প্রায়ই বলা হয় ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বিশ্বের প্রথম মার্কসবাদী। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিনয় সত্ত্বেও এঙ্গেলস সম্ভবত গর্বের সঙ্গেই এই আখ্যা মেনে নিতেন। তিনি একবার বলেছিলেন : “মার্কস যা অর্জন করতে পেরেছিলেন আমি তা পারতাম না। মার্কস আরও উঁচুতে দাঁড়িয়েছিলেন, আরও দূর পর্যন্ত দেখতে পেতেন। আমাদের সকলের চেয়ে ব্যাপকতর এবং দ্রুততর দৃষ্টিভঙ্গি নিতে পারতেন। মার্কস ছিলেন একজন জিনিয়াস, আমরা বড় জোর একজন প্রতিভাবান। তাঁকে ছাড়া তত্ত্ব আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। সঠিকভাবেই তাই এই তত্ত্ব তাঁর নাম বহন করছে।”
মার্কস-এঙ্গেলস সহযোগিতা
মার্কস ‘রাইনিশে জেইটুং’ নামে পত্রিকা সম্পাদনা করছিলেন। সামন্ততন্ত্রবিরোধী শক্তি বনাম রাষ্ট্রের মদতপ্রাপ্ত প্রতিক্রিয়াশীলদের তীব্র সংগ্রামের সময়পর্বে প্রতিক্রিয়াশীল প্রুশিয়া রাষ্ট্র ১৮৪৩-র মার্চে এই পত্রিকা নিষিদ্ধ করে দেয়। তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে মার্কস ১৮৪৪-র গোড়ায় প্যারিসে চলে আসেন। সেখানে তিনি ‘ডয়েশ-ফ্ল্যানজোইশে জারবুচার’ নামে জার্নাল সম্পাদনা শুরু করেন। এঙ্গেলস এই পত্রিকায় কনিষ্ঠতম লেখক ছিলেন, পরে এই পত্রিকার সহযোগীও হন। ১৮৪৪-এ এঙ্গেলস “Outline of a Critique of Political Economy” শীর্ষক নিবন্ধটি লেখেন। এই লেখায় এঙ্গেলস বুর্জোয়া রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তিমূলক নীতিগুলি স্পষ্ট করেন। এঙ্গেলস দেখান বুর্জোয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই অনিবার্যভাবে উৎপাদনের উপকরণের উপরে ব্যক্তি-মালিকানার কারণে ঘটে থাকে। দারিদ্রমুক্ত সমাজ হতে পারে ব্যক্তিমালিকানাহীন সমাজ। তা মার্কসকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। মার্কস এই ধারণায় পৌঁছান যে হেগেলের দর্শনের সমালোচনার মাধ্যমে তিনি যে উপসংহারে পৌঁছেছেন আর একজন চিন্তাবিদ বুর্জোয়া রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনার মাধ্যমে সেই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এর ফলেই আজীবনের সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতা এবং মার্কসবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির যৌথ বিকাশের ভিত্তি পোক্ত হয়।
এঙ্গেলসের কালজয়ী রচনা ‘The Condition of the working class in England’-এ শিল্প বিপ্লবের গোড়ার দিকে মার্কসের চিন্তাপ্রবাহকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করেছিল। এঙ্গেলস ম্যাঞ্চেস্টারে তাঁর পরিবারের বস্ত্র শিল্পের ব্যবসায় সময় দিতেন। ম্যাঞ্চেস্টার তখন ছিল শিল্প বিপ্লবের উদীয়মান রাজধানী। বুর্জোয়া রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনার মাধ্যমে এঙ্গেলসের এই কাজ এবং পরবর্তী প্রয়াস তাঁকে এই উপসংহারে টেনে নিয়ে গিয়েছিল যে যতক্ষণ পর্যন্ত শোষণের বস্তুগত উৎপাদনের এই পরিস্থিতি ছুঁড়ে ফেলা না যাচ্ছে ততক্ষণ শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়।
১৮৪৪-র আগস্টে এঙ্গেলস প্যারিসে মার্কসের সঙ্গে দেখা করেন। তার আগেও। ১৮৪২-এ কোলনে দু’জনের দেখা হয়েছিল। তবে ভবিষ্যতের যৌথ চিন্তা প্রক্রিয়ায় তার তেমন কোনও প্রভাব ছিল না। ১৮৪৪-র আগস্টের ১০ দিনে এঙ্গেলসের প্রতি মার্কসের শ্রদ্ধা বিপুলভাবে বেড়ে যায়। তিনি এঙ্গেলসের সাহস, নিষ্ঠা, মনঃসংযোগের প্রশংসা করেন এবং বলেন সেই সময়ের সমস্ত তাত্ত্বিক প্রশ্নে উভয়ে একমত। ভাববাদের প্রভাব খণ্ডন করে ১৮৪৪-এ তাঁদের দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে প্রথম যৌথ গ্রন্থ ‘The Holy Family or Critique of Critical Criticism’ রচিত হয়। এই গ্রন্থে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রমাণ করেন অতি প্রাকৃতিক শক্তি, মানব চেতনা বা বীরের ইতিহাস রচনা করে না। শ্রমজীবী মানুষ, তাঁদের শ্রম এবং রাজনৈতিক সংগ্রামই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাঁরা দেখান প্রলেতারিয়েত নিজের জীবনধারণের পরিস্থিতি অর্থাৎ সমকালীন সমাজ ধনতন্ত্রের অবসান না ঘটিয়ে নিজের মুক্তি অর্জন করতে পারে না। শ্রেণি হিসাবে প্রলেতারিয়েতের ঐতিহাসিক মুক্তিকামী ভূমিকার ব্যাখ্যা করেন তাঁরা। পরবর্তী সব রচনায় এটাই ছিল ভিত্তি।
কিন্তু দর্শনের স্তরে ভাববাদের আধিপত্যকে মোকাবিলা করা এবং বস্তুবাদী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করা দরকার ছিল। ১৮৪৫-৪৬-এ মার্কস-এঙ্গেলস যৌথভাবে এই কাজ করলেন ‘German Ideology’-তে। এই প্রথমবার বিশদে এবং পদ্ধতিগতভাবে তাঁরা শ্রমিকশ্রেণির বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তি ব্যাখ্যা করলেন।
বস্তুত ১৮৪৩-১৮৪৫ মার্কসবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। বিপ্লবী গণতন্ত্র থেকে সর্বহারা বিপ্লব, হেগেলের প্রভাব থেকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং দর্শন থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটেছে। এক্ষেত্রে মার্কস এবং এঙ্গেলস উভয়েই একসঙ্গে ভূমিকা পালন করেছেন।
হেগেলের আইনের দর্শনের সমালোচনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে মার্কস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে আইনি সম্পর্ক বা রাজনৈতিক রূপ শুধু সেগুলিকে দিয়েই বা মানব চেতনার বিকাশ দিয়ে সম্যক উপলব্ধি করা যায় না। তাকে বুঝতে হয় জীবনের বস্তুগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে। হেগেল আদর্শ সামাজিক কাঠামো যা ‘অ্যাবসলুটের বিকাশের অতি প্রাকৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে তৈরি হবে তাকে ‘নাগরিক সমাজ’ নামে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু মার্কস দেখালেন এই নাগরিক সমাজের শারীরতত্ত্ব খুঁজতে হবে রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যে। এখান থেকে তিনি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের যুগান্তকারী ভিত্তিতে পৌঁছালেন: “মানুষের চেতনা তার অস্তিত্ব নির্ধারণ করে নয় বরং তাঁদের সামাজিক অস্তিত্ব তাঁদের চেতনা নির্ধারণ করে।”
দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির এই সমালোচনার সূত্রে মার্কস-এঙ্গেলস যে বিপ্লবী তত্ত্বের বিকাশ ঘটালেন তা রূপ পেল তাঁদের যৌথ রচনা ১৮৪৪-র কমিউনিস্ট ইশৃতেহারে। একই সঙ্গে প্রথম আন্তর্জাতিক গঠনে।
এঙ্গেলসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল মানুষের কার্যকলাপের অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রয়োগ।
মানুষ, প্রকৃতি, দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তি হলো মানুষ ও প্রকৃতির চিরকালীন দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। অর্থাৎ মানুষের জীবন ও জীবনযাত্রা উন্নতর করতে প্রকৃতি থেকে গ্রহণ। এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করে, পরিবর্তনও করে। আবার প্রকৃতিও মানুষকে পালটে দেয় এবং মানব বিকাশে প্রভাব ফেলে। তাঁর প্রবন্ধ “The Part Played By Labor in the Transition from Ape to Man”-এ এঙ্গেলস দেখান কীভাবে এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে। ডারউইনের বিকাশের পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্রকে তিনি ভিত্তি করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন হাত, মানুষের অনুভূতি, কথা ইত্যাদির বিকাশে শ্রম কীভাবে ভূমিকা পালন করেছে। এসব কোনও দৈব সৃষ্টির ফলাফল নয়। এর ভিত্তি নিহিত আছে জীবনের বস্তুগত ভিত্তিতে। এঙ্গেলস দেখান মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি এবং বৃহত্তর বৃদ্ধির বিকাশ হঠাৎ ঘটেনি, স্বর্গের দানও নয়। এই বিকাশ ঘটেছে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বাস্তব পরিস্থিতির উপর। পরিণামে হাঁটাচলার বিকাশের মাধ্যমে। এঙ্গেলসের সময়কালের পরে চেতনার বিকাশ ও উন্নতি মানুষ ও প্রকৃতির দ্বান্দ্বিক এই সম্পর্ককেই আরও স্পষ্ট করেছে।
বিজ্ঞানী এবং নিদ্রাসংক্রান্ত গবেষকদের সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলি দেখিয়েছে আমরা কেন ঘুমাই এবং ঘুমালে কী হয়। তাঁরা দেখিয়েছেন জিনগত দিক থেকে মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত: যারা আগে ঘুমায় ও আগে ওঠে এবং যারা দেরিতে ঘুমায় ও দেরিতে ওঠে। প্রথম গোষ্ঠীকে বলা হয় চড়াই (larks) এবং পরের গোষ্ঠীকে বলে পেঁচা (owls)। মানব প্রজাতির ৪০ শতাংশ করে এই দুই গোষ্ঠীতে বিভাজিত। ঘুমের এই বিন্যাস তাদের জেনেটিক কোডে নিহিত আছে। বাকি ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে সময় পরিবর্তিত হয়। ফলে দিনরাত্রি মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় কেউ না কেউ জেগেই থাকে।
এ থেকে বোঝা যায় আদিম সাম্যবাদের সময় আক্রমণ ও বিপদ থেকে যৌথ জীবনকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। মানুষ প্রকৃতির এই দ্বান্দ্বিকতা বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন জেনেটিক কোডের রূপে বিকশিত হয়েছে যাতে ২৪ ঘণ্টাই প্রহরা বজায় থাকে। অর্থাৎ জীবনের বস্তুগত পরিস্থিতি বিকাশের রূপকে প্রভাবিত করেছে।
প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা: প্রকৃতি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আরও অনুসন্ধান করেছিলেন এঙ্গেলস। তাঁর এই অনুসন্ধান একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহারের জন্ম দেয় “প্রকৃতিতে দ্বন্দ্বের সূত্র নির্মাণ করার প্রশ্নই নেই। বরং সেখান থেকে আবিষ্কার করা এবং বিকশিত করা যেতে পারে।” বিজ্ঞানকে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আত্মস্থ করার এই চেষ্টা তিনি করেছিলেন এমন এক সময় যখন বিজ্ঞান আজকের স্তরে বিকশিত হয়নি। তিনি বলেছিলেন “দ্বান্দ্বিকতা হলো প্রকৃতি, মানবসমাজ এবং চিন্তার সাধারণ গতিসূত্র ও বিকাশের বিজ্ঞান।”
বস্তুত বিজ্ঞান যত এগিয়েছে এবং নতুন নতুন আবিষ্কার হয়েছে, সে মহাকাশ অভিযানে হোক, ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই হোক বা জেনেটিক্সের অগ্রগতি হোক, প্রকৃতির সাধারণ গতিসূত্র এবং বিকাশের আরও ব্যাখ্যা আমরা অর্জন করেছি যেমন এঙ্গেলস দেখিয়েছিলেন।
দ্বান্দ্বিকতা ও নৃতত্ত্ব এঙ্গেলস ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে তাঁর সময়ে প্রাপ্ত আদি মানবসমাজের নৃতাত্ত্বিক প্রমাণের উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। “Origins of the Family, Private Property and the State” গ্রন্থে এঙ্গেলস আধুনিক শ্রেণি সমাজ সম্পর্কে প্রচলিত ধোঁয়াশা ভেঙে দিয়েছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন কীভাবে সম্পত্তিভিত্তিক শ্রেণি সম্পর্ক পরিবারের জন্ম দিয়েছে, ‘স্ত্রী’ লিঙ্গের ঐতিহাসিক পরাজয় সূচিত করেছে। একগামিতা এবং পিতৃতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে, মহিলাদের নিপীড়ন বাড়িয়েছে।
দ্বান্দ্বিকতা ও ইতিহাস: এঙ্গেলসের “The Peasant war in Germany” ইতিহাসের বিচারে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রথম প্রয়োগ।
দ্বান্দ্বিকতা ও দর্শন: মার্কস “নাগরিক সমাজের শারীরতত্ত্ব কাঁটাছেড়া” করছিলেন। অর্থাৎ ধনতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যাখ্যা করছিলেন। সেখান থেকে তাঁর মহাগ্রন্থ। ‘দাস ক্যাপিটালস’ তৈরি হয়। এঙ্গেলস দার্শনিক ইউজিন ড্যুরিংয়ের মার্কসবাদ বিরোধী মহাতত্ত্বের ভ্রান্তি প্রমাণে বড় কাজ করেন। ড্যুরিং জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মধ্যে কিছু কিছু প্রভাব ফেলেছিলেন। এঙ্গেলস সেই ভ্রান্ত তত্ত্বকে অসাড় প্রমাণ করে মার্কসবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় সহজ-সরল দুর্দান্ত বিতর্ক ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ গ্রন্থে বিধৃত করেছেন। মার্কসবাদ, দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে এই অন্থের বিরাট প্রভাব রয়েছে।
একথা স্পষ্ট যে মানুষের কার্যকলাপ ও উদ্যোগের প্রায় সব ক্ষেত্রে এঙ্গেলস এককভাবে ও মার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
রাজনৈতিক তৎপরতা
এই তাত্ত্বিক ভিত্তি বিকাশের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের এই দুই মহাপথিক কেবল জ্ঞান চর্চাই করেননি। তাঁদের সময়ের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং কখনো কখনো তাঁর নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছেন। লিগ অব জাস্ট মার্কস এঙ্গেলসের উদ্যোগেই কমিউনিস্ট লিগে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা মার্কস-এঙ্গেলসকে পার্টির ‘কর্মসূচি’ লিখতে দিয়েছিলেন। ধারণা করা হয় এঙ্গেলসই তার প্রথম খসড়া তৈরি করেছিলেন। তারপর দু’জনে মিলে তা চূড়ান্ত করেন। সেই ঐতিহাসিক দলিল আহ্বান জানায় “দুনিয়ার মজদুর এক হও, শৃঙ্খল ছাড়া তোমাদের হারানোর কিছু নেই।”
শ্রমিকশ্রেণির বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে বিপ্লবী সংগঠন তৈরির জন্য মার্কসবাদের এই দুই পথপ্রদর্শক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীকে এক জায়গায় জড়ো করার এটি ছিল প্রথম প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
কিন্তু ১৮৭১-এ প্যারি কমিউনের পরাজয়ের পরে প্রথম আন্তর্জাতিক গুটিয়ে ফেলতে হয়। যখন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের সময় এল এঙ্গেলস সওয়াল করলেন এখন আন্তর্জাতিক কেবলমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলিকে নিয়ে তৈরি হতে পারে না। প্রত্যেক দেশের শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক দল অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ছিল শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলির আন্তর্জাতিক।
বৈজ্ঞানিক ও বৈপ্লবিক
লেনিন একবার বলেছিলেন মার্কসবাদের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ হলো তা একমাত্র দর্শন যা কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক এবং একই সঙ্গে বৈপ্লবিক। এই মিশ্রণ হঠাৎ হয়নি। মার্কস-এঙ্গেলস তাঁদের জীবনে এই দুই গুণের অনুসরণ করেছেন বলেই হয়েছে তাও নয়। মার্কসবাদ অন্তর্নিহিতভাবে এবং অবিচ্ছেদ্যভাবে এই দুই বিষয়কে সম্পৃক্ত করেছে। এ হলো মার্কসবাদের সৃজনশীল বিজ্ঞান।
মার্কসের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণি এবং গেটা বিশ্ব মূলত এঙ্গেলসের মাধ্যমেই মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরত সমৃদ্ধ রচনা এবং তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলির কথা জানতে পারে। মার্কসের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ নোটস বিন্যস্ত ও সম্পাদনা করেন এঙ্গেলস। তা থেকেই ক্যাপিটাল (দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড) তৈরি করেন এঙ্গেলসই। কমিউনিস্ট ইশতেহারের মুখবন্ধগুলিও এঙ্গেলস লিখছিলেন এবং অন্যান্য রচনায় নতুন সংস্করণের ভূমিকার মাধ্যমে এঙ্গেলস সমসাময়িক ঘটনাবলির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে সাহায্য করছিলেন।
লেনিন বলেছিলেন এঙ্গেলস “শ্রমিকশ্রেণিকে নিজেকে চিনতে শিখিয়েছিলেন, সচেতন হতে শিখিয়েছিলেন, স্বপ্নের বদলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিজ্ঞানকে।”
উপসংহারের জন্ম দেয় “প্রকৃতিতে দ্বন্দ্বের সূত্র নির্মাণ করার প্রশ্নই নেই। বরং সেখান থেকে আবিষ্কার করা এবং বিকশিত করা যেতে পারে।” বিজ্ঞানকে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আত্মস্থ করার এই চেষ্টা তিনি করেছিলেন এমন এক সময় যখন বিজ্ঞান আজকের স্তরে বিকশিত হয়নি। তিনি বলেছিলেন “দ্বান্দ্বিকতা হলো প্রকৃতি, মানবসমাজ এবং চিন্তার সাধারণ গতিসূত্র ও বিকাশের বিজ্ঞান।”
বস্তুত বিজ্ঞান যত এগিয়েছে এবং নতুন নতুন আবিষ্কার হয়েছে, সে মহাকাশ অভিযানে হোক, ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই হোক বা জেনেটিক্সের অগ্রগতি হোক, প্রকৃতির সাধারণ গতিসূত্র এবং বিকাশের আরও ব্যাখ্যা আমরা অর্জন করেছি যেমন এঙ্গেলস দেখিয়েছিলেন।
দ্বান্দ্বিকতা ও নৃতত্ত্ব এঙ্গেলস ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে তাঁর সময়ে প্রাপ্ত আদি মানবসমাজের নৃতাত্ত্বিক প্রমাণের উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। “Origins of the Family, Private Property and the State” গ্রন্থে এঙ্গেলস আধুনিক শ্রেণি সমাজ সম্পর্কে প্রচলিত ধোঁয়াশা ভেঙে দিয়েছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন কীভাবে সম্পত্তিভিত্তিক শ্রেণি সম্পর্ক পরিবারের জন্ম দিয়েছে, ‘স্ত্রী’ লিঙ্গের ঐতিহাসিক পরাজয় সূচিত করেছে। একগামিতা এবং পিতৃতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে, মহিলাদের নিপীড়ন বাড়িয়েছে।
দ্বান্দ্বিকতা ও ইতিহাস: এঙ্গেলসের “The Peasant war in Germany” ইতিহাসের বিচারে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রথম প্রয়োগ।
দ্বান্দ্বিকতা ও দর্শন: মার্কস “নাগরিক সমাজের শারীরতত্ত্ব কাঁটাছেড়া” করছিলেন। অর্থাৎ ধনতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যাখ্যা করছিলেন। সেখান থেকে তাঁর মহাগ্রন্থ। ‘দাস ক্যাপিটালস’ তৈরি হয়। এঙ্গেলস দার্শনিক ইউজিন ড্যুরিংয়ের মার্কসবাদ বিরোধী মহাতত্ত্বের ভ্রান্তি প্রমাণে বড় কাজ করেন। ড্যুরিং জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মধ্যে কিছু কিছু প্রভাব ফেলেছিলেন। এঙ্গেলস সেই ভ্রান্ত তত্ত্বকে অসাড় প্রমাণ করে মার্কসবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় সহজ-সরল দুর্দান্ত বিতর্ক ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ গ্রন্থে বিধৃত করেছেন। মার্কসবাদ, দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে এই অন্থের বিরাট প্রভাব রয়েছে।
একথা স্পষ্ট যে মানুষের কার্যকলাপ ও উদ্যোগের প্রায় সব ক্ষেত্রে এঙ্গেলস এককভাবে ও মার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
রাজনৈতিক তৎপরতা
এই তাত্ত্বিক ভিত্তি বিকাশের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের এই দুই মহাপথিক কেবল জ্ঞান চর্চাই করেননি। তাঁদের সময়ের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং কখনো কখনো তাঁর নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছেন। লিগ অব জাস্ট মার্কস এঙ্গেলসের উদ্যোগেই কমিউনিস্ট লিগে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা মার্কস-এঙ্গেলসকে পার্টির ‘কর্মসূচি’ লিখতে দিয়েছিলেন। ধারণা করা হয় এঙ্গেলসই তার প্রথম খসড়া তৈরি করেছিলেন। তারপর দু’জনে মিলে তা চূড়ান্ত করেন। সেই ঐতিহাসিক দলিল আহ্বান জানায় “দুনিয়ার মজদুর এক হও, শৃঙ্খল ছাড়া তোমাদের হারানোর কিছু নেই।”
শ্রমিকশ্রেণির বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে বিপ্লবী সংগঠন তৈরির জন্য মার্কসবাদের এই দুই পথপ্রদর্শক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীকে এক জায়গায় জড়ো করার এটি ছিল প্রথম প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
কিন্তু ১৮৭১-এ প্যারি কমিউনের পরাজয়ের পরে প্রথম আন্তর্জাতিক গুটিয়ে ফেলতে হয়। যখন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের সময় এল এঙ্গেলস সওয়াল করলেন এখন আন্তর্জাতিক কেবলমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলিকে নিয়ে তৈরি হতে পারে না। প্রত্যেক দেশের শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক দল অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ছিল শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলির আন্তর্জাতিক।
ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের অবদান
সোভিয়েতের ভাঙন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী গণমাধ্যমগুলি সমাজতান্ত্রিক ধারণারই বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণিত করে তোলে। এই সংগঠিত আক্রমণের প্রেক্ষিতে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মৃত্যুশতবার্ষিকী উদযাপন অধিকতর তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। বুর্জোয়া গণমাধ্যমের ঝটিকা আক্রমণের লক্ষ্য হলো তিনটি বিষয় প্রতিপন্ন করা সমাজতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে, সাম্যবাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই এবং ধনতন্ত্র হলো মানব সমাজের ক্রমবিকাশের সর্বশেষ পর্যায়। গত ১৫০ বছরের ইতিহাসকে নাকচ করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মার্কস ও এঙ্গেলস যে নবদিগন্তের সূচনা করেন তাকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করাই হলো সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসর গণমাধ্যমগুলির মূল লক্ষ্য। সমসাময়িক ঘটনাবর্তকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনাবলী যে নতুন দিকনির্দেশ করেছে তাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য বুর্জোয়াদের ভাড়াটে লেখকরা অবিরাম লেখনি চালনা করে চলেছেন। এঁদের কেউ কেউ ডারউইনের ক্রমবিকাশের তত্ত্বটিকে ভুল বলে চিহ্নিত করেছেন। আবার কিছু লেখক দ্বন্দ্বমূলক তথা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব দুটিকে অসার বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনতিক্রম্য অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্বের জন্যই বুর্জোয়া গণমাধ্যমের এই প্রচণ্ড আক্রমণ ১৯৯১-র ঘটনাপ্লবের পর দুর্বল হতে থাকে। অবিরত অর্থনৈতিক মন্দা ও উত্তরোত্তর তীব্র হওয়া শোষণ শাশ্বত ধনতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্বকে অসার প্রমাণ করেছে। যদিও ধনতন্ত্রের প্রচারকদের ঢাক সমাজতন্ত্রে ‘তথাকথিত মৃত্যু’র পরে সজোরে বেজে চলেছে।
সাম্যবাদী আদর্শের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম আক্রমণ নয়। সাম্যবাদী আন্দোলন তার জন্মলগ্ন থেকেই একের পর এক আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। এ ঘটনা ঘটেছে মার্কস ও এঙ্গেলসের সময়কাল থেকেই। মার্কস ও এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলি শোষণ-নির্ভর ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ফলে বুর্জোয়াদের পক্ষে মার্কস-এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলিকে আক্রমণ করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস তো নিছক তাত্ত্বিক ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের তত্ত্বগুলিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ ও রূপায়িত করার জন্য শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে কাঁধ মিলিয়েছেন। শ্রমিকশ্রেণি যাতে তাদের সংগ্রাম থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তাত্ত্বিক অনুধ্যানের যাতে যথাযথ সমন্বয় সম্ভব হয় তার জন্য এই দুই মহামনীষী জীবনভর সচেষ্ট থেকেছেন। তাঁরা ‘কমিউনিস্ট লিগ’-এর সভ্যপদ গ্রহণ করেন। ‘কমিউনিস্ট লিগ’-এর নামকরণ হয় ‘লিগ অব জাস্ট’-এর দ্বিতীয় কংগ্রেস থেকে। এই সংগঠন বিপ্লবী উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ‘কমিউনিস্ট লিগ’-এর সদস্যদের ভয়াবহ অত্যাচারের ও দমননীতির সম্মুখীন হতে হয়। পরে তাঁরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সঙ্ঘ’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করেন। প্রথমদিকে তাঁরা তাঁদের তত্ত্বগুলিকে সঙ্ঘের সদস্যদের কাছে পুরোপুরিভাবে গ্রহণযোগ্য করতে পারেননি। কিন্তু লক্ষ্যটা ছিল সুস্পষ্ট। সঙ্ঘের ভেতরে তাঁরা বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে, সংস্কারবাদ ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণাটি তখন ইউরোপীয় মহাদেশের অভিজ্ঞতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৮৭১-এর প্যারী কমিউন এই ধারণার সত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। প্যারী কমিউনের পতন হলেও, এর অভিজ্ঞতার আলোকে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরপর বিভিন্ন দেশে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের ওপর প্রচণ্ড নিপীড়ন শুরু হয়ে যায়। তৎসত্ত্বেও মার্কস ও এঙ্গেলস অকম্পিতচিত্তে তাঁদের গবেষণা ও শ্রমিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখেন।
মার্কসের মৃত্যু ও প্রথম আন্তর্জাতিকের পতনের পর এঙ্গেলস আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার স্বার্থে দৃঢ়ভাবে হাল ধরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হন। এক্ষেত্রেও সংগঠনের অভ্যন্তরে তাঁকে সংকীর্ণতাবাদী ও শোধনবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়। কেননা, তিনি শ্রমিক আন্দোলনকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য সচেষ্ট ছিলেন। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে তিনি কুড়িটি দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির এক সম্মেলন আয়োজন করেন।
১৮৯৫ সালে এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর লেনিন আরদ্ধ কাজ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নেন। ইউরোপের শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে আস্থা ও উৎসাহ সঞ্চারে লেনিন বিশেষভাবে সমর্থ হন। রাশিয়ার ঘটনাপ্রবাহের প্রতিও লেনিন অনুক্ষণ নজর রেখে চলছিলেন। মার্কসীয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে লেনিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে তাকে ধনতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা।
এই সময়কালে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়। বিভিন্ন দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী দমন ও নিপীড়নের প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণ সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন এগিয়ে চলে। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (আর এস ডি এলপি) অভ্যন্তরে এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক লেনিন নিরন্তর মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলগুলির বেশির ভাগটাই তাদের নিজ নিজ দেশে ১৯১৪ সালের যুদ্ধ সম্পর্কে বুর্জোয়াদের প্রচেষ্টার সপক্ষে প্রচার চালাচ্ছিল। ফলে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে পড়ে। কিন্তু পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের ধারণাটিও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৩এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে লেনিনের নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়া ও অতিবাম বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হয়। উন্নত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও অনুন্নত অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশ রাশিয়ায় সাফল্যের সঙ্গে বিপ্লব সংগঠিত করার লক্ষ্যে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়। নতুন পথের দিশারী হিসেবে এই বৈপ্লবিক ঘটনা ধনতন্ত্রের মূল ধরে নাড়া দেয়। শুরু হয় ইতিহাসের চাকাকে উলটোদিকে ঘোরানোর সবরকম বুর্জোয়া চক্রান্ত। অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ বা বহির্বিশ্বের ঘেরাটোপ চক্রান্ত কোনোটাই নতুন বৈপ্লবিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে সফল হয়নি। জাত শাসিত রাজ্যগুলির জনগণ এগিয়ে এসে সোভিয়েত গঠন করেন। রাশিয়ায় জাতি নির্বিশেষে সমাজবাদের প্রতি জনগণ দৃঢ় আস্থা জ্ঞাপন করেন। মার্কসবাদী বৈজ্ঞানিক আদর্শের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি এক গভীর গর্ববোধ রাশিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এমনকি বুর্জোয়া গণমাধ্যমে স্বীকৃত বুদ্ধিজীবী লেখক সিডনি ও পিটারস্বার্গ এবং জওহরলাল নেহরুর মতো রাজনীতিবিদও সোভিয়েত ইউনিয়নে গড়ে ওঠা নতুন সমাজকে সাদরে স্বীকৃতি দেন। এর ফলে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের আন্দোলন নতুন প্রেরণা পায়। পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সোভিয়েত ইউনিয়নকে এক অবিচল সংগ্রাম-সাথী হিসেবে আবিষ্কার করে।
অক্টোবর বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশের দেশগুলিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নতুন ধারা শুরু হয়। দুনিয়াব্যাপী শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং উপনিবেশগুলির শোষিত জনগণকে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে শামিল করার লক্ষ্যে লেনিন এক আন্তর্জাতিক সংগঠনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে এই সংগঠনের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। বহু বিপ্লবী ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল এই সম্মেলনে যোগ দেয়। ১৯২০ সালে সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস হয়।
একথা অনস্বীকার্য যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন জারের বন্দিশালা থেকে বহু অত্যাচারিত ও অবদমিত জাতিকে মুক্তির আলো দেখিয়েছে। সমাজবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণি ও জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে রত জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার স্লোগান দেশে দেশে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করে।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রথম ডিক্রি জারি হয় শান্তি ও ভূমির প্রশ্নে। লেনিনের নেতৃত্বে পার্টি বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার জন্য শ্রমিকশ্রেণির পাশে কৃষক সমাজকে শামিল করার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিল। শ্রমিক-কৃষককে ঐক্যবদ্ধ করার ফলে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ ও অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ সামলানো সম্ভবপর হয়।
সম্পূর্ণ নতুন পথে অভিযানের সময়, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র পর্যুদস্ত করতে করতেই সোভিয়েত রাশিয়া শিল্পের উন্নয়ন ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে সুপরিকল্পিত উন্নয়নের পথে সোভিয়েত রাশিয়া জোরকদমে এগিয়ে চলে। এর ফলে ধনতান্ত্রিক দেশের অপরিকল্পিত উন্নয়নের দৈন্য প্রকট হয়ে পড়ে। উন্নততর জীবনধারণের উপাদান ও জনগণের সামাজিক অধিকার সংরক্ষণ প্রশ্নে সোভিয়েত ব্যবস্থার দ্রুত অগ্রগতি দেখা দেয়। ধনতান্ত্রিক দেশগুলির জনগণ এইসব সামাজিক অধিকার ভোগ করতেন না। সত্তর দশকের শেষভাগে এই পরিকল্পনায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। তবে তা অন্য প্রসঙ্গ। সোভিয়েতের সাফল্য এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষের নতুন সংজ্ঞা, নতুন মর্যাদা পৃথিবীর নজর কাড়ে। বহু ধনতান্ত্রিক দেশ হিটলারের রণ-হুস্কারে ভেঙে পড়ে। কিন্তু সোভিয়েতের কাছে হিটলারের বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। এর ফলে পৃথিবীব্যাপী শক্তির ভারসামো এক আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করার বহু সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু নান্য ধরনের বিকৃতি ও বিচ্যুতিই অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়কে ডেকে আনে।
সাম্যবাদী আন্দোলন হলো দুনিয়াব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ও ধনতান্ত্রিক শক্তির আক্রমণকে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করার ইতিহাস। প্রত্যেকটি আক্রমণ কমিউনিস্টদের নিজেদের পথের সঠিকতা সম্পর্কে আরও জোর এনে দিয়েছে, অসাম্যের উৎসে থাকা শোষণব্যবস্থার অবসানে দৃঢ়সংকল্প করেছে। সমাজতন্ত্রের মৃত্যু সম্পর্কে বুর্জোয়া ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করেও প্রারম্ভিক বিহ্বলতা কাটিয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্টরা ঘটনাক্রমের বিশ্লেষণ করে কারণগুলি সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে চাইছে। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি চিহ্নিত করে তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক সত্যতা ও অব্যাহত প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে নতুন করে সুদৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত হতে পেরেছে।
এঙ্গেলসের ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ সমসাময়িককাল পর্যন্ত মার্কসীয় বীক্ষার ক্রমবিকাশের এক অসামান্য দলিল। মার্কসীয় দর্শনের মূল সূত্রগুলিকে সমর্থন করার পাশাপাশি বিজ্ঞানের, বিশেষত প্রকৃতি-বিজ্ঞানের, সমকালীন পর্যায়কে অনুসরণ করে এই আকর গ্রন্থটিতে এঙ্গেলস কতগুলি নতুন ও মৌলিক সূত্রের সন্ধান দেন। ড্যুরিংয়ের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি নিজের ও মার্কসের মতামতকে ব্যক্ত করেন। “দর্শন, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কিত সমস্যাগুলি সম্পর্কে তাঁর নিজের ও মার্কসের ধারণার এক ব্যাপক নিরীক্ষণের” প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এঙ্গেলস। গ্রন্থটির তিনটি ভাগ দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্র বিষয়ক।
দর্শনের মূল প্রশ্নে তিনি একান্তভাবে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে হাজির করেছিলেন। চেতনা হলো মানুষের মস্তিষ্কের ফসল, আর মানুষ হলো প্রকৃতির সৃষ্টি। এই কারণেই চিন্তনবিধির সঙ্গে প্রাকৃতিক বিধির সুসমঞ্জস সম্পর্ক আছে। এঙ্গেলস দেখালেন, চিন্তন। হলো বস্তুজগতের, অস্তিত্বের প্রতিফলন। এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে ড্যুরিংয়ের ধারণাকে খণ্ডন করেন। এঙ্গেলসের মতে বস্তুবিজ্ঞান ও দ্বন্দ্বমূলক বজ্রবাদের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের বিজ্ঞানোর্ধ্ব অবস্থান অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। অন্দ্বিক সম্পর্কের পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিয়ে এঙ্গেলস দন্দ্বমূলক-বস্তুবাদের সঙ্গে অধিবিদ্যাগত চিন্তনের মৌলিক পার্থক্য সুনিশ্চিত করেন। এঙ্গেলস লিখেছিলেন “অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের প্রবক্তাদের কাছে বস্তু ও মনোজগতের প্রতিবর্তন, চিন্তা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। পরস্পরের থেকে পৃথক করে, একের পরে আরেকটিকে বিবেচনা করতে হবে। ফলে অনুসন্ধানের উপাদান স্থির, অনমনীয়, চিরস্থায়ী।” পক্ষান্তরে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বস্তুর প্রতিফলনের মধ্যে গতিশীল ও মর্মগত সম্পর্ক সূত্রেই বিচার করে। জৈব জগতের থেকে অজস্র উদাহরণ নিয়ে এঙ্গেলস তাঁর ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’-এ প্রাকৃতিক জগতের বিকাশের মধ্যে নিহিত দ্বান্দ্বিক চরিত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতে “জীবনও হলো এক দ্বন্দ্ব যা সকল বস্তু ও বিক্রিয়ার মধ্যেই বর্তমান যা ক্রমাগত তৈরি হয় ও অবসান হয়। এই দ্বন্দ্বের অবসানে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, মৃত্যু শুরু হয়।” জৈব অবস্থার সর্বনিম্ন স্তরেও সংবেদনের সূচনা ঘটে। কিন্তু চেতনা, চিন্তা জৈব জীবনের সর্বোচ্চ উন্নত পর্যায়ের ফসল। চিন্তন হলো অত্যন্ত সংগঠিত বস্তু মানবমস্তিষ্কের ফসল।
এঙ্গেলসই প্রথম রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ব্যাপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। রাজনৈতিক অর্থনীতি হলো মানবসমাজের অস্তিত্বের উপাদান সমূহের উৎপাদন ও বিনিময়-নিয়ন্ত্রণকারী সূত্রগুলির বিজ্ঞান। এঙ্গেলস মনে করতেন বুর্জোয়া অর্থনীতির সঠিক সমালোচনার জন্য প্রয়োজন বিশেষ তাত্ত্বিক অনুসন্ধান। প্রাক্-বুর্জোয়া অর্থনীতি বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে সাম্যবাদী সমাজের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সূত্রগুলিকেও পরিস্ফুট করা দরকার। সাম্যবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে “সমাজের সকল সদস্যের অস্তিত্বের উপকরণ ও সামর্থ্যের পূর্ণবিকাশকে অবিরত ও ক্রমবর্ধমান হারে সুনিশ্চিত করতে হবে।”
“পুরনো উৎপাদন ও বিনিময় ব্যবস্থা ও তার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলিই কেবল নতুন উৎপাদন ও বিনিময় ব্যবস্থার প্রথমপর্বে প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করে না, পুরনো কটনের পদ্ধতিও তাকে বাধা দেয়। নতুন ব্যবস্থা পুরানো ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘসময় যুঝেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এঙ্গেলস বলেন যে, মার্কসই প্রথম ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’-এর উৎস আবিষ্কার করেন এবং পুঁজিপতিরা কিভাবে মুনাফা অর্জন করে তা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস সমাজতন্ত্র বিষয়ে তাঁদের গবেষণা শুরু করার আগেও সমাজতন্ত্রের ধারণা প্রচলিত ছিল। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার এই সমস্ত সমালোচনার ভিত্তিতে তাঁরা সমাজতন্ত্রের ধারণাকে আরও বিকশিত করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। পুরনো ব্যাখ্যাকে নস্যাৎ করে এঙ্গেলস বলেন যে, সমাজতন্ত্রের উদ্ভবের বিষয় বস্তুগত বা অবজেকটিভ ও বিষয়গত বা সাবজেকটিভ পূর্বশর্তের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর মতে, বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের তত্ত্ব পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রচিত, উৎপাদনী শক্তিসমূহের সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বের পরিণতিতে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সামাজিক উৎপাদনের সঙ্গে পুঁজিবাদী শোষণের দ্বন্দ্বকে সর্বহারার সঙ্গে বুর্জোয়াদের সংঘাতের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। এঙ্গেলসের মতে, শোষকদের দমন করা ছাড়া, অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়াদের নির্বাসন ব্যতিরেকে শোষণের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়। এঙ্গেলসের মতে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অবসান, শোষণের অবসান, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া সম্ভব নয়। যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাহায্যে “সর্বহারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে সর্বাগ্রে উৎপাদনের উপকরণকে রাষ্ট্র মালিকানার অধীনতায় নিয়ে আসে।”
মার্কস ও এঙ্গেলস যদিও প্রধানত জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শামিল হয়েছিলেন, দুনিয়াব্যাপী ঘটনাপ্রবাহের দিকেও তাঁদের নজর ছিল এবং সে সব থেকেও তাঁরা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এসবের মাধ্যমে এবং তাঁদের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাঁরা তাঁদের পূর্বের সিদ্ধান্তগুলির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিমার্জনও করেন। স্থায়ী বিপ্লব ও কৃষক প্রশ্নের ক্ষেত্রে একথা খুবই প্রাসঙ্গিক। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী। পরবর্তী স্তরে এই মৈত্রী বন্ধনই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে সুনিশ্চিত করতে পারে। উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের স্বার্থে শ্রমিকশ্রেণিকে শোষণ ও জনগণকে লুণ্ঠনের যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। এ কারণে এঙ্গেলস মনে করতেন প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একটা শ্রেণিচরিত্র থাকে। কেননা, রাষ্ট্রব্যবস্থা এক শ্রেণিকে পদানত করে অন্য শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। মানুষ কর্তৃক মানুষকে ও জাতি কর্তৃক জাতিকে শোষণের ব্যবস্থার অবসান করতে হলে প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বুর্জোয়া রাষ্ট্রবাবস্থাকে উৎখাত করা। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্রের আর কোনও ভূমিকাই থাকবে না এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা অবলুপ্ত হবে।
আর এখানেই শ্রমিকশ্রেণির পার্টিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। মতাদর্শ ও সংগঠন ছাড়া শ্রমিকশ্রেণি এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে না। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দিতে পারে। আদর্শে অবিচল রাজনৈতিক দলই শ্রমিকশ্রেণিকে এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে নেতৃত্ব
মার্কস ও এঙ্গেলসের এইসব গুরুত্বপূর্ণ সূত্রায়ন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসের ঘটনাবলীই সূত্রগুলিকে সত্য প্রমাণিত করেছে। সমাজতন্ত্রের সাময়িক বিপর্যয়ের প্রারম্ভিক পর্যায়ে যে উল্লাস ও সন্তুষ্টি লক্ষ্য করা গিয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। কেননা, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও ‘সাম্যবাদের মৃত্যু’ হয়েছে বলে যারা সদম্ভ ঘোষণায় ব্যাপৃত হন পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহ তাঁদের সংশায়ন্বিত করে তোলে। পরবর্তীকালের ঘটনাবলী শ্রমিকশ্রেণির মতাদর্শগত শক্তিকে বৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রারম্ভিক বিহ্বলতা কাটিয়ে শ্রমিকশ্রেণি আন্দোলন সংগঠিত করেছে সেইসব জায়গায় যেখানে শ্রমিকশ্রেণির দলগুলির প্রভাব ক্ষীয়মান বলে মনে হয়েছিল। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে দলগুলি পুনর্বিন্যাস্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। হতাশা ও বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠে কমিউনিস্টরা শ্রমিকশ্রেণির মতাদর্শে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাবর্তন করেছে। আক্রমণকারীরা ফের পিছু হঠতে শুরু করেছে। উত্তর-সমাজতন্ত্র পর্যায়ের দু-তিন বছরেই মানুষ পুঁজিবাদী নির্মম শোষণ ও মানবিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়নের তিক্তস্বরূপ উপলব্ধি করে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করে। শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা আবার এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা উপলব্ধি করেছেন যে সমাজতন্ত্রের বিকৃতি ও বিচ্যুতিগুলিকে সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অতীতে প্রত্যাবর্তন না, নতুনতর, ভিন্ন ভবিষ্যৎকে ত্বরান্বিত করার প্রয়োজন তাঁরা উপলব্ধি করেছেন।
যেসব সমাজতান্ত্রিক দেশ সমাজতন্ত্রের প্রতি আক্রমণকে রুখতে পেরেছে তারাও (সাভিয়েত ও পূর্ব ইউরোপের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আনুগত্য অটুট রেখেও সমসাময়িক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১৯৯১ সালের ঘটনাপ্রবাহের পূর্বে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ এমন পাঁচটি দেশে থাকেন যাঁরা এখনও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অবিচল।
লেনিন বলেছেন, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট প্রয়োগই মার্কসবাদের সজীব মর্মবস্তু। কিন্তু বহু কমিউনিস্ট পার্টি, বিশেষ করে শাসক কমিউনিস্ট পার্টিগুলি, এই মৌলিক নীতিটি বিস্তৃত হয়েছিল। কেউ কেউ এই নীতি থেকে দূরে সরে যায়, আবার কেউ কেউ গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দিয়ে কয়েকটি ধ্যান-ধারণাকেই আঁকড়ে থাকে। এহেন অবস্থান ও কাজ নিঃসন্দেহে অ-মার্কসীয়। দুনিয়াব্যাপী পরিবর্তনের সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টিকে জাগ্রত রেখে প্রতিটি দেশের বাস্তব পরিস্থিতিকে বুঝতে পারলে আন্দোলন আরো এগোতে পারতো। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনী শক্তিসমূহকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদক্ষেপের প্রয়োজন। শোষণের অবসানে ব্যাপকতর গণতান্ত্রিক বাতাবরণ সৃষ্টির বাস্তব পরিস্থিতি দেখা দেয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গভীরতা আসার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের অর্জিত সাফল্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারকে বাস্তবজীবনে আরও অগ্রগতির দিকে নেওয়াই প্রয়োজন।
যাঁরা সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে কেতাবি ধারণা ও বর্জনীয় বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিলেন, তাঁরা এমন ঢোক গিলতে শুরু করেছেন। এমনকি যে সমস্ত দেশে সমাজতন্ত্রের পথ পরিতাক্ত হয়েছিল সেখানেও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুত্থান ঘটেছে। ১৯৯১ সালের পরবর্তী সময়ে নিদারুণ কষ্টকর অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে মানুষ পুঁজিবাদের স্বরূপ চিনতে পারে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও জীবনধারণের অসংখ্য তৃপ্তিদায়ক সুবিধা উপভোগ করার পর মানুষকে ধনতন্ত্রের তিক্ত বটিকা গিলতে হয়। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বীভৎস বাস্তবকে মর্মে মর্মে অনুধাবন করার পর মানুষ আবার সঙ্গবদ্ধ হচ্ছেন। ১৯৯৪ সালের রাশিয়ান দুমা নির্বাচনে এই উদ্যোগের চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কমিউনিস্ট পার্টি অফ রাশিয়ান ফেডারেশন ও তার সঙ্গী অ্যাগ্রারিয়ান পার্টি এইসব নির্বাচনে ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। রাশিয়ার ৮৮টি অঞ্চলের মধ্যে ৭২ টিতে তারা প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। রিপাবলিকগুলির যেসব কমিউনিস্ট পার্টি পূর্বতন সোভিয়েত গঠন করে তারা পুনরায় সঙ্ঘবদ্ধ সংস্থা গড়ে তুলেছে। সমতার ভিত্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পুনর্গঠনের দাবি সোচ্চার হয়েছে। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই(এম)-সহ বিশ্বের ১৫০টি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হয়েছে। পুরনো দিনে ফেরার কথা তারা ভাবছে না এ কথা তাঁরা জোরের সঙ্গে বলছেন। নতুন দল হিসেবে অতীতের বিচ্যুতি ও ভুলগুলিকে তারা সংশোধন করার সংকল্প নিয়েছেন। পূর্ব ইউরোপেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে চলেছে। জনগণ কমিউনিস্টদের প্রতি পুনরায় আস্থা জ্ঞাপন করছেন। হাঙ্গেরির সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ পূর্বতন কমিউনিস্টদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। জার্মানির পূর্বাঞ্চলে যেখানে পুরনো জিডিআর ছিল সেখানে মানুষ নির্বাচনে পিডিএস-র পাশে বিপুলভাবে শামিল হয়েছেন। ইতালি, স্পেন তথা ইউরোপের অন্যান্য অংশেও এই জাতীয় পুনরুভ্যুত্থান শুরু হয়েছে। কানাডা ও আমেরিকার মতো দেশে যেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলন বেশ দুর্বল সেখানকার কমিউনিস্টরাও মতাদর্শের ওপর আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও কমিউনিস্ট আন্দোলনও শক্তিশালী হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী সরকারের পতনের পর কমিউনিস্টরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশীদার হয়েছেন। নেপালের জনগণ কমিউনিস্টদের সরকারি ক্ষমতায় নির্বাচিত করেছেন। অনুরূপভাবে লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন জোরদার হচ্ছে।
এইসব ঘটনাবলী একথাই প্রমাণ করে যে, কমিউনিস্ট আন্দোলন ও শ্রমিকশ্রেণির মতাদর্শের তথাকথিত ‘মৃত্যু’র পরিবর্তে অগ্রগতিই লক্ষণীয়ভাবে অব্যাহত।
সাম্রাজ্যবাদী গণমাধ্যম ও তার দোসরদের দ্বারা বহুল প্রচারিত সদর্প ঘোষণা আজ স্তিমিতপ্রায়, শতচ্ছিন্ন। সময়ের সরণিতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ ভাস্বর হয়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ প্রণয়নে এঙ্গেলসের অবদান অবিস্মণীয়। এই মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা অটুট থাকবে।
@NBA
@freemang2001gmail-com



