দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল সূত্র তিনটি
ক) বস্তুর গুণগত পরিবর্তনের সাথে সাথে তার পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটে, আবার একইভাবে তার পরিমাণগত পরিবর্তনের সাথে সাথে তার গুণগত পরিবর্তন ঘটে থাকে;
খ) পরস্পর বিরোধী শক্তির ঐক্যের সূত্র;
গ) অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি।
ক) আমরা জানি পরিবর্তনশীলতা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এই পরিবর্তন শুধু বস্তুর পরিমাণগত দিক থেকে নয়, তার গুণগত দিক থেকেও ঘটে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ জলের কথা বলা যেতে পারে। মনে করি একটা কেটলিতে জল ভরে জ্বলন্ত উনুনের ওপর রাখা হল। পরিবর্তন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর জল আস্তে আস্তে গরম হতে থাকে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর জল টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। এই সময়টাকে উল্লম্ফন বা বড় লাফ বলা যেতে পারে। তারপর একটা সময় আসে যখন জল বাষ্পে পরিণত হয়। বাস্প কেটলি থেকে বেরিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। জলের পরিমাণগত পরিবর্তনের সঙ্গে তার গুণেরও পরিবর্তন হয়। জল ফুটতে ফুটতে একটা সময় কেটলিতে আর জল থাকে না। অন্যদিকে জল ও বাষ্পের মধ্যে গুণগত মান এক নয়। আবার একটা পাত্রে জল রেখে তা যদি আমরা ফ্রিজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই তাহলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর দেখতে পাব ঐ জল জমে বরফ হয়ে গেছে। জলের গুণগত দিক ও পরিমাণগত দিক দুটোই পালটে গেছে। একটা বীজের পরিবর্তন ঘটিয়ে গাছ হয়। বীজ ও গাছ দুটোরই পরিমাণগত এবং গুণগত দিক আলাদা আলাদা। একটা মুরগির ডিম যদি ওমে বসানো হয় বা ‘তা’ দেওয়া হয় তাহলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর ডিম ফুটে মুরগির বাচ্চা বেরোবে। মুরগির ডিম আর মুরগির বাচ্চা গুণ ও পরিমাণ—দুদিক থেকেই পালটে গেছে। আমাদের কথাই ধরি না কেন। ঘণ্টাখানেক আগেও যে আমরা ছিলাম, এখন কিন্তু সেই আমরা আর নেই। আমাদের বয়স ঘণ্টাখানেক বেড়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের শরীরের বৃদ্ধি বা ক্ষয় এক মুহূর্তের জন্যও থেমে ছিল না। এতো গেল পরিমাণগত দিক। গুণগত দিক থেকেও আমাদের পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান কিছুটা হলেও বেড়েছে। রসায়নশাস্ত্রসহ বিজ্ঞানের সব শাখাতেই এর ভুরি ভুরি প্রমাণ মেলে।
খ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ অনুসারে দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর মধ্যে পরস্পর বিরোধী শক্তি কাজ করে। এই তত্ত্ব অনুসারে আমরা আমাদের চোখের সামনে যে সমস্ত বস্তু দেখি বা আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত নেই, এমন প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই দুটো পরস্পর বিরোধী শক্তি আছে। এমন দুটো শক্তি যা একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। অথচ একটা অবস্থায় তারা একই জায়গায় থাকতে বাধ্য হয়। এই দুটো শক্তির মধ্যে একটা সদর্থক বা ইতিবাচক আর একটা নেতিবাচক বা ঋণাত্মক। সোজা কথায়, একটা ‘হ্যা’ আর একটা ‘না’। তাই বস্তুর মধ্যে স্ববিরোধী শক্তির অবস্থান এই তত্ত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একটা চুম্বকের টুকরোর কথাই ধরা যাক না কেন। চুম্বকটির পরস্পর বিরোধী দুটো মেরু আছে। একটা উত্তর দিক আর একটা দক্ষিণ দিক। ঐ চুম্বকটিকে যদি দু’টুকরো করা যায় তাহলে আবার পরস্পর বিরোধী দুটো মেরু তৈরি হবে। এভাবে চুম্বকটিকে যত টুকরোই করা যাক না কেন, প্রত্যেকটির পরস্পর বিরোধী দুটো মেরু তৈরি হবে। আমরা যাকে জীবন বলি, তার মধ্যেও রয়েছে পরস্পর বিরোধী শক্তির ঐক্য। একটা প্রাণী যতক্ষণ বেঁচে থাকে, ততক্ষণ তার মধ্যে এই স্ববিরোধী শক্তি কাজ করে। যেমন, বেঁচে থাকতে গেলে একটা প্রাণীকে খাবার খেতেই হবে। সেই খাবার পাকস্থলীর যাঁতাকলে পিষে হজম হয়ে অন্যরূপে শরীরের পুষ্টি জোগায়। খাবারের অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। গ্রহণ ও বর্জন দুটো পরস্পর বিপরীত। কিন্তু এভাবেই প্রাণী বেঁচে থাকে। এই প্রক্রিয়া থেমে গেলে মরণ আসে। শুধু খাবার নয়, বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্তই হলো শ্বাস নেওয়া। আর শ্বাস শুধু নিলেই হয় না, অপ্রয়োজনীয় বা শরীরের দূষিত বাতাস বের করে দিতে হয়। নিঃশ্বাস নেওয়া এবং ত্যাগ করা—এই দুটো পরস্পর বিপরীত। কিন্তু এই দুটো ছাড়া বাঁচা যায় না। বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যেই স্ববিরোধিতা লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্ববিরোধিতা আছে। যেমন, পদার্থবিদ্যায় পজিটিভ ও নিগেটিভ বিদ্যুৎ, রসায়নে এটমের জড়ো হওয়া ও আলাদা হওয়া, মেকানিকস-এ ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া, অঙ্কে যোগ ও বিয়োগ ইত্যাদি সবই স্ববিরোধী শক্তির ঐক্যের নমুনা। ঠিক এভাবেই বলা যায়, জীবন না থাকলে মৃত্যু হতো না, আবার মৃত্যুছাড়া জীবনও থাকতো না। উঁচু না থাকলে নিচু থাকতো না, আবার নিচু না থাকলে উঁচু কথাটিরও কোন অর্থ থাকতো না। খারাপ না থাকলে ভালো কথাটি থাকতো না, তেমনি ভালো না থাকলে খারাপও থাকতো না। ধনী না থাকলে গরিব থাকতো না, আবার গরিব না থাকলে ধনীও থাকতো না। জমিদার না থাকলে প্রজা থাকতো না, প্রজা না থাকলে জমিদারেরও কোন চিহ্ন পাওয়া যেতো না। বুর্জোয়া না থাকলে সর্বহারা থাকতো না, তেমনি সর্বহারা না থাকলে বুর্জোয়া থাকতো না। সাম্রাজ্যবাদ না থাকলে উপনিবেশবাদ বা নয়া উপনিবেশবাদ থাকতো না, আবার উপনিবেশ বা নয়া-উপনিবেশ না থাকলে সাম্রাজ্যবাদ থাকতো না। ওপরের উদাহরণগুলো একটা আর একটার একদম উল্টো। কিন্তু ওরা একই সাথে থাকে। তবে এরা কিন্তু বরাবরের জন্য একসাথে থাকে না। একসাথে থাকাটা বিশেষ অবস্থার ওপর নির্ভর করে। একটা বোমার কথা ভাবা যাক। আমরা বলি বোমা ফেটেছে। তার অর্থ কি? বোমার মধ্যে অ্যামোনিয়া নাইট্রেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইড নামে যে দুটো পরস্পর বিরোধী শক্তি ছিল তারা আর একসাথে থাকতে পারলো না। বলা যায়, যে অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে ঐ বিরোধী শক্তি দুটো একসাথে ছিল, তা পালটে গেছে। হয় তাতে আঘাত করা হয়েছে বা আগুন দেওয়া হয়েছে, কিংবা একটা ঘর্ষণের সৃষ্টি করা হয়েছে। অথবা এমন একটা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যার ফলে ওরা আর একসাথে থাকতে পারে। না। আলাদা হতে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ছিটকে বেরিয়ে আসে। আমাদের সমাজের অবস্থাও অনেকটা সেরকমই। বুর্জোয়া আর সর্বহারা সমাজে একইসাথে থাকতে পারে ঠিক ততক্ষণ যতক্ষণ সেই পরিবেশ থাকে। সর্বহারাশ্রেণী যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐ পরিবেশের ওপর আঘাত করে, কিংবা সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ ঘটায়, তখন আর বুর্জোয়াশ্রেণি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। বুর্জোয়া সমাজের পতন ঘটে। সর্বহারাশ্রেণির শাসন জারি হয়।
গ) অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা জানি জগৎ বস্তুময়। বস্তু সদা পরিবর্তনশীল। সাধারণভাবে বলতে গেলে একটা বস্তুকে অস্বীকার বা নাকচ করে নতুন একটা বস্তু আসে। তারপর সেই বস্তুকে অস্বীকার করে আর একটা বস্তু আসে। এইভাবে সবকিছু এগিয়ে চলে। এই এগিয়ে চলা খুব সহজ সরলভাবে বা কোনরকম দ্বন্দ্ব ছাড়াই ঘটে যায়, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। নেতির নেতি বা অস্বীকৃতির অস্বীকৃতির নিয়ম অনুসারেই এই পরিবর্তন হয়। বস্তুজগতের সাধারণ ধারা মেনেই সমস্ত অগ্রগতি ঘটে থাকে। অস্বীকৃতি বলতে কোনকিছুকে পুরোপুরি ‘না’ করে দেওয়া বোঝায় না। অস্বীকৃতির মধ্যে একটা স্বীকৃতি বা সদর্থক দিক লুকিয়ে আছে। পুরোনোর মধ্যেই নতুনের জন্ম হয়। নতুন হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না। একথা অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে।
অস্বীকৃতির তত্ত্বটি হেগেল প্রথমে ব্যবহার করলেও তা ছিল ভাববাদের মোড়কে ঢাকা। যেন একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এগোয় না। দুঃখের পর সুখ, সুখের পর দুঃখ। আবার সুখ। আবার দুঃখ। যেন এভাবেই জগৎ চলে। তিনি অস্বীকৃতির তত্ত্বকে চিন্তা বা ভাব-এর অগ্রগতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস একে বস্তুগত দিক থেকে বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহার করেছেন। বস্তুজগতে সবসময়েই পুরোনোর বদলে নতুনের আগমন ঘটে। তবে নতুন এবং পুরোনো কিন্তু একটা চাকার মতো ঘুরেফিরে আসে না। একই জিনিস একই ভাবে নতুন হয়ে আবার ফিরে আসে না। পুরোনোর বদলে নতুন আসে আরো উন্নতভাবে। ভালো থেকে আরও ভালো হয়। এভাবেই বস্তুর বিকাশ বা অগ্রগতি ঘটে। শুধু পরিবর্তনের জন্যই পরিবর্তন হয় না। উন্নততর বস্তুর জন্যই পরিবর্তন।
পুরোনোকে অস্বীকার করেই নতুনের আগমন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে শুরুতেই নতুন পুরোনো থেকে একদম আলাদা। পুরোনোর গর্ভ থেকেই নতুনের জন্ম হয়। পুরোনোকে অস্বীকার করলেও তার অনেক গুণাবলি নতুনের মধ্যেও দেখা যায়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি আমাদের পূর্বপুরুষেরা চিন্তা করতে না পারতেন, তাহলে
আমরা আজকের এই উন্নত চিন্তার শরিক হতে পারতাম না। লক্ষ লক্ষ বছর আগে প্রাণীজগৎ চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করে। তার রেশ ধরেই অনেকটা রিলে রেস নামক এক ধরনের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো আমরা এগিয়ে চলেছি। আমরা যেমন আমাদের পূর্বপুরুষের চিন্তাকে গ্রহণ করে এবং তার যথাসম্ভব অগ্রগতি ঘটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি, আমাদের বংশধরেরাও তেমনি আমাদের চিন্তাভাবনার আরো অগ্রগতি ঘটিয়ে তাকে উন্নততর করে তুলবে। তারপর তাদের বংশধরেরাও একইভাবে এগিয়ে যাবে৷ এভাবেই মানব সমাজের অগ্রগতি ঘটছে। আমরা সবাই একটা উন্নততর সমাজের দিকে রওনা দিয়েছি।
প্রকৃতিজগতেও এর অনেক নমুনা পাওয়া যায়। একটা ধান থেকে গজানো কচি চারাগাছটিকে দেখে খুবই দুর্বল মনে হতে পারে। এটাকে সহজেই নষ্ট করে ফেলা যায়। ঐ দুর্বল চারাটিই কিন্তু কয়েক হাজার বছর ধরে টিকে আছে। কয়েক হাজার বছর আগে হয়তোবা মাত্র কয়েকটি ধানের চারা থেকেই অগুন্তি ধানগাছ জন্মেছে। কোটি কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একটা ধান মাটিতে পড়ার পর কলি বেরোয়। ধানটির একটা অংশ শিকড় হিসেবে মাটিতে ঢোকে। ক্রমে ক্রমে সে ধানটিকে অস্বীকার করতে থাকে। একদিন ধান আর থাকে না। একটা ধানগাছ জন্মায়। ধানগাছটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তারপর ঐ ধানগাছ থেকে অনেকগুলো ধান জন্মায়। এমন সময় আসে যখন আর ধানগাছটিও থাকে না। কিন্তু তার ধানগুলো থেকে আরও অনেক ধানগাছ জন্মায়। তা থেকে আরো অনেক ধান ও ধানগাছ—এভাবেই প্রকৃতি ও মানব সমাজ এগিয়ে চলেছে। বাদ (থিসিস), প্রতিবাদ (অ্যান্টি-থিসিস) ও সম্বাদ (সিস্থিসিস)—এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলা সম্ভব হয়। প্রথম ধানটিকে যদি আমরা বাদ বলে ধরে নিই, তাহলে ধানগাছটি হলো প্রতিবাদ। কারণ সে ধানটিকে অস্বীকার করেই জন্মেছে। আর তার ফল স্বরূপ অনেক ধান হলো সম্বাদ। ধানগাছটিকে তারা অস্বীকার করেছে। ঠিক তেমনি আদিম সমভোগবাদী সমাজকে যদি আমরা বাদ হিসেবে ধরে নিই, দাসসমাজ তাহলে প্রতিবাদ, কারণ আদিম সমভোগবাদী সমাজকে সে অস্বীকার করেছে। আর দাস সমাজকে অস্বীকার করেছে বলেই সামন্ততান্ত্রিক সমাজ হবে সম্বাদ। আবার দাস সমাজকে বাদ হিসেবে ধরে নিলে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ হবে প্রতিবাদ, পুঁজিবাদী সমাজ হবে সম্বাদ। এভাবেই সমাজ এগিয়ে চলেছে। তবে একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বপ্রকৃতির কোন কিছুই একেবারে হুবহু ফিরে আসে না। নতুন পুরোনোটার মতোই একেবারে একইরকম হয় না। প্রত্যেক প্রাণী বংশগতি সূত্রে তার পূর্বপুরুষের কাছ থেকে অনেক কিছু পেলেও সবকিছু পায় না। তাই দুনিয়ায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের চাইতে আলাদা।
সবশেষে একথা বলা যায়, বিশ্বজগতের অগ্রগতির ধারা খুব সহজসরলভাবে এগোয় না। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের নানা আঁকাবাঁকা পথ ধরেই তাকে এগোতে হয়।
@freemang2001gmail-com



