৪ অক্টোবর ১৯৩০
প্রিয় বাবা,
আমি শুনে স্তম্ভিত হলাম যে, বিশেষ ট্রাইবিউনালের সদস্যদের কাছে আমার আত্মপক্ষ সমর্থন বিষয়ে একটি আর্জি পেশ করেছেন আপনি। এই খবরে এমন নিদারুণ আঘাত লাগল যে তা শান্তভাবে সহ্য করা যায় না। আমার মনের সব ভারসাম্য এতে নাড়া খেয়েছে। এই পর্যায়ে এবং এই পরিস্থিতিতে এমন একটি আর্জি দাখিল করা আপনি উচিত বিবেচনা করলেন কী করে তা বুঝতে পারছি না। একজন পিতার আবেগ বা অনুভূতি যাই হোক না কেন, আমার মতামত না নিয়েই আমার হয়ে এমন একটি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার আপনার আছে বলে আমি মনে করি না। আপনি জানেন যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সর্বদাই আপনার থেকে আলাদা। আপনার সম্মতির বা অসম্মতির অপেক্ষা না রেখে আমি বরাবরই স্বাধীনভাবে কাজ করে চলেছি।
আশা করি আপনার মনে আছে যে গোড়া থেকেই আপনি আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যেন আমি খুব দৃঢ়চিত্তে এই মামলা লড়ি, যেন ঠিকমত আত্মপক্ষ সমর্থন করি। কিন্তু আপনি এও জানেন যে আমি সর্বদা এই ধারণার বিরোধী। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও বাসনা কখনও আমার ছিল না এবং দৃঢ়চিত্তে কখনও সে কথা ভাবিও নি। ভাসা-ভাসা কোনও মতাদর্শ ছিল, নাকি আমার অবস্থানের সপক্ষে কয়েকটি যুক্তি ছিল, সে কথা আলাদা এবং তা এখানে আলোচ্য নয়।
আপনি জানেন যে এই মামলায় আমরা একটি নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করছি। আমার প্রত্যেকটি কাজের সঙ্গতি থাকা উচিত সেই নীতির সঙ্গে, আমার আদর্শ ও আমার কর্মসূচির সঙ্গে। এখনকার অবস্থা একেবারে আলাদা, কিন্তু পরিস্থিতি যদি ভিন্নতর হত, তবুও আত্মপক্ষ আর যেই সমর্থন করুক আমি করতাম না। বিচার চলার পুরো সময়টা জুড়ে আমার একটি ধারণাই ছিল, তা হল এই বিচারের প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহ প্রদর্শন, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন। আমি বরাবরই এই মত পোষণ করেছি যে রাজনৈতিক কর্মীকে হতে হবে নিস্পৃহ, আদালতে আইনি লড়াই নিয়ে ভাবলে চলবে না এবং কঠিনতম দণ্ডাজ্ঞাও যদি তাদের উপর বর্ষিত হয়, তবে তা সাহসের সঙ্গে সইতে হবে। তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি রাজনৈতিক বিবেচনা নিয়ে, কোনও মতেই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। এই মামলায় আমাদের নীতি এই আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলেছে, সফল হয়েছি কি হই নি, সে বিচার আমি করতে পারি না। আমরা একেবারে নিঃস্বার্থভাবে মামলা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ভগৎ সিং-এর বাবা সরদার কিষাণ সিং ট্রাইবিউনালের কাছে একটি লিখিত আর্জিতে দাবি করেন যে তাঁর পুত্র নিরপরাধ এবং সন্ডারস্ হত্যার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই নেই। তিনি এই অনুরোধও করেন যে ভগৎ সিংকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হোক।
(বর্তমান চিঠিতে বাবার প্রতি ভগৎ সিং এর জবাব লিপিবদ্ধ।)
সর্বদা আমাদের কর্তব্য করে গেছি ।লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা অর্ডিন্যানস্ দলিলটির সঙ্গে সংযুক্ত এক বিবৃতিতে বড়লাট বলেছিলেন যে এই মামলা আসামিরা আইন ও ন্যায়বিচার দুটিকেই অবমাননার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে সুযোগ এনে দিল জনসমক্ষে দেখিয়ে দেওয়ার যে আমরা আইনের অবমাননার প্রয়াসী নাকি তা অন্যেরা করছে। এই বিষয়ে লোকে হয়তো আমাদের সঙ্গে একমত হবে না। হয়তো তুমিও তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার সম্মতি ছাড়াই আমার পক্ষে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এমন কী আমার গোচরে না এনে। আমার জীবনকে তুমি হয়তো মূল্যবান ভাবছ। কিন্তু আমার জীবন ততটা মূল্যবান নয়, অন্তত আমার কাছে নয়। আমার আদর্শের বিনিময়ে কিনবার মতো মূল্য আমার জীবনের নেই। সকলে একটি সাধারণ নীতি গ্রহণ করেছিলাম এবং সেটাই শেষ পর্যন্ত ধরে থাকব, তার জন্য ব্যক্তিগতভবে যত মূল্যই দিতে হোক কিছু এসে যায় না।
বাবা, আমি একেবারে অবাক হয়েছি। ভয় হয় পাছে ভদ্রতার সাধারণ নিয়মগুলোও ভুলে থাকি এবং আপনার এই পদক্ষেপের সমালোচনা, কিংবা বলা ভাল নিন্দা, করতে গিয়ে আমার ভাষাটা একটু রূঢ় হয়ে পড়ে। স্পষ্ট কথা বলি। আমার মনে হচ্ছে আমাকে পিছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে। অন্য কেউ করলে আমি একে বিশ্বাসঘাতকতার কম কিছু মনে করতাম না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি এটা একটা দুর্বলতা খুব নিকৃষ্ট ধরনের দুর্বলতা।
এই সেই সময় যখন প্রত্যেকের পরীক্ষা চলছিল। আমাকে বলতে হচ্ছে, বাবা, যে আপনি অকৃতকার্য হয়েছেন। আমি জানি আপনি ততটাই সৎ দেশপ্রেমিক যতটা কেউ হতে পারে। আমি জানি যে ভারতের স্বাধীনতার জন্য আপনি সারা জীবন নিয়োগ করেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনি এমন একটা দুর্বলতা প্রদর্শন করলেন কেন? আমি বুঝতে পারছি না।
পরিশেষে, আমি আপনাকে এবং আমার অন্য বন্ধুদের এবং আমার মামলার বিষয়ে আগ্রহী সমস্ত ব্যক্তিদের জানাতে চাই যে আপনার পদক্ষেপকে আমি অনুমোদন করি নি। এখনও আমি আত্মপক্ষ সমর্থনের পক্ষপাতী নই। আমার সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য কারও কারও আত্মপক্ষ সমর্থন প্রভৃতি বিষয়ে পেশ করা আর্জি আদালত যদি গ্রহণও করত, তবু আমি নিজের পক্ষ সমর্থন করতাম না। অনশনের সময়ে আমার সাক্ষাৎকার সংক্রান্ত যে আবেদন আমি ট্রাইবিউনালে জমা দিয়েছিলাম, তার অপব্যাখ্যা করে সংবাদতে প্রকাশিত হয় যে আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করব, যদিও প্রকৃতপক্ষে আমি কখনও আত্মপক্ষ সমর্থনের ইচ্ছুক ছিলাম না। আমার মতামত এখনও আগের মতোই আছে। বোরস্টাল জেলে বন্দি আমার বন্ধুরা একে বিশ্বাসঘাতকতা এবং শপথভঙ্গ বলে মনে করে থাকবেন। তাঁদের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তুলে ধরার কোনও সুযোগই আমি পাব না।
আমি চাই যে, এই জটিলতার সব কিছু বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জনসাধারণ জানুক, সুতরাং আমি এই চিঠিটি প্রকাশ করতে আপনাকে অনুরোধ করছি।
আপনার স্নেহশীল পুত্র
ভগৎ সিং
@freemang2001gmail-com



