Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই–সীতারাম ইয়েচুরী।

পার্টির সংগঠনকে শক্তিশালী করার বিষয়টি কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এমন একটি বিষয় যেদিকে একটি বিপ্লবী পার্টির প্রতিমুহূর্তে নজর দেওয়া। বলাই বাহুল্য, কোনও এক সুনির্দিষ্ট সময়ের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পার্টি তার কর্তব্য স্থির করে, দিকনির্দেশ করে- তা থাকে তার রাজনৈতিক রণকৌশলগত লাইনে এবং তার থেকেই ঠিক হয় পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো কীরকম হবে, পার্টির অগ্রাধিকার কী হবে। একদিকে যেমন শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনের পক্ষে তার প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি ও কার্যপদ্ধতির প্রতি কঠোরভাবে বিশ্বস্ত থাকা দরকার, একইসঙ্গে বর্তমান কর্তব্য পালনে পার্টির সর্বস্তরকে অবশ্যই সক্রিয় করার ক্ষমতা রাখে এমনই হতে হবে পার্টি সংগঠনকে। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন হলো এক গতিশীল সত্ত্বা।

আমরা, বহু দশক ধরে লেনিনের সেই বিচারসিদ্ধান্তকে বারে বারে উচ্চারণ করে আসছি- তিনি বলেছিলেন, “সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণই হলো দ্বন্দ্বত্বত্বের সজীব মর্মবস্তু।” এর অনেকগুলি দিক আছে। প্রথমত সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে শ্রেণীসংগ্রাম ও বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতির উপর এই পরিস্থিতির প্রভাব কতটা পড়বে তার যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার। বলাই বাহুল্য একমাত্র মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণে পৌঁছান সম্ভব। সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির যথাযথ পরীক্ষা এবং তারই ভিত্তিতে সঠিক নির্ণয় এই দুটো দিকই হলো সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক নির্ণয় করতে যদি ভুল বা ত্রুটি হয়, সেক্ষেত্রে তার ভিত্তিতে যে বিশ্লেষণ করা হবে তা যে ত্রুটিপূর্ণ হবে এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে নির্ণয় করার পর যে মূল্যায়ন করা হবে, তা করতে হবে বৈজ্ঞানিক বস্তুগত ভিত্তিতে এবং কোনরকম মনগড়া ধারণার প্রভাব অথবা আগে থেকে ঠিক করে রাখা বিবেচনা ছাড়াই। সুতরাং লেনিনীয় বিচারসিদ্ধান্তকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে গেলে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক মার্কসবাদী কার্যপদ্ধতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বিংশ শতাব্দীর সবকটি সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস একথাই দেখিয়ে দিচ্ছে যেসব কমিউনিস্ট পার্টি এইসব বিপ্লবকে জয়ী করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে যাকে বলে “মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই”-এ নিয়োজিত ছিল। এ হলো কমিউনিস্ট পার্টিগুলির অভ্যন্তরে এক চলামান সংগ্রাম এবং প্রতিটি কমিউনিস্টের ব্যক্তি সচেতনতার স্তরেও এই প্রক্রিয়া চলছে এবং আরো অনেক কারণের সঙ্গে এই বিষয়টিও ঠিক করে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সক্ষমতার জোর কতটা আছে।

স্বাভাবিকভাবেই সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির যদি ভুল মূল্যায়ন হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক লাইন, কৌশলগত লাইনও ভুল হবে। এমনকি যদি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে একটি সঠিক রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইন ঠিক হয়, তার বাস্তবে প্রয়োগ নির্ভর করে সংগঠনের ক্ষমতার উপর। স্তালিনের সেই বিখ্যাত কথা, রাজনৈতিক লাইন হয়ত ১০০ শতাংশে সঠিক, কিন্তু তা অর্থহীন হয়ে যায় সেই সঠিক রাজনৈতিক লাইনকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সংগঠনের না থাকে। সুতরাং জনসাধারণের চেতনাবৃদ্ধির জন্য ও বিপ্লবী গণজাগরণের জন্য তাদের প্রস্তুত করতে পার্টি যে কাজ করে তাতে পার্টি সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। পার্টি সংগঠনের বিভিন্ন দিক আছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মনগড়া ধারণার যে প্রবণতা তার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করা, এই সংগ্রাম চলে দুটো দিকেই অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নির্ণয়ে এবং সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণে। এবং তারই ভিত্তিতে জনসাধারণকে আরো বেশি বেশি সমবেত করে শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করা হয়।

মোদ্দা কথা হলো, সুনির্দিষ্ট সঠিক বোঝাপড়ার জন্য, শ্রেণীসংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সঠিক রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনের বিবর্তনে, লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশে সঠিক সাংগঠনিক কার্যপদ্ধতি প্রয়োগের জন্য মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করাটা অপরিহার্য। সর্বস্তরেই মনগড়া ধারণা বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

মনগড়া ধারণা, অধ্যয়নের ভ্রান্ত পদ্ধতি

চীন বিপ্লবের সময়কালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় স্কুলের উদ্বোধনে মাও জে দত্ত বলেছিলেন,                  

“অধ্যয়নের ক্ষেত্রে মনগড়া ধারণা নিয়ে চলা হলো এক ভ্রান্ত পদ্ধতি; এই পদ্ধতি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধী এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বেমানান। আমরা যেটা চাই তা হলো মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পদ্ধতিতে অধ্যয়ন। এই পদ্ধতিতে অধ্যয়ন মানে শুধু পার্টি স্কুলের অধ্যয়ন নয়, গোটা পার্টিতে তা চাইছি। এ হলো নেতৃস্থানীয় পদে থাকা কমরেডদের, পার্টির সমস্ত ক্যাডার ও পার্টি সদস্যদের চিন্তা পদ্ধতির প্রশ্ন, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আমরা কী চোখে দেখি তার প্রশ্ন, প্রতিটি পার্টি কমরেড তাদের নিজেদের কাজকে কী ভাবে দেখে তার প্রশ্ন। সত্যি কথা বলতে কি এ হলো অতীব এবং একেবারে গোড়ার পর্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

“পার্টিস্কুলে আমাদের কমরেডরা যে মার্কসবাদী তত্ত্বকে প্রাণহীন আপ্তবাক্য মনে না করেন। মার্কসবাদী তত্ত্বকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করা দরকার ও তার প্রয়োগ করা দরকার, আয়ত্ত করার উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো প্রয়োগ করার জন্য। আপনি যদি দু’একটি বাস্তব সমস্যার ব্যাখ্যায় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োগ করেন, তবে আপনি প্রশংসিত হবেন এবং কিছু সাফল্য অর্জন করতে পারবেন। আপনি যত সমস্যা ব্যাখ্যা করবেন, যত বেশি সামগ্রিকভাবে ও গভীরভাবে করবেন, তত আপনার সাফল্য আসবে। আমাদের পার্টি স্কুলের ছাত্ররা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন করার পর তারা চীনের সমস্যাকে কীভাবে দেখছে, তারা সমস্যাগুলি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে না আদৌ কিছুই বুঝতে পারছে না- সেটা দিয়ে বিচার করে ছাত্রদের ভাল অথবা খারাপ গ্রেড দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। (মাও সে তুঙ সিলেক্টেড ওয়ার্কস ভলিউম-৩, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৮)

এখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে মার্কসবাদের দার্শনিক শিক্ষা এবং সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছানোর লেনিনবাদী শিক্ষার দুটো দিকই মাও গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে সব ধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সফল হওয়ার জন্য। ‘হেগেলের যুক্তিবিজ্ঞানের সারসংক্ষেপ’ ‘(Conspectus of Hegel’s Sci-ence of Logic)’ শীর্ষক রচনায় লেনিন তাত্ত্বিক আলোচনা করতে গিয়ে মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে বিশেষ করে “অভিজ্ঞতার তথ্য একতরফা গ্রহণ” করার বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলেছেন।

 লেনিন বলছেন, “অনুমান ও তত্ত্বকে দাঁড় করানোর জন্য অনস্বীকার্য অভিজ্ঞতাকে সুনির্দিষ্ট সামগ্রিকতার প্রেক্ষিতে না দেখে উদাহরণ হিসাবে দেখানো হয়। ফলে সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা আগে থেকে মনগড়া সিদ্ধান্তের তলায় চাপা পড়ে যায়, তত্ত্বের ভিত্তি যায় হারিয়ে এবং শুধুমাত্র তত্ত্বের সঙ্গে যা খাপ খাচ্ছে সেটুকুই দেখতে পাওয়া যায়।” (ভি আই লেনিন, কালেকটেড ওয়ার্কস, ভলিউম ৩৮ ফিলসফিকাল নোট বুকস্, পৃষ্ঠা ২১০)।

সি পি আই (এম)-র প্রতিষ্ঠা- ভারতীয় পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন ভারতের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এই বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের মধ্য দিয়েই সি পি আই (এম) প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়। ২০তম কংগ্রেসের ‘কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব’-এ বলা হয়েছে, “ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) তৈরি হয় সংশোধনবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তীব্র এক লড়াইয়ের ভিত্তিতে, যে বিচ্যুতি গ্রাস করেছিল তৎকালীন অবিভক্ত সি পি আই’কে, বিপথে চালিত হবার গুরুতর বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছিল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এবং ফলত, আমাদের জনগণের মুক্তিলাভকে। ভারতীয় বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের প্রশ্নকে এবং ভারতের শাসকশ্রেণীগুলির গঠন ও চরিত্র সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়নকে ঘিরে তীব্র অন্তঃপার্টি মতাদর্শগত সংগ্রামের পরে সংশোধনবাদ থেকে নির্ণায়কভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে সি পি আই (এম)-এর আবির্ভাব হল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈপ্লবিক সূত্রগুলিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে এবং ভারতের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে প্রয়োগ করার সংকল্প নিয়ে।

এর ঠিক পরেই হঠকারী বাম-সংকীর্ণতাবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সি পি আই (এম)-কে লড়তে হয়, সেই প্রবণতাকে মতাদর্শগতভাবে মোকাবিলা করতে হয়, যা আবার ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পথচ্যুত করার বিপদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। এই মতাদর্শগত সংগ্রামের সময়েই হিংস্র শারীরিক আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়, তাকে অতিক্রম করতে হয়, আমাদের অনেক কমরেড শহীদ হন।

এইসব বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের সাফল্য এবং ভারতীয় জনগণের গৌরবজনক জঙ্গি সংগ্রামগুলির উত্তরাধিকারের সংমিশ্রণে (১) সি পি আই (এম) দেশের সব সবচেয়ে শক্তিশালী ও অগ্রণী বামপন্থী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত য়। এতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, এইসব মতাদর্শগত সংগ্রামে আমাদের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী অবস্থান ছিল সঠিক। হয়।

মতাদর্শগত বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সি পি আই (এম)-এর সংগ্রামের এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের বৈপ্লবিক মর্মবস্তুকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার একনিষ্ঠ প্রয়াসের ভিত্তি ছিল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আবির্ভুত সব ধরনের বিচ্যুতির ধারাবাহিক বিরোধিতা, যার জন্য তৎকালীন দুই বৃহৎ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট শক্তির সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টি- উভয়ের সঙ্গেই মতাদর্শগত সংঘাতে যেতে হয়েছে। এই মতাদর্শগত সংগ্রামই আমাদের পাটিকে ইস্পাতদৃঢ় করেছে। তার ফলে আমরা কেবল সবচেয়ে শক্তিশালী কমিউনিস্ট ও বামপন্থী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছি তাই নয়, ভারতের জাতীয় রাজনীতির ধারায় চাপ তৈরির ও প্রভাব ফেলার কাজে সক্ষম হয়ে উঠেছি।” কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব, প্যারা ১.৫ থেকে ১.৮ ২০তম কংগ্রেস, সি পি আই (এম) কোজিকোড়, কেরালা, এপ্রিল ৪-৯, ২০১২

ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে বিচ্যুতি, তার পিছনে অনেক কারণ আছে, তার মধ্যে একটি হলো ভারতীয় বিপ্লবের স্তর, স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে শাসকশ্রেণীর চরিত্র, বিকল্প শাসকশ্রেণীগুলির গঠনবৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে আগে থেকে মনগড়া ধারণা নিয়ে চলা, যার সঙ্গে আমাদের দেশের তৎকালীন সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির কোনও মিল ছিল না।

রুশ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

রুশ বিপ্লব চলাকালীন এই ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে লেনিনকে লড়াই করতে হয়েছিল। তাঁর লেখা “শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে বিভিন্ন প্রবণতার শক্তি সম্পর্কে বাস্তব তথ্য” (Objective data on the strength of various trends in the working class movements) শীর্ষক রচনায় লেনিন প্লেখানভ ও ট্রটস্কি উভয়ের মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে লিখেছেন,

 “প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁরা তাঁদের নিজেদের বাসনা, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী, পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের বিশ্লেষণ এবং তাঁদের নিজেদের পরিকল্পনাকে শ্রমিকশ্রেণীর ইচ্ছা, শ্রমিক আন্দোলনের প্রয়োজন বলে চালিয়েছেন।” (ভি আই লেনিন, কালেকটেড ওয়ার্কস, ভলিউম ২০, ডিসেম্বর ১৯১৩- আগস্ট ১৯১৪, পৃঃ ৩৮২)

প্রকৃতপক্ষে লেনিন বিপ্লবের স্তর সম্পর্কে যে তাত্ত্বিক অবতারণা করেছেন, তা তৈরি হয়েছিল সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির বস্তুগত পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। তাঁর ‘Letter of tactics’ বা ‘কৌশলগত বিষয় সম্পর্কে চিঠি’ শীর্ষক রচনায় রুশ বিপ্লবী আন্দোলনের অভ্যন্তরে শ্রেণীবিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন “আমরা কি মনগড়া ধারণার মধ্যে গিয়ে পড়ার মত বিপজ্জনক অবস্থায় নেই, আমরা কি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে ‘এড়িয়ে’ গিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পৌঁছতে চাইছি না, যে বিপ্লব এখনও সম্পূর্ণ হয়নি এবং এখনও কৃষক আন্দোলনকে নিঃশেষিত করে দেয়নি?” (লেনিন, কালেকটেড ওয়াকর্স, ভলিউম ২৪, পৃঃ ৪৮)

আমরা যখন সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছি- তখন দেখা যাক লেনিন যা বলেছেন তার প্রাসঙ্গিকতা কতটা। আগেই বলা হয়েছে, মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই হলো এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। এমন এক একটা সময় আসে যখন আমরা পরিস্থিতির যথাযথ বস্তুগত মূল্যায়ন করার পরিবর্তে সেই পরিস্থিতিকে আমাদের আগে থেকে মনগড়া তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চাই। এর ফলে কখনও কখনও আমরা ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাই।

মনগড়া ধারণা, আমাদের অভিজ্ঞতার কিছু উদাহরণ এইরকম ভ্রান্তির অনেক উদাহরণ আছে। যেমন উদাহরণ হিসাবে ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে ভারত মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশ্নে সমর্থন প্রত্যাহার এবং পরবর্তী নির্বাচনী কৌশলের প্রশ্নে পার্টির যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর কেন্দ্রীয় কমিটি যে নির্বাচনী পর্যালোচনা করেছিল তারই পুনরুক্তি করে ২০১২ সালের এপ্রিলে ২০তম কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, “সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ২০০৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বরেই কার্যকর করা উচিত ছিল, যখন সরকার IAEA-এর সঙ্গে আলোচনার জন্য গিয়েছিল। তখনই সুযোগ ছিল এই চুক্তিকে আটকে দেবার। সেই সময়ে তা না করাটা ভুল হয়েছে। ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোটের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতৃত্বের যে গভীর দায়বদ্ধতা ছিল, তার ফলে তাঁরা পারমাণবিক চুক্তিকে বাতিল করার পরিবর্তে বামপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাই পছন্দ করেছিলেন। মার্কিন সামাজ্যবাদ ও দেশের শাসকশ্রেণি কৌশলগত জোটের অংশ হিসাবে পারমাণবিক চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাদের সংকল্পবদ্ধতা ও ক্ষমতাকে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটি ছোট করে দেখেছিল। আমরা আমাদের নিজেদের শক্তি ও ঘটনাক্রমকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেখেছিলাম। সরকারকে আই এ ই এ-তে আলোচনার জন্য যেতে দেওয়া এবং কংগ্রেস ঐ চুক্তি বাস্তবায়িত করবে না এই বোঝাপড়া মেনে চলবে এমনটা আশা করাই ভুল হয়েছিল।” (রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট, ২০তম কংগ্রেস, সি পি আই (এম), কোজিকোড় কেরালা, এপ্রিল-৪-৯, ২০১২) একইভাবে সেই সময়ে যে নির্বাচনী কৌশল ও নির্বাচনী রণকৌশলগত

লাইন গ্রহণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচনী পর্যালোচনার ভিত্তিতে ২০তম কংগ্রেসের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, “পর্যালোচনা দুটি কারণকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে। প্রথমত তিন অথবা চারটি রাজ্যে অকংগ্রেসী ধর্মনিরপেক্ষ দলের সঙ্গে চুক্তি কখনও জাতীয় স্তরে নির্বাচনী বিকল্পের ভিত্তি হতে পারে না। দ্বিতীয়ত “বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার” গঠনের আহ্বান জানানো আমাদের দিক থেকে সঠিক হয়নি, বরং অকংগ্রেসী অবিজেপি বিকল্পকে শক্তিশালী করার আহ্বানেই স্থিত থাকা উচিৎ ছিল।” (রাজ্যনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট, ২০তম কংগ্রেস, সি পি আই (এম), কোজিকোড়, কেরালা, এপ্রিল-৪-৯, ২০১২)

আরেকটি উদাহরণ দেখা যাক। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পার্টি কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর মোটর গাড়ি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তৈরির ঘোষণায় যে ভুল এবং সমস্যা যথাযথভাবে না সামলানোর দিকটি আত্মসমালোচনার দৃষ্টিতে স্বীকার করেছিল। সেটাই পশ্চিমবঙ্গে প্রথম জমি অধিগ্রহণের উদাহরণ ছিল না এবং শেষ জমি অধিগ্রহণও নয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের আগে সি পি আই (এম) ও বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে যে সর্বাঙ্গীণ হোমওয়ার্ক করে থাকে অর্থাৎ সকল জমি মালিকদের সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি আলোচনা করে উভয়ের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি মীমাংসা করা, সিঙ্গুরে তা করা হয়নি। সিঙ্গুরে যে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, তার অন্যতম বড় কারণ হলো যে ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আমরা ২৯৪টির মধ্যে ২৩৫ টি আসন পেয়েছিলাম। মোট প্রদত্ত ভোটের ৫০.১৮ শতাংশ ভোট বামফ্রন্ট পেয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে ঐ ভোট হয়েছিল প্রধানত ব্যাপক শিল্পায়নের প্রশ্নে এবং সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরে চিরাচরিত হোমওয়ার্ক করেনি এই ধারণায় যে আমরা বিপুল জয় পেয়েছি এবং জনসাধারণ প্রস্তাবিত শিল্পায়ন কর্মসূচীকে অনুমোদন করেছে।

যদিও, লেনিনের কথামত আমরা বাস্তবতার শুধু একটা দিক দেখেছিলাম। অপর দিকটি হলো এই যে ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় সি পি আই (এম)-র ভোট ৩৮.৫৭ শতাংশ থেকে কমে ২০০৬-র বিধানসভা নির্বাচনে হয়েছিল ৩৭.১৩ শতাংশ। সুতরাং যেখানে আমরা বিধানসভায় প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসন পেয়েছিলাম, ভোটের শতাংশ বিচারে আমাদের ভোট সামান্য কমেছিল। যদি আমরা সঠিকভাবে এর তাৎপর্য ধরতে পারতাম, তবে সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের আগে সর্বাঙ্গীণ হোমওয়ার্ক করার কাজটি গুরুত্ব পেত। দুভাগ্যবশত এই দিকটি নজর এড়িয়ে গেছে। প্রকৃত বাস্তবতাকে সামগ্রিকভাবে না দেখার পাশপাশি আমরা আরও কিছু ভুল করেছিলাম, যার ফলে জনগণের থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা বহুলাংশে বেড়ে যায়।

এ ছাড়াও আঞ্চলিক ও জাতীয়স্তরের অন্যান্য কারণে সি পি আই (এম) ও বামফ্রন্ট তুলনামূলকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়ে। এর পরবর্তীকালে সকল বিরোধী দলগুলি তা সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি থেকে মাওবাদী সকলেই তাদের হিংসার রাজনীতি সঙ্গে করে নীতিহীন জোট গড়ে তোলে ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এবং ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে, যার ফলে পার্টির পক্ষে এক বিরাট নির্বাচনী বিপর্যয় হয়। ২০১১ সালের নির্বাচনে একদিকে বামফ্রন্ট ও অন্যদিকে গোটা বিরোধীপক্ষের সম্মিলিত প্রাপ্ত ভোট প্রায় কাছাকাছি হলেও বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের অনেকগুলি আসন হারাতে হয়।

তাই, জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যে ভুলত্রুটি হয়েছিল, তার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টি কংগ্রেস আত্মসমালোচনার দৃষ্টিতে বলেছে যে “বাস্তবতার একদিক দেখা”র ফলে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল।

আগে থেকে মনগড়া সিদ্ধান্তর পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার ভিত্তিতে বস্তুগত মূল্যায়নে পৌঁছানো হলো পার্টি সংগঠনের সক্ষমতা তৈরি ও পার্টির বর্তমান কর্তব্য পালনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু উদাহরণ

যদিও পরিপ্রেক্ষিত ও সময় অনেকটাই আলাদা, তবু চীন বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কিছু মূল্যবান শিক্ষা নিতে পারি। বেজিঙের পিপলস পাবলিশিং হাউসের সম্পাদকমণ্ডলী যারা মাও জে দণ্ডের নির্বাচিত সংকলন করেছিল, তারা “অনুশীলন সম্পর্কে” শীর্ষক মাওয়ের বক্তৃতা ছাপতে গিয়ে যে নোটটি দিয়েছিলেন, “আমাদের পার্টির মধ্যে কিছু মতান্ধ কমরেড ছিলেন যাঁরা দীর্ঘদিন যাবৎ চীন বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বর্জন করেছিলেন। এঁরা এই সত্যকে অস্বীকার করতেন যে মার্কসবাদ একটা অন্ধ মতবাদ নয় বরং কর্মের পথনির্দেশক” এবং মার্কসীয় রচনাবলী থেকে অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে ভয় দেখাতেন। আবার কিছু অভিজ্ঞতাবাদী কমরেডও ছিলেন যাঁরা দীর্ঘকাল নিজেদের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ করে রাখতেন এবং বিপ্লবী অনুশীলনের জন্য তত্ত্বের গুরুত্ব বুঝতেন না, বিপ্লবকে সমগ্রভাবে দেখতেন না, এঁরা অধ্যাবসায়ের সঙ্গে হলেও অন্ধের মত কাজ করতেন। এই দুই ধরনের কমরেডদের ভুল চিন্তা, বিশেষ করে মতান্ধদের ভুল চিন্তা ১৯৩১-৩৪ সালে চীনা বিপ্লবের বিপুল ক্ষতিসাধন করে এবং তৎসত্ত্বেও মতান্ধরা নিজেদের মার্কসবাদী পোশাকে সজ্জিত করে বহু সংখক কমরেডকে বিভ্রান্ত করে। কমরেড মাও সে তুঙ “অনুশীলন সম্পর্কে” প্রবন্ধটি রচনা করেছিলেন মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পার্টিতে মতান্ধতা এবং অভিজ্ঞতাবাদের আত্মমুখী ভুলগুলি এবং বিশেষ করে মতান্ধতার ভুল খুলে ধরার জন্য। প্রবন্ধটির নামকরণ “অনুশীলন সম্পর্কে” করা হয়। একসাথে মতান্ধরা অনুশীলনকে ছোট করে দেখে, আর ঐ মতান্ধতার আত্মমুখীতা খুলে ধরার ওপর এই প্রবন্ধে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ঐ প্রবন্ধটির ভাবধারা কমরেড মাও সে তুঙ ইয়েনানে জাপ-বিরোধী সামরিক ও রাজনৈতিক কলেজে প্রদত্ত একটি বক্তৃতায় উপস্থিত করেছিলেন।”

পার্টি কমরেডরা কীভাবে মনগড়া বিবেচনার শিকার না হয়ে বরং তার থেকে উদ্ধার পেতে কাজ করবে সে বিষয়ে মাও এক্ষেত্রে বলেছিলেন, “কোন মানুষ যদি তার কাজে সাফল্য পেতে চায় অর্থাৎ সম্ভাব্য ফলাফল অর্জন করতে চায়, তবে তাকে তার নিজের চিন্তাধারাকে বস্তুগত বর্হিজগতের নিয়মের সঙ্গে অতি অবশ্যই সম্পর্কযুক্ত করতে হবে; তা যদি সম্পর্কযুক্ত না হয় তবে সে প্রয়োগে ব্যর্থ হবে। ব্যর্থতার পর, সে শিক্ষাগ্রহণ করে, নিজের চিন্তাধারাকে সংশোধন করে বর্হিজগতের নিয়মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে এবং তারপর ব্যর্থতাকে সাফল্যয় পর্যবসিত করেন, তাই একথা বলা হয়ে থাকে যে, “ব্যর্থতাই হলো সাফল্যের জন্মদাত্রী” এবং “গড্ডায় পড়লেই বুদ্ধি খোলে” (মাও সে তুঙ, সিলেক্টেট ওয়ার্কস ভলিউম ১, পৃষ্ঠা ২৯৬-২৯৭)

এখানে কমরেড মাও ‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করেছেন। পার্টির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কমরেডরা হয়তো ভুল করতে পারেন। ভুল করাটা কোন ভুল নয়, কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়াটা ভুল: নতুন করে যাতে ভুল না হয় তা ঠেকাতে আগের ভুল কেন হয়েছিল তা বোঝার চেষ্টা না করাটা হলো আরেকবার ভুল করা। শেষ কথা এই যে ভুল না শোধরানো এবং ভুল বোঝাপড়ার ভিত্তিকে আঁকড়ে থাকাটা ভুল। স্তালিনের সেই বিখ্যাত উক্তি ছিল একমাত্র যে কমরেডরা কোনরকম কাজ করে না, তারাই কোন ভুল করে না। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কমিউনিস্টরা হয়তো ভুল করতে পারে, আসল কথাটা হলো সেটা সংশোধন করা হচ্ছে কিনা এবং এমন ব্যবস্থা করা যাতে বারে বারে সেই ভুল না হয়।

এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে একজন কমরেড যেন তাঁর উপর দায়িত্ব পালনের জন্য অবশ্যই পুরোদস্তুর প্রস্তুত থাকেন। অনেকটা একই প্রসঙ্গে মাও বলছেন, “আমি নিশ্চিত নই এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারব কিনা” কখনও কখনও আমরা কোনও কমরেডকে একথা বলতে শুনি যখন তিনি দায়িত্ব নিতে দোনামোনা করেন। তিনি কেন আত্মবিশ্বাসী নন? তার কারণ যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হচ্ছে তার উপাদান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর সম্যক বোঝাপড়া নেই অথবা সেই কাজের সঙ্গে তাঁর সামান্য সম্পর্ক আছে অথবা কোন সম্পর্ক নেই, সুতরাং সেই কাজের যা নিয়ম তা তাঁর আয়ত্বের বাইরে। তিনি যদি কাজের চরিত্র ও পরিস্থিতির বিস্তৃত বিশ্লেষণ করেন, তাহলে তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন এবং কাজটি স্বেচ্ছায় করবেন। তিনি যদি কাজটার পিছনে কিছু সময় দেন এবং কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং তিনি যদি এমন ব্যক্তি হন যিনি খোলামনে বিষয়টিকে দেখেন, সমস্যাটিকে মনগড়া ধারণার ভিত্তিতে, একতরফাভাবে এবং ওপর ওপর না দেখেন, তাহলে কাজটি কীভাবে করা যাবে সে বিষয়ে নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন এবং আরও সাহসের সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করবেন। একমাত্র যারা সমস্যা সম্পর্কে মনগড়া, একতরফা, ওপর ওপর চিন্তা করে এবং তারাই ঘটনাস্থলে আসামাত্রই নির্বোধের মতো অর্ডার করে অথবা নির্দেশ জারি করে, পরিস্থিতি বিচার করে না, সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে দেখে না (সমস্যার অতীত এবং সামগ্রিক বর্তমান পরিস্থিতি), সমস্যার গভীরে যায় না (সমস্যাটির চরিত্র এবং একটির সঙ্গে অন্যটির আন্তঃসম্পর্ক)। এইসব ব্যক্তি হোঁচট খেতে এবং পড়ে যেতে বাধ্য।” (মাও সে তুঙ, সিলেক্টেড ওয়াকর্স, ভলিউম ১, পৃঃ ৩০২)

এর থেকে বোঝা যাচ্ছে একজন ব্যক্তি কমরেডের দক্ষতার উপরও নির্ভর করছে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির যথাযথ পরীক্ষা হবে কিনা। এজন্য সেই কমরেডকে যেমন পার্টির সাংগঠনিক ক্লাস ও শিক্ষায় যোগ দিতে হবে তেমনই ধারাবাহিকভাবে আত্মশিক্ষায় মন দিতে হবে। সেই সঙ্গে এ হল একজন কমরেডের পক্ষে এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। এটা না করলে তিনি বর্তমানে যে দায়িত্ব তাঁর উপর দেয়া আছে তা তিনি সম্পন্ন করতে পারবেন না।

জনগণের থেকে শেখো

লিও শাও চি তাঁর পার্টি সংবিধানের সংশোধন সংক্রান্ত রিপোর্টে যা পরবর্তীকালে “পার্টি প্রসঙ্গে” নামক পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে তিনি বলেছিলেন, “জনগণ নিজেই তার ইতিহাস তৈরি করে। অবশ্যই জনগণের নিজস্ব চেতনা ও ইচ্ছাই হবে তাদের মুক্তির ভিত্তি। জনগণ নিজেরাই নিজেদের অগ্রবর্তী বাহিনী ঠিক করে, তাদের নেতৃত্বে নিজেদের সংগঠিত করে এবং নিজেদের মুক্তির জন্য লড়াই করে। একমাত্র এইভাবেই তারা সচেতন প্রচেষ্টার দ্বারা নিজেদের সংগ্রামের সাফল্যকে অর্জন করে, রক্ষা করে ও সংহত করে। জনগণের শত্রুকে একমাত্র জনগণ নিজেরোই উৎখাত করতে পারে। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। জনসাধারণের সত্যিকারের সচেতনতা, তাদের সমাবেশ ছাড়া শুধু অগ্রবর্তী বাহিনীর একক চেষ্টা দিয়ে জনগণের পক্ষে মুক্তি অর্জন করা, অগ্রগতি ঘটানো কোনো কিছু সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। যদি জনসাধারণ স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে নিজেরা দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে না নেয় এবং অন্যেরা তা সংগঠিত করে তাদের উপর চাপিয়ে দেয় তাহলে এমনকি খাজনা অথবা সুদ হ্রাস, অথবা শ্রম বিনিময় টিম, সমবায় তৈরির মতো জনগণের আশু স্বার্থের বিষয়গুলিও মেকি, আনুষ্ঠানিক শূন্যগর্ভে পরিণত হয়।”

“কমিউনিস্টদের স্বার্থ হল জনগণের স্বার্থ। আমাদের কর্মসূচী ও রাজনীতি যতই সঠিক হোক না কেন, তা জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও ধারাবাহিক সংগ্রাম ছাড়া কার্যকর করা যাবে না। জনসাধারণের সচেতন ও স্বেচ্ছামূলক কার্যক্রমের দ্বারা যদি সবকিছু নির্ভরশীল ও নির্ধারিত না হয় তবে আমরা কিছুই অর্জন করতে পারব না এবং আমাদের সকল প্রচেষ্টা কোনো কাজে আসবে না। জনসাধারণের রাজনৈতিক চেতনার উপর এবং তাদের কাজে নামার প্রতি আগ্রহে আস্থা রাখা, তাদের সত্যিকারের জাগরণ ও সমাবেশ এবং তার সঙ্গে পার্টির সঠিক নেতৃত্ব, যদি থাকে তাহলে আমরা পার্টির মহান আদর্শের সকল দিকেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারি। সুতরাং জনসাধারণ যতদিন না সম্পূর্ণ সচেতন হচ্ছে, ততদিন কমিউনিস্টদের অর্থাৎ জনগণের অগ্রবর্তী বাহিনীর কর্তব্য হল সেই চেতনা বাড়ানোর জন্য সবরকমের কার্যকরী ও যথাযথ কাজ চালিয়ে যাওয়া। এইটা হলো আমাদের কাজের প্রথম ধাপ তা সে যত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হোক না কেন। প্রথম ধাপ সম্পূর্ণ হলেই আমরা দ্বিতীয় ধাপের দিকে অগ্রসর হতে পারি। (লিউ শাও চি সিলেক্টেড ওয়ার্কস ভলিউম-১, পৃঃ ১৩৭)

এ ছাড়াও তিনি লিখছেন, “জনগণের কাছ থেকে না শিখে, আমরা যদি নিজেদের চালাক মনে করে জনগণের চেতনাকে উন্নত করার চেষ্টা করি, নিজেদের কল্পনাপ্রসূত কিছু কর্মসূচী নিই এবং কিছু ঐতিহাসিক ও বিদেশি অভিজ্ঞতাকে যান্ত্রিকভাবে কাজে লাগাই তবে আমাদের প্রচেষ্টা অবশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। জনগণের থেকে শেখার জন্য আমরা যেন এক মুহূর্তের জন্য তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হই। আমরা যদি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হই, তাহলে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়বে এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার মত যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তথ্যভিজ্ঞ, যোগ্য অথবা দল হতে পারব না। (সিলেক্টেড ওয়াকর্স, লিউ শাও চি, ভলিউম ১, পৃ. ৩৪৯)।

প্রয়োগের সংশোধন

মনগড়া ধারণা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের উপর নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো একজন ব্যক্তি কমরেডের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ভুল বস্তুগত মূল্যায়ন থেকে তাঁকে ভুল দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এইসব মূল্যায়ন ছাড়া, মনগড়া ধারণার ভিত্তিতে বিবেচনা করলে, খুব পছন্দ অথবা খুব অপছন্দের ব্যাপার চলে আসে, ফলে সেই কর্মীর যথাযথ মূল্যায়ন হয় না এবং এর ফলে পার্টি সংগঠনে তার ভয়ানক পরিণতি দেখা দেয় নেতৃত্বের দিক থেকে যদি খুব পছন্দ এবং খুব অপছন্দের ব্যাপার থাকে – তাহলে স্বাভাবিকভাবেই স্তাবকতা উৎসাহ পায় এবং ক্যাডাররা ‘নেতাদের খুশি করা’-র অভ্যাস আয়ত্ত করে। এই প্রবণতার বিপজ্জনক পরিণতি এই যে নিচুতলার কর্মীরা পরিস্থিতির যথাযথ বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা ও মূল্যায়ন করার পরিবর্তে ‘নেতারা যা শুনতে চায়’ সেটাই রিপোর্ট করে।

গত একদশকে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার মত শক্ত ঘাঁটিতেও নির্বাচনী ফলাফলের মূল্যায়নে নিচুতলা থেকে মনগড়া বাড়িয়ে দেখানোর রিপোর্টিং ঘটেছে। এমনকি নির্বাচন হয়ে যাবার পরও নামাদের ফলাফল কেমন হবে সে সম্পর্কে বুথ কমিটিগুলি পার্টি কেন্দ্রকে রিপোর্ট পাঠিয়েছে। নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফলের পর দেখা গেল আমাদের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভুল। এটা হয়েছে মনগড়া ধারণার ভিত্তিতে বাড়িয়ে দেখার জন্য অথবা বিপজ্জনকভাবে, নিচুতলা থেকে এমন মূল্যায়নই পাঠানো হয়েছে ‘যা নেতারা শুনতে ভালবাসেন’। এ থেকে স্পষ্ট আমাদের মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল নিচুতলার মনগড়া মূল্যায়ন এবং সেটাই রিপোর্ট করা হয়েছে অথচ আমরা বুঝতে পারিনি জনগণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এত দুর্বল হয়েছে যে তার ফলেই এই ভুল মূল্যায়ন হয়েছে। হয়তো নিচুতলার থেকে যে রিপোর্ট করা হয়েছিল এমন মানুষদের কাছ থেকে জেনে যাদেরকে আমরা আমাদের দরদি বলে মনে করেছি কিন্তু তারা আমাদের স্রেফ ছেড়ে চলে গেছে আমরা তা বুঝাতেও পারিনি। এইসব কারণ অথবা আরও অনেক সম্মিলিত কারণে হয়তো এমন ঘটনা ঘটেছে।

সাংগঠনিক কাজেও মনগড়া ধারণা বেশ কিছু বড় রকমের বিচ্যুতি ঘটাতে পারে, যেমন কমরেডসুলভ ব্যবহারের অভাব, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, কমরেডদের মধ্যে ‘একজনকে ডিঙ্গিয়ে ওপরে ওঠা’-র অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এইসব ঘটনা ঘটলে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়ন হতে বাধ্য, এবং তার ফলে মানুষের সঙ্গে আমাদের আরও বিচ্ছিন্নতা বাড়ে।

-এই পরিস্থিতিতে, পার্টিতে সর্বস্তরে মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করার জরুরী প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ‘সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি’-তে কী পরিবর্তন এসেছে এ বিষয়ে একটি সঠিক বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও অনুমানে পৌঁছানোর জন্যই এ লড়াই করার প্রয়োজন আছে। এই সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করে একটি সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ‘সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ’-এ পৌঁছানোর জন্য এবং পরবর্তীকালে সেই মোতাবেক সাংগঠনিক পদ্ধতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করার জনাই মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়োজন আছে।

পার্টির রাজনৈতিক-রণকৌশলগত লাইনের বিবর্তনও এর উপর খুবই নির্ভরশীল। এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ভুল হয় তবে রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনও ভ্রান্ত হবে এবং পার্টি দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদী অথবা বাম হঠকারিতা যেকোনো দিকে বিচ্যুত হওয়ার বিপদে পড়তে পারে।

সুতরাং ভারতে সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে সাফল্যের জন্য, ভারতীয় বিপ্লবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরকে সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য, বর্তমান পরিবর্তনগুলির মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিশ্লেষণের জন্য আমাদের যে প্রচেষ্টা তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল সর্বস্তরে মনগড়া ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যাতে শ্রেণিশক্তিসমূহের ভারসাম্যের পরিবর্তন আমাদের অনুকূলে আনা যায়। আমাদের দেশে বিপ্লবী কৌশলগত লক্ষ্যকে অর্জন করার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এ কাজ জরুরী।

সি পি আই (এম) যথাযথ আলোচনার পর গত ২১তম কংগ্রেস থেকে বর্তমান রাজনৈতিক-রণকৌশলগত লাইন গ্রহণ করেছে। যদিও সাংগঠনিক প্লেনাম ঠিক করবে আমরা কতটা যোগ্যতার সঙ্গে কার্যকরীভাবে রাজনৈতিক-রণকৌশলগত লাইনকে বাস্তবায়িত করব। এক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে পার্টির সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে কি কি প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে সেটাও এ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামনে কর্তব্য এটাই।

সুতরাং তিনটি স্তরেই অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন, সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, সঠিক সাংগঠনিক পদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত যা ভারতীয় জনগণের সঙ্গে আমাদের সজীব সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এ কাজে বহুবিধ ক্ষেত্রে যে মনগড়া ধারণার প্রকাশ পায় তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের দায়িত্ব গোটা পার্টিকেই সামগ্রিকভাবে নিতে হবে।

(দি মার্কসিস্ট পত্রিকার ২০১৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত On Combating Subjectivism শীর্ষক নিবন্ধের বঙ্গানুবাদ)

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating