মহান নভেম্বর বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের প্রতিটি দেশের সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের উপর নভেম্বর বিপ্লবের প্রভাব সুদূর প্রসারী, সর্বস্তরের মানুষ অবাক বিস্ময়ে এই প্রথম এক নতুন সমাজব্যবস্থা, সম্পূর্ণ শোষণহীন ব্যবস্থা দেখেছেন এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ নিজ দেশে সংগঠিত হয়েছেন ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনে ও কমিউনিস্ট পার্টিতে। নভেম্বর বিপ্লবের প্রভাবে আমাদের দেশেও গড়ে উঠেছিল ট্রেড ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। আমার ওপরও বিরাট প্রভাব পড়েছিল এই বিপ্লবের।
বিপ্লবজাত সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্য, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতি, নারী স্বাধীনতার স্বীকৃতি, শ্রমিকদের অধিকারের প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি, সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা পদানত ও ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা ও বাড়বাড়ন্ত, এসবই ছিল বিপ্লবের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া। দুনিয়া দখলের লক্ষ্যে ফ্যাসিস্ট হিটলার, মুসোলিনির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যখন পুঁজিবাদী দেশগুলি একের পর এক আত্মসমর্পণ করছে, সে সময় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের কালজয়ী প্রতিরোধ বিশ্ব মানবসমাজ ও সভ্যতা রক্ষা করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের লালফৌজের সাহায্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে সামিল পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করে দেশগুলি সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিল। ১৯৪৯ সালে সফল হয় চীন বিপ্লব। ১৯৪৫ সালে ভিয়েতনামের উত্তর অংশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে গণতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা হয় ও সমাজতান্ত্রিক উত্তর ভিয়েতনাম গড়ে ওঠে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের জনগণের তীব্র ও তীক্ষ্ণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত হয়। দুই ভিয়েতনামের একীন প ও সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামে রূপান্তরিত হয়। উত্তর কোরিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে চলা, ১৯৫৯ সালে ল্যাতিন আমেরিকার বুকে সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক কিউবা গড়ে শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক শিবিরের প্রতিষ্ঠা, বিশ্বের মানুষকে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধী সংগ্রামে এগিয়ে নিয়ে যায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে পাল্লা দেওয়া এবং কিউবা সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদবিরোধী দুর্গ হিসাবে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে।
নভেম্বর বিপ্লব, অতুলনীয় সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্য চালানো বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষের ওপর থেকে শোষণ, বঞ্চনার অবসান ও দাসত্বের অবসান ঘটিয়েছিল এবং এর পাশাপাশি ঔপনিবেশিকতামুক্ত সদ্য স্বাধীন উন্নয়নশীল দেশগুলি “সমাজকল্যাণকর” ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
(২) সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ত্রুটি, বিচ্যুতি, শাসক কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শহীনতা, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মতাদর্শ থেকে বিচ্যুতি, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটিয়েছে। এরদ্বারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদী মতাদর্শের অসাড়তা প্রমাণ করে না; বরং ঐ বৈজ্ঞানিক মতবাদের অভ্রান্ততা ও প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা আজকের দিনে আমাদের কর্তব্য। অতএব, নভেম্বর বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে এবং নিজ দেশের মাটিতে তার বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োগের জন্য আমি ১ বছরে ১২টি প্রবন্ধ লিখেছি। এন বি এ ঐগুলি নিয়ে একটা সংকলন প্রকাশ করছে।
রুশ দেশে জার আমলে পুরোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যা মহান নভেম্বর বিপ্লব নামে এখনও সুপরিচিত। এখনকার হিসাবে সেটি আমরা নভেম্বর বিপ্লব হিসাবে পালন করে থাকি। ১৯১৭ সালের ৭ থেকে ১৭ নভেম্বর দুনিয়া কাঁপানো দশদিনে যুগান্তকারী এই বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। তার একশো বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দীপক দাশগুপ্তের লেখা এ বিষয়ে বারোটি প্রবন্ধের এক সংকলন ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রকাশ করছে। আমাকে তার মুখবন্ধ লিখতে বলা হয়েছে। পার্টি ও বিভিন্ন গণসংগঠনের পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধকার হিসেবে দীপক দাশগুপ্তের নতুন করে আর পরিচয় করিয়ে দেবার প্রশ্ন ওঠে না। আমাদের বোঝাপড়ার পরিধির মধ্যে তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ লেখকের রচনা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কারণ পুস্তক পর্যালোচনার দায়িত্ব ভূমিকা লেখকের নয়।
সংকলনের শুরু হয়েছে ‘প্যারি কমিউন থেকে নভেম্বর বিপ্লব’ প্রবন্ধটি দিয়ে যেখানে প্যারি কমিউনে প্রতিষ্ঠা থেকে একুশ শতকে সমাজতন্ত্রে সম্পর্কে আজকের দৃষ্টিভঙ্গি ১৪৬ বছরের পথ পরিক্রমার ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। এই সংকলনের প্রবন্ধগুলিতে নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা, বিপ্লবী পরিস্থিতি ও বিপ্লবী পার্টি বিপ্লবের এই দুই অত্যাবশ্যক প্রাক-শর্ত নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যার পাশাপাশি আজকের দিনে তার প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি বার বার ফিরে এসেছে। এসেছে বিপ্লবোত্তর সমাজতন্ত্রের নির্মাণ ও সাফল্য, সারা বিশ্বে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব, সমাজতন্ত্র নির্মাণে গুরুতর ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে চিহ্নিত করার প্রয়াস ও এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলার পথ অনুসন্ধানের প্রসঙ্গ।
লেখক কেবল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদসা নন, তিনি শ্রমিক আন্দোলনের একজন প্রবীণ নেতা যিনি রাজ্যে ও দেশে এই কাজে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। স্বাভাবিকভাবে বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণি, শ্রমিক আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক ঐক্য ইত্যাদির পাশাপাশি শ্রেণি, শ্রেণি স্বার্থ, শ্রেণি ঐক্য ও শ্রেণিসংগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখানে আলোচিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জাতিগুলির মহান মিলন ক্ষেত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতে জাতি সমস্যার সমাধানের দিশা দেখানোর বিশ্লেষণাত্মক প্রয়াস ঠিক এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মহান নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্যাপন ও শ্রমিক আন্দোলন
নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা ও এর প্রাসঙ্গিকতা
লেনিনবাদ ও নভেম্বর বিপ্লব
প্যারি কমিউন থেকে নভেম্বর বিপ্লব
এ ঊনবিংশ শতকের শুরুতে বিপ্লবের দেশে (ফ্রান্সে) সাফল্যজনকভাবে প্রথম শ্রমিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু আশেপাশের সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলির ব্যাপক সশস্ত্র আক্রমণের মধ্য দিয়ে মাত্র ৭২ দিনের মাথায় খ্যাতিসম্পন্ন প্যারি কমিউন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বুর্জোয়াদের সশস্ত্র আক্রমণের দ্বারা হাজার হাজার বীর কমিউনার্ড শহিদের মৃত্যু বরণ করেছিলেন। কমিউন ধ্বংস হওয়ার পর মার্কস বলেছিলেন: “কমিউনের আদর্শ চিরভাস্বর।” যদিও কমিউন সম্পর্কে প্রথম দিকে মার্কস ও এঙ্গেলসের সম্মতি ছিল না।
প্যারি কমিউনের প্রতিষ্ঠা হলো
১৮৭১ সালের ১৮ মার্চের প্রত্যুষে ‘Viva la Commune’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কার্ল মার্কস বলেছেন: “১৮ মার্চের প্রত্যুষে ‘Viva la Commune’-এর বজ্রনির্ঘোষে প্যারিস জেগে উঠল। কী জিনিস এই কমিউন, বুর্জোয়াদের কাছে যা এত অস্বস্তিকর প্রহেলিকা?” কেন্দ্রীয় কমিটি ১৮ মার্চের ইশতাহারে ঘোষণা করেছিল, “প্যারিসের প্রলেতারীয়রা শাসক শ্রেণিগুলির ব্যর্থতা ও বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে উপলব্ধি করেছে যে, জনজীবনের কার্যকলাপ পরিচালনভার নিজেদের হাতে গ্রহণ করে পরিস্থিতি রক্ষা করার মুহূর্তটি সমাগত…. তারা বুঝেছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে ওঠা তাদের অবশ্য কর্তব্য ও পরম অধিকার।”
প্যারি কমিউন সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে কার্ল মার্কস দেখিয়েছেন যে “কমিউন হলো সাম্রাজ্যের সাক্ষাৎ বিপরীত”। কমিউন ছিল শ্রমিকদের প্রথম রাষ্ট্র। মার্কস বলেছেন: “কমিউন শ্রেণি শাসনের রাজতন্ত্রী রূপটিকে শুধু অপসারিত করবে না, খাস শ্রেণি শাসনকেই দূর করবে। কমিউন ছিল সেই প্রজাতন্ত্রেরই একটি নির্দিষ্ট রূপ।”
৭২ দিনের মধ্যে কমিউনের জনকল্যাণকর কর্মসূচি
(১) কমিউনের প্রথম ঘোষণা ছিল স্থায়ী সৈন্যদলের অবলুপ্তি, তার স্থানে সশস্ত্র জনগণের প্রতিষ্ঠা।
(২) সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে শহরে বিভিন্ন পল্লি থেকে নির্বাচিত নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে দায়িত্বশীল ও স্বল্পমেয়াদে প্রত্যাহারযোগ্য পৌর প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিউন গঠিত হয়েছিল।
(৩) কমিউন ছিল না এক পার্লামেন্টীয় সংস্থা।
(৪) কমিউন হয়ে উঠল শ্রমিক ও শ্রমিকশ্রেণির আস্থাভাজন এক সংস্থা এবং এটি একটি কাজের সংস্থা ও কার্যনির্বাহক ও আইন-প্রণয়নী সংস্থা।
(৫) পুলিশকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতিয়ার হিসাবে না রেখে, তার রাজনৈতিক প্রকৃতির সবটাকে অবিলম্বে ঘুচিয়ে দিয়ে, তাকে রূপান্তরিত করা হলো কমিউনের কাছে দায়বদ্ধ ও যে-কোনো সময় প্রত্যাহারযোগ্য সংস্থা রূপে।
(৬) প্রশসনের সমস্ত শাখার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা হয়।
(৭) কমিউনের সদস্য থেকে শুরু করে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই সরকারি কাজ চালাতে হলো শ্রমজীবীদের মজুরিতে এবং রাষ্ট্রের বড়ো বড়ো হোমরা-চোমরাদের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিশেষ সুবিধা ও প্রাপ্য ভাতাও হলো বিলুপ্ত।
(৮) কেবলমাত্র পৌরশাসন নয়, এযাবৎ রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত সমস্ত উদ্যোগই অর্পিত হলো কমিউনের হাতে।
কার্ল মার্কস তাঁর ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে: “কমিউন সম্পর্কে কাল্পনিক কোনো আশা তাদের ছিল না।” “কমিউন কোনো ভোজবাজি তাদের উপহার দেবে না, এটা তাদের জানা ছিল।” তাদের একথা জানা ছিল যে, “নিজেদের মুক্তি অর্জনের জন্য এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় অর্থনৈতিক শক্তির ক্রিয়ায় বর্তমান সমাজের অমোঘ প্রবণতা যে দিকে সেই উচ্চতর রূপ অর্জনের জন্য তাদের যেতে হবে সুদীর্ঘ সংগ্রামের ভিতর দিয়ে, একসারি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যা পরিস্থিতি ও মানুষকে একেবারে রূপান্তরিত করবে।” পরে মার্কস আরও বলেছেন যে “প্যারিস কমিউন যখন নিজ হস্তে বিপ্লব পরিচালনার ভার তুলে নিল, যখন সাধারণ শ্রমিকেরা প্রথম তাদের স্বাভাবিক ঊর্ধ্বতনদের সরকারি বিশেষ অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করতে সাহস পেল এবং অদৃষ্টপূর্ব সুকঠিন অবস্থার মধ্যেও বিনয়, বিবেক ও দক্ষতার সঙ্গে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে লাগল। এমন বেতনে, যার সর্বোচ্চ হারও জনৈক বড়ো বিজ্ঞানীর মতো… কোনো একটা মেট্রোপলিটান স্কুল বোর্ড সেক্রেটারির ন্যূনতম প্রয়োজনেরও পাঁচ ভাগের এক ভাগ…. তখন শ্রমিকশ্রেণির প্রজাতন্ত্রের প্রতীক লাল পতাকাকে টাউন হলের শীর্ষে উড্ডীন দেখে প্রাচীন পৃথিবী রোষে ফুঁসছিল।”
৭২ দিনের মাথায় কমিউন ধ্বংস হলো ভার্সাইয়ের কমিউন-বিরোধী সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক আক্রমণের কারণে। ২০ মে থেকে ভার্সাইবাহিনী ব্যাপক ও নিরন্তর আক্রমণ চালানোর ফলে। সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়াশ্রেণির ভাড়াটেদের দিয়ে রক্তাক্ত আক্রমণে কয়েক হাজার কমিউনার্ড শহিদের মৃত্যু বরণ করলেন। বহু কমিউনার্ড পালিয়ে বেঁচেছিলেন। কমিউন ধ্বংস হওয়ার পর মার্কস লিখেছিলেন যে “কমিউন সমেত শ্রমিকশ্রেণির প্যারিস চিরদিন এক নতুন সমাজের গৌরবদীপ্ত অগ্রদূত হিসাবে বন্দিত হবে। শ্রমিকশ্রেণির বিশাল হৃদয়ে তার শহিদরা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইতিহাস তাদের জল্লাদদের ইতিমধ্যেই সেই শাস্তিমঞ্চে দন্ডিত করেছে, যেখান থেকে তাদের পুরোহিতদের প্রার্থনাতেও তাদের নিষ্কৃতি মিলবে না।” প্যারি কমিউনে লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে মার্কস কমিউনিস্ট ইশতাহারের ১৮৭২-এর জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, কমিউন প্রমাণ করছে যে: “তৈরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিলেই শ্রমিকশ্রেণি তা কাজে লাগাতে পারে না।”
**প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কমরেড কার্ল মার্কস ৬ মাস আগেই প্যারির শ্রমিক অভ্যুত্থান না করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে “বিদ্রোহ করাটা সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হবে না।” তিনিই ১৮৭১-এর এপ্রিলে প্যারিসের গণ-অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তিনি আরও বলেছিলেন: “এই বীরত্বের ইতিহাস অতুলনীয়।”
ফ্রেডরিক এঙ্গেলস প্যারি কমিউনকে বলেছিলেন “প্যারি কমিউন হলো সর্বহারাশ্রেণির একনায়কতন্ত্রের রূপ।”
কমরেড লেনিন বলেছিলেন, “সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্বের প্রথম স্তর হলো প্যারি কমিউন; দ্বিতীয় স্তর হলো নভেম্বর বিপ্লবজাত সোভিয়েত ইউনিয়ন।” লেনিনের দৃষ্টিতে কমিউনের ও সমাজবিপ্লবের লক্ষ্য এক। লেনিন মহান নভেম্বর বিপ্লবের আগে কমিউনের অভিজ্ঞতা বারবার নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
কমিউন সম্পর্কে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ/সমালোচনা
কার্ল মার্কস ১৮৮১-তে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন: “কমিউনের বেশির ভাগটা সমাজতান্ত্রিক ছিল না, হওয়া সম্ভবও ছিল না।” এঙ্গেলস লিখেছেন: “কমিউন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে জনগণের সশস্ত্র শক্তিকে যথাযথ বাবহার করতে পারেনি।”
কমরেড লেনিন বলেছিলেন: ১৮৭১-এর মহান সড়াকুদের কাছ থেকে আমরা শুধুমাত্র কমিউন শব্দটা গ্রহণ করব না। আমরা তাদের স্লোগানগুলি হুবহু বেছে নেব না। আমরা সেই কর্মসূচির প্রয়োগ সংক্রান্ত দিকগুলো বেছে নেব, যেগুলির রাশিয়ার সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে।”
কিন্তু, কমিউনের মতাদর্শগত বিষয় ছিল প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রশ্নে দায়বদ্ধতা ছাড়া আর কোনো সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম ছিল না। ক্রমান্বয়ে কমিউন পরাজয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। যারা প্রথমে কমিউনের পক্ষে এসেছিল তারা অনেকে কমিউনের পাশ থেকে গরে যাচ্ছিলেন, শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল শ্রমিকশ্রেণি। কিন্তু, অবশেষে ভার্সাই, জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদের অভূতপূর্ব নৃশংস আক্রমণের সামনে কমিউন ধ্বংস হলো।
প্যারী কমিউন (ফরাসি: Commune de Paris) ছিল ১871 সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত প্যারিস শহরে প্রতিষ্ঠিত একটি বিপ্লবী সরকার। এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির দ্বারা গঠিত একটি বিপ্লবী সরকার যা ৭৩ দিন টিকে ছিল।
প্যারী কমিউন ছিল একটি বিপ্লবী সরকার, যা ১৮ মার্চ, ১৮৭১ সালে প্যারিসের শ্রমিক শ্রেণির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ২৮ মে, ১৮৭১ পর্যন্ত টিকে ছিল। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে, প্যারী কমিউন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে: চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ, বেতন হ্রাসের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য ন্যায়বিচার, শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, কারিগরদের জন্য সমবায় প্রতিষ্ঠা.
প্যারী কমিউন সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি শ্রমিক শ্রেণির দ্বারা একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের প্রথম উদাহরণগুলির মধ্যে একটি ছিল। যদিও এটি খুব অল্প সময়ের জন্য টিকে ছিল, এটি বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
প্যারী কমিউনের পতনের পর, ফরাসি সরকার এটিকে কঠোরভাবে দমন করে। বহু বিপ্লবী নেতা ও কর্মীকে হত্যা করা হয় এবং অনেকে দেশত্যাগে বাধ্য হন।
প্যারী কমিউন সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- এটি ফরাসি বিপ্লবের একটি অংশ ছিল।
- এটি শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির একটি প্রতীক ছিল।
- এটি সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।
- প্যারী কমিউনের পতনের পর, এটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছে।
–চলবে–




