Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

প্রতীক নয়, বিরসা মুন্ডা এক জীবন্ত দর্শন।-কুমার রাণা

আজ যখন উন্নয়নের নামে বন উজাড় হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে— তখন বিরসার কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়: “যে-সমাজ প্রকৃতিকে ভুলে যায়, সে-সমাজ নিজেকে ধ্বংস করে।” এখানে কোথাও আমরা শুনতে পাই— যাঁর রচনার সঙ্গে বিরসার পরিচয় না-থাকা— কার্ল মার্কসের কথার প্রতিধ্বনি: কেউই এ-পৃথিবীর মালিক নয়, আমরা অছি মাত্র। তাই বিরসাকে  ‘প্রতীক’ বানিয়ে, পুঁজির নেতৃত্বে এবং আগ্রাসনে তাঁর ভাবনাকে অকার্যকর করার যে-দুষ্কর্ম চলছে তাকে উদ্ঘাটিত ও প্রতিহত করাটা আজকের সুস্থ রাজনীতির অন্যতম প্রধান কর্মসূচি।

Powered by Translate

Not A Symbol, Birsa Munda A Living Philosophy

জীবনের দৈর্ঘ্য মাত্র পঁচিশ বছর। জীবনের প্রসার অপরিমেয়। যে মুন্ডা লোকসমূহে তাঁর জন্ম, যে ভূখণ্ডের তিনি অধিবাসী, যে প্রতিরোধ সংগ্রামের তিনি নেতা, সে-সব ছাড়িয়ে তাঁর নাম বিস্তৃত হয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। আদিবাসী লোকসমূহের কাছে ‘ধরতি আবা’ বিরসা মুন্ডা নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধের প্রতীক। ‘ধরতি আবা’, আক্ষরিক অনুবাদে, পৃথিবীর পিতা, প্রকৃতপক্ষে এক আশ্চর্যরকমের প্রশস্ত শব্দব্যবহার: প্রকৃতি ও ভূমির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের দ্যোতক—একটি প্রাথমিক পরিবেশ-চেতনার প্রতীক। আবার, শাসকদের কাছে তাঁর নামটাই একটাই শীলমোহর। তাঁর জন্মভূমি বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের শহরে শহরে তো বটেই, তাঁর নাম ও মূর্তি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত। সংসদ ভবনে তাঁর প্রতিকৃতি, ১৫ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন ‘জনজাতীয় গৌরব দিবস’, ওই দিনটা আবার ঝাড়খণ্ড রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবসও।  শাসক দলগুলো তাঁকে ব্যবহার করে চলেছে, প্রধানত আদিবাসী লোকসমূহের কাছে নিজেদের অপশাসনকে বৈধ করে তুলতে। তাঁকে জনজাতীয় নায়ক হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি, তারা সেই কুকর্মগুলো চালিয়ে যায়, যেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে বিরসা জননায়ক ও শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর সংগ্রামের মূলে ছিল— ভূমি ও অরণ্যের ওপর জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতিগত স্বাধীনতা, এবং এমন এক নৈতিক-পরিবেশমুখী সমাজব্যবস্থা যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা বা সংখ্যাগুরু ধর্মীয় রাজনীতির বাইরে। এই পরিসরে বিরসার দার্শনিক চিন্তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমরা সংক্ষেপে কিছু কথা বলব।

এক 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ শাসনের ভূমি নীতি ছোটনাগপুরের সাবেক সামূহিক ভূমি-ব্যবস্থাকে বদলে দিয়ে ভূমিকে করে তোলে মালিকী সম্পত্তি। উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা। এ অঞ্চলে ভূমি-ব্যবস্থাকে বলা হত ‘খুঁটকাঠি’, যা ছিল প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের সামষ্টিক ভূমি সংস্কৃতির প্রতীক। ব্রিটিশ শাসনে এই সামূহিক ভূমি-ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে; মহাজন ও বাইরে থেকে আসা লোকেরা জমির মালিক হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থার ওপর আঘাত আদিবাসীদের বস্তুগত জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলার পাশাপাশি মানুষে মানুষে এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটিকেও ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। যে-অরণ্য আগে আদিবাসীদের লৌকিক নিয়মে স্বাধীন এক সত্তা হিসেবে গণ্য হত, লোকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী তা থেকে জীবনযাপনের রসদ যোগাড় করতেন, কিন্তু কখনোই তাকে কারও সম্পত্তি বলে মনে করতেন না, ঔপনিবেশিক আইনে তাকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হল। একদিকে শিকার, জঙ্গলে অ-স্থায়ী চাষবাস, কাঠ জোগাড়—সবই অপরাধ বলে গণ্য হতে থাকে, অন্যদিকে সরকার ও তার দেশীয় সাঙাতরা লক্ষ লক্ষ একর বনভূমি লুঠ করে রাজস্ব ও ব্যক্তিগত পুঁজি ফাঁপিয়ে তোলে। আদিবাসীরা লোকসমূহ, অরণ্য, মৃত্তিকা, পশু-পক্ষী, নদী, জলস্রোত, সমস্তই পুঁজির আগ্রাসনের বলি হয়। (এ-প্রসঙ্গে আমি অন্যত্র কিছুটা বিস্তারে বলবার চেষ্টা করেছি। দ্রষ্টব্য, প্রশ্নের লোককথা (কলকাতা: আর বি ই বুকস, ২০২২) বইতে ‘আদিবাসী ভারত’ প্রবন্ধ, এবং এতে উল্লিখিত সূত্র।) 

এই-রকম এক পরিস্থিতিতে বর্তমান খুঁটি জেলার চালখাঁদ গ্রামের এক মুন্ডা পরিবারে বিরসার জন্ম। পারিবারিক দারিদ্র এবং সুযোগ বঞ্চনা সত্ত্বেও তিনি কিছুটা স্কুলশিক্ষা অর্জন করতে পারেন– চাইবাসার খ্রিস্টান স্কুলে। শিক্ষা অর্জনের প্রক্রিয়াতে খ্রিস্টানদের সঙ্গে, এবং তার পরে বৈষ্ণবদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। শৈশব থেকেই তাঁর জানার ইচ্ছা ছিল প্রবল। সেই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মেশার এবং তাঁদের আকৃষ্ট করার গুণ তাঁর মধ্যে ছিল। জানার ইচ্ছা থেকে তাঁর মধ্যে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। আবার ধর্মীয় নানা বিষয় নিয়েও তাঁর মনে সন্দেহ জাগে। সেই সন্দেহ থেকে তিনি খ্রিষ্টধর্ম ও উচ্চবর্ণীয় হিন্দু প্রথা— দুই-ই প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন ধর্মীয় আন্দোলন সৃষ্টি করেন, যা বিরাসাইত নামে খ্যাত হয়। এই আন্দোলন ছিল এক আদিবাসী ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, যাকে প্রায়ই বিভ্রান্তিকরভাবে ‘হিন্দুকরণ’ বা ‘ধর্মান্তর’ বলে দেখা হয়।

আর, সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে তিনি ১৮৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি মুন্ডা, ওরাঁও ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মশাসন, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের বার্তা দিতে শুরু করেন। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান ছিল, “আবুয়া দিশুম, আবুয়া রাজ– আমাদের দেশ, আমাদের শাসন”। বিরসার সেই ঘোষণা আজ ঝাড়খণ্ড সরকারের বিভিন্ন প্রচারে বড়ো আকারে জায়গা পেয়েছে, কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে উঠতে পারেনি। বরং, সেই ঘোষণাটি গ্রহণ করে, বর্তমান শাসকরা বিরসার মর্মবস্তুকেই পরিত্যাগ করেছে।

১৮৯৯–১৯০০ সালে বিরসা ব্রিটিশ ও তার স্থানীয় স্যাঙাতদের বিরুদ্ধে যে-প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, উলগুলান নামে খ্যাত সেই প্রতিরোধ কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহই ছিল না; এটি ছিল সামাজিক সংস্কার ও লৌকিক পুনর্জাগরণের মিশ্র রূপ। গ্রামবাসীরা কর দিতে অস্বীকার করেন, নিজেদের জমি পুনর্দখল করেন এবং বিরসার নেতৃত্বে একত্রিত হন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী আন্দোলন দমন করে; বিরসাকে গ্রেপ্তার করে রাঁচি জেলে পাঠানো হয়, যেখানে ১৯০০ সালের ৯ জুন, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে, তিনি রহস্যজনকভাবে মারা যান। (বিশদ জানতে, কুমার সুরেশ সিং-এর প্রামাণ্য বই, বিরসা মুন্ডা অ্যান্ড দ্য বিরসাইত মুভমেন্ট ইন ছোটনাগপুর: ১৮৭৪-১৯০১, কলকাতা: সিগাল, ১৯৮৪, দ্রষ্টব্য)। তাঁর অকালমৃত্যু তাঁকে শুধু শহিদের মর্যাদাই দেয় না, তাবৎ আদিবাসীদের মধ্যে তাঁর এক ঐশ্বরিক রূপ গড়ে দেয়। সে এমন এক ঈশ্বর যেখানে যে-কোনও অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াইতে আদিবাসী ব্যক্তিমানুষেরা নিজেদের বিরসার সঙ্গে অভিন্ন করে তোলে। (বিরসা মুন্ডা, কলকাতা: গাঙচিল, ২০১২ পুস্তিকাটা লিখবার সময় আমি এই দিকটার ওপর নির্ভর করেছিলাম)। 

যদিও আন্দোলনটি স্বল্পস্থায়ী ছিল, তবু এর সুবাদেই ১৯০৮ সালের ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট প্রণীত হয়, যা আদিবাসী ভূমি বিক্রি বা হস্তান্তরের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ঠিক যেমনভাবে ১৮৫৫ সালে দামিন-ই-কো এলাকায় সিধু-কানুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র সংগ্রাম হুল-এর সুবাদে গড়ে ওঠে সাঁওতাল পরগনা টেনান্সি অ্যাক্ট। 

বিরসা মুন্ডার চিন্তায় চারটি মূল বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়: (ক) ভূমি পবিত্র, যৌথ ও অ-বিক্রেয় সম্পদ; (খ) নিজের লৌকিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ; (গ) কুসংস্কার, মদ্যপান ও বিভেদের বিরোধিতা; এবং (ঘ) নৈতিক পরিবেশ চেতনা– মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সঙ্গতির ধারণা। বিরসার চিন্তাগুলো এক সমন্বিত সমাজ-পরিকল্পনার কথা বলে— যেখানে রাজনীতি নয়, সমাজ ও প্রকৃতি মূল কেন্দ্র। আজকের বৈশ্বিক বিপন্নতার কালে, যখন এই পৃথিবীর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রগাঢ় হচ্ছে, তখন, বিরসার এই চিন্তাগুলো থেকে আমরা প্রতিরোধের অনেক রসদ পেতে পারি।    

দুই

বিরসার সংগ্রামকে আজকের সময়ে নতুন করে দেখা দরকার, কারণ তাঁর আদর্শ সরাসরি জড়িত ভূমি, অরণ্য ও জীবিকার অধিকারের সঙ্গে। আজও ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও পূর্ব ভারতের বহু আদিবাসী এলাকা কর্পোরেট খনন, শিল্প প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের কারণে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে। এই বাস্তবতা বিরসার যুগের ব্রিটিশ জমিদার ও দিকুদের আধুনিক রূপের মতোই। লোকে বলে, বিরসার ঘোষণা ছিল, আমাদের জমি আমাদের মা। একে বিক্রি করা মানে নিজের আত্মাকে বিক্রি করা। বাস্তবিকই বিরসা এই উক্তিটি করেছিলেন কি না তার নথিভুক্ত প্রমাণ নেই। হতে পারে লোকেরা মুখে মুখে এই উক্তি রচনা করে নিয়েছে। সেটাই বিরসার সার্থকতা: তিনি যে-ভাবে ভেবেছিলেন, সেই ভাবনা তিনি লোকসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। সে-কারণেই আজকের বিভিন্ন অরণ্য ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে আদিবাসীদের এত অগ্রগামী ভূমিকা। বিরসা যে-প্রাকৃতিক ন্যায়বোধের কথা বলেছিলেন, তা আজকের জলবায়ু পরিবর্তন-সংকটের মধ্যে নতুন অর্থ পেয়েছে। (দ্রষ্টব্য, ভগ্নসন্ধি সময়ের ভাবনা (কলকাতা: অনুষ্টুপ, ২০২৪) বইতে, ‘খাণ্ডবদহনের সর্বনাশ থেকে বাঁচার পথ’ প্রবন্ধ, এবং এতে উল্লিখিত সূত্র) 

আগেই যেমন বলেছি, বিরসা মুন্ডা শুধু জমির লড়াই করেননি; তিনি আদিবাসী সমাজের দার্শনিক-সাংস্কৃতিক মর্যাদার সংগ্রামকে বিকশিত রূপ দিয়েছিলেন। সেই সংগ্রাম ছিল শাসকীয়তার বিরুদ্ধে লোকসমূহের মধ্যে প্রবাহিত জীবনের এক প্রশস্ত ধারণা। সেই দ্বন্দ্ব আজ যেন আরও প্রকট হয়েছে: ইংরেজ নেই, তথাকথিত স্ব-দেশীয়দের শাসন আদিবাসী দর্শনকে সরিয়ে দিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করেছে। তাই, আদিবাসী ভাষা, নৃত্য, সংগীত, পোশাককে ‘লোকসংস্কৃতি’ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়, কিন্তু সেই সংস্কৃতির জীবন্ত রাজনৈতিক অর্থকে আড়াল করা হয়। যেমন সরকারি অনুষ্ঠানে ‘আদিবাসী নৃত্য’ পরিবেশন করা হলেও, আদিবাসী ভাষা ও শিক্ষার জন্য বাজেট কমানো হয়। দর্শন থেকে সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্ন করে দুটোকেই বিপর্যস্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা যায় সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ। অর্থাৎ, সংস্কৃতিকে সাজিয়ে রাখা হয়, কিন্তু তার অর্থ ও শক্তি কেড়ে নেওয়া হয়। বিরসার মূল বার্তা ছিল— নিজের সংস্কৃতি মানে নিজের নিয়ন্ত্রণের অধিকার। 

বিরসা নিজের ধর্ম তৈরি করেছিলেন— যা না-হিন্দু, না-খ্রিস্টান, বরং একটি আদিবাসী লৌকিক পুনর্জাগরণ। আজকের ভারতে ধর্ম নিয়ে যে-মেরুকরণ চলছে, তাতে বিরসার এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কোনও বহিরাগত ধর্মকে ঘৃণা করে প্রত্যাখ্যান করেননি, তাঁর প্রত্যাখান ছিল একান্তই আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়ের কারণে। তাঁর ধর্মে ‘এক ঈশ্বর’-এর ধারণা ছিল, কিন্তু সেই ঈশ্বর ভূমি, বৃক্ষ ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত; এটি এক ধরনের পরিবেশমুখী একেশ্বরবাদ। অপরদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান, ইসলাম, ইত্যাদির মধ্যে তিনি দেখেছিলেন বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষকে আলাদা করে রাখার, ঈশ্বরকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে দেখার বৈশিষ্ট্য। তাঁর দর্শনে, ঈশ্বর, মানুষ, পাহাড়, নদী– সকলের সমান যোগদান, কেউ সর্বশ্রেষ্ঠ নয়। আজও তাঁর ভাবধারা আমাদের শেখায়—ধর্মের আসল উদ্দেশ্য হল মানুষের মর্যাদা, মানুষের প্রাকৃতিক অস্তিত্ব ভারসাম্য রক্ষা, বিভাজন নয়। 

তিন

বহু সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, ২০০০ সালে যখন ঝাড়খণ্ড আলাদা গঠিত হয়, বিরসা মুন্ডাকে রাজ্যের প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম, ডাকটিকিট— সব তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যায়— বিরসার নাম ব্যবহার হচ্ছে রাজনীতি ও ক্ষমতার অলংকার হিসেবে। ‘বিরসা মুন্ডা স্মারক উদ্যান’ তৈরি হলেও, সেই অঞ্চলের আদিবাসীরা প্রায়ই জমি হারাচ্ছে নতুন শিল্প প্রকল্পে। এই দ্বৈততা বোঝায়—বিরসাকে প্রতীক বানিয়ে, তাঁর দর্শনকে আড়াল করা হচ্ছে। তিনি ছিলেন জমি ও স্বাধীনতার যোদ্ধা; অথচ আজ তাঁর নাম ব্যবহৃত হচ্ছে এমন নীতির প্রচারে, যা উচ্ছেদ ও বননাশ ঘটায়।

রাজনৈতিক বক্তৃতায় বিরসাকে প্রায়ই ‘জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে তিনি অবশ্যই সম্মানিত হন, কিন্তু তাঁর জনজাতীয় পরিচয় মুছে যায়। বিরসা কোনও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের জন্য লড়েননি; তিনি লড়েছিলেন এমন এক দেশের জন্য যেখানে আদিবাসীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকারী হবে, মানুষে মানুষে এবং মানুষে-প্রকৃতিতে বিভাজন থাকবে না। তাঁর ‘আবুয়া দিশুম আবুয়া রাজ’ ঘোষণা একদিকে যেমন স্থানীয় সার্বভৌমত্বের প্রকাশ, জাতীয়তাবাদের নয়, তেমনি এই ঘোষণা কেবল বিশেষ অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়, সমগ্র পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য: এমন পৃথিবী যেখানে এক মানুষের ওপর অপর মানুষের দখলদারি থাকবে না, প্রকৃতির ওপর পুঁজির দখলদারি থাকবে না। সুতরাং, তাঁর প্রতীকী মর্যাদা যত বেড়েছে, তাঁর বিপ্লবী ভাবনা ততটাই ক্ষীণ হয়েছে— যেন তাঁকে ‘মূর্তি’ বানিয়ে স্থির করে দেওয়া হয়েছে, জীবন্ত চিন্তা হিসেবে না-দেখে।

ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী সাধারণত তিনভাবে কোনও বিপ্লবী চরিত্রকে নিজেদের দখলে আনে: (ক) ছদ্ম প্রশংসা ও স্মরণ, যেমন ছুটি ঘোষণা, ডাকটিকিট, মূর্তি প্রভৃতি; (খ) বিকৃত পুনর্ব্যাখ্যা– তাঁর আন্দোলনকে ‘শান্তিপূর্ণ সংস্কার’ বলে দেখানো; এবং (গ) নিয়ন্ত্রণ– তাঁর নাম ব্যবহার করে বিপরীত নীতি প্রয়োগ করা। বিরসার ক্ষেত্রেও এই তিনটি ধাপই ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, আজ যখন সরকারি নীতিতে বনাঞ্চল বেসরকারিকরণের পথে যাচ্ছে, তখনই ‘বিরসা মুন্ডা দিবস’ পালন হচ্ছে উচ্ছেদপ্রবণ অঞ্চলে।

টেলিভিশন, পাঠ্যপুস্তক বা রাজনৈতিক প্রচারে বিরসাকে প্রায়ই দেখা যায়— এক সাহসী তরুণ যোদ্ধা, ধর্মপ্রচারক ও ত্যাগী নেতা হিসেবে। কিন্তু এই উপস্থাপনায় তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অনুপস্থিত। তাঁকে ‘ভগবান বিরসা’ বলা হয়, ফলে তিনি মানুষের সীমা ছাড়িয়ে ঈশ্বরত্বে উন্নীত হন— যেখানে প্রশ্ন, যুক্তি ও সামাজিক সমালোচনার জায়গা থাকে না। অ-রাজনীতিকরণ (ডি-পলিটিসাইজেশন) নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়াতে রাজনৈতিক বিপ্লবকে ধর্মীয় বা নৈতিক রূপে আড়াল করা হয়।

আজ ঝাড়খণ্ড ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির বহু তরুণ, শিক্ষক ও আন্দোলনকারী বিরসার নামেই তাঁদের সংগঠন গড়ে তুলছেন— যেমন ‘বিরসা সেবা সংঘ’, ‘ধরতি আবা আন্দোলন’, ‘উলগুলান মঞ্চ’ ইত্যাদি। এই সংগঠনগুলি শিক্ষা, পরিবেশ ও নারী অধিকারের ক্ষেত্রে কাজ করছে। তবে তারা একই সঙ্গে অভিযোগ করে—বিরসার প্রতীককে কেন্দ্র করে রাজনীতিবিদেরা ভোটের সময় আবেগ তৈরি করেন, কিন্তু নীতি প্রণয়নের সময় তাঁর চিন্তাকে উপেক্ষা করেন। এটি ‘স্মৃতি রাজনীতি’-র এক উদাহরণ— যেখানে অতীতের স্মৃতিকে বর্তমানের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়।

চার

বিরসা মুন্ডা ছিলেন কেবল এক জনজাতীয় নায়ক নন, তিনি ছিলেন প্রকৃতি, ন্যায্যতা ও স্বাধীনতার দার্শনিক। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আমাদের শেখায়: 

ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি সংস্কৃতির ভিত্তি; 

সংস্কৃতি শুধু নৃত্য-গীত নয়; এটি আত্মসম্মান ও নৈতিক শক্তির প্রকাশ; 

রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়; এটি সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। 

আজ যখন উন্নয়নের নামে বন উজাড় হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে— তখন বিরসার কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়: “যে-সমাজ প্রকৃতিকে ভুলে যায়, সে-সমাজ নিজেকে ধ্বংস করে।” এখানে কোথাও আমরা শুনতে পাই— যাঁর রচনার সঙ্গে বিরসার পরিচয় না-থাকা— কার্ল মার্কসের কথার প্রতিধ্বনি: কেউই এ-পৃথিবীর মালিক নয়, আমরা অছি মাত্র। তাই বিরসাকে  ‘প্রতীক’ বানিয়ে, পুঁজির নেতৃত্বে এবং আগ্রাসনে তাঁর ভাবনাকে অকার্যকর করার যে-দুষ্কর্ম চলছে তাকে উদ্ঘাটিত ও প্রতিহত করাটা আজকের সুস্থ রাজনীতির অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। বিদ্রোহের প্রতীক বিরসাকে অনুগত রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করার ষড়যন্ত্রকে বিনষ্ট করার কাজটিও রাজনীতিকেই হাতে তুলে নিতে হবে। যে বিরসা বলেছিলেন নিজের শাসনের কথা, তাঁর নামে এখন শাসন চলে অন্যদের; বিরসার স্বপ্নের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সংগঠিত ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা আজকের দিনের প্রধান রাজনৈতিক বিকল্প বলে গণ্য হওয়া দরকার।

বিরসার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা মানে কেবল তাঁর জন্মদিন পালন নয়— বরং তাঁর ভাবনার পুনরুজ্জীবন। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতা মানে মানুষের ওপর রাষ্ট্রের অধিকার নয়, স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির মুক্ত ভাবে, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে যাবার স্বাধীনতা। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যাঁরা সংগ্রামে বদ্ধপরিকর, অবহেলিত বিরসা এসে তাঁদের পথ দেখান।

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating