Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

কেন সমাজতন্ত্র?-অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

আর্থ-সামাজিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা যাঁর নেই তাঁর কি ‘সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে মতামত দেওয়া উচিত? আমার বিশ্বাস, অনেকগুলি কারণে তিনি তা দিতেই পারেন?

আসুন, প্রথমে আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্নটি বিবেচনা করি। বাহ্যত মনে হতে পারে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অর্থনীতি-বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো মৌলিক পদ্ধতিগত পার্থক্য নেই: দু’টি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা পারিপার্শ্বিক ঘটনাগুলি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য নিয়মাবলী আবিষ্কার করতে চান যাতে করে ঘটনাবলির পারস্পরিক সম্পর্ক যথাসম্ভব সহজে বোধগম্য হতে পারে। কিন্তু আসলে দু’টি গবেষণার মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য থেকেই যায়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সাধারণ সূত্রাবলি আবিষ্কার সহজসাধ্য নয়। কারণ অর্থনৈতিক ঘটনাবলি এমন বহু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল যার স্বতন্ত্র মূল্যায়ন অত্যন্ত কঠিন। তথাকথিত সভ্যযুগের সূচনা থেকে মানুষের ইতিহাসে বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। আমরা ভালোই জানি, সেই সব অভিজ্ঞতার বেশিরভাগটাই প্রভাবিত হয়েছে বা সীমাবদ্ধ থেকেছে যে সব উপাদানের দ্বারা তারা চরিত্রগতভাবে পুরোপুরি অর্থনৈতিক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলির অধিকাংশই সামরিক শক্তির দ্বারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিজিত দেশগুলিতে তারা নিজেদের আইনগতভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত করে। তারা জমির ওপর একাধিপত্য স্থাপন করে এবং নিজেদের স্বার্থে পুরোহিততন্ত্র সৃষ্টি করে। এই পুরোহিতরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমাজে শ্রেণি-বিভাজনকে একটি চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের রূপ দেয়। এইভাবে তারা এমন সুদৃঢ় মূল্যবোধের জন্ম দেয় যা মানুষের সামাজিক আচরণের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। বেশিরভাগ মানুষই প্রভাবিত হয় অচেতনভাবে।

ঐতিহাসিক পরম্পরায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, থোরস্টাইন ভেবলের ভাষায়, মানব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে “লুণ্ঠনের অধ্যায়”। এখন প্রশ্ন, আমরা কি সেই অধ্যায় পেরিয়ে আসতে পেরেছি? আজ যে-অর্থনৈতিক তথ্য আমরা দেখতে পাই তা এসেছে ওই অধ্যায়ের মধ্যে থেকে এবং এই তথ্যাবলি থেকে যে সব সূত্র আমরা পেতে পারি তা মানব-ইতিহাসের অন্য কোনো অধ্যায় সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। যেহেতু সমাজতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই হলো লুণ্ঠনের এই অধ্যায়কে অতিক্রম করে আরো এগিয়ে যাওয়া, তাই উল্লিখিত পর্যায়ের অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক সমাজের ওপর তেমন কোনো আলোকপাত করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্র একটি সামাজিক ও নৈতিক লক্ষ্যের পথে চালিত হয়। বিজ্ঞান সেই লক্ষ্য সৃষ্টি করে না। আরও বড় কথা, মানুষের হৃদয়ে তাকে প্রোথিত করতেও বিজ্ঞান অক্ষম। বিজ্ঞান বড়জোর নির্দিষ্ট কোনো কোনো লক্ষ্যে পৌঁছনোর উপায় বাতলায়। লক্ষ্য নির্ধারণ করেন উচ্চগ্রামের নৈতিক আদর্শ-সম্পন্ন ব্যক্তিত্বরা এবং যদি সেই আদর্শ নিষ্প্রাণ না হয়ে প্রাণবন্ত ও গতিসম্পন্ন হয় তাহলে অসংখ্য মানুষ সেই আদর্শ গ্রহণ করে তাকে এগিয়ে নিয়ে চলে, এরাই অর্ধসচেতনতার সঙ্গে সমাজের ধীর উদ্‌বর্তনকে সম্পন্ন করে।

এসব কারণেই মানবিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অতিমূল্যায়ন সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, একমাত্র বিশেষজ্ঞরাই কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মতামত দানের অধিকারী।

কিছুকাল ধরে অসংখ্য মানুষ সোচ্চারে বলছেন, মানবসমাজ এক সংকটের মধ্যে দিয়ে চলছে, সমাজের স্থিতিশীলতা শোচনীয়ভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। এই পরিস্থিতির চরিত্রই হলো, যে ছোটো বা বড় গোষ্ঠীতে সাধারণ মানুষ অবস্থান করে সেই গোষ্ঠীর প্রতি তারা হয় উদাসীন অথবা ভীষণরকম বিরূপ। আমি কী বলতে চাইছি সেটা বোঝানোর জন্যে আমি এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলছি। আমি সম্প্রতি এক বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও একটি যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বললাম, এই যুদ্ধ মানুষে। অস্তিত্বকে গুরুতরভাবে বিপন্ন করবে। আমার ধারণা একটা অতিজাতিক (Supra-National) সংগঠনই কেবলমাত্র মানবজাতিকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। এই কথা শুনে আমার অতিথি খুব ধীর ও শান্ত স্বরে বললেন, “মানবজাতির অবলুপ্তির প্রতি আপনার এত গভীর বিরুদ্ধতা কেন?”

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, একশো বছর আগেও এত হালকাভাবে কারও পক্ষে এমন কথা বলা সম্ভব ছিল না। এটা এমন এক মানুষের মন্তব্য, যিনি নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন এবং সেই চেষ্টায় সফল হওয়ার আশা তাঁর প্রায় নেই। এটা এক যন্ত্রণাদায়ক একাকিত্ব ও সমাজ বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ, আজকের দিনে যার শিকার হচ্ছেন বহু বহু মানুষ। কিন্তু তার কারণটা কী? এই বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে বেরিয়ে আসার কি কোনো রাস্তা নেই?

এসব প্রশ্ন তোলা সহজ, কিন্তু কোনো নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। তবু আমি অবশ্যই যথাসাধ্য চেষ্টা করব। যদিও আমি খুবই সচেতন যে, আমাদের অনুভূতি ও প্রচেষ্টা প্রায়শই স্ববিরোধী ও অস্বচ্ছ-খুব সহজ সরল সূত্রে সেগুলিকে প্রকাশ করা যায় না।

মানুষ একাধারে ব্যক্তি হিসেবে নিঃসঙ্গ এবং সামাজিক। একক ব্যক্তি হিসেবে সে নিজের ও তার স্বজনদের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করে, তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিতৃপ্তি চায় এবং তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার প্রস্ফুটন কামনা করে। সামাজিক ব্যক্তি হিসেবে নিজের পার্শ্ববর্তী মানুষজনের স্বীকৃতি ও সহানুভূতি লাভের সে চেষ্টা করে, তাদের আনন্দের শরিক হতে সে চায়, তাদের দুঃখযন্ত্রণার সান্ত্বনাদানে সে তৎপর হয়, তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সে আশা করে। এইসব বহুবিচিত্র, প্রায়শই পরস্পরবিরোধী আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টা মানুষের বৈশিষ্ট্যময় চরিত্র গঠন করে। এই বৈশিষ্ট্যের সফল সমন্বয়ই নির্ধারণ করে, সে নিজের ভারসাম্য কতখানি অর্জন করতে পারবে; সমাজের সুস্থতা বিধানে তার অবদানই বা কতখানি হবে। এটা খুবই সম্ভব যে, মানুষের এই দুই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আপেক্ষিক শক্তি নির্ধারিত হয় প্রধানত উত্তরাধিকার সূত্রে। সে পূর্ণ ব্যক্তিত্ববান হয় তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাবে, যে সমাজব্যবস্থার মধ্যে সে বড়ো হয়েছে তার দৌলতে, সমাজের ঐতিহ্যের সুবাদে ও বিশেষ বিশেষ আচরণের বাঞ্ছনীয়তার ওপরে। ব্যক্তি মানুষের জীবনে “সমাজ” নামক বিমূর্ত চেতনা বলতে বোঝায়, সমসাময়িক মানুষের ও পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলির সমস্ত ব্যক্তির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্কের যোগফল। একজন ব্যক্তি নিজে চিন্তা করতে, অনুভব করতে, চেষ্টা করতে ও নিজে থেকে কাজ করতে পারে। কিন্তু সে তার শারীরিক, বৌদ্ধিক ও আনুভূতিক অস্তিত্বের জন্য সমাজের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, তাকে সামাজিক কাঠামোর ব্যতিরেকে ভাবা বা বোঝা সম্ভব নয়। সমাজই ব্যক্তিকে খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, কাজ করার যন্ত্র, ভাষা, চিন্তাপ্রণালী ও চিন্তার অধিকাংশ বিষয়বস্তুর জোগান দেয়। “সমাজ” ছোটো একটি শব্দ, কিন্তু তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অতীত ও বর্তমানে লক্ষ-কোটি মানুষের শ্রম ও কীর্তিস্তম্ভ আর এটাই সম্ভব করেছে ব্যক্তিজীবনের অস্তিত্ব। সুতরাং পিঁপড়ে বা মৌমাছিদের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি মানুষের বেলাতেও সমাজের ওপর নির্ভরতা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যা মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু পিঁপড়ে ও মৌমাছির পুরো জীবনপ্রবাহে সমস্ত খুঁটিনাটিই পূর্বনির্ধারিত, অনড় সহজাত প্রবৃত্তি জৈবিক উত্তরাধিকার সূত্রে ওরা পেয়েছে। অন্যদিকে মানবসমাজের গঠন ও মানুষে মানুষে পারস্পারিক সম্পর্ক একদিকে বহুবিচিত্র অন্যদিকে পরিবর্তনমুখী। মানবজাতির প্রাগ্রসরতা সম্ভব হয়েছে স্মৃতিশক্তি, নিত্যনতুন সহযোগী খুঁজে নেবার ক্ষমতা, ভাষামাধ্যম ব্যবহারের যোগ্যতার কারণে। জৈবিক প্রয়োজনীয়তার তাড়নায় এসব ঘটেনি। মানুষের এইসব যোগ্যতা যে-উন্নয়ন ঘটিয়েছে তার প্রকাশ আছে পরম্পরাবাহিত ঐতিহ্যে, প্রতিষ্ঠানে, সংগঠনে, শিল্প ও সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, যন্ত্রবিজ্ঞানের কীর্তিকলাপে। এ থেকেই বোঝা যায়, মানুষ কীভাবে নিজের আচরণ দিয়ে নিজের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। আরও বোঝা যায়, মানব-জীবনের পরিবর্তনপ্রবাহে সচেতন চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা কতখানি ভূমিকা পালন করে।

বংশধারার সূত্রে মানুষ জন্মলগ্নেই পেয়ে যায় দেহমনের বিশেষ জৈবিক বিন্যাস যা সুনির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়, তার মধ্যেই পড়ে মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা যা মানবপ্রজাতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া, জন্মের পর সারা জীবনকাল জুড়ে মানুষ অর্জন করে এক সাংস্কৃতিক বিন্যাস (Consti-tution)। সমাজের মধ্যে নানা আদান প্রদান ও বহুবিধ প্রভাবের মধ্যে দিয়েই তার এই অর্জন। কিন্তু কালক্রমে এই সাংস্কৃতিক বিন্যাস বা আবহ পরিবর্তিত হয় যা মুখ্যত নির্ধারণ করে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক। তথাকথিত আদিম সংস্কৃতিসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে আধুনিক নৃতত্ত্ব আমাদের শেখায়, সমাজের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক ছক ও গঠনসমূহের প্রাধান্য তার প্রভাবে মানুষের সামাজিক আচার-আচরণে গভীর ভিন্নতা জন্ম নেয়। যাঁরা মানুষের জীবনকে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে চাইছেন, তাঁদের আশার ভিত এই সত্যের ওপর দাঁড়াতে পারে। জৈবিক বিন্যাসের দরুন মানবজাতি নিরিখে নির্ধারিত হওয়ার পর বেতনক্রম ঠিক হয়। এটা বুঝে নেওয়া জরুরি যে তত্ত্বগতভাবেও শ্রমিকদের বেতন তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয় না।

মুষ্টিমেয়র হাতে ব্যক্তি পুঁজির কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা থাকে। তার একটা কারণ, পুঁজিপতিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। আরেকটি কারণ প্রযুক্তির উন্নতি। ক্রমবর্ধমান শ্রমবিভাজন ছোটো ছোটো শিল্পপতিকে সারিয়ে দিয়ে বৃহৎ শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করে। এই প্রক্রিয়া মুষ্টিমেয় ব্যক্তিপুঁজির শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করে। গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত রাজনৈতিক সমাজও ব্যক্তিপুঁজির এই বিপুল ক্ষমতাকে ফলপ্রসূভাবে প্রতিহত করতে পারে না। এটা ঘটছে তার কারণ আইনসভার সদস্যদের বেছে নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। পুঁজিপতিরা ওই রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচুর অর্থসাহায্য দেয় অথবা অন্যরকমভাবে প্রভাবিত করে। পুঁজিপতিরা প্রায় সমস্ত দিক থেকেই আইনসভার সঙ্গে নির্বাচকমণ্ডলীর বিচ্ছেদ ঘটায়। তার ফলে যাঁরা জনপ্রতিনিধি তাঁরা কার্যত সাধারণ নিম্নসুবিধাভোগী মানুষের যথোচিত স্বার্থরক্ষায় অক্ষম হন। সর্বোপরি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুঁজিপতিরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমগুলি (সংবাদপত্র, রেডিও, শিক্ষা)-র ওপর অনিবার্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তাই ব্যক্তিগতভাবে কোনো নাগরিকের পক্ষে তথ্যগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং নিজের রাজনৈতিক অধিকারের যুক্তিযুক্ত প্রয়োগ অত্যন্ত দুঃসাধ্য এবং বলা যায় প্রায় অসম্ভব।

ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিভিত্তিক অর্থনীতিতে যে অবস্থা রয়েছে দু’টি প্রধান নীতিই তার অন্তরসার। প্রথমত, উৎপাদনের উপায় (পুঁজি) ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং মালিকরাই ঠিক করে কীভাবে সেই পুঁজি তারা বিনিয়োগ করবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমচুক্তি হলো স্বাধীন। অবশ্য এই অর্থে বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজ বলে কোনো পদার্থ নেই। এটা অবশ্যই লক্ষ করতে হবে যে, শ্রমিকরা দীর্ঘ ও তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে কিছুটা উন্নত “স্বাধীন শ্রমচুক্তি” লাভে সমর্থ হয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ধরলে আজকের অর্থনীতি বিশুদ্ধ পুঁজিতন্ত্র থেকে খুব একটা আলাদা নয়।

উৎপাদন করা হয় মুনাফার জন্য, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়। এমন কোনো নিয়ম নেই যে, সমস্ত যোগ্য ও সমস্ত কর্মপ্রার্থী কোনো-না-কোনো পেশায় নিযুক্ত হতে পারবে। ফলে “বেকারদের বাহিনী” সর্বদা মজুত থাকে। শ্রমিক সবসময় চাকরি হারানোর ভয়ে ভীত। যেহেতু বেকার ও স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের পক্ষে একটা লাভজনক বাজার জোগান দেওয়া সম্ভব নয়, তাই ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তার ফলে দেখা যায় গুরুতর জীবনযন্ত্রণা। প্রযুক্তিগত উন্নতি সবসময় সকলের জন্য কাজের বোঝা কমায় না, বরং প্রায়শই তা অধিকতর বেকারত্বের জন্ম দেয়। পুঁজিপতির মুনাফা-স্পৃহা, তাদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতা পুঁজির সঞ্চয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক অস্থিরতা তৈরি করে, যার থেকে জন্ম নেয় শোচনীয় মন্দা। বঙ্গাহীন প্রতিযোগিতা শ্রমের বিপুল অপচয় ঘটায় এবং ব্যক্তি-মানুষের সামাজিক চেতনার পঙ্গুত্ব ডেকে আনে যার উল্লেখ আমি আগেই করেছি।

আমি মনে করি ব্যক্তিমানুষের এই পঙ্গুত্বই পুঁজিবাদের জঘন্যতম কদাচার। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই এই অসুখের দ্বারা আক্রান্ত। ছাত্রসমাজের মস্তিষ্কে অনবরত ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে লাগামহীন প্রতিযোগিতার মানসিকতা। এই ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হয় তারা যেন ভবিষ্যৎ জীবিকা-স্বরূপ বিপুল সম্পদের উপাসনা করে।

আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, কেবলমাত্র একটি উপায়েই এই সব গুরুতর ক্ষতিকর দিককে দূর করা যেতে পারে। সামাজিক উদ্দেশ্যমুখী শিক্ষাব্যবস্থার সহযোগে একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই প্রতিকার সম্ভব। এরকম অর্থনীতিতে উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর সামাজিক মালিকানা বলবৎ থাকে এবং পরিকল্পনা মাফিক তাদের ব্যবহার হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি মানবসম্প্রদায়ের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল রেখে উৎপাদন করে, সমস্ত কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে কাজকে ভাগ করে দেয় এবং প্রত্যেক মানব-মানবী ও শিশুর জীবিকাকে সুনিশ্চিত করে। শিক্ষা প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষের মধ্যে তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার উদ্বোধন তো ঘটায়ই, সেইসঙ্গে আমাদের বর্তমান সমাজ ক্ষমতার সাফল্যকে যেভাবে গৌরবান্বিত করা হয় তার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃষ্টি করে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ।

তৎসত্ত্বেও এটা মনে রাখা প্রয়োজন পরিকল্পিত অর্থনীতি মানেই সমাজতন্ত্র নয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানুষকে পুরোপুরি দাসে পরিণত করতে পারে। সমাজতন্ত্রের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত দুরূহ সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান। বহুদূর প্রসারিত রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এটা কীভাবে সম্ভব? কীভাবেই বা সম্ভব হবে আমলাতন্ত্রকে সর্বশক্তিমান ও স্বার্থপরতন্ত্র হওয়া থেকে রোখা?

ব্যক্তিমানুষের অধিকারকে কী উপায়ে সুরক্ষিত করা সম্ভব এবং সেই সঙ্গে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক পথে কীভাবে চালিত করা যাবে?

রূপান্তরের এই যুগে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও সমস্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়। বর্তমান অবস্থায় এই সব সমস্যার মুক্ত ও অবাধ আলোচনা এক শক্তিশালী নিষেধের আওতায় চলে এসেছে। সুতরাং আমি মনে করি, এই প্রত্রিকার প্রকাশ একটি প্রয়োজনীয় জনসেবা হয়ে উঠবে।

[এই প্রবন্ধটি ১৯৪৯ সালে সে মাসে ‘মাস্থলি রিভিউ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।] অনুবাদ: দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী

আমি কীভাবে সমাজতন্ত্রবাদী হলাম –হেলেন কেলার

কয়েক বছর ধরে খবরের কাগজে প্রায়ই আমার নামের সঙ্গে সমাজবাদকে যুক্ত করে খবর ছাপা হচ্ছে এক বন্ধু বললেন-বেসবল, শ্রীযুক্ত রুজভেল্ট এবং নিউ ইয়র্ক পুলিসি কেচ্ছাকাহিনীর সঙ্গে একত্রে আমি কাগজের প্রথম পাতা দখল করেছি। এই উল্লেখ আমার খুব-একটা মনমতো হয়নি। কিন্তু আমি মোটের ওপর খুশি যে, আমার ও আমার শিক্ষিকা শ্রীমতী ম্যাসি-র শিক্ষা-গৌরব সম্পর্কে অনেক মানুষ আগ্রহী হয়েছেন। বদমায়েসিও তো হিতকর হয়ে উঠতে পারে। আমি আনন্দিত যে, আমার কর্মসাধনের ধারাকে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে সংবাদপত্রের স্তম্ভে প্রায়শই উঠে আসছে ‘সমাজতন্ত্র’-শব্দটি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আমি সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে লিখব। আমি স্বয়ং এবং আমার মতামত যে-বিপুল প্রচারের সুযোগ পেয়েছে তা যে অনেকটাই যুক্তিযুক্ত আমার লেখায় তা-ও তুলে ধরা হবে। এসব সম্বন্ধে এতদিন পর্যন্ত আমি বিশেষ কিছু লিখিনি বা বলিনি। আমি লিখেছি কয়েকটা চিঠি যেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো কমরেড ফ্রেন্ড ওয়ারেল-কে লেখা একখানি পত্র। সেটা ছাপা হয়েছে ‘বিচারবুদ্ধির কাছে আবেদন’ (‘Appeal to reason’) নামক গ্রন্থে। কয়েকজন রিপোর্টারকে আমি সাক্ষাৎকার দিয়েছি। তাঁদের মধ্যে একজন ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’-এর সাংবাদিক। তিনি একটি মনোরম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, আমার কথাগুলোকে সততার সঙ্গে পুরোপুরি ছেপেছেন। শেনেকটাডি (Schenectady) তে আমি কখনও যাইনি। মেয়র লুন (Lune)-এর সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ করিনি। তাঁর কাছ থেকে কোনো চিঠি আমি কদাচ পাইনি। কিন্তু শ্রীমতী ম্যাসি-র মাধ্যমে তিনি আমাকে সহৃদয় বার্তা পাঠিয়েছেন। শেনেকটাডি-তে শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিত হবার বাসনা আমার ছিল, কিন্তু শ্রীমতী ম্যাসি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমায় সে-ইচ্ছা ত্যাগ করতে হয়েছে।

এইরকম নেতিবাচক এবং প্রায়-তুচ্ছ বিষয়ে ধনবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকায় প্রচুর সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। সংবাদপত্র থেকে কেটে-রাখা টুকরোয় আমার একটি ড্রয়ার ভরাভর্তি হয়ে গেছে। আমি তার সিকিভাগও পড়িনি। ওগুলো পড়ব কি না সে সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ নই। অতি অকিঞ্চিৎকর বিষয়ে এত এত মন্তব্য ছাপা হয়েছে। এখন আমি যদি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আন্তরিকভাবে বলতে-লিখতে আরম্ভ করি তাহলে সংবাদপত্রগুলো কী করবে? তবে আপাতত আমি চাইছি আমার অবস্থান জানাতে, কতকগুলো মিথ্যা রিপোর্টকে সংশোধন করতে আর আমার কাছে অন্যায্য বলে বোধ হয়েছে এমন কিছু নিন্দাবাদের প্রত্যুত্তর দিতে।

প্রথম: আমি কীভাবে সমাজতন্ত্রী হলাম? উত্তর: পড়াশুনো করে। আমি প্রথম যে বইটি পড়ি সেটা হল ওয়েল্স-এর ‘পুরোনোর বদলে নতুন পৃথিবী’ (‘New Worlds for Old’)। শ্রীমতী ম্যাসি বইটি আমাকে পড়তে বলেছিলেন। রচনাটির কল্পনাঋদ্ধতা ম্যাসিকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর প্রত্যাশা ছিল: এই রচনার বিদ্যুৎচমকিত আঙ্গিক আমাকে উদ্দীপিত করবে। তিনি যখন এ বই আমাকে দেন তখন তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। তবে শ্রীযুক্ত ম্যাসির ও আমার সঙ্গে আলোচনাশেষের আগেই তিনি বোধ হয় সমাজতন্ত্রবাদী হয়ে উঠবেন।

শ্রীযুক্ত ওয়েল্স আমাকে অধিকতর পঠনের পথে চালিত করলেন।

আমি উদ্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আরও বই চাইছিলাম। শ্রীযুক্ত ম্যাসি তাঁর সমাজবাদী সাহিত্যের পাঠাগার থেকে কিছু বাছাই করা বই আমায় এনে দিলেন। তিনি আমার ওপর কোনো বই চাপিয়ে দেননি। আমি আরও বই চাইছিলাম এবং তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করেছেন মাত্র। সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত মতামতে আমাকে সম্পৃক্ত করার কোনও ঝোঁক তাঁর মধ্যে আমি দেখিনি। সত্যি বলতে কী, আমি তাঁর কাছে কত সময় অভিযোগ করেছি: আমি যতক্ষণ চাইছি কেন তিনি ততক্ষণ আমার সঙ্গে আলোচনা করবেন আমার বই-পড়ার গণ্ডী ছিল সীমাবদ্ধ। ধীর গতিতে আমি পড়েছি। অন্ধদের জন্যে ব্রেইলে ছাপা জার্মান দ্বিমাসিক পত্রিকা আমি নিতাম। (আমাদের জার্মান কমরেডরা অনেক দিক থেকে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে) জার্মান ব্রেইল ভাষায় লেখা এরফুর্ট প্রোগ্রাম-এর ওপর কাউটস্কির আলোচনা আমার হাতে এসেছিল। আমার এক বান্ধবী সপ্তাহে তিনদিন আসতেন আমার পছন্দসই রচনা পড়ে শোনানোর জন্যে। তাঁর কাছ থেকে আমার হাতে এসেছে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য, আমি তা পড়েছি। আর ছিল ‘ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট’ পত্রিকা। বান্ধবীর কাছে আমার অনুরোধ ছিল, তিনি যেন তাঁর প্রাণবন্ত আঙুল দিয়ে আমার উৎসুক আঙুলে পত্রিকাটির বিভিন্ন রচনা সঞ্চারিত করে দেন। হাত দিয়ে পড়তে সময় লাগে। ৫০,০০০ শব্দের একটি অর্থনীতির বই আঙুল দিয়ে আত্মস্থ করা সহজ নয়, দ্রুত তা করাও যায় না। কিন্তু পড়াটা তো আনন্দের ঘটনা, সেই আনন্দ আমি বারংবার অন্তরে ধারণ করেছি, শেষ পর্যন্ত ধ্রুপদী সমাজতান্ত্রিক লেখকদের সব রচনার সঙ্গে আমি পরিচিত হতে পেরেছি।

প্রসঙ্গত একটা কথা আমি বলব। ‘দি কমন কজ’ (“The Common Cause’) প্রত্রিকায় আমার সম্বন্ধে কিছু বক্তব্য বেরোয়, ‘দি লাইভ ইস্যু’ (‘The live Issue’) পত্রিকায় তা পুনর্মুদ্রিত হয়। দু’টোই সমাজতন্ত্র-বিরোধী পত্রিকা। ওই লেখাটি সম্পর্কে আমি কিছু মন্তব্য করতে চাইছি। রচনাটি থেকে খানিকটা আমি উদ্ধৃত করছি:

“পঁচিশ বছর যাবৎ কুমারী কেলারের শিক্ষক ও সব সময়ের সঙ্গী হলেন শ্রীমতী জন ম্যাসি। দু’জনেই, শ্রীযুক্ত ও শ্রীমতী জন ম্যাসি, কট্টর মার্কসবাদী প্রচারক। কুমারী কেলার প্রগাঢ় জীবনবোধে উপনীত হতে চান এবং তার জন্য তাঁর আজীবন বন্ধু শ্রীমতী ম্যাসি’র ওপর নির্ভর করেন। বিস্ময়ের কিছু নেই যে, পরিণামে তিনি ম্যাসিদের মতবাদে আষ্টেপৃষ্ঠে আসক্ত হবেন।”

হতে পারে শ্রীযুক্ত ম্যাসি উৎসাহী মার্কসবাদী প্রচারক। অবশ্য দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে, আমার আঙুলের মাধ্যমে মার্কসবাদ হস্তান্তরিত করতে তাঁর উৎসাহের যথেষ্ট অভাব ছিল। অন্যদিকে শ্রীমতী ম্যাসি মার্কসবাদী নন, সমাজতন্ত্রীও নন। সুতরাং ‘দি কমন কজ’ যা বলছে তা সত্য নয়। ওটা সম্পাদকের মস্তিষ্কজাত। একটা পুরো কাপড় কেটে তিনি এটা বানিয়েছেন। তাঁর মস্তিষ্ক যখন এভাবে কাজ করছে তখন স্বভাবতই তিনি সমাজতন্ত্র-বিরোধী। কে সমাজতন্ত্রবাদী আর কে তা নয় তা বোঝার মতো বোধবুদ্ধি তাঁর নেই।

ওই একই রচনার আরেকটি উদ্ধৃতি দেখুন। রচনার শিরোনাম: ‘প্রচারের জন্য শেনেকটাডির লালদের বিজ্ঞাপন: অন্ধ মেয়ে হেলেন কেলারকে ব্যবহার’। তারপর মূল লেখা আরম্ভ হলো:

“শেনেকটাডির সমাজতন্ত্রীরা স্বার্থসাধনের জন্য হতভাগ্য হেলেন কেলারকে যেভাবে এখন ব্যবহার করছে তার চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওই দলের মুদ্রণ-মাধ্যম ঘোষণা করে চলেছে, হেলেন কেলার সমাজতন্ত্রবাদী এবং তিনি নবগঠিত বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ারের সদস্য হতে চলেছেন।”

“স্বার্থসাধনের জন্য হতভাগ্য হেলেন কেলারকে যেভাবে এখন ব্যবহার করছে”-এই মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে আমি প্রত্যুত্তর দিতে পারি। কিন্তু তা আমি দেব না। আমি শুধু বলব ‘দি কমন কজ’ পত্রিকার ভণ্ড সহানুভূতি আমার কাছে অবাঞ্ছিত। কিন্তু ‘স্বার্থসাধনের জন্য ব্যবহার’ কথাটার মানে কী?-এটা যদি ওরা জানত তাহলে আমি আনন্দিত হতাম।

এবার আসি আসল ঘটনায়। মেয়র লুন যখন জানলেন আমি শেনেকটাডিতে যেতে পারি তখন ‘বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ার’ কে তিনি প্রস্তাব দিলেন, আমার জন্যে তাঁরা যেন একটা জায়গা রাখেন। মেয়র লুনের পত্রিকা ‘দি সিটিজেন’ (‘The Citizen’)-এ এই ঘটনার কিছুই ছাপা হয়নি। বস্তুত, বোর্ডের অভিপ্রায় ছিল, শেনেকটাডিতে আমার পৌঁছানোর আগে এ ব্যাপারে কোনো কথা তারা বলবে না। কিন্তু পুঁজিবাদী কাগজের রিপোর্টাররা ব্যাপারটা আঁচ করল এবং যখন মেয়র লুন অনুপস্থিত তখন আলবানির ‘নিকারবোকার প্রেস’ (‘Knickerbocker Press’) বিষয়টা ঘোষণা করে দিল। সারা দেশে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ল এবং সংবাদপত্রের স্বার্থসর্বস্ব দুষ্কর্ম আরম্ভ হয়ে গেল। এ কাজ কি কোনো সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা করেছিল? না। এটা করল পুঁজিবাদী সংবাদপত্রগুলি। সমাজতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকা সংবাদটি ছেপেছিল, কেউ কেউ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সম্পাদকীয়ও লিখল। কিন্তু শ্রীযুক্ত লুনের পত্রিকা ‘দি সিটিজেন’ নীরব ছিল, আমার নাম সেই পত্রিকায় ছাপা হয়নি। অথচ সপ্তাহের পর সপ্তাহ রিপোর্টাররা লুনকে টেলিফোন করছিল, টেলিগ্রাফ আসছিল-সবাই চাইছিল তাঁর সাক্ষাৎকার। পুঁজিবাদী সংবাদপত্রই আমাকে কেন্দ্র করে স্বার্থসাধন করে গেছে। কেন? সাধারণ পত্র-পত্রিকা কী ঘুণাক্ষরেও গ্রাহ্য করে সমাজতন্ত্রকে? না, মোটেই না। সমাজতন্ত্রকে তারা ঘৃণা করে। কিন্তু হায়! আমি হলাম সংবাদপত্রের খোশগল্পের শিকার! আমি যে শেনেকটাডিতে ছিলাম না, যে রিপোর্টার ‘খবর’টা প্রথম ছেপেছিল তার প্রতি আমার বিতৃষ্ণাও নেই-এসব কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম।

‘আমি সমাজতন্ত্রবাদী-এই ঘোষণা’ পুঁজিবাদী সংবাদপত্রে মুদ্রিত হবার পর সমাজতন্ত্রবাদী পত্র-পত্রিকায় আমার কথা বহুল প্রচারিত হয়, এ ঘটনা সত্য। কিন্তু যে রিপোর্টাররা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন তাঁরা সবাই সাধারণ বাণিজ্যিক সংবাদপত্রের প্রতিনিধি। কোনো সমাজতন্ত্রবাদী সংবাদপত্র আমার কাছ থেকে লেখা চায়নি- ‘দি কল’ (“The Call’) বলুন, ‘দি ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট’ (“The National Socialist’) বলুন, কেউ না। ‘দি সিটিজেন’ পত্রিকার সম্পাদক পরোক্ষভাবে শ্রীযুক্ত ম্যাসি’কে জানান-আমার একটা রচনা পেলে ভালো হয়। কিন্তু তিনি এত সুভদ্র, এত বিবেচক, যে আমাকে কখনও লেখার কথা খোলাখুলি বলতে পারেননি।

নিউ ইয়র্ক টাইমস আমার লেখা চেয়েছিল। টাইমসের সম্পাদক আমাকে আশ্বস্ত করার জন্যে জানালেন, তাঁর কাগজ জনসাধারণের কাছে পৌঁছানোর মূল্যবান মাধ্যম এবং তিনি আমার কাছ থেকে একটি রচনা পেতে চান। তিনি আমাকে টেলিগ্রাফও পাঠান। আমার পরিকল্পনার কথা তিনি আমাকে জানাতে বলেন। আরও বলেন, শেনেকটাডির বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ারের সদস্য হিসেবে আমার সম্ভাব্য কাজকর্মের খসড়াও যেন তাঁদের জানাই। এই অনুরোধে আমি সাড়া দিইনি, এটা আনন্দের কথা। কারণ, কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেদের নিরপেক্ষ সহানুভূতির আবরণ ছিঁড়ে ফেলে আমাকে তাঁরা সামাজিকভাবে ব্রাত্য করে দিতে চাইলেন। ২১ সেপ্টেম্বর টাইমস-এর পাতায় দেখা গেল একটা সম্পাদকীয়, যার শিরোনাম ‘ঘৃণাই লাল পতাকা’। আমি তার দু’টি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি:

“পতাকা অবাধে ওড়ে। তবু এটা জঘন্য। এটা বিশ্বব্যাপী যথেচ্ছাচার ও নৈরাজ্যের প্রতীক। সে কারণে যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এটাকে ঘৃণার চোখে দেখে।”

“যে সব কাজকর্ম লাল পতাকা কর্তব্য বলে গণ্য করে। সে রকম কাজ না করলে পুলিস হয়তো পতাকাধারীকে হেনস্থা করে না। কিন্তু ওই ব্যক্তি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার যোগ্য সবসময়েই। কারণ, সে বহন করছে যথেচ্ছাচারের প্রতীক। অতএব শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি পাবার অধিকার সে হারিয়েছে।”

কোনো বিশেষ রঙের কাপড়ের পূজারি আমি নই। কিন্তু লাল পতাকা আমি ভালোবাসি। এই পতাকা আমার এবং সমস্ত সমাজতন্ত্রবাদীর কাছে যে প্রতীক তুলে ধরে তা আমি ভালোবাসি। আমার পড়ার ঘরে একটি লাল পতাকা ঝুলছে। পারলে এই পতাকা নিয়ে সানন্দে কুচকাওয়াজ করে টাইম্স-এর অফিস ছুঁয়ে যাব। সমস্ত রিপোর্টার ও ক্যামেরাধারী সক্রিয়তম অবস্থায় এই দৃশ্য দেখুক। টাইম্স-এর মোক্ষম দণ্ডাদেশ অনুসারে আমি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি লাভের সমস্ত অধিকার হারিয়েছি, আমাকে দেখা উচিত সন্দেহের দৃষ্টিতে। তবু টাইম্স-এর সম্পাদক চাইছেন আমি তাঁকে আমার রচনা দিই। আমি যদি সন্দেহজনক চরিত্রের মানুষ হই তাহলে কী করে তিনি বিশ্বাস করলেন, আমি তাঁকে আমার লেখা দেব? ধনবাদীস্বার্থ-বিরোধী আন্দোলনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্যে যে পুঁজিবাদী সম্পাদক অস্বাস্থ্যকর নৈতিকতা, ক্ষতিকর যুক্তিবিন্যাস ও দুষ্ট আচরণের গহ্বরে পড়েছেন, আশা করি, তাঁর ক্রিয়াকাণ্ড আমার মতোই আপনারাও উপভোগ করছেন। আমরা সহানুভূতির অধিকারী নই, অথচ আমাদের কারও কারও রচনা তিনি চাইছেন, কারণ সেই রচনা তাঁদের কাগজকে টাকা কামাতে সাহায্য করবে। কুখ্যাত খুনির স্বীকারোক্তি যেমন মূল্যবান তেমনি তাঁর কাছে মূল্যবান আমাদের মতামত। আমরা সুন্দর নয়, কিন্তু আকর্ষণীয় তো বটে।

আমি সাংবাদিকদের পছন্দ করি। তাঁদের অনেককে আমি জানি। দু-তিনজন সম্পাদক আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাছাড়া, দৃষ্টিহীনদের স্বার্থে যে কাজ আমরা করতে চাই তার জন্যে সংবাদপত্র আমাদের প্রচুর সাহায্য করে। ওই কাজে সাহায্য বা ভাসা ভাসা বদান্যতা বাবদ তাঁদের কিছু লোকসান হয় না। কিন্তু সমাজতন্ত্র, ওঃ হো, সেটা তো আলাদা ব্যাপার। সমাজতন্ত্র সমস্ত দারিদ্র্যের, সব বদান্যতার উৎসে গিয়ে পৌঁছায়। খবরের কাগজে যে অর্থশক্তি কাজ করে তা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারী। আর সম্পাদকরা? যে হাত তাঁদের খাওয়াচ্ছে-পড়াচ্ছে তাঁরা তার বশংবদ। সমাজতন্ত্রকে দমিয়ে দেবার জন্যে, সমাজতন্ত্রবাদীদের প্রভাবকে ডুবিয়ে মারতে, যতদূর যাবার ততদূর তাঁরা যাবেন।

কমরেড ফ্রেড ওয়ারেনকে লেখা আমার চিঠি ‘অ্যাপিল টু রিজন’ (‘Appeal to Reason’)-এ ছাপা হয়েছিল আমার এক বন্ধু বোস্টনের ট্র্যানস্ক্রিপ্ট’ (‘Transcript)-এ বিশেষ একটি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি মুদ্রণের জন্যে আমার ওই চিঠির ওপর একটি নিবন্ধ রচনা করলেন, কিন্তু প্রধান সম্পাদক তা কেটে উড়িয়ে দিলেন।

আমার সম্পর্কে এবং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ব্রুকলিনের ‘ঈ’ (‘Eagle’) প্রত্রিকা লিখল, হেলেন কেলারের “বিকাশ পাবার পথে দৃষ্টিগ্রাহ্য বাধা রয়েছে এবং তার ফলেই জন্ম নিচ্ছে তার ভ্রান্তিগুলো।” কয়েক বছর আগে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। পরিচয় হলে আমি জানলাম, তিনি ব্রুকলিন ‘ঈ’-এর সম্পাদক শ্রীযুক্ত ম্যাক্কেলওয়ে (Mckelway)। নিউ ইয়র্কে দৃষ্টিহীনদের পক্ষ থেকে ডাকা একটি সভার শেষে এই পরিচয়। সে সময়ে কত উদারভাবে তিনি আমার প্রশংসা করেছিলেন, ভাবলে আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাই। কিন্তু এখন যেহেতু আমি সমাজতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছি তাই তিনি আমাকে এবং জনসমাজকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন: আমি অন্ধ ও বধির এবং স্বভাবতই অনিবার্য ভ্রান্তির শিকার। তাঁর সঙ্গে দেখা হবার পর কয়েক বছর কেটে গেছে আর ইতিমধ্যে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কুঁকড়ে গেছে। এখন লজ্জায় লাল হবার পালা তাঁর। অন্ধত্ব ও বধিরত্ব হয়তো-বা কোনো কোনো মানুষকে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যায়। মার্কস সম্ভবত বদ্ধ কালা ছিলেন আর উইলিয়াম মরিস অন্ধ। মরিস স্পর্শানুভূতি দিয়ে ছবি এঁকেছেন আর গন্ধানুভূতি দিয়ে দেয়াল-কাগজে নক্সা তুলেছেন।

ওঃ, ব্রুকলিনের ‘ঈগল’ কী হাস্যকর। কী ভীতু এক পাখি! ও তো সামাজিকভাবে অন্ধ ও বধির। এক অসহ্য ব্যবস্থাকে সে পাহারা দিচ্ছে। যে শারীরিক অন্ধত্ব ও বধিরতাকে আমরা প্রতিরোধ করতে চাই তার অনেকটাই তো আসছে ওই ব্যবস্থা থেকে। মানুষের চূড়ান্ত দুর্দশার প্রতিরোধে আমাদের যে কর্মোদ্যম ঈগল তাতে সাহায্য করতে রাজি আছে। কিন্তু একটা শর্তে-সবসময়ের শর্ত: শিল্প-কারখানার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করা চলবে না; শিল্পই তো ঈগলদের খোরাক জোগায়, তাদের কর্ণকে বধির করে, তাদের দৃষ্টিকে অন্ধকারে ঢাকে। আমার যুদ্ধ ঈপ্স-এর বিরুদ্ধে। ঈপ্স যে ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, যাকে তুলে ধরে, সমর্থন করে, আমি সেই ব্যবস্থাকে ঘৃণা করি। সে প্রতি-আক্রমণ করুক, কিন্তু তা করুক সততার সঙ্গে। সে আমার মতাদর্শকে আক্রমণ করুক। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও যুক্তিযুক্ততার বিরুদ্ধাচরণে সে নামুক। আমি দেখতে-শুনতে পাই না একথা কেন সে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে? এটা সঙ্গত যুদ্ধ নয়। এ অযৌক্তিক। আমি পড়তে পারি। সময় করতে পারলে ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় লেখা সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত যাবতীয় বই-ই আমি পড়ে ফেলতে পারি। ব্রুকলিন ‘ঈগ্ল’-এর সম্পাদক যদি কিছু বইও পড়তেন তাহলে তিনি আরও জ্ঞানী হয়ে উঠতেন, ভালো সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারতেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করতে যে বই লেখার স্বপ্ন আমি দেখি, আমি জানি সে বইয়ের নাম কী হবে। আমি নামকরণ করব ‘শিল্পজগতের অন্ধত্ব ও সামাজিক বধিরতা’ (‘Industrial Blindness and Social Deafness’)

[কীভাবে পায়চারি করতে করতে দৃষ্টিহীন ও বধির হয়ে গেলেন, কীভাবে তাঁর শিক্ষিকা অ্যানি সুলিভান (Anne Sullivan)-এর সহায়তায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করলেন- হেলেন কেলার (১৮৮০-১৯৬৭)-এর সেই কাহিনি সুপরিচিত। উইলিয়াম গিবসনের নাটক ‘অলৌকিক শ্রমিক’ (The Miracle Worker’) তাঁর কাহিনির ওই অংশটিকে জনপ্রিয় করেছে। র‍্যাডক্লিফ কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, দৃষ্টিহীন ও বধিরদের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছেন, কীর্তিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বই লিখেছেন, চলচ্চিত্র ও মঞ্চে অভিনয় করেছেন। এই সব কীর্তি তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর বন্ধু মার্ক টোয়েন তাঁকে স্থান দিয়েছেন নেপোলিয়নের সমস্তরে, তিনি বলেছেন, “এঁরা উনিশ শতকের অন্যতম দুই আকর্ষণীয় চরিত্র”। হেলেন কেলার যে সমাজতন্ত্রের বিখ্যাত, আন্তরিক ও সোচ্চার প্রবক্তা-একথা আমরা বড়ো-একটা মনে রাখি না। গভীর একাকিত্ব থেকে তিনি উঠে এসেছেন অনুপ্রাণিত সমাজমুখী ব্যক্তি হিসেবে, তাঁর চারপাশের জগতের সঙ্গে তিনি সংযোগ স্থাপন করেছেন। ১৯০৯ সালে তিনি সোস্যালিস্ট পার্টির সদস্য হন। (পরবর্তীকালে বিশ্ব শ্রমিকদের সংগঠনে তিনি যোগ দেন) শ্রমিক সংগ্রাম, রাশিয়ার বিপ্লব, নারীর ভোটাধিকার এবং সর্বোপরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতা এসব নিয়ে তিনি লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন সর্বত্রই ফুটে উঠেছে তাঁর সমাজতান্ত্রিক চেতনা। তাঁর কাছে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ছিল এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিবন্ধীরা দুর্দশায় ভোগে। সেই দুর্দশার উৎস যে প্রায়শই পুঁজিবাদ ও শিল্পায়ন-একথা তিনি বলেছেন। ১৯২১ সালের পর ‘আমেরিকান ফাউন্ডেশন অফ দি ব্লাইন্ড’-এর জন্য মনপ্রাণ দিয়ে অর্থ সংগ্রহে নেমেছেন। সারাজীবনই তিনি ছিলেন বামপন্থী ও র‍্যাডিকাল ।।

[এই রচনাটি সমাজতান্ত্রিক দলের দৈনিক সংবাদপত্র ‘নিউ ইয়র্ক কল’-এ ৩ নভেম্বর ২০১২-তে প্রকাশিত হয়।]

অনুবাদ: দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী

এক অঙ্কবিদের প্রত্যয়-জনসাধারণের

গুরুত্ব সর্বাধিক

ডার্ক ঐ সুইক

নেদারল্যান্ডে সাক্কো ও ভানজেত্তির মুক্তি সংগ্রামে আমি অংশ নিয়েছিলাম এবং ১৯২৭ সালে আমি ছিলাম বোস্টনে, যেখানে তাঁদের কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। সেকারণে শেষের মাসগুলোতে আমি প্রতিবাদীদের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত হই। আমার মনে আছে ওঁদের মৃত্যুদণ্ডের দিনে আমি ছিলাম নিউইয়র্কে। বেল টেলিফোন ল্যাবরোটারির একটি দায়িত্বপূর্ণ কাজে তখন নিযুক্ত ছিলম। বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী নরমান টমাস আহুত একটি সুবিশাল জনসভায় আমরা যোগদান করি। তখনই টেলিফোনে ওঁদের মৃত্যুদণ্ডের খবর আসে। প্রথমে সাক্কো, তারপর ভানজেত্তির। বহু মানুষ সেদিন চোখের জল ফেলেছিল। তারা চিৎকার করে বলছিল “জাস্টিস ইজ ডেড”। সাক্কো-ভানজেত্তি ঘটনায় এটাই আমার স্মৃতিতে ধরা আছে। কিন্তু এখন আমায় বলতেই হবে সাক্কো আর ভানজেত্তি ছিলেন নিতান্তই সাধারণ মানুষ। সারো ছিলেন একজন সাধারণ জুতাপ্রস্তুতকারক, ভানজেত্তি ছিলেন হতদরিদ্র মাছ বিক্রেতা। তবুও তাঁরা ছিলেন নায়কোচিত। তাঁদের সৎ প্রত্যয় আজও আমাদের প্রাণিত করে।

আমার জীবনে তিনটি উক্তি সবসময় আমার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। প্রথম উক্তিটি করেছিলেন সেন্ট পল নিউ টেস্টামেন্টের ১ করিন্থিয়ান্স ১৩ শীর্ষক অধ্যায়ে: প্রত্যয়, আশা ও চ্যারিটি এই তিনটিকে আঁকড়ে ধরো।

তিনের মধ্যে সর্বোত্তম হলো চ্যারিটি। দ্বিতীয় উক্তিটি কার্ল মার্কসের: “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। তৃতীয়টি আইনস্টাইনের “মানবজাতির বাঁচার জন্য এবং এক স্তর থেকে উন্নততর স্বরে পৌঁছানোর জন্য নতুন ধরনের চিন্তা অত্যন্ত প্রয়োজন”। এই তিনটি উক্তি সর্বদা তোমাকে চিন্তা করার ও নতুন কিছু কাজ করার অনেক রসদ দেবে। সেন্ট পল-এর দৃষ্টিতে চ্যারিটি শব্দের অর্থ ভিক্ষাদান নয়। চ্যারিটি শব্দটি লাতিন শব্দ “Caritas” থেকে গৃহীত। আবার “Caritas” শব্দটি গ্রিক শব্দ “agcpe”-এর ভাষান্তর, যার অর্থ তোমার আশেপাশের মানুষজনের অদৃষ্টের কথা ভেবে নিজের বিবেক অনুসারে কাজ করা। এক অর্থে প্রত্যেক মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবলমাত্র সে মানবজাতির একজন সদস্য বলে নয়, একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবেও সে সমান গুরুত্বের দাবিদার।

আমার এক অত্যন্ত পণ্ডিত বন্ধু একবার বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে এসেছে আর চলে গেছে সেই শতকোটি মানুষের দিকে তাকাও এবং তাদের মধ্যে খুব সামান্য মানুষই এখানে ছাপ রেখে যেতে পেরেছে”। আমার মতে এর প্রধান কারণ এই চ্যারিটির অভাব। আমার ধারণা লিঙ্কনের এই উক্তিটির সঙ্গে পল একমত হতেন যেখানে লিঙ্কন বলেছিলেন, ঈশ্বর নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষকে ভালোবাসেন কারণ আমাদের মধ্যে তিনি এতো সাধারণ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আমি বলেছি প্রত্যেক মানুষই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবার তাহলে তাদের কথা একটু বলা যাক। এই একঘেয়ে নীরস জীবনে এমন একজন মা তুমি খুঁজে পাবে যে তার সন্তানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছে, বা একজন শিক্ষক যাঁর শিক্ষা তোমাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আকস্মিকভাবেই আমরা আবিষ্কার করি একজন আপাত নির্বোধ ব্যাঙ্ক কেরানি জলরঙ দিয়ে চিত্রাঙ্কন করছে। এখানেই আমরা খুঁজে পাই একজন বিষণ্ণ ছুতার মিস্ত্রী সবচেয়ে শিল্পগুণসম্পন্ন কাঠের কাজটি করছে। নিউইয়র্ক লেবার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের জন্য আমি বহুবছর আগে

একটি জুতাপ্রস্তুত কারখানা নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। এবং প্রত্যেক জুতা প্রস্তুতকারক, প্রত্যেক কারখানার শ্রমিক যাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, প্রতিজনই আমাকে অন্তত একটি করে ঘটনা বলেছিল। প্রতিটি ঘটনারই বিশেষ গুরুত্ব আছে। যেমন কারখানায় তাদের রসালাপ, যন্ত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রমিক সংগঠনের জন্য তাদের কাজ, ধর্মঘট সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাদের লড়াই এবং বাঁচার রসদ জোগাড় করার জন্য তাদের সংগ্রাম ও সক্রিয়তার কথা। এগুলো প্রতিটি জীবিকার ক্ষেত্রেই সমান সত্য। মানুষ কেবলমাত্র গুরুত্বপূর্ণই নয়, সে একইভাবে চিত্তাকর্ষকও বটে। তুমি-আমি সকলেই কৌতূহলজনক। তুমি যদি এটা না জেনে থাকো, আমি জানি। বালজ্যাকের থেকে ভালোভাবে এই উপদেশ আর কেউ দিতে পারেননি। তিনি ছিলেন গত শতাব্দীর বিশিষ্ট ফরাসি লেখক। আমি আমার যৌবনে। বালজ্যাকের বেশকিছু লেখা পড়েছি। তুমি যদি বালজ্যাকের রচনা পড়ে থাকো সেখানে সাধারণ মানুষের মহত্তের কথা খুঁজে পাবে। সাধারণ মানুষের প্রতি মুগ্ধতার কথা তাঁর উপন্যাসগুলিতে উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাসগুলিতে ছড়িয়ে আছে একজন পিতা, একজন অজ্ঞাত আবিষ্কারক, একজন দৈনন্দিন জীবনে সংগ্রামরত কাগজবিক্রেতা, একজন গ্রামের চিকিৎসক, একজন প্যারিস যাজক, একজন নিঃস্ব ব্যাঙ্কার, এমনকি একজন আসামীর ব্যক্তিগত মহত্বের কথা।

একেবারে মানব সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে প্রস্তর যুগ হয়ে বর্তমান কম্পিউটারের যুগ অবধি মানবজাতির অগ্রসরতার ইতিহাস চর্চা করলে দেখা যাবে প্রত্যেক সমাজে একজন খ্যাতনামা আবিষ্কর্তার আড়ালে আছে শতশত ক্ষুদ্র আবিষ্কর্তা-বৈজ্ঞানিক। আবার তারাও দাঁড়িয়ে আছে আরো ক্ষুদ্রতর অজ্ঞাত বহু মানুষের কাঁধের ওপর ভর করে। মানব ইতিহাসের কোনো মহৎ সৃষ্টিই সম্ভব হতো না যদি না এই বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষ সেই সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারতো। এই একই কথা প্রযোজ্য সমস্ত শ্রমিক আন্দোলন এবং সমাজতন্ত্রের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও, যেখানে ইউজিন ভেবস-এর মতো মহৎ নামের পশ্চাতে ছিল শতশত সাধারণ মানুষ। এসকল খ্যাতনামা ব্যক্তির আদর্শ বা বক্তব্যের কোনো মূল্যই থাকতো না যদি না সাধারণ জনগণ তার নিজের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাত্যহিক লড়াইটা না লড়তো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যেতেন। এরকম অনেক মানুষ ১৯১০-এর দশকে নেদারল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এদের অনেকের সঙ্গেই আমার আলাপ হয়েছিল এবং নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমি অভিভূত হয়েছি। অনেকক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রসঙ্গে নেতাদের তুলনায় তাদের বেশি গভীরতার পরিচয় পেয়েছি। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।

আমার বই থেকে কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। এই রাষ্ট্রে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জনশিক্ষাকে ফলপ্রসূ করার কৃতিত্ব হোরাস মনি-র পাশাপাশি এই শতশত মানুষগুলোরও প্রাপ্য যারা তার পিছনে দাঁড়িয়েছিল। কেবলমাত্র ইউজিন ভেবস-এর পক্ষে শ্রমিক আন্দোলনকে পরিচিত দেওয়া বা সফল করা সম্ভব হতো না। যদি না সাধারণ জনতা তাঁর সঙ্গে থাকতো। পিটার জেঙ্গার-এর পক্ষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল কারণ এই সাধারণ মানুষ তাঁর পক্ষে সওয়াল করেছিল। শুধুমাত্র সুসান কি.অ্যান্টনি নারী-ভোটাধিকার আন্দোলনকে সাফল্য এনে দেননি, তাঁর সপক্ষে ছিল শতশত সাধারণ নারী। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই আমাদের এই অসাধারণ মানুষদের দেখতে হবে, যারা এইভাবে কাজ করেছে এবং প্রায়শই আত্মত্যাগ করেছে। কখনো কখনো নেতাদের থেকেও তাদের বেশি আন্তরিক মনে হয়েছে।

এই সমস্ত ঘটনা সাধারণ মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে, তাদের মধ্যে প্রত্যয় তৈরি করতে পারে, যদি সেগুলিকে সঠিকভাবে তাদের সামনে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের কপালে জোটে যন্ত্রণা, শোষণ, উৎপীড়ন, দারিদ্র্য এমনকি মৃত্যু। চ্যারিটি কি আমাদের সহায়তা দিতে পারে? হ্যাঁ পারে বৃহদর্থে, যেমনটি বলা হয়েছিল পুরনো স্লোগানে “সংগঠিত হও, একজোট হও”। অথবা আমি কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র স্লোগানটি আবার বলতে পারি: “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। এই স্লোগান আমাদের সাহায্য করেছিল ১৮৪৮ সালে এবং ১৯৯৬-তেও এই স্লোগান ছিল একইরকম শক্তিশালী ও সত্য। মার্কসের মতে একটি উন্নততর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেই সমাজ নিজেই শ্রমিক সাধারণ সৃষ্টির মাধ্যমে এই উন্নততর সমাজ গড়ে তোলে। উচ্চতর কোনো শক্তি বা জাদুমন্ত্রের প্রয়োজন নেই। যদি সাধারণ মানুষ সচেতনভাবে সংগঠিত হয়, তাহলে সমাজের অগ্রগতি তারাই ঘটাতে পারে। অর্থাৎ এই অগ্রগতির শক্তি সমাজ নিজেই উৎপাদন করে।

তোমাদের কতকগুলি উদাহরণ দেওয়া যাক বিষয়টিকে আমি কিভাবে দেখছি। সমগ্র ঊনবিংশ ও বিংশ শতক জুড়ে স্বাধীনতাকামী শ্রমিক আন্দোলনের একের পর এক পরাজয় ঘটে এবং প্রত্যেকবারই সে পূর্বের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। ১৮৪৮-এর বিপ্লবের পরাজয়ের পনেরো বছরের মধ্যেই সে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৮৬৪ তে প্রথম ইন্টারন্যাশনাল গঠন করে। ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউনের পর প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কিন্তু আঠারো বছরের মধ্যেই ব্রাসেলস-এ দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয়। দ্বিতীয়টি ছিল প্রথমটির তুলনায় শক্তিশালী এবং এর শাখা বিস্তৃত ছিল বিশ্বের বৃহদাংশে। আমি নিজে সাক্ষী ছিলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এবং আমার মনে আছে ১৯১৪ সালে দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল ভেঙে পড়ল। তার ওপরই আমাদের ভরসা ছিল যদি সে এই যুদ্ধ থামাতে পারে। এটি ছিল স্বাধীনতা ও প্রগতির শক্তির আরো একটা গুরুতর বিপর্যয়। এই বিপর্যয় ঘটেছিল সর্বগ্রাসী জাতীয়তাবাদের জন্য, যে জাতীয়তাবাদ আজ খুব পরিচিত শব্দ।

১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়। তাকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশেও তা ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রথমবারের জন্য বিশ্বের একটা গোটা অংশকে সমাজতান্ত্রিক ছাঁচে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। বেশ সাফল্যের সঙ্গেই এটা করা সম্ভব হয়েছিল। অতঃপর ১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে এবং পণ্ডিতরা চিৎকার করে বলতে থাকে “ছয় সপ্তাহের মধ্যে হিটলার মস্কোয় পৌঁছবে।” এটা যাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন তাঁরা ভাবলেন সমগ্র বিশ্বকে সমাজতান্ত্রিক ছাঁচে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা পুনরায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কিন্তু হিটলার সেদিন জেতেনি। তোমরা সকলেই জানো তার কী পরিণতি হয়েছিল। এর ফলে বিশ্বের একটি বৃহদাংশে সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার বিস্তার ঘটেছিল। ১৯৪৯ সালে আমার পঞ্চান্নতম জন্মদিবসে চীনে জনগণের প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল আমার জন্মদিনের শ্রেষ্ঠ উপহার। এসময় থেকে চীন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে হাঁটতে শুরু করে। সম্ভবত এখনও একই লক্ষ্যে অবিচলিত। তারপর ১৯৮৯-এ সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নততর সমাজ গঠনের লক্ষ্য তীব্র আঘাত পায়। এসময় থেকে মনে হতে থাকে পুঁজিবাদ তথা সংকটময় পুঁজিবাদ সমগ্র পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করছে।

কিন্তু যেসব ঐতিহাসিক ঘটনার দৃষ্টান্ত এর পূর্বেই আমি দিয়েছি, সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষণ দিয়ে আমাদের মনের মধ্যে কিছু আশা আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি। আমার ধারণা এই সংকটময় বিশ্বে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির স্বাধীনতার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব সংগ্রাম সূচিত হবে। কিন্তু আমাদের সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি যা আমি ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ, কেবলমাত্র বিশ্বব্যাপী শ্রমিকশ্রেণির সংগঠনের কথা আমাদের ভাবলে চলবে না, পাশাপাশি যে পৃথিবীতে আমরা অবস্থান করছি তার সংরক্ষণের জন্যও সংগ্রাম করতে হবে।

এরূপে মানবজাতির মুক্তিকামী সংগ্রাম এবং এই পৃথিবীর সংরক্ষণের জন্য পরিচালিত সংগ্রামের সহাবস্থানই আমাদের নতুন ভাবনাচিন্তার রসদ জোগাবে এবং আমি বিশ্বাস করি এই নতুন চিন্তার উদ্যম ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আসবে না। নতুন ভাবে চিন্তার উদ্ভাবন ঘটাবে সমগ্র বিশ্বের আমজনতা যারা বর্তমান ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের শিকার। এই নতুন ভাবে ভাববার সুযোগ অনেক আছে কিন্তু এর জন্য নতুন পথ অন্বেষণ করতে হবে। এর উত্তর খোঁজার দায়িত্ব যুবসমাজের হাতেই ন্যস্ত। লাল ও সবুজের সহাবস্থানের পথ আবিষ্কার করতে হবে। লাল হলো শ্রম ও শ্রমিকশ্রেণির প্রতীক এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির চিহ্নবাহক হলো সবুজ। এই দুই শ্রেণির মধ্যে নিশ্চিতভাবেই দ্বন্দ্ব বর্তমান। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে উভয় শ্রেণির সহাবস্থানের রাস্তা তৈরি করতে হবে। শুধুমাত্র লাল ও সবুজ একসঙ্গে কাজ করবে তা নয়, সাদা, বাদামি এবং কালো-কেও তাদের সঙ্গে নিতে হবে।

এটাই হলো একজন অঙ্কবিদের বিশ্বাস। যদিও শুধুমাত্র একজন অঙ্কবিদ হিসেবে আমি এই কথাগুলো বলছিনা। সাক্কো-ভানজেত্তি’র মতো সাধারণ মানুষ রূপে একজন সাধারণ মুচি, একজন দরিদ্র মাছ বিক্রেতা এবং তোমাদের সঙ্গে নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন ও বাসনাকে ভাগ করে নিচ্ছি। (১৯৯৮ সালে প্রকাশিত।)

অনুবাদ: সুমিত্র চক্রবর্তী

কেন আমি কমিউনিস্ট-ই থাকবো–লরেন্স হ্যারিস

পাগল না হলে এখন আর কমিউনিস্ট থাকা যায় না একথা ঠিক নয়। আমি তো একজন কমিউনিস্ট। কিন্তু আমি মোটেই পাগল নই। সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ। অবশ্য, ব্রিটিশ পার্টির নেতৃত্বের পদ্ধতিগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু তার সঙ্গে কমিউনিস্ট থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।

পূর্ব ও পশ্চিমে যে সব পরিবর্তন ঘটছে সে সম্পর্কে বামপন্থীদের বক্তব্য যুক্তিনিষ্ঠ। এসব পরিবর্তনের অর্থ সমাজতন্ত্রের কবরে যাওয়া নয়। বরং সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণার নবজীবন শুরু হয়েছে। এখনই বরং ঠাণ্ডা যুদ্ধের দমবন্ধ করা কোটর থেকে বেরিয়ে, ধনতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আর তার বিকল্প নিয়ে খোলামেলা যুক্তিনির্ভর আলোচনা প্রস্ফুটিত হতে পারে।

আমি কমিউনিস্ট কারণ আজও বিরাট সংখ্যক মানুষের জীবন বৈষয়িক, শারীরিক এবং ভাবগত সবদিক থেকেই দারিদ্র্য পীড়িত। তাঁরা আদৌ মুক্ত নন। এই পরিস্থিতি অতিক্রম করার সাধ্য ধনতন্ত্রের আছে বলেও আমি মনে করি না। ধনতন্ত্র বরং নানাভাবে পরিস্থিতিকে জিইয়ে রাখছে এবং আরও অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

কমিউনিস্ট হবার অর্থ এই বিশ্বাস যে, সমাজকে যুক্তিসঙ্গত এবং গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত করার দ্বারা এমন একটা জগৎ গড়ে তোলা সম্ভব যেখানে মানুষের সৃজনশীল সম্ভাবনা পরিপূর্ণতা লাভ করবে। বাজার এবং কৈফিয়ৎ-যোগ্যতাহীন যৌথ কারবারিদের হাতে দুনিয়াকে ছেড়ে দেবার মধ্যে আশাব্যঞ্জক কিছুই দেখি না।

আজকের দিনে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসকে কল্পনাশ্রিত মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, আধুনিক ইতিহাসকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ধনতন্ত্রের গুণাবলী সম্পর্কে সংকীর্ণ মানসিকতা দেখানো হচ্ছে। প্রকাশ করা হচ্ছে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় সম্পর্কে নিছক অজ্ঞতা। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। এই বিশ্বাসকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলেও আমি মনে করি না।

এটা ঠিক যে, কোথাও কোথাও সমাজতন্ত্রের নামে ভয়ানক সব ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। ধনতন্ত্র যে শক্তিশালী, তার যে মানুষের জীবনে উন্নততর পরিবর্তন আনার ক্ষমতা আছে এটাও স্বীকার করে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য যে ধনতন্ত্রে মুনাফা-রাজ অসহনীয় বৈষম্যের জন্ম দেয়। জন্ম দেয় পরাধীন ক্ষয়িষ্ণু জীবনের। এটাই ছিল মার্কসের পরিপ্রেক্ষিত। ইতিহাস অনেকদিন থেকেই তার যথার্থতা প্রমাণ করেছে।

মার্কস সঠিকভাবেই বলেছিলেন, ধনতন্ত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হয় এমন সব বিরাট যৌথ প্রতিষ্ঠানের হাতে যারা প্রকৃতপক্ষে কারও কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। আজ তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির রাষ্ট্রীয় নীতিকে সহজেই নাকচ করে দিচ্ছে। এর ফল যদি ভালও হয় তবু এধরনের ব্যবস্থাকে সহনযোগ্য বলা যেতে পারে, কাম্য কখনই বলা যাবে না। কিন্তু আমাদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বহু মানুষের সর্বনাশ না করে ধনতন্ত্র কখনই বিকশিত হতে পারে না।

মার্কসের সময়ের তুলনায় শিল্পোন্নত দেশগুলির জনগণ অনেক ভাল অবস্থায় আছেন এটা মেনে নিলেও ধনতন্ত্রের গতিশীলতার উপরোক্ত ভিত্তি অপরিবর্তিতই থাকছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে বেকারির গহ্বরে নিক্ষেপ না করে আজও বাজারি অর্থনীতি কোনো নতুন জিনিস বানাবার, উৎপাদনের নতুন ক্ষমতা সৃষ্টির বিকল্প কোনো পথের সন্ধান পায় নি।

পশ্চিমী দুনিয়ার অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক উন্নতির কারণও একই আক্ষরিক অর্থেই লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকারে পরিণত হয়েছেন। যেমন পশ্চিম জার্মানি এবং অনুরূপ শক্তিশালী অর্থনীতির ক্ষেত্রে, তেমনি ব্রিটেনের ক্ষেত্রেও ঐ জীবনগুলি বরবাদ করা হয়েছে। ‘শ্রমশক্তির সংরক্ষিত বাহিনী’ কথাটা হয় তো কালোপযোগী নয়, কিন্তু আজও ঐ বাহিনীর উপর নির্ভরশীল যে ব্যবস্থা সেটা আরও বেশি অনুপযোগী।

হ্যাঁ, এখনকার শ্রমিকরা আগের তুলনায় বেশি মজুরি পান। কাজের ঘণ্টাও আগের তুলনায় কমেছে। তাদের জীবনযাত্রার মানে প্রকৃত উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু এটাই কি প্রমাণ করে যে ধনতন্ত্র বদলে গেছে? নারীজাতি এবং কৃষ্ণাঙ্গরা আজও যেসব বৈষম্যের শিকার সেগুলির দিকে চোখ বন্ধ করে রাখলে মনে হতে পারে যে, পুঁজিবাদী শোষণের বাড়াবাড়িটা এখন অতীতের ঘটনা। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

তৃতীয় বিশ্বের অবস্থার দিকে তাকালেই দেখা যাবে আন্তর্জাতিক অর্থের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা বিরাট পরিমাণ সম্পদকে ঘিরে মেহনতকারিদের দরিদ্র, বঞ্চিত জীবন। এসব দেখার পর কারও একথা মনে করার উপায় নেই যে সব কিছু ঠিকঠাক চলছে। মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বিয়োগান্তক এই সত্য বর্তমান দশককে আরও অসহনীয় করে তুলেছে।

এই ভয়ঙ্কর সত্যকে ধনতন্ত্র থেকে বিযুক্ত করা সম্ভব নয়, যেমন বিযুক্ত করা সম্ভব নয় পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা অথবা জাপানের বিপুল বৈভবকেও। এই জন্যই আমি কমিউনিস্ট। শত শত বছর ধরে সাক্ষ্যপ্রমাণ জমা রয়েছে। আধুনিক উদাহরণেরও অভাব নেই।

এখনকার অবস্থা থেকে দু’টো উদাহরণ দিচ্ছি। তৃতীয় বিশ্বের নারী সমাজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের বিনিময়েই আমাদের কেতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। চরমতম দরিদ্র মানুষদেরও পেটে গামছাবেঁধে জোগান দিতে হচ্ছে পশ্চিমের কাছ থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের অর্থ।

কমিউনিস্ট হবার অর্থ কেবল পুঁজিবাদীদের ত্রুটিগুলি চিনতে পারা নয়। কমিউনিস্ট হবার অর্থ ওই বিশ্বাস যে সমাজতন্ত্র যথেষ্ট উন্নততর কিছু দিতে পারে। স্তালিনবাদী বাড়াবাড়ি অথবা কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলিতে পরিবেশগত (ecological) ভারসাম্য বিনষ্ট হবার পটভূমিতে ঐ বিশ্বাস অবাস্তব মনে হতে পারে। অন্যদিকে, পুঁজিবাদের সাম্প্রতিক অত্যাচারগুলিও তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু অভিযোগ চালাচালি করে লাভ নেই। আরও উন্নত সমাজতন্ত্র সম্ভব কিনা সেই সিদ্ধান্তে আসার জন্য তা কোনো কাজে আসবে না।

যেটা প্রাসঙ্গিক তা হলো এখন, এই ১৯৮৯ সালে এটা পরিস্কার যে, পূর্ব ইউরোপীয় এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্র নিজেদের ইতিহাস নিজেদের অপরাধ এবং অগ্রগতি সবই খতিয়ে দেখতে পারছে। আর, এগুলি নতুন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি বিকশিত করার পক্ষে প্রচণ্ড গতি সঞ্চার করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে রাজনৈতিক জীবনে খোলামেলা পরিবেশ আনা হচ্ছে। সমাজতন্ত্র যে সম্ভবত একটি নতুন, আশাব্যঞ্জক এবং আরও গণতান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করতে চলেছে এটাই সেই বিশ্বাসের সব থেকে বড় কারণ।

সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা উন্নততর জীবনমান সৃষ্টিতে সক্ষম কি না? সোভিয়েতে কোনো কোনো বছরে খাদ্যশস্যের ঘাটতির কথা সুবিদিত। অর্থনীতির অন্যান্য ব্যর্থতাও খুবই বেদনাদায়ক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরিকল্পিত অর্থনীতি ব্যাপারটাই ত্রুটিপূর্ণ। ঐ সব ব্যর্থতার জন্য দায়ী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নয়, দায়ী ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা।

ইতিহাস দেখিয়ে দিচ্ছে ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণের জন্য অনেক কিছুই করা হয়েছে। অবাঞ্ছিত সুবিধাভোগী বা দুর্নীতি আছে ঠিকই। কিন্তু পুঁজিবাদী দেশগুলির মত্রে অর্থনীতির মধ্যেই ব্যাপক বৈষম্যের বীজ উপ্ত নয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যেও ঐসব সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এবং সম্ভব হয়েছে ঠাণ্ডাযুদ্ধের পটভূমিতে সামরিকখাতে বিপুল ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত অসহযোগিতা সত্ত্বেও।

সেসব এখন বদলে যেতে পারে। নতুন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে পরিচালনা করার নতুন সমাজতান্ত্রিক নীতির সাফল্যের সত্যিকার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

কিছু কিছু পণ্ডিত বলতে চান সমাজতন্ত্রের সপক্ষে এখন আর কোনো শক্তি নেই। তাঁরা হয়তো একথাও বলবেন যে পশ্চিমী দুনিয়ায় শ্রমিকশ্রেণী বলে আর কিছু নেই, সুতরাং শ্রেণীরাজনীতি বলেও কিছু নেই। এসব কথার কোনো অর্থ হয় না, এমন কি ব্রিটেনের জনজীবন থেকে সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাগুলি নিংড়ে বের করে দিলেও না। আর, ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণীর রাজনীতিকে যে দৃষ্টিতেই দেখা হোক না কেন, তৃতীয় বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তিকে কারোরই উপেক্ষা করা উচিত নয়।

পশ্চিমী দুনিয়া দেখতে আসা হাজার হাজার বার্লিনবাসী চিত্র সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, তাঁরা নিজেদের দেশে সমাজতন্ত্রকে নতুন করে গড়তে চান। সোভিয়েত ইউনিয়নে ধর্মঘটী খনি-শ্রমিকরাও বলেছেন তাঁদের ধর্মঘট উন্নততর সমাজতন্ত্রের জন্যই। এগুলিই তো সব কথা বলে দিচ্ছে। অথবা প্রায় সব কথাই বলে দিচ্ছে। পুরনো কমিউনিস্ট শাসন বর্জন করার অর্থ পুঁজিবাদের জন্য লালসা-পশ্চিমীদের এই ধারণা একেবারেই ভুল।

[(লরেন্স হ্যারিস গ্রেট ব্রিটেনের ওপ্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক। ‘দ গার্ডিয়ান’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের অব্যবহিত পরে।।

লেখক পরিচিতি

হেলেন অ্যাডামস কেলার (জন্ম-১৮৮০, মৃত্যু-১৯৬৮) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্না মার্কিন লেখক, রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষিকা। তিনিই প্রথম অন্ধ-মুক-বধির, যিনি স্নাতক হন। সোশালিস্ট পার্টি অফ অ্যামেরিকার সদস্যা। মহিলাদের ভোটাধিকার, শ্রমিক সঠিকার ও সমাজতন্ত্রের জন্য জোরালো বক্তব্য উপস্থিত করেছেন গোটা দুনিয়ায়। দি স্টোরি অফ মাই লাইফ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ প্রভৃতি বই বহু মানুষের প্রেরণার কাজ করে চলেছে। শারিরীক প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার এক উজ্জ্বল প্রেরণা হেলেন কেলার।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (জন্ম-১৮৭৯, মৃত্যু-১৯৫৫) বিজ্ঞান আকাশের ধ্রুবতারা। আইনস্টাইন প্রবর্তিত আপেক্ষিকতাবাদ বিজ্ঞান জগতের এক অমূল্য সম্পদ। এই তত্ত্ব প্রয়োগ করে গণিত বিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা ও রসায়ন বিদ্যার মৌলিক ভিত্তিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। আইনস্টাইনের তৃতীয় সূত্র আলোক বিদ্যা বা ফটো-ইলেকট্রিসিটির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্য তাঁকে ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই সূত্র ধরে পরবর্তীকালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আবিষ্কার সম্ভব হয়। ইহুদী বিরোধী হিটলারের জন্য মতবিরোধের জন্য তাঁকে জার্মানি ত্যাগ করতে হয়। পরম শান্তিকামী

৩৮আইনস্টাইন যুদ্ধকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। বিখ্যাত মনীষী রোমা রোঁলার সঙ্গে পৃথিবী-ব্যাপী যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ভারত ও ভারতীয় ভাবধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তিনি।

ডার্ক জঁ স্কুইক (জন্ম-১৮৯৪, মৃত্যু-২০০০) বিশিষ্ট ওলন্দাজ গণিতজ্ঞ, মার্কসীয় তাত্ত্বিক। জীবনের বড় অংশই অতিবাহিত করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। ম্যাকার্থিবাদের সময়ে মার্কিন প্রশাসন তাঁকে হেনস্থা করে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ এ হিস্ট্রি অব ম্যাথম্যাটিকস, দি বার্থ অফ কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, এ সোর্স বুকইন ম্যাথমেটিকস। আজীবন নেদারল্যান্ড কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। বিখ্যাত জার্নাল অফ সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর শততম জন্মবর্ষে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি এখনও সজাগ ও সক্রিয় থাকেন কী করে? জবাবে স্ট্রইক বলেছিলেন, এর জন্য তিনটি ‘M’-এর ভূমিকা গুরুত্ব। প্রথম M হলো Marriage বা বিবাহ, দ্বিতীয় M হলো Maxism এবং তৃতীয় M হলো Mathmatics। তাঁর ১০৬তম জন্মদিনের ২১ দিন পর অধ্যাপক স্ট্রইকের মৃত্যু হয়।

লরেন্স হ্যারিস: লণ্ডন স্কুল অফ ইকনমিকসের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক।

কেন সমাজতন্ত্র প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০১৪ পুনর্মুদ্রণ। নভেম্বর, ২০১৪

তৃতীয় মুদ্রণ: সেপ্টেম্বর, ২০১৬ চতুর্থ মুদ্রণ: ডিসেম্বর, ২০১৭ পঞ্চম মুদ্রণ: ডিসেম্বর, ২০১৯

প্রকাশক অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি. ১২এ. বঙ্কিম চাটার্জি স্ট্রীট

কলকাতা-৭০০ ০৭৩

মুদ্রক এসপেস শ্রাচী সেন্টার ৭৪ বি. এ. জে. সি বোস রোড কলকাতা-৭০০ ০১৬

কেন সমাজতন্ত্র?

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

আমি কীভাবে সমাজতন্ত্রবাদী হলাম

হেলেন কেলার

এক অঙ্কবিদের প্রত্যয় জনসাধারণের গুরুত্ব সর্বাধিক

ডার্ক জঁ স্ট্রইক

কেন আমি কমিউনিস্ট-ই থাকবো–লরেন্স হ্যারিস

লেখক পরিচিতি

সূচীপত্র

@freemang2001gmail-com

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating