২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে — শিরোনাম ছিল “India’s $3.9 billion plan to help Modi’s mogul ally after U.S. charges”। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ভারত সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক মহল আদানি গ্রুপকে আর্থিক সংকট থেকে বাঁচাতে এলআইসি-র (Life Insurance Corporation of India) অর্থ ব্যবহার করেছে। এই পরিকল্পনার পরিমাণ প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩০,০০০–৩৩,০০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি সংস্থার ট্যাক্সপেয়ার-সমর্থিত অর্থ আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যখন আদানি যুক্তরাষ্ট্রে ঘুষ ও জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে অস্বীকার করছে। বিরোধীরা একে “পুঁজিবাদী যোগসাজশ” (Crony Capitalism) আখ্যা দিয়েছে।
আদানি গ্রুপের আর্থিক চাপ ও মার্কিন অভিযোগ
গৌতম আদানি, ভারতের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি, যার ব্যবসা বন্দরের পাশাপাশি কয়লা, বিমানবন্দর ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিস্তৃত। ২০২৪ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) ও সিকিউরিটিজ কমিশন (SEC) আদানি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনে। এর পরেই এলআইসির শেয়ারের বাজারমূল্য কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ৭,৮৫০ কোটি টাকা কমে যায়।
এর আগে ২০২৩ সালে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের রিপোর্টে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে শেয়ার কারচুপি ও হিসাব জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল, যাতে এলআইসি ৫.৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। যদিও ভারতের সেবি (SEBI) কিছু অভিযোগ খারিজ করেছিল, তবু বিদেশি ব্যাংকগুলো আদানিকে ঋণ দিতে অনীহা দেখায়। ফলে ২০২৫ সালের গোড়ায় গ্রুপটির ঋণ ২০% বেড়ে যায়।
সরকারি পরিকল্পনা : ৩.৯ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা
ওয়াশিংটন পোস্ট দাবি করেছে, ২০২৫ সালের মে মাসে অর্থ মন্ত্রকের অধীনে ডিএফএস (Department of Financial Services), নিটি আয়োগ ও এলআইসি মিলে একটি নথি প্রস্তুত করে যাতে বলা হয়, এলআইসির অর্থ আদানি কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগ করতে হবে। পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজারে “আস্থা জাগানো” এবং “আদানিকে সহায়তা করা”।
মূল বিনিয়োগ ছিল:
প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার আদানি গ্রুপের বন্ডে
প্রায় ৫০৭ মিলিয়ন ডলার আদানি গ্রিন এনার্জি ও আম্বুজা সিমেন্টের শেয়ারে
৩০ মে ২০২৫-এ এলআইসি একাই আদানি পোর্টসের ৫,০০০ কোটি টাকার বন্ড ক্রয় করে, যা আসলে একটি পুরনো ঋণ পুনর্গঠন ছিল।
প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
আদানি গ্রুপ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের বৃদ্ধির ইতিহাস মোদীর শাসনকালের আগের এবং প্রতিবেদনটি “ভারতের ভাবমূর্তি নষ্টের চক্রান্ত”। এলআইসি জানিয়েছে, বিনিয়োগগুলি বোর্ডের অনুমোদনক্রমে হয়েছে এবং “প্রতিবেদন সম্পূর্ণ মিথ্যা”। অন্যদিকে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস যৌথ সংসদীয় তদন্ত (JPC) দাবি করেছে। বিশ্লেষক হেমিন্দ্র হাজারি বলেন, “এলআইসির মতো সংস্থায় যদি কিছু হয়, সরকারকেই তা উদ্ধার করতে হবে।”
প্রভাব ও সমালোচনা
সমালোচকদের মতে, এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার, যা সাধারণ নীতিবিমা গ্রাহকদের সঞ্চয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বিরোধীরা একে “মোদানি যৌথ উদ্যোগ” বলে কটাক্ষ করেছে। এই ঘটনাকে ভারতের অর্থনৈতিক নীতির স্বচ্ছতার উপর প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উপসংহার
এই প্রতিবেদনটি আবারও মনে করিয়ে দিল—ভারতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী কর্পোরেটদের সম্পর্ক কতটা গভীর। যদিও সরকার ও আদানি উভয়েই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, ওয়াশিংটন পোস্ট-এর নথিপত্র ইঙ্গিত দেয় যে আদানিকে রক্ষা করতেই এলআইসির বিশাল অর্থ ব্যবহার হয়েছে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের আর্থিক প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

@freemang2001gmail-com



