[আমাদের পার্টি সভ্যদের অনেকে আর পার্টির বাইরের আমার কোনো কোনো বন্ধুও, আমায় আমার স্মৃতিকথা লেখার গুনো বারেবারে বলেছেন। আমারও একান্ত ইচ্ছা যে আমি আমার রাজনীতিক জীবনের স্মৃতিকথা লিখি। তার জন্যে আমি কিছু কিছু দলিলপত্রও জোগাড় করেছি এবং এখনও করছি। একচল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছরের কথা কেউ শুধু স্মৃতির ওপরে নির্ভর করে লিখতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস নেই। তিয়াত্তর বছর বয়স পুরো করে আমি চুয়াত্তরে পা বাড়াতে চলেছি। একে তো এই বয়স, তার ওপরে আবার আমার চোখে ছানি পড়েছে। এই অবস্থায় স্মৃতিকথা লেখা শেষ করতে। পারব কিনা কে জানে। এ অনুরোধও আমায় কেউ কেউ করেছেন যে আমার রাজনীতিক জীবনের স্মৃতিকথা লেখা শুরু করবার আগে আমি আপুর আগেকার জীবন সম্বন্ধে, আর সেই সময়কার দেশের অবস্থ্য সম্বন্ধে অতি সংক্ষেপে হলেও কিছু যেন লিখি। নীচে আমি তাই লিখতে যাচ্ছি।]
বঙ্গোপসাগরে ভাসমান একটি ছোট্ট দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। যুক্ত বঙ্গে এই দ্বীপটি নোয়াখালি জিলায় ছিল, দেশ ভাগ হওয়ার ক’বছর পরে তা চট্টগ্রাম (চাটিগাঁ) জিলায় গিয়েছে। বাঙলা ১২৯৬ সালের শ্রাবণ মাসের কোনও এক সোমবারে আমি এই দ্বীপের মুসাপুর গ্রামে জন্মেছি। আমাদের দরিদ্র পরিবারে কারুনাই জন্ম-বার্ষিকী পালিত হতো না, আমার জন্মবার্ষিকীও কোনোদিন পালিত হয়নি। তাই, জন্মের তারিখ আমার মনে নেই, মায়ের মুখে শুনে শুধু সাল, মাস ও বারের কথাই আমার মনে আটকে রয়েছে। ১২৯৬ সালের শ্রাবণ মাসের ৭ই, ১৪ই, ২১শে ও ২৮শে তারিখ সোমবার ছিল। খ্রীষ্টীয় সনের হিসাবে এই তারিখগুলি ১৮৮৯ সালের ২২শে জুলাই, ২৯শে জুলাই, ৫ই আগস্ট ও ১২ই আগস্ট। এই চারটি তারিখের মধ্যে কোন্ তারিখটি ছিল আমার প্রকৃত জন্মদিন তা জানার আর কোনও সম্ভাবনা নেই। সাধারণত আগস্ট মাসকেই আমি আমার জন্মমাস বলে থাকি।
আমার পিতার নাম মনসুর আলী, আর মায়ের নাম চুনাবিবি। আমার পিতামহের নাম মহম্মদ কায়েম আর মাতামহের নাম ছিল হরশাদ আলী ঠাপার। সন্দ্বীপে ও চাটিগাঁয় মুসলিমদের ভিতরেও ঠাকুর পদবী আছে। কবি আলাওলের কাব্যে সৈয়দ মাগন ঠাকুরের নাম আছে। মুসলমানদের নামে ঠাকুর পদবী খানিকটা আভিজাত্যের চিহ্ন। মাতামহের পরিবারে কিঞ্চিৎ আভিজাত্যের দাবি ছিল। আমাদের দ্বীপের মতো ছোট জায়গায় কোনও পরিবারের নামে একটি বা দুটি তৌজি থাকলেই সে পরিবার অভিজাত হিসেবে গণ্য হ’ত।
১৮২৭ সালে আমার পিতা জন্মেছিলেন। আমাদের দ্বীপের তখনকার দিনের রেওয়াজ অনুসারে তিনি কিছু বাঙলা ও পারসী লেখাপড়া শিখেছিলেন। তবে, বাঙলায় পরীক্ষা দিয়েই তিনি মোখতারি পাস করেছিলেন। সন্দ্বীপের আদালতে তিনি আইনের ব্যবসায় করতেন। আমার শিশু বয়সে বৃদ্ধ হওয়ার কারণে তিনি আদালতে খাওয়া এক রকম ছেড়েই দিয়েছিলেন। আমি মা-বাবার কনিষ্ঠ সন্তান। আমাদের পরিবারের দারিদ্র্য ছিল অবর্ণনীয়। পিতার সমব্যবসায়ী লোকেরা প্রত্যেকেই অনেকটা ভূসম্পত্তির মালিক হতে পেরেছিলেন, কিন্তু পিতা তা হতে পারেননি।
আমাদের ওই অঞ্চলে মুসলিম শিশুদের প্রথম পাঠ শুরু হ’ত আরবীতে। আনুষ্ঠানিকভাবে আমারও তাই হয়েছিল। তবে, আরবী অক্ষর পরিচয় না করিয়ে কেবলমাত্র স্বরচিহ্নের সাহায্যে শিশুদের কোরান পড়ানোর যে-রীতি ছিল এবং তাতে শিশুদের যে বিপুল সময় নষ্ট হ’ত আমার বেলায় তা হয়নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে এদিক থেকে আমার বাবা খানিকটা প্রগতিশীল ছিলেন। তিনি শুরু হতেই আমায় অ-আ-ক-খ পড়িয়েছিলেন। আমি যখন সন্দ্বীপ মধ্য ইংরেজী স্কুলে (পরে এই স্কুলের নাম সন্দ্বীপ কার্গিল হাইস্কুল হয়েছে) বাঙলা উচ্চ প্রাথমিক শ্রেণীতে পড়ছিলাম তখন আমায় পড়া ছেড়ে দিতে হয়। আমি ছিলাম শিশু, আর স্কুল ছিল আমাদের বাড়ি হতে অনেক দূরে। তার ওপরে স্কুলের সামান্য বেতন জোগানোর সামর্থ্যও আমার বাবার ছিল না। তাই, আমি যে স্কুল ছেড়ে দিলাম তার জন্যে আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের কেউ তেমন হায়-আফসোস করলেন না। বাড়িতে বসে বসে আমার দিন বৃথা কেটে যাচ্ছিল সেই সময়ে পরিবারে চাষ-বাসও হ’ত না যে তার কাজে আমি লেগে যাব।
মুসলিমপ্রধান সন্দ্বীপে মোল্লা-মৌলবীর অভাব নেই। গ্রামে গ্রামে পারসী-আরবী পড়ানোর ছোট ছোট মাদ্রাসা। মাদ্রাসায় পড়ার খরচও কম। আমি বালোর সীমা ছাড়াতে যাচ্ছিলাম। এই সময়ে অন্যদের দেখাদেখি আমি মাদ্রাসায় পড়া শুরু করে দিলাম। ইরানের কবি আসাসীর “গুলিস্তান” “বুস্তান” অনেকখানি পড়েছিলাম, কবি জামীর “ইউসুফ-ও-জুলায়খা” কাব্যের পড়া সবে শুরু করেছিলাম আর পড়েছিলাম কিছু কিছু আরবী ব্যাকরণ। এর মধ্যে এল ১৯০৫ সাল। এই সময়ে আমার মনে প্রবল বাসনা হ’ল যে আমি ইংরেজী স্কুলে পড়ব। আমার অগ্রজরা তিনজন ছিলেন মুনশী মহব্বত আলী, মৌলবী মকবুল আহমদ ও মুনশী খুরশীদ আলম। মৌলবী মকবুল আহমদ আমায় মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ অর্থ সাহায্য করতেন। তাঁকে পত্রযোগে আমার বাসনার কথা জানালাম, কিন্তু তাঁর নিকট হতে কোনও সাড়া পেলাম না। তারপরে কাউকে কিছু না বলে আমি বাকেরগঞ্জ জিলায় চলে গেলাম। নোয়াখালী জিলার স্থল ভাগের বামনী হতেই আমি বাকেরগঞ্জে গিয়েছিলাম। তখন বামনীর আখতারিয়া মাদ্রাসায় আমি পড়ছিলাম। বাকেরগঞ্জ জিলায় পায়ে হেঁটে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম। বামনী ও বরগুনার কথা মনে আছে। পরে পৌঁছেছিলাম আমতলী থানার অধীন বুড়ীরচর গ্রামে। এখানে একজনের বাড়িতে থেকে ছোট-বড় ছেলেদের অ-আ-ক-খ পড়াতে শুরু করে দিলাম। বাকেরগঞ্জ জিলার নিরক্ষর গ্রামগুলিতে তখন নোয়াখালী জিলার অল্প-শিক্ষিত লোকেরা এসে বিদ্যা বা অবিদ্যা দান করত। আমার ইচ্ছা ছিল এইভাবে কিছু পয়সা রোজগার করে ওই জিলারই কোন না কোন হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে যাব। অগ্রজ মৌলবী মকবুল আহমদ এসে একদিন আমায় এই অজ্ঞাতবাস হতে খুঁজে বার করলেন, বললেন হাইস্কুলে পড়তে দিবেন। ২০১৯০৬ সালের মার্চ মাসে আমি সন্দ্বীপ কার্গিল হাইস্কুলের নিচের ক্লাসে ভর্তি হলাম। আমার তখন ষোল-সতের বছর বয়স। ক্লাসের ছোট ছোট ছেলেরা তা সত্ত্বেও আমায় ক্লাসে যে বসতে দিল, মাথায় চাটি মেরে তাড়িয়ে দিল না, তার কারণ আমি তাদের তুলনায় বাঙলা অনেক ভালো জানতাম। মাদ্রাসায় পড়ার সময়ে আমি বাঙলার চর্চা কখনও ছেড়ে দিইনি। তার মানে, বাঙলা বই পেলে আমি পড়তাম, বাঙলা মাসিক বা সাপ্তাহিক কাগজ পেলে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত না পড়ে ছেড়ে দিতাম না। মাসিক কাগজে নানান রকম প্রবন্ধ পড়া হতেই আমার মনে ইংরেজী শেখার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল। আমি গড়তে চাইতাম মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস। পরিচিতদের মধ্যে যাঁরা কলেজে পড়তেন তাঁরা আমায় বোঝালেন যে কমপক্ষে সৈয়দ আমীর আলীর “এ সার্ট হিস্টরি অফ দি সারাসেন্স” ও “দি স্পিরিট অফ ইসলাম” না পড়লে আমি মুসলিম সভ্যতার কিছুই বুঝতে পারব না। ইংরেজী ভাষা শিখে তাতে একজন পণ্ডিত হয়ে যাব এই উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আমার একান্ত বাসনা ছিল ইংরেজী বই পড়ে বুঝতে পারা।
১৯১০ সালে আমি সন্দ্বীপ কার্গিল হাই-স্কুল হতে নোয়াখালি জিলা স্কুলে চলে যাই। (বাঙলাদেশে জিলার সদরে যে গবর্নমেন্টের স্কুল থাকত তাকেই বলা হইত জিলা স্কুল)। ১৯১৩ সালে এই স্কুল হতে পরীক্ষা দিয়ে আমি মেট্রিকুলেশন পাস করি। আমার অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ ১৯০৭সালেই বাড়ি হতে আমার বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু বিয়ে আমায় কোনোদিন ঘর-সংসারের আওতায় বাঁধতে পারেনি। ১৯১৩ সালেই আমি প্রথমে হুগলী কলেজে (এখন নাম হুগলী মোহসেন কলেজ) আই, এ, ক্লাসে ভর্তি হই। ওখানে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ওই বছরেই চলে আসি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে। তখন হতেই আমি কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা।
আই.এ. পরীক্ষায় ফেল করে আমি কলেজ ছেড়ে দিলাম। তখন আমার বিদ্যার্জনের হিসাব খতিয়ে দেখলাম যে বাঙলা আমি এক রকম লিখতে পারি, ইংরেজী বই পড়লে মোটামুটি বুঝতে পারি, উর্দু বই পড়লে যদিও একরকম বুঝতে পারি, তবে তা পড়তে বড় বেশি সময় লেগে যায়। অনেক চেষ্টায় ক্লাসিকাল পারসী ভাষা কিছু কিছু বুঝতে পারতাম, কিন্তু চর্চার অভাবে আমার সেই জ্ঞানটুকুও আজ ভোঁতা হয়ে গেছে। স্কুল ও কলেজে আমার দ্বিতীয় ভাষা ছিল আরবী। খতিয়ে দেখার ফলে এটা বেশ বোঝা গেল যে আরবী আমি কিছুই শিখতে পারিনি।
১৯০৬ সালের মার্চ মাসে আমার ইংরেজী স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই (১৯০৫ সালের ১৬ই আগস্ট তারিখে) লর্ড কার্জনের হঠকারিতায় বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। পূর্ববঙ্গের সব কয়টি জিলা দার্জিলিং জিলাকে বাদ দিয়ে উত্তরবঙ্গ ও চীফ কমিশনার শাসিত আসাম প্রদেশকে নিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ছোট নাগপুর ওড়িশ্যাকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল বঙ্গদেশ। বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের পূর্বেও বাঙলাভাষী সিলেট ও কাছাড় জিলা আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে যে বঙ্গদেশ থেকে গেল তাতে বঙ্গভাষী লোকেরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়লেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তাই প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু হলো। এই আন্দোলন সারা ভারতবর্ষকে নাড়া দিয়েছিল। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে বঙ্গভাষীদের সংখ্যাধিক্য তো ছিলই, সংখ্যাধিক্য ছিল মুসলমানদেরও। পূর্ববঙ্গ ও আসামে চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সব সুবিধা তারা পেতে লাগলেন অবিভক্ত বাঙলায় তাঁরা তা পেতেন না। অবশ্য, এ সব সুযোগ সুবিধার ভাগ পূর্ববঙ্গ ও আসামের হিন্দুরাও যে পেতেন না তা নয়। তবু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁরা একান্তভাবে যোগ দিলেন। কারণ, বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বঙ্গ সংস্কৃতিরও ব্যবচ্ছেদ ছিল। বড় বড় হিন্দু জমিদারদের মনে এই ভয়ও ঢুকেছিল যে মুসলিম প্রজা-প্রধান পূর্ববঙ্গে জমিদারী প্রথা না বিলোপ হয়ে যায়। তার ওপরে ধর্মগতভাবে হিন্দুরা খুবই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন।
উভয় বঙ্গের মুসলমানদের ভিতরে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খুব অল্পসংখ্যক মুসলমান যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের ভিতরে মিস্টার আবদুর রসুল (ব্যারিস্টার), আবদুল হালীম গজনবী (পরে স্যার আবদুল হালীম গজনবী), মৌলবী মনিরুজ্জমান ইসলাম আবাদী, মৌলবী কাজেম আলী (কোজেম আলী মাস্টার নামে খ্যাত ছিলেন)। সৈয়দ ইসমাইল হুসায়ন সিরাজী, বর্ধমানের মৌলবী আবুল কাসেম, মৌলবী মুজিবর রহমান (“দি মুসলমান” নামক ইংরেজী সাপ্তাহিকের সম্পাদক), মৌলবী মুহম্মদ আকরম খান (এখন ঢাকার “আজাদ” পত্রিকার মালিক), পাটনার মিস্টার আলী ইমাম (পরে স্যার আলী ইমাম), তাঁর ভ্রাতা মিস্টার হাসসান ইমাম, মিস্টার মুজহারুল হক, ব্যারিস্টার, (পরে পাটনার সাদাকত আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা), মৌলবী লিয়াকত হোসায়ন ও ডাক্তার আব্দুল গফুর সিদ্দিকী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। আমি বঙ্গভঙ্গের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোনো আন্দোলনেই যোগ সিইনি। তখন আমার যে বয়স ছিল তাতে কোনো এক পক্ষে যোগ দিলে আমার পক্ষে তা মোটেই বে-মানান হতো না। আমার বয়সের ছেলেরা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তবে, সাম্প্রদায়িক কোনো ব্যাপারে আমি একেবারেই যোগ দিইনি একথা বললে অপলাপ করা হবে। বিশেষ মুসলিম দাবি-দাওয়ার সভা-সমিতিতে আমি যোগ দিয়েছি। আমি সে সময়ে ধার্মিক মুসলমান ছিলাম। দিনে পাঁচবার নমাজ না পড়লেও রমজানের পুরো মাস উপবাস বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও স্বদেশী জিনিস ব্যবহারের আন্দোলনও চলেছিল। এই আন্দোলন এত প্রবল হয়েছিল যে উভয় বাঙলায় রাজনীতিক আন্দোলনের নামই হয়ে গিয়েছিল স্বদেশী আন্দোলন। আজও দেশের লোক রাজনীতিক আন্দোলনকে স্বদেশী আন্দোলন বলেন। এখানে একটি কথা বলা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে এই সময়ে স্বদেশী আন্দোলনকারীদের নিকটে জাপানী পণ্যও স্বদেশী পণ্যরূপে পরিগণিত। ছিল। আজ এই কথা শুনে অনেকে আশ্চর্য হবেন, কিন্তু কথাটা সত্য। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা স্বদেশী পণ্য ব্যবহারের আবেদন জানিয়ে দেওয়ালে ছাপানো ইশতেহার মেরে দিতেন। এই সকল ইশতেহারে জাপানী পণ্য ব্যবহারের বিশেষ আবেদন থাকত। ইউরোপ হতে আমদানী করা দিয়াশলাই গ্রেট ব্রিটেনে তৈয়ার হ’ত না। তবু জাপানের অপকৃষ্ট হাতী মার্কা দিয়াশলাই-এর পক্ষে প্রচার চলত যদিও এই দিয়াশলাই জ্বলতে চাইত না। প্রচারের ফলে। লোকেরা তা কিনতেন এবং পরম নিষ্ঠার সঙ্গে জ্বালাবার চেষ্টা করতেন। ১৯০৪ সালের রুশ-জাপান যুদ্ধে জাপানের বিজয়ে ভারতের উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর লোকেরা বিমুগ্ধ হয়েছিলেন। জাপানের কৃষ্টিদূতেরা আগে হতেই ভারতে আসা-যাওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁরা আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ওপরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারেও সমর্থ হয়েছিলেন। মোট কথা, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের ওপরে জাপানের নজর পড়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে জাপানের ভারত আক্রমণের চেষ্টা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অনেক বছর আগে হতেই তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। আমাদের ওপরে জাপানের বোমা যখন পড়ছিল তখনও আমাদের বহু দেশবাসী জাপানকে পরম বন্ধু হিসাবে গণ্য করেছেন।
সাপ্তাহিক “হিতবাদী’র সম্পাদক কালীপ্রসন্ন কাব্য বিশারদ শুধু প্রথম স্বদেশী যুগের একজন বড় নেতা ছিলেন না, তিনি একজন সাহসী নেতাও ছিলেন। ১৯০৬ সালে বরিশালে প্রাদেশিক সম্মেলনের সময়ে বাকেরগঞ্জ জিলার ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট নিজের বাংলোয় ডেকে নিয়ে অপমানিত করার উদ্দেশ্যে যখন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায়কে বসতে বললেন না তখন কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে জোর করে তাতে সুরেন্দ্রনাথকে বসিয়ে দেন। কাব্যবিশারদ সেই অল্পসংখ্যক ভারতীয়দের একজন ছিলেন যাঁরা মনে-প্রাণে ভারতের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা চাইতেন। ১৯৬০ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর তারিখে আমি কাব্যবিশারদের “হিতবাদী’র সহকর্মী স্ত্রীকেশবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত দেখা করেছিলেম। ৯৭ বছর বয়সে পা বাড়ালেও তখনও তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রখর ছিল। তিনি বললেন, স্বাস্থ্যের অজুহাত দেখিয়ে কাব্যবিশারদকে ১৯০৭ সালে তাঁর সমমতের বন্ধুরা জাপানে পাঠিয়েছিলেন। (তাঁর স্বাস্থ্য সত্যই খারাব ছিল, কিডনির পীড়ায় তিনি ভুগছিলেন)। তবে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য ছিল যে কাব্যবিশারদ জাপানে গিয়ে ভারতের মুক্তি আন্দোলনের দূতের কাজ করবেন। অর্থাৎ, তাঁর কাজ হবে ভারতের মুক্তি-সংগ্রামে জাপান কিভাবে কতটা সক্রিয় সাহায্য করবে তা জেনে আসা। জাপানে পৌঁছে কাব্যবিশারদ অনেক পদস্থ জাপানীদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পান। তা থেকে তিনি বুঝতে পারেন যে মুক্তি-সংগ্রামে জাপান ভারতকে কোনো সাহায্য করবে না। পক্ষান্তরে ইংরেজের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জাপান একদিন ভারতকে আপন সাম্রাজ্যভুক্ত করার অভিলাষী। কাব্যবিশারদ খুবই হতাশ হন। তাঁর মনে একটা সন্দেহ জেগেছিল যে অসুস্থতার কারণে তিনি হয়তো দেশে নাও পৌঁছুতে পারেন। তাই, পত্রে সব কথা লিখে সেই পত্র তিনি বিশেষ ঠিকানায় দেশে পাঠিয়ে দেন। এই পত্র পৌঁছেছিল। তার একটি বাক্য “জাপান ভারতের বন্ধ হে” সেই সময়ে বাঙলার বহু সংবাষ্পত্রে ছাপা হয়েছিল। দেশে ফেরার পথে কাব্যবিশারদ জাহাজে মারা যান।
হ্যাঁ, স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করার দিকে একটা ঝোঁক আমারও ছিল। দেশী মিলের কাপড় আমি পরতাম। সামর্থ্যে কুলোলে অন্য স্বদেশী জিনিসও আমি কিনতাম।
বাঙলায় সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের অভ্যুদয় একটি স্মরণীয় ঘটনা। এটা ছিল গোপন আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গের আগেই তাঁদের দল গড়ে উঠেছিল। অবশ্য বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তাঁদের আরও বেশী প্রেরণা জুগিয়েছিল। এটা বিশেষ লক্ষণীয় যে বাঙলাদেশেই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বেশী দানা বেঁধেছিল। বাঙলার বাইরেও তাঁদের কর্মপ্রচেষ্টা চলেছে, কিন্তু বাঙলার মতো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আমার মনে যে পরিবর্তন আসছিল এবং সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যে রোমাঞ্চ ছিল, আমার মনে হয় হয়তো আমি তাতে যোগ দিতে পারতাম। কিন্তু তার পথে দুস্তর বাধা ছিল। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের প্রথম পর্যায় (১৯০৪-১৯১৭) কঠোরভাবে হিন্দুধর্ম-অনুশাসিত ছিল। এই বিপ্লব
১১ প্রচেষ্টায় আমার স্থান হ’ত না। অতীতে আমাদের দেশে ধর্ম হতে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনীতিক আন্দোলন হয়নি। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের আন্দোলনই বা কি করে ধর্মনিরপেক্ষ হবে? এই আন্দোলনে প্রথম যাঁরা অগ্রণী হয়েছিলেন তাঁদের ভিতরে-শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষও একজন। আন্দামান হতে মুক্তি পেয়ে এসে তিনি প্রথম যে “আত্মকথা” লিখেছিলেন (এখন দুষ্প্রাপ্য) তাতে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে হিন্দু রাজত্বের প্রতিষ্ঠাই তাঁদের অভিপ্রেত ছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের আন্দোলন শুধু হিন্দু আন্দোলনও ছিল না, আসলে তা ছিল বর্ণ-হিন্দুদের আন্দোলন। এই আন্দোলনে রোমাঞ্চ ছিল বলে শিক্ষিত যুবকেরা সহজে তাতে আকৃষ্ট হতেন এবং দেশের স্বাধীনতার নামে অকাতরে কারাবরণ করতেন এবং প্রাণও বলি দিতেন। অন্যদিক হতে বিচার করতে গেলে এর পেছনে একটা গভীর নৈরাশ্যও ছিল। বাঙালী শিক্ষিত যুবকদের পক্ষে, বিশেষ করে শিক্ষিত হিন্দু যুবকদের পক্ষে তখন হতেই জীবন-সংগ্রাম দুরূহ হয়ে উঠেছিল বলে তাঁদের ভিতরে একটা নৈরাশ্যের সৃষ্টি হচ্ছিল। নৈরাশ্য হতেই মানুষ ব্যক্তিগত খুন-খারাবির পথে যায়।
হিন্দু সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা ধর্মানুসারী যে ছিলেন, জেলে গেলে তাঁদের ভিতরে অনেকে যে প্রথমেই একখানা সম্ভ্রমাকর্ষক কালীর ছবি (an imposing picture of Goddess Kali) চেয়ে পাঠাতেন তার জন্যে আমি তাঁদের ওপরে কোনো দোষারোপ করতে চাইনে। ভারতবর্ষের রাজনীতির অবস্থাই ছিল এই রকম। মুসলমানদের হাত হতে ইংরেজের ক্ষমতা দখলের পরে মুসলমানরাও সুদীর্ঘ কাল ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়েছেন। তাঁদের সংগঠন সন্ত্রাসবাদীদের চেয়ে অনেক বেশি সংহত ছিল, অনেক বেশি ছিল তাঁদের আন্দোলনের ব্যাপকত্ব এবং কৃষকরাও যোগ দিয়েছিলেন এই আন্দোলনে। কিন্তু এই আন্দোলনও ছিল মুসলিম ধর্মানুশাসিত। তাঁদের সংগ্রামকে তাঁরা ধর্মযুদ্ধ মনে করেছেন। তাঁরাও চেয়েছিলেন মুসলিম রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পরবর্তী যুগে মওলানা ওবায়দুল্লা প্রভৃতি আফগানিস্তানে যখন ভারতীয় বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন এবং অস্থায়ী ভারত গবর্নমেন্টও স্থাপন করেছিলেন তখন তাঁরা হিন্দ-মুসলমান প্রভৃতি সকলের জন্যে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁরা তাঁদের ফৌজের নাম দিয়েছিলেন খোদাই ফৌজ (Army of God)। এই খোদাই ফৌজে ব্রিটিশ ফৌজের মতো মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ও মেজর জেনারেল প্রভৃতি পদও ছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কর্মপদ্ধতিকে আমরা সমালোচনা করি। কিন্তু তাঁদের। বলিদানকে কে না শ্রদ্ধা করে পারেন?
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন নিষ্ফল হয়নি। ইংল্যান্ডের রাজা ও ভারতের সম্রাট পঞ্চম জর্জ তাঁর অভিষেক উপলক্ষে ভারতে এসেছিলেন। ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর তারিখে দিল্লির দরবার হতে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার কথা তিনি ঘোষণা করলেন। আরও তিনি ঘোষণা করলেন যে ভারতের রাজধানী কলকাতা হতে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হবে। নূতন ব্যবস্থায় পূর্ববঙ্গ, দার্জিলিং সহ উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ (প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান বিভাগ) বঙ্গপ্রদেশে পরিণত হ’ল। বিহার, ছোটনাগপুর ও ওড়িশ্যাকে নিয়ে গঠিত হ’ল নূতন বিহার ও ওড়িশ্যা প্রদেশ। বঙ্গভঙ্গের পূর্বে পুরো বাঙলাদেশ (পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ) বিহার, ছোটনাগপুর ও ওড়িশ্যাকে নিয়ে বঙ্গদেশ ছিল। আসাম আবারও চীফ কমিশনার শাসিত প্রদেশে পরিণত হ’ল। আসামে বঙ্গভাষী সিলেট ও কাছাড় জিলা তো থাকলই, বঙ্গতাযী আরও অনেক এলাকা থেকে গেল। বিহার ও ওড়িশ্যা প্রদেশেও বঙ্গভাষী বড় এলাকা চলে গেল এসব সত্ত্বেও বঙ্গভাষী লোকের বিপুল সংখ্যাধিক্য নিয়ে বঙ্গদেশ গঠিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এটাই হয়েছিল সবচেয়ে বড় লাভ।
২০১১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই যুদ্ধে অন্তত মনে মনে ভারতীয় মুসলমানরা ইংরেজের বিরুদ্ধে ছিলেন। কারণ, মুসলমান সাম্রাজ্য ভুরি ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা হলেও ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধের চাকরি নিয়ে ভারতীয় মুসলমানরা ইরাক প্রভৃতি দেশে যেতে ছাড়েননি। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরেও সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাঁদের আন্দোলন আরও জোরে চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির নিকট হতে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য নিয়ে ভারতে একটা অভ্যুত্থানের চেষ্টাও করেছিলেন। আগে হতে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তাঁদের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যুদ্ধের সময় ভারতের ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট নানান রকম সাবধানতা অবলম্বন করে। তার মধ্যে ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট (ভারতরক্ষা আইন) একটি। এই আইনে। সন্দেহবশে ভারতময় হাজার হাজার লোককে বিনাবিচারে বন্দী করে রাখা হয়। তাছাড়া ১৮১৮ সালের ৩ নম্বর রেগুলেশনও প্রযুক্ত হয়েছিল। বাঙলাদেশেই বন্দীর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।
১৩ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস কিন্তু যুদ্ধের প্রতি তাঁদের সমর্থন ও আনুগত্য জানালেন। যে চার বছর যুদ্ধ চলেছিল তার। প্রতি বছরই কংগ্রেসের সারা ভারত মঞ্চ হতে যুদ্ধের প্রতি আনুগত্য ঘোষিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ১৯১৮ সালে দিল্লিতে কংগ্রেসের যে অধিবেশন হ’ল তাতে রাজানুগত্যের প্রস্তাব তো পাস হ’লই, যুদ্ধের সফল সমাপ্তির জন্যে ব্রিটিশ গবর্নমেন্টকে অভিনন্দন জানাতেও ভুল হ’ল না। এই সব কিছুর প্রতিদানে কংগ্রেসকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে ১৯১৪ সালে মাদ্রাজের গবর্নর লর্ড পেন্টল্যান্ড মাদ্রাজে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিলেন। ১৯১৫ সালে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে বোম্বের গবর্নর লর্ড উইলিংডন যোগ দিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে লখনউতে কংগ্রেসের যে বার্ষিক অধিবেশন হ’ল তাতে যোগ দিলেন যুক্ত প্রদেশের গবর্নর স্যার জেমস্ মেস্টন। তিনি যখন মন্ডপে প্রবেশ করলেন তখন সমস্ত প্রতিনিধি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাদর সম্বর্ধনা। জানিয়েছিলেন।
১৯১৭ সালে দেশে নানান রকম আন্দোলন শুরু হলো। রাজনীতিক বন্দীদের মুক্তি-আন্দোলন তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খিলাফৎ আন্দোলনের আরম্ভও ১৯১৭ সালেই হয়, যদিও তা প্রবল রূপ ধারণ করেছিল ১৯২০ সালে। নিরুপদ্রব প্রতিরোধের কথাও ১৯১৭ সাল হতে। হাওয়ায় ভাসতে থাকে। সভা-সমিতির অধিবেশনের সংখ্যাও এই বছরে খুব বেড়ে যায়। ১৯১৬ সালে লখনউ কংগ্রেসের সমঝোতার ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই এই সকল সভায় যোগ দিচ্ছিলেন। ১৯১৬ সাল। হতেই আমি সকল প্রকার রাজনীতিক সভা ও মিছিলে যোগ দিতে আরম্ভকরি। ১৯১৭ সালে কলকাতায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অধিবেশন হয়। সেবারেই আমি প্রথম কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অধিবেশনে দর্শকরূপে যোগদান করি। এই দুটি সংগঠনেরই তখন যে কায়দাকানুন ছিল তাতে ইচ্ছা শ্রেয়স্কর মনে করেছিলাম। করলেই আমি প্রতিনিধি হতে পারতাম, দর্শকরূপে যোগদান করাই আমি ১৯১৭ সালের ২০শে আগস্ট তারিখে ইংল্যান্ডে ভারতের সেক্রেটারি অফ্ স্টেট, অর্থাৎ ব্রিটিশ মন্ত্রীদের ভিতরে ভারতের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, মিস্টার মন্টেন্ড ঘোষণা করলেন যে ভারতবাসীকে দায়িত্বপূর্ণ শাসন ক্ষমতা দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলে নিরুপদ্রব প্রতিরোধের যে সব কথাবার্তা চলছিল তা থেমে যায়।
১৯১৭-১৮ সালে মিস্টার মন্টেগু ও ভারতের বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ড ভারতের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে ভারতীয়দের মতামত সংগ্রহ করেন। তাঁদের যুক্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালের জুন মাসে। কংগ্রেসের একটি বড় অংশ এই রিপোর্টে লিখিত প্রস্তাব মেনে নিতে চাইলেন এবং অপরাংশ বললেন, প্রস্তাব মোটেই আশানুরূপ নয়। এই নিয়ে আলোচনার জন্যে ১৯১৮ সালের ২৯শে আগস্ট তারিখে বোম্বেতে সৈয়দ হাসসান ইমামের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের এক বিশেষ অধিবেশন হয়। মাহমুদাবাদের মহারাজার সভাপতিত্বে একই সময়ে বোম্বেতে মুসলিম লীগেরও এক অধিবেশন বসে। উভয় অধিবেশনের সিদ্ধান্ত একই রকম হয়েছিল। তার মোদ্দা কথা এই ছিল যে মন্টেজ-চেমসফোর্ড রিপোর্টের প্রস্তাবগুলি নৈরাশ্যব্যঞ্জক ও অসন্তোষকর। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতরে শাসন ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তাবই গ্রহণীয় হতে পারে না, ইত্যাদি। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ায় যে বুর্জোয়া বিপ্লব হয় তাতে জারের পতন ঘটে। তার পাঁচ মাসের ভিতরে যে মন্টেগু ভারতকে দায়িত্বপূর্ণ শাসনক্ষমতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন তার পেছনে এই বিপ্লবেরও কিছু প্রভার নিশ্চয় ছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে রাশিয়ায় সর্বহারা বিপ্লব সফল হয় এবং তার ফলে মজুরশ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টির অধিনায়কত্বে মেহনতী জনগণের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট চেঁচাতে লাগল যে যুদ্ধ ফ্রন্টে রাশিয়ার ভাঙন ধরল। রাশিয়ার সর্বহারা বিপ্লবের প্রকৃত খবর যেন ভারতে আসতে না পায় তার জন্যে ভারতের ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট খুব কড়াকড়ি ব্যবস্থা করল। সঙ্গে সঙ্গে লেনিনের বিরু েও সোবিয়েত নেতাদের বিরুদ্ধে নানান ধরনের কুৎসারও প্রচার হতে থাকল। ইউরোপে তো যেতেন শুধু ভারতের ধনী লোকেরা কিংবা তাঁদের অনুগৃহীত লোকেরা। তাঁরা রুশ বিপ্লবের ওপরে সদয় ছিলেন না। তা সত্ত্বেও সংবাদপত্রের বিরুদ্ধ খবরগুলির ভিতর হতেও ভালো খবর বের হয়ে পড়ত। তাছাড়া ব্রিটিশ গবর্নমেন্টের তরফ হতে যা কিছু মন্দ বলে প্রচারিত হতো দেশের
সাধারণ মানুষ ধরে নিতেন যে তার ভিতরে নিশ্চয় কিছু ভালো আছে। ১৯১৮ সালে আমাদের দেশের মজুরদের ভিতরেও চাঞ্চল্য দেখা দেয়। ওই গালের ১১ই নভেম্বর তারিখে প্রথম মহাযুদ্ধের বিরতি ঘোষিত হয়। নানা স্থানে অনুয়দের ধর্মঘটও শুরু হয়ে যায়। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে তা বেড়েই চলল। জল বিপ্লব আমাদের দেশের মজুরদের সামনেও আশার আলো তুলে ধরেছিল।বিক্ষত হয়েছিল। সে সময়ে যে-পত্র তিনি ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয়কে লিখেছিলেন তার ভাষা অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথের খেতাব বর্জনে বিশ্বে যো চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল তাতে ব্রিটিশ গবর্নমেন্টকে বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল। তা এ থেকে বোঝা গিয়েছিল যে ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট বছরের পর বছর। কবির খেতাব বর্জন মেনে নিলেন না। ইংরেজরা কবিকে স্যার রবীন্দ্রনাথ একসিকিউটিভ কাউন্সিলের সভ্য স্যার শঙ্করণ নায়ার তাঁর বার্ষিক চৌষট্টি ঠাকুরই লিখে চললেন। পাঞ্জাবের লাঞ্ছনার প্রতিবাদে গবর্নর জেনারেলের হাজার টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দিলেন বটে, কিন্তু ব্রিটিশ রাজার দেওয়া নাইট খেতাবটি ছাড়তে পারলেন না।
পাঞ্জাবে যা যা ঘটেছিল গান্ধীজী তাতে মনে দুঃখ পাননি এ কথা কেমন করে বলব? কিন্তু তিনি ঘোষণা করলেন যে সত্যাগ্রহের কথা বলে তিনি হিমালয়-প্রমাণ ভুল করেছিলেন। তিনি বললেন, তাঁর প্রস্তাবের ফলেই মন্দ লোকেরা স্থায়ী বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পেরেছে। তিনি তাঁর সত্যাগ্রহের প্রস্তাব তুলে নিলেন। পাঞ্জাবে কি ঘটে গেল, আর গান্ধীজী কি বললেন! তিনি জনসাধারণকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিলেন।
সব কিছুর শেষ আছে। পাঞ্জাবের লাঞ্ছনারও একদিন শেষ হলো। যাঁরা জীবন বলি না দিয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, এমনকি সামরিক মুক্তি পেলেন। কলকাতার জনসাধারণ পাঞ্জাবে নেতৃবৃন্দকে যে বিপুল সম্বর্ধনা আদালতের বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডেও দণ্ডিত হয়েছিলেন, তাঁরা সকলে জানিয়েছিলেন সেই রকম সম্বর্ধনা আমি কম দেখেছি।
অনেক আগে নির্ধারিত হয়েছিল যে, কংগ্রেসের ১৯১৯ সালের বার্ষিক কংগ্রেসের অধিবেশন হওয়া উচিত, কি উচিত নয়, এই নিয়ে কথা উঠেছিল। অধিবেশন অমৃতসরে হবে। পাঞ্জাবে যা কিছু ঘটেছিল তারপরেও অমৃতসরে শেষ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তই বহাল থাকল। পণ্ডিত মোতিলাল নেহরু সভাপতি নির্বাচিত হলেন। ইতিমধ্যে মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারত সংস্থার আইন পাস হয়ে গিয়েছিল। একটি রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণার ফলে রাজবন্দীরা এবং অনেক দণ্ডিত বন্দীও ছাড়া পেলেন। অনেকে বললেন, প্রদেশে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা কার্যে প্রয়োগ সম্ভব হবে না। আবার গান্ধীজী-সহ হবে। দ্বৈত শাসনের মণ্ডাটি খাওয়ার জন্যে অনেক নেতারই মুখ দিয়ে লালা অন্যরা ভাবলেন যতটুকু অধিকার পাওয়া গেছে ততটুকুই কাজে লাগাতে ঝরতে লাগল।
এই আবহাওয়ায় অমৃতসরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন আরম্ভ হলো। বাল গঙ্গাধর তিলক ইংল্যান্ডে ছিলেন। সেখানে তিনি কথা দিয়ে এসেছিলেন, সংস্কার আইনের মারফত যা কিছু পাওয়া গেছে সেটুকুই তিনি কাজে লাগাবার চেষ্টা করবেন এবং আরো বেশী পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করতে থাকবেন। দেশের মাটিতে পা দিয়ে ভিন্ন রকম আবহাওয়া দেখে তিনি বলতে বাধ্য হলেন যে সংস্কার আইন মোটেই সন্তোষজনক নয়। কিন্তু অমৃতসর কংগ্রেসে যাওয়ার পথে তিনি এক কাণ্ড করে বসলেন। গঙ্গাপুর নামক রেলওয়ে স্টেশন হতে ভারত সংস্কার আইন পাস করার জন্যে অভিনন্দন জানিয়ে ব্রিটিশ রাজা বা মন্ত্রিসভাকে একটি টেলিগ্রাম তিনি পাঠিয়ে দিলেন। এই আস্বস্তরি নেতার অমৃতসর পৌঁছানোর তরও সইল না। টেলিগ্রামে তিনি একথাও জুড়ে দিলেন যে অভিনন্দন তিনি ভারতের জনসাধারণের তরফ হতেই পাঠাচ্ছেন। জানিনে, কোন্ জনসাধারণ তাঁকে এই অধিকার দিয়েছিলেন। টেলিগ্রামে একথারও উল্লেখ ছিল যে ব্রিটিশের তরফ হতে যতটা সাড়া পাওয়া যাবে ততটা সাড়া Co-operation বা পারস্পরিক সহযোগিতার প্রস্তাব। ভারতীয়েরাও দেবেন। এটাই ছিল তিলকের উদ্ভাবিত বিখ্যাত Responsive
এতকাল পরে আজও মনে হচ্ছে যে পাঞ্জাবের সামরিক আইনের লাঞ্ছনার পরে অমৃতসরে কংগ্রেসের যে-অধিবেশন হয়েছিল তা নিয়ে কোনোদিন কোনো ভারতবাসী আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করতে পারবেন না। এই অধিবেশন ভারতের মাথা বিশ্বের দরবারে হেঁট করে দিয়েছিল। পাঞ্জাবের বাইরে কোথাও কংগ্রেসের এই অধিবেশন হলে ভালো হ’ত। কিছু গরম বক্তৃতা যে কংগ্রেসে হয়নি তা নয়, কিন্তু আসল ব্যাপার ছিল ১৯১৯ সালের সংস্কার আইনকে কি করে কাজে লাগানো যায় তার প্রচেষ্টা। মিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশের (তখনো তিনি “দেশবন্ধু” হননি) পূর্ণ দায়িত্বসম্পন্ন গবর্নমেন্ট স্থাপনের প্রস্তাব, যাতে সংস্কার আইনকে নৈরাশ্যব্যঞ্জক ও অসন্তোষকর বলা হয়েছিল, সবজেক্ট কমিটিতে পাস হলেও প্রকাশ্য অধিবেশনে তাতে গান্ধীজীর সংশোধনী প্রস্তাব যোগ হয়ে প্রস্তাবটি আরো বেশী জলো হয়ে গেল। সংশোধনীর দ্বারা প্রস্তাবে যা যোগ হলো তাতে এই দাঁড়াল যে পূর্ণ দায়িত্বসম্পন্ন সরকার স্থাপিত না প্রয়োগ করবে। হওয়া পর্যন্ত তাকে ত্বরান্বিত করার জন্যে জনসাধারণ সংস্কার আইনকে কাজে
— চলবে–
@NBA
@freemang2001gmail-com



