Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

মার্কসবাদ—এমিল বার্নস

মার্কসবাদ হল আমাদের এই জগৎ এবং তারই অংশ মানবসমাজ সম্বন্ধে সাধারণ তত্ত্ব। এর নামকরণ হয়েছে কার্ল মার্কসের (১৮১৮-১৮৮৩) নাম অনুসারে। মার্কস্  ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে একযোগে বিগত শতাব্দীর মধ্য ও শেষভাগে এই তত্ত্বকে রূপায়িত করেন।

মানবসমাজ  বর্তমানে যে অবস্থায় আছে সেখানে কিভাবে এলে পৌঁছেছে, সমাজে পরিবর্তন কেন হয় এবং ভবিষ্যৎ মানুষের ইতিহাসে কি কি পরিবর্তন দেখা দেবে-এইসর প্রশ্নের উত্তর তাঁরা খুঁজেছিলেন। অনুসন্ধানের ফলে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সামাজিক পরিবর্তনগুলি কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। সেগুলিও বহিঃপ্রকৃতির পরিবর্তনের মতো কতকগুলি নিয়ম অনুসারে ঘটে। এই সত্যের ভিত্তিতেই সমাজ সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব খাড়া করা দরকার হয়। সেই তত্ত্ব মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার বনিয়াদের উপর.. প্রতিষ্ঠিত।

সমাজ সম্বন্ধে ধর্মবিশ্বাস, জাতি (৫৯০০), বীরপুজা, ব্যক্তি-বিশেষের অভিরুচি, আকাশকুসুমের স্বপ্ন ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়া যেসব অস্পষ্ট ধারণা এতদিন প্রচলিত ছিল এবং এখনও আছে-মার্কসীয় তত্ত্ব সে-সবগুলির বিরোধী।

মার্কস সেই সাধারণ তত্ত্বকে তাঁর সমসাময়িক সমাজের, বিশেষ করে পুঁজিবাদী ব্রিটেনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এইভাবেই পুঁজিবাদ সম্বন্ধে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্বের সৃষ্টি হয়। কিন্তু মার্কস সর্বদাই এই দৃঢ় অভিমত প্রকাশ করেছেন যে তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বকে তাঁর ঐতিহাসিক ও সামাজিক তত্ত্বের থেকে কোনমতে পৃথক করা চলে না। মুনাফা ও মজুরিকে কিছুদূর পর্যন্ত বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক সমস্তা হিসাবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু যে ছাত্রের উদ্দেশ্য বিমূর্ত বিচারের পরিবর্তে বাস্তব জীবনকে অধ্যয়ন করা,, তিনি নীয় ঐ সীমা অতিক্রম না করে পারেন না। তিনি বুঝতে পারেন যে মুনাফা ও মজুরির প্রশ্নকে বুঝতে হলে মালিক’ এবং শ্রমিকদেরও আলোচনার বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। তেমনিই ইতিহাসের যে বিশেষ স্তরে তারা বাস করে, সেই স্তরটিকে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো সমাজে বিকাশ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিও গড়ে উঠছে অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাস ও পৃথিবী সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে। তাই (তত্ত্ব হিসাবে মার্কসবাদের শেষ সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়নি। যতই ইতিহাসের অগ্রগতি হয় এবং মানুষ অধিকতর পরিমাণে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকে ততই মার্কসবাদও ক্রমাগত সমৃদ্ধ হতে থাকে। তাকে নূতন সংগৃহীত তথ্যগুলির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। মার্কস এবং এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর এই দিক দিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান দিয়েছেন ভুলাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭۰۰ ১৯২৪) এবং জোসেফ স্তালিন। রুশিয়ার নূতন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে লেনিনের অসমাপ্ত কাজের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান স্তালিন।

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাহায্যে যে জানলাভ করা যায় তার দ্বারা বহিঃপ্রকৃতিকে পরিবর্তিত করা যায়। ঠিক তেমনিই (সমাজকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অধ্যয়নের দ্বারা যে জানলাভ হয় তাকে সমাজকে

পরিবর্তিত করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত থেকে আর একটি কথাও ‘স্পষ্ট হয়। সমাজের গতি যেসব সাধারণ নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেগুলি বহির্জগতের সাধারণ নিয়মের মতো একই ধাঁচের। মানুষ ও জড় পদার্থ-উভয়ের ক্ষেত্রে সার্বজনীন ভাবে প্রযোজ্য নিয়মগুলিকে আশ্রয় করেই মার্কসীয় দর্শন বা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি রূপায়িত হয়েছে।

পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে কতকগুলি অত্যন্ত আশু জরুরী ক্ষেত্রে মার্কসীয় তত্ত্বের বিষয় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু মার্কসবাদ সম্বন্ধে জানলাভে যাঁরা উৎসুক তাঁদের গোড়াতেই একটি কথা বোঝা প্রয়োজন। (মার্কসবাদ স্বীকৃতি দাবি করে সত্য  হিসাবে, কোনো বিমূর্ত নৈতিক সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে নয়। আর যেহেতু তা লতা, তাই আজিকার পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ ও অভিশাপের ত্রাস থেকে মানবতাকে মুক্তিদানের কাজে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করা সম্ভব এবং কর্তব্য। সেই পথই সমস্ত নরনারীকে সমাজের এক উন্নততর স্তরে পরিপূর্ণ বিকাশের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করবে।

সমাজের বিকাশের নিয়ম

মানুষের ইতিহাসকে সাধারণত জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের কাহিনী বা দুই একজন রাজা বা সেনাপতি কিংবা রাষ্ট্রনায়কের কীর্তি-কথা রূপে চিত্রিত করা হয়। কখনও ‘কখনও এই সব লোকের উদ্দ্বেন্তকে নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন-কোনো ব্যক্তি নেহাতই তাঁর উচ্চাশার দরুন অন্য দেশ জয় করেন অথবা তাঁর নীতি বা দুর্নীতিপরায়ণতার দরুন বিশেষ বিশেষ কাজ করেন ইত্যাদি। কখনও বা ঐসব ব্যক্তির কার্যকলাপকে স্বদেশের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার সঙ্কল্প বা ধর্মবিশ্বাসের যারা অনুপ্রাণিত বলে দেখানো হয়।

ইতিহাস সম্পর্কে এইরূপ দৃষ্টিভঙ্গিতে মার্কসবাদ সন্তুষ্ট নয়।

প্রথমত, মার্কসবাদের মতে জনসাধারণই হল প্রকৃত ইতিহাস-বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ব্যক্তিবিশেষ সম্বন্ধে আলোচনা করা যেতে পারে শুধু সেই পরিমাণে, যে পরিমাণে তাঁর মধ্যে ব্যক্তির চেয়েও ব্যাপকতর কিছু অর্থাৎ জনসাধারণের কোনো না কোনো আন্দোলন মূর্ত হয়েছে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, ক্রমওয়েলের কথা ধরা যেতে পারে। ক্রমওয়েলের গুরুত্বের কারণ তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যক্তিগত কার্যকলাপ নয়। তিনি পুরাতন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইংরাজ জনসাধারণের এক অংশের সংগ্রামে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, সেইজন্নই তাঁর গুরুত্ব। তিনি এবং তাঁর আন্দোলন সামন্তবাদের বাধাগুলিকে ভেঙে ফেলে ব্রিটেনে পুঁজিবাদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। তিনি কতগুলি যুদ্ধ করেন তার তালিকা বা তাঁর ধর্মবিশ্বাদ, অথবা তিনি যে সব কূট চক্রান্ত করেছিলেন ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনাই মুখ্য জিনিস নয়। জানার বা বোঝার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, ব্রিটেনের উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার বিকাশে ক্রমওয়েলের অবদান কতটুকু? আর জানা প্রয়োজন যে কেন সেই যুগে এবং বিশেষভাবে ব্রিটেনে সামন্তপ্রথা ও তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রবল হয়ে উঠেছিল? কি কি পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেই যুগে? এইগুলিই ইতিহাস-বিজ্ঞানের গোড়ার কথা বা ভিত্তি। এইভাবে কোনো যুগের ও সেই সঙ্গে অন্নান্ত যুগ এবং জাতির ইতিহাস অধ্যয়নের দ্বারা অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে সাধারণ তত্ত্ব খাড়া করা যায়। এইভাবেই জানা যায় সমাজ বিকাশের নিয়মগুলিকে। সে নিয়ম রসায়ন এবং বিজ্ঞানের অন্যান্ন শাখার নিয়মের মতোই সত্য। একরার সেই নিয়মগুলিকে জানার পর আমরা অন্ত্যান্ত বৈজ্ঞানিক নিয়মের মতোই সেগুলিকে কাজে লাগাতে পারি। তাদের সাহায্যে আমরা যে শুধু আগামী দিনের সম্ভাব্য ঘটনা সম্বন্ধে ভরিাদ্বাণী করতে পারি তাই নয়, এমন ভাবে কর্মধারাকে পরিচালনা করতে পারি যাতে সেই ভবিয়যান্ট কাজে পরিণত হয়।

সুতরাং মার্কসবার ইতিহাস-অধ্যয়নের দ্বারা সমগ্র মানব-ইতিহাসের পশ্চাতে যে সব প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করে সেগুলিকে খুঁজে বার করতে চায়। তাই তার অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু হল। জনসাধারণ, ব্যক্তিবিশেষ নয়। জনসাধারণের জীবনকে অধ্যয়নের। ফলে দেখা যার যে সমাজের আদিম যুগের পর থেকেই মানুষ বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেই অংশগুলি পরস্পরবিরোধী প্রবৃত্তি নিয়ে কাজ করে। এক অংশের সঙ্গে অপর অংশের এই বিরোধ দেখা দেয় ব্যক্তিহিসাবে নয়, শ্রেণী হিসাবে।

শ্রেণী কি? খুব সহজ ভাষায়, একই প্রণালীতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে সমাজের এইরূপ এক একটি অংশ হল এক একটি শ্রেন্টি। যেমন সামন্তসমাজে দেখা যায় যে, রাজা ও সামন্তপ্রভুদের জীবন-যাত্রার ভিত্তি ছিল ভূমিদাসের নিকট থেকে আদায় করা কর। ভূমিদাসেরা প্রধানত জমিতে ফসল উৎপাদন করত এবং তারা কায়িক পরিশ্রমের দ্বারা অথবা ফসলের অংশ দিয়ে প্রভুকে কর দিতে বাধ্য ছিল। সামন্তপ্রভুরা ছিল একটি শ্রেণী এবং শ্রেণী হিসাবে তাদের স্বার্থ ছিল অভিন্ন। তাদের সকলের একই উদ্দেশ্য ছিল অর্থাৎ ভূমিদাসদের পরিশ্রমের ফল প্রভুদের হাতে তুলে দেওয়ার বঙ্গলে যত বেশী পরিমাণে সম্ভব নিজ নিজ পরিবারের প্রয়োজনে ব্যবহার এবং নিজ নিজ স্বার্থে কাজ করার স্বাধীনতা। তাদের প্রভুরা ছিল একাধারে আইন-রচয়িতা এবং বিচারক। সেই সব প্রভুদের কঠোর ব্যবহারের অবসানও ভূমিদাসদের কাম্য ছিল। (একজন অ্যাংলো-চায়ন লেখক নিম্নলিখিত কথাগুলির যারা একজন ভূমিবাধের মনোভাব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাকে প্রভুর জমিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হত। ‘মহাশয়! আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। খুব ভোরে উঠে বলদগুলিকে নিয়ে মাঠে যাই এবং তাদের লাঙ্গলের সঙ্গে জুতে কাজ শুরু করি। যত শীতই পড়ুক না কেন, প্রভুর ভয়ে আমি ঘরে থাকার সাহস করি না। কিন্তু প্রত্যেক দিন আমাকে পুর্বা এক একর জমি বা তার বেশী চাষ করতে হয়।”)

তাই প্রত্যেক দেশেই সামন্তযুগীয় সমাজে প্রভু ও ভূমিদাসদের * আইলিন পাওয়ায় কর্তৃক “মধ্যযুগের জনসাধারণ” নামক বই হইতে উদ্ধৃত। ভিতর বিরামহীন সংগ্রাম চলেছে। কখনও হয়তো সেই সংগ্রাম চলেছে ব্যক্তিগতভাবে অথবা কখনও একদল ভূমিদাস মিলে তাদের বিশেষ প্রভুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আবার কখনও সেই খন্দ ব্যাপকরূপে দেখা দিয়েছে। বহুসংখ্যক ভূমিদাস তাদের জীবনযাত্রার সাধারণ অবস্থায় পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে জবস্ এবং ওয়াটটাইলারের নেতৃত্বে যে কৃষক বিদ্রোহ হয় তা এইরূপ সংগ্রামেরই উদাহরণ। ভূমিদাস বা কৃষকদের অনুরূপ বিদ্রোহ জার্মানি, রুশিয়া এবং আরও অনেক দেশেই ঘটে। তাছাড়া ছোটখাটো সংঘর্ষ এবং লড়াই চলত সর্বদাই।

প্রভুর জমি চাষ করার বাধ্যবাধকতা ছাড়াও ভূমিদাসদের নানাধরনের জিনিস দিয়ে কর দিতে হত। শুধু নিজেদের জমির কদলের অংশই নয়, ভূমিদানেরা ও তাদের পরিবার হস্তশিল্পের দ্বারা যে সব জিনিস তৈরি করত তারও একটা অংশ প্রভুকে দিতে বাধ্য ছিল। কতকগুলি বিশেষজ্ঞ উৎপাদক ছিল, যেমন, অস্ত্রশস্ত্র এবং যন্ত্রপাতির কারিগরেরা। আর ছিল বণিকের দল, তারা অপরের উৎপন্ন দ্রব্যের উদ্বৃত্ত অংশ কিনে নিয়ে অন্য দেশ ও অঞ্চলের উৎপন্ন দ্রব্যের সঙ্গে বিনিময় করত। ব্যবসায় বাণিজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বণিকদের চাহিদা বেড়ে চলে। তখন আর তারা ভূমিদাসদের দ্বারা উৎপন্ন দ্রব্যের উদ্বৃত্ত অংশ অর্থাৎ প্রভুদের প্রয়োজন মিটানোর ণয় যা অবশিষ্ট থাকে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। তাই বণিকেরা নিজেরাই বাজারের জন্ম সংগঠিত উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশে উভোগী হয়। এই কাজে নিযুক্ত হয় সেই সব ভূমিদাসেরা খারা হয় প্রভুদের দয়ায় মুক্তিলাভ করেছিল অথবা প্রভুদের কবল থেকে পালিয়ে শহরে এসেছিল। তারা সর্বক্ষণের পরিশ্রমের জন্ম নিযুক্ত হয়। অনেক মুক্ত ভূমিদাস নিজেরাও শহরে এসে স্বাধীন কারিগর-রূণে কাজ শুরু করে, তাদের পণ্য ছিল প্রধানত কাপড়, ধাতুনির্মিত জিনিসপত্র ইত্যাদি। স্থানীয় চাহিদা মিটানোই ছিল সামন্তযুীয় উৎপাদন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য। কিন্তু উপরোক্তভাবে, ধীরে ধীরে, বহু শতাব্দী ধরে, সেই উৎপাদন ব্যবস্থার ভিতরেই গড়ে ওঠে নূতন উৎপাদন-প্রথা। সে প্রখার উদ্দ্বেস্ত বাজারের চাহিদা মিটানো এবং তা স্বাধীন কারিগর ও মজুরদ্রের মালিকদের দ্বারা পরিচালিত। স্বাধীন কারিগরেরাও ক্রমে মজুরের মালিকে পরিণত হয় এবং মজুরি দিয়ে লোক খাটানো শুরু করে। এইভাবে ষোড়শ শতাব্বী থেকে নূতন এক শ্রেণীর অভ্যুদয় হতে থাকে। তাঁ হল শিল্পপতি ধনিক শ্রেণী। আর তার ‘ছায়া’ হিসাবে সেই সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিক শ্রেণী। অন্নদিকে গ্রাম অঞ্চলেও পুরাতন সামন্ত সমাজের বাধ্যবাধকতা ভেঙে পড়ে। কায়িক শ্রমের যারা করের পরিবর্তে টাকায় খাজনা দেওয়ার প্রখ্য প্রচলিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিদাসেরা রূপান্তরিত হয় নিজ নিজ ভূমিখণ্ডের মালিক স্বাধীন চাষীতে। ভূস্বামীরাও নিজের জমি চাষের শুরু মজুরি দিয়ে শ্রম-শক্তি ক্রয় শুরু করে। এইভাবে একদিকে কৃষি-পুঁজিপতিদের উদ্ভব হয় এবং সেই সঙ্গে গড়ে ওঠে মজুরির উপর নির্ভরশীল ক্ষেত-মজুরের দল।

কিন্তু শহরে ও গ্রামে পুঁজিপতি শ্রেণীর অভ্যুদয়ের ফলে পুরাতন। শাসকশ্রেণী অর্থাৎ সামন্ত প্রভুদের ক্ষমতা আপনা থেকেই ধ্বসে গড়েনি। বরং দেখা গেছে যে রাজতন্ত্র, অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায় এবং গীর্জা বা পুরোহিত সম্প্রদায় নবজাত পুঁজিবাদকে নিজ স্বার্থে ব্যবহারের জন্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে, যে সব ভূমিদাস মুক্তিলাভের পর বা পলায়ন করে শহরে এসে বসবাস শুরু করেছিল তারা প্রভুদের কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা (সে কর কায়িক শ্রম বা ফসলের অংশ বা নগদ টাকা যে রূপেই হোক না কেন) থেকে নিস্তার লাভ করে। কিন্তু তাদেরই বংশধরেরা ধনশালী হয়ে ওঠার পর উপলব্ধি করে যে তারা প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন হতে পারেনি। রাজা এবং অভিজাত শ্রেণী তাদের নানারকম ট্যাক্স দিতে বাধ্য করে, ব্যবসায়ের উপর নানারূপ বিধিনিষেধের বোঝা চাপায় এবং উৎপাদনের অবাধ বিকাশের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

বাজা এবং পুরাতন অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায় যে ঐসব কাজ করতে পারত তার কারণ রাষ্ট্র-যন্ত্র ছিল তাদেরই দখলে। সশস্ত্র সেনাবাহিনী, বিচারক এবং জেলখানা ইত্যাদি ছিল তাদের মুঠোর ভিতর। আইন প্রণয়ন করত তারাই। সুতরাং পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপত্তির ফলে শ্রেণীদ্বন্দেরও নূতন নূতন রূপ দেখা দিল। পুঁজিপতি শ্রেণীকে শুরু করতে হল রাজতন্ত্র ও সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে বহু শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম। কয়েকটি অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ দেশে যে সংগ্রাম আজও চলেছে, কিন্তু কতকগুলি দেশে, যেমন ব্রিটেনে ও ফ্রান্সে তার পরিসমাপ্তি হয়েছে।

কিভাবে হয়।                                                                                                                                      পুঁজিপতি শ্রেণী সশস্ত্র বিপ্লবের দ্বারা পুরাতন সামন্ত-শাসকদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়। অ্যান্ত দেশের তুলনায় ব্রিটেনে অনেক আগেই এই স্তরটি উপস্থিত হয়। সেখানে নানারকম ট্যাক্সের বোঝা এবং বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে উদীয়মান পুঁজিপতি শ্রেণীর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চরম পর্যায়ে পৌঁছে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ঐসব বিধিনিষেধ পুজিবাদী উৎপাদন-প্রথার বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। পুঁজিপতিরা প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে যথা রাজার নিকট আবেদন, ট্যাক্স দিতে অস্বীকার প্রভৃতি উপায়ে ঐ বাধাগুলি অপসারণের চেষ্টা করে কিন্তু এভাবে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কোনো সুদূরপ্রসারী ফললাভ করা সম্ভব হয়নি। কাজেই পুঁজিপতিরা শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়। তারা তখন রাজার বিরুদ্ধে এবং খামখেয়ালীভাবে ট্যাক্স চাপানো ও ব্যবসায়ের উপর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে জনমত জাগ্রত করার কাজে প্রবৃত্ত হয়। সামন্তপ্রগার বাঁধন ভাঙার সমস্ত রকম চেষ্টার শান্তি স্বরূপ রাজার বিচারকেরা গিরেফতারি পরোয়ানা জারি, জরিমানা এবং অন্তান্ত্য দণ্ড বিধান করত। সে সবের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রবল হয়ে ওঠে। মোদ্দা কথার পুঁজিপতি শ্রেন্টকে সশস্ত্র বিপ্লব সংগঠনের পথ নিতে হয়। পুরাতন শাসকশ্রেণীকে সামরিক শক্তির সাহায্যে পরাস্ত করার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণী রাজা এবং অত্যাচারের পুরাতন রূপগুলির বিরুদ্ধে জনষণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব করে। এই অভ্যুত্থানের সাফল্যের ফলেই পুঁজিপতি শ্রেণী শাসকশ্রেণীরূণে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন তারা পুঁজিবাদের অগ্রগতির সমস্ত বাধাকে চূর্ণ করা এবং সেজন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়নের কাজে হাত দিতে পারে।

একথা খুবই সত্য যে বেশীর ভাগ ইতিহাস পুস্তকে ইংল্যান্ডের এই পুঁজিবাদী বিপ্লবকে দেখানো হয়েছে বোমান-ক্যাথলিক মনোভাবাপন্ন স্বৈরাচারী রাজা প্রথম চার্লসের বিরুদ্ধে সংগ্রামরূপে, আর ক্রমওয়েলডক ক্যাথলিক-বিরোধী এবং ব্রিটিশ স্বাধীনতার মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত একজন অতি শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাপারটিকে নীতিগত ও ধর্মীয় সংগ্রামরূপে উপস্থাপিত করা হয়েছে। মার্কসবাদ কেবল ব্যক্তি বা সংগ্রামের আওয়াজগুলির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে। সেই দৃষ্টিতে তখনকার যুগের সংগ্রামের মর্ম হল পুরাতন সমস্ত প্রভুশ্রেণীর বিরুদ্ধে উদীয়মান পুঁজিপতি শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের লড়াই। বস্তুত ঐ সময়টি ছিল একটি পরিষ্কার যুগসন্ধিক্ষণ; উপরোক্ত বিপ্লব এবং ১৬৮৯ সালে তার দ্বিতীয় স্তরে পুঁজিপতি শ্রেণী বাষ্ট্র-পরিচালনায় এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

ইংল্যাণ্ডে, বিকাশের গোড়ার দিকে পুঁজিবাদী বিপ্লব ঘটায় সেখানে পুঁজিপতিদের জয় সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্ত হতে পারেনি। ফলে একদিক দিয়ে যেমন পুরাতন সামন্ত সম্বন্ধের অনেক কিছু ধ্বংস হয় অন্নদিকে তেমনি ভূস্বামী সম্প্রদায় বহুল পরিমাণে বজার থেকে যায়। এদের মধ্যে এমন অনেক লোক ছিল যারা শহরে ধন উপার্জন করে। ভূস্বামীতে পরিণত হয়েছিল। পুরাতন ভূস্বামীরা পুঁজিপতি-ভূস্বামীরূপে বিকাশ লাভ করে। তারা নূতন ধনিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে পরবর্তী দুই শতাব্দী পর্যন্ত রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রাখে।

কিন্তু ফ্রান্সে সমগ্র প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অনেক পরে এবং সেখানে ১৭৮৯ সালের আগে পুঁজিবাদী বিপ্লব ঘটেনি। তাই সেখানে অব্যবহিত পরিবর্তনগুলি অনেক হুদূরপ্রসারী হয়। মার্কসবাদীদের মতে তার কারণ এই নয় যে রুশো প্রমুখ লেখকেরা মানুষের অধিকারের কথা ঘোষণা করে বই লিখেছিলেন কিংবা বিপ্লবেয় জনপ্রিয় ধ্বনি ছিল ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’। ক্রমওয়েল-বিপ্লবের সারবস্তু ছিল শ্রেণীদ্বন্দ্ব, ধর্মীয় আওয়াজ নয়। ঠিক তেমনি, ফরাসী বিপ্লবের প্রাণবন্ধকে অনুসন্ধান করতে হবে ফ্রান্সের, তৎকালীন শ্রেণী-সম্বন্ধের ভিতরে, পতাকায় খচিত স্ন্যায়ের বিমূর্ত নীতির মধ্যে নয়।

এই ধরনের যুগ সম্বন্ধে মার্কস বলেন “কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে বিচার করার সময় যেমন আমরা তার নিজের সম্বন্ধে অভিমতকে ভিত্তিরূণে গ্রহণ করি না, তেমনি কোনো বিপ্লবী যুগকে নিজের সম্বন্তে তার চেতনার সাহায্যে বিচার করা চলে না।” কোনো বিপ্লবী যুগকে বোঝার জয়া যে জিনিসটির দিকে নজর দেওয়া সবচেয়ে বেশী জরুরী তা হল কোন্ কোন্ শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতার জন্ত পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করছে। হয়তো উদীয়মান শ্রেণীর নেতারা বুঝে বা না বুঝে প্রচার করতে পারেন যে তাঁদের লড়াই কতকগুলি বিমূর্ত আদর্শ বা প্রশ্নের লড়াই, সেগুলির সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে শ্রেণী-স্বার্থ বা শ্রেণীগত ক্ষমতার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নাও থাকা সম্ভব। তবুও নূতন শ্রেণী কিভাবে পুরাতনের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় সেইটিই আসল বিচার্য বিষয়।

মার্কসীয় ইতিহাস দৃষ্টি অনুসারে যুধ্যমান শ্রেণীগুলির দ্বন্দ্বই সমাজ-বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। সমাজে শ্রেণীভেদ এবং নূতন শ্রেণীর অভ্যুদয় হয়ে থাকে জীবনযাত্রার পক্ষে প্রয়োজনীয় উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশের স্তর অনুসারে। শক্তিচালিত যন্ত্রের আবিষ্কার উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুগান্তর আনয়ন করে, কিন্তু তার তাৎপর্য এইটুকুতে সীমিত নয়। সে আবিষ্কার চরকা এবং হস্তচালিত তাঁতের সাহায্যে উৎপাদনে নিযুক্ত লোকদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, শক্তিচালিত যন্ত্রের সাহায্যে একজন শ্রমিক একদিনে যা উৎপাদন করে, হস্তচালিত যন্ত্রের সাহায্যে একজন কারিগর তা উৎপাদনের জ্য সাত দিন সময় নেয়, সুতরাং কারিগরের পক্ষে এরূপ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। ফলে স্বীয় যন্ত্রপাতির মালিক ব্যক্তিগত উৎপাদকের স্থানে এখন গড়ে উঠল দুই ধরনের লোক-একদিকে পুঁজিপতি শ্রেন্ট, তারা শক্তিচালিত যন্ত্রের মালিক, নিজে হাতে যন্ত্র চালায় না; আর অন্যদিকে দেখা দিল শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকশ্রেণী, উৎপাদনের সাধনগুলির উপর তাদের কোনো গহ নেই, তারা মজুরির বিনিময়ে মালিকের জন্য কাজ করে।

উপরোক্ত পরিবর্তন কারুর দ্বারা পূর্ণনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী সচেতনভাবে সাধিত হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু লোক নিজেদের গুবিধার স্বপ্ন নবলব্ধ জ্ঞানকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে, আর তার প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে দেখা দেয় ঐ পরিবর্তন। তাদের কাজের কলে সমাজে কি প্রতিক্রিয়া হবে সে কথা তারা ধারণা বা আশা করেনি। মার্কসের মতে মানবসমাজের সমস্ত পরিবর্তন সম্বন্ধে এই কথা খাটে। মানুষের জ্ঞানের আয়তন অবিরাম গতিতে বেড়ে চলে, মানুষ সেই নব-গন্ধ জ্ঞানকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এবং চাঁরই ফলে সমাজে গভীর পরিবর্তন ঘটায়। এই সব সামাজিক পরিবর্তনের পরিণতি হয় শ্রেণীখন্দে। সেই শ্রেণীঘন্য আবার ধর্মবিশ্বাস ব্যায় এবং পার্লামেন্ট ইত্যাদি মতাদর্শ বা প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে যন্দের রূপ আত্মপ্রকাশ করে। তার কারণ, প্রচলিত মতাদর্শ এবং প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে ওঠে পুরাতন উৎপাদন প্রথা ও শ্রেণী-সম্বন্ধের ভিত্তির উপরে।

ঐসব মতাদর্শ বা ধারণা এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি কিভাবে হয় এবং বিলুপ্তিই বা হয় কি কারণে? মার্কস বলেন যে মতাদর্শ এবং প্রতিষ্ঠান সর্বকালে এবং সর্বক্ষেত্রে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। প্রাথমিক জিনিস হল জীবিকার সাধন অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ইত্যাদির উৎপাদন। সমস্ত ঐতিহাসিক সামাজিক-ধমষ্টিতে সমটির অন্তর্ভুক্ত মানুষগুলির পারস্পরিক সম্বন্ধের পকৃতি নির্ভর কয়ে উৎপাদন- প্রথার উপর। তা সে সমষ্টি আদিম উপজাতি, দার্স-সমাড সামস্বসমাজ বা আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ যাই হোক না কেন। প্রতিষ্ঠানগুলি যে কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা অনুসারে গড়ে ওঠে তা নয়। প্রত্যেক সমষ্টির মধ্যে প্রচলিত রীতি-রেওয়াজদে আশ্রয় করেই সেগুলির উদ্ভব হয়। প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, নতিক আদর্শ এবং অন্যায় ভাবধারাকে বলা চলে রীতি-রেওয়াজে মূর্ত রূপ আর বীডি-রেওয়াজগুলি হল উৎপাদন প্রখার সঙ্গে প্রত্যন্দ পাবে সংশ্লিষ্ট।

সুতরাং বোঝা যায় যে উৎপাদন প্রথার পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠান এবং ভাবধারারও পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ সামন্তবাদ থেকে পুজিবাদে পরিবর্তনের কথা ধরা যায়। এক স্তরে যা নীতিসঙ্গত বলে মনে হত অম্ল স্তরে তাই নীতিবিয়োধী বিবেচিত হয়। যখন বাস্তবে পরিবর্তন ঘটতে থাকে, উৎপাদন-প্রথার রূপান্তর হতে থাকে তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই মতাদর্শের ক্ষেত্রে ধন্দু দেখা দেয় এবং প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মাথা তোলে।

পুঁজিবাদী উৎপাদন-প্রথার উদ্ভবের পর সামন্তযুগীয় সগন্ধ-সমাটির সঙ্গে তার সংঘাত দেখা দেয়। নূতন উৎপাদন-প্রথায় পুঁজির একচ্ছত্র প্রাধান্ত প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, তাই মতাদর্শের ক্ষেত্রেও সংমণ শুরু হল। রাজার ঈঐশ্ববদত্ত অধিকারের ধারণার বিরুদ্ধে আওয়াজ। উঠল ‘প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা না হলে ট্যাক্স বদানো চলবে না’। দাবি উঠল ‘অবাধ বাণিজ্যের অধিকার চাই’। দেখা দিল নূতন ধর্মমত, যা ব্যক্তিস্বাধীনতা বৃদ্ধির এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের পরিমাণ হ্রাসের। পক্ষপাতী। আপাতদৃটিতে থাকে বিমূর্ত অধিকার এবং ধর্মমতের জন্ত স্বাধীন ব্যক্তিদের মরণপণ লড়াই বলে মনে হত আসলে তা ছিল মুমূর্ষু সামন্তবাদের বিরুদ্ধে উদীয়মান পুঁজিবাদের সংগ্রাম। মতাদর্শের ছন্ম ছিল গৌর বা আনুষঙ্গিক।

সেই জন্মই মার্কসবাদীরা স্বপ্নাশ্রয়ীদের মতো সমাজ-সংগঠনের অন্ত কতকগুলি বিমূর্ত নীতি প্রচার করেন না। মার্কসবাদের মতে যেসব ‘নীতি’ মাজলের চিন্তায় আত্মপ্রকাশ করেছে সেগুলি আসলে বিশেষ স্থান ও কালের সমাজের বাস্তব সংগঠনের প্রতিফলন মাত্র। সেগুলি ধনস্ত কাল ও স্থানের পক্ষে প্রযোজ্য হতে পারে না। উপরন্ত যে সমস্ত ধারণাকে সার্বজনীন বলে মনে হয়, যথা সাম্যের আদর্শ, সেগুলি সমাজের বিভিন্ন স্তরে একই অর্থ বহন করে না। গ্রীক নগর- রাষ্ট্রে মানুষের সমান অধিকারের নীতি দাসদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়নি। তেমনি মহান ফরাসী বিপ্লবের মূলমন্ত্র ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’ ছিল উদীয়মান পুঁজিপতি শ্রেণীর নিজস্ব যন্ত্র। তাদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল অবাধ বাণিজ্যের স্বাধীনতা, সাম্যের অর্থ ছিল সামন্ত প্রভুদের সঙ্গে সমান মর্যাদা এবং মৈত্রীর অর্থ ছিল পুঁজিপতি শ্রেণীর আত্ম-সংহতি অর্থাৎ সামন্তযুগীয় অত্যাচার এবং বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে পারস্পরিক সহায়তা। কিন্তু ফ্রান্সের উপনিবেশিক দাসদের জন্ত, এমনকি খোদ ফ্রান্সের দরিদ্র জনসাধারণের জন্ম ঐ মূলযন্ত্রের কোনটিই প্রযুক্ত হয়নি।

অতএব, একথা স্বচ্ছন্দে বলা চলে যে, বেশীর ভাগ ভাবধারা, বিশেষত যেগুলি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তা হল শ্রেণীগত ভাবধারা, সমাজের ক্ষমতাসীন শ্রেক্টর ভাবধারা। শাসকশ্রেণী নিজস্ব ভাবধারাকে সমাজের বাকি অংশের উপর চাপিয়ে দেয়। চালি দিতে তারা পাবে, কারণ, প্রচারের যন্ত্র তাদেরই সম্পত্তি, শিক্ষা-ব্যবস্থাও তাদের করায়ত্ত এবং বিদ্রোহী ভাবধারাকে শাস্তি দেওয়ার স্বর তাদের হাতে রয়েছে আইন আদালত, চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার ব্যবস্থা এবং অনুরূপ আরো কত কিছু। অবঙ্গ এরূপ, মনে করা ঠিক নয় যে শাসকশ্রেণী আগেই স্থির করে যে অমুক ভাবধারা যদিও সত্য নয় তবু অন্যকে তা মানতে বাধ্য করা হবে অথবা অন্ততপক্ষে তারা যাতে প্রকাশে বিরুদ্ধাচরণ না করে সেজন্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। বরং দেখা যায় শাসকশ্রেণী ঐসব ভাবধারাকে আবিষ্কার করে না, তার উদ্ভব হয় বাস্তব জীবন থেকে। সাবস্ত প্রভু বা ‘লর্ড’ উপাধিপ্রাপ্ত ধনী শিল্পপতির প্রকৃত ক্ষমতাই অভিজাতদের শ্রেষ্ঠর সম্বন্ধে ধারণার বাস্তব ভিত্তি। কিন্তু একবার এরূপ ধারণার উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠালাভের পর শাসকশ্রেণীর পক্ষে সকলকে দিয়ে সেই ধারণাকে স্বীকার করিয়ে নেওয়া খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কেননা, সর্বসাধারণ যদি তাকে স্বীকার না করে তথে তারা সেই অনুযায়ী কাজ করতে রাজী হবে না। যেমন হয়ত তারা রাজার ঐশ্বরিক অধিকার অস্বীকার করে বসবে, এমনকি তাঁর শিরশ্ছেদন করতেও পারে। কাজেই যে কোনো বুগে এবং যে কোনো দেশে শাসকশ্রেণী ‘বিপজ্জনক চিন্তাধারা’র বিস্তারে বাধা দেবে। সে প্রক্রিয়া শুধু ইউনাইটেড স্টেটস্-এরই বিশেষত্ব নয়।

এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, ভাবধারা যদি গৌণ হয় এবং উৎপাদন প্রথার বাস্তব পরিবর্তনই যদি হয় মুখ্য তাহলে ‘বিপজ্জনক’ চিন্তাধারার উৎপত্তি হয় কিভাবে? মোদ্দা কথা, মৃতন উৎপাদন-প্রথার উৎপত্তি হওয়ার আগে তার কথা লোকে চিন্তা করে কিভাবে?

এর উত্তর: নূতনের জন্মের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হলে লোকে সে সম্বন্ধে চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু নেই পরিবেশ যখন দেখা দেয় তখন পুরাতন অবস্থা এবং নূতন উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে সংঘাত মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।)

মজুরের দ্বারা উৎপাধন-প্রথার উৎপত্তি এবং মুনাফা উহুলের জন্ম পণ্য বিক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা-এই উভয় দিক থেকে গোড়ার যুগের পুঁজিপতিদের সামনে ব্যবদায়ের উপর সামন্তযুগীয় বিধিনিষেধ প্রবল বাবা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সমস্ত বিধিনিষেধের হাত থেকে মুক্তি, ট্যাক্স বসানোর ব্যাপারে মত-প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি ধারণার উদয় হয়। তখনও পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যুদয় হয়নি, কিন্তু তার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিবেশের মধ্য থেকেই। পুঁজিবাদী ভাববায়া মাথা তোলে। সমাজতন্ত্রবাদী ভাবধারা সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদের কথা আলাদা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদী ভাবধারার উত্তর তখনই সম্ভব হয়েছে যখন সমাজতন্ত্রবাদী সমাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে অর্থাৎ যখন দুহৎ শিল্পের দ্বারা উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্টিত হয়েছে ব্যাপক ভিত্তিতে এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের সংকট বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে পুজিবাদ সমাজের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

ভাবধারা জন্মগ্রহণ করে বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে। কিন্তু একবার। মূর্তি পরিগ্রহ করার পর যে তারা যাহয়ের কার্যধারার উপর এবং চা মাধ্যমে ঘটনাপ্রবাহের উপর প্রভাব বিস্তার কয়ে তাতে কোনো সন্দেহ নেই পুরাতন উৎপাদন-ব্যবস্থার ভিত্তিতে গঠিত ভাবধারা হল রক্ষণশীর, তা মানুষের কাজকে পিছনের দিকে টেনে রাখে, তাই প্রত্যেক যুগে প্রভুশ্রেণী উক্ত ভাবধারা প্রচারের অন্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করে। অন্যদিকে উৎপাদনের নূতন অবস্থার ভিত্তিতে জাত ভাবধারা হল প্রগতিশীল, তা পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে নূতন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজে প্রেরণা যোগায়। অতএব প্রভুশ্রেণী ঐ ভাবধারাকে বিপজ্জনক মনে করে। যে সমাজ-ব্যবস্থা অগণিত নরনারীকে উপবাসী রেখে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খান্তসামগ্রী নষ্ট করতে কুরিত হয় না তাকে নিন্দা করা নিঃসন্দেহ ভাবে ‘বিপজ্জনক চিন্তা’, কেননা সেই চিন্তাই এমন এক সমাজের কথা ভাবতে শিখায় যেখানে উৎপাদনের উদ্দেঞ্চ হবে মানুষের কল্যাণ, মুনাফা নয়। সেই ভাবনাই আবার সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী দল গঠনে প্রেরণা যোগায়) এবং নেই দলগুলি নূতন সমাজ-ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করার কাজে আত্মনিয়োগ করে।

সমাজের অগ্রগতি সম্বন্ধে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহাসিক যণ্ডবাদ নামে পরিচিত। তা বস্তুতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণবাদ (Materialistic determinism) থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। বস্তুতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণবাদের মতে মানুষের কার্যকলাপ সম্পূর্ণভাবে তার পারিপার্শ্বিক বাস্তব জগৎ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সত্য এর বিপরীত। মাহবের কার্যকলাপ এবং তার ফলে যে সব বাস্তব পরিবর্তন হয় উত্তর জিনিসই কতক পরিমাণে বাস্তব পরিবেশের এবং কতক পরিমাণে সেই পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার উপযোগী মানুষের জ্ঞানের দ্বারা নির্ধারিত হয়। কিন্তু মানুষ সেই জ্ঞান লাভ করে বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সুতরাং বাস্তব জগৎ-ই মুখ্য জিনিস। বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা আরাম কেদারায় বসে লাভ হয় না। জীবিকার জয় জরুরী উপাদান উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে লাভ করা যায়। মানুষের জ্ঞানের পরিবি বেড়ে চলে এবং উৎপাদনের নূতন নূতন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় ও মানুষ সেগুলিকে কাজে প্রয়োগ করে। তখন দেখা যায় যে সমাজ-সংগঠনের পুরাতন রূপ অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নূতন পদ্ধতিকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহারের পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করছে। শোষিত শ্রেণী তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই প্রথমে এই সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। গোড়াতে সে বিশেষ বিশেষ এক একটি বাধার অর্থাৎ পুরাতন সমাজব্যবস্থার দরুন তার কাজে যখন যে বিশেষ বাধা সৃষ্টি হয় তার বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু তার এই লড়াই অনিবার্যরূণে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্ম শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সাধারণ সংগ্রামে পরিণত হয়।

পুরাতন ব্যবস্থার ভিতর থেকে যে নূতন উৎপাদিকা-শক্তির বিকাশ হয় তা কিছুদূর পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এবং পূর্বপরিকল্পনাবিহীনভাবে অগ্রসর হতে থাকে। পুরাতন ব্যবস্থার ধারক সমাজ-সংগঠনের বিরুদ্ধে সংগ্রামও প্রথম প্রথম অনুরূপভাবেই চলে। কিন্তু তা সমস্ত ক্ষেত্রেই এমন এক স্তরে এসে পৌঁছায় যেখানে বোঝা যায় যে পুরাতন শ্রেণী-সম্বন্ধই নূতন উৎপাদিকা-শক্তির পরিপূর্ণ ব্যবহারের পথে বাধাস্বরূপ। তখন থেকে ভবিষ্ণুতের অষ্টা উদীয়মান শ্রেণী সচেতনভাবে কাজ শুরু করে।

কিন্তু উৎপাদিকা-শক্তির বিকাশের প্রক্রিয়া বর্তমানে স্বতঃস্ফূর্ত এবং পূর্বপরিকল্পনাবিহীনভাবে অগ্রসর হওয়ার অবস্থা অতিক্রম করে এসেছে। মানুষ যথেষ্ট অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের নিয়ম সম্বন্ধে যথেষ্ট জান লাভ করেছে। সে প্রথম সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং এমন ধরনের সমাজগঠনে প্রবৃত্ত হতে পারে যেখানে উৎপাদন হবে সচেতন ও সুপরিকল্পিত উপায়ে। সেই সমাজ সম্বন্ধে এঙ্গেলস বলেছেন:

“যেসব বাস্তব এবং বহিঃশক্তি এতকাল ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রিত করেছে তারা তখন মানুষের নিয়ন্ত্রণের অধীন হবে। তখন থেকেই মানুষ সম্পূর্ণ সচেতনভাবে নিজেদের ইতিহাস র না করবে।”

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating