Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

বিশ্বজুড়ে কর্ম সংকোচন দারিদ্র্য: সমাধান কোন্ পথে?

BISWAJURE KORMO SONKOCON DARIDRO: SOMADHAN KON POTHE By Santosh Sen Published by Subrata Das, from Bahu-bachan Prakashani, Halisahar, Banimandir, North 24 Pargana

লেখক

প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২৩

বহুবচন প্রকাশনী-এর পক্ষে

হালিশহর, বানীমন্দির উত্তর ২৪ পরগনা থেকে সুব্রত দাস কর্তৃক প্রকাশিত।

ফোন- ৯৯০৩৭৬২৯২৭ বহুবচন প্রকাশনীর অফিস

৪১, শ্রীগোপাল মল্লিক লেন নিউল্যান্ড, কলেজ স্কোয়ার কলকাতা-৭০০ ০১২

বিক্রয়কেন্দ্র স্টল- এক্স ৩, (কলেজ স্কোয়ার) সূর্য সেন স্ট্রীট, কলকাতা-৭০০০১২

অক্ষর বিন্যাসে বিশ্বরূপ বিশ্বাস

মুদ্রক বেঙ্গল লোকমত প্রিন্টার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ বি, ক্রীক লেন, কলকাতা-৭০০ ০১৪

প্রচ্ছদ নির্মান সুদীপ্ত জানা মূল্য ৪০ টাকা

বিশ্বজুড়ে কর্ম সংকোচন দারিদ্র্য: সমাধান কোন পথে

শুরুর কথা:

অতি সম্প্রতি প্রকাশিত একটি তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক। রাষ্ট্রপুঞ্জের দরবারে ২০০ টির বেশী এনজিও একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। যার নির্যাস-বিশ্বে প্রতি চার সেকেন্ডে এক জনের মৃত্যু হচ্ছে শুধুমাত্র না খেতে পেয়ে। অর্থাৎ অঙ্কের হিসেবে বছরে প্রায় ৭৯ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে। কোভিড ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাপিয়ে গেছে খাদ্যের অভাবে প্রাণহানির পরিসংখ্যান। এই মুহূর্তে বিশ্বের কম করে ৩৪.৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসঙ্কটে ভুগছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা নতুন না হলেও ২০১৯ সালের পর বিশ্বজুড়ে খদ্যসঙ্কটে ভুগতে থাকা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তীব্র আর্থিক বৈষম্য চলছে সমাজ জুড়ে।

বৈষম্যের চিত্রটা দেখুন। ২০২১ সালের অক্সফার্ম রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের কাছে মোট যে সম্পদ রয়েছে, তার থেকেও বেশি সম্পদের অধিকারী মাত্র দশ জন ধনকুবের। এবং কোভিড-কালীন সময়ে এই ধনকুবেরদের সম্পদ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। Global wealth report, 2021 থেকে জানা যাচ্ছে-২০২০ সালে এই বৈষম্য আরো বেড়েছে। মাত্র ১.১ শতাংশ ধনকুবের সমাজের প্রায় ৪৬% সম্পদ কুক্ষিগত করে পিরামিডের পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরে বসে রয়েছে, আর বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের জুটেছে মোট সম্পদের মাত্র ১.৩ শতাংশ। এই পথ বেয়ে আমেরিকায় পৌঁছালে দেখা যায়-আমেরিকার অর্ধেকের বেশি সম্পদের মালিকানা রয়েছে মাত্র ৪০০ ধনী শ্রেষ্ঠদের হাতে। আর ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে চিত্রটা আরো চিত্তাকর্ষক। মাত্র এক শতাংশের সম্পদ

বিশ্বজুড়ে কর্ম সংকোচন দারিদ্র্য: সমাধান কোন্ পথে

২০২০ সালের তুলনায় একুশ সালে বেড়ে হয়েছে ৪০.৬%। দেশের অধিকাংশ জনগণকে আরো নিঃস্ব করে মোট সম্পদের প্রায় পুরোটাই (৭২.৫%) চলে গেছে মাত্র দশ শতাংশের বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদে। এদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আদানি ও আম্বানি গোষ্ঠী। আদানির একদিনের উপার্জন ১৬১২ কোটি ডলার। এক বছরে আদানির সম্পত্তি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২২ সালে বিশ্বের ধনীতমদের তালিকায় দু’নম্বরে উঠে এসেছেন তিনি। আর এক ‘বহুজাতিক রাজ’ আম্বানী রয়েছেন প্রথম দশ ধনকুবেরদের মধ্যে। সমস্ত জাতীয় সম্পত্তি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, জল জঙ্গল পাহাড় জমি, খনিজসম্পদ এবং জনগণের অর্থ লুঠ করে বীভৎস খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে কিছু ধনকুবেরের মুনাফার পাহাড়কে আরো উঁচুতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আর এর বিপরীত প্রান্তে থাকা মানুষজনের আর্থিক চালচিত্র ভীষণ ভয়াবহ। তথ্য বলছে -২০২২ সালে বিশ্বের ক্ষুধাসূচকের তালিকায় ১২১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭ নম্বরে, অর্থাৎ শেষের দিক থেকে প্রথম হওয়ার খুব কাছে। অথচ, ২০১৪ সালে এই তালিকায় ভারত ছিল ৫৫ নম্বরে। মাত্র আট বছরে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বহুগুন বেড়ে গেছে। ‘আচ্ছে দিনের’ এর চেয়ে ভালো উপহার আর কিই বা হতে পারে!

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:

২০২২ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার সূচকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সমস্ত দেশের পিছনে রয়েছে ভারত। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের প্রকাশক ‘কনসান ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েলথ হাঙ্গার হিলফ’ বিশ্ব ক্ষুধার এই মাত্রাকে ‘গুরুতর’ বলে অভিহিত করেছে। মূলত চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এই ক্ষুধা সূচক স্কোর তৈরি করা হয়। যেমন: কত শতাংশ মানুষের পর্যাপ্ত ক্যালরি জোটে না, জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স অবধি শিশু মৃত্যুর হার কত, কত শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম এবং কত শতাংশ শিশুর ওজন উচ্চতার তুলনায় কম। স্বভাবতই শেষ দু’টি সূচক শিশুদের অপুষ্টির আন্দাজ দেয়, আর সেখানেই পিছিয়ে পড়ছে ভারত সহ একাধিক দেশ। কারণ, বিনি পয়সায় বা সস্তায় পেট ভরে শুধু ভাত খাইয়ে ক্ষুধা দূর হতে পারে না, পুষ্টির সমাধান তো দূর অন্ত। এই তালিকায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বেশ কয়েকটি দেশ যেমন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও মায়ানমারের অবস্থানও ভারতের উপরে। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জের সমীক্ষায় পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে এই অজুহাতে রিপোর্ট অস্বীকার করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু বাস্তব বড়ই রুঢ় ও নির্মম। দেশে বেকার মানুষের জীবন যন্ত্রণা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি-র তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে ২০২২ এর ডিসেম্বরে এসে বেকার বাহিনীর সংখ্যা বেড়েছে ৮.৩০ শতাংশ হারে, যার মধ্যে শহরঞ্চলে বেকারত্বের হার ১০.০৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বছরে দুই কোটি করে বেকারের চাকরি আজ গল্পকথায় পর্যবসিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এটা শুধুমাত্র একটি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ইতিহাসকে বিচার করার ক্ষেত্রে বড় খামতি থেকে যাবে। কারণ, বর্তমান পুঁজিবাদী জমানা বৃহৎ শিল্পের যুগ নয়। তাই সংগঠিত শিল্পে স্থায়ী পদে কোটি কোটি চাকরি কার্যত অসম্ভব। বরং এখনো টিকে থাকা মুষ্টিমেয় বৃহৎ শিল্প সংস্থায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মচারীর কাজ হারানোটাই দস্তুর। এই সত্যটাকে উপলব্ধিতে আনতে পারলে কোথায় কীভাবে সমাধান লুকিয়ে আছে, সেই পানে দৃষ্টিকে প্রসারিত করা সম্ভব হবে। লেখার শেষাংশে আমরা এই নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাব।

অন্যদিকে ২০২১ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে’ রিপোর্ট প্রকাশ করলে ঝুড়ি থেকে বেড়াল ঠিক বেরিয়ে পড়ে। এই রিপোর্ট থেকে জানা যায়-আগের পাঁচ বছরের তুলনায় বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে ভারতীয়দের অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা অনেকগুণ বেড়েছে। আর অক্টোবরে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ‘জে এন ইউ’-র গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘প্লাস ওয়ান’- এ। তাতে দেখা যায়, গত এক দশকে মহিলা-পুরুষ নির্বশেষে ভারতীয়দের গড় উচ্চতা কমে গিয়েছে। অ্যানিমিয়া বৃদ্ধি ও উচ্চতা হ্রাস-দুটোই ঘটে যথাযথ পুষ্টির অভাবে। এই মুহুর্তে দেশে অপুষ্ট মানুষের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি। আসলে হিন্দুত্ব, হিন্দুয়ানা, জাত পাত ধর্ম বর্ণে বিভাজন, ঘৃণাভাষণ তো আর খিদের জ্বালা বা অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে পারেনা। আমাদের দেশের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী আমরা মূলত কার্বোহাইড্রেট খেয়ে পেট গেছে। ভরাই, খাদ্য তালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ খুব কম থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হল-এই খাদ্যাভ্যাসের সংস্কৃতি অর্থনীতির পশ্চাৎপরতা থেকে জন্ম নিয়েছে কি? দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের ক্রয়ক্ষমতায় মাছ, মাংস, ডিম, দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছে দিতে পারছে কি? খাদ্য যথেষ্ট মজুদ থাকা সত্বেও তা দরিদ্র প্রান্তিক জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে কেন?

বিশ্বজুড়ে বাস্তব অবস্থাটা ঠিক কেমন:

২০২২ এর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য অধিকর্তা ডেভিড বিসলে বিশ্ববাসীকে জানান দিলেন-“আগামী বছরেই বিশ্বে ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। খাবারের অভাব এবং জিনিসপত্রের চড়া দাম শুধু দুর্ভিক্ষই তৈরি করবে না, বরং এর জেরে বিভিন্ন দেশে আর্থিক বৈষম্য বাড়ার সাথে সাথে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়বে”। তিনি আরো বলেছেন-“সাড়ে পাঁচ বছর আগে আমি যখন রাষ্ট্রপুঞ্জে খাদ্য সংক্রান্ত বিভাগের দায়িত্ব নিই, তখন পৃথিবীজুড়ে আট কোটি মানুষ ঠিকমত খেতে পেতেন না। আমরা ভেবেছিলাম এই সংখ্যাটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, অথচ তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে”। আবহাওয়া বদল আর ভূউষ্ণায়নের জেরে খাদ্য সংকটে জর্জরিত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৫ কোটিতে। করোনার ধাক্কায় এই সংখ্যাটা পৌঁছায় ২৭.৬ কোটিতে। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৫ কোটি ছাড়িয়ে BWI, IMF এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রমাদ গুনছে। দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্যসঙ্কট নিয়ে তাদের উদ্বেগ স্পষ্ট। তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়ম-‘Race to the bottom’ অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি রুখতে অর্থবানদের ট্যাক্স কমানোর নীতি বাস্তবে সমস্যাকে আরো তীব্র করেছে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের জামানায় আমেরিকার সরকার ব্যাপক হারে কর ছাড়ের জাতি গ্রহণ করলেও অর্থনীতিকে বেগবান করতে পারেনি। কিন্তু এই নীতির ফলে বর্তমানে আমেরিকার একজন শ্রমিকের চেয়েও কম ট্যাক্স প্রদান করে একজন বিলিয়ন ডলারের মালিক বা পুঁজিপতি। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলি স্পষ্টতই জানিয়েছে-১৯৭০ সালের তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার পর বর্তমানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার খাড়াই পথে আরো তীব্র গতিতে নিচের দিকে ধাবমান। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মুদ্রাস্ফীতিকে আটকাতে ব্যাংক ঋণের উপর সুদের বোঝা বাড়িয়েই চলেছে, এর ফলে বিশ্ব এক ভয়ানক আর্থিক মন্দার গভীর খাদের কিনারার দিকে এগিয়ে চলেছে। আইএমএফ’ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানাচ্ছেন আমেরিকার ‘ফেডারেল ফান্ড রেট’ (এই রেট অনুযায়ী ধার্য সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ নেয় এবং তাদের বাড়তি অর্থ অন্যদের ধার দেয়) বাড়ানোর ফলে ডলার শক্তিশালী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডলারে শোধ করতে হয় এমন ঋণের বোঝাও অনেক বেড়েছে। এটাই হচ্ছে ডলার আধিপত্যবাদ। বিশ্বের অর্থনীতি ধসে পড়ে পড়ক, কিন্তু আমেরিকার ডলারকে শক্তিশালী করতেই হবে। অথচ সুদের হার বাড়িয়ে যে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না, বরং অর্থনৈতিক সংকট ও কাজ হারানো শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ে তা এর আগের বড় বড় মন্দার সময় প্রমাণিত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভিউ অনুযায়ী ২০০৭-০৯ সালের তীব্র সংকটের ফলে বিশ্বের দুই কোটির বেশি মানুষ চাকরি খুইয়ে নতুন করে বেকার বাহিনীতে নাম লেখান এব আমেরিকা সরকারকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কর ছাড়ের ফলে ধনকুবেরদের সম্পত্তি আকাশচুম্বী হয়, সেটা আজ অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর সুদের হার বৃদ্ধিাকোপ সরাসরি গিয়ে পড়ে শ্রমিক কর্মচারী সহ উপভোক্তাদের ওপর। এর ফলে শ্রমিকরা আরও বেশি করে কর্মচ্যুত হন, শ্রমিকসহ সাধারন মানুষ বাধ্য হন তাদের দৈনন্দিন সংসার চালানোর খরচ কমাতে। এবং ক্রমশঃ বেড়ে চলা বাজেট ঘাটতি সামলাতে সরকারও বাধ্য হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহনসহ সমস্ত সামাজিক খাতে ব্যয় কমাতে। সবদিক দিয়েই যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন  আমজনতা। সমাজে বিদ্যমান পাহাড় প্রমান অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে এইসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে। ধনকুবেররা মিলিয়ন ডলারের ক্লাব থেকে বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে ঢুকে পড়ছেন আর নিরন্ন দরিদ্র মানুষগুলো গভীর দারিদ্র্যতার অসুখে জর্জরিত হচ্ছেন। অথচ সব দোষ গিয়ে পড়ে সেই শ্রমিকদের ঘাড়েই। বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে বলে পণ্যের দাম বাড়ছে, এই যুক্তি খাড়া করে পুঁজির মালিকেরা। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া মুদ্রাস্ফীতির সময় শ্রমিকদের মাইনে তো বাড়েই না, বরং তা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আর উদার অর্থনীতির সুযোগে ১৯৮০ থেকেই শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। বড় বড় কারখানাগুলো তুলে দিয়ে ‘ভার্টিক্যাল ডিভিশন অফ লেবার’ এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদেরকে ব্যক্তি মানুষে পরিণত করা হয়েছে। ফলতঃ শ্রমিকদের যুথবদ্ধ শক্তির জোরে বার্গেনিং করে মাইনে ঠিক করার ক্ষমতা আজ অতীত। দশ নম্বর পাতার চিত্র থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় ১৯৭০ থেকে কিভাবে শ্রমিকদের মজুরি কার্যত কমে চলেছে।

প্রায় উল্টোদিকে ধনকুবেরদের সম্পত্তি দিনে দিনে ফুলেফেঁপে উঠছে। তাই অর্থনীতিবিদদের যুক্তি

কর্পোরেটদের উচিত মজুরি না কমিয়ে মুনাফা কমানোর দিকে নজর দেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন-“বর্তমান উদার আর্থিক নীতির সুযোগে বড় বড় কোম্পানিগুলোর পক্ষে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়াটা অতি সহজ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে”। আইএমএফ’ র সচিব বলতে বাধ্য হয়েছেন “আমরা যদি এই আর্থিক সঙ্কট সামলে মুদ্রাস্ফীতিকে বাগে আনতে না পারি, তাহলে জনগণকে কার্যত রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে”।

পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক ব্যাংক সহ অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থার হর্তাকর্তা এবং অর্থনীতিবিদদের একটা অংশের গলায় উদ্বেগের সুর বাজছে। তাঁরা সমস্বরে জানাচ্ছেন -সামাজিক অসাম্য, সম্পদের অসম বণ্টন, বিভিন্ন সরকারি নীতির ব্যর্থতাই ভারত সহ সারা দুনিয়ায় না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির আসল কারণ। সম্পদের অসম বণ্টনকে কাঠগড়ায় তুললেও তাঁরা কিন্তু পুঁজির উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরির নিয়ম ও পুঁজিবাদের ‘ট্রিকল ডাউন থিওরি’র বিরোধিতা করতে পারছেন না। তাঁদের পক্ষে কেন এই কাজ করা সম্ভব নয়, সেইদিকে একটু চোখ ফেরানো যাক।

ট্রিকল ডাউন থিওরি:

পুঁজিবাদী অর্থনীতির এ এক দারুন মজাদার থিওরি। পুঁজির বাজার সচল রাখার জন্য তাদের দরকার এক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর (৩-৫ শতাংশ জনগণ), ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যাদের বেতন বা মজুরিও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েক গুণ। অন্যদিকে বুভুক্ষু নিরন্ন মানুষের একটা দলকে টিকিয়ে ও কোনক্রমে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, যাতে তারা শ্রমশক্তি বেচতে পারে। ওদের তত্ত্ব অনুসারে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের আয়ের একটা অংশ চুইয়ে চুইয়ে পৌঁছে যাবে সমাজের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায়। এইসব তত্ত্ব শুনতে বেশ ভালো হলেও বাস্তবে কী ঘটে? আলো ঝলমলে অট্টালিকায় অতিরিক্ত খাবার খেয়ে বা নষ্ট করে খাও পিও জিও’ সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ ডুবে থেকে বুজুয়াদের জয়গান গেয়ে আর ভোগ্যপণ্যের এক বিশাল বাজারকে সদা সচল রেখে চলেছে বুজুয়াদের পেটোয়া উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী। পন্যসর্বস্ব ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নিমগ্ন এই অংশটি আরো আরো টাকা, একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, ২৭ তলের প্রাসাদোপম বাড়ি, বিদেশ ভ্রমন বিলাস বৈভবের জন্য অন্ধগতিতে ছুটে চলেছে নিরন্তর। যে কারণে সমাজের এই অংশটি তাদের লোভ লালসা ও আরামের জন্য প্রকৃতির নিষ্পেষণ বাড়িয়েই চলেছে। সমাজ ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বার্থপর ব্যক্তিমানুষে পরিনত এই অংশটির চিন্তাভাবনা অপ্রাকৃত হয়ে পড়েছে। তাদের আদরের ছেলেমেয়ে ও নতিপুতিদের জন্য বিষাক্ত ক্লেদাক্ত কি ভয়ানক পৃথিবী রেখে যাচ্ছে সেদিকেও তাদের হুঁশ নেয়, আরো ওপরে ওঠার দৌড়ে ক্লান্ত মানুষগুলির এই নিয়ে ভাবনাচিন্তা করারও অবকাশ নেই।

আর অন্যদিকে এক বিরাট অংশের মেহনতি মানুষ, যারা প্রকৃতিকে ব্যবহার করে শ্রমশক্তি প্রয়োগ করে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে চালু রেখেছে, তাদের জীবনযাপনের সলিল ধারা বয়ে চলে একবেলা উপোষ করে বস্তিতে দশ ফুট বাই দশ ফুটের খুপরিতে গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে পড়া, পরের দিন সকালে শ্রমশক্তি বেচতে আবার কারখানায় দৌড়ানোর মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ সমাজের একটা ছোট অংশে বিশাল বিপুল বৈভব, অর্থের প্রাচুর্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের সমাহার। আর অন্যদিকে নিরন্ন বুভুক্ষু মানুষের লম্বা মিছিল। এই প্রসঙ্গে কার্ল মার্ক্স কী বলছেন দেখা যাক।

পুঁজির চিরকালীন নিজস্ব সঙ্কট:

ক্যাপিটালের তৃতীয় খন্ডে মার্ক্স প্রঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন “উৎপাদিত পণ্যের পুরোটা এমনকি স্থির ও পরিবর্তনীয় পুঁজি সহ উদ্বৃত্তমূল্যকেও বাজারে বিক্রি করতে হয়। যদি এটার একাংশ বিক্রি করা হয় বা পুরোটাও উৎপাদন-মূল্যের নিচে বিক্রি করা হয়, তাহলেও শ্রমিকরা শোষিত হয়। কিন্তু শোষণের অর্থাৎ শ্রম চুরির ফলে তৈরি হওয়া উদ্বৃত্ত মূল্য বিক্রি করতে না পারায় পুঁজির রিলেলাইজেশন হয়ে ওঠে না। পুঁজিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে না পারায় পুঁজি আংশিক এমনকি পুরোপুরি ক্ষতির (loss) মুখে পড়ে। প্রত্যক্ষ শোষণ এবং পুঁজির পুনরুৎপাদন কখনোই এক জিনিস নয়। এই দুটো স্থান কালের সীমা ছাড়িয়েও যুক্তিযুক্ত ভাবে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন (diverged) হয়ে পড়ে। প্রথমটি (শ্রম শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্য) নির্ধারিত হয় শুধুমাত্র সমাজের উৎপাদিকা শক্তির দ্বারা। কিন্তু দ্বিতীয়টি (রিলেলাইজেশন ও পুনরুৎপাদন) উৎপাদনের বিভিন্ন শাখা ও সমাজের ক্রয় ক্ষমতার ওপর সমানুপাতিক হারে নির্ভর করে। কিন্তু চরম উৎপাদিকাশক্তি (absolute production power) কিংবা চরম ক্রয়ক্ষমতার দ্বারা শেষেরটি নির্ধারিত হয় না। এটা নির্ধারিত হয় বিতরণের বিরোধ বা অসম বন্টনের দ্বারা, যা আবার সমাজের এক বড় অংশের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় প্রচন্ডভাবে। এর ফলে স্বভাবতই পুঁজির সঞ্চয়ন ও বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ে আরো বড় আকারে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করার মধ্য দিয়ে। পুঁজির উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের এটাই বৈজ্ঞানিক নিয়ম” [Capital, volume 3, page 244 অনুবাদ লেখকের]।

মার্ক্সের এই বক্তব্যকে সহজে বললে যা দাঁড়ায় শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করেই উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হয়, যার পুরোটা বাজারে বিক্রি করে ফিরিয়ে না আনতে পারলে পুজির বৃদ্ধি হয় না আর পুঁজির পুনরুৎপাদন করতে না পারলে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। আচ্ছা ভাবা যাক যে, সমাজের সব মানুষকে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জুড়ে নেওয়া হল এবং পুরো উৎপাদিত দ্রব্য শ্রমিকদের দেওয়া শ্রম-সময় অনুসারে তাদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হল। এমনটা হলে তো উদ্বৃত্ত হয় না, গুদামে পচিয়ে বা সমুদ্রে ফেলে দিয়ে সমাজের অমূল্য সম্পদ নষ্ট করতে হয় না, আর কোন মানুষকে না খেয়েও থাকতে হয় না। এটা মোটেই কষ্ট কল্পনা নয়। কিন্তু এসব করলে পুঁজির যে সমুহ বিপদ। “শ্রম চুরি করে এবং সমাজের একটা বড় অংশকে নিরন্ন রেখে উদ্বৃত্ত তৈরি করতে না পারলে পুঁজির যে চলে না। পুঁজিকে যতই মানবিক করে দেখানোর চেষ্টা হোক না কেন, এখানেই পুঁজি সবচেয়ে বড় অমানবিক কাজটা করে চলে নিরন্তর।” তাই সমাজে চূড়ান্ত বৈষম্য জিইয়ে রেখে উৎপাদন ও সকলের সামগ্রিক ক্রয়ক্ষতার মধ্যে বিরাট ফারাক জারি রেখেই পুঁজিক টিকে থাকতে হয়। এটাই পুঁজির নিজস্ব দ্বন্দ্ব।

পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী অর্থনীতিবিদরা বৈষম্যের কথা যেমন সামনে আনছেন, তেমনি অনুৎপাদক খাতে পুঁজির বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান ডেভিড মালপাস’ র কন্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট ধরা পড়ে। কিন্তু তাঁরা কেউ পুঁজির মধ্যেকার আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করছেন না। এই দ্বন্দ্বের নিরসনের পথে না হেঁটে সংকট মুক্তির জন্য এদের টোটকা হল-পুঁজির মালিকদের একটু ভদ্র সভ্য ও সমঝদার হতে হবে। কোথায় কেন কীভাবে এবং কতটা বিনিয়োগ করা দরকার সেই পথ বাতলে দিতে গিয়ে মালপাস বলছেন “পপুলার ভিডিও গেমস বানানোর প্রজেক্টে মাইক্রোসফট কোম্পানি ৬৯ বিলিয়ন ডলার (এক বিলিয়ন মানে ১০০ কোটি) বিনিয়োগ করছে। অথচ তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলো বছরে ৮ বিলিয়ন করে তিন বছরের জন্য ২৪ বিলিয়ন ডলার অনুদান চাইলেও তা দেওয়া হয় না”। তিনি স্পষ্টতই বলছেন “উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য যখন বেশি করে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তখন লক্ষ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে সম্পূর্ণ অনুৎপাদক খাতে। এই অমৃতবাণী শুনে মালপাসকে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের বেশ হিতাকাঙ্ক্ষী বলে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আসলে এঁদের এই ভালোমানুষির পিছনে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ অন্য কারণ। উন্নয়নশীল দেশের সস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিংড়ে নিয়ে ‘গ্লোবাল ভ্যালু অ্যাডেড চেইন’ র মধ্যে দিয়ে পুঁজির চলন ও মুনাফার হার বাড়িয়ে তোলার যে বিশ্ব কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা ধসে পড়বে এই সব দেশে যথেষ্ট বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে না পারলে। এটাই ওদের মাথাব্যথার প্রধান কারণ। আসলে রিয়েল এস্টেট, ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ব্যবসা, অটোমোবাইল শিল্পের সাথে ভিডিও গেমসের মত বৈদ্যুতিন শিল্পে বিপুল বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়কে আরো বেশি করে বাজারমুখী করা যাবে। কৃত্রিমভাবে চাহিদা বাড়িয়ে, খাও-পিও-জিও সংস্কৃতিকে চাগাড় দিয়ে আরো আরো বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি, পাঁচতারা- সাততারা হোটেলে রাত্রিবাস, বিলাসবহুল গাড়ি, রাজকীয় প্রাসাদ, ইত্যাদি প্রভৃতির জগতে এই অংশটাকে জুড়ে দাও। বিক্রিবাটা বাড়বে, চড়চড় করে বাড়বে মুনাফার গ্রাফ। অন্যদিকে প্রদীপের আলোর নিচে চাপা পড়ে থাকবে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের হাহাকার। কারণ, পুঁজির সারপ্লাস তৈরির প্রক্রিয়াকে চালু রাখতে কেবলমাত্র একটা ক্ষুদ্র অংশের পারচেজিং পাওয়ার বাড়িয়ে বাজারকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করা হয়। পুঁজির এই অন্ধ গতিকে বজায় রাখতে সমাজের একটা অংশকে পণ্য-সর্বস্ব এক ব্যক্তি মানুষে পরিণত করা হচ্ছে। আর অন্যদিকে শক্তির অপচয় ঘটিয়ে অণুৎপাদক খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে। যার হাত ধরে “প্রকৃতির শোষণ ও নিষ্পেষন বাড়ছে, দ্রুতগতিতে বাড়ছে গ্রাম ও শহরের মধ্যে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রের মধ্যে বিপাকীয় ফাটল।” পুঁজির এই নিজস্ব দ্বন্দ্বের নিরসন করতে না পারলে কোন টোটকা দিয়ে পুঁজিকে তার  সংকট থেকে বের করে আনা কার্যত সম্ভব নয়।

বিজ্ঞান প্রযুক্তির-বিকাশ ও অতি উৎপাদনের সাথে

পুঁজির দ্বন্দ্ব: তথ্য বলছে-বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন সব মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হলেও বিরাট সংখ্যক মানুষ, কম করে ১০০ কোটি রাতে ঘুমোতে যান খালি পেটে বা দুমুঠো মুড়ি বাতাসা খেয়ে। প্রচুর খাদ্য উৎপাদন হলেও সব মানুষের থালায় খাবার জোটে না। অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে বলেই ইউরোপ-আমেরিকায় এক বছর ছাড়া ছাড়া চাষ করতে হয়। যে বছর চাষ হয় না সেই সময় কৃষকদের ভর্তুকি দেয় সরকার। আর অতিরিক্ত খাদ্য গুদামে পচে নষ্ট হয়, কোন কোন সময় তা নষ্টও করে দেওয়া হয় ইচ্ছে করে। অথচ অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য সর্বসাধারণের মধ্যে বন্টন করে দিলে তো আর পুঁজির চলে না। বিনি পয়সায় বা কম দামে খাবার জুটে গেলে বেকার বাহিনী আর শ্রম-শক্তি বিক্রির জন্য কারখানার দরজায় কড়া নাড়বে না। তারা খেলাধুলা করবে, মনের আনন্দে সংস্কৃতি চর্চা করবে, বা নানান সামাজিক কাজে নিজেদের যুক্ত করবে। ফলে শ্রমিকের অভাব হলে উৎপাদন করতে শ্রমশক্তির মূল্য বেশি চোকাতে হবে। আর তাই পুঁজির মালিকদের জারি রাখতে হয় ‘ক্ষুধার অনুশাসন’। এটাই পুঁজির সঞ্চয়নের অমোঘ নিয়ম। অন্যদিকে কৃষিতে ভর্তুকি বা নূন্যতম সহায়ক মূল্য দিতে বাধ্য হয় সরকার।

নাহলে প্রচুর খরচ করে কৃষিপণ্যের সঠিক দাম না পেয়ে কৃষকরা পরের বছর আর চাষ করবেন না, কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ হবে না, দেখা যাবে খাদ্যসঙ্কট। উল্টোদিকে এই ভর্তুকি আবার সরকারকে বাজার থেকে তুলে নিতে হয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে। তাই প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপন্ন হলেও বাজারে তার দাম সবসময় চড়া থাকে।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ হওয়ার ফলে বর্তমানে পণ্য উৎপাদন করতে শ্রমসময় অনেক কম লাগার কথা। উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আটঘন্টা কেন, তিন-চার ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে সমান পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। আর এর ফলে উৎপাদিত পণ্যের এক্সচেঞ্জ ভ্যালু বা বিনিময়মূল্য অনেক কম হয়। কিন্তু এই কম দামে পণ্য বিক্রি করলে পুঁজির রেট অফ রিটার্ন বা মুনাফার হার যাবে কমে। ফলতঃ পুঁজির সঞ্চয়ন ও মুনাফার হারকে বজায় রাখতে পন্য গুদামে পচিয়ে বা সমুদ্রে ফেলে দিয়ে, বাজারে পণ্যের চাহিদা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তার বিনিময় মূল্যকে তুঙ্গে রাখতে হয়। এই দ্বন্দ্বের নিরসন করতে না পারলে খাদ্যসঙ্কট অনাহার ও দুর্ভিক্ষের সমাধান বাস্তবে সম্ভব নয়।

পুঁজির নিজস্ব এই দ্বন্দ্ব আরো জটিল হচ্ছে যুদ্ধ ও বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে।

দেশে দেশে যুদ্ধ খাদ্য সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করছে:

ইউক্রেন বিশ্বের ৪০ কোটি মানুষের খাদ্য যোগায়, অথচ যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি প্রায় পুরো বন্ধ। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর প্রয়োজনীয় খাদ্যের বড় অংশই আমদানি নির্ভর। যেমন ইয়েমেনকে তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৯০ শতাংশই অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে তিরিশ শতাংশ আমদানি হয় কৃষ্ণসাগর দিয়ে। অথচ ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের কয়েকটি বন্দর দখল করে নেয়। ফলে তীব্র খাদ্যসঙ্কটে পড়ে গিয়ে ইয়েমেনের জনসাধারণের এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। অন্যদিকে রাশিয়া দ্বিতীয় বৃহত্তম সার রপ্তানিকারী এবং অন্যতম বড় শস্য উৎপাদক দেশ। কিন্তু পশ্চিমী দুনিয়ার নিষেধাজ্ঞার জেরে বিশ্ববাজারে তাদের পণ্য ঠিকমতো আসছে না। আবার, সার রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে বৃহত্তম উৎপাদক চীন। ফলে অন্যান্য দেশে শস্য উৎপাদন মার খাচ্ছে সারের যোগানের অভাবে। এক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার শস্য উৎপাদনে ঘাটতি ও খাদ্যসঙ্কট সাম্প্রতিক কালের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। পৃথিবীর মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীতের জনগণের পয়লা নম্বরের শত্রু আমেরিকার সেনাবাহিনী কর্তৃক ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সাদ্দাম হোসেনকে শায়েস্তা করার জন্য ইরাকের যুদ্ধ এবং সিরিয়া সহ মধ্য-প্রাচ্যের নানান দেশে আমেরিকার হানাদারি, প্রতিটি যুদ্ধই বয়ে নিয়ে এসেছে প্রচুর প্রাণহানির সাথে সাথে ভয়ঙ্কর খাদ্যসঙ্কট, এমনকি দুর্ভিক্ষ।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত ধরে শস্য উৎপাদনে ঘাটতি ও খাদ্যসঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে:

বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের নানান প্রান্তে মেঘভাঙা প্রবল বৃষ্টিপাত, হড়পা বান, ধস, প্লাবন আর অন্য কিছু অঞ্চলে অনাবৃষ্টি, খরা, তীব্র দাবদাহ, অতিরিক্ত গরম, জলের সংকট সব ধরনের এক্সট্রিম (চরম) প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটছে বারবার। এসবের হাত ধরে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ ও শস্য উৎপাদন। দানবীয় সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ‘পাকা ধানে মই’ দিচ্ছে বারেবারে। সুন্দরবনের হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমিতে সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে যাওয়ার ফলে এইসব জমিতে আগামী কয়েকবছর চাষ বা ফসল ফলানো বেশ কষ্টসাধ্য কাজ হবে। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে চাষের জমি তার উর্বরতা হারিয়ে বন্ধ্যা হয়ে পড়ছে। ২০২২ সালের জুন থেকে পাকিস্তান স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে। ২২ কোটি জনসংখ্যার দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ জলমগ্ন হয়ে পড়েছেন। অতিরিক্ত জল জমে যাওয়া ও পর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা না থাকায় ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, আগামীতে তা আরো ত্বরান্বিত হবে। চাষের জমি থেকে বন্যার জল না নামলে শীতকালীন গম ও সব্জি চাষ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্যসুরক্ষায়। পাকিস্তান সরকারের হিসেব মতো-আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক ইতিমধ্যেই ১৮০০ কোটি ডলার ছুঁয়ে ফেলেছে। নষ্ট হয়ে গেছে পাকিস্তানের প্রায় ৮০ লক্ষ একর জমির ফসল। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর ফলে দেশ জুড়ে বাড়বে চাষীদের হাহাকার এবং বেকারত্ব ও দারিদ্র্য, শতাংশের নিরিখে যা ৩৬% পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। পাক সরকারের পক্ষে জানানো হয়েছে -শুধুমাত্র বন্যা পরিস্থিতিই ১১৮ জেলার অন্তত ৩৭ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সেপ্টেম্বরের (২০২২) শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিজ্ঞানীরা জলবায়ু সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যার পোশাকি নাম ‘ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসেসমেন্ট অফ ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস’। এই রিপোর্টে জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে (COP 26) গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমানোর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাষ্ট্রনায়করা, সেগুলি পুরোপুরি রক্ষিত হলেও খুব বেশি হলে আগামি ৭০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে অন্তত ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ফলে বিশ্বজুড়ে ভয়ঙ্কর দাবানল, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, এবং বিশ্বের অন্য কোন প্রান্তে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা ও সংখ্যা অকল্পনীয়ভাবে এতটাই বেড়ে যাবে (সাম্প্রতিক কালে আমেরিকায় মারাত্মক তুষার ঝড় ও শৈত্যপ্রবাহে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিপর্যস্ত অবস্থা ও কম করে ৬০ জনের মৃত্যু আর একবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল) এবং স্থল ও জলের বাস্তুতন্ত্রেরও এমন আমূল পরিবর্তন ঘটবে যে, ২১০০ সালের মধ্যেই পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না। এইসবের হাত ধরে প্রচুর কৃষিজমি পুরোপুরি অফসলি ও অনুর্বর হয়ে পড়বে। চাষের জমিগুলো ধীরে ধীরে সরে যাবে দুই মেরুর দিকে। আর মেরুপ্রদেশের বরফ ততদিনে গলে গিয়ে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ানোর পাশাপাশি বরফের পুরু চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা স্থলভাগকেও উপরে তুলে আনবে। আমাজন নদীর অববাহিকা আর ৪০০ বছরের মধ্যে একেবারে রুখা-শুখা মরুভূমি হয়ে পড়বে। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েছে ভারতসহ এশিয়ার নানান দেগুলোর জন্যও।

অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন টু কমব্যাট ডেজার্টিফিকেশন’ এর অনুযায়ী- ২০৫০ সালের মধ্যেই গোটা বিশ্বের ৯০% চরিত্রই বদলে যাবে। তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘সেভ সয়েল’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। একাধিক মাটি ক্রমেই শুকিয়ে যাচ্ছে। আগামী কিছু বছরে খাদ্য-উৎপাদন ব্যাপক হারে কমবে। মনে করা হচ্ছে আর কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরে খাদ্য উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। ফলে ক্ষুধা, অনাহার, অপুষ্টির সমস্যা বাড়বে। কোন দিন হয়ত খাবারের দাবীতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। এইসব সমীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের সারমর্ম হল-জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়েই শস্য উৎপাদনে ঘাটতি, খাদ্য সংকট, এমনকি দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা তীব্রতর আকার নেবে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্লাইমেট রিফিউজি বা পরিবেশগত উদ্বাস্তু জনগণের লম্বা মিছিল। জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন’ সমস্ত তথ্য / সমীক্ষার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দাবি করেছেন-২০৫০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র পরিবেশগত উথান্তর সংখ্যা দাঁড়াবে ১৫০ কোটির ঘরে। স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আদিবাসী সম্প্রদায় সহ সমাজের নিম্নবর্গের প্রান্তিক মানুষজন। এই বিশাল সংখ্যক শিকড়চ্যুত-ভূমিহীন-উদ্বাস্তু- দেশান্তরী মানুষ তাদের সম্পত্তি, ভূমি, বা চাষের জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হবেন। নিজের মাটি শিকড় থেকে হারিয়ে যাওয়া এইসব মানুষজন রাষ্ট্রের ছুঁড়ে দেওয়া কিছু খুদ কুঁড়ো পেয়ে ব না পেয়ে রাস্তার ধারে, বেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে বা বাস-গুমটিতে রাতে শুতে যাবেন খালি পেটেই। খিদের জ্বালায় ঘুম ভেঙে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন কোন এক শহরের জনসমুদ্রে। ফলতঃ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে নতুন করে মানবতার চূড়ান্ত রিপোর্ট অপমৃত্যু ঘটবে। তাই এটা আজ জলের মতো পরিষ্কার যে, মাটির বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা ও বিক্রির স্বার্থে দেশে দেশে লাগিয়ে ভাগিয়ে দেওয়া যুদ্ধ-বিদ্রোহ এবং কর্পোরেট বাহিনীর সীমাহীন লোভ লালসা ও মুনাফার স্বার্থে বিনষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতির রুদ্ররোষ ও দুর্বিপাক অর্থনৈতিক মন্দা, দারিদ্র্য এবং খাদ্যসঙ্কট ও মূল্যবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করে তুলছে। সমস্যা যত তীব্র হচ্ছে, দেশে দেশে তত বেশি করে মানুষ বিক্ষোভ প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন। চলুন লড়াইয়ের আঙিনায় ফেরা যাক।

অর্থনৈতিক সংকট ও শ্রমিকদের দুরাবস্থার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও আমেরিকায় শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম:

বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ২০১১-র “অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট” আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ ও অগ্রসর একদল তরুণ তরুণীর তোলা স্লোগান ‘৯৯ ভাগ বনাম এক ভাগ বলশেভিকদের ‘পিস-ব্রেড-ল্যান্ড’ স্লোগানের মতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিশ্ববাসীর দরবারে। অর্থনৈতিক অসাম্যের বিষয়কে আবারও রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে আসা এবং বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে পুঁজি, বিশেষ করে ফিন্যান্স পুঁজির ভূমিকাকে দায়ী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সামনে নিয়ে আসে এই অকুপাই আন্দোলন। বর্তমান আর্থিক মন্দায় শ্রমিকদের মজুরি কমছে, উল্টোদিকে মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি লাগামছাড়া। অর্থনীতির এই সাঁড়াশি চাপে ব্রিটেনের মানুষজন রাগে ক্ষোভে ফুঁসছেন দীর্ঘদিন ধরেই। এই ক্ষোভকে সংগঠিত করতে ‘এনাফ ইজ এনাফ নামে দেশজুড়ে প্রচার কর্মসূচি শুরু হয়। এরই ধারাাহিকতায় পয়লা অক্টোবর, ২০২২ এক লক্ষ মানুষ বিক্ষোভ প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। লন্ডন, ম্যানচেস্টার লিভারপুল, গ্লাসগো সহ পঞ্চাশটি মেট্রো শহরে বিক্ষোভসংঘটিত হয়। পরেরদিন ব্রিটেনের বড় ট্রেড ইউনিয়ন বাম ধারার সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে সমাজকল্যাণ খাতে সরকারের ব্যয় কমানোর প্রতিবাদে বার্মিংহামে কনজারভেটিভ পার্টির সদর দপ্তরে বিক্ষোভ চলে সারাদিন ধরে। মজুরি হ্রাস এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পোস্টাল এবং রেল শ্রমিকরা ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকদিন ধরেই। প্রতিবাদকারীরা এই ধর্মঘটকেও সমর্থন জানান। উৎসাহব্যঞ্জক খবর এই যে, দেশের সমস্ত বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ন, রেলের জাতীয় ইউনিয়ন, বন্দর ও পরিবহন শিল্পের শ্রমিক, ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইয়াং কমিউনিস্ট লীগ এই চলমান বিদ্রোহকে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নামছেন। এই সমস্ত সংগঠনগুলির মূল দাবি-জীবন যাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির সমাধানে সরকার সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করুক। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ এবং ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ এর রাজনীতির কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি গগনচুম্বী। অন্যদিকে শক্তি উৎপাদন ও সরবরাহকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অসীম মুনাফার তাগিদ এই সমস্যাকে আরো তীব্র করে তুলেছে। লেবার পার্টির নেতারাও এই চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।

ব্রিটেনে স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকসমাজ বৃহত্তম ধর্মঘটের পথে:

খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি (কোথাও কোথাও ১৫ শতাংশেরও বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে) ও মুদ্রাস্ফীতির সমাধানে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ব্রিটেনে শুরু হয়েছে নার্সদের বিক্ষোভ। করোনা সংক্রমণের সময় থেকেই রিটেনের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি উঠতে থাকে। বর্তমানে নার্সদের বিক্ষোভ তুঙ্গে, দাবি আদায় নাহলে কর্মবিরতির হুমকি দিয়েছিলেন তিন লক্ষ নার্স। ১৫ ঘন্টা ধর্মঘটের ফলে লন্ডন এবং প্যারিসের মধ্যে দ্রুতগামির বিশেষ ট্রেন চলাচলও বন্ধ ছিল। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে (ULB) ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং কর্মীরা ধর্মঘটের সমর্থনে পিকেটিং করেন। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম শ্রমিক, থাকায় কাজের চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলসহ সমস্ত পণ্যের। আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে সংসারের নিত্যদিনের ঘানি টানতে শ্রমিকরা জেরবার হচ্ছেন। কর্মী সংকোচন, ছাঁটাই ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং চাকরির দাবিতে কর্মচারী, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ধর্মঘটে সামিল হয়ে এক নতুন আলোকবর্তিকা খুলে দিলেন।

প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজম ও কর্মী সংকোচন:

বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে পাঁচটি। বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানির দ্বারা, যাদেরকে সংক্ষেপে GAFAM নামে ডাকা হয়। এই পাঁচটি বিগটেক কোম্পানি হল-গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক, অ্যাপেল ও মাইক্রোসফ্ট। জ্ঞান-অর্থনীতি বা নলেজ ইকোনমিকে করায়ত্ত করে অ্যাপ ভিত্তিক একটা প্লাটফর্ম তৈরি করে এবং ভোক্তা ও কর্মীদের সেই নেটওয়ার্কে যুক্ত করে বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের জগত থেকে মুনাফা বের করে নিয়ে চলে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির ধনকুবেররা। বলাবাহুল্য যে, এদের ওপর কোন রাষ্ট্রেরই কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ‘অনলাইন-শপিং’ জগতের মূল সংগঠনগুলোই হল বিদেশি কোম্পানি। এইসব হর্তাকর্তারা তাদের মুনাফার একটা বড় অংশ বাইরে নিয়ে চলে যাচ্ছে, ফলে ওয়ার্কারদের দুর্দশা বাড়ার সাথে সাথে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই প্লাটফর্ম অর্থনীতির মালিকরা শ্রমিককে শ্রেণী হিসেবে কোনভাবেই সংগঠিত হতে দেবে না, তাদের ‘শ্রেণী পরিচয়’ মুছে দিয়ে একক ব্যক্তি মানুষে পরিণত করতে উঠে পড়ে লেগেছে বর্তমান অর্থনীতির কর্তাব্যক্তিরা। শ্রমিকশ্রেণীর যুথবদ্ধতা, সহযোগিতা-সহমর্মিতা, আন্তর্জাতিকতা বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধকে নষ্ট করে এবং একই সাথে পরিবারকে ভেঙে দেওয়ায় আগামীদিনে শ্রমিকশ্রেণী, স্থায়ী শ্রমিক বা একটা ভদ্রস্থ মাইনে এইসব শব্দগুলো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে। বাস্তবে ঘটছেও তা। ও

৪,৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করে টুইটার নামক বিগটেক কোম্পানি কিনে নেওয়ার পর বিশ্বের পয়লা নম্বর ধনকুবের ইলন মাস্ক সদর্বে ঘোষণা করলেন -৭৫ শতাংশ কর্মীকে ছাঁটাই করা হবে। বাস্তবত ৪ঠা নভেম্বর টুইটারের ৫০ শতাংশ কর্মীকেই (৩৭০০ জন) ছাঁটাই করা হল, তার মধ্যে ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা সর্বাধিক। এখানেই শেষ নয়। ১৩ ই নভেম্বর আবারো কর্মী ছাঁটাইয়ের খাঁড়া নেমে এল। টুইটারের ৫৫০০ অস্থায়ী কর্মীর মধ্যে ৪৪০০ জনকেই তাড়িয়ে দেওয়া হল। অন্যদিকে ফেসবুকের (অধুনা মেটাভার্স) সিইও জুকারবার্গ জানালেন-১১,০০০ ইঞ্জিনিয়ার ও অফিসারকে ছাঁটাই করা হবে। আর এক বিগটেক কোম্পানি অ্যামাজন অবিলম্বে তাদের ১০,০০০ ওয়ার্কফোর্স কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের এই প্রতিকে ত্বরান্বিত করতে অন্যান্য কোম্পানিগুলোও মাঠে নেমে পড়েছে কোমর বেঁধে। টুইটার, মেটা, অ্যামাজনের পর ভারতীয় স্টার্টআপগুলোতে ১৭,৬৫০-জন চাকুরিজীবি ছাঁটাই হলেন। সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে ‘বাইজুস’ নামক অ্যাপভিত্তিক কোচিং সেন্টারে। তারপর ওলা আর ব্রিঙ্কিট।

বিশ্ব পুঁজিবাদের নতুন চেহারা সম্পর্কে টুইটার একটা বড় সিগন্যাল। অতিমারীর সময়ে যে সেক্টরটা সবচেয়ে বেশী ফুলেফেঁপে উঠেছে, দেখা যাচ্ছে সেই সেক্টরটাই সবচেয়ে বেশী অস্থির, নড়বড়ে (volatile)। অতিমারীর প্রথম দু’বছরেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১০ জনের সম্পদ অতিমারী -পূর্ববর্তী ১৪ বছরের চেয়েও (২০০৮-এর গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিসের সময় থেকে) বেশী বেড়েছে, এবং এঁরা প্রায় সবাই মার্কিন সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক হাইটেক মাল্টি বিলিওনেয়ার্স। অত্যধিক সময় জুড়ে একটানা কাজ করার কারণে অবসাদ, ক্লান্তিতে জর্জরিত হলেও মোটা মাইনে, গাড়ি বাড়ির জাগতিক মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের অধিকাংশ কর্মী বাহিনী। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মী সংকোচনের ধূসর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরাও নতুন করে ভাবছেন। ইউনিয়ন তৈরি করে যুথবদ্ধ হওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন দেশেই। শ্রমিক কর্মচারীদের শ্রম শোষণ করে আর তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করেই ফিন্যান্স পুঁজির মালিকরা এতদিন ধরে তাদের মুনাফার পাহাড় বাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের (যা আবার তাদেরই তৈরি করা) দোহাই দিয়ে তারাই নির্বিচারে কোপ বসাচ্ছে কর্মীদের ঘাড়ে। মুনাফা বৃদ্ধির হারকে উচ্চমার্গে রাখতেই GAFAM সহ বড় বড় অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের রাস্তায় হাঁটছে। লগ্নিপুঁজির এই চরিত্রটাকে বুঝতে হবে আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারীদের। ওদের আক্রমণ রুখতে হলে সংঘবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

প্রকৃতির জগতে বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য:

পুঁজির নিজস্ব সংকটে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা- ছাঁটাই-দারিদ্র্যের যুক্তিসংগত সমাধান সম্ভব নয় পুঁজির ‘উৎপাদন পুনরুৎপাদন চক্র’ এর মধ্যে ঘুরপাক খেলে। বরং সমূলে উৎপাটিত করতে হবে এই পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিকেই। মানুষের বেঁচে থাকার রসদ যোগতে ন্যূনতম প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রকৃতির যতটা সম্ভব কম ক্ষতি করে সহযোগিতা লেক উৎপাদন প্রক্রিয়ার কথা ভাবতে হবে। কাদের স্বার্থে, কিসের বিনিময়ে, কতটুকু এবং কীভাবে উৎপাদন হবে, তা ঠিক করতে হবে জনগণের বৃহৎ অংশের সক্রিয় অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে। আর তা করতে হবে বিনষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতি পরিবেশ মেরামতির কাজের সাথে সঙ্গতি স্থাপন করেই। এতে করে বাস্তবত প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে, বাঁচবে প্রকৃতি পরিবেশ, বাঁচবে মানব প্রজাতি সহ তামাম জীবকূল। এই রাস্তায় হাঁটতে হলে প্রকৃতির জগতে বৈপরীত্যের identity of oppsites) বিরাজ করে, তাকে স্পষ্ট করে বুঝে নিতে হবে। মধ্যে যে ঐক্য বিজ্ঞানের নিয়ম নীতিতে এবং সমাজের জগতে যেমন বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য বিরাজ করে প্রকৃতির ছন্দেও তা পদ্মাদভাবে কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ প্রকৃতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মকে সামনে আনা যায়। জলচক্র, কার্বন-আান্সজেন চক্র এবং নাইট্রোজেন চক্র এই তিনটি ০০ত্বপূর্ণ চক্রের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির জগতে ভারসাম্য রক্ষিত হয়ে চলেছে সৃষ্টির সেই উষাকাল থেকে।

বৈপরীত্যের মাঝে ঐক্যের বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনেই পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি, বেড়ে ওঠা ও টিকে থাকা। অথচ মানুষ তার ক্ষুদ্র স্বার্থে প্রকৃতির এই ভারসাম্য গুলোকে বিনয় করে চলেছে। আজকে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বেশি করে কার্যকরী করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু মানুষের স্বাগে ব্যবহার করা নয়, বরং প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটিও করে চলেছে বেশ কিছু দেশ। সেই ২০০৮ সাল থেকে জাপান মানুষের জৈববর্জ্যকে রিসাইকেল করে চাষের জমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মানুষের ব্যবহৃত টয়লেটো জলকে চাষের কাজে ও গৃহস্থালির কাজে পুনরায় ব্যবহার করা, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা পানীয় জলে পরিণয় করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে একজন পৃথিবীবাসী বছরে গড়ে পঞ্চায় লিটার মল ও ৫০০ লিটার মূত্র ত্যাগ করে। এঐ জৈববর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বায়োগ্যাস, হাইড্রোজেনের মতো জ্বালানি, জৈব সার তৈরি ও জলসেচের কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে আরো বেশ কিছু দেশে যেমন অস্ট্রেলিয়া, ইজরায়েল, নামিবিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কিছু শহরে এই লক্ষ্যে নানান প্রকল্প গ্রক করা হয়েছে। জৈববর্জ্যের সাথে ভেষজ তেল মিশিয়ে বাগ। তৈরীর ইটও বানানো হচ্ছে :                                                (তথ্যসূত্রঃ https://www conserve-energy-future.com)।

অর্থাৎ বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশকে কাজে লাগির অত্যন্ত কমশক্তি ব্যবহার করে মানুষ ও পশুপাখির মলমা সহ সমস্ত জৈববর্জ্যকে পুনর্নবীকরণ শক্তি, সার তৈরি সা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশে চালু থাকা ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট (IWMI)’ এর প্রকল্পকে পর্যবেক্ষণ করার পর বিশ্ব ব্যাংকের ‘ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রোগ্রাম’ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ভারত সরকারের কাছে আবেদন করেছে IWMI’এর সাথে যৌথভাবে জৈববর্জ্য পুনর্নবীকরণে কাজে হাত লাগাতে। এমনকি এই লক্ষ্যে এরমধ্যেই শ্রীলঙ্কার সাথে দুটি জাতীয় চুক্তি সম্পাদন করেছে IWMI কর্তৃপক্ষ (তথ্যসূত্রঃ https:// ourworld.unu.edu/en/human-waste-reuse-solution-to-growing-sanitation-problem)

জৈববর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে কৃষক সম্প্রদায়কে সাহায্য করা ও নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিজ্ঞানী গবেষকরা সমানে কাজ করে চলেছেন। যদিও এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়িক ফন্দি ফিকির। ব্যবসায়িক স্বার্থের পরিবর্তে সব দেশের সরকার ও প্রশাসন যদি সরাসরি কৃষক সম্প্রদায় ও গরিব মানুষের স্বার্থের কথা ভেবে ও প্রকৃতি-পরিবেশ খাঁচানোর লক্ষ্যে যুক্তিযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাহলে বাস্তবত জৈববর্জ্য ও স্তুপীকৃত জঞ্জালের পাহাড়কে জৈব সার, সেচের জল ও পুনর্নবীকরণ শক্তিতে বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন জল-স্থল-বাতাসের দূষণ কমানো সম্ভব, পাশাপাশি প্রকৃতিকে আবার ফিরিয়ে দেওয়ার ফলে শক্তির ও পানীয় জলের সংকটের সমাধানও সম্ভব। এককথায় পুঁজির উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের মায়াবী জগতে আবদ্ধ না থেকে প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ও পুনরুৎপাদনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানব প্রজাতি সহ সমগ্র জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখার জিয়ন কাঠি।

সমাধানের পথ খোঁজা:

বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় না আছে বাকস্বাধীনতা, না আছে দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার রসদ, আর না আছে দূষণহীন পরিবেশে বিষমুক্ত খাবার খেয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক রিভিউ’তে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে, যদি দৈনিক আয় ৭.৪ মার্কিন ডলার সীমারেখা হিসেবে ধরা হয় তাহলে সারা বিশ্বে দারিদ্র্য নির্মূলে লাগবে ২০০ বছর। সবকিছু বাদ দিয়ে বিদ্যমান বাস্তবতায় সে জায়গায় পৌঁছাতে গেলে (আয়ের সুষম বন্টন ছাড়া যদি আমরা দারিদ্র্য নির্মূলের সে জায়গায় পৌঁছাতে চাই) আমাদের বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার বর্তমানের তুলনায় বাড়াতে হবে ১৭৫ গুণ। এই আকাশকুসুম কল্পনা যদি বাস্তবে রূপায়িতও করা যায়, তবু দেখা যাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে যতটুকু সাফল্য অর্জিত হবে, সেটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন এবং বাস্তুতন্ত্রের শৃঙ্খল ধ্বংস হওয়ার কারণে।

বর্তমানে এক বড় অংশের অর্থনীতিবিদদের যুক্তি “ধনকুবেরদের করছাড় তো নয়ই, বরং তাদের ওপর অতি উচ্চ হারে ট্যাক্স চাপানো দরকার এবং এই টাকায় জনগণের সুবিধার্থে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, ইত্যাদি সামাজিক খাতে বেশি পরিমাণে খরচ করতে পারবে। ফলে জনগণের আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে বাজারকেও চাঙ্গা করা যাবে”। এর সাথে আমরা যুক্ত করতে চাই ধনকুবেরদের থেকে উচ্চহারে ট্যাক্স সংগ্র করে সেই টাকায় ওদেরই মুনাফার স্বার্থে বিনষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতি- পরিবেশকে মেরামতের কাজে যুক্তিযুক্ত কার্যকরী এক সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক ওদেরই স্বার্থে নষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতি পরিবেশকে ফিরিয়ে আনার দায় সাধারণ খেটে খাওয়া গরীব মানুষের ওপর বর্তাবে কেন? চরম আর্থিক বৈষম্যের জেরে খেতে না পাওয়া কোটি কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যদি খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টির প্রধান ভিলেন পুঁজির মালিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাহলে পুঁজিপতিদের সাজানো বাগান যে তছনছ হয়ে যাবে, তা হলফ করেই বলা যায়।

তাই এই সমস্যার মোকাবিলায় পুঁজিকে উৎখাত করার লড়াইয়ের হাত ধরাধরি করে দেশী বিদেশী বহুজাতিক কর্পোরেটের আরো আরো মুনাফার স্বার্থে বিনষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতি পরিবেশ মেরামত করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সংগ্রামকে আরো তীক্ষ্ণ করতে হবে। প্রকৃতি মেরামতির দাবির আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের সাথে যুক্ত হয়ে শ্রমিকশ্রেণী সহ মানব সমাজ ও প্রকৃতিকে বাঁচানো সম্ভব পুঁজির বিশ্বজোড়া হিংস্র আক্রমণে থেকে। প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ বাঁচানোর বিশ্বব্যাপী লড়াই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই সমস্ত মানুষ শুধু integrated হবে তাই না, সাংস্কৃতিক জগতেও ছন্দবদ্ধতা ফিরে আসবে। এক বিশ্বমানবতার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের মিলনে, যেখানে সমস্ত ধরণের শ্রমবিভাজনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। মানুষকে তার চামড়ার ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ এক ছোট জীবের বদ্ধভাবনা থেকে বার করে প্রাকৃতিক করবে। নিজের ক্ষুদ্র শরীরের বাইরে নদী সমুদ্র, পাহাড়, পর্বত, অবুজ বনানী, প্রাকৃতিক জলাভূমি দিয়ে ঘেরা যে বৃহৎ জগৎ তার রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে বিরাজ করছে, যে প্রাকৃতিক জগৎ আসলে মনুষ্য শরীরের এক বর্ধিত অংশ, বেঁচে থাকার প্রাণ ভোমরা, মানুষের আত্মা সেইটি মানুষ নতুন করে উপলব্ধিতে আনতে পারবে। এর মধ্য দিয়েই নির্মূল হবে

নিজের শরীরে শুষে নিয়ে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখবে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম মেনে।

৪। মাত্রাতিরিক্ত বিষ ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে হাইব্রিড চাষের পরিবর্তে ফিরিয়ে আনতে হবে জৈব চাল মিশ্র চাষ, প্রাকৃতিক চাষের এক সামগ্রিক পরিকল্পনা। এইভাবে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফর্মিং ‘এর মধ্য দিয়ে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও ব্যবহার, কৃষকদের বংশানুক্রমিক ভাবে প্রাণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি হাঁস মুরগি মাছ, গরু ছাগল পালনের বন্দোবস্তও করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রকৃতি থেকে প্রয়োজনে নেওয়ার বিনিময়ে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মানুষ ও পশুপাখির জৈব বা করার প্রয়োজন পড়বে। এর ফলে নতুন নতুন কাজে চাষের জমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ সুযোগ যেমন বাড়বে প্রভূত পরিমাণে, পাশাপাশি গ্রাম শহরের মধ্যে মেটাবলিক রিফ্ট বা বিপাকীয় ফাটলে সমাধানও হবে। সাথে সাথে বিষমুক্ত কৃষিশস্য ও প্রাণি প্রোটিন পেয়ে গ্রামের গরীব মানুষের পুষ্টির সমাধান হয় এবং রোগ অসুখের প্রাদুর্ভাব কমবে।

৫। জলের দূষণ ও সংকট থেকে মুক্তি পেতে রাসায়নি চাষের বদলে বিকল্প চাষের পাশাপাশি মজে যাওয়া পুরু খাল বিল বাউর সহ সমস্ত জলাভূমি ও চুরি হয়ে যাওয় নদীগুলোর সংস্কার করা জরুরী হয়ে পড়বে। প্রয়োজ পড়বে নতুন নতুন পুকুর দীঘি জলাশয় খননের, দেশ আধা শস্য শ্যামলা হবে।

৬। বাতাসে প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যাওয়া দূষিত বার ডাইঅক্সাইডকে প্রশমিত করতে বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ কাজে লাগিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

স্থানীয় অঞ্চল বা প্রদেশের বৈচিত্র্য, বিশেষত্বকে মাথায় রেখে এবং স্থানীয় অঞ্চলের বিশেষ করে আদিবাসী জনজাতি মানুষদের চিরাচরিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাথে বিজ্ঞানের মিশেল ঘটিয়ে এইভাবে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে বাস্তবত প্রচুর নতুন কাজের জায়গা খুলে যাবে, পাল্লা দিয়ে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। আমাদের এই প্রস্তাবনা ও ভাবনার পক্ষে বাস্তব তথ্যও খুব জোরালো। বায়ুদষণের মোকাবিলায় ভারতে কম করে ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য খাতে। “চতুর্থ ক্লিন এয়ার সামিট”-এ এই তথ্য পেশ করেছেন কানপুর আই আই টির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এন এন ত্রিপাঠী। তিনি এও জানিয়েছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের রাজ্যে এই খাতে ২০ থেকে ৪০ হাজার কর্মসংস্থান হবে। পাঠক বুঝতেই পারছেন যে, বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ মেরামতির লক্ষ্যে সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কার্যত লক্ষ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব।

আরো একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যত বেশি প্রকৃতি কেন্দ্রীক হবে, প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির অংশ হয়ে বড় হয়ে উঠবে শিশুরা, তত বেশি করে ডায়াবিটিস, ক্যান্সারের মতো অসুখ বিদায় নেবে। বায়ুদূষণ কমলে, দূষণ জনিত রোগ অসুখ ও মৃত্যুর হার কমবে সমানুপাতিক হারে। বিশুদ্ধ টাটকা শাকসব্জি খেয়ে, শুদ্ধ জল পান করে পেটের সব রোগ হাওয়া হবে চিরতরে। এককথায় দূষণহীন সুস্থ সুন্দর পরিবেশে বাস করার সুযোগ পেলে মানুষ হবে নিরোগ, ফলত: আধুনিক চিকিৎসার নামে অপ্রয়োজনীয় গাদাগাদা ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষা ও ওষুধের প্রয়োজনও ফুরোবে। দূষণহীন নির্মল পরিবেশের সান্নিধ্যে প্রকৃতি কেন্দ্রীক নিরোগ মানুষ স্বভাবতই তরতাজা ও সতেজ থাকবে, মনের আনন্দে সে প্রকৃতি রক্ষার কাজে হাত দেবে এবং সমাজের সকলের প্রয়োজনে উৎপাদন করবে। পুঁজির বল্লাহীন মুনাফার স্বার্থে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ নয়, প্রয়োজন ভিত্তিক নূন্যতম উৎপাদনে শক্তির অপচয় কমার সাথে সাথে শ্রম-সময় ও শ্রমশক্তির ব্যবহারও হ্রাস পাবে।

এই পথে হাঁটলে প্রকৃতি পরিবেশে বাঁচবে ঠিকই, মানব সভ্যতাও বিলুপ্তির হাত থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু এখানে বিনিয়োগ করলে পুঁজির সঞ্চয়ন ও মুনাফা বৃদ্ধির হার ধাক্কা খাবে। তাই কর্পোরেট বাহিনী পরিবেশ মেরামতির কাজে বিনিয়োগ তো করেই না, বরং ফুলেফেঁপে ওঠা কাল্পনিক পুঁজিকে রিয়েল করার মরিয়া প্রচেষ্টায় সে তৃতীয় বিশ্বের সস্তা শ্রমকে নিংড়ে নিয়ে ছিবড়ে করছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে নির্বিচারে লুঠ করতে এই সব দেশের জল- জঙ্গল -জমি, পাহাড়-পর্বত, সবকিছুকেই নিঃশেষ করছে। ফলে দিনদিন বিপাকীয় ফাটলের রেখা দীর্ঘতর হচ্ছে এবং মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভোগবাদ-সর্বস্ব ব্যক্তিমানুষে পরিণত করা হচ্ছে। ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতা, বিশ্ব মানবিকতা ও বিশ্ব ভাতৃত্ববোধ পরিচয়কে।

আমাদের যুক্তির সমর্থনে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসা দুটি প্রকল্পকে সামনে আনব হাইজেনিক হাইপোথিসিস ও মাইক্রোবায়োম হাইপোথিসিস। হাইজেনিক হাইপোথিসিস বলছে অপ্রাকৃতিক, অস্বাভাবিক খাদ্যাভাস এবং মায়ের দুধের পরিবর্তে কৌটোর দুধ (1); ভাত রুটি ডাল, সব্জি, ফলমূল, মাছ ডিমের পরিবর্তে গাদা গাদা চকলেট, চিপস, ঠান্ডা পানীয়, পিজ্জা, বার্গার এর মত জাঙ্ক ফুড ও ফাস্ট ফুড খেয়ে খেয়ে শিশুরা হয়ে পড়ছে ওবেসিটির শিকার। যার ফল- অকাল স্থূলতা, হজমের সমস্যা, ডায়াবেটিসের রমরমা। বাতাস-মাটি-জল ফুল-ফল-পাখিদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুদের বড় করা হচ্ছে জীবাণুনাশক ও সাবান দিয়ে বারবার হাত ধুয়িয়ে ঝকঝকে তকতকে মার্বেলের বদ্ধ ঘরে; শীততাপ যন্ত্র চালিত ঘরে গাড়িতে ও বিদ্যালয়ে। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠার পরিবর্তে প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন এইসব শিশুদের ভাগ্যে জুটছে হাজারো রোগ, দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিকতা, অপ্রাকৃতিকতা। ফল যা হবার তাই ঘটছে। অন্যদিকে মাইক্রোবায়োম হাইপোথিসিস অনুযায়। চাষের কাজে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার কীটনাশকের ব্যবহার এবং পুঁজির বাজার চালু রাখার স্বার্থে আমাদের অপ্রয়োজনীয় হাজারটা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারের ফলে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা মাইক্রোবায়োমের জালকে শতছিন্ন করে লক্ষ কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসের দলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর তথাকথিত উন্নয়নের অজুহাতে মুষ্টিমেয় মানুষের মুনাফা ও ব্যবসার স্বার্থে নির্বিচারে অরণ্য নিধন ও জঙ্গল জ্বালিয়ে দেওয়ার কারণে কোভিড-১৯ এর মতো অজানা অপরিচিত জুনোটিক ভাইরাসের দল জঙ্গল ছেড়ে পঙ্গপালের মতো মানুষের শরীরে হানা দিচ্ছে, যার সম্ভাবনা সদর ভবিষ্যতে আরো বেশি বেশি করে ঘটবে, এমনটাই আশঙ্কা বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের। শরীরকে ও আজকের দিনে ‘পুঁজির সাথে প্রকৃতির’ এই দ্বন্দ্বকে শ্রমিকশ্রেণীর টিকে থাকা আগুয়ান অংশ ও নেতৃত্ব যত তাড়াতাড়ি আত্মস্থ করবেন এবং সেই অনুযায়ী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করবেন, শ্রমিক-কর্মচারী তথা খেটে খাওয়া মানুষ এবং সমাজ প্রগতির পক্ষে তত মঙ্গল। আজকে একদিকে যেমন সমস্ত ঠিকা, পরিযায়ী ও প্ল্যাটফর্ম জগতের কর্মীদের নিয়ে সংগঠিত লড়াই গড়ে তুলতে হবে, পাশাপাশি প্রকৃতি পরিবেশের মেরামতির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের আঙিনায় মিলতে হবে কৃষক, শ্রমিক সহ সমস্ত কর্মচারীদের। পাশাপাশি সংগঠিত শক্তির জোরে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি তুলতে হবে-পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল হোতা দেশী বিদেশী কর্পোরেট সংস্থার ওপর অতি উচ্চহারে ট্যাক্স বসিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে সুস্থ সুন্দর নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হবে অবিলম্বে। পরিবেশ ধ্বংসের কারণে আজ শুধুমাত্র বন্ধ কলকারখানার শ্রমিকই নয়, সমগ্র শ্রমজগতের মানুষ আক্রান্ত। ফলে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের দাবিকে সামনে আনতে হবে। শ্রমজগতের সমস্ত শ্রমকে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত করতে হবে। তবেই এই সভ্যতা বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচবে। এটাই আজকের সময়ের বাস্তব দাবি।

বিশ্বজুড়ে কর্ম সংকোচন দারিদ্র্য: সমাধান কোন পথে

RESPECT Augmentation des salair DROIT DE GRÈVE pensions et minima socias

ফ্রান্সের শ্রমিক সংগঠনের যৌথ মিছিল: ১৮ অক্টোবর, ২০২২

ফ্রান্সে শ্রমিকদের বিক্ষোভ: ২৭.০১.২০২২

                           –চলবে–

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating