অবশেষে দীর্ঘকাল পরে কমরেড গণেশ ঘোষের জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত হলো কমরেড গণেশ ঘোষের “মুক্তিতীর্থ আন্দামান” পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণ। ন্যাশনাল বুক এজেন্সির এই উদ্যোগ যে প্রশংসনীয় সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সশস্ত্র বিপ্লবীদের কাছে আন্দামান ছিল বিংশ শতাব্দীর বাস্তিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে মহান ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) পূর্বে প্যারি নগরীর পূর্বাঞ্চলে ফরাসি রাজাদের দুর্গ হিসেবে অবস্থিত ছিল এই বাস্তিল। এই দুগেই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত বিপ্লবীদের বন্দি করে রাখা হত। বাস্তিল দুর্গ ছিল বিপ্লবী বন্দিদের উপর নারকীয় অত্যাচার উৎপীড়ন চালাবার কেন্দ্রস্থল। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই এই কুখ্যাত দূর্গ ধ্বংস করার অভিযান দিয়েই শুরু হয়েছিল ১৭৮৯ সালের মহান ফরাসি বিপ্লব।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের, বিপ্লবী বন্দিদের উপর নৃশংস অত্যাচার উৎপীড়ন চালাবার কেন্দ্র হিসেবেই ব্রিটিশ শাসকেরা বঙ্গোপসাগরের শেষ প্রান্তে গড়ে তুলেছিল আন্দামানের সেলুলার জেল। সে কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে কমরেড গণেশ ঘোষ তাঁর “মুক্তিতীর্থ আন্দামান” গ্রন্থে লিখেছেন:
“ভারতের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আন্দামান একটি অতি বিশিষ্ট ও গৌরবোজ্জ্বল স্থান অধিকার করে রয়েছে। ১৮৮৫ সালে প্রথম ‘কয়েদি উপনিবেশ’ (পেনাল সেটেলমেন্ট) বলে পরিকল্পিতভাবে আন্দামানের, বিশেষভাবে আন্দামানের প্রধান ও কেন্দ্রীয় শহর পোর্ট ব্লেয়ারের পত্তন হয়। সেই বছরেই কয়েক শত রাজবন্দিকে জোর করে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের সকলকে সেখানে হত্যা করার সুপরিকল্পিত ও সুনিশ্চিত উদ্দেশ্য নিয়েই। একথা খুব জোর দিয়ে বলবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, কেন না সিপাহি-বিদ্রোহ সংক্রান্ত যে কয়েক সহস্র ব্রিটিশ-বিরোধী রাজবন্দিকে জোর করে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে একজনও জীবন নিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেনি। এ সম্পর্কে আজ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি যত নথিপত্র, কাগজ, দলিল, দস্তাবেজ ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে তা থেকে সুনিশ্চিতভাবে এবং নিঃসন্দেহে এই কথাই প্রমাণিত হয়েছে। এই আন্দামানেই ভারতের অগণিত বীর মুক্তি সংগ্রামীর দেহাবশেষ মিশে রয়েছে। তাই ভারতের জনসাধারণের কাছে আন্দামান হয়ে রয়েছে “ভারতের মুক্তিতীর্থ”। “এবং এ কথাও সত্য যে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের হাতে ভারতের যে মুক্তি সংগ্রামীগণ আন্দামানে এবং পরবর্তীকালে সেখানকার সেলুলার জেলে প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা অপরিসীম দুঃখভোগ করেছেন তাঁরা সকলেই এবং তাঁরা প্রত্যেকেই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থাতেই ভারতের মুক্তির সম্ভাবনায় সুদৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। অন্য কোনো পন্থায় বিশ্বাসী কোনো দেশপ্রেমিক অথবা মুক্তি-পিয়াসীকে সাম্রাজ্যবাদী সরকার পূর্বে কিংবা পরে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীতে অথবা বিংশ শতাব্দীতে কখনোই আন্দামানে পাঠায়নি। সুতরাং আন্দামান ছিল ভারতের কেবল বিপ্লবীপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরই আবাসস্থল।”
আন্দামান সেলুলার জেল কবে নির্মিত হয় এবং সেলুলার জেলের ওয়ার্ডের ইটগুলি যে কাদের উৎপীড়িত জীবনের সাক্ষী হয়ে রয়েছে তার বর্ণনাও কমরেড গণেশ ঘোষ দিয়েছেন। তাঁর নিজের কথায়: “আন্দামানের বিখ্যাত সেলুলার জেলের নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়েছিল ১৮৯৬ সালে এবং নির্মাণকার্য শেষ হয় ১৯১০ সালে। কিন্তু ১৮৯৭ সাল থেকেই ওই সেলুলার জেলে রাজবন্দিদের আবদ্ধ করে রাখবার ব্যবস্থা করা হয় এবং সেই সময় থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ওই সেলুলার জেলের ভিতরেই ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা অতি নির্মম ও নৃশংসভাবে বহু রাজবন্দিকে হত্যা করেছে। এই সেলুলার জেলের প্রত্যেকখানি ইট অগণিত রাজবন্দিদের অবর্ণনীয় দুঃখ যন্ত্রণার নীরব মুক সাক্ষী হয়ে রয়েছে।”
সেই সাক্ষী বিলুপ্ত করার চেষ্টা করেছিল স্বাধীন ভারতের কংগ্রেসি শাসকেরা। অবশ্য আন্দামান মৈত্রী সংঘের হস্তক্ষেপে সেলুলার জেলের ছয়টি ওয়ার্ড ভেঙে ফেলা কংগ্রেসি শাসকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখনও সেন্ট্রাল টাওয়ার ও দু’টি ওয়ার্ড ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার-উৎপীড়নের সাক্ষী হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর ব্যকিগুলো কংগ্রেসি শাসকেরা ভেঙে ফেলেছে।
আন্দামান সেলুলার জেলে রাজবন্দিদের উপর যে অত্যাচার চলত তা আনেকেরই অজানা। যাঁরা সেখানে ছিলেন তাঁরাই জানেন আন্দামান সেলুলার জেলের এই বীভৎসরূপের কথা। ব্রিটিশ শাসকদের প্রিয় ও আস্থাভাজন চার্লস টেগার্ট আলিপুর বোমার মামলায় দণ্ডিত বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেম কানুনগো প্রমুখ বন্দিদের আন্দামানের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে যে কাহিনি লিখে রেখেছিল সেই কাহিনি ফলাও করে ছেপেছিল আনন্দবাজার পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তাদের ১৯৮৬-এর শারদীয় সংখ্যায়। কুখ্যাত চার্লস টেগার্ট তাঁর কাহিনিতে এটাই দেখবার চেষ্টা করেছে যে, আন্দামানে বিপ্লবী বন্দিদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল আর সেই কাহিনি বিশ্বাস করে আনন্দবাজারে পত্রিকা চার্লস টেগার্টের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস এই কথাই বলে যে, আন্দামান বিপ্লবী বন্দিদের মনোবল কোনোকালেই ভাঙতে পারেনি। ত্রিশের দশকের যে বিপ্লবী-বন্দিরা ওই সেলুলার জেলে প্রেরিত হয়েছিলেন তাঁরা এক নতুন ইতিহাসই সৃষ্টি করলেন।
বিংশ শতাব্দীর বাস্তিল ওই আন্দামান সেলুলার জেল ১৯৩৩ সালের মধ্যভাগের পর থেকে রূপান্তরিত হতে থাকল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ শেখার বিদ্যায়তনে। সেই বিদ্যায়তনের ছাত্র হিসেবেই চট্টগ্রামের ব্রিটিশ অস্ত্রাগার দখলের অন্যতম নেতা বিপ্লবী গণেশ ঘোষ হয়ে উঠেছিলেন কমরেড গণেশ ঘোষ। বিপুল সংখ্যক বিপ্লবীর আন্দামান” গ্রন্থে। কমিউনিস্টে রূপান্তরের প্রক্রিয়াই লিপিবদ্ধ রয়েছে কমরেড গণেশ ঘোষের “মুক্তিতীর্থ। চার্লস টেগার্টের পথ অনুসরণ করেই বাংলাদেশের কুখ্যাত গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন আন্দামান সেলুলার জেলে গিয়ে বিরূপ সংবর্ধনাই পেয়েছিলেন এবং ধাতুতে গড়ে উঠেছে। তিনি বুঝেছিলেন ত্রিশ দশকের বিপ্লবী বন্দিরা কারাপ্রাচীরের অন্তরালেই এক বিশেষ এসব কাহিনির সঙ্গে আন্দামানের ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের কাহিনি মিশিয়ে “মুক্তিতীর্থ আন্দামান” এক অপূর্ব গবেষণার গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এর কৃতিত্ব কমরেড গণেশ ঘোষের। সেই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি বাংলা ভাষাভাষী পাঠক সমাজের কৃতজ্ঞতাভাজন হলেন।
১২ নভেম্বর ‘৯৯ সুধাংশু দাশগুপ্ত
লেখকের কথা
ভারতের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আন্দামান একটি অতি বিশিষ্ট এবং গৌরবোজ্জ্বল স্থান অধিকার করে রয়েছে। ১৮৫৮ সালে প্রথম ‘কয়েদি উপনিবেশ’ (Penal Settlement) বলে পরিকল্পিতভাবে আন্দামানের, বিশেষভাবে আন্দামানের প্রধান এবং কেন্দ্রীয় শহর পোর্ট ব্লেয়ারের পত্তন হয়ে। সেই বছরেই কয়েক শত রাজবন্দিকে জোর করে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের সকলকেই সেখানে হত্যা করবার সুপরিকল্পিত ও সুনিশ্চিত উদ্দেশ্য নিয়েই। একথা খুব জোর দিয়ে বলবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেন না সিপাহি বিদ্রোহ সংক্রান্ত যে কয়েক সহস্র ব্রিটিশ-বিরোধী রাজবন্দিকে জোর করে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের মধ্যে একজন বন্দিও জীবন নিয়ে আর দেশে ফিরে আসতে পারেনি। এ সম্পর্কে আজ পর্যন্ত সরকারি এবং বেসরকারি যত নথিপত্র, কাগজ, দলিল, দস্তাবেজ ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে তা থেকে সুনিশ্চিতভাবে এবং নিঃসন্দেহে এই কথাই প্রমাণিত হয়েছে।
আন্দামানের চতুষ্পার্শ্বের সমুদ্রের জলে এবং আন্দামানের ধূলিকণায় ভারতের অগণিত বীর মুক্তি-সংগ্রামীর দেহাবশেষ মিশে রয়েছে। তাই ভারতের জনসাধারণের কাছে আন্দামান হয়ে রয়েছে “ভারতের মুক্তিতীর্থ”। এবং একথাও সত্য যে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের হাতে ভারতের যে মুক্তি সংগ্রামীগণ আন্দামানে এবং পরবর্তীকালে সেখানকার সেলুলার জেলে প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা অপরিসীম দুঃখ ভোগ করেছেন তাঁরা সকলেই এবং তাঁরা প্রত্যেকেই সাম্রাজাবাদ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থাতেই ভারতের মুক্তির সম্ভাবনায় সুদৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। অন্য কোনো পন্থায় বিশ্বাসী কোনো দেশপ্রেমিক অথবা মুক্তি-প্রয়াসীকে সাম্রাজ্যবাদী সরকার পূর্বে কিংবা পরে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতে অথবা বিংশ শতাব্দীতে কখনই আন্দামানে পাঠায়নি। সুতরাং আন্দামান ছিল ভারতের কেবলমাত্র বিপ্লবপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরই আবাসস্থল। শাসনের শের নারার জন্য লোহার ত্রিভুজ। এই ত্রিভুজের উঁচুতে দুইদিকে দুই ইএবং গীতদিই পা বেঁধে দেওয়া হত।
আন্দামানের বিখ্যাত সেলুলার জেলের নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়েছিল ১৮৯৬ সালে এবং নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৯১০ সালে। কিন্তু ১৮৯৭ সাল থেকেই ওই সেলুলার জেলে রাজবন্দিদের আবদ্ধ করে রাখবার ব্যবস্থা হয় এবং সেইসময় থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ওই সেলুলার জেলের ভিতরেই ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা অতি নির্মম ও নৃশংসভাবে বহু রাজবন্দিকে হত্যা করেছে। এই সেলুলার জেলের প্রত্যেকখানি ইঁট অগণিত রাজবন্দির উত্তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে উষ্ণ হয়ে রয়েছে এবং প্রত্যেকখানি ইট অগণিত রাজবন্দির অবর্ণনীয় দুঃখ যন্ত্রণার নীরব মৃক সাক্ষী হয়ে রয়েছে। কিন্তু এই রাজবন্দির সকলেই ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লব পন্থায় বিশ্বাসী। অহিংস পন্থায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের ভারত ত্যাগে বাধ্য করা যাবে একথা তাঁরা কেউই বিশ্বাস করতেন না।সেলুলার জেলের প্রধান প্রবেশদ্বার। কয়েক বছর আগে দুইদিকের উঁচু গম্বুজ দুইটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ভারতবর্ষে যাঁরা অহিংস পন্থায় বিশ্বাস করেন বলে তাঁরা মনে করেন যে ভারতের মুক্তি সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছে কেবলমাত্র ১৯২০-২১ সাল থেকেই অর্থাৎ যখন থেকে গান্ধীজি কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই অহিংসাপন্থী নেতৃত্ব ভারতের শাসন ক্ষমতা লাভ করেই সরকারি উদ্যোগ ও সরকারি অর্থে ভারতের মুক্তি, সংগ্রামের যে ইতিহাস রচনার ব্যবস্থা করেন সেই “ইতিহাসে” ১৯২০-২১ সালের পূর্বের অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে, সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দীতে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে ভারতের মুক্তি অর্জনের যে সকল প্রচেষ্টা হয়েছে সেই সকল ঘটনা ও বিষয় যথাযথভাবে উল্লিখিত হয়নি এবং যথাযথ মর্যাদাও পায়নি। এবং শুধু তাই নয়। অহিংসা পন্থায় বিশ্বাসী এই রাজনৈতিক নেতৃত্ব শাসন ক্ষমতা সাজ করেই ভারতের মুক্তি তীর্থ আন্দামানের বিশিষ্ট এবং ইতিহাস বিখ্যাত স্মৃতিচিহ্ন বেহুলার কারাগারটিকে একেবারে ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন কারে ফেলবার ব্যবস্থা করেন। এবং তাঁদের সেই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ফলে ভারতের অপরিসীম গৌরবমণ্ডিত মংলায় জেলটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ভারতের জনগণের অগোচরে এবং গোপনে ওয়াও একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। তারপর কিছুটা জানাজানি হয়ে যাবার যার সদয় ভারতব্যাপী প্রতিবাদ ধ্বনিত হবার ফলে বাকি অংশটুকুর ধ্বংসের কাজ ভাইপার দ্বীপের ক্ষুদ্র জেলখানা। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৭২ সালে লর্ড মেয়-কে হত্যার প্রায় অব্যবহিত পরেই ক্ষুদ্র জেলে শের আলিকে হত্যা করা হয়েছিল।
ভারতের জনগণের একান্ত ইচ্ছা ভারতের দেশপ্রেমিক শহীদ ও বীর মুক্তি বোরিবোজ্জ্বল স্মৃতিমণ্ডিত ঐতিহাসিক সেলুলার কারাগারটির যথাযথ ওরে গাধাদিজভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। সকলেরই সুদৃঢ় বিশ্বাস দেশের মানুষের প্রতিবাদ ও বিরোধিতায় সেলুলার জেলের আরও ধ্বংস বন্ধ হবে এবং দেশের জনগণের ইচ্ছায় ভারতের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি-সৌধরূপে সেলুলার জেলটিকে সুরক্ষিত করে রাখবার ব্যবস্থা হবে।
এই বইখানি ব্যক্তিগত জীবন আলেখ্য অথবা “নির্বাসিতের স্মৃতিকথা” ধরনের আদৌ লেখা হয়নি। এই ক্ষুদ্র বইখানিতে আন্দামানের এবং বিশেষভাবে বহু ইতিহাসমণ্ডিত সেলুলার জেলের কিছুটা পরিচিতি দেবার চেষ্টা হয়েছে।
খাঁরা আমাদের দেশের অতীতকালের মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক তাঁদের কাছে বইখানি ভালো লাগবে এবং তাঁরা বইখানি পড়ে কিছুটা উপকৃত হবেন বালে আশা করি।
২৯ আগস্ট ১৯৭৭কলকাতা
গণেশ ঘোষ
গণেশ ঘোষ
সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম: ১৯০০। অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলার বিনোদপুরে। বাবা বিপিনবিহারী ঘোষ।
শিক্ষা জীবন শুরু চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় পরিচয় মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে। তাঁর প্রভাবে দেশপ্রেমের হাতেখড়ি। ১৯২১-এ নাগপুর কংগ্রেসে গান্ধীজি অহিংস আন্দোলনের ডাক দিয়ে কলকাতায় এসে অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দলের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে এক বছরের জন্য সশস্ত্র আন্দোলন বন্ধ করার অনুরোধ করলে বিপ্লবীরা তা মেনে নেন। চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে অহিংস আন্দোলন। গণেশ ঘোষ ও তাঁর সহযোগী অনন্ত সিং-এর নেতৃত্বে স্কুল কলেজে ধর্মঘট হলো। ধর্মঘট হলো বার্মা অয়েল কোম্পানিতে, বিভিন্ন কারখানায় এবং চট্টগ্রাম বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজে। ওদিকে চাঁদপুরে আসাম থেকে আসা চা-বাগিচা শ্রমিকদের ওপর গোর্খা সৈন্য লেলিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সমস্ত আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েতে ধর্মঘট হলো। গণেশ ঘোষের বাবাও এই সুবাদে ধর্মঘটে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হওয়ার পর গণেশ ঘোষ কলকাতার মানিকতলায় ন্যাশনাল স্কুল অব এডুকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু কলেজের ক্লাশে না গিয়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক নিয়ে গণেশ ঘোষ মানিকতলার একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরক তৈরির ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। তা পুলিশের নজরে এসে যায়। ১৯২৩ সালে আরও অনেকের সঙ্গে গণেশ ঘোষও গ্রেপ্তার হন। সেই প্রথম পুলিশের মুখোমুখি হন তিনি। যদিও অল্প নয়াস এবং উপযুক্ত প্রমাণাভাবে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালে নতুন করে গোটা বাংলাদেশে বিপ্লবী নেতাদের ধরপাকড় শুরু হয়। ওই বছরের ২৫ অক্টোবর গণেশ ঘোষ গ্রেপ্তার হন। বাংলার বাইরে বিভিন্ন জেলে চার বছর কাটিয়ে ১৯২৮ সালে তিনি ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে গণেশ ঘোষ প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত দিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য হন। জেলে থাকতে আদয়েই আংনিয়েল ব্রিয়েনের লেখা আইরিশ ফ্রিডম বইটি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। করছিছিল বিওলীদের মতো কিছু একটা করার জন্য তাঁর মন উতলা হয়েছিল। ১৯২৯-৩০ জলসেই সুযোগ এল। দেশ তখন নতুন করে গণ-আন্দোলনের জন্য উদ্দীপ্ত। চট্টগ্রামে সূর্য সেনের সুযোগ্য নেতৃত্বে গণেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনুরূপ সেন, সেন (হলু সেন), নির্মল সেন, অনন্ত সিং একটি গোপন শক্তিশালী জঙ্গি গোষ্ঠী জড়ালেন। গৃহীত হলো চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের পরিকল্পনা। ১৯৫০ সালে ১৮ এপ্রিল রাতে বিপ্লবীরা প্রথম আঘাত হানলেন। সূর্য সেনের ঠিক অনুরূপভাবেই ১৯৪৭ সালের পরে অর্থাৎ ভারতবর্ষের উপর থেকে পরসম্পদলোভী ইংরেজ তস্করদের অশুচি স্পর্শের অবসানের পর আন্দামানের আলেখা, আন্দামানের ইতিহাস ভারতের নরনারীর মনে গভীর সম্ভ্রমের, প্রীতির, পবিত্রতার ও শ্রদ্ধার মনোভাব সৃষ্টি করে।
ভারতের মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে আন্দামানের একটি সম্মানের ও গৌরবের স্থান আছে। একমাত্র বর্বর ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসকগণ ও তাদের সমর্থক কিছু সংখ্যক দেশদ্রোহী ভারতের অধিবাসী ভিন্ন অপর কারও সঙ্গেই ভারতবাসীদের এ সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই।
আন্দামান বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ সীমার ঠিক ওপারে ভারত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপ। আন্দামানের যথাযথ নাম ‘আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ’। মোটামুটিভাবে প্রায় ঠিক উত্তর-দক্ষিণে ছড়ানো এবং সামান্য একটি অর্ধ-চন্দ্রাকারে অবস্থিত ক্ষুদ্র বৃহৎ সংখ্যক দ্বীপের সমন্বয়ে এই আন্দমান-দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি হয়েছে। ছোট বড় ২০৪টি দ্বীপের সমষ্টিকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ বলা হয় এবং অনুরূপ ১৮টি দ্বীপের সমষ্টিকে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বলা হয়। সমগ্র আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের স্থলভাগের আয়তন ৮২৯৩ বর্গ কিলোমিটার, তার মধ্যে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আয়তন ৬৩৪০ বর্গ কিলোমিটার এবং নিকোবর দ্বীপসমূহের আয়তন ১৯৫৩ বর্গ কিলোমিটার। ওই সকল দ্বীপগুলির মধ্যে উত্তর আন্দামান, মধ্য আন্দামান, দক্ষিণ আন্দামান এবং বৃহৎ নিকোবর নামের চারটি দ্বীপই আপেক্ষিকভাবে বেশ বড়। আমাদের গঙ্গা নদীর মোহনা থেকে আন্দামানের দূরত্ব ৯৪৫ কিমি এবং মাদ্রাজ বন্দর থেকে দূরত্ব ১১৯১ কিমি। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের দূরত্ব ৭১০ কিমি।
এই দ্বীপসমূহ আগাগোড়া প্রায় সর্বত্রই গভীর অরণ্যে আবৃত এবং নাতিউচ্চ পাহাড়ও প্রায় সর্বত্রই আছে। এইসব পাহাড়ের মধ্যে দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপে অবস্থিত সর্বাপেক্ষা উচ্চতম শৃঙ্গের নাম মাউন্ট হ্যারিয়েট। এই শৃঙ্গের উচ্চতা ৪৫০ মি অর্থাৎ প্রায় ১৪০০ ফুট। এই পাহাড়েরই দক্ষিণ দিকে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রধান শহর এবং শাসনকেন্দ্র পোর্ট ব্লেয়ার অবস্থিত।
একমাত্র এই পোর্ট ব্লেয়ার শহরের নিকটবর্তী দুই একটি স্থান ভিন্ন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে আর প্রায় কোথাও সুস্বাদু অর্থাৎ পানীয় জল পাওয়া যেত না এবং কিছু বছর পূর্বে পর্যন্ত পানীয় জল পাওয়ার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। কেবলমাত্র সমগ্র আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে দুই একটি স্থানে গভীর অরণ্যে আবৃত পাহাড়ের মধ্যে দুই একটি ছোট ঝরনা ছিল সেখানে কিছু সুস্বাদু জল পাওয়া যেত। দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপে প্রায় কোনো মাসই বৃষ্টিহীন নয়। কেবলমাত্র ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং এপ্রিল এই তিনটি মাসেই এই সকল দ্বীপপুঞ্জে অন্যান্য সময় অপেক্ষা বৃষ্টি একটু কম হয়। কিন্তু এই বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখবার কোনো ব্যবস্থা পোর্ট ব্লেয়ারের নিকটবর্তী একটি স্থান ভিন্ন অপর কোথাও ছিল না বলে কোথাও পানীয় জল পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। অতি সম্প্রতিকালে নানাস্থানে এই ব্যবস্থা হয়েছে।
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ‘কালাপানি’ বলেও ভারতের জনসাধারণের কাছে সুপরিচিত। এই নামের একটি ভিত্তিও আছে। কলকাতা থেকে আন্দামানের পথে প্রায় অর্ধভাগ অতিক্রমের পর দেখা যায় সমুদ্রের জলের রং বদলিয়ে গিয়েছে; নীল থেকে জলের রং প্রগাঢ় নীল বরং একেবারে ফাউন্টেন পেনের কালির মতোই গাঢ় কালো রং-এ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। এই পরিবর্তনের কারণ বলা কঠিন। কেউ কেউ বলেন, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের চতুর্দিকের সমুদ্র অতি গভীর বলেই জলের রং অত কালো দেখায়। আবার সমুদ্র-বিজ্ঞান সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলেন, ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের অংশ গভীর নয়, ওই অংশে কোথাও ১৫০ ফুটের বেশি গভীরতা নাই।
যাই হোক, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী চতুর্দিকের ওই কালোজল হাজারের আবাসভূমি। এই হাঙ্গরেরা অত্যন্ত হিংস্র এবং তাদের পরিমাণও অসংখ্য। এই সকল দ্বীপপুঞ্জের চতুর্দিকের জল মানুষের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওই জলে গাঁতার কেটে কয়েক মিনিট বেঁচে থাকার কথা চিন্তা করাও নাকি অসম্ভব ও অবাস্তব।
পৃথিবীর আদিম মানুষদের কিছু সংখ্যক মানুষ বরাবরই অর্থাৎ বহু সহস্র বৎসর মার আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাস করছে। এখনও সেই মানুষদের কিছু সাকিঞ্চিৎকর অংশ আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অগম্য গভীর অরাণো সভ্যজগৎ থকে দূরে সভ্য মানুষের দৃষ্টি এবং নাগালের বাইরে বাস করছে। গত একশত বছরে আদির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং ভয় হচ্ছে আগামী একশো বছরে কারী হয়তো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তারা কৃষ্ণবর্ণ এবং খর্বকায়। ইংরেজিতে এক বলে পিগমী’ (Pigmy)। বন্যজন্তু শিকার ও সমুদ্রের মৎস্য শিকারই তাদের শ্রীদারগের একমাত্র উপায়। তারা কিন্তু আগুনের ব্যবহার জানে এবং শুড় গায়া দিয়ে ঘরও বানাতে পারে। নর-বিজ্ঞানীরা বলেন আন্দামান-নিকোবর স্ত্রীর এই আদিম অধিবাসীদের মোটামুটিভাবে চারভাগে ভাগ করা যায়; এক ‘কারোয়া’ বলা হয়, দ্বিতীয় অংশকে ‘ওঙ্গি’। তৃতীয় অংশকে ‘সেন্টিনেলিস’ এবং চতুর্থ অংশকে ‘আন্দামানী’ বলা হয়। এদের মধ্যে জারোয়ারাই সর্বাপেক্ষা জেদি, দুর্ধর্ষ, সংগ্রামশীল এবং সভ্য জগতের সংস্পর্শে আসবার ঘোরতর বিরোধী।
আন্দামানের এই আদিম মানুষেরা আজও কৃষি কাজ ও খেতখামারের কাজ জানে না। তারা পশুপালনও জানে না; কিন্তু তারা কেবলমাত্র কুকুর পোষে, বন্য জন্তু বিশেষভাবে বন্য শুকর শিকারে কুকুরের সাহায্য পাওয়া যায়, এইজন্য। ওই সকল আদিম বন্য মানুষদের এক একটি পরিবারের কাছে প্রায় নাকি ১২-১৪টি কুকুর থাকে।
এইসকল আদিম মানুষ পূর্বে সভ্য মানুষের এবং সভ্য জগতের ঘোরতর বিরোধী ছিল। ১৮৫৯ সালে পোর্ট ব্লেয়ার প্রায় আবার নতুন করে স্থাপিত উপনিবেশের বিরুদ্ধে ওই সকল আদিম মানুষ প্রচণ্ড আক্রমণ করে। পোর্ট ব্লেয়ারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘এবারডিন বাজার’ অঞ্চলেই সরকারের সশস্ত্র পুলিশ ও ফৌজের সঙ্গে ওই সকল আদিম মানুষের যুদ্ধ হয়েছিল। ‘এবারডিনের যুদ্ধ’ বলেই ঐতিহাসিক নথিপত্রে ওই সংগ্রামের উল্লেখ আছে।
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ওই সকল আদিম মানুষের মধ্যে ‘ওঙ্গি’-রাই খুব নমনীয় এবং সভ্য জগতের সংস্পর্শে আসবার বিরোধী নয়; বরং ওঙ্গিদেরই বহু সংখ্যক মান্য সভ্য মানুয়ের সংস্পর্শে এসে খুব প্রভাবান্বিত হয়েছে এবং তাদের জীবন পদ্ধতির মধ্যেও বেশ কিছু পরিমাণে পরিবর্তন এনেছে। ওঙ্গিরা ঘাস পাতা দিয়ে একপ্রকার আচ্ছাদন তৈরি করতে পারে যা ওঙ্গি মেয়েরা তাদের কোমরের নিচে পরিধান করে।
জারোয়ারা অত্যন্ত দুর্দমনীয় এবং সভ্য মানুষমাত্রকেই ওরা শত্রু মনে করে ও বিষাক্ত তির দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। ওদের বর্তমানের এই অনমনীয় জেদ ও সভ্যতা-বিরোধী মনেভাবের কিছুটা বাস্তব কারণও আছে; ওরা সভ্য মানুষদের কাছে সম্পূর্ণ বিনা কারণে যথেষ্ট প্ররোচনা পেয়েছে। ১৯২১ সালে আন্দামানের ইংরেজ শাসকেরা অবিবেচকের ন্যায় শুধুমাত্র কৌতুকপরায়ণতার বশবর্তী হয়ে জারোয়াদের কিছু সংখ্যক মানুষকে ধরে নিয়ে আটক করে রাখে। এর ফলে জারোয়ারা উত্তেজিত হয়ে কিছু কিছু এমন কাজ করে, যার জন্য স্থানীয় শাসকেরা মনে ভাবে যে তাদের সম্ভ্রমহানি হচ্ছে। তাই জারোয়াদের শিক্ষা দেবার জন্য এবং ইংরেজ সরকার যে অপরিসীম শক্তির অধিকারী সে কথা ওই সকল অসভ্য বন্য জারোয়াদের ভালো করে বুঝিয়ে দেবার জন্য ১৯২৩ সালে ৩৭ জন জারোয়াকে ইংরেজ শাসকদের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর থেকে জারোয়ারা আর সা মানুষদের বিশ্বাস করে না এবং সভ্য জগতের সংস্পর্শে আসবার ঘোরতর বিরোধী হয়ে পড়েছে। তাদের এই মনোভাব আজও অক্ষুণ্ণ আছে। জারোয়ারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সম্পূর্ণ উলঙ্গ থাকে।
‘আন্দামানীরা’ও পূর্বে সভ্য জগতের সংস্পর্শে আসবার ঘোরতর বিরোধী ছিল এবং ভারত ভূখণ্ডের মানুষের আন্দামানে উপস্থিতিকে তারা অনধিকার প্রবেশ বলেই মনে করত। ১৮৫৮ সালে স্বাধীনতাকামী ভারতের বিদ্রোহী ও ইংরেজ-বিরোধী দেশপ্রেমিক ভারতীয়দের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসনে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন করে আবার পোর্ট ব্লেয়ারে উপনিবেশ স্থাপন করে তখন প্রধানত এই ‘আন্দামানী’রাই দলবদ্ধভাবে ১৮৫৯ সালে পোর্ট ব্লেয়ার আক্রমণ করে এবং সরকারের বন্দুকের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র তির ধনুক দিয়েই সুদৃঢ়ভাবে লড়াই করে যায়। উপরে ‘এবারডিনের যুদ্ধ’ বলে এই ঘটনাকেই বলা হয়েছে।
পরবর্তীকালে অবশ্য এই ‘আন্দামানী’রাই যথেষ্ট নমনীয় এবং উদার মনোভাবাপন্ন হয়েছে এবং সভ্যতার সংস্পর্শে এসেছে। এখন তারা প্রায় সকলেই কিছু কিছু বস্ত্র পরিধান করে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাঙা হিন্দিতে কিছু কথা বলতেও পারে। সেন্টিনেলিরাও জারোয়াদের মতোই জেদি এবং তাদের সভ্য জগতের সংস্পর্শে আসবার বিরোধী। নৃতত্ত্ববিদেরা মনে করেন এই সেন্টিনেলিরা জারোয়াদেরই একটি অংশ মাত্র এবং তারা সেন্টিনেল দ্বীপের মধ্যেই বসবাস করে। এই সেন্টিনেল দ্বীপ দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপসমূহের মধ্যেই একটি দ্বীপ মাত্র।
কোনো কোনো ভূবিজ্ঞানী মনে করেন, বহু লক্ষ বৎসর পূর্বে বর্মা, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে (এর ভিতর আন্দমান, নিকোবর দ্বীপসমূহও অন্তর্ভুক্ত) এক বিস্তীর্ণ স্বভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সেই সময়ে সমুদ্র আরও বহুদূর দক্ষিণে ছিল। পরবর্তীকালে বিরটি বিরাট ভূ-কম্পনের ফলে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে সেই বিস্তীর্ণ স্বরাগ একসময়ে নিমজ্জিত হয়ে গিয়ে বর্তমান অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সেই ভূ-বিজ্ঞানীরা জারিও মনে করেন সেই বিস্তীর্ণ ভূভাগের উপর যে বিরাট বিরাট পাহাড় ছিল এবং নিকল পাহাড় জলমগ্ন হয়ে যায়, সেই নিমজ্জিত পাহাড়ের যে সকল শীর্ষস্থানসমূহ উপর রয়েছে তাই বর্তমানে আন্দমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পরিণত হয়েছে। এবৎসর পূর্বেকার সেই সংযুক্ত ভূভাগের জন্যই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপে আর মানুষদের অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে বলে নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানীরা মনে করেন। *জারও মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে এমনকি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন দেশের সরদের আগমন ও ভ্রমণের কথা ইতিহাসে উল্লিখিত আছে। প্রায় এই সময় থেকেই আরব বণিকেরাও এই অঞ্চলে যাতায়াত করতেন। নবম শতাব্দীতে আরব বণিকদের লেখা থেকে আন্দামান দ্বীপের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁরা আন্দামানের অধিবাসীদের ‘আঙ্গামানিয়ান’ বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে, ওই সকল দ্বীপের নাম ‘আন্দামান’ হওয়ার এইটিও একটি কারণ হতে পারে। মালয়েশিয়ার মানুষ এই সকল দ্বীপকে ‘হন্দুমান’ বলে বলতেন, পরবর্তীকালে সম্ভবত এই কথাটিই বিকৃত হয়ে ‘আন্দামানে’ রূপান্তরিত হয়েছে।
একাদশ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের চোল রাজাদের তাঞ্জোর শিলালিপিতে নিকোবর দ্বীপসমূহের সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। ওই সকল শিলালিপিতে এই সকল দ্বীপসমূহকে (অর্থাৎ নিকোবর দ্বীপসমূহকে) ‘নাক্কাভরম’ বলে বলা হয়েছে। ‘নাক্কাভরম’ অর্থ নগ্ন মানুষের দেশ। মধ্যযুগের পর্যটকেরা এবং তারও পরে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ডেনমার্ক ও সুইডেন দেশের নাবিকেরাও নিকোবর দ্বীপ-সম্পর্কে এই নামই ব্যবহার করেছেন। সম্ভবত এই ‘নাক্কাভরম’ পরবর্তীকালে আধুনিক ‘নিকোবর’ নামে। পরিণত হয়েছে।

@গণেশ ঘোষ
@freemang2001gmail-com



