Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

আমি কিভাবে সমাজতন্ত্রবাদী হলাম? -হেলেন কেলার ।

উৎপাদন করে, সমস্ত কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে কাজকে ভাগ করে দেয় এবং প্রত্যেক মানব-মানবী ও শিশুর জীবিকাকে সুনিশ্চিত করে। শিক্ষা প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষের মধ্যে তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার উদ্বোধন তো ঘটায়ই, সেইসঙ্গে আমাদের বর্তমান সমাজ ক্ষমতার সাফল্যকে যেভাবে গৌরবান্বিত করা হয় তার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃষ্টি করে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ।

তৎসত্ত্বেও এটা মনে রাখা প্রয়োজন পরিকল্পিত অর্থনীতি মানেই সমাজতন্ত্র নয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানুষকে পুরোপুরি দাসে পরিণত করতে পারে। সমাজতন্ত্রের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত দুরূহ সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান। বহুদূর প্রসারিত রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এটা কীভাবে সম্ভব? কীভাবেই-বা সম্ভব হবে আমলাতন্ত্রকে সর্বশক্তিমান ও স্বার্থপরতন্ত্র হওয়া থেকে রোখা? ব্যক্তিমানুষের অধিকারকে কী উপায়ে সুরক্ষিত করা সম্ভব এবং সেই সঙ্গে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক পথে কীভাবে চালিত করা যাবে?

রূপান্তরের এই যুগে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও সমস্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়। বর্তমান অবস্থায় এই সব সমস্যার মুক্ত ও অবাধ আলোচনা এক শক্তিশালী নিষেধের আওতায় চলে এসেছে। সুতরাং আমি মনে করি, এই প্রত্রিকার প্রকাশ একটি প্রয়োজনীয় জনসেবা হয়ে উঠবে।

[এই প্রবন্ধটি ১৯৪৯ সালে সে মাসে ‘মান্হলি রিভিউ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

কয়েক বছর ধরে খবরের কাগজে প্রায়ই আমার নামের সঙ্গে সমাজবাদকে যুক্ত করে খবর ছাপা হচ্ছে। এক বন্ধু বললেন- বেসবল, শ্রীযুক্ত রুজভেল্ট এবং নিউ ইয়র্ক পুলিসি কেচ্ছাকাহিনীর সঙ্গে একত্রে আমি কাগজের প্রথম পাতা দখল করেছি। এই উল্লেখ আমার খুব-একটা মনমতো হয়নি। কিন্তু আমি মোটের ওপর খুশি যে, আমার ও আমার শিক্ষিকা শ্রীমতী ম্যাসি-র শিক্ষা-গৌরব সম্পর্কে অনেক মানুষ আগ্রহী হয়েছেন। বদমায়েসিও তো হিতকর হয়ে উঠতে পারে। আমি আনন্দিত যে, আমার কর্মসাধনের ধারাকে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে সংবাদপত্রের স্তম্ভে প্রায়শই উঠে আসছে ‘সমাজতন্ত্র’-শব্দটি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আমি সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে লিখব। আমি স্বয়ং এবং আমার মতামত যে-বিপুল প্রচারের সুযোগ পেয়েছে তা যে অনেকটাই যুক্তিযুক্ত আমার লেখায় তা-ও তুলে ধরা হবে। এসব সম্বন্ধে এতদিন পর্যন্ত আমি বিশেষ কিছু লিখিনি বা বলিনি। আমি লিখেছি কয়েকটা চিঠি যেগুলোর মধ্যে প্রধান হলে’ কমরেড ফ্রেড ওয়ারেল-কে লেখা একখানি পত্র। সেটা ছাপা হয়েছে ‘বিচারবুদ্ধির কাছে আবেদন’ (‘Appeal to reason’) নামক গ্রন্থে। কয়েকজন রিপোর্টারকে আমি সাক্ষাৎকার দিয়েছি। তাঁদের মধ্যে একজন ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ড’-এর সাংবাদিক। তিনি একটি মনোরম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, আমার কথাগুলোকে সততার সঙ্গে পুরোপুরি ছেপেছেন। শেনেকটাডি (Schenectady) তে আমি কখনও যাইনি। মেয়র লুন (Lune)-এর সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ করিনি। তাঁর কাছ থেকে কোনো চিঠি আমি কদাচ পাইনি। কিন্তু শ্রীমতী ম্যাসি-র মাধ্যমে তিনি আমাকে সহহৃদয় বার্তা পাঠিয়েছেন। শেনেকটাডি-তে শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিত হবার বাসনা আমার ছিল, কিন্তু শ্রীমতী ম্যাসি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমায় সে-ইচ্ছা ত্যাগ করতে হয়েছে।

এইরকম নেতিবাচক এবং প্রায়-তুচ্ছ বিষয়ে ধনবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকায় প্রচুর সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। সংবাদপত্র থেকে কেটে-রাখা টুকরোয় আমার একটি ড্রয়ার ভরাভর্তি হয়ে গেছে। আমি তার সিকিভাগও পড়িনি। ওগুলো পড়ব কি না সে সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ নই। অতি অকিঞ্চিৎকর বিষয়ে এত-এত মন্তব্য ছাপা হয়েছে। এখন আমি যদি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আন্তরিকভাবে বলতে-লিখতে আরম্ভ করি তাহলে সংবাদপত্রগুলো কী করবে? তবে আপাতত আমি চাইছি আমার অবস্থান জানাতে, কতকগুলো মিথ্যা রিপোর্টকে সংশোধন করতে আর আমার কাছে অন্যায্য বলে বোধ হয়েছে এমন কিছু নিন্দাবাদের প্রত্যুত্তর দিতে।

প্রথম: আমি কীভাবে সমাজতন্ত্রী হলাম? উত্তর: পড়াশুনো করে। আমি প্রথম যে বইটি পড়ি সেটা হল ওয়েল্স-এর ‘পুরোনোর বদলে নতুন পৃথিবী’ (‘New Worlds for Old’)। শ্রীমতী ম্যাসি বইটি আমাকে পড়তে বলেছিলেন। রচনাটির কল্পনাঋদ্ধতা ম্যাসিকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর প্রত্যাশা ছিল: এই রচনার বিদ্যুৎচমকিত আঙ্গিক আমাকে উদ্দীপিত করবে। তিনি যখন এ বই আমাকে দেন তখন তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। তবে শ্রীযুক্ত ম্যাসির ও আমার সঙ্গে আলোচনাশেষের আগেই তিনি বোধ হয় সমাজতন্ত্রবাদী হয়ে উঠবেন।

শ্রীযুক্ত ওয়েল্ল্স আমাকে অধিকতর পঠনের পথে চালিত করলেন।

আমি উদ্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আরও বই চাইছিলাম। শ্রীযুক্ত ম্যাসি তাঁর সমাজবাদী সাহিত্যের পাঠাগার থেকে কিছু বাছাই-করা বই আমায় এনে দিলেন। তিনি আমার ওপর কোনো বই চাপিয়ে দেননি। আমি আরও বই চাইছিলাম এবং তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করেছেন মাত্র। সমাজতন্ত্র। সম্পর্কিত মতামতে আমাকে সম্পৃক্ত করার কোনও ঝোঁক তাঁর মধ্যে আমি দেখিনি। সত্যি বলতে কী, আমি তাঁর কাছে কত সময় অভিযোগ করেছি: আমি যতক্ষণ চাইছি কেন তিনি ততক্ষণ আমার সঙ্গে আলোচনা করবেন না।

আমার বই-পড়ার গণ্ডী ছিল সীমাবদ্ধ। ধীর গতিতে আমি পড়েছি। অন্ধদের জন্যে ব্রেইলে ছাপা জার্মান দ্বিমাসিক পত্রিকা আমি নিতাম। (আমাদের জার্মান কমরেডরা অনেক দিক থেকে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে) জার্মান ব্রেইল ভাষায় লেখা এরফুর্ট প্রোগ্রাম-এর ওপর কাউটস্কির আলোচনা আমার হাতে এসেছিল। আমার এক বান্ধবী সপ্তাহে তিনদিন আসতেন আমার পছন্দসই রচনা পড়ে শোনানোর জন্যে। তাঁর কাছ থেকে আমার হাতে এসেছে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য, আমি তা পড়েছি। আর ছিল ‘ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট’ পত্রিকা। বান্ধবীর কাছে আমার অনুরোধ ছিল, তিনি যেন তাঁর প্রাণবন্ত আঙুল দিয়ে আমার উৎসুক আঙুলে পত্রিকাটির বিভিন্ন রচনা সঞ্চারিত করে দেন। হাত দিয়ে পড়তে সময় লাগে। ৫০,০০০ শব্দের একটি অর্থনীতির বই আঙুল দিয়ে আত্মস্থ করা সহজ নয়, দ্রুত তা করাও যায় না। কিন্তু পড়াটা তো আনন্দের ঘটনা, সেই আনন্দ আমি বারংবার অন্তরে ধারণ করেছি, শেষ পর্যন্ত ধ্রুপদী সমাজতান্ত্রিক লেখকদের সব রচনার সঙ্গে আমি পরিচিত হতে পেরেছি।

প্রসঙ্গত একটা কথা আমি বলব। ‘দি কমন কজ’ (The Common Cause’) প্রত্রিকায় আমার সম্বন্ধে কিছু বক্তব্য বেরোয়, ‘দি লাইভ ইস্যু’ (‘The live Issue’) পত্রিকায় তা পুনর্মুদ্রিত হয়। দু’টোই সমাজতন্ত্র-বিরোধী পত্রিকা। ওই লেখাটি সম্পর্কে আমি কিছু মন্তব্য করতে চাইছি। রচনাটি থেকে খানিকটা আমি উদ্ধৃত করছি:

“পঁচিশ বছর যাবৎ কুমারী কেলারের শিক্ষক ও সব সময়ের সঙ্গী হলেন শ্রীমতী জন ম্যাসি। দু’জনেই, শ্রীযুক্ত ও শ্রীমতী জন ম্যাসি, কট্টর মার্কসবাদী প্রচারক। কুমারী কেলার প্রগাঢ় জীবনবোধে উপনীত হতে চান এবং তার জন্য তাঁর আজীবন বন্ধু শ্রীমতী ম্যাসি’র ওপর নির্ভর করেন। বিস্ময়ের কিছু নেই যে, পরিণামে তিনি ম্যাসিদের মতবাদে আষ্টেপৃষ্ঠে আসক্ত হবেন।” হতে পারে শ্রীযুক্ত ম্যাসি উৎসাহী মার্কসবাদী প্রচারক। অবশ্য দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে, আমার আঙুলের মাধ্যমে মার্কসবাদ হস্তান্তরিত করতে তাঁর উৎসাহের যথেষ্ট অভাব ছিল। অন্যদিকে শ্রীমতী ম্যাসি মার্কসবাদী নন, সমাজতন্ত্রীও নন। সুতরাং ‘দি কমন কজ’ যা বলছে তা সত্য নয়। ওটা সম্পাদকের মস্তিষ্কজাত। একটা পুরো কাপড় কেটে তিনি এটা বানিয়েছেন। তাঁর মস্তিষ্ক যখন এভাবে কাজ করছে তখন স্বভাবতই তিনি সমাজতন্ত্র বিরোধী। কে সমাজতন্ত্রবাদী আর কে তা নয় তা বোঝার মতো বোধবুদ্ধি তাঁর নেই।

ওই একই রচনার আরেকটি উদ্ধৃতি দেখুন। রচনার শিরোনাম: ‘প্রচারের জন্য শেনেকটাডির লালদের বিজ্ঞাপন: অন্ধ মেয়ে হেলেন কেলারকে ব্যবহার’। তারপর মূল লেখা আরম্ভ হলো:

“শেনেকটাডির সমাজতন্ত্রীরা স্বার্থসাধনের জন্য হতভাগ্য হেলেন কেলারকে যেভাবে এখন ব্যবহার করছে তার চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওই দলের মুদ্রণ-মাধ্যম ঘোষণা করে চলেছে, হেলেন কেলার সমাজতন্ত্রবাদী এবং তিনি নবগঠিত বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ারের সদস্য হতে চলেছেন।”

“স্বার্থসাধনের জন্য হতভাগ্য হেলেন কেলারকে যেভাবে এখন ব্যবহার করছে”-এই মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে আমি প্রত্যুত্তর দিতে পারি। কিন্তু তা আমি দেব না। আমি শুধু বলব ‘দি কমন কজ’ পত্রিকার ভণ্ড সহানুভূতি আমার কাছে অবাঞ্ছিত। কিন্তু ‘স্বার্থসাধনের জন্য ব্যবহার’ কথাটার মানে কী? এটা যদি ওরা জানত তাহলে আমি আনন্দিত হতাম।

এবার আসি আসল ঘটনায়। মেয়র লুন যখন জানলেন আমি শেনেকটাডিতে যেতে পারি তখন ‘বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ার’কে তিনি প্রস্তাব দিলেন, আমার জন্যে তাঁরা যেন একটা জায়গা রাখেন। মেয়র লুনের পত্রিকা ‘দি সিটিজেন’ (‘The Citizen’)-এ এই ঘটনার কিছুই ছাপা হয়নি। বস্তুত, বোর্ডের অভিপ্রায় ছিল, শেনেকটাডিতে আমার পৌঁছানোর আগে এ ব্যাপারে কোনো কথা তারা বলবে না। কিন্তু পুঁজিবাদী কাগজের রিপোর্টাররা ব্যাপারটা আঁচ করল এবং যখন মেয়র লুন অনুপস্থিত তখন আলবানির ‘নিকারবোকার প্রেস’ (‘Knickerbocker Press’) বিষয়টা ঘোষণা করে দিল। সারা দেশে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ল এবং সংবাদপত্রের স্বার্থসর্বস্ব দুষ্কর্ম আরম্ভ হয়ে গেল। এ কাজ কি কোনো সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা করেছিল? না। এটা করল পুঁজিবাদী সংবাদপত্রগুলি। সমাজতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকা সংবাদটি ছেপেছিল, কেউ কেউ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সম্পাদকীয়ও লিখল। কিন্তু শ্রীযুক্ত লুনের পত্রিক’ ‘দি সিটিজেন’ নীরব ছিল, আমার নাম সেই পত্রিকায় ছাপা হয়নি। অথচ সপ্তাহের পর সপ্তাহ রিপোর্টাররা লুনকে টেলিফোন করছিল, টেলিগ্রাফ আসছিল- সবাই চাইছিল তাঁর সাক্ষাৎকার। পুঁজিবাদী সংবাদপত্রই আমাকে কেন্দ্র করে স্বার্থসাধন করে গেছে। কেন? সাধারণ পত্র পত্রিকা কী ঘুণাক্ষরেও গ্রাহ্য করে সমাজতন্ত্রকে। না, মোটেই না। সমাজতন্ত্রকে তারা ঘৃণা করে। কিন্তু হায়। আমি হলাম সংবাদপত্রের খোশগল্পের শিকার। আমি যে শেনেকটাডিতে ছিলাম না, যে রিপোর্টার ‘খবর’টা প্রথম ছেপেছিল তার প্রতি আমার বিতৃষ্ণাও নেই-এসব কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম।

‘আমি সমাজতন্ত্রবাদী-এই ঘোষণা’ পুঁজিবাদী সংবাদপত্রে মুদ্রিত হবার পর সমাজতন্ত্রবাদী পত্র-পত্রিকায় আমার কথা বহুল প্রচারিত হয়, এ ঘটনা সত্য। কিন্তু যে রিপোর্টাররা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন তাঁরা সবাই সাধারণ বাণিজ্যিক সংবাদপত্রের প্রতিনিধি। কোনো সমাজতন্ত্রবাদী সংবাদপত্র আমার কাছ থেকে লেখা চায়নি-‘দি কল’ (“The Cail’) বলুন, ‘দি ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট’ (The National Socialist’) বলুন, কেউ না। ‘দি সিটিজেন’ পত্রিকার সম্পাদক পরোক্ষভাবে শ্রীযুক্ত ম্যাসি’কে জানান-আমার একটা রচনা পেলে ভালো হয়। কিন্তু তিনি এত সুভদ্র, এত বিবেচক, যে আমাকে কখনও লেখার কথা খোলাখুলি বলতে পারেননি।

নিউ ইয়র্ক টাইম্স আমার লেখা চেয়েছিল। টাইমসের সম্পাদক আমাকে আশ্বস্ত করার জন্যে জানালেন, তাঁর কাগজ জনসাধারণের কাছে পৌঁছ্যানার মূল্যবান মাধ্যম এবং তিনি আমার কাছ থেকে একটি রচনা পেতে চান। তিনি আমাকে টেলিগ্রাফও পাঠান। আমার পরিকল্পনার কথা তিনি আমাকে জানাতে বলেন। আরও বলেন, শেনেকটাডির বোর্ড অফ পাবলিক ওয়েলফেয়ারের সদস্য হিসেবে আমার সম্ভাব্য কাজকর্মের খসড়াও যেন তাঁদের জানাই। এই অনুরোধে আমি গড়া দিইনি, এটা আনন্দের কথা। কারণ, কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেদের নিরপেক্ষ সহানুভূতির আবরণ ছিঁড়ে ফেলে আমাকে তাঁরা সামাজিকভাবে ব্রাত্য করে দিতে চাইলেন। ২১ সেপ্টেম্বর টাইম্স-এর পাতায় দেখা গেল একটা সম্পাদকীয়, যার শিরোনাম ‘ঘৃণাই লাল পতাকা’। আমি তার দু’টি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি:

“পতাকা অবাধে ওড়ে। তবু এটা জঘনা। এটা বিশ্বব্যাপী যথেচ্ছাচার ও নৈরাজ্যের প্রতীক। সে কারণে যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এটাকে ঘৃণার চোখে দেখে।”

“যে সব কাজকর্ম লাল পতাকা কর্তব্য বলে গণ্য করে। সে রকম কাজ না করলে পুলিস হয়তো পতাকাধারীকে হেনস্থা করে না। কিন্তু ওই ব্যক্তি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার যোগ্য সবসময়েই। কারণ, সে বহন করছে যথেচ্ছাচারের প্রতীক। অতএব শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি পাবার অধিকার সে হারিয়েছে।”

কোনো বিশেষ রঙের কাপড়ের পূজারি আমি নই। কিন্তু লাল পতাকা আমি ভালোবাসি। এই পতাকা আমার এবং সমস্ত সমাজতন্ত্রবন্দীর কাছে যে প্রতীক তুলে ধরে তা আমি ভালোবাসি। আমার পড়ার ঘরে একটি লাল পতাকা ঝুলছে। পারলে এই পতাকা নিয়ে সানন্দে কুচকাওয়াজ করে টাইম্স-এর অফিস ছুঁয়ে যাব। সমস্ত রিপোর্টার ও ক্যামেরাধারী সক্রিয়তম অবস্থায় এই দৃশ্য দেখুক টাইমস-এর মোক্ষম দণ্ডাদেশ অনুসারে আমি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি লাভের সমস্ত অধিকার হারিয়েছি, আমাকে দেখা উচিত সন্দেহের দৃষ্টিতে। তবু টাইমস-এর সম্পাদক চ ইডেন-আমি তাঁকে আমার রচনা দিই! আমি যদি সন্দেহজনক চরিত্রের মানুষ হই তাহলে কী করে তিনি বিশ্বাস করলেন, আমি তাঁকে আমার লেখা দেব? ধনবাদীস্বার্থ-বিরোধী আন্দোলনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্যে যে পুঁজিবাদী সম্পাদক অস্বাস্থ্যকর নৈতিকতা, ক্ষতিকর যুক্তিবিন্যাস ও দুষ্ট আচরণের গহ্বরে পড়েছেন, আশা করি, তাঁর ক্রিয়াকাণ্ড আমার মতোই আপনারাও উপভোগ করছেন। আমরা সহানুভূতির অধিকারী নই, অথচ আমাদের কারও কারও রচনা তিনি চাইছেন, কারণ সেই রচনা তাঁদের কাগজকে টাকা কামাতে সাহায্য করবে। কুখ্যাত খুনির স্বীকারোক্তি যেমন মূল্যবান তেমনি তাঁর কাছে মূল্যবান আমাদের মতামত। আমরা সুন্দর নয়, কিন্তু আকর্ষণীয় তো বটে।

আমি সাংবাদিকদের পছন্দ করি। তাঁদের অনেককে আমি জানি। দু-তিনজন সম্পাদক আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাছাড়া, দৃষ্টিহীনদের স্বার্থে যে কাজ আমরা করতে চাই তার জন্যে সংবাদপত্র আমাদের প্রচুর সাহায্য করে। ওই কাজে সাহায্য বা ভাসা ভাসা বদান্যতা বাবদ তাঁদের কিছু লোকসান হয় না। কিন্তু সমাজতন্ত্র, ওঃ হো. সেটা তো আলাদা ব্যাপার! সমাজতন্ত্র সমস্ত দারিদ্র্যের, সব বদান্যতার উৎসে গিয়ে পৌঁছায়। খবরের কাগজে যে অর্থশক্তি কাজ করে তা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারী। আর সম্পাদকরা? যে হাত তাঁদের খাওয়াচ্ছে-পড়াচ্ছে তাঁরা তার বশংবদ। সমাজতন্ত্রকে দমিয়ে দেবার জন্যে, সমাজতন্ত্রবাদীদের প্রভাবকে ডুবিয়ে মারতে, যতদূর যাবার ততদূর তাঁরা যাবেন।

কমরেড ফ্রেড ওয়ারেনকে লেখা আমার চিঠি ‘অ্যাপিল টু রিজন’ (‘Appeal to Reason’) এ ছাপা হয়েছিল আমার এক বন্ধু বোস্টনের ট্যানস্ক্রিপ্ট’ (‘Transcript’)-এ বিশেষ একটি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি মুদ্রণের জন্যে আমার ওই চিঠির ওপর একটি নিবন্ধ রচনা করলেন, কিন্তু প্রধান সম্পাদক তা কেটে উড়িয়ে দিলেন।

আমার সম্পর্কে এবং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ব্রুকলিনের ‘ঈ’ (‘Eagle’) প্রত্রিকা লিখল, হেলেন কেলারের “বিকাশ পাবার পথে দৃষ্টিগ্রাহ্য বাধা রয়েছে এবং তার ফলেই জন্ম নিচ্ছে তার ভান্তিগুলো।” কয়েক বছর আগে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। পরিচয় হলে আমি জানলাম, তিনি ব্রুকলিন ‘ঈগল’-এর সম্পাদক শ্রীযুক্ত ম্যাকেলওয়ে (Mckelway) নিউ ইয়র্কে দৃষ্টিহীনদের পক্ষ থেকে ডাকা একটি সভার শেষে এই পরিচয়। সে সময়ে কত উদারভাবে তিনি আমার প্রশংসা করেছিলেন, ভাবলে আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাই। কিন্তু এখন যেহেতু আমি সমাজতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছি তাই তিনি আমাকে এবং জনসমাজকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। আমি অন্ধ ও বধির এবং স্বভাবতই অনিবার্য ভ্রান্তির শিকার। তাঁর সঙ্গে দেখা হবার পর কয়েক বছর কেটে গেছে আর ইতিমধ্যে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কুঁকড়ে গেছে। এখন লজ্জায় লাল হবার পালা তাঁর। অন্ধত্ব ও বধিরত্ব হয়তো-বা কোনো কোনো মানুষকে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যায়। মার্কস সম্ভবত বন্ধ কালা ছিলেন আর উইলিয়াম মরিস অন্ধ। মরিস স্পর্শানুভূতি দিয়ে ছবি এঁকেছেন আর গন্ধানুভূতি দিয়ে দেয়াল-কাগজে নক্সা তুলেছেন।

ওঃ, ব্রুকলিনের ‘ঈগল’ কী হাস্যকর। কী ভীতু এক পাখি। ও তো সামাজিকভাবে অন্ধ ও বধির। এক অসহ্য ব্যবস্থাকে সে পাহারা দিচ্ছে। যে শরীরিক অন্ধত্ব ও বধিরতাকে আমরা প্রতিরোধ করতে চাই তার অনেকটাই তো আসছে ওই ব্যবস্থা থেকে। মানুষের চূড়ান্ত দুর্দশার প্রতিরোধে আমাদের যে কর্মোদ্যম ঈগল তাতে সাহায্য করতে রাজি আছে। কিন্তু একটা শর্তে সবসময়ের শর্ত: শিল্প-কারখানার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করা চলবে না; শিল্পই তো ঈগলদের খোরাক জোগায়, তাদের কর্ণকে বধির করে, তাদের দৃষ্টিকে অন্ধকারে ঢাকে। আমার যুদ্ধ ঈগল-এর বিরুদ্ধে। ঈগল যে ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, যাকে তুলে ধরে, সমর্থন করে, আমি সেই ব্যবস্থাকে ঘৃণা করি। সে প্রতি-আক্রমণ করুক, কিন্তু তা করুক সততার সঙ্গে। সে আমার মতাদর্শকে আক্রমণ করুক। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও যুক্তিযুক্ততার বিরুদ্ধাচরণে সে নামুক। আমি দেখতে-শুনতে পাই না-একথা কেন সে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে? এটা সঙ্গত যুদ্ধ নয়। এ অযৌক্তিক। আমি পড়তে পারি। সময় করতে পারলে ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় লেখা সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত যাবতীয় বই-ই আমি পড়ে ফেলতে পারি। ব্রুকলিন ‘ঈগল’-এর সম্পাদক যদি কিছু বইও পড়তেন তাহলে তিনি আরও জ্ঞানী হয়ে উঠতেন, ভালো সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারতেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করতে যে বই লেখার স্বপ্ন আমি দেখি, আমি জানি সে বইয়ের নাম কী হবে। আমি নামকরণ করব ‘শিল্পজগতের অন্ধত্ব ও সামাজিক বধিরতা’ (‘Industrial Blindness and Social Deafness) 1

[কীভাবে পায়চারি করতে করতে দৃষ্টিহীন ও বধির হয়ে গেলেন, কীভাবে তাঁর শিক্ষিকা অ্যানি সুলিভান (Anne Sullivan)-এর সহায়তায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করলেন- হেলেন কেলার (১৮৮০-১৯৬৭)-এর সেই কাহিনি সুপরিচিত। উইলিয়াম গিবসনের নাটক ‘অলৌকিক শ্রমিক’ (‘The Miracle Worker’) তাঁর কাহিনির ওই অংশটিকে জনপ্রিয় করেছে। র‍্যাডক্লিফ কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, দৃষ্টিহীন ও বধিরদের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছেন, কীর্তিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বই লিখেছেন, চলচ্চিত্র ও মঞ্চে অভিনয় করেছেন। এই সব কীর্তি তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর বন্ধু মার্ক টোয়েন তাঁকে স্থান দিয়েছেন নেপোলিয়নের সমস্তরে, তিনি বলেছেন, “এঁরা উনিশ শতকের অন্যতম দুই আকর্ষণীয় চরিত্র” হেলেন কেলার যে সমাজতন্ত্রের বিখ্যাত, আন্তরিক ও সোচ্চার প্রবক্তা- একথা আমরা বড়ো-একটা মনে রাখি না। গভীর একাকিত্ব থেকে তিনি উঠে এসেছেন অনুপ্রাণিত সমাজমুখী ব্যক্তি হিসেবে, তাঁর চারপাশের জগতের সঙ্গে তিনি সংযোগ স্থাপন করেছেন। ১৯০৯ সালে তিনি সোস্যালিস্ট পার্টির সদস্য হন। (পরবর্তীকালে বিশ্ব শ্রমিকদের সংগঠনে তিনি যোগ দেন) শ্রমিক সংগ্রাম, রাশিয়ার বিপ্লব, নারীর ভোটাধিকার এবং সর্বোপরি প্রথম বিশ্বযুড়ে বিরোধিতা এসব নিয়ে তিনি লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন সর্বত্রই ফুটে উঠেছে তাঁর সমাজতান্ত্রিক চেতনা। তাঁর কাছে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ছিল এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিবন্ধীরা দুর্দশায় ভোগে। সেই দুর্দশার উৎস যে প্রায়শই পুঁজিবাদ ও শিল্পায়ন-একথা তিনি বলেছেন। ১৯২১ সালের পর ‘আমেরিকান ফাউন্ডেশন অফ দি ব্লাইন্ড’-এর জন্য মনপ্রাণ দিয়ে অর্থ সংগ্রহে নেমেছেন। সারাজীবনই তিনি ছিলেন বামপন্থী ও র‍্যাডিকাল।                                                                                              

[এই রচনাটি সমাজতান্ত্রিক দলের দৈনিক সংবাদপত্র ‘নিউ ইয়র্ক কলা এ ৩ নভেম্বর ২০১২-তে প্রকাশিত হয়।

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating