মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বকোষ নামে যে গ্রন্থটি সুপরিচিত তারই নাম ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ এঙ্গেলস-এর ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শে কেবল যে একটি নতুন সংযোজন তাই নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শকে বাস্তব সত্যের উপর দাঁড় করাতে পূর্বেও যেমন এই গ্রন্থটি অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে, আজও ঠিক সমানভাবে একই ভূমিকা পালন করে চলেছে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপের বুকে বহু দার্শনিক আত্মপ্রকাশ করেন। বর্তমান সভ্যতার বিকাশে এঁদের বিশেষ অবদানও রয়েছে। ইউরোপীয় ভূখন্ডের এহেন একজন দার্শনিক মনীষী হলেন ‘হের ইউজেন ড্যুরিং’। অধ্যাপক ড্যুরিং এক নতুন ধরনের সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রচারিত হবার অব্যবহিত পর থেকেই। তিনি সমাজতন্ত্রের জন্য একদিকে যেমন ভাববাদী চিন্তাধারার বিরোধিতা করেছিলেন, ঠিক তারই পাশাপশি এমন সব তত্ত্ব হাজির করেছিলেন যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ড্যুরিং এবং ড্যুরিং পন্থীরা চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটাকেই চ্যালেঞ্জ করতে। তাঁরা যে নতুন ধরনের সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব হাজির করতে চেয়েছিলেন তার দার্শনিক ভিত্তিটা ছিল: ‘পৃথিবী ও জীবন সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধরনের চৈতন্যের বিকাশই দর্শন’। অর্থাৎ ডু্যুরিং এবং তাঁর সহযোগীরা সমাজতন্ত্রের বস্তুগত মূল ভিত্তিটাকেই অস্বীকার করেছিলেন।
ড্যুরিং পন্থীদের অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নাকচ করে দিতেই ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ‘অ্যান্টি ডারিং’ গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থে এঙ্গেলস অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস, দর্শন, প্রকৃতি বিজ্ঞান প্রভৃতি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সপক্ষে এই গ্রন্থটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। মার্কসবাদী তত্ত্বকে সম্পৃক্ত করতে এই বইটি এতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বইটিকে বাজেয়াপ্ত করার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৪০ সালে জ্যোতি বসু ব্রিটেন থেকে যখন কলকাতায় ফিরে আসেন তখন ব্রিটিশ সরকার বসুর যে কয়টি গ্রন্থ সীজ করে তার মধ্যে ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ও ছিল।
রথীন সেন তাঁর এই ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’: ‘মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষার সম্পদ’ গ্রন্থে মূল গ্রন্থের প্রধান প্রধান বৈশিষ্টগুলি তুলে ধরেছেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় হবে। পাশাপাশি মূল গ্রন্থের গভীর অনুশীলনের জন্য ক্ষুধা সৃষ্টি করবে।
অনিল বিশ্বাস
কলকাতা, ৩১শে জানুয়ারি, ১৯৯৬
উনিশ শতকের ইউরোপ। শ্রমিকদের গণ-আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে আর বুর্জোয়ারা তাদের বিপ্লবী চরিত্র হারিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করেছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলন যখন নতুন একটি বিপ্লবী শক্তির জন্মের সূচনাকরছে ঠিক সেই সময় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস-এর কর্মজীবনের শুরু।
কার্ল মার্কসের ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাশিয়ার রাইন প্রদেশের বারমেন শহরে ১৮২০ সালের ২৮শে নভেম্বর।
১৮৪২-এ যখন মার্কস ও এঙ্গেলস-এই দুই মহান বিপ্লবী পরস্পরের সঙ্গে পরিচিতির সূত্রে পাশাপাশি এসে দাঁড়ালেন তখন শ্রমিক আন্দোলন ছিল মূলতঃ অসংগঠিত, লক্ষ্যহীন এবং প্রকৃতপক্ষে স্বতঃস্ফূর্ততার উপর নির্ভরশীল। কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিরোধিতা ও তার ত্রুটি দুর্বলতাগুলির সমালোচনা করলেও যুক্তির আলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে মানব সমাজের গতিধারাকে বিশ্লেষণ করে ধনতন্ত্রের অবসান ও সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতার কথা তখনো ছিল শ্রমিকশ্রেণীর অজানা। নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ সম্বন্ধে শ্রমিকশ্রেণী ছিল অসচেতন। সমাজতন্ত্রের চিন্তাকে বিজ্ঞানসম্মত একটি তত্ত্বে পরিণত করেছিলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। সারা পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণী তাই মহান মার্কসের পাশাপাশি এঙ্গেলসকেও এক অসামান্য বোদ্ধা, সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার, আমৃত্যু শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থে সংগ্রামী ও সংগঠক হিসাবে স্মরণ করে।
সারা জীবন এঙ্গেলস অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করেছেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব বিশ্লেষণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য, নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংগঠন সৃষ্টির। তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে “অ্যান্টি ড্যুরিং” পুস্তকটির রচনা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
এই অসামান্য রচনাটির মধ্যেই শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী তত্ত্বকে তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বইটির তিনটি অংশ, দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, যার মধ্য দিয়ে এঙ্গেলস সমগ্র মার্কসবাদী চিন্তাকেই সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করেছিলেন। মার্কসবাদ শিক্ষার ক্ষেত্রে, সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানব সমাজের গতিধারা অনুধাবন ও শোষণমুক্তির যথার্থ পথ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে “অ্যান্টি-ড্যুরিং” নিঃসন্দেহে অবশ্য পাঠ্য। “অ্যান্টি ড্যুরিং”-এর অর্থশাস্ত্র সংক্রান্ত অংশটির দশম অধ্যায় লিখেছিলেন মার্কস। এছাড়াও পুস্তক হিসাবে মুদ্রণের পূর্বে সমগ্র পাণ্ডুলিপিটি এঙ্গেলস মার্কসকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। সেই সময়, মার্কস ব্যস্ত ছিলেন “ক্যাপিটাল” রচনার কাজে।
এঙ্গেলস-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বস্তুবাদী বিশ্ববীক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করা। মার্কসবাদীদের কাছে বইটি মার্কসবাদের বিশ্বকোষ নামে পরিচিত। কারণ, ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে এই বিতর্কে এঙ্গেলসকে অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস, দর্শন, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সমাজতন্ত্রের অজস্র প্রশ্ন আলোচনা করতে হয়েছে। এঙ্গেলস নিজেই বলেছেন-সময় এবং শূন্য, দেশ সম্পর্কিত ধারণা থেকে খি-ধাতু তত্ত্ব (দেনা পাওনার উপায় হিসাবে দু’টি ধাতুকে ব্যবহার), বন্ধ এবং গতির নিত্যতা হতে নৈতিক ভাবধারার অনিত্য প্রকৃতি, ডারউইনের। বক্তব্য থেকে ভবিষ্যতের তরুণ সম্প্রদায়কে শিক্ষাদান অবধি সমস্ত বিষয় ছিল এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত “অ্যান্টি ড্যুরিং”-এর তিনটি পরিচ্ছেদের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে এঙ্গেলস রচনা করেছিলেন ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। “অ্যান্টি-ড্যুরিং” রচনা কালে প্রতি মুহূর্তে এঙ্গেলসের মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। কারণ এই সময় তাঁর স্ত্রী গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৮৭৮-এর সেপ্টেম্বরে। তাঁর জীবনাবসান হয়। ব্যক্তিগত এই দুঃখ ও যন্ত্রণা নিয়েও এঙ্গেলস ছিলেন শোষিত মানুষের প্রতি কর্তব্যে অবিচলিত।
১৮৭৫ সালে জার্মানির দু’টি রাজনৈতিক সংগঠন সোস্যাল ডেমোক্রাটিক ওয়ার্কাস পার্টি ও জার্মান শ্রমিকদের সাধারণ সমিতি সম্মিলিত হয়। এই উদ্দেশ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির গোথা কংগ্রেসে একটি কর্মসূচী গৃহীত হয়। কর্মসূচীটির খসড়া প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায়, সোসাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতারা সুবিধাবাদী স্রোতধারার সঙ্গে আপস করতে সম্মত হয়েছেন। মার্কস ও এঙ্গেলস একে বিরাট ভুল এবং এর পরিণতি হবে মারাত্মক মনে করেছিলেন। জার্মানির শ্রমিক নেতাদের এই ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য খসড়াটির তীব্র সমালোচনা করে মার্কস যা লিখেছিলেন তা-ই পরে “গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা’ নামে পরিচিতি লাভকরে। কিন্তু মার্কসের সমালোচনা ও বিপরীত যুক্তি অগ্রাহ্য করেই, জার্মান শ্রমিকদের দু’টি রাজনৈতিক সংগঠনের সম্মেলন একটি বাস্তব সত্যে পরিণত হয়।
মার্কস ও এঙ্গেলস যা আশঙ্কা করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে গোথা কংগ্রেসের পর তা সত্য হয়ে ওঠে। পার্টির কেন্দ্রীয় পত্রিকা সেই সব লেখকদের মর্যাদা দিতে থাকে যাদের সম্পর্কে পার্টির এক নেতাকে এঙ্গেলস তখনই লেখেন যে তাঁদের মারাত্মক অর্থনৈতিক ভ্রান্তি, ত্রুটিপূর্ণ মতবাদ এবং সমাজতন্ত্রী সাহিত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এ পর্যন্ত জার্মান আন্দোলনের তত্ত্বগত উৎকর্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সেরা মাধ্যম হয়ে উঠছে। অন্যত্রও এঙ্গেলস মন্তব্য করেন যে পার্টির নৈতিক ও বৌদ্ধিক স্তরের অবনমন ঘটেছে এবং এর সংবাদপত্র ও সম্মেলনগুলিতে অর্ধশিক্ষিত পণ্ডিতদের ‘অজ্ঞতা’ প্রকাশিত এই পটভূমিকায় ইউজেন তারিং-এর আবির্ভাব। বাক্তিগত জীবনে ইউজেন ড্যুরিং ছিলেন প্রথমে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পরে ১৮৭৩ সাল হতে তিনি অধ্যাপনা করতেন মেয়েদের বেসরকারী কলেজে। পরবর্তী কালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাদানের অধিকারটি কেড়ে নেওয়া হয়। ড্যুরিং পেটি-বুর্জোয়া তত্ত্বগুলির বিচিত্র সংমিশ্রণে এক নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোষণা করেন। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ও উদ্বৃত্ত মূল্যের ভিত্তিতে পুজিবাদী উৎপাদনের রহস্য উদ্ঘাটন-এই যে দু’টি বিরাট আবিষ্কারের জন্য মানব সভ্যতা মার্কসের কাছে কৃতজ্ঞ, তাকে অগ্রাহ্য করেই ড্যুরিং-এর সমাজতান্ত্রিক কল্পনা। প্রসঙ্গত মার্কস এবং তাঁর মতবাদ সম্পর্কে ড্যুরিং লিখেছিলেন-“নিষ্ফলা ধারণা যেগুলি বাস্তবে ইতিহাস ও তর্কশাস্ত্রগত অলীক কল্পনার জারজ সন্তান… বিভ্রান্তিকর বিকৃতি… ব্যক্তিগত অহমিকা, নীচ মুদ্রাদোষ, বদমেজাজী, রসিকতার নামে ভাঁড়ামী… দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক পশ্চাদপদতা।…” ডারউইনের তত্ত্বকেও ড্যুরিং জঘন্য ভঙ্গিতে আক্রমণ করেছিলেন। ড্যুরিং-এর ভাষায়। ‘ডারউইনীয় অর্থ কবিতা এবং রূপান্তর ঝুশলতা আর তার সঙ্গে উপলব্ধি সম্বন্ধে স্কুল ও সচেতন সংকীর্ণতা ও ব্যবর্তনের তীক্ষ্ণতায় দুর্বলতা…। আমাদের মতে ডারউইনবাদের, যার থেকে অবশ্য লামার্কের সূত্রগুলিকে বাদ দিতে হবে, বৈশিষ্ট্য হলো মানবতার বিরুদ্ধে এক বর্বরতা।” চার্লস ডারউইনের জন্ম ১৮০৯ সালে। বি-এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভূ-তত্ত্ব বিদ্যা সম্বন্ধে এক শিক্ষামূলক ভ্রমণে ডারউইন ওয়েলস-এ যান। এরপর প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে ‘এইচ, এম এস বিগল’ জাহাজে চেপে দীর্ঘ পাঁচ বছর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সুযোগ পান। এই দীর্ঘ বছরগুলিতে ডারউইন অর্জন করেছিলেন প্রকৃতি সঙ্গন্ধে গভীর অভিজ্ঞতা। জৈবিক ক্রমবিকাশের মূল সূত্র আবিষ্কার ডারউইনের অসাধারণ কীর্তি। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গ্রন্থ ‘অরিজিন অব স্পিসিস’। ১৮৭১ সালে ‘ডিসেন্ট অব ম্যান।’ প্রথম বইটি পড়ে মার্কস এঙ্গেলসকে লিখলেন-“আমাদের ধারণার প্রাকৃতিক ঐতিহাসিক ভিত্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে এই গ্রন্থটি এঙ্গেলসও প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বইটি পড়েন। ডারউইনের আবিষ্কার তাদের কাছে বিবেচিত হয়েছিল এক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে। ভারউইনের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত পস্নবর্তী আবিষ্কারে কিছুটা সংশোধিত হয়েছে, কিন্তু নিঃসন্দেহে ডারউইনের মতবাদই জীববিদ্যার ভিত্তি তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের তত্ত্বের প্রষ্টা। তিনি লিখলেন যে বিভিন্ন প্রজাতির সৃষ্টি প্রথম হতেই স্থির ও অপরিবর্তনীয় নয়। বহু রূপান্তরের পথ ধরেই তারা এগিয়েছে। সুবিধাজনক জৈবিক রূপগুলোই অস্তিত্ব রক্ষার। অসুবিধাজ সংগ্রামে টিকে থাকবে আর অনিবার্যভাবেই বিলুপ্ত হবে রূপগুলি। জীবজগতের ক্রমবিকাশের তত্ত্ব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে লামার্কের নামও উল্লেখযোগ্য।
জীবজগতে বৈচিত্র্য বিপুল। শুধু বিভিন্ন জাতি বা প্রজাতির মধ্যে নয় (Species), এক জাতি বা প্রজাতির মধ্যেও এই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এমনকি, একই পিতা মাতার সন্তানদের মধ্যেও থাকে নানা পার্থক্য। ডারউইনের মূল বক্তব্য
দ্বিতীয়তঃ জীবের মধ্যে সন্তান সংখ্যার বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রবণতায় খাবার ও বাসস্থানের জন্য অনিবার্য ভাবেই চলে প্র তিযোগিতা। অন্তহীন এই জীবনযুদ্ধ।
তৃতীয়তঃ খাদ্য ও বাসস্থানের জন্যে এই যুদ্ধে যারা পরাজিত হয়; যুদ্ধে, রোগে বা ক্ষুধার তাড়নায় আগে মরে যায় তাদের স্বাভাবিকভাবেই বংশবৃদ্ধি হয় না এবং ক্রমশ পৃথিবী থেকে তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। প্রকৃতির নির্বাচনে জীবনযুদ্ধে যোগ্যেরা জয়ী হয়, দীর্ঘদিন নিজেদের রক্ষা করে এবং সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এভাবেই সৃষ্টি হয় নতুন নতুন জাতি ও প্রজাতির। এই যোগ্যর অস্তিত্বের প্রশ্নেই ডারউইন ব্যবহার করেছেন হাভার্ড স্পেনসারের কথাটি “Survival of the Fittest,” ডারউইন আরো বললেন যে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্যও অনতিক্রমা নয়। দীর্ঘকাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একজাতি অন্য জাতিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এইভাবেই উৎপত্তি হয়েছে মানুষের। অন্যদিকে, লামার্কের বক্তব্য প্রাণীর অঙ্গ সংস্থানে পরিবর্তন হতে পারে পরিবেশের প্রভাবে। প্রাণীর জীবিতকালেই শারীরিক বৈশিষ্ট্য বংশধারায় সংক্রামিত হতে পারে কিন্তু কোন দোষ বা গুণ বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হবেই একথা বলা যায় না। ডারউইনের বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে স্বীকার না করলেও এঙ্গেলস “অ্যান্টি-ড্যুরিং”-এ লিখেছিলেন যে ডারউইনীয় তত্ত্বের চালিকা শক্তির কাছে প্রকৃতি বিজ্ঞান বিরাট প্রেরণা পেয়েছে।
ডারউইন প্রসঙ্গে তোলা ইউজেন ড্যুরিং-এর প্রশ্নের উল্লেখ করে এঙ্গেলস দ্বিবাহীনভাবে বলেছেন, প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনটি সম্বন্ধে যার বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই শুধু সে-ই এরকম প্রশ্ন তুলতে পারে। এঙ্গেলসকে লেখনী তুলে নিতে হয়েছিল ড্যউরিং-এর নির্বোধ, শালীনতাহীন, যুক্তি বিবর্জিত বক্তব্যের প্রতিবাদে। ড্যুরিং দাবি করেছিলেন তাঁর বক্তব্য অর্থশাস্ত্র, দর্শন ও সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে এক বিপুল পরিবর্তন সৃষ্টি করবে। দর্শনের সংজ্ঞা নির্ধাবণ করে ড্যুরিং বললেন “পৃথিবী ও জীবন সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধরনের চৈতন্যের বিকাশই দর্শন এবং ব্যাপকতর অর্থে সকল জ্ঞান ও অভীপ্সার নীতিগুলি এর অন্তর্ভুক্ত।” বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় ড্যুরিং-এর এই নতুন বক্তব্যের সমর্থনসূচক রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। জার্মানির পার্টির নৈতিক ও বৌদ্ধিক মানের হ্রাস এবং ড্যুরিং-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মার্কস ও এঙ্গেলসকে বিচলিত করে। প্রকৃতপক্ষে, ড্যুরিং-এর জনপ্রিয়তা শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির তত্ত্বগত ভিত্তিকেই অনিশ্চিত করে। যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হলো বিপ্লবী প্রলেতাবীয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাবে অথবা পার্টি সুবিধাবাদী পেটি-বুর্জোয়া অবস্থান গ্রহণ করবে?’
আমাদের মনে রাখতে হবে ইতিপূর্বে ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে, ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’, যেখানে সমাজ ব্যবস্থার গতিধারা বিশ্লেষণ করে পুঁজিবাদী সমাজে নির্মম ও নির্লজ্জ শ্রমিক শোযণের চরিত্রটি অনাবৃত করা হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির পথ, ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে মার্কসের যুগান্তকারী রচনা ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড যেখানে এই পূজিবাদী শোষণের চরিত্রটি আরও যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে ও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এছাড়াও এঙ্গেলসের সামনে ছিল প্যারি কমিউনের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা; তাই ইউজেন ড্যুরিং-এর মতো ব্যক্তিদের যুক্তি বুদ্ধিহীন পান্ডিত্যাভিমানের বাচালতা এঙ্গেলসকে গভীরভাবে আহত করেছিল। এর প্রতিবাদে নীরব থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক পণ্ডিতদের আস্ফালনের প্রতিবাদে এঙ্গেলস ঘোষণা করলেন “বর্তমান জার্মানিতে নতুন চিন্তা পদ্ধতি সৃষ্টিকারী হের ড্যুরিং আদৌ বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি নন। কিছুকাল যাবৎ সেই দেশে অজস্র দার্শনিক এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে অসংখ্য নিত্য নতুন পদ্ধতি ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি আবির্ভূত হচ্ছে।….. আসলে হের ড্যুরিং এই ধরনের গলাবাজি করা মেকি বিজ্ঞানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নমুনা। কাব্যে, দর্শনে, অর্থনীতিতে, ইতিহাস তত্ত্বে সব কিছুই জার্মানিতে। অর্থহীন দস্তুনিনাদে ডুবে যাচ্ছে।”
১৮৭৭ সালের শুরুতেই জার্মান সোসাল ডেমোক্রাসির মুখপত্রে এঙ্গেলস “বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হের ইউজেন ড্যুরিং সাধিত বিপ্লব” শিরোনামে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখলেন। ড্যুরিং সমর্থকরা এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ১৮৭৭ এর মে মাসে পার্টি কংগ্রেসে এঙ্গেলস-এর প্রবন্ধগুলির প্রকাশ বন্ধ করার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এই প্রস্তাবটি কংগ্রেসে গৃহীত না হলেও সিদ্ধান্ত হয় যে প্রবন্ধগুলি এরপর মূল সংবাদপত্রে নয়, বৈজ্ঞানিক ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হবে। ১৮৭৮ সালেই প্রবন্ধগুলি সংগ্রথিত করে “অ্যান্টি-ড্যুরিং” পুস্তক হিসাবে মুদ্রিত হয়।
এই বইয়ের সূচনাতেই এঙ্গেলস বললেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মণীষীদের পক্ষে তাঁদের পূর্বসূরীদেরমতোই নিজেদের যুগের সীমা অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
সমস্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে বুর্জোয়াদের বিরোধের পাশাপাশি ছিল শোষক ও শোষিত, নিষ্কর্মা ধনী ও গরিব মজুরদের সাধারণ বিরোধ। এই পরিস্থিতি ছিল বলেই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরা শুধু একটা বিশেষ শ্রেণী নয়, সমস্ত নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদের প্রচার করতে সমর্থ হয়। যদিও জন্ম থেকেই বুর্জোয়ারা তাদের বিপরীত শক্তির দ্বারা ভারাক্রান্ত: মজুরি শ্রমিক ছাড়া পুঁজিপতিদের অস্তিত্ব। অসম্ভব এবং গিল্ডের মধ্য যুগীয় বার্জার যে পরিমাণে আধুনিক বুর্জোয়া রূপে প্রকাশিত, সেই পরিমাণে গিল্ডের কর্মী এবং গিল্ডের বাইরেকার দিন মজুরেরা পরিণত হয় প্রলেতারিয়েতে। এবং অভিজাতদের সঙ্গে সংগ্রামে বুর্জোয়ারা যুগপৎ সকলের, বিভিন্ন মেহনতী শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে পারলেও বড়ো বড়ো প্রত্যেকটি বুর্জোয়া আন্দোলনেই স্বাধীন বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই শ্রেণীটির যারা বর্তমান প্রলেতারিয়েতের পুরোধা।
‘অ্যান্টি-ড্যুরিং” মূলগতভাবে দর্শন সংক্রান্ত বই। জগৎকে উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করার দৃষ্টিভঙ্গিই দর্শন। ভাববাদী দার্শনিকদের মতে দর্শন হচ্ছে চেতনা বা ভাব। আর বস্তুবাদী দার্শনিকের মতে বস্তু-জগৎকে কেন্দ্র করেই সব কিছু ঘটছে। অর্থাৎ, চেতনাই জগৎ অথবা বস্তুই জগৎ এই হচ্ছে ভাববাদী ও বস্তুবাদী দার্শনিকদের বিচারের মর্মবস্তু। এখানে এঙ্গেলস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মার্কসবাদের মূলকথা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে মার্কস ও এঙ্গেলস-এর পূর্ববর্তী দার্শনিকদের মধ্যে হেগেলই বিশেষভাবে তুলে ধরেন দ্বান্দ্বিকতার সূত্র। এঙ্গেলস বললেন, হেগেলের দর্শনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো ‘দ্বান্দ্বিকতার পুনঃপ্রবর্তন। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের সকলেই ছিলেন স্বভাব দ্বান্দ্বিক। দ্বান্দ্বিকভাবে মৌলিক চিন্তাগুলির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন অ্যারিস্টটল। দ্বান্দ্বিকতার প্রবক্তা হিসাবে রেনে, দেকার্ত ও স্পিনোজার নামও উল্লেখযোগ্য। হেগেল অবশ্য নিঃসন্দেহে ভাববাদী। কিন্তু, মূলত বিষয়াশ্রয়ী ভাববাদী হেগেল চেয়েছিলেন দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্বের মাধ্যমে অগ্রগতির নিয়ম সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে। হেগেলের দার্শনিক ব্যাখ্যায় ইতিহাসে চলার পথে বার বারই দেখা দেয়। বিরোধ, আর সেই বিরোধ বিক্ষোভ সংঘাতের মধ্য দিয়েই মানুষ এগিয়ে চলেছে প্রগতির পথে। কিন্তু, হেগেলের দার্শনিক চিন্তায় স্ব-বিরোধিতাও যথেষ্ট। হেগেলের মতে সকল ঘটনার ভিত্তি হচ্ছে ভাব বা তাঁর ভাষায় ‘পরমভাবের’ বিকাশ। বাস্তব জগৎ, তাঁর মতে, এই ভাবেরই একটি প্রতিফলন। হেগেলের দার্শনিক ধারণা রক্ষণশীল ও ভাববাদী। কিন্তু দ্বান্দ্বিকতার প্রশ্নে (অবিরাম বিকাশ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া) নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক।
হেগেলের দার্শনিক চিন্তাধারা মার্কস ও এঙ্গেলস গভীরভাবে অনুশীলন করেছিলেন এবং বিশেষভাবে গ্রহণ করেছিলেন দ্বান্দ্বিকতার সূত্রটিকে। আংশিকভাবে ফয়ের-বাখের বক্তব্যকেও তাঁরা স্বীকৃতি জানালেন। জার্মান দার্শনিক ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ সামন্ত প্রভু দের ধর্মীয় ভাববাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন প্রকৃতি এবং মানুষকে নিরীক্ষণ করতে হবে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মানুষ ও জগতের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে ঈশ্বর ও পরম ভাবের কোন প্রয়োজন নেই। মানুষ ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি বরং ঈশ্বরই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের দ্বারা। কিন্তু, ফয়েরবাখের বস্তুবাদ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এই বস্তুবাদী ধারণা ছিল যান্ত্রিক, সীমাবদ্ধ ও সংগতিহীন। হেগেলের ভাববাদকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফয়েরবাখ তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এঁদের বক্তব্যের অসংগতি দূর করেই মার্কস ও এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্ব।
এঙ্গেলস মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষাকে তার সমগ্রতায় উপস্থাপিত করেছেন। মার্কসবাদের প্রতিটি উৎস যে পরস্পর সম্পৃক্ত এবং একে অপরকে প্রভাবিত করছে তিনি তা “অ্যান্টি-ড্যুরিং-এর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলেন। এর যে কোন একটি উৎসকে অস্বীকার করলে বা সরিয়ে নিলে অনিবার্যভাবে তা সমগ্রতার মধ্যে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে এবং সুবিধাবাদ বা সংশোধনবাদের পথকে উন্মুক্ত করে দেয়।
ড্যুরিং-এর মতবাদকে তীর ভাবে আক্রমণ করে এঙ্গেলস সুস্পষ্টভাবে বললেন যে, জগতের প্রকৃত ঐক্য তার বাস্তব অস্তিত্ব থেকেই গঠিত। প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর মধ্যে যে অনন্ত বৈচিত্র্য আমরা দেখি তা বস্তুর গতি বিকাশেরই বিভিন্ন রূপ। বিকাশের অত্যন্ত উন্নত স্তরে বস্তুর বৈশিষ্টাগুলির অন্যতম হলো চেতনা। গতিহীন বস্তু অসম্ভব। গতিময় বস্তুর বিভিন্ন রূপ ছাড়া বাস্তবে আর কোন কিছুই নেই।
“অ্যান্টি ড্যুরিং”-এ এঙ্গেলস জন্মতত্ত্বের বিশদ ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন। তিনি দেখান বন্ধবাদ, বস্তুসমূহ ও তাদের প্রতিরূপগুলিকে তাদের অপরিহার্য সম্পর্ক, গতি, উৎপত্তি ও বিনাশের মধ্যে উপলব্ধি করে
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল তিনটি সুত্রকে এঙ্গেলস তুলে ধরলেন। এই তিনটি সূত্র হলো ঐক্য ও বিপরীতের সংঘাত, পরিমাণগত পরিবর্তনগুলির গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তর এবং নেতির নেতি বা নিরাকরণের নিরাকরণ (Negation of negation)।
এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিকাশের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্টভাবে লিখলেন। এক্ষেত্রে অধিবিদ্যক (Metaphysical) যুক্তির দুর্বলতা প্রমাণ করতে গিয়েও এঙ্গেলস গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে ডারউইনের উল্লেখ করেছেন। অধিবিদাকের কাছে-বস্তু ও তার মানসিক প্রতিচ্ছবি অর্থাৎ চিন্তা ভাবনা পরস্পর বিচ্ছিন্ন, এদের বিচার করতে হবে পরস্পর থেকে পৃথকভাবে। অনু সন্ধেয় বস্তু হিসাবে এগুলি অনড় ও অপরিবর্তনীয়। এঙ্গেলস লিখেছিলেন- “দ্বান্দ্বিকতার প্রমাণ হলো প্রকৃতি এবং একথা স্বীকার করতেই হবে যে আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিদিন অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়বস্তু দিয়ে প্রমাণ করে চলেছে যে শেষ বিচারে প্রাকৃতিক ক্রিয়া অধিবিদ্যামূলক নয়, দ্বন্দ্বমূলক……।
এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে নাম করতে হয় ডারউইনের। প্রকৃতির অধিবিদ্যক (Metaphysical) সম্বন্ধবোধের বিরুদ্ধে তিনি গুরুতর আঘাত করে প্রকৃতপক্ষে প্রমাণ করেন যে সমস্ত জৈব সত্তা, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং স্বয়ং মানুষ কোটি কোটি বছরের এক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল।”
জীবজগতের উদাহরণ টেনে প্রকৃতির বিকাশের দ্বান্দ্বিক চরিত্রের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে “অ্যান্টি-ড্যুরিং”-এ। এঙ্গেলস লিখেছেন যে জীবনও একটা বিরোধ যা সমস্ত বস্তু ও প্রক্রিয়ার মধ্যেই উপস্থিত, এবং তা অবিরাম জন্ম নিচ্ছে ও নিজেকে রূপান্তরিত করছে। যখনই বিরোধটি লোপ পায়, জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তখনই অবধারিতভাবে ঘটে মৃত্যু।
মানুষের চেতনা ও জগৎ অবিরাম গতিতে বিকশিত হচ্ছে, কারণ চেতনা জগৎকেই প্রতিফলিত করে। এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক বিরোধের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে দেখালেন যে এই বিরোধই প্রকৃতপক্ষে অনন্ত গতির সূত্র হিসাবে কাজ করছে। জগৎ সম্পর্কে বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ জ্ঞানলাভের প্রচেষ্টা মানুষের চিন্তার স্বভাব। কিন্তু জগৎ। অবিরাম বিকাশলাভ করে এবং মানুষের জানলাভের সামর্থ্যও ক্রমাগত প্রসার লাভকরে চলে তাই পূর্ণ সত্যের উপলব্ধির ধারাও অন্তহীন। প্রতিটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে মানুষের জ্ঞান আপেক্ষিক, অসম্পূর্ণ। আংশিক, আপেক্ষিক সত্যগুলিকে একত্রিত করেই পরিপূর্ণ সত্য সৃষ্টি হয়, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট আপেক্ষিক সত্যের মধ্যেই রয়েছে পরিপূর্ণ সত্যের উপাদান।
দর্শনের ক্ষেত্রে ত্যুরিং-এর বক্তব্যের যুক্তিহীনতা প্রমাণ করে এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত করেছেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্ব।
অর্থনীতি সম্পর্কে এক উদ্ভট তত্ত্ব উপস্থাপিত করে ড্যুরিং বলেন- “দাসপ্রথা ও মজুরি দাসত্বের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যমজ ভাইয়ের মতো যুক্ত বলপ্রয়োগ ভিত্তিক সম্পত্তিকে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক চরিত্রসম্পন্ন সামাজিক আর্থনীতিক সাংবিধানিক রূপ হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং এতদিন পর্যন্ত এইগুলি এমন একটা কাঠামো গঠন করেছে, একমাত্র যার মধ্যেই প্রাকৃতিক আর্থনীতিক নিয়মাবলীর ফলাফল নিজেদের ব্যক্ত করতে পেরেছে।” ড্যুরিং আরও বললেন যে আর্থনীতিক প্রশ্নে দুটি প্রক্রিয়া-উৎপাদন ও বণ্টন। আর বিনিময় উৎপাদনেরই একটা বিভাগ। ড্যুরিং-এর মত অনুসারে পুজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি বেশ ভালো, আর সেটা টিকেও থাকবে। তবে পুজিবাদী বণ্টন পদ্ধতি অত্যন্ত খারাপ আর সেটার অস্তিত্ব কিছুতেই থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে, পুজিবাদী সমাজের উৎপাদন পদ্ধতি সম্বন্ধে ড্যুরিং-এর আপত্তি করার কিছুই ছিল না। ড্যুরিং এটাও দাবি করলেন যে তিনিই শ্রমের মূল্য আবিষ্কারক।
ড্যুরিং-এর অজ্ঞতার তীব্র সমালোচনা করে তাঁর বিচিত্র বক্তব্যের উত্তরে এঙ্গেলস বললেন, অর্থনীতিতে একমাত্র পণ্যের মূল্যের কথাই জানা আছে। ব্যক্তিগত উৎপাদকরা পৃথক পৃথকভাবে সমাজে দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন করে। প্রথমত এগুলি ব্যক্তিগত উৎপাদকদের উৎপন্ন জিনিস। কিন্তু এইসব দ্রব্যগুলি কেবলমাত্র তখনই পণ্যে পরিণত হয়, যখন সেগুলি উৎপন্ন হয় সমাজের ভোগের জন্যে। বিনিময়ের মাধ্যমে সেগুলি সমাজের প্রয়োজনে লাগে। এইসব ব্যক্তিগত উৎপাদকরা পরস্পর সামাজিক সম্পর্কে যুক্ত। এদের নিয়েই গড়ে ওঠে সমাজ। সুতরাং, যখন বলা হয় পণ্যের একটা নির্দিষ্ট মূল্য আছে তখন (১) এটা সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় জিনিস। (২) এটা তৈরি করেছে একজন ব্যক্তি, ব্যক্তিগত ব্যবহারের কারণে (৩) ব্যক্তিগত শ্রমের সৃষ্টি হলেও এর পেছনে সামাজিক শ্রমও আছে এবং বিনিময়ের মাধ্যমে সামাজিকভাবে স্থির করা নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম এই পণ্য সৃষ্টি করেছে। (৪) শ্রম বা শ্রম-ঘন্টার হিসাবে এই পরিমাণকে বিচার না করে বিচার করা হচ্ছে আরেকটি পণ্যের মধ্য দিয়ে।
এঙ্গেলস বললেন, শ্রমের মূল্য কথাটি স্ব-বিরোধী। একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে শ্রম শুধুমাত্র দ্রব্য উৎপাদন করে না, মূলাও সৃষ্টিকরে। শ্রমের দ্বারা এই মূল্য পরিমাণ করা হয়, তাই শ্রমের কোন আলাদা মূল্য থাকতে পারে না। ঠিক যেমন ওজনের কোন আলাদা ওজন বা তাপের কোনো পৃথক তাপমাত্রা থাকতে পারে না। “প্রচলিত শ্রমকে, সক্রিয় শ্রম-শক্তিতে বিনিময় করতে হবে শ্রমজাত দ্রব্যের সঙ্গে। শ্রমজাত দ্রব্যের মতো শ্রম-শক্তিও একটা পণ্য, শ্রমজাত দ্রব্যের সঙ্গে এর বিনিময় ঘটবে। কিন্তু এই শ্রম-শক্তির মূল্য কোনভাবেই শ্রমজাত দ্রব্যের সাহায্যে নির্ধারিত হয়
১১না, নির্ধারিত হয় শ্রম-শক্তির মধ্যে মূর্ত সামাজিক শ্রমের দ্বারা, মজুরি সংক্রান্ত বর্তমান আইন অনুযায়ী।”
“অ্যান্টি-ড্যুরিং”-এর অর্থনৈতিক অংশে এঙ্গেলস মার্কসের অর্থনৈতিক মতবাদের প্রধান বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সংজ্ঞা নিরূপণ করে এঙ্গেলস বললেন-ব্যাপকতম অর্থে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি হচ্ছে মানব সমাজে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বৈষয়িক উপকরণগুলি উৎপাদন ও বিনিময়ের নির্ধারক নিয়মগুলির বিজ্ঞান।
এই অংশে এঙ্গেলস দেখালেন, ‘পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সামাজিক সঙ্কটের জন্ম দিচ্ছে তার কারণই উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈরিতা। এই বৈরিতাই আরও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে ব্যবস্থাটি সমাধানের অযোগ্য। এই বাস্তবতার উপর ভিত্তি করেই শ্রমিকশ্রেণীকে সংঘর্ষের পদ্ধতি স্থির করতে হবে, নির্ধারিত করতে হবে সংগ্রামের কৌশল।
উৎপাদন, বিনিময় ও বণ্টনের দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াশীলতা সম্বন্ধে মার্কসের ধারণাগুলি উপস্থিত করে এঙ্গেলস সামাজিক উৎপাদনের প্রাধান্যের বস্তুবাদী নীতি গ্রহণ করলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করলেন যে যদিও শেষ পর্যন্ত বণ্টনের পদ্ধতি উৎপাদন ও বিনিময়ের পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবু উৎপাদন ও বিনিময়ের উপর বণ্টনও যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করে।
বলপ্রয়োগ, ইতিহাসের সব ক’টি স্তরেই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলির পরিণতি হিসাবে থেকেছে, কারণ হিসাবে নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তি সৃষ্টির কারণ গুলি পরীক্ষা করে এঙ্গেলস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম হয়েছিল। বর্ধিত উৎপাদনের স্বার্থে সামাজিক আদান প্রদান সহজতর করে নেবার জন্য উৎপাদন ও বিনিময়ের পরিবর্তিত সম্পর্কগুলিরই ফল হিসাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম।
এঙ্গেলস বললেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার হলো সেনাবাহিনী, সমস্ত যুগে এর সংগঠন এবং যুদ্ধ পদ্ধতি অর্থনৈতিক অবস্থার উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল, অর্থাৎ “জনসংখ্যার গুণও পরিমাণ এবং কারিগরী বিকাশের” উপর তা নির্ভরশীল। অবশ্য এ কথা বলা যায় না যে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর বলপ্রয়োগের কোন প্রভাবই নেই। সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা মূলতঃ সূচনায় নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কলাপের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তুসমাজ থেকে কিছুটা স্বাতন্ত্রা অর্জনের পর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক বিকাশের অনুকূল বা প্রতিকূল হতে পারে। প্রতিকূল হলে অর্থনৈতিক বিকাশ অনিবার্যভাবেই বলপ্রয়োগেই তার পথ করে নেবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পতনেই এই সংঘাতের পরিসমাপ্তি। এ প্রসঙ্গে মার্কস বলেছিলেন “বলপ্রয়োগ প্রতিটি পুরনো সমাজে গর্ভস্থ ভ্রুণের ক্ষেত্রে ধাত্রী”-র কাজ করে।
ইউজেন ড্যুরিং মার্কসকে ঘৃণ্যভাবে আক্রমণ করে লিখেছিলেন- “পুজির ধারণা সংক্রান্ত মার্কসের সংজ্ঞা জাতীয় অর্থনীতির সঠিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে নিছক বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করবে…. বাচালতাকে গভীর যুক্তিসঙ্গত সত্য রূপে উপস্থিত করা হয়েছে…এর ভিত্তি খুবই নড়বড়ে” ইত্যাদি। মার্কসের বক্তব্য দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এঙ্গেলস বললেন যে ড্যুরিং-এর মতে মার্কস বলেছেন-পুঁজি সৃষ্টি হয়েছে অর্থ থেকে। প্রকৃতপক্ষে মার্কস বলেছিলেন- যে সব অর্থনীতির রূপের মধ্য দিয়ে পণ্যের আদান-প্রদান পদ্ধতি বিকাশ লাভ করেছিল মুদ্রা তার একেবারে শেষ পর্যায়ে আবির্ভূত হয়েছে। পণ্য আদান-প্রদানের এই চূড়ান্ত উৎপন্নটি হচ্ছে প্রাথমিক রূপ, যার মধ্য দিয়ে পুঁজির উদ্ভব ঘটে। ইতিহাসের দিক থেকে পুঁজি হচ্ছে জমি জমা সম্পত্তির বিপরীত রূপ, যা অনিবার্যভাবেই প্রথমে অর্থের রূপ নেয়, আর্থিক সম্পদ, বণিক ও মহাজনের পুঁজি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আজকের দিনেও সমস্ত পুঁজি, তা পণ্য, শ্রম বা অর্থ যাই হোক না কেন, প্রথমে বাজারে এসে উপস্থিত হয় অর্থের রূপ নিয়ে, একটা নির্দিষ্ট পথেই এই অর্থ পুজিতে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অংশেই মুনাফা সম্পর্কীয় ড্যুরিং-এর অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এঙ্গেলস মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে মার্কস ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি পুঁজিবাদী মুনাফা যন্ত্রের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করে উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তি আবিষ্কার করেন। এটাই ছিল মার্কসের সবচেয়ে যুগান্তকারী সাফল্য এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তি আবিষ্কারের দিন থেকেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সূত্রপাত।
“অ্যান্টি-ড্যুরিং”-এর তৃতীয় অধ্যায়ে এঙ্গেলস সুষ্ঠু যুক্তি বিন্যাসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে বিশ্লেষণ করেন। ইতিপূর্বে দীর্ঘকাল ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ধারণা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সাঁ-সিমো, ফুরিয়ের ও ওয়েন। ড্যুরিং এঁদের বিরুদ্ধে অশোভনভাবে কটাক্ষ করলেন। সাঁ-সিমো সম্পর্কে ড্যুরিং-এর অভিমত যে তিনি ধর্মীয় বাতিকে ভুগছেন। ফুরিয়ের হচ্ছেন অকথ্য ধরনের নির্বোধ এবং ওয়েনের পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি বৃদ্ধিহীন ও অমার্জিত। রবার্ট ওয়েন প্রসঙ্গে ড্যুরিং লিখেছিলেন, “সাম্যবাদ সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা ওয়েনের ছিল তা আমরা মনে করতে পারি না।” এই মূল্যায়নকে নির্বোধ ও উদ্ভট আখ্যা দিয়ে এঙ্গেলস বললেন যে, ওয়েনের ‘বুক অফ নিউ মর্যাল ওয়ার্ল্ড’-এ শ্রমের প্রতি সমান দায় দায়িত্ব ও ব্যবহার্য দ্রব্যের উপর সমান অধিকার সমন্বিত সাম্যবাদের ধারণা শুধু স্পষ্টভাবে প্রকাশই পায়নি, ভাবী সাম্যবাদী সমাজের ভিত্তি ও রূপরেখা স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ওয়েন সুস্পষ্ট সাম্যবাদ শুধু প্রচারই করেননি পাঁচ বছর ধরে তিনি হ্যাম্পশায়ারের হারমনি হল উপনিবেশে এই তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। ওয়েনের উদ্যোগে ১৮৩২ সালে লন্ডনে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিক সমবায়গুলির দ্বারা শ্রমজাত দ্রব্যের সম-বিনিময় বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাঁ-সিমোর মধ্যে আমরা যেমন পরবর্তীকালের সমাজতন্ত্রীদের যাবতীয় ধ্যান-ধারণার উৎস খুঁজে পাই, ফুরিয়েরের মধ্যে তেমনই দেখতে পাই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা। সাঁ-সিমো ছিলেন মহান ফরাসি বিপ্লবের সন্তান। এই বিপ্লবে সুবিধাভোগী অলস শ্রেণীগুলি, অভিজাত ও পুরোহিতদের বিরুদ্ধে “থার্ড-এস্টেট’-এর অর্থাৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যে সক্রিয় জাতির বিপুল সংখ্যক জনগণের বিজয় ঘটে। কিন্তু থার্ড-এস্টেটের বিজয় দ্রুত এই এস্টেট-এর একটা ক্ষুদ্রাংশের বিজয় হিসাবে দেখা দেয়। অর্থাৎ, সমাজের একটা সুবিধাভোগী অংশ হিসাবে সম্পত্তিবান লুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। এই জন্যে সাঁ-সিমোর কাছে থার্ড-এস্টেট ও সুবিধাভোগী শ্রেণীগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্বটি ‘শ্রমিক’ ও ‘অলস’দের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হিসাবে প্রতিভাত হয়। ফুরিয়ের বুর্জোয়া বিপ্লব-পূর্ব তাদের অনুপ্রাণিত প্রভুদের এবং বিপ্লবোত্তর তাদের স্তাবক গোষ্ঠীকে প্রাপ্য মূল্যেই গ্রহণ করেছিলেন। বুর্জোয়া জগতের বৈষয়িক ও নৈতিক দৈন্যাকে তিনি নির্মমভাবে উদঘাটন করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ভারিং অত্যন্ত কুৎসিতভাবে ইউটোপীয়দের চরিত্র চিত্রণ করেছিলেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত নাম দিয়ে। যেমন সাঁ-সিমো-সাঁ (পূণ্যাত্মা), ফুরিয়ের দু (পাগল) এবং ওয়েন-ও উ(Woe!) অর্থাৎ, ওয়েন-হায় রে কপাল। আর ড্যুরিং-এর এই অভিমত সম্বন্ধে কোন পাঠক যদি সহমত পোষণ না করেন তাহলে তিনিও, ড্যুরিং-এর মতে, কোন না কোন গণ্ডমূর্খ শ্রেণীর অন্তর্গত। এঙ্গেলস-এর মতে এই ধরনের মানুষদের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশের মূল করণ ইতিহাস বিশ্লেষণ বোধের অভাব এবং এই তিনজন চিন্তানায়কের রচনাবলী সম্বন্ধে ‘ভয়াবহ অজ্ঞতা।” তিনি ড্যুরিংকে চিহ্নিত করলেন ইউটোপীয় চিন্তাবিদদের একজন নিকৃষ্ট উত্তরসূরী রূপে। এঙ্গেলস এই তিন চিন্তানায়কের বুর্জোয়া সমাজের চমৎকার সমালোচনাকে প্রশংসা করতেন এবং পুজিবাদী শোষণের প্রতিবাদ হিসাবে তাঁদের অনেকগুলি ধারণাকে এঙ্গেলস মূল্যবান বলে গণ্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে এঁদের কয়েকটি ধারণাকে মার্কসবাদে বিস্তারিত রূপ দেওয়া হয়েছিল। এঁদের ধারণাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শহর ও গ্রমের মধ্যে বৈষম্য দূর হবে। রাষ্ট্রের একদিন বিলোপ ঘটবে এবং মানুষের উপর রাজনৈতিক শাসনের রূপান্তর ঘটবে।
এঙ্গেলস অবশ্য এইসব মহান ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রীদের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধেও সচেতন ছিলেন। তাঁরা তাঁদের সময়কালে, নতুন সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছনোর জন্য। বাস্তববাদী পথ দেখাতে পারেননি। এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে পুঁজিবাদী উৎপাদনের অপরিণত অবস্থা এবং অপরিণত শ্রেণী অবস্থার সঙ্গে অপরিণত তত্ত্ব সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
ইউটোপীয়রা মনে করতেন যে নতুন সামাজিক ব্যবস্থা নির্মাণ যুক্তির কাজ। এ বিষয়ে সরাসরি ভিন্নমত ঘোষণা করে এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রের বিষয়গত পূর্ব শর্তের উপর চূড়ান্ত গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখান যে, বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ গড়ে উঠেছে পূজিবাদী ব্যবস্থার বিরোধগুলির উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান তীব্র সংঘাতের ভিত্তিতে। এই সংঘাত পুজিবাদী সমাজকে অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের পথে পরিচালিত করে। তিনি এইভাবে পুঁজিবাদের প্রধান বিরোধের শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা সুত্রায়িত করেন। সামাজিকৃত উৎপাদন এবং পুঁজিবাদীদের দ্বারা উৎপাদনের ফল আত্মসাৎ করার মধ্যে বিরোধ প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যে বৈর বিরোধ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।
এঙ্গেলস বলেন শ্রেণী হিসাবে পরজীবীতে পরিণত বুর্জোয়াকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিচ্যুত করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদ্যোগ অথবা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই উৎপাদিকা শক্তির পরিবর্তন পুজিবাদী ব্যবস্থার শোষণমূলক মর্মবস্তুকে কিছুতেই শেষ করতে পারে না। পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি বিকাশলাভ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ব্যক্তিগত উৎপাদন রূপ নিতে থাকে যৌথ উৎপাদনে। এর ফলে, পুজিবাদীদের জয়েন্ট স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। পূজিবাদী সমাজের সরকারী প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রও কিছু সংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান অথবা শ্রম শিল্পের কোন সমগ্র শাখার পরিচালনভার গ্রহণে বাধ্য হয়। এঙ্গেলস পরিষ্কার করে দিলেন- “জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে অথবা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রূপান্তর, উ উৎপাদিকা শক্তিগুলির পুঁজিবা পুজিবাদী ধরনের অবসান ঘটায় না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন পন্ন না করা পর্যন্ত পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির বিলোপ, শোষণের বিলোপ এবং সমাজতা সতান্ত্রিক ব্যবস্থার বস্থার প্রতিষ্ঠা প্রতি সম্ভব নয়। এই পর্যায়ে, প্রলেতারিয়েত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করবে এবং উৎপাদনের উপকরণগুলিকে প্রথমেই রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করবে।”
পুজিবাদকে আকর্ষণীয় করে তোলার সমস্ত প্রচেষ্টা ও ধারণাকে এই মত বাতিল করে দেয়। উন্নত সৃজিবাদী রাষ্ট্র শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষকে শোষণ ও লুণ্ঠনের জন্য সমাজে আধিপত্যকারী বুর্জোয়াদের একটি হাতিয়ার ছাড়া কিছুই নয় এই ধরনের রাষ্ট্র সম্পর্কে এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে উৎপাদিকা শক্তিকে অধিগ্রহণ করতে এই রাষ্ট্র যত বেশি অগ্রসর হয়, ততই জাতীয় পুঁজিপতিতে পরিণত হয়ে নাগরিকদের শোষণ করে। শ্রমিকরা মজুরি শ্রমিক অর্থাৎ প্রলেতারিয়েতই থেকে যায়। এখানেই এঙ্গেলস এমন সব প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যা অনেক পরে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের আওতায় সুস্পষ্ট আকার নিয়েছে।
মার্কসীয় তত্ত্বের গুরুত্বপূ বিষয় যেমন শ্রেণীগুলির উদ্ভব, রাষ্ট্র, পরিবার, ধর্ম ইত্যাদি নিয়েও “অ্যান্টি-ডারিং”-এ এঙ্গেলস সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।
ইউজেন ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে এঙ্গেলস বিজ্ঞানসম্মত দূরদৃষ্টির সাহায্যে কমিউনিস্ট সমাজের রূপরেখা রচনা করেছিলেন। পুরনো শ্রমবিভাগ যা গ্রামীণ জনতাকে মানসিক জড়তায় এবং শহরের জনগণকে একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন কর্মব্যস্ততায় আমৃত্যু অবসাদগ্রস্ত করে রাখে, যে শ্রমবিভাগ মানুষকে জড়বুদ্ধি ও হীনবল করে, তার শারীরিক ও মানসিক গুণগুলিকে কেবলই দুর্বল করে দেয়, তার বিপরীতে কমিউনিজম মানুষের ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের ব্যাপকতম সুযোগ তৈরি করে এক নতুন শ্রম সংগঠন গড়ে তোলে। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় উৎপাদনশীল শ্রম বোঝা হয়ে থাকে না, পরিবর্তিত হয় আনন্দে।
সমানাধিকারের ধারণা সম্পর্কেও এঙ্গেলসের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণী বৈষমা বিলোপ করার সময় কমিউনিস্টরা জনগণের রুচি ও গুণাবলীকে মোটেই গায়ের জোরে সমান করে না, অথবা তাদের স্বাতন্ত্রাকে দমন করে না। এঙ্গেলস লিখেছিলেন সমানাধিকারের প্রলেতারীয় দাবির প্রকৃত মর্মবস্তু হলো শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিলোপ।
এঙ্গেলস আরও উল্লেখ করেন যে জীবনধারণের যে পরিবেশ এতদিন মানুষকে ঘিরে রেখেছে এবং শাসন করেছে, কমিউনিজম গড়ে উঠলে এই পরিবেশ মানুষের। আয়ত্তে আসবে। মানুষ এই প্রথম হবে প্রকৃতির প্রকৃত, সচেতন প্রভু, সামাজিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক।।
অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অসাধারণ স্ফূরণ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় অথবা কু-সংস্কারের অবসান ঘটাবে। এঙ্গেলস ধর্মকে, যে সব বাইরের শক্তি মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষের মনে সেগুলির কল্পনাপ্রসূত প্রতিচ্ছবি হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি ধর্মীয় ধারণাগুলির বিকাশের কারণ অনুসন্ধান করে তাদের সামাজিক উৎসগুলি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন। ডারিং ভবিষ্যৎ সমাজে ধর্মকে সোজাসুজি বেআইনী করা হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই মতকে তীব্রভাবে বিদ্রূপ করে এঙ্গেলস বললেন, যে কারণগুলি ধর্মকে পৃষ্ট করে, সেগুলির অস্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটলেই ধর্ম স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করবে।
“অ্যান্টি ড্যুরিং”-এর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অধ্যায়ে এঙ্গেলস এই মত প্রকাশ করেন যে কমিউনিজম না গড়ে ওঠা পর্যন্ত জনগণ তাদের সামাজিক জীবনের সচেতন নির্মাতা হবে না, প্রকৃত মুক্তি অর্জন করতে পারবে না। তিনি একে মানুষের বাধ্যবাধকতার জগৎ থেকে মুক্তির জগতে উত্তরণ হিসাবে অভিহিত করেন।
এঙ্গেলস দৃপ্ত বলিষ্ঠতায় ঘোষণা করলেন-মানব সমাজের এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো প্রলেতারিয়েতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই কাজের যথার্থ অবস্থা ও প্রকৃতি অনুধাবন করা, শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভাবধারা সঞ্চার করা, শ্রমিকদের সমাজ বিকাশের নিয়মগুলি বোঝার জন্য শিক্ষিত করার দায়িত্ব তিনি সমাজতন্ত্রীদের উপর অর্পণ করেছিলেন।
এঙ্গেলস রচিত “অ্যান্টি ড্যুরিং” বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। সমাজতন্ত্রীদের উপর ড্যুরিং-এর প্রভাবকে এঙ্গেলস বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে প্রাক-মার্কসীয় ধারণাগুলিকে তাত্ত্বিকভাবে নস্যাৎ করার কাজটি সম্পূর্ণ করেছিলেন। জার্মান সোসাল ডেমোক্রাটরা এরপর থেকে মার্কসবাদকে একটি অখণ্ড বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে বুঝতে শুরু করেন।
“অ্যান্টি ডারিং” প্রকাশের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন মার্কসীয় বিশ্ব-বীক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। লেনিন যথার্থভাবেই বলেছিলেন যে “অ্যান্টি ডুরিং” হচ্ছে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন শ্রমিকের কাছে মার্কসবাদের সারগ্রন্থ। শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির সংগ্রামে এই বইটি বিরাট ভূমিকা পালন করছে। “অ্যান্টি ডারিং” অল্প কয়েকটি বই-এর অন্যতম যা কখনো পুরনো হয় না এবং ইতিহাসের প্রত্যেকটি মোড় পরিবর্তনে এই বইটির অফুরন্ত সম্পদ নতুনতর দিক উন্মোচন করে।
@NBA
@freemang2001gmail-com



