ পাউন্ড বেড়ে দাঁড়াবে ৬ পাউন্ডে। আসলে যদিও দশজনের লেলি একরকমই থাকে, পাঁচজন লোকের একটি দলের মজুরি যদি মাত্র শিলিং থেকে ৬ শিলিং বাড়ে আর পাঁচজনের অন্য দলের মজুরি মাত্র ৫০ শিলিং থেকে ৭০ শিলিং-এ ওঠে, গড়পড়তা হিসাব দেখিয়ে তবু আমরা বলতে পারি যে মজুরির সাধারণ হার শতকরা ২০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্ধেক লোকের অবস্থা কিছুমাত্র উন্নত হচ্ছে না, এক চতুর্থাংশের অবস্থার যৎসামান্যই উন্নতি হচ্ছে আর মাত্র এক-চতুর্থাংশের অবস্থা বাস্তবিকই ভালো হয়ে উঠছে। তবুও গড়ের হিসাবে ঐ কুড়িজন ব্যক্তির মোট মজুরির পরিমাণ বাড়ছে শতকরা বিশভাগ, আর যে-পুঁজি তাঁদের কাজে লাগাচ্ছে তার মোট পরিমাণেরও যে-পণ্য তাঁরা তৈরি করছেন তার দরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হবে ঠিক এমনই যেন তাঁরা সবাই সমানভাবে গড়পড়তা মজুরিবৃদ্ধির ভাগ লয়েছেন। কৃষিমজুরদের ক্ষেত্রে মজুরির মান ইংলন্ড ও স্কটল্যান্ডের ভিন্ন জেলায় বহুলাংশেই বিভিন্ন রকমের হওয়ায় মজুরিবৃদ্ধির ফল তাঁরা গেলেন অত্যন্ত অসমভাবে।
সর্বশোধে, এঐ মজুরিবৃদ্ধি যে-সময়ে ঘটে সেই সময়েই উল্টো ধরনের ২৫০০লি প্রভাব কাজ করছিল-যেমন, রুশযুদ্ধজনিত নতুন ট্যাক্স, আবঙ্গভাবে কৃষিমজুরদের বসতবাড়ীর ধ্বংসসাধন, ইত্যাদি। এই লর্যন্ত ভূমিকা। অতঃপর আমার বক্তব্য বলছি। ১৮৪৯ থেকে ৯ সালের মধ্যে গ্রেট বিটেনে কৃষি-মজুরির গড়পড়তা হার বেড়েছিল
৪০ ভাগ। আমার এই জোর-গলায় বলা সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসাবে আমি আপনাদের কাছে বহু খুঁটিনাটি ব্যাপার পেশ করতে পারতাম কিন্তু বর্তমান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আপনাদের কাছে একটি নীতিনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধের উল্লেখই যথেষ্ট মনে করছি। প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু “কৃষিতে প্রযুক্ত শক্তিসমূহ” এবং স্বর্গত মিঃ জন. সি. মর্টন ১৮৬০ সালে লন্ডনে সোসাইটিতে প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন। স্কটল্যান্ডের ১২টি ও ইংল্যান্ডের ৩৫টি জেলার অধিবাসী প্রায় একশ জন কৃষকের কাছ থেকে তিনি যে-সব বিল ও অন্যান্য প্রামাণ্য দলিল সংগ্রহ করেছিলেন তার থেকেই মিঃ মর্টন হিসাবপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।
আমাদের বন্ধু ওয়েস্টনের মত অনুসারে ও সেইসঙ্গে কারখানা ১৮৫৯ সালের মধ্যেকার যুগে কৃষিজাত সামগ্রীর দর প্রচণ্ডভাবে বাড়া মজুরদের যে মজুরিবৃদ্ধি ঘটেছিল তার হিসাব ধরলে ১৮৪৯ থেকে উচিত ছিল। কিন্তু আসলে ঘটেছিল কি? রুশ যুদ্ধ ও ১৮৫৪ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত পর-পর ফসলের মন্দা সত্ত্বেও ইংলন্ডের কৃষিজাত সামগ্রীর মধ্যে অগ্রগণ্য ফসল গমের গড়পড়তা দর ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৮-এর মধ্যে কোয়াটার পিছু প্রায় ৩ পাউন্ড থেকে ১৮৪৯ থেকে ১৮৫৯-এর ভিতর কোয়ার্টার পিছু প্রায় দু পাউন্ড ১০ শিলিং-এ নোট গিয়েছিল। শতকরা ৪০ ভাগ গড়পড়তা কৃষি-মজুরিবৃদ্ধির সঙ্গে এ হলো শতকরা ১৬ ভাগের বেশি গমের দর হ্রাস। ঐ সময়ের ভিত যদি আমরা ঐ যুগের শেষদিকের সঙ্গে প্রথমদিকের, অর্থাৎ ১৮৫৯-এ ৯৩৪,৪১৯ থেকে কমে গিয়েছিল ৮৬০,৪৭০-এ-পার্থক্যটা ৭৩,৯ সঙ্গে ১৮৪৯-এর যদি তুলনা করি তবে সেই যুগে সরকারী নিঃস্বসংখ্য জনের; আমি মানছি যে হ্রাস খুবই অল্প এবং পরের বছরগুলিতে আম তা বজায়ও থাকেনি কিন্তু তবু তা হ্রাস তো বটেই।
বলা যেতে পারত, শস্য আইন (Corn Laws) বাতিল হবার যা ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৮ সালের তুলনায় ১৮৪৯ থেকে ১৮৫৯-এর তাতেই বা কী? সহকর্মী ওয়েস্টনের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে এই বিদেশী শস্য আমদানীর বহর দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আশা করা স্বাভাবিক যে, বিদেশী বাজারের উপরে এই আকস্মিক, বিপুল ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা সেখানকার কৃষিজাত দ্রব্যের দর নিশ্চয়ই মারাত্মক রকম চড়িয়ে দিয়েছিল-বাইরে থেকেই হোক বা ভিতর থেকেই হোক বর্ধিত চাহিদার ফলাফল তাঁর মতে এক্ষেত্রে একইরকম থেকে যাবার কথা। ঘটল কি? ফসল মন্দার সামান্য কয়েকটি বছর ছাড়া এই গোটা যুগটাতেই শস্যের দরের সর্বনাশা পড়তির ফলে ফরাসী দেশের একটা একটানা চেঁচামেচি শুরু হলো, বারবার মার্কিনদের পোড়াতে হলো রাড়তি মাল, আর মিঃ আরকুহার্টের কথা যদি ঠিক হয়, রাশিয়াও এখন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের প্ররোচনা যোগাচ্ছিল, কারণ ইউরোপের বাজারে তার কৃষি-রপ্তানি পঙ্গু হয়ে পড়েছিল মার্কিন প্রতিযোগিতার চাপে।
সহকর্মী ওয়েস্টনের যুক্তির তত্ত্বগত তত্ত্বগত রূপ দাঁড়ায় এই রকম: লব সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ উৎপাদনের ভিত্তিতেই যে কোনো চাহিদাবৃদ্ধি ঘটে থাকে। সুতরাং তার ফলে কখনও ইপ্সিত সামগ্রীর সরবরাহ বাড়তে পারে না, বাড়তে পারে শুধু তার টাকার অঙ্গে মাপা দরই। এখন সবথেকে মামুলি পর্যবেক্ষণের ফলেও দেখা যায় যে চাহিদাবৃদ্ধি কোনও কোনও ক্ষেত্রে পণ্যের বাজার দরকে একেবারেই অপরিবর্তিত সয়া রাখতে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাজারদর সাময়িকভাবে চড়াবে, গঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ বাড়বে, এবং তারপরে দর আগের পর্যায়ে ও প্রাণেকক্ষেত্রে আগের পর্যায়েরও নিচে নেমে যাবে। বাড়তি মজুরি বা প্রথা যে কোনো কারণের জন্যই চাহিদাবৃদ্ধি ঘটুক না কেন সমস্যার তাতে মোটেই অবস্থান্তর হয় না। সহকর্মী ওয়েস্টনের মত অনুসরণ করতে গেলে মজুরিবৃদ্ধির অনন্যা সাধারণ অবস্থার ফলে উদ্ভুত প্রক্রিয়াকে যেমন ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়, সাধারণ প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যাও একই রকম কঠিন হয়ে নাঁড়ায়। সুতরাং আমরা যে-বিষয় আলোচনা জাপার তার যুক্তির মোটেই কোনও বিশেষ প্রযোজ্যতা নেইটি মে সময়গুলির ফলে চাহিদাবৃদ্ধির দরুন শেষ পর্যন্ত বাজার দর না চড়ে অপয়াই শুধু এতে প্রকাশ পাচ্ছে। পরবয়ায়ই বৃদ্ধি পায় সে-নিয়মগুলির হেতুনির্ণয়ে তাঁর হত চড়ে
৩. মজুরি ও টাকা (Currency)
বিতর্কের দ্বিতীয় দিনে আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন তাঁর পুরনো বক্তব্যগুলি নতুন ছাঁদে সাজালেন। তিনি বললেন: আর্থিক মজুরি সাধারণভাবে বৃদ্ধি পেলে তার ফলে সেই মজুরি দিতে বেশি টাকা লাগবে; যেহেতু টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট সুতরাং সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার সাহায্যে কি করে আপনি বর্ধিত টাকার অঙ্কে মাপা মজুরি দিতে পারবেন? প্রথমে আর্থিক মজুরি বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মজুরদের বরাদ্দ পণ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট বলে বিপত্তি ঘটল; এখন মুক্কিল বাধছে পণ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট হলেও আর্থিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে। অবশ্য তাঁর গোড়ার মনগড়া সিদ্ধান্ত যদি আপনারা বাতিল করেন তা হলে তাঁর পরবর্তী নালিশও দূর হবে। যাই হোক, আমি দেখাব আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে এই টাকার প্রশ্নের কোনো সম্পর্কই নেই।
আপনাদের দেশে টাকাকড়ি দেবার ব্যবস্থা ইউরোপের যে কোনো দেশের চাইতে অনেক বেশি উন্নত। ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার পরিধি ও কেন্দ্রিকতার দরুন সমপরিমাণ মূল্য চলাচলের এবং সমান বা বেশি পরিমাণ ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য অনেক কম টাকা দরকার পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মজুরির দিক থেকে দেখলে, ইংরাজ কারখানা শ্রমিক প্রতি সপ্তাহে দোকানদারদে তার মজুরির টাকা তুলে দেয়, সে আবার প্রতি সপ্তাহে সে টাকা ব্যা মালিককে পাঠায়। সে আবার প্রতি সপ্তাহে শিল্পপতিকে সে টাকা ফেরার দেয়। সে আবার সেই টাকা মজুরদের দেয়-এইভাবে চলে। এ কৌশলের ফলে একজন মজুরের গোটা বছরে মজুরিই (ধরুন ৫ পাউন্ড) এমন একটিমাত্র পাউন্ড-মুদ্রার সাহায্যে দেওয়া চলে যা প্র সপ্তাহে একই চক্রে ঘোরে। এমন কি ইংলন্ডেও এ ব্যবস্থা স্কটল্যাথে মতো উন্নত নয় এবং সর্বত্র সমান উন্নতও নয়; কাজেই আমরা দেখা পাই যে, নিছক শিল্পপ্রধান জেলার তুলনায় কোনো কোনো জেলায় অনেক কম পরিমাণ মূল্য চলাচলের জন্য অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন হয়।
আপনারা যদি চ্যানেলের ওপারে যান তবে দেখবেন টাকার অঙ্কে মাপা মজুরি সেখানে ইংলণ্ডের থেকে অনেক কম, কিন্তু জার্মানী, ইতালী, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সে তা চলাচল করানো হয় অনেক বেশি পরিমাণ টাকার সাহায্যে। একটি পাউন্ড-মুদ্রা সেখানে অত তাড়াতাড়ি ব্যাঙ্কারের হাতে পড়বে না বা শিল্পমালিক পুঁজিদারদের কাছে ফেরত যাবে না; আর সেইসব ক্ষেত্রে তাই একটি পাউন্ড-মুদ্রা বছরে ৫২ পাউন্ড চলাচল করানোর জায়গায় হয়ত ২৫ পাউন্ড চলাচল করাতেই আপনার তিনটি পাউন্ড-মুদ্রার দরকার পড়বে। সুতরাং ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে ইংলন্ডের তুলনা করলে আপনারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারবেন যে টাকার অঙ্কে মাপা বেশি মজুরির চাইতে হয়তো কম মজুরি চলাচল করাতেই অনেক বেশী টাকার প্রয়োজন হতে পারে, আর এটা হচ্ছে আসলে আমাদের বর্তমান আলোচনার সম্পূর্ণ বহির্ভুত একটা কূট ব্যাপার মাত্র।
সব থেকে ভাল হিসাব যা আমার কাছে আছে সে-অনুসারে এই দেশের মজুর-শ্রেণীর বাৎসরিক আয় ২৫ কোটি পাউন্ড বলে ধরা যেতে পারে। এই বিপুল অঙ্কটি চলাচল করা হয় প্রায় ৩০ লক্ষ পাউন্ডের সাহায্যে। ধরুন শতকরা ৫০ ভাগ মজুরী বেড়ে গেল। তা হলে ৩০ লঞ্চ পাউন্ডের জায়গায় ৪৫ লক্ষ পাউন্ড লাগবে। মজুরদের দৈনিক খ্যাচের মস্ত বড় একটা অংশ রূপো ও তামায় অর্থাৎ সোনার সঙ্গে যার আপেক্ষিক মূল্য আইনের দ্বারা মনগড়াভাবে নির্ধারিত হয় এমন নিদর্শন ঘুরাতেই চলে, এইজন্য টাকার অঙ্কে মাপা মজুরি শতকরা ৫০ ভাগ লড়রে চরমক্ষেত্রে, ধরা যাক, পাউন্ড স্বর্ণমুদ্রার ১০ লক্ষ পাউন্ড পরিমাণ বাড়তি চলাচল প্রয়োজন হবে। ব্যাঙ্ক অফ ইংলণ্ড বা বেসরকারী ব্যাঙ্কের জান্ডারে বর্তমানে অমুদ্রিত যে ১০ লক্ষ পাউন্ড সোনার তাল বা মুদ্রা নিস্ক্রিয় হয়ে আছে, তাই তখন চলাচল করতে থাকবে। কিন্তু বাড়তি টাকার অভাবের দরুন কোনো গণ্ডগোল উপস্থিত হলে ঐ দশ লক্ষের কৃষিপ্রণবাড়তি মুদ্রণ বা বাড়তি ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতির সামান্য খরচও এড়ানো দিতে পারে এবং বাস্তবিকই এড়ানো হবে। আপনারা সবাই জানেন যে এ দেশের টাকা দু’টো মস্ত ভাগে বিভক্ত। একটি ধরনের যোগান আসে নানারকমের ব্যাঙ্ক নোট থেকে-ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়ীর লেনদেনের জন্য এবং ক্রেতা ব্যবসায়ীদের মোটা মাপের টাকা দেবার সময়ে এর ব্যবহার হয়। আর এক ধরনের টাকা, ধাতব মুদ্রা, চলে খুচরো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে। স্বতন্ত্র হলেও এই দুই ধরনের টাকা পরস্পরের মধ্যে কাজ করে চলে। তাই বেশি টাকা দেবার সময়েও ৫ পাউন্ডের কম খুচরো অঙ্কের ক্ষেত্রে বহুলাংশেই স্বর্ণমুদ্রা চলে। ধরুন যদি আগামী কাল ৪ পাউন্ড, ৩ পাউন্ড বা ২ পাউন্ডের নোট চালু হয় তাহলে এই সব চলাচলের খাতে যে সোনা চলে তা তখুন সেখান থেকে হটে যাবে এবং আর্থিক মজুরি বাড়ার ফলে প্রয়োজনীয় খাতেই বইতে থাকবে। এইভাবে শতকরা ৫০ ভাগ মজুরিবৃদ্ধির দরুন যে বাড়তি লক্ষ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে-একটি পাউন্ড মুদ্রা না বাড়িয়েও তার যোগান দেওয়া সম্ভব হবে। আবার একটি মাত্র বাড়তি বিল বা হুন্ডি চলাচল মারফত যেমন বেশ কিছু দিন ধরে চলেছিল ল্যাঙ্কাশায়ারে।
সহকর্মী ওয়েস্টন কৃষিমজুরির ক্ষেত্রে যেমন ধরেছেন, মজুরিহার ঐ রকম শতকরা একশ ভাগ সাধারণভাবে বৃদ্ধি পেলে যদি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দর বিপুল পরিমাণে বাড়ে এবং তাঁর মত অনুসারে সেজন্য যদি এমন বাড়তি টাকার দরকার পড়ে যার যোগান মেলে না, তা হলে সাধারণভাবে মজুরি কমে গেলে, উল্টো দিকেও সমমাত্রায় নিশ্চয়ই একই ফল দেখা দেখা যাবে। আচ্ছা। আপনারা সবাই জানেন যে, ১৮৫৮ থেকে ১৮৬০-এই কটা বছর তুলাশিল্পের পক্ষে সবচেয়ে শ্রীবৃদ্ধির বছর ছিল এবং সেই দিক থেকে আশ্চর্য রকম ভাবেই ১৮৬০ সালটি ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাসে অতুলনীয় হয়ে রয়েছে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের অন্য সব শাখাগুলিতেও সে-বছরে খুবই পয়মন্ত অবস্থা ছিল। তুলাশিল্পের মজুর ও তাঁদের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য সমস্ত শিল্পের মজুরদের মজুরি আগের যে কোনো সময়ের চাইতে ১৮৬০ সালে বেশি ছিল। আমেরিকার সংকট এল এবং ঐ মোট মজুরি হঠাৎ আগেকার পরিমাণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেল। উল্টো দিকে হলে (অর্থাৎ মজুরি বাড়লে) এটা হতো শতকরা ৩০০ ভাগ বৃদ্ধি। মজুরি পাঁচ থেকে বেড়ে কুড়ি হলে আমরা বলি যে শতকরা ৩০০ ভাগ বেড়েছে; যদি কুড়ি থেকে কমে তা পাঁচে দাঁড়ায় আমরা বলি শতকরা ৭৫ ভাগ কমেছে, কিন্তু বাড়তির ক্ষেত্রেই হোক আর কমতির ক্ষেত্রেই হোক, (মজুরি বাড়াকমার) পরিমাণ সেই একই অর্থাৎ পনেরো শিলিংই থাকবে। তাই এটা হলো মজুরি হারের এক অভূতপূর্ব ও আকস্মিক পরিবর্তন এবং তুলা ব্যবসায়ে যারা প্রত্যক্ষভাবে নিযুক্ত শুধু তারাই নয়, তার উপরে পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল সমস্ত মজুরের হিসাবে যদি আমরা রাখি তা হলে দেখি যে সে পরিবর্তনের আওতার মধ্যে যত মজুর পড়েছে তাদের সংখ্যা কৃষিমজুরের সংখ্যারও দেড়া। কিন্তু গমের দর কি কমেছিল? ১৮৫৮ থেকে ১৮৬০ সাল এই তিন বছরে ঐ দর কোয়ার্টার-পিছু বাৎসরিক গড়পড়তা ৪৭ শিলিং ৮ পেন্স থেকে ১৮৬১ থেকে ১৮৬৩ এই তিন বছরে কোয়ার্টার-পিছু বাৎসরিক গড়পড়তা ৫৫ শিলিং ১০ পেন্সে বেড়ে উঠল। আর টাকার দিকে, ১৮৬০ সালে যেখানে ৩,৩৭৮,১০২ পাউন্ড মুদ্রা ট্যাকশালে ছাপা হয়েছিল সেখানে ১৮৬১ সালে ৮,৬৭৩,২৩২ পাউন্ড মুদ্রা ছাপা হলো। অর্থাৎ ১৮৬০ জালের থেকে ১৮৬১ সালে ৫,২৯৫,১৩০ পাউন্ড মুদ্রা বেশি ছাপা হলো। এ কথা ঠিক যে ১৮৬০ সালের চেয়ে ১৮৬১ সালে ১,৬১৯,০০০ পাউন্ড ব্যাঙ্ক-নোট কম চক্তি ছিল। সেটা বাদ দিন। তা হলেও ১৮৬০ সালের পয়মন্ত বছরের থেকে ১৮৬১ সালে ৪,৯৭৬,১৩০ পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ৪,০০০,০০০ বেশি টাকা থাকে; কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের সোনার তালের মজুদ ঠিক এত অনুপাতে না হলেও, কাছাকাছি অনুপাতে কমে যায়।
১৮৪২-এর সঙ্গে ১৮৬২ সালের তুলনা করুন। চালু পণ্যের মূল্য পরিমাপের প্রচণ্ড বৃদ্ধি ছাড়াও ১৮৬২ সালে ইংলন্ড ও ওয়েলসের রিলওয়ের শেয়ার, ঋণ ইত্যাদির নিয়মিত লেনদেনের বাবদই শুধু পুঁজি খরচ হয়েছিল ৩২০,০০০,০০০ পাউন্ড; ১৮৪২ সালে এ অংক অবিশ্বাস্য বলে বোধ হতো। তবু মোট টাকার পরিমাণ ১৮৬২ ও ১৮৪২ সালে বেশ সমান সমান ধরনেরই ছিল, এবং শুধু পণ্যই নয়, মোটামুটি সমস্ত রকম টাকাকড়ির লেনদেনের মধ্যেই ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রচণ্ডতা সত্ত্বেও সাধারণভাবে আপনারা টাকার ক্রমিক হ্রাসপ্রাপ্তির লক্ষণই দেখতে পাবেন। আমাদের বন্ধু ওয়েস্টনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ এক দূরতিক্রম্য সমস্যা।
ব্যাপারটাকে আর একটু তলিয়ে দেখলে তিনি বুঝতে পারবেন যে মজুরির কথা একেবারে ছেড়ে দিলেও, তাকে নির্দিষ্ট বলে ধরে নিলেও, যে-পণ্য চলাচল করাতে হবে তার মূল্য ও পরিমাণ এবং সাধারণভাবে যে-সব টাকাকড়ির লেনদেন মেটাতে হয় তার পরিমাণ প্রতিদিনই পরিবর্তিত হয়; যে ব্যাঙ্ক-নোট ছাড়া হয়, তার পরিমাণ প্রতিদিনই বদলায়; কোনো টাকার সাহায্য ছাড়াও, বিল, চেক, খাতাপত্রে ঋণ, নিকাশঘর (ক্লিয়ারিং হাউস) মারফত যে প্রাপ্য মেটানো হয় প্রতিদিনই তার পরিবর্তন হয়; যেক্ষেত্রে আসলে ধাতব মুদ্রার দরকার পড়ে সেক্ষেত্রে যে-মুদ্রা চালু রয়েছে এবং যে-মুদ্রা ও সোনার তাল মজুদ রয়েছে কিংবা ব্যাঙ্কের ভাণ্ডারে নিষ্ক্রিয় রয়েছে তার অনুপাত প্রতিদিন বদলায়; যে জাতীয় লেনদেনে সোনার যে তাল লাগে তার পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য বাইরে যা চালান যায় তার পরিমাণের অনুপাতও রোজই বদলায়। সহকর্মী ওয়েস্টন দেখতে পেতেন যে নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক সম্পর্কে তাঁর গোঁড়ামি হচ্ছে একটা মস্ত ভুল, প্রতিদিনকার অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যের সঙ্গে যার কোনো সঙ্গতিই নেই। টাকাকড়ির নিয়ম সম্পর্কে তাঁর ভ্রান্ত ধারণাকে মজুরিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে একটা যুক্তি হিসাবে খাড়া না করে বরং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে কোন্ নিয়মের বলে টাকার আয়তন নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় তার সম্পর্কেই তিনি যদি অনুসন্ধান চালাতেন তো ভাল হতো।
৪. সরবরাহ ও চাহিদা
আমাদের বন্ধু ওয়েস্টন “রেপেটিশিও এস্ট ম্যাটার স্টুডিওরাম্” অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি হচ্ছে পর্যালোচনার জননী, এই ল্যাটিন প্রবাদ মানেন আর তাই তিনি আবার তাঁর গোড়াকার গোঁড়ামির পুনরাবৃত্তি করেছেন এই নতুন রূপে যে মজুরিবৃদ্ধিজনিত টাকা হ্রাসের ফলে পুঁজিও কমে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। টাকা সম্পর্কে তাঁর নানা উদ্ভট কল্পনা নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই অনেক আলোচনা করেছি; তাই টাকা সম্পর্কিত কাল্পনিক গণ্ডগোল থেকে যে সব কাল্পনিক ফলাফল উৎসারিত হবে বলে তিনি কল্পনা করেছেন সে-নিয়ে আলোচনা আমি সম্পূর্ণ অর্থহীন বলে মনে করি। নানা রকমফেরের ভিতর দিয়ে তাঁর যে একটিমাত্র গোঁড়ামিই ফিরে ফিরে এসেছে আমি কালক্ষেপ না করে সেই গোঁড়ামিকে তার সব থেকে সহজ তত্ত্বগত রূপে পর্যবসতি করব।
একটিমাত্র মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাবে কি রকম সমালোচনাহীন মনোভাব নিয়ে তিনি বিষয়টিতে হাত দিয়েছেন। তিনি ওকালতি করেছেন মজুরিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বা ঐ বৃদ্ধিজনিত উচ্চ মজুরির বিরুদ্ধে। আমি এখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করি-বেশি মজুরি আর কম মজুরি বলতে তিনি কি বোঝেন। হপ্তায় পাঁচ শিলিং মজুরি কেন কম ও বিশ শিলিং মজুরিই বা দেশি কেন? বিশের তুলনায় পাঁচ যদি কম হয় তবে দু’শর তুলনায় বিগ তো আরো কম। তাপমান যন্ত্রের সম্পর্কে যদি কাউকে বক্তৃতা করতে হয় আর তিনি যদি বেশি ও কম ডিগ্রি নিয়ে গলাবাজি শুরু কারেন তবে কোনও জ্ঞানই তিনি বিতরণ করবেন না। তাঁকে আমায় গড়াতেই বলতে হবে কি করে সেই তাপাঙ্ক বার করতে হয় যেখানে নিছিলে জল জমে বরফ হয় কিংবা ফুটে বাষ্প হয় আর কিভাবে সালমানযন্ত্রের বিক্রেতা বা প্রস্তুতকারকের খামখেয়ালের দ্বারা নয়, গোড়তিক নিয়মের দ্বারাই ঐ নির্দিষ্ট তাপমানগুলি স্থির হয়। এখন মজুরি মুনাফার বাপারে সহকর্মী ওয়েস্টন যে শুধু অর্থনৈতিক নিয়ম থেকে ৪. এনয়ের নির্দিষ্ট মান বার করতেই ব্যর্থ হয়েছেন তাই নয়, সেগুলি……………….
@সংগৃহীত
@freemang2001gmail-com



