Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

বিজ্ঞান ও মার্কসীয় দর্শন- জে বি এস হ্যালডেন

আমি বহু বিস্তীর্ণ’ ক্ষেতে আলোচনাকে প্রসারিত করবার চেষ্টা করেছি এবং আমি সম্পূর্ণ সচেতন যে, আমি এটা করেছি অসমভাবে এবং অগভীরভাবে। আমি আশা করি যে, হয়ত অন্যদের আমি উদ্বুদ্ধ করতে পারব আমার আলোচনার ফাঁকগুলি পূরণ করতে এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে সংশোধন করতে। প্রবল বাদানুবাদের মধ্যে দিয়েই বিজ্ঞানের যথোপযুক্ত মার্কসবাদী ব্যাখ্যায় পৌঁছানো সম্ভব এবং আমি এটা খুব পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে আমি প্রবলভাবে সমালোচিত হওয়ার আশা করি। তবে আমি এও আশা করব যে, আমার যে সমালোচনা করা হবে ত। হবে গঠনমূলক।

আমার দেওয়া উদ্ধৃতিগুলিতে আমি নিম্নোক্তরুপ শব্দ-সংক্ষেপ করেছি :

এফ. ‘লাডবিগ ফয়ারবাখ এ্যান্ড দি আউটকাম অব ক্ল‍্যাসিকাল জার্মান ফিলসফি’: ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, ১৮৮৮, ইংরেজী অনুবাদ (লন্ডন, মাটি’ন লরেন্স, তারিখ নেই)

এ. ডি. ‘হের ইউজেন জারিওস রেভল্যুশন ইন সায়েন্স’ (‘অ্যান্টি জুরিও’): ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, ১৮৭৮, ইংরেজী অনুবাদ এমিল বার্ন’ন (লন্ডন, লরেন্স এ্যান্ড উইশার্ট’, তারিখ নেই)

‘ক্যাপিটাল’: কাল’ মার্কস, ইংরেজী অনুবাদ: মরে ও আভেলিও, সম্পাদনা, ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৮৮৭ (লন্ডন, জজ’ অ্যালেন এ্যান্ড আনউন লিমিটেড) সি.

৬. এফ. ‘দি ওরিজিন অব দি ফ্যামিলি, প্রপাটি’ এ্যান্ড দি স্টেট’: ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, ১৮৮৪, ইংরেজী অনুবাদ: আর্নেস্ট উনটারমান (কার, শিকাগো, ১৯০২)

এম. ই. ‘মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এমপিরিও-ক্রিটিসিজম’: ভি. আই. লেনিন, ১৯০৯, ইংরেজী অনুবাদ: ডেভিড কভিটকো (লন্ডন, মার্টিন লরেন্স, তারিখ নেই)

আমার আশা আমার অনেক পাঠকই উপরোন্ড বইগুলি পড়তে উদ্বুদ্ধ হবেন।

অনুবাদকের নিবেদন

(জে. বি. এস. হ্যালডেনের The Marxist Philosophy and the Sciences নামক বিখ্যাত গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হলো।।

হ্যালডেন যে সময়ে এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তখন কেবলমার সোভিয়েত ইউনিয়নে মাক’সীয় দর্শনের বাস্তব কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। ভূতপূর্ব রুশ সাম্রাজ্যের অধীন প্রায় সমগ্র জনসমাজ নতুন জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিার দিকে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। (বর্তমানে বিশ্বের জনসমাজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মাক’সীয় দর্শনের শ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়ে সমাজতান্দ্রিক বিশ্বকে প্রসারিত করেছে। কাজেই মার্ক’সীয় দর্শ’নের বাস্তব গুরুত্ব এখন আর কেউ অস্বীকার করতে পারেন না।) বিশ্বের জনসমাজের এত বৃহৎ অংশকে যে দশ’ন প্রভাবিত করেছে সেই দশ’নের মম’ গ্রহণ করার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। প্রথম শ্রেণীর বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম হ্যালডেন দীর্ঘকাল আগে এই প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিলেন এবং নির্মোহ বিচার-বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে মার্ক’সীয় দর্শ’নই একমাত্র বাস্তব দর্শন এবং অভ্রান্ত দর্শ’ন। মার্ক’সীয় দর্শ’ন অর্থাৎ বান্দিক বস্তুবাদ অন্যান্য দার্শনিক মতবাদের মতো কোনো বিশেষ গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়। (দ্বান্দি্বক বস্তুবাদ প্রকৃতি, ইতিহাস, সমাজ-এক কথায় জগৎ ও জীবনের সার্বিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা এবং তার থেকে পর্যায়ক্রমে কিন্তু নিশ্চিতভাবে জ্ঞানলাভের পদ্ধতি।

(মার্কসবাদের ভিত্তি হলো বিজ্ঞান।) মার্কসবাদী বিশ্লেষণে রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমরা যেমন সমাজের রূপান্তরের গতি-প্ররতি পূর্ব’ থেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি, তেমনি সেই রূপান্তরকে নিয়ন্ত্রিত করতেও সমর্থ হই। যেহেতু মার্কসবাদে মানুষের সমগ্র কার্য’ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় সেইহেতু মার্কসবাদ বিজ্ঞানকেও নতুন আলোকে উদ্ভাসিত করে, কেন-না বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিজ্ঞানের প্রয়োগও মানুষের কাজের একটি ক্ষেত এবং এই কাজ সমকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং মানুষের চিন্তার কতকগুলি সাধারণ নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া মার্ক’সবাদ এমন কতকগুলি নিয়ম নির্ণয় করতে পেরেছে যেগুলি প্রকৃতির রাজ্যে যেমন সত্য তেমনি মানুষের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। (মার্ক’সবাদের বিবেচ্য বিষয় প্রধানত সত্তা নয়, সত্তার উদ্ভব ও বিকাশের প্রক্রিয়া। মার্কসবাদ আমাদের পরিবর্তন ও সবরকমের বিকাশকে বুঝতে সাহায্য করে। কাজেই, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিজ্ঞানের প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্ক’সবাদ আমাদের সহায়ক হয়, আমাদের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করে। বর্তমান গ্রন্থে হ্যালডেন মার্কসবাদের এই দিকটি পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন যে মাক’সবাদ তাঁর নিজের গবেষণার কাজে যেমন সহায়ক হয়েছে, অন্যান্য বৈজ্ঞানিক কর্মী ও বিজ্ঞানের ছাত্রদের নিকট তেমনি সহায়ক হবে এই আশা নিয়েই তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। যদিও এই গ্রন্থ মূলত বৈজ্ঞানিক কর্মী ও বিজ্ঞানের ছারদের উদ্দেশ্য করেই রচিত হয়েছে তবুও আলোচ্য বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছেও চিত্তাকর্ষক হবে, কেন-না শেষ বিচারে এ হলো আমাদের সমাজ জীবনের কথা।

মার্ক’সবাদের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কে’র বিষয়ে মার্ক’সের প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কা’পিটাল’-এ কোনো আলোচনা আমরা পাই না। হ্যালডেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বিজ্ঞানের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পর্ক’ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন এঙ্গেলস। এই বিষয়ে আমাদের কাছে তাঁর সব চেয়ে গুরুয়েপাণ’ বইগুলি হলো ১৮৭৮ সালে লেখা Herr Eugen Duhring’s Revolution in Science, সাধারণভাবে যা Anti-Duhring নামে পরিচিত এবং ১৮৮৮ সালে লেখা একখানা ছোট বই Ludwig Feuerbach and the Outcome of Classical German Philosophy এ ছাড়া আছে পান্ডুলিপি আকারে রক্ষিত এঙ্গেলসের অনেক নোট যা পাবে’ পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়নি কিন্তু মার্ক’স-এঙ্গেলস আর্কাইভস-এ “Dialektik und Natur” এই শিরোনামে পাওয়া যায়।

(লেনিনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ’ দার্শনিক গ্রন্থ হলো ১৯০৮ সালে প্রকাশিত Materialism and Empirio-Criticism। এই গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন প্রধানত বগদানফ, লুনাচারস্কি প্রমুখ অন্যান্য যাঁরা নিজেদের মার্কসবাদী বলে দাবি করতেন তাঁদের বক্তব্য খণ্ডনের জন্য। এ ছাড়া লেনিনের কয়েকটি ছোট কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ নোট, যেগুলি পাণ্ডুলিপি আকারে রক্ষিত ছিল, প্রকাশিত হয়েছে।)

বর্তমান গ্রন্থে বিজ্ঞানের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পর্ক’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হ্যালডেন প্রধানত উপরোক্ত সূত্রগুলির ওপর নির্ভর করেছেন। লেনিনের সমকালে যেসব আবিষ্কারের ফলে পদার্থবিদ্যার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল, যেমন তেজস্ক্রিয়তা, ইলেকট্রন, আপেক্ষিকতাবাদ ইত্যাদির আবিষ্কার।

সেগুলিকে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন অথচ মার্ক’সবাদের বিরোধীরা দাবি করেছিলেন যে ঐসব আবিষ্কারের ফলে মার্কসবাদের মৌল তত্ত্বগুলি খাঁডত হয়েছে। কাজেই ঐসব আবিষ্কারকে লেনিন যে স্বাগত জানিয়ে-ছিলেন তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ’ ঘটনা। তবে, বিজ্ঞানের সঙ্গে মার্ক’সবাদের সম্পক’ আলোচনায় এঙ্গেলসই আমাদের প্রধান উৎস। অবশ্য তিনি নিজেই খুব স্পষ্ট করে বলেছেন যে তাঁর গ্রন্থের প্রধান তত্ত্বগুলি মার্ক’স থেকে উৎসারিত।

হ্যালডেন মার্কসবাদের মূল তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করবার সঙ্গে সঙ্গে এঙ্গেলস ও লেনিনের লেখায় মার্ক’সবাদের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কে’ যে ধারণা বিকাশিত হয়েছে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও আলোচনা করেছেন বর্ত’মান গ্রন্থে। তিনি দেখিয়েছেন যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলির সঙ্গে মার্কসবাদের কোনে অসঙ্গতি নেই। মার্কসবাদের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ তত্ত্ব হলে। খণ্ডনের খণ্ডন (Negation of the Negation।। মার্ক’সের মতে প্রগতি, নতুনত্ব ও বিকাশের এইটিই হলো প্রধান উৎস। বিজ্ঞানের প্রগতিতে এই নিয়ম যেমন অতীতে তেমনি এখনও সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে চলেছে। হ্যালডেন এই আলোচন। প্রসঙ্গে সঙ্গতভাবেই পাঠকদের সতক’ করে দিয়েছেন যে উপরোক্ত গ্রন্থস্বয়ে ব্যস্ত এঙ্গেলসের মতামত বিচার করার সময় তাঁর যেন স্মরণ রাখেন যে ঐসব মত তিনি প্রকাশ করেছিলেন প্রায় ঘাট বছর আগেকার (বর্তমান গ্রন্থ রচনার সময় থেকে ধরে) বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সেই কারণে, বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ’ করার জন্য ঐসব মতামত অবশ্যই কিছুটা সংশোধন করে নিতে হবে।

এঙ্গেলস তাঁর সময় পর্যন্ত আগত ও উদ্ভুত বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলির ওপয় এবং লেনিন তাঁর কালে উদ্ভুত বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলির ওপর মার্কসবাদ প্রয়োগ করেছিলেন। হ্যালডেন মার্কসবাদ প্রয়োগ করেছেন তাঁর নিজের কালের বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলির ওপর। সঙ্গত কারণেই তিনি বলেছেন যে এই কালে আমাদের অবশ্যই যথেষ্ট সতর্ক’ভাবে অগ্রসর হতে হবে। মাক’সবাদ বড়জোর একজন বিজ্ঞানীকে বলতে পারে যে কোনদিকে তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। মার্কসবাদ কদাচিত তাঁকে বলবে যে তিনি কি দেখতে পাবেন, আর আকে যদি অনড় তত্ত্বে পর্য’বসতি করা হয় তার ফল হবে বিভ্রান্তিকর। মনে রাখা দরকার যে অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র খুব সীমাবদ্ধ। সেই গবেষণার কাজে যেমন সব সময় অনুবীক্ষণ যন্ত বা অন্তরকলনের প্রয়োজন হয় না, তেমনি প্রয়োজন হয় না দ্বান্দিকতা সূত্রের। বস্তুত মার্ক’সবাদী দৃষ্টির সাথ’ক প্রয়োগের ক্ষেত্র হলো বিজ্ঞানের বিকাশের অনুধাবনে এবং বিজ্ঞানের এক শাখার সঙ্গে অপর শাখার সম্পক নির্ণয়ে। যেমন, রসায়নের সঙ্গে পদার্থবিদ্যার সম্পর্ক’ ও জীববিদ্যার সঙ্গে রসায়নের সম্পর্ক’ নির্ধারণে মার্কসবাদী দৃষ্টি নিয়ে অগ্রসর হলে বৈজ্ঞানিক কর্মী অনেক নতুন ও কার্য’কর সিদ্ধান্তে আসতে পারেন।) মাক’সবাদ বিশেষ ফলপ্রস; হয় বিজ্ঞানের সেইসব শাখায় যেগুলির বিবেচ্য বিষয় পরিবর্ত’ন যেমন, অভিবাক্তির তত্ত্ব।

(বর্তমান গ্রন্থে হ্যালডেন মার্কসবাদী দৃষ্টিতে বিজ্ঞানের যেসব শাখা পর্যালোচনা করেছেন সেগুলি হলো: গণিত, বিশ্বতত্ত্ব এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও কোয়ান্টামবাদ, জীববিদ্যা, মনোবিদ্যা এবং সমাজবিদ্যা। যেসব সামাজিক প্রয়োজনে এবং অর্থনৈতিক বিকাশের সূরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে তা তিনি যেমন দেখিয়েছেন তেমনি দেখিয়েছেন যে বিভিন্ন শাখার বিকাশ ও অগ্রগতি ঘটেছে মার্কসবাদের মূল সূতগুলি অনুযায়ী। হ্যালড্রেনের উপস্থাপনা যেমন প্রাঞ্জল তেমনি চিত্তাকর্ষক।)

গণিতের ক্ষেত্রে সজ্ঞান যুক্তির প্রয়োগ হয়েছে গোড়া থেকেই। সংখ্যা ও মাপজোখ অবলম্বন করেই গণিতের উদ্ভব। দেখা যাবে গণিতের বিকাশে খণ্ডনের খন্ডন ঘটেছে একেবারে সংখ্যাতত্ত্ব থেকে। তেমনি পদার্থবিদ্যা বা বিশ্বতড়ের ক্ষেত্রে আমাদের এই উপলগ্নি ঘটেছে যে বস্তু-বিশ্বকে পর্ব’স্থিত অনড় পদার্থ’ হিসেবে না দেখে তাকে বিকাশের ধারা হিসেবে দেখতে হবে। বস্তুবিংশ্বরও যে ইতিহাস আছে, ভৌতজগতের যে নিয়ম একদা কার্যকর হত্যে আজ তাতে অনেক পরিবর্ত’ন ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে আরও ঘটবে এই প্রত্যয়ে আমরা উপনীত হয়েছি। পরিমাণগত পরিবর্ত’ন গুণগত পরিবত নে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা স্বীকৃত হয়েছে কোয়ান্টামবাদে। বস্তুত, কোয়ান্টামবাদ পদার্থে’র ভৌত সংগঠন ও রাসায়নিক চরির সম্বন্ধে আমাদের নতুন ধ্যান-ধারণার বিকাশ ঘটিয়েছে। জীববিদ্যা ও মনোবিদ্যায় বৈপরীত্যের ঐক্য বা বিরোধী সমাগম, পরিমাণগত পরিবর্ত’ন গুণগত পরিবর্ত’নে পরিণত হওয়া এবং খণ্ডড়নের খণ্ডন আমাদের কাছে অনেক স্পষ্টতরভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। বস্তুত, জীবজগতের বিকাশের প্রধান চালিকা-শক্তি যে ঐ নিয়মগুলি, আধুনিক গবেষণায় তার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সমাজবিদ্যা মার্কসবাদ প্ররোগের বিশেষ ক্ষেত্র। ইতিহাস প্রমাণ করছে যে সারা দুনিয়ায় মার্কসবাদের আকৃিত ঐসব অলংঘ্য নিয়ম কার্যকর হচ্ছে, এবং তদনুযায়ী সমাজের রূপান্তর ঘটে চলেছে। হ্যালডেন এসবের যে পরিচয় দিয়েছেন, কেবলমার বৈজ্ঞানিক কর্মী ও বিজ্ঞানের ছাত্ররা তা অনুধাবন করলে উপকৃত হবেন তাই নয়, সাধারণ পাঠকরাও জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে বাস্তব ও সার্থক ধারণায় পৌঁছাতে পারবেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে লেখা হলেও হ্যালডেনের বর্তমান গ্রন্থের সার্থকতা এইখানে। এই সার্থকতা উপলব্ধি করেই এই গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করা হলো।

এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়গুলি আপাতদৃষ্টিতে অসিজ্ঞ নীদের কাছে কিছু দূরুহ মনে হতে পারে। কিন্তু হ্যালডেন অসামান্য দক্ষতায় এগুলি সাধারণ পাঠকের কাছেও সহজবোধ্য করেছেন। অনুবাদেও আমরা সেই প্রাঞ্জলতা ও সুবোধ্যতা বজায় রাখবার চেষ্টা করেছি। কতটা সফল হয়েছি, পাঠকরা তার বিচার করবেন।

অনুবাদের কাজে একটা বিশেষ অসুবিধার কথা উল্লেখ করার আছে। বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাভাষার দৈনা আজও ঘে চেনি। এর কারণ, বিজ্ঞানকে আমরা সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সচেষ্ট এইনি। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় কাজকম’ করছেন আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা শতাধিক বছর ধরে, কিন্তু তাঁদের চিতা ও গবেষণার ফলগুলি প্রকাশের মাধ্যম ইংরেজী ভাষ্য। ফলে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কাজ কর্মে’র পরিচয় দেওয়ার উপযোগী শব্দ সম্পদ বাংলাতে এখনো সৃষ্টি হয়নি। হ্যালডেন তাঁর গ্রন্থে যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন সেগুলি ব্যক্ত করার উপযোগী সঠিক প্রতিশব্দ বাংলাতে না থাকার জন্য আমরা সেগুলিকে ব্যাখ্যা করে উপস্থিত করার চেষ্টা করেছি। আশা করি এতে অর্থ-প্রমাদ ঘটবার আশঙ্কা থাকবে না। মার্কসবাদের একটি লক্ষ্য জনসাধারণের চিন্তার মান উন্নত করা, উন্নত ধ্যান-ধারণা তাঁদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। মার্কসবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় বলে আমরা এ বিষয়ে সচেতন থেকেছি।

আমাদের দেশের বিজ্ঞানের ছাত্ররা ও সাধারণ শিক্ষিতজন এই অনুবাদ পাঠে উপকৃত হবেন এই আমাদের আশা।

তারাপদ মুখোপাধ্যায়

                                                         কয়েকটি মার্কসীয় তত্ত্ব

আমার শ্রোতাদের ও পাঠকদের কাছে দুটি ত্রুটি স্বীকার করবার আছে। এক, আমি প্রথমত দাশ’নিক নই কিন্তু আমাকে যখন রাজনৈতিক দর্শনের ওপর বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে আহ্বান করা হলো তখন আমি সর্বাপেক্ষা রাজনীতি-সম্পৃক্ত দশ’ন অর্থাৎ মার্ক’সের দর্শ’ন থেকে বেশি উপযোগী আর কোনো বিষয় নির্বাচন করতে পারি না। দ্বিতীয় জুটি অনেক গুরুতর। মার্কসবাদ সম্বন্ধে কিছু বলবার যোগ্যতা আমার কোনো দিক দিয়েই নেই। প্রায় এক বছর হলো মার আমি মার্কসবাদী হয়েছি। প্রাসঙ্গিক সমস্ত বিষয় আমি এখনো অধ্যয়ন করিনি, যদিও মার্ক’সবাদী হওয়ার আগে তার মধ্যে অনেকাংশ আমি পড়েছি। এই বক্তৃতামালার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র আমার শ্রোতাদের কাছে বিষয়টি পরিস্ফুট করে তোলা নয়, আমার নিজের চিন্তা ভাবনাকেও স্পষ্ট করে তোলা। স্মরণ করা যেতে পারে, সক্রেটিস নিজেকে বলতেন অন্যদের অ-মূত’ ধারণাগুলিকে এই জগতে ভূমিষ্ঠ করাবার ধাত্রী। আমার শ্রোতাদের ও পাঠকদের আমি আহ্বান করছি, আমার ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করতে।

এখন, প্রথমেই আমরা নিজেদের প্রশ্ন করব, কেন মার্ক’সবাদ গুরুত্বপূর্ণ’? আমার মনে হয় আমি ধরে নিতে পারি যে আমার শ্রোতাদের অধিকাংশ এবং আমার পাঠকদের একটা বড় অংশ এর বিরুদ্ধ-ভাবাপন্ন। কেন তারা এ নিয়ে মাথা ঘামাবে? একটা কারণ এই দর্শনের ব্যবহারিক উপযোগিতা বিরাট। কেউ যদি সিদ্ধান্ত করে যে এই দর্শ’ন সম্পূর্ণ’ ভুল তাহলেও এর গুরুত্ব কিছুমাত্র কম নয়। এই দর্শ’নকে অবলম্বনকারীদের আচরণে একটা বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি হয়। আমার বিশ্বাস সাধারণ একজন তত্ত্বীয় দার্শনিকের সঙ্গে এক, সপ্তাহ কাটালেও (অন্তত, ছুটির সময়) জানা যাবে না যে তিনি ভাববাদী না বাস্তববাদী, কিন্তু আমার মনে হয় না কোনো মার্ক’সবাদীর সঙ্গে একদিন মাত্র কাটালেও তাঁর মতবাদ কি তা অজানা থাকবে।

আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাশ’নিক মতবাদ আছে যা বহু পরিমাণে কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। প্রথম, স্কলাস্টিক দর্শন, যার সর্বপ্রধান প্রবক্ত’ ছিলেন সেপ্ট টমাস অ্যাকুইনাস। ঐ দর্শ’ন কেবলমাত্র কয়েকজন ব্যক্তির বা সমগ্র সাধু-মোহান্ত সমাজের মতামতকে ব্যক্ত করে না, বিরাট মধ্যযুগীয় সভ্যতার আচার-আচরণের উৎস এটি। রোমান ক্যাথলিক চার্চের কর্ম’ধারা পরিচালনায় এই দর্শ’ন এখনো সক্রিয়। আমরা এটা গ্রহণ করি বা না করি তবুও এটা পর্যালোচনা করার মতো বিষয়, কেন-না ক্যাথলিক চার্চ’ এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। ব্যবহারিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ’ দশ’নগুলির দ্বিতীয়টিকে এক বা দুই শতাব্দী আগে বলা হতো প্রাকৃতিক দর্শ’ন (ন্যাচারাল ফিলসফি), বর্তমানে বলা হয় বিজ্ঞান। কিন্তু এর প্রয়োগের ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ। কতকগুলি ক্ষেত্রে এটি নিশ্চয়ই বিশেষ সফল হয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কম। নিঃসন্দেহে এটি জগতকে বদলে দিয়েছে।

মার্কসবাদ দাবি করে যে এতে রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় এবং এটা জগতের রূপান্তরের পূর্বাভাস দিতে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের সক্ষম করে তোলে। এই মতবাদ মানবিক জগতে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে এবং যেহেতু বিজ্ঞান সমকালীন আর্থ’ সামাজিক অবস্থা এবং মানুষের চিন্তাধারার কয়েকটি বড় সাধারণ নিয়মের ওপর নির্ভরশীল, সেইহেতু তা বিজ্ঞানের ওপর নতুন আলোকপাত করে। এতে আরও কতকগুলি নিয়মের কথা বলা হয় যেগুলি মানবিক কার্যাবলী ও প্রকৃতি-উভয়ক্ষেত্রে সর্ব’র প্রযোজ্য। এখানে এই দাবিগুলি আমাদের বিচার করে দেখতে হবে।

সর্বোপরি, আমার বিশ্বাস এই বক্তৃতাগুলি দেওয়ার পক্ষে যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কেন-না মার্ক’সীয় দর্শন সম্বন্ধে কোনো-কোনো মহলে উল্লেখ-যোগ্য ভুল ধারণা আছে দেখা যায়। আমার মনে হয়, বেশ কিছু লোক মার্কসবাদ বলে কিছু আছে কি-না তা-ই জানেন না। সম্ভবত উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব ছাড়া মার্কসের রচনার তত্ত্বগত দিক সম্বন্ধে তাঁরা কিছু জানেন না। যদি তাঁরা শোনেন যে মার্কসবাদ হলো বস্তুবাদ, তাঁরা মনে করেন বস্তুবাদ হলো সেই তত্ত্ব যাতে বলা হয় মানুষ একটি যন্ত্র বা যাতে মনের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়। ১৯১৭ সালের আগে পর্যন্ত মার্ক’সবাদকে বাকুনিন, সোরেল বা অন্যান্য বিপ্লবী তাত্ত্বিকদের মতবাদের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে না করবার বা এটা একটা ক্ষুদ্র (ক্ল‍্যাঙ্কদের বা উৎকেন্দ্রিক লোক-গোষ্ঠীর) মতবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়ত সম্ভব হতো। ইংল্যান্ডে বিশেষ করে অবস্থাটা ঐরকমই ছিল, সেখানে পণ্ডিত মহলের ও রাজনীতিক মহলের বড় অংশেই এটা উপেক্ষা করা হতো, কিন্তু মূল য়ুরোপ ভূখণ্ডে এটা অন্তত সমালোচনায় যোগ্য বলে মনে করা হতো। অবশ্য আপনাদের মনে থাকবার কথা মানুষ বা ধৰ্ম্ম উভয় ক্ষেত্রে ‘ক্ল্যাঙ্ক’ শব্দের সংজ্ঞা হলো ‘একটি ছোট জিনিস যা আবর্তন (বিপ্লব) করে।’ (ইংরেজী কথাটা হলো-‘A little thing that makes revolutions’. Revolution শব্দের অর্থ আবর্ত’ন এবং বিপ্লব দুই-ই)। এখন মার্কসবাদের গুরুত্ব অস্বীকার করা অসম্ভব কেন-না মাক’সবাদ ছিল লেনিনের দর্শ’ন। এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে লেনিন ছিলেন তাঁর কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। এ কথা স্বীকার করা মানে তাঁর মতবাদকে মেনে নেওয়া নয়। যেমন, মুসলমান না হয়েও এ কথা স্বীকার করা সম্পূর্ণ’ সম্ভব যে মহম্মদ ছিলেন তাঁর কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। বিশ্ব-ইতিহাসের ওপর যাঁর এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ’ প্রভাব পড়েছে সেই লেনিনের মতবাদ নিশ্চয়ই বিচারের যোগ্য।

আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারি, প্লেটো বলেছিলেন আদর্শ’ রাষ্ট্র সেখানেই সম্ভব যখন সেখানে কোনো দার্শনিক রাজা হন। লেনিন, আরও অনেক কিছু ছাড়া ছিলেন একজন দার্শনিক। পরে আমরা তাঁর কয়েকটি দাশ’নিক মতামত বিচার করব। ভূতপূর্ব’ রুশ সাড়াজোর জন সমাজের ব্যাপকতম অংশে তিনি রাজা বা একজন ডিকটেটর (একনায়ক) না হলেও হয়েছিলেন তাদের মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি ও তাদের মতাদর্শে’র নেতা। এবং সেই জন-সমাজ এখনো তিনি যেসব নীতি নির্ধারণ করেছিলেন প্রধানত সেইগুলির দ্বারাই চালিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, অবশ্যই একটি আদর্শ’ রাষ্ট্র নয়। তার একটি কারণ মার্কসবাদীরা আদর্শ’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নয়, তাদের মনোযোগ বাস্তব রাষ্ট্র বা সম্ভাব্য রাষ্ট্রের দিকে। লেনিনের দশ’ন এখন সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে, কমিউনিস্ট পার্টি’র সভ্য নয় এমন সব মার্কসবাদীদের মধ্যে খুবই সজীব। সোভিয়েত ইউনিয়নে দর্শ’নের প্রতি আকর্ষণের ব্যাপকতার পরিমাপ করা যায় এই একটি বিবৃতি থেকে (যা আমি সত্য বলে মনে করি) যে, ১৯৩৬ সালে কান্টের কিছু দার্শনিক রচনাবলীর (আমার বিশ্বাস হয় না সেগুলি তাঁর সম্পূর্ণ’ রচনাবলী) অনুবাদের এক লক্ষ কপি ছাপা হয়েছিল এবং তার সবগুলিই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে, যেভাবেই হোক, দশ’ন ব্যাপকভাবে আকর্ষণীয় বিষয় এবং বৃটেনে কমিউনিস্ট প্রচার অভিযানের একটি ফল হয়েছে দর্শনের প্রতি আকর্ষণের পুনরুজ্জীবন।

যারা অন্য কোনো দর্শনের সত্যতা এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক আচার আচরণের ন্যায্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত-প্রত্যয় হয়েছে তাদেরও কেন অন্তত মোটামুটিভাবে মার্ক’সবাদ অধ্যয়ন করা উচিত তার কয়েকটি কারণ এইরকম।

এই বক্তৃতাগুলি দেওয়ার পক্ষে আমার কারণ অবশ্য স্বতন্ত্র। আমি মনে করি মার্ক’সবাদ সত্য।

এখন প্রশ্ন হলো, মার্ক’সবাদ কি? লেনিনের পূর্বগামী এবং বিশিষ্ট একজন রুশ মার্কসবাদী প্লেখানভ তাঁর বই ‘ফান্ডামেন্টাল প্রয়েমস অব মাক’সিজম’ এই কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন “মার্কসবাদ একটি সুসম্পূর্ণ তাত্তিকে মতবাদ।” অ্যারিস্টটল, সেন্ট টমাস, স্পিনোজা অথবা হেগেলের দর্শ’ন সম্বন্ধে ঐ কথা মোটামুটিভাবে প্রযোজ্য। সক্রেটিসের দর্শ’ন সম্মধে স্পষ্টতই ঐ কথা সত্য নয়। মার্কসবাদের ক্ষেত্রেও ঐ কথা অসত্য। মার্কসবাদ চড়োন্ত নয়, ক্রমবদ্ধ মতবাদ নয় এবং কেবলমাত্র গৌণত তাত্ত্বিক। এটি চূড়ান্ত নয়, কেন-না এটা জীবন্ত এবং উন্নীত হয়ে চলেছে এবং সর্বোপরি মার্ক’সবাদে চরমতের দাবি করা হয় না। মার্ক’সবাদ সম্বন্ধে একজন মার্কসবাদী বড়জোর এই কথা বলতে পারে যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়কার সামাজিক অবস্থায় সর্বোৎকৃষ্ট এবং সব চেয়ে সত্য যে দর্শান সৃষ্টি করা সম্ভব ছিল, তাই হলো মাক’সবাদ। মুখ্যত এটি মতবাদ নয়, এটি একটি পদ্ধতি। মার্ক’স নিজে যেমন তাঁর ফয়ারবাখের (এফ, পৃঃ ৭৫) ওপর একাদশ থিসিসে (নিবন্ধে) বলেছেন, “দার্শনিকেরা কেবল বিভিন্নভাবে জগতকে ব্যাখ্যা করেছেন, দরকার তাকে পরিবর্তি’ত করা।” দেকাতে’র মতো তিনিও তাঁর দশ’নকে মাখ্যত একটা পদ্ধতি বলেই মনে করেছেন এবং যদিও তত্ত্ব মার্কসবাদের অপরিহার্য’ অঙ্গ তবুও মার্ক’স প্রয়োগকে তত্ত্বের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।)

এ কথার অথ’ অবশ্যই এই নয় যে বহু পরিমাণে তাঁর পদ্ধতির প্রয়োগের ফলে উদ্ভুত বেশ কিছু পরিমাণ তত্ত্বও মাক’সবাদের অন্তভু’ন্ত হয়নি। কিন্তু প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলির মতো মার্ক’সবাদের মধ্যেকার বিস্তারিত ধারণাবলীর সৃষ্টি হয়েছে বাস্তব অবস্থার ক্ষেত্রে মার্ক’সীয় পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে। এবং যে তত্ত্ব এখন আছে তা অতীতের বড়-বড় দার্শনিক মতবাদের সঙ্গে তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে গড়ে উঠেছে বাস্তব ঘটনা পর্য’বেক্ষণের ফলে এবং খুব কম পরিমাণে ‘বিশুদ্ধ চিন্তা’র সাহায্যে।

মার্কসবাদের ঐতিহাসিক সূচনা ও উৎসগুলি সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। ১৮১৮ খৃস্টাব্দে দক্ষিণ-পশ্চিম জামানির ট্রায়ার শহরে মার্ক’সের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ইহুদি আইনজীবী। মার্কসের বয়স যখন ছয় বৎসর তখন তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট মতাবলম্বী খৃস্টান হন। মার্ক’সের সহকর্মী’ ফ্রেডারিক এঙ্গেলস রাইনল্যান্ডের বারমেন শহরে ১৮২০ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন জামান শিল্পপতি। দু’জনেই দর্শ’ন অধ্যয়ন করেন। এপিকিউরাসের দর্শনের ওপর গবেষণা-নিবন্ধের জন্য মার্ক’স ডক্টরেট উপাধি পান। তাঁরা দু’জনেই বামপন্থী হেগেলীয় মতাবলম্বী ছিলেন এবং পরে ফয়ারবাখের অনুগামী হন। মার্ক’স চেয়েছিলেন দার্শনিক হতে এবং খুব সম্ভব যে তিনি যদি অধ্যাপক হতেন তা-হলে বাস্তবে যা ঘটেছিল তার তুলনায় তিনি যে সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছিলেন তার পক্ষে অনেক কম বিপজ্জনক ব্যক্তি বলে গণ্য হতেন। তবে মনে রাখতে হবে যে প্রশীয় সরকার ফয়ারবাখ ও বাউয়ারের মতো আরও অনেককে বরখাস্ত করেছিলেন যাঁদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক মত বৈপ্লবিক হলেও মার্ক’সের পরবর্তী কালের মতামতের থেকে অনেক নরম ছিল। ১৮৪২ খৃস্টাব্দে চরমপন্থী রাইনিশে জাইটুও পরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের তিনি ছিলেন একজন। ১৮৪৩ খৃস্টাব্দে যখন এটা বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন তিনি প্যারিসে চলে যান। ইতিমধ্যে এঙ্গেলস ১৮৪২ খৃস্টাব্দে ম্যাঞ্চেস্টার চলে গিয়েছিলেন, সেখানে তুলোর দালাল হিসেবে কাজ করছিলেন এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ১৮৪৫ সালে তাঁর ‘দি কনডিশন অব দি ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড’ নামক পুস্তক প্রকাশিত হয়।

১৮৪৪ সালে প্যারিসে মার্কাস ও এঙ্গেলসের পরষ্পরের সঙ্গে দেখা হয় এবং তাঁরা জীবনব্যাপী বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁরা প্রধোর মতো বিপ্লবী ফরাসী তাত্ত্বিকদের স্বারা প্রভাবিত হন ও সমাজতন্ত্রী হন। ১৮৪৫ সালে প্রশীয় সরকারের ইচ্ছানুযায়ী মার্ক’সকে প্যারিস ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং তিনি ব্রুসেলস চলে যান। ঐ সময়ে তাঁদের মত আরও অনেক পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। প্রধো ও অন্যান্য ফরাসী নেতাদের থেকে তাঁর। ভিন্নমত হলেন এবং তাঁদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত হলো, ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’-তে। এর খসড়া করেছিলেন এঙ্গেলস এবং প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৭ সালে।

১৮৪৮ সালে দু’জনেই জার্মানিতে বিপ্লবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, মার্ক’স সাংবাদিক হিসেবে এবং এঙ্গেলস সৈনিক হিসেবে। ১৮৪৯ সাল থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাঁদের জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন তাঁরা ইংল্যান্ডে, সেখানে মাক’সের মৃত্যু হয় ১৮৮৩ সালে এবং এজেলসের ১৮৯৫ সালে। মার্ক’স বাস করতেন লন্ডনে এবং এঙ্গেলস ১৮৭১ সাল পয’ত ম্যাঞ্চেস্টারে, তারপর তিনিও লন্ডন চলে আসেন।

ইনটারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস এ্যাসোসিয়েশন পরবর্তী কালে ফাস্ট’ ইনটারন্যাশনাল (প্রথম আন্তর্জাতিক) নামে যা পরিচিত-প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক কাজগুলি করা ছাড়া তাঁরা ঐ সময়ে প্রচুর লিখেছেন। মার্ক’সের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূণ’ গ্রন্থ অবশ্যই ‘ডাস ক্যাপিটাল’ কিন্তু বিজ্ঞানের সঙ্গে মাক’সবাদের সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রধানত এঙ্গেলস যেসব মতামত ব্যক্ত করেছেন তারই ওপর নির্ভর করব। আমাদের বিষয়ের তাঁর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ’ গ্রন্হুগুলি হলো: ‘হের ইউজেন ড্যুরিওস, রেভল্যুশন ইন সায়েন্স’ (১৮৭৮), সব’সাধারণের কাছে যা ‘অ্যান্টি-ডারিও’ নামে পরিচিত এবং ১৮৮৮ সালে রচিত অপেক্ষাকৃত ছোট গ্রন্থ ‘লাডবিগ ফয়ারবাখ এ্যান্ড দি আউটকাম অব ক্ল‍্যাসিকাল জামান ফিলসফি’। সর্বশেষ, এঙ্গেলসের বিরাট সংখ্যক নোটের পান্ডুলিপি। এগুলি অবশ্য ইতিপূর্বে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু মার্কস-এঙ্গেলস আকাইভ-এ ‘ডায়ালেকটিক উন্ড নেটর’ (Dialektik Und Natur-Dialectic of Nature) এই নামে প্রকাশিত হয়েছে। অ্যান্টি-ডারিঙ ও ফয়ারবাখ দু’খানিই বিতর্ক’মূলক গ্রন্থ এবং অধিকাংশ লোকের কাছেই সহজপাঠ্য বলে মনে হয় কিন্তু একাধিক কারণে দর্শ’নের একজন সাধারণ ছাচের কাছে এগুলি কিছুটা ধাঁধার মতো মনে হবে। বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার যে এঙ্গেলস তীর বাঙ্গের সঙ্গে যাঁর লেখার সমালোচনা করেছিলেন সেই ড্যুরিঙ ছিলেন সমাজতন্ত্রী ও বস্তুবাদী, এবং বহু বিষয়ে একমত ছিলেন তাঁরা দুজনে যাকে ভিত্তি করে বাস্তব বিতর্কের অবকাশ ছিল। যেসব ক্ষেত্রে এঙ্গেলস ভিন্ন মত পোষণ করতেন সেইসব ক্ষেয়ে তিনি জ্যুরিঙকে প্রবলভাবে আক্রমণ করেছিলেন।

আবার, এঙ্গেলস নিজেকে ফয়ারবাখের শিষ্য বলেছেন কিন্তু বহু ক্ষেত্রে তিনি ফয়ারবাখের সমালোচক ছিলেন। অনুরূপভাবে, মার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত তাঁর ‘দি হোলি ফ্যামিলি’ রচিত হয়েছিলো জুনো বাউয়ারের বিরুদ্ধে যাঁর সঙ্গে তাঁর বেশ কিছুটা মতৈক্য ছিল এবং ‘পভাটি অব ফিলসফি’-তে আক্রমণের লক্ষ্য ছিলেন প্র’ধ্যে। ঐসব গ্রন্থগুলির বৈশিষ্ট্য হলো সেগুলি প্রকাশ্য শত্রুদের বিরুদ্ধে রচিত হয়নি, রচিত হয়েছিল তাঁদের বিরুদ্ধে যাদের সঙ্গে তাঁরা বহু বিষয়ে একমত ছিলেন। সাধারণ দর্শনের বই সব পাঠকদের উদ্দেশ করে লেখা, কেবলমাত্র তাদের উদ্দেশ্যে লেখা নয় যাদের সঙ্গে মাত্র কয়েকটি সীমাবদ্ধ ক্ষেতে গ্রন্থকারের মত-বিরোধ আছে। কাজেই সাধারণ দর্শনের বই পড়তে অভ্যস্ত কোনো পাঠকের কাছে ঐসব বই পড়া কঠিন আয়াসের ব্যাপার।

প্রশ্ন করা যেতে পারে সমকালীন যেসব ব্যক্তির সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে তাঁর মত পার্থক্য ছিল যেমন কোঁত, মিল, স্পেন্সার অথবা গ্রীন, এঙ্গেলস তাঁদের কেন আক্রমণ করেননি? সম্ভবত তার উত্তর এই। তাঁদের মতো দার্শনিকদের দিন যে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে এটা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল। মিল ও স্পেন্সারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলির অনেকাংশ বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে, আধুনিক সমাজতল্লীদের অনেকেই জারিত ও ফয়ারবাখের মত অনুসরণ করেন। এঙ্গেলস ‘দক্ষিণপন্থী’ মতবাদগুলিকে তাদের অশোধিত রূপকে নয়, সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপকে আক্রমণ করেছিলেন। বস্তুত, তিনি সহজতম প্রতিপক্ষকে না বেছে নিয়ে কঠিনতম প্রতিপক্ষকে বেছে নিয়েছিলেন।

(লেনিনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ’ দার্শনিক গ্রন্থের নাম ‘মেটিরিয়ালিজম এ্যান্ড এম্পিরিও-ক্রিটিসিজম’। ১৯০৮ সালে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল এবং প্রধানত বগদানফ, লুনাচারস্কি এবং অন্য যাঁরা নিজেদের মার্কসবাদী বলে দাবি করতেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়োজিত হয়েছিল। পরবর্তী কালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারে লেনিনের সহকর্মী’ হয়েছিলেন লুনাচারস্কি। প্রথমবার লেনিনের ঐ বই পড়লে মনে হবে এটা একরকম বিধিবদ্ধ সংকীর্ণ মার্ক’সীয় মতান্ধতা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। যখন বগদানফ নিজেকে মার্কসবাদী বলে দাবি করেছেন তখন বগদানফের সঙ্গে মার্ক’সের মতের। পার্থক্য দেখাবার জন্য মার্কসের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার বাস্তবিকই যৌক্তিকতা আছে। গোটা বইটাই একজন যোদ্ধার বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য আপোষকামীরা, তা তাঁরা বগদানফ ও লুনাচারস্কির মতো মার্কসীয় আন্দোলনের অন্তভু’ন্ত লোকই হোক বা ম্যাক ও অ্যাভেনারিয়াসের মতো তার বাইরের লোকই হোক। তাঁর অভিমত “যেমন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমনি দাশ’নিক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষরা ঘোলাটে বৃদ্ধির লোক।” অন্যদিকে যেখানেই তিনি স্বচ্ছ চিন্তা দেখতে পেয়েছেন সেখানেই তার প্রশংসা করেছেন ও স্বীকৃতি দিয়েছেন, এবং ফলে প্রায়ই সম্পূর্ণভাবে তাঁর বিরোধীদের প্রতি তিনি যথেষ্ট শিষ্টাচার করেছেন। যেমন জেমস ওয়াড’ সম্পর্কে’ তিনি অন্যান্য কথার মধ্যে বলছেন, “এই স্পষ্ট ও সুসমঞ্জস অধ্যাত্মবাদী যেভাবে প্রশ্নটি রেখেছেন তা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিষ্কার ও প্রাসঙ্গিক।” অনুরূপভাবে, কাল’ পিয়ারসন সম্পকে’ বলা হয়েছে, “বস্তুবাদের এই বিবেকবান ও সৎ শত্রু।” এছাড়া, লেনিনের কতকগুলি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ মন্তব্যের পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।

এঙ্গেলস তাঁর ‘ফয়ারবাখ’ ও ‘অ্যান্টি-ডারিঙ’ গ্রন্থে এবং লেনিন যেভাবে বিজ্ঞানের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পর্ক’কে বিবৃত করেছেন এই বক্তৃতাগুলিতে আমরা তার মধ্যেই নিবন্ধ থাকব। লেনিন পদার্থ বিদ্যাতে তেজস্ক্রিয়া ও ইলেকট্রনের আবিষ্কারকে যে স্বাগত জানিয়েছিলেন তা বিশেষ চিত্তাকর্ষ’ক কেন-না যেসব আবিষ্কারের দ্বারা মার্ক’সবাদের মূলসূত্রগুলি অপ্রমাণিত হয়ে গেছে বলে বলা হতো সেগুলির সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পক’ কি, তা তিনি দেখিয়েছেন। তবে, আমাদের বক্তব্যের প্রধান উৎস হলেন এঙ্গেলস যদিও তিনি বলেছেন যে তাঁর রচনার প্রধান সূত্রগুলি মার্ক’স থেকে নেওয়া।

মার্কসবাদ অধ্যয়ন করতে গেলে তত্ত্বীয় দর্শ’নের ছাত্র প্রথমে কিছুটা হতাশ বোধ করবে। এতে বহু প্রশ্নের উত্তর যে দেওয়া হয়নি তার দুটি ভিন্ন-ভিন্ন কারণ আছে। প্রথমত, কতকগুলি প্রশশ্ন যথাযথভাবে উত্থাপিত হয়নি এবং যেসব ঐতিহাসিক কারণে অতীতে ঐসব প্রশ্ন করা হতো তা দেখিয়ে দেওয়াই ছিল যথেষ্ট। অন্য প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে, বর্তমানে যেসব তথা আমাদের হাতে আছে সেগুলির ভিত্তিতে জবাব দেওয়া যায় না। যেমন, মস্তিষ্ক ও মনের মধ্যেকার সম্পক’ নির্ধারণ করা মূলত অসম্ভব নয়, কিন্তু যতদিন আমরা আরও বেশি না জানি, বিশেষত মস্তিষ্ক সম্পকে’, ততদিন এটা একমাত্র সংক্ষিপ্তভাবে করা সম্ভব। মার্কসবাদের মনোযোগের বিষয় সত্তা বা অস্তিত্ব নয়, কিভাবে ঘটনা ঘটছে তাই মাক’সবাদের আলোচ্য বিষয়। (মাক’সবাদে দাবি করা হয় যে এটা কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়, সবরকমের পরিবর্ত’ন ও বিকাশকে বুঝতে সাহায্য করে এবং বোঝবার ফলে ঐ পরিবর্ত’ন ও বিকাশকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করতে সাহায্য করে।) অধিকাংশ দার্শনিক সময় ও পরিবর্তনকে কমবেশি কাল্পনিক বলে মনে করেছেন, যদিও হেগেলের সময় থেকে সেগুলিকে অপেক্ষাকৃত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্ত’নশীল জগত্যের পেছনে একটি কালাতীত সত্তা খু’জে বের করবার চেষ্টা হয়েছে। প্লেটোর দর্শনে এই প্রচেষ্টা বিশেষভাবে প্রকট।

এটা উল্লেখযোগ্য যে অধিকাংশ তত্ত্বীয় দর্শনের সঙ্গে খৃস্টধর্মের পাথ’কা হলো তাতে কালে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার ওপর চরম গুরুত্ব দেওয়া হয় যথা- সৃষ্টি, পতন, মনুষ্য প্রজাতির উদ্ধার এবং শেষ বিচার। আদিম খৃস্টধর্মে এই বৈশিষ্ট। বিশেষভাবে বজায় ছিল, কিন্তু ক্রমশ যখন এটি আর বৈজবিক ধর্ম’ রইল না তখন কিছু ধর্ম’তত্ত্বদে খৃস্টধমে’র তত্ত্বকে ক্রমেই আরও বেশি হৈতিক করে তোলবার চেষ্টা করেছেন। খৃষ্টধর্মে’র প্রথম শতকগুলিতে ধর্ম’তত্ত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে নব্য-প্লেটোনিক মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এবং বর্তমানে আমরা দেখছি ডীন ইঙ্গ-এর মতো দার্শনিকেরা ধর্ম’তত্ত্বের কালগত দিকটা লঘু করে কালহীন বা চিরন্তন দিকটাই বেশি করে তুলে ধরবার চেষ্টা করছেন। এটা অবশ্যই কেবলমাত্র সমাপতন নয় যে তাঁদের রাজনৈতিক মত সাধারণত প্রতিক্রিয়াশীল।

*মাক’সবাদে যে প্রচেষ্টা করা হয় মানতে হবে যে সেটি ন্যূনপক্ষে সত্তা হয়ে ওঠার সমস্যার ব্যাখ্যা করবার একটি স্পর্ধিত প্রচেষ্টা, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত দর্শনগুলিতে সত্ত্য সম্পর্কে’ যেসব সমস্যা উত্থাপিত হয়েছে সেগুলি সম্পর্কে মার্কসবাদের বক্তব্য খুব সামান্য। ঐসব সমস্যার অনেকগুলিই অস্বচ্ছ

চিন্তার ফলে উদ্ভুত হয়েছে বলে সেগুলিকে সরাসরি বাদ দেওয়া হয়েছে। মার্ক’সবাদে বস্তু ছাড়া অন্য কিছুকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, কাজেই পরা-বিদ্যাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে অবশ্যই ধরে নেওয়া হয়েছে যে বস্তুর জোগানের অফুরন্ত উৎস আছে, কিন্তু তার বেশি আর কিছু ধরা হয়নি।

এই অধ্যায়ের বাকি অংশে মার্কসবাদের কয়েকটি তত্ত্ব সংক্ষেপে বিবতে করব, অবশ্য এগুলি প্রধানত অর্থনৈতিক ক্ষেরের বাইরে। আমি কেবলমাত্র খুব সংক্ষিপ্তভাবে শেষ অধ্যায়ে মার্কাসের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করব এবং যেহেতু আমি অর্থনীতিবিদ নই, আমি মনে করি না যে আমার আলোচনা অভিনব বা প্রামাণিক হবে।

প্রথম হলো, তত্ত্ব ও প্রয়োগের ঐক্য এবং প্রয়োগই প্রধান। ফয়ারবাখের (এফ, পৃঃ ৭৩) ওপর মার্ক’সের থিসিস-সমূহের একটি থেকে উদ্ধৃতি দিতে চাই।

“মানুষের চিন্তা বিষয়নিষ্ঠভাবে সত্য কি-না এটা তত্ত্বের কোনো প্রশ্ন নয়, এটা প্রয়োগের প্রশ্ন। প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তার চিন্তার সত্যতা, অর্থাৎ তার বাস্তবতা ও ক্ষমতা, ‘এই জাগতিকতা’ প্রমাণ করতে হবে। যে চিন্তার সঙ্গে প্রয়োগের কোনো সম্পক’ নেই সেই চিন্তা বাস্তব কি অবাস্তব তা নিয়ে যে বিবাদ তা স্কলাস্টিক মতবাদীদের প্রশ্ন ছাড়া অন্য কিছু নয়।”

আবার, (এঙ্গেলস জ্যোতিষ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, জ্যোতিষ চচার প্রথম দিকে কতকগুলি সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি ছিল কোপার্নিকাসের সিদ্ধান্ত এবং ঐ সিদ্ধান্তগুলির প্রত্যেকটির সাহায্যে দৃষ্ট ঘটনাগুলি যথেষ্ট পরিমাণে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যেত। কেবলমাত্র যখন নিউটনের অভিকর্ষ’ তত্ত্বের ভিত্তিতে নেপচুন গ্রহ আবিষ্কৃত হলো, এবং হ্যালির ধমকেতু আবার কবে দেখা যাবে তা বলে দেওয়া সম্ভব হলো, তখনই ঐ তত্ত্ব প্রমাণিত বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানে এসব খুবই সাধারণ কথা কিন্তু নব্বই বছর আগে (উনিশ শতকের মাঝামাঝি) এটা কোনোমতেই সাধারণ কথা ছিল না।)

‘আমরা এই পর্যন্ত বলতে পারি যে মার্কসবাদ থেকে প্রয়োগবাদ আশা করা যায়, যদিও প্রয়োগবাদের সঙ্গে অন্যান্য ক্ষেত্রের প্রায় সবগুলিতে মার্ক’সবাদের পার্থক্য আছে, বিশেষ করে, মার্কসবাদে এইসব ক্ষেতে যেমন। জগতের পরিবর্ত’নের ওপর সর্বথা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এবং সর্বোপরি, বিশ্বাস করা হয় যে একটি বাস্তব জগৎ আছে এবং পরম সত্যে কখনও পৌঁছানো না গেলেও অবিরামভাবে তার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। দ্বিতীয়, মার্ক’সীয় তত্ত্ব হলো বস্তুবাদ। বন্ধুবাদ শব্দটা বহু অথে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেজন্যে জানা বিশেষ প্রয়োজন মার্ক’স এই শব্দে ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছেন। এঙ্গেলস লিখেছেন (এফ, পৃঃ ৩১):

“সত্তার সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক’, ভাবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক’ সমগ্র দর্শনের এই সর্বপ্রধান প্রশ্নের মূলে, যেমন সব ধর্মে’র মূলে, রয়েছে বর্ব’র যুগের সঙ্কীর্ণ’ ও অজ্ঞ ধ্যান-ধারণা। কিন্তু সর্বপ্রথম এই প্রশ্ন তার সমগ্র তীক্ষ্ণতা ও তাৎপর্য’ নিয়ে উত্থাপিত হয় য়ুরোপীয় সমাজের খৃস্টীয় মধ্যযুগের দীর্ঘকালীন মোহাচ্ছন্নতার অবসানের পর। সত্তার সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক কি এই প্রশ্ন স্কলাস্টিক মতবাদেও একটা বড় স্থান অধিকার করেছিল। সেখানে প্রশ্ন ছিল কোনটি প্রাথমিক, ভাব অথবা প্রকৃতি। এই প্রশ্ন খৃস্টধর্মে’র ক্ষেত্রে এই আকারে উত্থাপিত হয়েছিল: ‘ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন না জগৎ চিরকালই আছে’?

“দাশ’নিকেরা এই প্রশ্নের উত্তরে দুটি বড় শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে-ছিলেন। যাঁরা ভাবকে প্রকৃতির আগে স্থান দিয়েছিলেন এবং সেইহেতু যে আকারেই হোক জগৎ সৃষ্টি হয়েছে বলে ধরে নিয়েছিলেন (এবং দাশ নিকদের আলোচনায় সৃষ্টি খৃস্টধর্মে’র ধারণার সঙ্গে তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও অসম্ভব) তাদের নিয়ে হলো ভাববাদী শিবির। অন্যদিকে, যাঁরা প্রকৃতিকে প্রাথমিক বলে গণ্য করেছিলেন তাঁর। বস্তুবাদীদের বিভিন্ন শিবিরভুক্ত।

“ভাববাদ এবং বস্তুবাদ এই দুটি শব্দের অর্থ মূলত এই এবং তার বেশি অন্য কিছু নয় এবং এখানেও ঐ শব্দ দুটি অন্য কোনো অর্থে ব্যবহৃত হয়নি।”

আপনারা লক্ষ্য করবেন যে জোর দেওয়া হয়েছে কালগত অগ্রাধিকারের ওপর, যুক্তিগত অগ্রাধিকারের ওপর নয়। যে দার্শনিক মতবাদে ঐতিহাসিক ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হয়, সেই মতবাদে এইটাই স্বাভাবিক।)

এখন বস্তুবাদের ঐ সংজ্ঞা অনেকেই মানেন না। যেমন, আমার প্রয়াত পিতা জে. এস. হ্যালডেন ‘মেটিরিয়ালিজম’, পূঃ ৫ (লন্ডন, ১৯৩২)] লিখেছিলেন:

“ভৌত-রাসায়নিক বাস্তবতা অথবা আমাদের চারপাশের বিশ্বকে মামুলি পদার্থ বিজ্ঞানগুলিতে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা বাস্তবের অনুরূপ, এই ধারণা কেবলমাত্র জীবন সম্পর্কে নয় সচেতন আচরণের সম্পকে’ও প্রযোজ্য -এই মতবাদকেই বলা যেতে পারে বস্তুবাদ।”

লেনিন যা লিখেছেন তার সঙ্গে যদি আমরা এটা মিলিয়ে দেখি তাহলে আমরা দেখব যে জে. এস. হ্যালডেনের মত, অন্তত উপরোক্ত অনুচ্ছেদে যে-ভাবে ব্যস্ত হয়েছে, মার্কসবাদের বিরোধী নয়। লেনিনের কথায়:

“এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক যে বস্তুবাদ চেতনাকে-যা হলো লঘুতর বাস্তবতা স্বীকার করে নেবে অথবা তড়িৎ-চৌম্বক অথবা আরও অপরিমেয়-ভাবে জটিল কোনো গতিসম্পন্ন বস্তুর ধারণা না করে যান্ত্রিক বিশ্বের ধারণা। স্বীকার করে নেবে।” (এম. ই, পৃঃ ২৩৮)

আবার অন্য এক জায়গায় লেনিন লিখেছেন

“বস্তুর, যা নিয়ে বস্তুবাদ জড়িত, একমার ধর্ম’ হলো যে তার অস্তিত্ব অন্য-নিরপেক্ষ বাস্তব, আমাদের চেতনার বাইরেও তার অস্তিত্ব আছে। অপরিবর্তনীয় উপাদানসমূহ অথবা ‘দ্রব্যাদির অপরিবর্ত’নীয় সার’ স্বীকার করে নেওয়া বস্তুবাদ নয়, তা হলো অধিবিদ্যাগত ধারণা, স্বান্দিক বস্তুবাদের বিরোধী ধারণা।” (এম. ই., পঃ ২২০))

অতএব এটা পরিষ্কার যে মার্কসবাদে যাকে বস্তুবাদ বলা হয় তা অষ্টাদশ শতকের ফরাসী দার্শনিকদের বস্তুবাদ থেকে অনেক কম পরিমাণে যান্ত্রিক। উল্লেখযোগ্য যে, যদিও আমার প্রয়াত পিতা বস্তুবাদের প্রবল বিরোধী ছিলেন, তাঁর বই ‘দি সায়েন্সেস এ্যান্ড ফিলসফি’ কোনোমতে মার্কসবাদী না হলেও মস্কোর একজন বেতার ভাষ্যকার তা দ্বান্দিকে বস্তুবাদের খুব ভালো প্রারম্ভিক পাঠ্যবই হিসেবে সুপারিশ করেছিলেন।

আবার, লেনিনের মনোভাব ভাববাদের বিরোধী হলেও তা সম্পূর্ণ নেতিবাচক ছিল না। “কেবলমাত্র স্থূল, সাদাসিধে এবং অধিবিদ্যাগত বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দার্শনিক ভাববাদ অর্থহীন। বিপরীত দিকে, স্বান্দিকে বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দার্শনিক ভাববাদ হলো জ্ঞানের স্বাভাবিক চরিত্রের একটিকে অথবা জ্ঞানের সীমাকে একদেশদর্শী ভাবে অতিরঞ্জিত ও স্ফীতকায় করে বস্তু থেকে, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঐশ্বরিক পরমে পরিণত করা।” [এম. ই, পৃঃ ৩২৭ (নোটের পাণ্ডুলিপি)]

অনেকে প্রশ্ন করেন, বস্তুবাদের অর্থ’ যখন দাঁড়িয়েছে বড় রকমের ভোজ ও দামী মোটরগাড়ির প্রতি আসক্তি তখন আপনারা বস্তুবাদ শব্দটা পরিত্যাগ করে, বাস্তববাদ বা কম বিরুদ্ধতা সৃষ্টি করবে এইরকম অন্য কোনো শব্দ কেন ব্যবহার করেন না? এর উত্তর হলো, মার্কসবাদ এই কথার ওপর বিশেষ জোর দেয় যে বস্তুই হলো আদি এবং মার্কসবাদ হলো লড়াকু দর্শন। মার্ক’সবাদকে কখনো-কখনো প্রবলভাবে ভাববাদের মোকাবিলা করতে হয়। যেমন, বর্তমানে শান্তিবাদীরা যাঁরা মনে করেন সদিচ্ছার স্বারাই দুনিয়াকে যুদ্ধ থেকে বাঁচানো সম্ভব যেন সদিচ্ছা একেবারে ফাঁকা দুনিয়ায় কাজ করবে তাঁদের প্রচারের এবং যে নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন বর্তমান রাষ্ট্রগুলি ভেঙে দেওয়াই যথেষ্ট, এবং মানুষের

                                                           চলবে-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating