Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

মার্কস-এঙ্গেলস স্মৃতি                                 

 কার্ল মার্কসের অন্ত্যেষ্টি-অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ– ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

গত ১৫ মার্চ বিকেলবেলা ঠিক পৌনে তিনটের সময়ে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত চিন্তাবিদের সকল চিন্তা-ভাবনার অবসান ঘটে গেল। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্যে তাঁকে একা রেখে একটু অন্যত্র গিয়েছিলুম আমরা, আর যখন ফিরে এলুম তখন দেখলুম নিজস্ব আর্মচেয়ারটিতে শান্তিতে নিদ্রা যাচ্ছেন তিনি তবে সে-নিদ্রা ছিল তাঁর চিরনিদ্রা।

এই মানুষটির প্রয়াণে ইউরোপ ও আমেরিকার সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাসবিজ্ঞান উভয়েরই অপরিমেয় ক্ষতি হল। এই বিরাট প্রাণের মহাপ্রস্থানে যে-শূন্যতার সৃষ্টি হল অতি দ্রুত তা অনুভূত হতে থাকবে।

জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম যেমন আবিষ্কার করেছেন ডারউইন, তেমনই মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানব-ইতিহাসের বিকাশের সূত্র। মতাদর্শের পর্দা পড়ে পড়ে আবরণ সৃষ্টি হওয়ার ফলে এতকাল যা লোকচক্ষুর অগোচরে ছিল, মার্কস উদ্ধার করেছেন সেই সহজ-সরল সত্যটিকে অর্থাৎ, রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প, ধর্ম ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করার আগে মানুষের একেবারে প্রাথমিক প্রয়োজন হল খাদ্য, পানীয়, আশ্রয় আর পরনের বস্ত্রের; অর্থাৎ জীবনধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক বৈষয়িক উপাদানসমূহের উৎপাদন এবং, ফলত, এক নির্দিষ্ট যুগকালের মধ্যে অর্জিত অর্থনৈতিক বিকাশের স্তরই হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ভিত্তি যার উপর বিবর্ধিত হয়ে উঠেছে একেকটি বিশেষ জনসমাজের যাবতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন-সম্পর্কিত ধ্যানধারণা, শিল্প এবং এমনকী ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা পর্যন্ত- আর, সে-কারণে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ীই উপরোক্ত ব্যাপারগুলি ব্যাখ্যা করা উচিত, এ-পর্যন্ত যেমনটা হয়ে এসেছে তেমন উলটো দিক থেকে নয়।

কিছু এই-ই সব নয়। আজকের দিনের পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতি এবং যে-দুর্জোয়া সমাজ এই উৎপাদন-পদ্ধতির সৃষ্টি তাদের নিয়ন্ত্রিত করে থাকে যে-বিশেষ মতিতত্ত্ব তারও আবিষ্কর্তা মার্কসই। যে-সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় কী বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ, কী সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়পক্ষেরই পূর্ববর্তী সকল অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানোর শামিল হয়েছিল উদ্‌বৃত্ত মূল্যের আবিষ্কার একেবারে সহসা সেই সমগ্র সমস্যাটির উপর আলোকপাত করল।

এই জাতীয় দুটি আবিষ্কারই যে-কোনো মানুষের সারা জীবনের পক্ষে যথেষ্ট। এমন ধরনের একটি আবিষ্কারের সৌভাগ্যও যার হয়, সে-মানুষ ধন্য। অথচ যেখানেই মার্কস গবেষণা চালিয়েছেন এমন প্রতিটি ক্ষেত্রেই (আর, বলা বাহুল্য, তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রও ছিল বহুবিচিত্র আর কোনো ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানের কাজ উপর-উপর সারেননি তিনি), এমনকী গণিতশাস্ত্রেও স্বনির্ভর স্বাধীন সব আবিষ্কার ঘটানোয় সক্ষম হয়েছেন।

এমনই ছিলেন এই বিজ্ঞানী মানুষটি। কিন্তু এটাও মানুষটির এমনকী অর্ধেকেরও পরিচয় নয়। মার্কসের কাছে বিজ্ঞান ছিল ঐতিহাসিক দিক থেকে বেগবান এক বৈপ্লবিক শক্তি। কোনো একটি তত্ত্বগত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এমন কোনো নতুন আবিষ্কার, হাতে-কলমে যার প্রয়োগের কথা হয়তো তখনও পর্যন্ত ধারণা করা রীতিমতো অসম্ভব ঠেকছে, তাকে যত খুশি হয়েই তিনি অভ্যর্থনা জানাতেন না কেন তাঁর আনন্দের প্রকৃতি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের হত যদি ওই ধরনের কোনো আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িত থাকত শ্রমশিল্পের ক্ষেত্রে অবিলম্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তনাদি ও সাধারণভাবে ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারটি। যেমন, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে আবিষ্কারগুলির বিকাশ এবং মার্সেল দেপ্রের’ সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহ গভীর মনোযোগে অনুধাবন করছিলেন তিনি। কারণ, সবকিছুর উপরে মার্কস ছিলেন বিপ্লবী। জীবনে তাঁর সত্যিকার লক্ষ্য ছিল- পুঁজিবাদী সমাজ ও সেই সমাজ যে-সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে যে-কোনো প্রকারে তাদের উচ্ছেদে অবদান জোগানো; আধুনিক যে-প্রলেতারিয়েতকে তিনিই প্রথম তার নিজস্ব অবস্থান ও তার প্রয়োজনাদি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিলেন, সচেতন করেছিলেন তার মুক্তির পক্ষে আবশ্যিক শর্তাবলী সম্পর্কে, তারই শৃঙ্খলমোচনে অবদান জোগানো ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল তাঁর চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য। আর এমন প্রচণ্ড আবেগ, নাছোড়বান্দা ভাব আর সাফল্যের সঙ্গে তিনি লড়তেন যার তুলনা ছিল বিরল। Rheinische Zeitung প্রথম পর্ব (১৮৪২), প্যারিসের Vorwärls (১৮৪৪), Deutsche-Brüsscler Zeitung (১৮৪৭), Neue Rheinische Zeitung (১৮৪৮-৪৯) ও New York Tribune (১৮৫২-৬১) পত্রিকায় তাঁর কাজ, তদুপরি প্রচুর সংগ্রামী প্রচার-পুস্তিকা রচনা, প্যারিস, ব্রাসেল্স ও লন্ডনে সংগঠনগুলোর কাজকর্ম চালানো, পরিশেষে, সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার, মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ গঠন- একই সঙ্গে এ-সবই নিষ্পন্ন করেছেন তিনি। বস্তুত, এই শেষোক্ত কাজটি এমনই গৌরবময় কীর্তি যে এ-সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা যদি আর কিছুই না করতেন তবে শুধুমাত্র এই কাজটির জন্যেই তাঁর গর্ব করা সাজত।

ফলত, মার্কস ছিলেন তাঁর কালের সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষের পাত্র, সবচেয়ে জঘন্য কুৎসা রটনার উপলক্ষ্য। একচ্ছত্র রাজতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রী উভয় ধরনের গভর্নমেন্টই তাঁকে তাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করেছে। রক্ষণশীল অথবা অতিগণতন্ত্রী যা-ই হোক না কেন বুর্জোয়ারা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতেছে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা কুৎসাবর্ষণে। আর এ-সব কোনো কিছুতে ভ্রূক্ষেপ করেননি তিনি, মাকড়সার জাল বা জঞ্জাল গণ্য করে উপেক্ষা করেছেন এদের, অত্যন্ত প্রয়োজনে বাধ্য হলে মাঝেসাঝে জবাব দিয়েছেন, এইমাত্র। আর আজ তিনি প্রয়াত- সাইবেরিয়ার খনি-অঞ্চল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার এবং ইউরোপ ও আমেরিকার সকল অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্মীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর শোক নিবেদনের উপলক্ষ্য তিনি। ভরসা করে এ-কথা বোধহয় বলা চলে যে প্রতিপক্ষ বহু থাকলেও মার্কসের একজনও ব্যক্তিগত শত্রু ছিল কিনা সন্দেহ। যুগে-যুগে স্থায়ী হবে ওঁর নাম, কীর্তিত হবে ওঁর কৃতি!

১৮৮৩, ১৭ মার্চ

১. মার্সেল দেপ্রে (১৮৪৩-১৯১৮) ফরাসি পদার্থবিদ, দূরান্তরে বিদ্যুৎসঞ্চার প্রণালীর আবিষ্কারক। সম্পা.

২. মার্কস Rheinische Zeitung Neue Rheinische Zeitung নামের পত্রিকা দুটির সম্পাদক ছিলেন এবং উপরোক্ত অন্যান্য পত্র-পত্রিকাগুলির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কিংবা বিদেশস্থ সংবাদদাতা ছিলেন। সম্পা

৩. আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ (প্রথম আন্তর্জাতিক)-এর প্রতিষ্ঠা করেন মার্কস ১৮৬৪ সালে। এই আন্তর্জাতিক কায়েম থাকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত। এইটিই ছিল প্রলেতারীয় পার্টির প্রথম অঙ্কুর। -সম্পা

ভ. ই. লেনিন এর

কার্ল মার্কস ১

নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৮১৮ সালের ৫ মে ত্রিয়ার শহরে (প্রাশিয়ার রাইন অঞ্চলে) কার্ল মার্কসের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন অ্যাডভোকেট, ইহুদি, ১৮২৪ সালে তিনি প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। পরিবারটি ছিল সমৃদ্ধ ও সংস্কৃতিবান, কিন্তু বিপ্লবী নয়। ত্রিয়ারের স্কুল থেকে পাশ করে মার্কস প্রথমে বন এবং পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ও আইনশাস্ত্র পড়েন, কিন্তু বিশেষ করে অধ্যয়ন করেন ইতিহাস ও দর্শন। ১৮৪১ সালে পাঠ সাঙ্গ করে এপিকিউরসের দর্শন সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির থিসিস পেশ করেন। দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে মার্কস তখনও ছিলেন হেগেলপন্থী ভাববাদী। বার্লিনে তিনি ‘বামপন্থী হেগেলবাদী’ (ব্রুনো বাউয়ের প্রভৃতি) গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। হেগেলের দর্শন থেকে এঁরা নাস্তিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে অধ্যাপক হবার আশায় মার্কস বন শহরে আসেন। কিন্তু। সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির ফলে (ওই সরকার ১৮৩২ সালে ল্যূদভিগ ফয়েরবাখকে অধ্যাপক পদ থেকে বিতাড়িত করে ও ১৮৩৬ সালে ফের তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয় না, ১৮৪১ সালে বন-এ তরুণ অধ্যাপক ব্রুনো বাউয়েরেরও বক্তৃতার অধিকার কেড়ে নেয়) মার্কস অধ্যাপক-জীবন ছাড়তে বাধ্য হন। সে-সময়ে জার্মানিতে বামপন্থী হেগেলবাদীদের মতামত অতি দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠছিল। ১৮৩৬ সালের পর থেকে ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ বিশেষ করে ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা শুরু করেন এবং আকৃষ্ট হন বস্তুবাদের দিকে, যা ১৮৪১ সালে তাঁর মধ্যে (খ্রিস্টধর্মের সারমর্ম’) প্রধান হয়ে ওঠে। ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ভবিষ্যৎ দর্শনশাস্ত্রের মূলসূত্র’। ফয়েরবাখের এই সব রচনা সম্পর্কে এঙ্গেলস পরে লিখেছিলেন, অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে এই সব বইয়ের ‘মুক্তি-ক্রিয়া নিজের অভিজ্ঞতায় অনুভব করার মতো’। ‘আমরা সকলে’ (অর্থাৎ মার্কস সমেত বামপন্থী হেগেলবাদীরা) ‘তৎক্ষণাৎ ফয়েরবাখপন্থী হয়ে গেলুম।’ এই সময় বামপন্থী হেগেলবাদীদের সঙ্গে যাঁদের কিছু কিছু মিল ছিল রাইন অঞ্চলের এমন কিছু র‍্যাডিক্যাল বুর্জোয়া কলোন শহরে Rheinische Zeitung নামে সরকারবিরোধী একটি পত্রিকা স্থাপন করেন (প্রকাশ শুরু হয় ১৮৪২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে)। মার্কস ও ব্রুনো বাউয়েরকে পত্রিকাটির প্রধান হবার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৮৪২ সালের অক্টোবরে মার্কস পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হয়ে বন থেকে কলোনে চলে আসেন। মার্কসের সম্পাদনায় পত্রিকাটির বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক প্রবণতা উত্তরোত্তর স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং সরকার পত্রিকাটির উপর প্রথমে দুইদফা ও তিনদফা সেন্সর ব্যবস্থা চাপায় এবং পরে ১৮৪৩ সালের ১ জানুয়ারি পত্রিকাটিকে একেবারেই রন্ধ করার সিদ্ধান্ত করে। এই সময় মার্কসকে কাগজের সম্পাদনায় ইস্তফা দিতে হয়, কিন্তু তাতেও পত্রিকাটি রক্ষা পেল না, ১৮৪৩ সালের মার্চ মাসে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। Rheinische Zeitung পত্রিকায় মার্কসের প্রধান-প্রধান লেখা হিসেবে নিচে যেগুলির নাম দেওয়া হয়েছে (গ্রন্থপঞ্জীও দ্র.) তাছাড়াও মোসেল উপত্যকায় আঙুর-চাষিদের অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রবন্ধের উল্লেখ করেছেন এঙ্গেলস। পত্রিকায় কাজ করে মার্কস বুঝলেন রাজনীতি-সংকান্ত অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট পরিচয় নেই, তাই এ বিষয়ে তিনি সাগ্রহে পড়াশুনো শুরু করলেন।

১৮৪৩ সালে ক্রয়েজনাখ শহরে মার্কস জেনি ফন ভেস্টফালেনকে বিবাহ করেন। জেনি তাঁর বাল্যসহচরী, ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁদের বাগদান হয়েছিল। মার্কসের স্ত্রী প্রাশিয়ার এক প্রতিক্রিয়াশীল অভিজাত পরিবারের মেয়ে। প্রাশিয়ার এক সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল যুগে ১৮৫০-১৮৫৮ সালে এঁর বড়ো ভাই প্রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। আর্নোল্ড রুগের (১৮০২-১৮৮০)- বামপন্থী হেগেলবাদী, ১৮২৫-১৮৩০ সালে কারারুদ্ধ, ১৮৪৮ সালের পর বিদেশে প্রবাসী, ১৮৬৬-১৮৭০ সালের পর বিসমার্কপন্থী সঙ্গে একত্রে বিদেশ থেকে একটি র‍্যাডিক্যাল পত্রিকা যার করার জন্যে মার্কস ১৮৪৩ সালের শরৎকালে প্যারিসে আসেন। Deutsch-Französische Jahrbücher নামে এই পত্রিকাটির শুধু একটি সংখ্যাই বার হয়েছিল। জার্মানিতে গোপন প্রচারের অসুবিধা এবং রুগের সঙ্গে মতান্তরের ফলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এই পত্রিকায় মার্কস যে-সব প্রবন্ধ লিখেছিলেন তাতে তখনই তিনি আত্মপ্রকাশ করেন এমন এক বিপ্লবী রূপে যিনি ‘বর্তমান সবকিছুর নির্মম সমালোচনা’, বিশেষ করে ‘অস্ত্রের সমালোচনা’ ঘোষণা করছেন এবং আবেদন জানাচ্ছেন জনগণ ও প্রলেতারিয়েতের কাছে।

১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস কয়েক দিনের জন্যে প্যারিসে জাসেন এবং তখন থেকে মার্কসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। উভয়েই তাঁরা প্যারিসের তদানীন্তন বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির উদ্দীপ্ত জীবনে অত্যন্ত সক্রিয় অংশ নেন (এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল প্রুধোঁর মতবাদ, ১৮৪৭ সালে মার্কস তাঁর ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ আআআছে সে-মতের চূড়ান্ত ফয়সলা করেছিলেন) এবং পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র-সংক্রান্ত নানাবিধ মতবাদের সঙ্গে প্রবল সংগ্রাম চালিয়ে বৈপ্লবিক প্রলেতারীয় সমাজতন্ত্র অথবা কমিউনিজমের (মার্কসবাদের) তত্ত্ব ও রণকৌশল গড়ে তোলেন। নিচের গ্রন্থপঞ্জীতে মার্কাসের এই যুগের (১৮৪৪-১৮৪৮) লেখাগুলি দ্রষ্টব্য। প্রাশিয়ান সরকারের দাবিতে ১৮৪৫ সালে বিপজ্জনক বিপ্লবী বলে মার্কসকে প্যারিস থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। অতঃপর ব্রাসেলসে আসেন মার্কস। ১৮৪৭ সালের বসন্তে তিনি ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামে একটি গুপ্ত প্রচার সমিতিতে যোগ দেন; লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে (লন্ডনে, ১৮৪৭ সালের নভেম্বর) তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং কংগ্রেস থেকে ভার পেয়ে সুপ্রসিদ্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন। ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা প্রকাশিত হয়। প্রতিভাদীপ্ত স্বচ্ছতা ও উজ্জ্বলতায় এই রচনাটিতে রূপায়িত হয়েছে নতুন বিশ্ববীক্ষা, সমাজজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সুসঙ্গত বস্তুবাদ, বিকাশের সবথেকে সর্বাঙ্গীণ ও সুগভীর মতবাদ-দ্বান্দ্বিকতা, শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্ব এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের বিশ্ব-ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকার তত্ত্ব।

১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব শুরু হলে মার্কস বেলজিয়াম থেকে নির্বাসিত হন। আবার তিনি প্যারিসে চলে এলেন এবং মার্চ বিপ্লবের পর ফিরে গেলেন জার্মানিতে, কলোন শহরেই। এইখানে প্রকাশিত হয় Neue Rheinische Zeitung পত্রিকা, ১৮৪৮ সালের ১ জুন থেকে ১৮৪৯ সালের ১৯ মে পর্যন্ত। মার্কস ছিলেন তার প্রধান সম্পাদক। নতুন তত্ত্বের চমৎকার সমর্থন পাওয়া গেল ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের বৈপ্লবিক ঘটনাস্রোতে, যেমন তা সমর্থিত হয়েছে পরবর্তী কালে পৃথিবীর সব দেশের সমস্ত প্রলেতারীয় ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে। প্রথমে বিজয়ী প্রতিবিপ্লব মার্কসকে আদালতে অভিযুক্ত করে (১৮৪৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন) এবং পরে নির্বাসিত করে জার্মানি থেকে (১৮৪৯ সালের ১৬ মে)। প্রথমে প্যারিসে গেলেন মার্কস, ১৮৪৯ সালের ১৩ জুনের মিছিলের পর সেখান থেকেও পুনরায় নির্বাসিত হয়ে লন্ডনে আসেন এবং সেখানেই বাকি জীবন কাটান।

মার্কসের নির্বাসিত জীবন অত্যন্ত কষ্টে কাটে, মার্কস-এঙ্গেলস পত্রাবলী (১৯১৩ সালে প্রকাশিত) থেকে তা বিশেষ পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। অভাব-অনটনে মার্কস ও তাঁর পরিবার একেবারে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ওঠেন; এঙ্গেলসের নিরন্তর ও আত্মোৎসর্গী অর্থ-সাহায্য না পেলে মার্কসের পক্ষে ‘পুঁজি’ বইখানি শেষ করা তো দূরের কথা, অভাবের তাড়নায় তিনি নিশ্চিতই মারা পড়তেন। তাছাড়া, পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রের, সাধারণভাবে অ-প্রলেতারীয় সমাজতন্ত্রের প্রাধান্যবিস্তারকারী মতবাদ ও ধারাগুলি মার্কসকে নিরন্তর কঠিন সংগ্রামে বাধ্য করেছে এবং মাঝে-মাঝে অতি ক্ষিপ্ত বন্য ব্যক্তিগত আক্রমণও প্রতিহত করতে হয়েছে তাঁকে (‘Herr Vogt’)”। দেশান্তরী চক্রগুলি থেকে পৃথক হয়ে মার্কস তাঁর একাধিক ঐতিহাসিক রচনায় (গ্রন্থপঞ্জী দ্র.) নিজের বস্তুবাদী তত্ত্ব নির্ণয় করেন, এবং প্রধানত রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এই বিজ্ঞানটির ক্ষেত্রে মার্কস তাঁর ‘রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ (১৮৫৯) এবং ‘পুঁজি’ (প্রথম খণ্ড, ১৮৬৭) রচনা করে বিপ্লব সাধন করেছেন (নিচে মার্কসের মতবাদ প্র.)।

৫০-এর দশকের শেষে ও ৬০-এর দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবনের যুগ মার্কস আবার প্রত্যক্ষ কার্যকলাপের মধ্যে টেনে নেয়। ১৮৬৪ সালে (২৮ সেপ্টেম্বর) লন্ডনে বিখ্যাত প্রথম আন্তর্জাতিক, বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কস ছিলেন এই সমিতির প্রাণস্বরূপ, তার প্রথম ‘অভিভাষণ’ এবং বহুবিধ প্রস্তাব, ঘোষণা ও ইশতেহার তাঁরই রচনা। বিভিন্ন দেশের শ্রমিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করে, বিভিন্ন ধরনের মার্কসপূর্ব অ-প্রলেতারীয় সমাজতন্ত্রকে (মাঙ্গিনি, প্রুধোঁ, বাকুনিন, ইংলন্ডের উদারনৈতিক ট্রেড ইউনিয়নবাদ, জার্মানিতে লাসালপন্থীদের দক্ষিণ দিকে দোদুল্যমানতা ইত্যাদি) সংযুক্ত কার্যকলাপের পথে চালনার চেষ্টা করে এবং এই সব সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলির মতবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে মার্কস বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণির প্রলেতারীয় সংগ্রামের একটি একক রণকৌশল গড়ে তোলেন। যে-প্যারিস কমিউনের অমন সুগভীর, পরিষ্কার, চমৎকার, কার্যকর, বৈপ্লবিক মূল্যায়ন মার্কস উপস্থিত করেন (‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’, ১৮৭১), তার পতন (১৮৭১) ও বাকুনিনপন্থীদের দ্বারা প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যে বিভেদসৃষ্টির পর ইউরোপে তার অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়ল। আন্তর্জাতিকের হেগ কংগ্রেসের (১৮৭২) পর মার্কস আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদকে নিউ ইয়র্কে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল; পৃথিবীর সমস্ত দেশে শ্রমিক আন্দোলনের অপরিমেয় রকমের বৃদ্ধির একটা যুগের জন্যে, তার প্রসারবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ব্যাপক সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক পার্টি সৃষ্টির একটা যুগের জন্যেই তা পথ ছেড়ে দেয়।

আজন্তাতিকে প্রচুর কাজকর্ম এবং তত্ত্ব নিয়ে কাজের জন্যে কঠিনতর পরিশ্রমের ফলে মার্কসের স্বাস্থ্য চূড়ান্তরূপে ভেঙে গিয়েছিল। রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রকে ঢেলে সাজা এবং ‘পুঁজি’ বইখানিকে সম্পূর্ণ করার কাজ তিনি চালিয়ে যান, রাশি-রাশি নতুন তথ্য সংগ্রহ করেন ও একাধিক ভাষা (যথা রুশ) আয়ত্ত করেন, কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যে ‘পুঁজি’ সম্পূর্ণ করা তাঁর আর হয়ে উঠল না।

১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরামকেদারায় বসে শান্তভাবে মার্কস তাঁর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। লন্ডনের হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে মার্কসকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে সমাধিস্থ করা হয়। মার্কসের সন্তানদের মধ্যে কিছু বাল্যাবস্থাতেই মারা যায় লন্ডনে, যখন চরম অভাবের মধ্যে পরিবারটি বাস করছিল, তখন। এলিওনর অ্যাভেলিং, ল্যরা লাফার্গ ও জেনি লোঙ্গে মেয়েদের এই তিনজনের বিয়ে হয় ইংরেজ ও ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে। শেষোক্ত জনের পুত্র ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির একজন সভ্য।

১৩১. ভ. ই. লেনিনের লেখা কার্ল মার্কসের জীবনী-সম্পর্কিত প্রবন্ধের একটি অংশমাত্র এখানে উদ্ধৃত হল। -সম্পা.

২. এপিকিউরস (জীবনকাল আনুমানিক খ্রি. পূ. ৩৪১ সাল থেকে ২৭০ সাল)- প্রখ্যাত প্রাচীন গ্রিক বস্তুবাদী দার্শনিক ও নিরীশ্বরবাদী। সম্পা.

৩. গেওর্গ ভিলহেলম হেগেল (১৭৭০-১৮৩১)- খ্যাতকীর্তি জার্মান বিষয়মুখ ভাববাদী দার্শনিক। ভাববাদী দ্বন্দ্বতাত্ত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সাধন করেন।-সম্পা,

৪. ১৯১৪ সালে গ্রানাত বিশ্বকোষের জন্যে লেখা ড. ই. লেনিনের এই প্রবন্ধটির শেষে মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী সাহিত্যের একটি আলোচনাও সংযোজিত ছিল। এ-বইয়ে সেই পরিশিষ্ট অংশটি মুদ্রিত হয়নি। সম্পা.

৫. ‘Herr Vogt’- জার্মান বুর্জোয়া ডেমোক্রাট কার্ল ফট্-এর যথার্থ স্বরূপ উন্মোচিত করে লেখা মার্কসের বিখ্যাত গ্রন্থ সম্পা.

ভ. ই. লেনিন

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

নিভে গেল মনীষার কিবা দীপশিখা, আহা, কী হৃদয়ে রুদ্ধ হল রে স্পন্দন।?

নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৮৯৫ সালের ৫ আগস্ট (২৪ জুলাই) লন্ডনে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বন্ধু কার্ল মার্কসের পর (১৮৮৩ সালে প্রয়াত) এঙ্গেলসই ছিলেন গোটা সভ্য দুনিয়ায় আধুনিক প্রলেতারিয়েতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মনীষী ও গুরু। কার্ল মার্কসের সঙ্গে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের পরিচয়ের পর থেকে ভাগ্যচক্রে দুই বন্ধুর জীবনকর্ম হয়ে ওঠে তাঁদের সাধারণ অন্বিষ্ট। তাই প্রলেতারিয়েতের জন্যে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস কী করেছেন সেটা বুঝতে হলে আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশে মার্কসের মতবাদ ও ক্রিয়াকলাপের তাৎপর্য পরিষ্কার হৃদয়ঙ্গম করা দরকার। মার্কস ও এঙ্গেলস সর্বপ্রথম দেখান যে শ্রমিক শ্রেণি ও তার দাবিদাওয়া হল বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আবশ্যিক সৃষ্টি, এ-ব্যবস্থা ও তার বুর্জোয়ারা অনিবার্যভাবেই প্রলেতারিয়েতকে সৃষ্ট ও সংগঠিত করে; তাঁরা দেখান, মানবজাতি বর্তমানে যে-দুর্দশায় নিপীড়িত তা থেকে তার পরিত্রাণ ঘটায় বিভিন্ন সজন্যয় ব্যক্তিবিশেষের শুভ প্রচেষ্টা নয়, সংগঠিত প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি-সংগ্রাম। মার্কাস ও এঙ্গেলস তাঁদের বৈজ্ঞানিক রচনায় প্রথম ব্যাখ্যা করেন যে সমাজতন্ত্র স্বপ্নদ্রষ্টার কল্পনা নয়, বর্তমান সমাজের উৎপাদনী শক্তিগুলির বিকাশের চরম লক্ষ্য ১ও অপরিহার্য পরিণাম মাত্র। এ যাবৎকাল সমস্ত লিখিত ইতিহাস হল শ্রেণি-সংগ্রামের ইতিহাস, কতকগুলি সামাজিক শ্রেণির উপর অন্য কতকগুলি শ্রেণির প্রভুত্ব ও ভয়ের পালাবদলের ইতিহাস। এবং তা চলতে থাকবে যতদিন না লোপ পাচ্ছে শ্রেণি-সংগ্রাম ও শ্রেণি-প্রভুত্বের ভিত্তি, অর্থাৎ ব্যক্তিগত মালিকানা ও বিশৃঙ্খল সামাজিক উৎপাদন। প্রলেতারীয় স্বার্থের দাবি হল এই সব ভিত্তির বিলোপ, তাই সংগঠিত শ্রমিকদের সচেতন শ্রেণি-সংগ্রাম চালিত হওয়া চাই এদের বিরুদ্ধে। আর

প্রতিটি শ্রেণি-সংগ্রামই হল রাজনৈতিক সংগ্রাম। আর্জন ও এঙ্গেলসের এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানে আত্মমুক্তির জন্যে সংগ্রামরত সমস্ত প্রলেতারিয়েত আয়ত্ত করেছে, কিন্তু উনিশ শতকের ৪০-এর দশকে যখন দুই বন্ধু তৎকালের সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য ও সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিলেন তখন এ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারেই অভিনব। গুণী ও গুণহীন, সৎ ও অসৎ এমন বহু লোক তখন ছিলেন যাঁরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রামে, রাজা, পুলিস ও যাজকদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আচ্ছন্ন হয়ে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের স্বার্থবিরোধ দেখতেন না। শ্রমিকেরা স্বাধীন সামাজিক শক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হবে এ ভাবনাটাকেই আমল দিতেন না তাঁরা। অন্যদিকে ছিলেন বহু স্বপ্নদর্শীও (কখনও কখনও আবার প্রতিভাবান), তাঁরা ভাবতেন যে সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার অন্যায় বিষয়ে সরকার ও শাসক শ্রেণির প্রত্যয় জাগালেই পৃথিবীতে শান্তি ও সর্বজনীন কল্যাণ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। বিনা সংগ্রামে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন তাঁরা। পরিশেষে, তদানীন্তন সমাজতান্ত্রীদের প্রায় সবাই এবং সাধারণভাবে শ্রমিক শ্রেণির বন্ধুরা প্রলেতারিয়েতকে ভাবতেন একটা দুষ্টক্ষত হিসেবে এবং শিল্পবৃদ্ধির সঙ্গে সে দুষ্টক্ষত কীভাবে বাড়ছে তা দেখে আতঙ্ক হত তাঁদের। সেইজন্যেই এঁরা সকলে ভাবতেন কীভাবে শিল্প ও প্রলেতারিয়েতের বৃদ্ধি রোধ করা যায়, থামানো যায় ‘ইতিহাসের চাকা’। প্রলেতারিয়েতের বৃদ্ধিতে এই সাধারণ ভীতির বিপরীতে মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের সমস্ত ভরসাই রাখলেন প্রলেতারিয়েতের অবিরাম বৃদ্ধির উপর। যত বেশি হবে প্রলেতারিয়েত, বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে ততই বাড়বে তার শক্তি, ততই নিকটতর ও সম্ভবপর হয়ে উঠবে সমাজতন্ত্র। শ্রমিক শ্রেণির জন্যে মার্কস ও এঙ্গেলসের যা অবদান সেটা অল্প কথায় এইভাবে বলা যায়: শ্রমিক শ্রেণিকে তাঁরা আত্মজ্ঞান ও আত্মচেতনার শিক্ষা দেন এবং স্বপ্নদর্শনের স্থানে স্থাপন করেন বিজ্ঞান। এইজন্যেই এঙ্গেলসের নাম ও জীবনের কথা প্রতিটি শ্রমিককে জানতে হবে। এ-কারণে আমাদের সমস্ত প্রকাশনার মতো এই সংকলনটিরও উদ্দেশ্য হল রুশ শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণিগত আত্মচেতনা জাগিয়ে তোলা, এবং তাতে আধুনিক প্রলেতারিয়েতের দুই মহাগুরুর অন্যতম ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের জীবন ও ক্রিয়াকলাপের একটা রূপরেখা দেওয়া।

প্রাশিয়া রাজ্যের রাইন প্রদেশের বার্মেন শহরে ১৮২০ সালে এঙ্গেলস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কারখানার মালিক। ১৮৩৮ সালে সাংসারিক কারণে এঙ্গেলস উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না করেই ব্রেমেনের একটি সওদাগরি হৌসে কর্মচারী হিসেবে ঢুকতে বাধ্য হন। ব্যবসায়িক কাজের মধ্যেও নিজের বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে এঙ্গেলসের বাধা হয়নি। ছাত্র-অবস্থাতেই তিনি স্বৈরাচার ও আমলাদের স্বেচ্ছাচারিতাকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। দর্শনের চর্চা মারফত তিনি আরও অগ্রসর হন। সে-সময় জার্মান দর্শনের ক্ষেত্রে ছিল হেগেলীয় মতবাদের প্রাধান্য, এঙ্গেলস তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। হেগেল স্বয়ং ছিলেন স্বৈরাচারী প্রাশিয়ান সরকারের পক্ষপাতী, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরূপে তিনি তখন তার চাকরিতে বহাল, তাহলেও হেগেলের শিক্ষা ছিল বৈপ্লবিক। মানবিক যুক্তি ও মানবিক অধিকারের উপর হেগেলের বিশ্বাস এবং বিশ্বে পরিবর্তন ও বিকাশের চিরন্তন প্রক্রিয়া চলছে এই মর্মে তাঁর দর্শনের যে মূল প্রতিপাদ্য তার ফলে বার্লিনের এই দার্শনিকের যেসব শিষ্য চলতি অবস্থা মেনে নিতে চাইছিলেন না তাঁরা এই চিন্তায় উপনীত হন যে চলতি অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, চলতি অন্যায় ও প্রভুত্বকারী অমঙ্গলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূল নিহিত রয়েছে চিরন্তন বিকাশের বিশ্বজনীন নিয়মে। সবই যদি বিকশিত হয়ে উঠতে থাকে, যদি একটা প্রতিষ্ঠানের স্থান নেয় অন্য প্রতিষ্ঠান, তবে প্রাশিয়ান রাজা বা রুশ জারের স্বৈরাচারই বা কেন চিরকাল চলবে, কেন চলবে বিপুল অধিকাংশের ঘাড় ভেঙে নগণ্য অল্পসংখ্যকের ধনবৃদ্ধি, জনগণের উপর বুর্জোয়ার প্রভুত্ব? হেগেলের দর্শনে বলা হয়েছিল আত্মার ও ভাবের বিকাশের কথা, এটা ভাববাদী তত্ত্ব। আত্মার বিকাশ থেকে এ দর্শন পৌঁছত প্রকৃতি, মানুষ এবং লৌকিক, সামাজিক সম্পর্কের বিকাশে। বিকাশের চিরন্তন প্রক্রিয়া বিষয়ে হেগেলের ভাবনা অব্যাহত রেখে মার্কস ও এঙ্গেলস আগে-থেকেই ধরে-নেওয়া ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গীটি বর্জন করেন; জীবনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাঁরা দেখলেন যে আত্মার বিকাশ দিয়ে প্রকৃতির বিকাশ ব্যাখ্যা তো হয়ই না বরং উল্টো, প্রকৃতি দিয়ে, পদার্থ দিয়েই ব্যাখ্যা করা উচিত আত্মার… হেগেল ও অন্যান্য হেগেলপন্থীদের বিপরীতে মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন বস্তুবাদী। বিশ্ব ও মানবসমাজের উপর বস্তুবাদী দৃষ্টিপাত করে তাঁরা দেখলেন যে প্রকৃতির সমস্ত ঘটনার পিছনে যেমন আছে বস্তুগত কারণ, মানব-সমাজের বিকাশও তেমনি বস্তুগত, উৎপাদনী শক্তির বিকাশের শর্তাধীন। মানবিক চাহিদা মেটানোর জন্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনে লোকে পরস্পরের সঙ্গে যে সম্পর্ক স্থাপন করে তা নির্ভর করে উৎপাদনী শক্তির বিকাশের উপর। আর এই সম্পর্ক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় সামাজিক জীবনের সমস্ত ঘটনার, মানবিক প্রচেষ্টা, ভাবনাধারণা ও আইনের। উৎপাদনী শক্তির বিকাশ থেকে সৃষ্ট হয় ব্যক্তি-মালিকানার ভিত্তিতে স্থাপিত সামাজিক সম্পর্ক, কিন্তু আবার দেখা যাবে যে উৎপাদনী শক্তির ওই বিকাশেই ফের অধিকাংশের সম্পত্তি লোপ পায় আর তা কেন্দ্রীভূত হয় নগণ্য সংখ্যাল্পের হাতে। বর্তমান সমাজব্যবস্থার যা ভিত্তি সেই মালিকানাই লুপ্ত হয় তাতে, তার বিকাশ হয় সেই লক্ষ্যের দিকে যা গ্রহণ করেছে সমাজতন্ত্রীরা। সমাজতন্ত্রীদের শুধু এইটুকু বুঝতে হবে কোন সামাজিক শক্তি বর্তমান সমাজে তার স্বকীয় অবস্থানের কারণেই সমাজতন্ত্র স্থাপনে আগ্রহী, এবং আপন স্বার্থ ও ঐতিহাসিক কর্তব্যের চেতনা সেই শক্তিতে সঞ্চারিত করতে হবে। এ শক্তি হল প্রলেতারিয়েত। এ শক্তির সঙ্গে এঙ্গেলসের পরিচয় হয় ইংলণ্ডে, ব্রিটিশ শিল্পের কেন্দ্র ম্যাঞ্চেস্টারে, ১৮৪২ সালে। তিনি এখানে এসে একটি সওদাগরি হৌসে চাকরি নেন, তাঁর বাবা ছিলন এ হৌসটির অন্যতম অংশীদার। এঙ্গেলস এখানে কেবল কারখানার আপিসে বসে থাকেননি, শ্রমিকেরা যেখানে গাদাগাদি করে থাকতেন সেই সব নোংরা বস্তির মধ্যে ঘুরে বেড়াতেন তিনি, নিজের চোখে দেখতেন তাদের নিঃস্বতা ও দারিদ্র্য। শুধু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে তৃপ্ত না হয়ে তিনি ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা সম্পর্কে তখন পর্যন্ত যা কিছু প্রকাশিত হয়েছিল সব পাঠ করেন, সাধ্যায়ও সমস্ত সরকারি দলিল তিনি খুঁটিয়ে অধ্যয়ন করেন। এই অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের ফল হল ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘ইংলন্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’। ‘ইংলণ্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’ বইটির লেখক হিসেবে এঙ্গেলসের প্রধান কীর্তি কী তা আমরা আগেই বলেছি।

এঙ্গেলসের আগে অনেকেই প্রলেতারিয়েতের ক্লেশ বর্ণনা করে তাদের সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছেন। এঙ্গেলসই প্রথম বলেন যে প্রলেতারিয়েত শুধু একটি ক্লেশভোগী শ্রেণী নয়; যে লজ্জাকর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে সে রয়েছে, সেই অবস্থাটাই তাকে অপ্রতিরোধ্যরূপে সামনে ঠেলে দিচ্ছে ও নিজের চরম মুক্তির জন্যে সংগ্রামে বাধ্য করছে। আর সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত নিজেই সাহায্য করবে নিজেকে। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন অনিবার্যভাবেই শ্রমিকদের এই চেতনায় উপনীত করাবে যে সমাজতন্ত্র ছাড়া তাঁদের গত্যন্তর নেই। অন্যদিকে, সমাজতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হবে যখন তা হয়ে উঠবে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্য। ইংলণ্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা সম্পর্কে এঙ্গেলসের বইখানির এই হল মূল কথা। চিন্তাশীল ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত এই ভাবনা আজ আত্মস্থ করে নিলেও সে সময়ে এটা ছিল একেবারে নতুন। এ ভাবনা পেশ করা হয়েছিল যে-বইখানায় সেটির রচনাশৈলী মুগ্ধ করার মতো, ইংরেজ প্রলেতারিয়েতের দুর্দশার অতি প্রামাণ্য ও রোমহর্ষক চিত্রে তা পরিপূর্ণ। এই বই হল পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর অভিযোগপত্র। এর প্রভাবও হয়ে ওঠে দূরপ্রসারী। আধুনিক প্রলেতারিয়েতের অবস্থার সেরা ছবি হিসেবে সর্বত্রই এঙ্গেলসের বইটির উল্লেখ শুরু হয়। এবং বাস্তবিকই, শ্রমিক শ্রেণীর দুর্দশার এমন জ্বলজ্বলে ও সত্য বর্ণনা ১৮৫৪ সালের আগে বা পরে আর দেখা যায়নি।

এঙ্গেলস সোশ্যালিস্ট হয়ে ওঠেন কেবল ইংলণ্ডেই। ম্যাঞ্চেস্টারে তিনি তদানীন্তন ইংরেজ শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও ইংরেজদের সমাজতন্ত্রী প্রকাশনাগুলিতে লিখতে শুরু করেন। ১৮৪৪ সালে জার্মানিতে ফেরার পথে প্যারিসে মার্কসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় হয়, চিঠিপত্রের যোগাযোগ আগেই ঘটেছিল। মার্কসও প্যারিসে ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের ও ফরাসি জীনের প্রভাবে সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। দুই বন্ধু এখানে একত্রে লেখেন ‘পবিত্র পরিবার, অথবা সমালোচনামূলক সমালোচনীর সমালোচনা’। বইটি প্রকাশিত হয় ‘ইংলণ্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’ প্রকাশের এক বছর আগে, এবং তার বেশির ভাগটাই ছিল মার্কসের লেখা; বৈপ্লবিক বস্তুবাদী সমাজতন্ত্রের প্রধান যেসব কথা আগে বলেছি, তারই বুনিয়াদ পেশ করা হয় এই বইয়ে। দার্শনিক বাউয়ের ভ্রাতাদের ও তাঁদের অনুগামীদের ব্যঙ্গ করে বলা হল ‘পবিত্র পরিবার’। এই ভদ্রলোকেরা এমন সমালোচনার প্রচার করতেন, যার সবকিছু বাস্তবতার ঊর্ধ্বে, পার্টি ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে, সমস্ত ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপ বর্জন করে পরিপার্শ্বের জগৎ ও তার ঘটনাবলী নিয়ে কেবল ‘সমালোচনামূলক’ অনুধ্যানে ব্যাপৃত থাকত। সর্বশ্রী বাউয়েররা সমালোচনায় অসমর্থ জনতা (uncritical mass) হিসেবে গণ্য করে প্রলেতারিয়েতের প্রতি উন্নাসিক ভাব দেখাতেন। এই কাণ্ডজ্ঞানহীন ও ক্ষতিকর ধারার বিরুদ্ধে মার্কস ও এঙ্গেলস দৃঢ়চিত্তে উঠে দাঁড়ান। শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্র কর্তৃক দলিত শ্রমিক, এই বাস্তব একটি মানবিক ব্যক্তিসত্তার নামে তাঁরা দাবি করেন অনুধ্যান নয়, উন্নত সমাজ গঠনের জন্যে সংগ্রাম। সেরূপ সংগ্রাম চালাতে সমর্থ ও তাতে স্বার্থ সম্পন্ন যে-শক্তি, সেটা তাঁরা অবশ্যই দেখেন প্রলেতারিয়েতের মধ্যে। ‘পবিত্র পরিবারের’ আগেই মার্কস ও রুগে’র Deutsch-Französische Yahrbücher পত্রিকায় এঙ্গেলসের ‘রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ ছাপা হয়, তাতে সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ঘটনাগুলিকে দেখা হয় ব্যক্তি-মালিকানার প্রভুত্বের অনিবার্য পরিণাম হিসেবে। মার্কসের রচনায় যে-বিজ্ঞানে পুরো একটা বিপ্লব ঘটে যায় সেই রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের চর্চা করার জন্যে মার্কস যে সিদ্ধান্ত নেন, তার পিছনে এঙ্গেলসের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনাটা নিঃসন্দেহে কাজ করেছে।

১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত সময়টা এঙ্গেলস ব্রাসেল্স ও প্যারিসে কাটান এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাসেলস্ ও প্যারিসে জার্মান শ্রমিকদের মধ্যে হাতে-কলমের কাজকে মিলিয়ে নেন। এইখানেই গুপ্ত জার্মান সমিতি ‘কমিউনিস্ট লীগ’-এর সঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের যোগাযোগ হয়, এ সঙ্ঘ তাঁদের উপর ভার দেয় তাঁদের রচিত সমাজতন্ত্রের মূলনীতি বর্ণনা করার জন্যে। এইভাবেই জন্ম নেয় ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’। ছোট এই পুস্তিকাখানি বহু বৃহৎ গ্রন্থের মতোই মূল্যবান: সভ্য জগতের সমস্ত সংগঠিত ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত আজও তার প্রেরণায় সজীব ও সচল।

১৮৪৮ সালের যে বিপ্লব প্রথমে ফ্রান্সে শুরু হয়ে পরে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত হয়, তার পরিণতিতে মার্কস ও এঙ্গেলস দেশে ফেরেন। সেখানে, প্রাশিয়ার রাইন অঞ্চলে তাঁরা কলোন থেকে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক Neue Rheinische Zeitung পত্রিকার প্রধান হয়ে উঠেন। প্রাশিয়ার রাইন প্রদেশের সমস্ত বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন দুই বন্ধু। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কবল থেকে জনগণের স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষা করে যান শেষ মাত্রা পর্যন্ত। সবাই জানেন, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি জয়লাভ করে। Neue Rheinische Zeitung নিষিদ্ধ হয়। দেশান্তরী হয়ে জীবনযাপনের সময়ই মার্কস প্রাশিয়ান নাগরিকত্ব হারিয়েছিলেন, এয়ার তাঁকে নির্বাসিত করা হয়; আর এঙ্গেলস সশস্ত্র গণবিদ্রোহে অংশ নেন, তিনটি সংঘর্ষে লড়াই করেন মুক্তির জন্যে, এবং বিদ্রোহীদের পরাজয়ের পর সুইজারল্যান্ড হয়ে লণ্ডনে পালান।

মার্কসও সেখানে বসতি পাতেন। এঙ্গেলস অচিরে ফের কেরানির কাজ নেন ৪০-এর দশকের ম্যাঞ্চেস্টারের সেই সওদাগরি হৌসে, এবং পরে তার অংশীদার হন। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত তিনি থাকেন ম্যাঞ্চেস্টারে আর মার্কস লন্ডনে, এতে তাঁদের জীবন্ত মানসিক যোগাযোগে বাধা হয়নি: প্রায় দৈনিক চিঠির আদান-প্রদান চলত তাঁদের। এই সব পত্রালাপের মধ্যে দিয়ে তাঁরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার বিনিময় করেন এবং একযোগে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যান। ১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লগুনে ফেরেন, এবং ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত চলে তাঁদের কর্মচঞ্চল মিলিত মানসিক জীবন। এর ফল হল মার্কসের দিক থেকে- ‘পুঁজি’, আমাদের যুগের মহত্তম রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রীয় রচনা, আর এঙ্গেলসের দিকে থেকে ছোট-বড়ো একসারি বই। পুঁজিবাদী অর্থনীতির জটিল ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করেন মার্কস। আর অতি সহজ ভাষায়, প্রায়ই বিতর্কমূলক রচনায়, সাধারণ বৈজ্ঞানিক সমস্যা এবং অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে ইতিহাসের বস্তুবাদী বোধ ও মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী লেখেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলসের এই সব রচনার মধ্যে উল্লেখ করব: ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে বিতর্কমূলক রচনা (এখানে দর্শন এবং প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বহু বৃহত্তম প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে), ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ (রুশ ভাষায় অনুবাদ, সেন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে প্রকাশিত, ৩য় সংস্করণ, ১৮৯৫), ‘ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ’ (প্লেখানভের টীকাসহ রুশ অনুবাদ, জেনেভা ১৮৯২), রুশ সরকারের বৈদেশিক নীতির উপর প্রবন্ধ (জেনেভার ‘সঙ্গিয়াল-দেমক্রাত্’ পত্রিকার ১ম ও ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত ও রুশ ভাষায় অনূদিত), বাসস্থান-সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে চমৎকার প্রবন্ধাবলী, এবং পরিশেষে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ সম্পর্কে ছোট হলেও দুটি অতি মূল্যবান নিবন্ধ (‘রাশিয়া প্রসঙ্গে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস’, ভ.ই. জাসুলিচ কর্তৃক রুশ ভাষায় অনূদিত, জেনেভা, ১৮৯৪)। মার্কস মারা যান; পুঁজি বিষয়ে তাঁর বৃহৎ রচনা সম্পূর্ণরূপে গুছিয়ে যেতে পারেননি। খসড়া হিসেবে তা অবশ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর মৃত্যুর পর ‘পুঁজির’ দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড গুছিয়ে তোলা ও প্রকাশ করার গুরুভার শ্রমে আত্মনিয়োগ করেন এঙ্গেলস। ১৮৮৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন দ্বিতীয় এবং ১৮৯৪ সালে তৃতীয় খণ্ড (চতুর্থ খণ্ড গুছিয়ে যেতে পারেননি তিনি)। এই দুই খণ্ড নিয়ে খাটতে হয়েছে অনেক। অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল-ডেমোক্রাট আডলার সঠিকভাবেই বলেছেন যে ‘পুঁজির’ ২য় ও ৩য় খণ্ড প্রকাশ করে এঙ্গেলস তাঁর প্রতিভাবান বন্ধুর যে-মহনীয় স্মৃতিস্তম্ভ গড়েছেন তাতে। তাঁর অনিচ্ছাসত্ত্বেও অক্ষয় অক্ষরে তাঁর নিজের নামটাও ক্ষোদিত হয়ে গেছে। সত্যিই ‘পুঁজির’ এই দুই খণ্ড হল মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনের মিলিত রচনা।

পুরাকথায় বন্ধুত্বের অনেক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্তের কাহিনি শোনা যায়। ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েত একথা বলতে পারে যে তাদের বিজ্ঞান গড়ে দিয়ে গেছেন এমন দুই মনীষী ও যোদ্ধা, যাঁদের সম্পর্ক মানবিক বন্ধুত্বের সর্বাধিক মর্মস্পর্শী সমস্ত প্রাচীন কাহিনিকেও ছাড়িয়ে যায়। এঙ্গেলস সর্বদাই এবং মোটের উপর সঙ্গতভাবেই-নিজেকে রেখেছেন মার্কসের পিছনে। এক পুরনো বন্ধুর কাছে তিনি লেখেন, ‘মার্কস জীবিত থাকাকালে আমি দোহারের কাজ করেছি’। জীবিত মার্কসের প্রতি ভালোবাসার এবং মৃতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার সীমা ছিল না তাঁর। রুক্ষ যোদ্ধা ও কঠোর এই মনীষীর ছিল এক গভীর স্নেহশীল হৃদয়।

১৮৪৮-১৮৪৯ সালের আন্দোলনের পর নির্বাসনকালে মার্কস ও এঙ্গেলস কেবল বিজ্ঞান নিয়েই ব্যাপৃত থাকেননি। ১৮৬৪ সালে মার্কস স্থাপন করেন ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ’ এবং পুরো দশ বছর ধরে তার নেতৃত্ব দেন। এ-সঙ্ঘের কাজকর্মে এঙ্গেলসও সজীব সক্রিয় অংশ নেন। শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশে এই ‘আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ’টির কার্যকলাপের তাৎপর্য বিপুল, মার্কসের মতে দুনিয়ার মজুরকে এক করেছে তা। কিন্তু ৭০-এর দশকে ‘আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ’ বন্ধ হয়ে গেলেও মার্কস ও এঙ্গেলসের শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবিধায়ক ভূমিকার অবসান ঘটেনি। বরং বলা যেতে পারে, শ্রমিক আন্দোলনের মনোজাগতিক নায়ক হিসেবে তাঁদের তাৎপর্য অবিরাম বেড়ে গেছে, কারণ এই আন্দোলনই বেড়ে উঠেছে অবিরত। মার্কসের মৃত্যুর পর এঙ্গেলস একাই ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রীদের উপদেষ্টা ও নেতার কাজ চালিয়ে যান। তাঁর কাছে পরামর্শ ও আদেশ যেমন চাইতেন জার্মান সমাজতন্ত্রীরা (সরকারি দমননীতি সত্ত্বেও এঁদের শক্তি দ্রুত ও অবিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠে), তেমনি চাইতেন পিছিয়ে থাকা দেশের প্রতিনিধিরা (যেমন স্পেন, রুমানিয়া, রাশিয়ার)-ভেবেচিন্তে মেপে মেপে যাঁদের প্রথম-প্রথম পদক্ষেপ করতে হচ্ছিল। বৃদ্ধ এঙ্গেলসের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থেকে এঁরা সকলেই আহরণ করেছেন।

মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই রুশ ভাষা জানতেন, রুশী বই পড়তেন, রাশিয়া নিয়ে জীবন্ত আগ্রহ ছিল তাঁদের, রুশ বিপ্লবী আন্দোলনকে তাঁরা দরদ দিয়ে অনুধাবন করেছেন ও রুশ বিপ্লবীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে গেছেন। এঁরা দুজনেই গণতন্ত্রী থেকে সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন, এবং রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঘৃণার গণতান্ত্রিক বোধ এঁদের মধ্যে ছিল অসাধারণ প্রবল। এই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অনুভূতি এবং তৎসহ রাজনৈতিক স্বৈরাচারের সঙ্গে অর্থনৈতিক পীড়নের সম্পর্ক বিষয়ে গভীর তাত্ত্বিক বোধ ও সমৃদ্ধ জীবনাভিজ্ঞতায় মার্কস ও এঙ্গেলস হয়ে ওঠেন বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যাপারেই অসাধারণ সজাগ। সেই কারণেই পরাক্রান্ত জার সরকারের বিরুদ্ধে মুষ্টিমেয় রুশ বিপ্লবীর বীরোচিত সংগ্রাম অভিজ্ঞ এই বিপ্লবীদের শ্যালয়ে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল সাড়া জাগায়। অন্যদিকে, মেকি অর্থনৈতিক সুবিধা

                                                     চলবে

লাভের জন্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের অতি প্রত্যক্ষ ও জরুরি কর্তব্য থেকে রুশ সমাজতন্ত্রীদের সরে আসার হীন চেষ্টাটা তাঁদের চোখে স্বভাবতই সন্দেহজনক ঠেকেছিল এবং এমনকি সামাজিক বিপ্লবের মহাদর্শের প্রতি সরাসরি বেইমানি বলেই তাঁরা তা গণ্য করেছিলেন। ‘প্রলেতারিয়েতের মুক্তি হওয়া চাই তাদের নিজেদের কাজ’- অবিরাম এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন মার্কস ও এঙ্গেলস। আর নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে সংগ্রাম করতে হলে কিছুটা রাজনৈতিক অধিকারও প্রলেতারিয়েতের জয় করা দরকার। তাছাড়া, মার্কস ও এঙ্গেলস পরিষ্কার দেখেছিলেন যে পশ্চিম-ইউরোপীয় শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষেও রাশিয়ায় রাজনৈতিক বিপ্লবের তাৎপর্য হবে বিপুল। স্বৈরতন্ত্রী রাশিয়া চিরকালই ছিল ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার দুর্গপ্রাকার। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে দীর্ঘকালের মতো বিরোধ বপন করে ১৮৭০ সালের যুদ্ধ রাশিয়াকে যে অসাধারণ অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে স্থাপন করে তাতে অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হিসেবে স্বৈরতন্ত্রী রাশিয়ার তাৎপর্যটাই বেড়েছে। পোলিশ, ফিনিশ, জার্মান, আর্মেনিয়ান ও অন্যান্য ছোট-ছোট জাতিকে যার পীড়ন করার দরকার নেই, দরকার নেই অবিরাম ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জার্মানিকে লাগানোর, তেমন এক স্বাধীন রাশিয়া থাকলেই কেবল বর্তমান ইউরোপ তার সামরিক চাপ থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে, ইউরোপের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল উপাদান দুর্বল হয়ে যাবে, এবং ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণীর শক্তি বেড়ে উঠবে। তাই পশ্চিমে শ্রমিক আন্দোলনের সাফল্যের জন্যেই এঙ্গেলস রাশিয়ায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন সাগ্রহে। তাঁর প্রয়াণে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বন্ধুকে হারাল রুশ বিপ্লবীরা।

প্রলেতারিয়েতের মহা যোদ্ধা ও গুরু ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের স্মৃতি অক্ষয় হোক!

১. নিকোলাই আলেক্সেয়েভিচ নেক্রাসভের লেখা ‘দব্রলিউবভ-স্মরণে’ শীর্ষক কবিতাটি থেকে। -সম্পা

২. মার্কস ও এঙ্গেলস একাধিকবার দেখিয়েছেন যে তাঁদের মানসিক বিকাশ বহুদিক থেকে মহান জার্মান দার্শনিকদের, বিশেষ করে হেগেলের নিকট ঋণী। এঙ্গেলস বলেছেন, ‘জার্মান দর্শন না থাকলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রও সম্ভব হত না। (লেনিনের টীকা)

৩. এটি একটি আশ্চর্য সমৃদ্ধ ও শিক্ষাপ্রদ গ্রন্থ। দুঃখের বিষয়, সমাজতন্ত্রের বিকাশের ঐতিহাসিক রূপরেখা সংবলিত এ-গ্রন্থের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র এ-পর্যন্ত রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে (‘বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রের বিকাশ’, দ্বিতীয় সংস্করণ, জেনেভা, ১৮৯২ সাল)। (লেনিনের টীকা)

                                             পোল  লাফার্গ–মার্কস-স্মরণে ১

মানুষ ছিলেন তিনি, দোষেগুণে যথার্থ মানুষ, অমন মানুষ আমি এ-জীবনে দেখব না কখনও।

(শেক্সপীয়র, ‘হ্যামলেট’, প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য)

কার্ল মার্কসের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৮৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর আগে ১৮৬৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনের সেন্ট মার্টিন্স হলে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে প্রথম আন্তর্জাতিকের পত্তন হয়। আর আমি ওই ফেব্রুয়ারিতে প্যারিস থেকে লণ্ডনে আসি প্যারিসের নতুন সংগঠনটির হালচালের খবরাখবর মার্কসকে জানাতে। বর্তমানে যিনি ফ্রান্সের বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রের সেনেটর সেই ম. তোল্যা সে সময়ে আমাকে একখানি পরিচয়পত্র দেন।

আমার বয়স তখন ২৪ বছর। ওই প্রথম দর্শন আমার মনে সে সময়ে যে রেখাপাত করেছিল যতদিন বাঁচব তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। মার্কসের শরীর তখন ভালো যাচ্ছিল না। ‘পুঁজি’ বইটির প্রথম খণ্ডটি লিখছিলেন তিনি। খণ্ডটি অবশ্য তার পরেও দুই বছর, অর্থাৎ ১৮৬৭-র, আগে প্রকাশিত হয়নি। আরব্ধ কাজ শেষ করে যেতে পারবেন না ভেবে ভয় পাচ্ছিলেন তিনি আর তাই অল্পবয়সী মানুষজন দেখা করতে এলে ভারি খুশি হতেন। ওর মুখের বুলি ছিল তখন, ‘আমার পরেও যাতে কমিউনিস্ট প্রচার চালানো সম্ভব হয় তার জন্যে লোকজনকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে আমায়।’

কার্ল মার্কস ছিলেন সেই ধরনের বিরল ব্যক্তিদের একজন একই সঙ্গে যাঁরা বিজ্ঞান ও জনজীবনের ক্ষেত্রে ছিলেন নেতৃত্ব দিতে সমর্থ এই দুটো দিক তাঁর মধ্যে এত ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল যে একমাত্র বিদ্বজ্জন ও সমাজতন্ত্রী যোদ্ধা এই দুই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য একই সঙ্গে হিসেবের মধ্যে ধরলে তবেই তাঁকে বোঝা সম্ভব। মার্কসের মত ছিল এই যে গবেষণার চরম ফলাফল কী হবে তার পরোয়া না রেখেই বিজ্ঞানের জন্যে বিজ্ঞানের চর্চা চালিয়ে যাওয়া উচিত। তবে, তিনি এটাও মনে করতেন যে সমাজজীবনে সক্রিয়ভাবে যোগদান না করা কিংবা রেশমের মধ্যে গুটিপোকার মতো নিজেকে পড়ার ঘরে বা লেবরেটরিতে আবদ্ধ করে রাখা এবং সমকালীনদের জীবন, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা বিজ্ঞানীর পক্ষে আত্মাবমাননা ছাড়া কিছু নয়।

মার্কস বলতেন, ‘বিজ্ঞানচর্চাকে স্বার্থপর আনন্দ-উপভোগে পরিণত করা ঠিক নয়। বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করার মতো সৌভাগ্য অর্জন করেছে যারা, অর্জিত জ্ঞানকে মানুষের সেবায় তাদেরই সর্বপ্রথম কাজে লাগানো উচিত।’ তাঁর একটি প্রিয় বুলিই ছিল: ‘মানুষের জন্যে কাজ কর।’

শ্রমিক শ্রেণীর দুঃখকষ্টের জন্যে যদিও তাদের প্রতি মার্কসের সহমর্মিতা ছিল গভীর, তবু কমিউনিস্টশোভন দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করেছিলেন তিনি ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে নয় বরং ইতিহাস ও রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের চর্চার ফলেই। তিনি বলতেন, পুঁজিবাদী স্বার্থের প্রভাব থেকে মুক্ত এবং শ্রেণীগত কুসংস্কারে অন্ধ নয় এমন যে-কোনো পক্ষপাতশূন্য মনকে অবশ্যই এই এক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।

সে যাই হোক, পূর্বনির্ধারিত কোনো মতামত পোষণ না করে মানবসমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশের অনুধাবনে রত থাকার সময়ে কলম ধরার পিছনে মার্কসের অপর কোনোই উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল তিনি চেয়েছিলেন গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলি প্রচার করতে এবং যে-সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন তখনও পর্যন্ত কল্পস্বর্গ স্থাপনের স্বপ্নবাষ্পে আচ্ছন্ন ছিল তাকে একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যুগিয়ে দেওয়ার দৃঢ়সংকল্পই ছিল তাঁর অবলম্বন। যে-শ্রমিক শ্রেণীর ঐতিহাসিক ব্রত হল সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব অর্জনের পরে-পরেই কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা, একমাত্র সেই শ্রেণীর বিজয়কে অগ্রসর করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই স্বীয় মতামত প্রকাশ্যে প্রচার করেছিলেন তিনি।

যে দেশে জন্ম নিয়েছিলেন একমাত্র সেই দেশে নিজ কার্যকলাপকে সীমাবদ্ধ রাখেননি মার্কস। তিনি বলতেন, ‘আমি হলুম গিয়ে বিশ্ব-নাগরিক। যেখানেই থাকি না কেন সেইখানেই আমি সক্রিয়।’ বস্তুত, তৎকালীন ঘটনাবলী ও রাজনৈতিক নির্যাতন ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইংলণ্ড যে দেশেই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে কিছু এসে যায়নি তাতে সে দেশেই বৈপ্লবিক আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছেন তিনি।

অবশ্য মেটল্যান্ড পার্ক রোডের বাড়িতে পড়ার ঘরে সেদিন প্রথম যাঁকে দেখি আমি, তিনি অক্লান্ত ও অতুলনীয় সমাজতন্ত্রী প্রচারক নন, বরং বলা যায় ধ্যানী বিজ্ঞানী। ওই পড়ার ঘরটি ছিল সেই কেন্দ্র যেখানে সভ্য জগতের দূর-দূরান্তের সকল অঞ্চল থেকে পার্টি কমরেডরা আসতেন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাগুরুর মতামত জানতে। মার্কসের মানসিক জীবনের অন্তরঙ্গতায় প্রবেশ করতে হলে এই ঐতিহাসিক ঘরখানির পরিচয় আগে জানা দরকার।

ঘরখানা ছিল বাড়ির দোতলায়। টানা একটা জানলা দিয়ে আলো এসে ভরে দিত ঘরখানা। জানলা দিয়ে চোখে পড়ত পার্কের দৃশ্য। জানলার বিপরীত দিকে ঘর-গরমের চুল্লীর দু-পাশে দেয়াল জুড়ে ছিল বইয়ের তাক। তাকগুলো ছিল বইয়ে ভরা আর ছাদ পর্যন্ত উঁচু হয়ে ওঠা খবরের কাগজ আর পাণ্ডুলিপিতে ঠাসা। চুল্লীর বিপরীত দিকে জানলার একপাশে থাকত দুটো টেবিল, তার উপর কাগজপত্র, বই আর খবরের কাগজের স্তূপ। ঘরের মাঝখানে সবচেয়ে আলোকিত জায়গাটায় ছিল একখানা ছোট্ট সাদাসিধে ডেস্ক (তিন ফুট দুই ফুট আয়তনের) আর একখানা কাঠের আর্মচেয়ার। আর্মচেয়ার আর পিছনের বইয়ের তাকগুলোর মাঝখানে, জানলার বিপরীত দিকে ছিল চামড়ায়-মোড়া একটা সোফা। সময়ে সময়ে বিশ্রামের জন্যে এই সোফাটায় এসে শুতেন মার্কস। চুল্লীর উপরকার তাকে থাকত আরও কিছু বই, চুরুট আর দেশলাই, তামাকের বাক্স, কাগজ-চাপা আর কিছু ছবি- মার্কসের স্ত্রী আর মেয়েদের, ভিলহেল্ম ভল্ফ আর ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের।

মার্কস ছিলেন কড়া ধূমপায়ী। কথায় কথায় একবার আমায় বলেছিলেন, ‘পুঁজি’ বইটা লেখার সময় যত চুরুট ফুঁকেছি বইটা থেকে এমন কি তারও দাম উঠবে না।’

তবে দেশলাইয়ের খরচ ছিল তাঁর এর চেয়েও বেশি। পাইপ বা চুরুট টানতে এত ঘনঘন ভুলে যেতেন তিনি আর সেগুলো জ্বালাতে অল্প সময়ের মধ্যে এমন বাক্সের-পর-বাক্স দেশলাই খালি করে ফেলতেন যে তার সংখ্যা দেখলে অবিশ্বাস্য ঠেকত। বই কিংবা কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে কিংবা বলা চলে অগোছালো করতে- কাউকেই দিতেন না তিনি। বইপত্রের অগোছালো ভাবটা ছিল আপাত-বিশৃঙ্খলা, আসলে সবকিছুই থাকত তাদের নির্দিষ্ট জায়গায়, ফলে দরকার পড়লেই নির্দিষ্ট বই কিংবা নোটবইটি হাতের কাছে পেয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সহজ হত। এমন কি আলাপের সময়েও প্রায়ই থেমে বই টেনে নিতেন, আর ঠিক তখন যে-বিষয়ের উল্লেখ করছিলেন বই থেকে তার সপক্ষে উদ্ধৃতি কিংবা পরিসংখ্যানের নজির দেখাতেন। তিনি ও তাঁর পড়ার ঘর ছিল হরিহরাত্মা: নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যতখানি তাঁর আয়ত্তে ছিল ঠিক ততখানিই আয়ত্তে ছিল ওই পড়ার ঘরের বই আর কাগজপত্রগুলি।

বই সাজানোর ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সামঞ্জস্যরক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না মার্কসের: তাঁর বইয়ের তাকে নানা আকার-আয়তনের বই আর পুস্তিকা পাশাপাশি রাখা থাকত। বইপত্র সাজিয়ে রাখতেন তিনি বিষয়বস্তু অনুসারে, আকার অনুযায়ী নয়। বই ছিল তাঁর কাছে মনের হাতিয়ার, বিলাসদ্রব্য নয়। মার্কস বলতেন, ‘ওরা আমার দাস, যেমনটি চাইব সেইভাবে আমার কাজে লাগতে হবে ওদের।’ বইয়ের আকার বা বাঁধাই, কাগজ বা টাইপের গুণাগুণ- এ সবে ভ্রূক্ষেপ ছিল না তাঁর; অবলীলায় তিনি পাতার কোণ মুড়ে রাখতেন, মার্জিনে পেন্সিল দিয়ে চিহ্ন দিতেন, লাইনকে লাইন দাগিয়ে রাখতেন। বইয়ের মার্জিনে লেখা অভ্যাস ছিল না তাঁর, তবে বইয়ের লেখক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন মনে হলে কখনও কখনও এক-আধটা বিস্ময়সূচক কিংবা জিজ্ঞাসার চিহ্ন দেগে দেওয়া থেকে আত্মসংবরণ করতে পারতেন না। লেখার নিচে দাগ দেওয়ার তাঁর যে পদ্ধতি ছিল, তাতে যে কোনো বই থেকে। প্রয়োজনীয় অনুচ্ছেদ খুঁজে পাওয়া তাঁর পক্ষে সহজ হত। বহুদিন পরে পরে নোটবইগুলো আর বইয়ের নিম্নরেখ অনুচ্ছেদগুলো ফিরে-ফিরতি পড়ার একটা অভ্যাস ছিল তাঁর, স্মৃতিতে সেগুলো জীইয়ে রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হত। মার্কসের ছিল অসামান্য নির্ভরযোগ্য স্মৃতিশক্তি- হেগেলের উপদেশ অনুযায়ী অপরিচিত বিদেশি ভাষায় লেখা কবিতা তরুণ বয়স থেকে কণ্ঠস্থ করে এই শক্তিকে বাড়িয়ে তুলেছিলেন তিনি।

হাইনে আর গ্যয়টের কাব্য ছিল কণ্ঠস্থ, কথাবার্তায় হামেশাই তাঁদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। সকল ইউরোপীয় ভাষার কবিদের তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী পাঠক। প্রতি বছর একবার করে মূল গ্রিক ভাষায় ইস্কাইলস পড়ার তাঁর অভ্যাস ছিল। তিনি মনে করতেন মানবসমাজ যত নাট্য-প্রতিভার জন্ম দিয়েছে তাঁদের মধ্যে দুই মহত্তম স্রষ্টা হলেন ইস্কাইলস আর শেক্সপীয়র। শেক্সপীয়রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম: কবির রচনাবলী একেবারে খুঁটিয়ে পড়েছিলেন তিনি, এমন কি সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটিও ছিল মার্কসের নখদর্পণে। এই মহান ইংরেজ নাট্যকারের প্রতি সমগ্র মার্কস পরিবারের ছিল সত্যিকার অচলা ভক্তি; শেক্সপীয়রের বহু রচনাই মার্কসের তিন মেয়ের কণ্ঠস্থ ছিল। আগেই ইংরেজি পড়তে পারতেন মার্কস, কিন্তু ১৮৪৮ সালের পর তিনি যখন ওই ভাষায় তাঁর দখল পাকাপোক্ত করতে মনস্থ করলেন তখন শেক্সপীয়রের নিজস্ব শব্দ ও বাকভঙ্গি খুঁজে বের করে তার একটা তালিকা পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছিলেন। উইলিয়ম কবেট সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল উঁচু, কবেটের বিতর্কমূলক রচনার অংশবিশেষ থেকেও ওইভাবে শব্দচয়ন করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রিয় কবিদের তালিকায় দান্তে আর রবার্ট বার্নও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; মেয়েরা যখন এই শেষোক্ত স্কটিশ কবির ব্যঙ্গ-কবিতা আবৃত্তি করতেন কিংবা তাঁর রচিত গাথাগুলি গাইতেন তখন পরমানন্দে তা উপভোগ করতেন মার্কস।

প্রসঙ্গত উল্লেখ যে প্যারিস মিউজিয়মের ডিরেক্টর, অক্লান্ত কর্মী ও নানা বিজ্ঞানে পারদর্শী পণ্ডিত, ক্যুভিয়ের ব্যক্তিগত ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ওই মিউজিয়মে তাঁর জন্যে কয়েকখানা ঘরের একটা স্যুইট নির্দিষ্ট ছিল। এই স্যুইটের প্রত্যেকটি ঘর নির্দিষ্ট থাকত একেকটি বিশেষ ধরনের কাজের জন্যে এবং সে-উদ্দেশ্যে ঘরটি সাজানো থাকত উপযুক্ত বইপত্র, যন্ত্রপাতি, শারীরস্থান-সংক্রান্ত সহায়ক যন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে। এক ধরনের কাজ করতে করতে যখন ক্লান্তিবোধ করতেন ক্যুভিয়ে তখন পাশের ঘরে চলে গিয়ে অন্য ধরনের কাজ শুরু করতেন: বলা যায়, মনঃসংযোগের এই স্বল্পায়াস পরিবর্তনের ফলে তিনি নাকি বিশ্রাম পেতেন।

ক্যুভিয়ের মতো মার্কসও ছিলেন অক্লান্ত কর্মী, কেবল অতগুলো পড়ার ঘরের সরঞ্জাম যোগানোর সামর্থ্য ছিল না তাঁর। তিনি বিশ্রাম নিতেন শুধু পড়ার ঘরে পায়চারি করেই। ফলে ঘরের দোরগোড়া থেকে জানলা পর্যন্ত গালচের একফালি অংশ কালক্রমে জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, মাঠের মধ্যেকার পায়ে চলা পথের মতো দাগ ধরে গিয়েছিল তাতে।

সময়ে-সময়ে সোফাটায় শুয়ে পড়ে উপন্যাস পড়তেন। কখনও কখনও একই সঙ্গে কয়েকখানা উপন্যাসও পড়তেন তিনি, ঘুরে ঘুরে একেক বার একেক খানা বই একটু একটু করে। ডারউইনের মতো মার্কসও ছিলেন একেবারে উপন্যাসের পোকা; তাঁর পছন্দ ছিল আঠারো শতকের উপন্যাস, বিশেস করে ফিল্ডিঙের ‘টম জোন্স’ বইটি। অপেক্ষাকৃত আধুনিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে তাঁর কাছে সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক ঠেকত পোল দ্য কক, চার্লস লেভার, বয়োজ্যেষ্ঠ আলেক্সান্দর দ্যুমা ও ওয়াল্টার স্কটের রচনাবলী; স্কটের ‘ওল্ড মর্টালিটি’ বইটিকে তো সেরা শিল্পকর্ম বলেই গণ্য করতেন। অ্যাডভেঞ্চার আর হাসির গল্পের দিকে স্পষ্টতই পক্ষপাতিত্ব ছিল তাঁর।

সেভান্তেস আর বালজাককে আর সব ঔপন্যাসিকের চেয়ে বড় বলে মনে করতেন মার্কস। ‘ডন কিকসোর্ট’-এর মধ্যে তিনি সন্ধান পেয়েছিলেন ধ্বংসমুখ সেই বীরব্রতের মহাকাব্যের তৎকালীন বিকাশোম্মুখ বুর্জোয়া জগতে যার সদ্গুণাবলী ছিল ব্যঙ্গবিদ্রূপ উপহাসের বস্তু। বালজাকের তিনি এত ভক্ত ছিলেন যে ভেবেছিলেন রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্র বিষয়ে বই লেখা শেষ করেই বালজাকের মহৎ রচনাবলী La Comédie Humaine’-এর একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখে ফেলবেন। বালজাককে শুধু যে তাঁর যুগের ইতিহাসবেত্তা জ্ঞান করতেন মার্কস তাই নয়, লুই ফিলিপের রাজত্বকালে যে-সব চরিত্র ছিল ভ্রূণাকারে এবং লেখকের প্রয়াণের পর তৃতীয় নাপোলেয়র আমলে একমাত্র যেগুলি পূর্ণপরিণত হয়ে উঠেছিল সেই সব সম্ভাব্য চরিত্রের ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিমান স্রষ্টা বলেও তাঁকে মনে করতেন।

* সকল ইউরোপীয় ভাষাই পড়তে পারতেন মার্কস আর লিখতে পারতেন জার্মান, ফরাসি আর ইংরেজি ভাষায়। তাঁর এই লেখার ক্ষমতা এমনকি ভাষাবিদদেরও। প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ‘জীবন-সংগ্রামে বিদেশি ভাষা হচ্ছে হাতিয়ারের সামিল’-কথা ক’টি বারবার বলে আনন্দ পেতেন তিনি।

নানা ভাষা আয়ত্ত করার প্রতিভা ছিল তাঁর অসামান্য। তাঁর মেয়েরাও উত্তরাধিকারসূত্রে বাপের এই গুণটি পেয়েছিলেন। রুশ ভাষা শিখতে শুরু করেন তিনি যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ অতিক্রম করে গেছে। যদিও ওই ভাষার সঙ্গে মার্কসের জানা আধুনিক বা প্রাচীন কোনো ভাষারই ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য ছিল না, তবু মাত্র মাস ছয়েকের মধ্যে ভাষাটি তিনি এতদূর ভালোভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে রুশ কবি ও গদ্যলেখকদের রচনা পড়ে তা থেকে আনন্দ পাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছিলেন। রুশ

কবি ও লেখকদের মধ্যে তাঁর পছন্দ ছিল পুস্ক্রিন, গোগল ও শ্চেদ্রিনের রচনা। সরকারি তদন্তের যে রিপোর্টগুলি রাজনৈতিক সত্য উদ্‌ঘাটনের কারণে তৎকালীন রুশ গভর্নমেন্ট প্রকাশ না করে চেপে দিয়েছিল সেগুলি যাতে পড়তে পারেন এই উদ্দেশ্যেই রুশ ভাষা শিখেছিলেন তিনি। গুণগ্রাহী বন্ধুরা ওই সব দলিল মার্কসের জন্যে সংগ্রহ করেছিলেন; ফলে সারা পশ্চিম ইউরোপে তিনিই ছিলেন নিশ্চিতভাবে একমাত্র রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রী ওই দলিলগুলি সম্পর্কে যাঁর জ্ঞানগম্যি ছিল। কবি ও ঔপন্যাসিকদের রচনাপাঠ ছাড়াও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়ার অপর একটি আশ্চর্য উপায় আবিষ্কার করেছিলেন মার্কস, তা হল অঙ্ক কষা। গণিতের প্রতি তাঁর একটা বিশেষ ধরনের ঝোঁক ছিল। বীজগণিত এমনকি তাঁকে মানসিক সান্ত্বনা পর্যন্ত জোগাত, ঘটনাবহুল জীবনে সবচেয়ে মনোকষ্টের মুহূর্তগুলিতে তিনি শরণ নিতেন এই অঙ্কশাস্ত্রটির। স্ত্রীর শেষ অসুখের দিনগুলিতে স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক কাজে মন দিতে পারতেন না তিনি, আর তখন স্ত্রীর রোগযন্ত্রণার দরুন যে-মনোকষ্ট ভোগ করতেন তা ভুলে থাকতেন একমাত্র অঙ্ক কষায় ডুবে থেকে। মানসিক কষ্টভোগের ওই সময়টায় তিনি লিখে ফেলেছিলেন অণুকলন (infinitesimal calculus)-বিষয়ক উচ্চতর গণিতের একখানা বই। বিশেষজ্ঞদের মতে বইখানির বৈজ্ঞানিক মূল্য অপরিসীম। উচ্চতর গণিতের মধ্যে মার্কস প্রত্যক্ষ করেছিলেন দ্বান্দ্বিক গতির সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ও ওই একই সঙ্গে সরলতম নমুনা। তিনি এই মত পোষণ করতেন যে, কোনো বিজ্ঞানকেই সত্যিকার পরিণত বিজ্ঞান আখ্যা দেওয়া চলে না যতক্ষণ না তা গণিতের ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছে।

যদিও মার্কসের নিজস্ব গ্রন্থাগারে তাঁর সারা জীবনব্যাপী গবেষণাকার্যের সঙ্গে সঙ্গে সযত্নে সংগৃহীত হাজার খানেকেরও বেশি বই ছিল, তবু তাঁর পক্ষে তা যথেষ্ট ছিল না। বেশ কয়েক বছর ধরে তাই নিয়মিতভাবে ব্রিটিশ মিউজিয়মে গিয়ে পড়াশুনো করেছিলেন তিনি। ওই গ্রন্থগারের গ্রন্থ-তালিকার প্রশংসায় তিনি ছিলেন পঞ্চমুখ। এমনকি মার্কসের প্রতিপক্ষীয়রাও তাঁর বহুবিস্তৃত ও প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য হতেন। তাঁর নিজস্ব বিষয় রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, ইতিহাস, দর্শনশাস্ত্র ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এটা ছিল প্রযোজ্য।

যদিও অনেক রাত করে শুতে যেতেন মার্কস তবু সর্বদাই সকাল আটটা থেকে নটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে পড়তেন। তারপর খানিকটা কালো কফি খেয়ে নিয়ে খবরের কাগজগুলো দেখতেন। অতঃপর ঢুকতেন গিয়ে পড়ার ঘরে, রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত সেখানে কাজ করতেন তিনি। একমাত্র খাওয়ার সময়গুলোয় তিনি কাজ বন্ধ রাখতেন, আর বন্ধ রাখতেন আবহাওয়া অনুকূল থাকলে সন্ধের দিকে হ্যাম্পস্টেড হীথে এক চক্কর বেড়ানোর জন্যে। কখনও কখনও দিনের বেলায় ঘণ্টা খানেক কি ঘণ্টা দুই সোফায় শুয়ে ঘুমিয়েও নিতেন। যৌবন-বয়সে প্রায়ই রাত জেগে কাজ করা তাঁর অভ্যাস ছিল।

কাজ করাটা ছিল মার্কসের নেশা। কাজে এমন ডুবে থাকতেন যে প্রায়ই খেতে পর্যন্ত ভুলে যেতেন। প্রায়ই বেশ কয়েক বার ডাকাডাকির পর তবে তিনি খাবার ঘরে নেমে আসতেন, আর শেষ গ্রাস মুখে তোলা সাঙ্গ হতে না হতেই ফের ফিরে যেতেন পড়ার ঘরে।

মার্কস ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পাহারী, এমন কি ক্ষুধামান্দ্যে ভুগতেন পর্যন্ত। ক্ষুধামান্দ্য কাটানোর চেষ্টায় রাঙের মাংস, ধোঁয়ায়-জরানো মাছ, কেভিয়ার, আচার ইত্যাদি উন্ন গন্ধওয়ালা খাবার খেতেন। মস্তিষ্কের প্রবল সক্রিয়তার কারণে ভুগতে হত তাঁর পাকস্থলীকে।

মস্তিষ্কের পায়ে সারা শরীরটাকে বলি দিয়েছিলেন মার্কস; মস্তিষ্কচালনায় ছিল তাঁর সবথেকে বেশি আনন্দ। দর্শনশাস্ত্রে তাঁর যৌবনকালের দীক্ষাগুরু হেগেলের এই কথা কটির পুনরাবৃত্তি প্রায়ই করতে শুনতুম তাঁকে: ‘নভোমণ্ডলের বিস্ময়ের চেয়ে যে-কোনো অপরাধীর এমনকি অপরাধচিন্তারও চমৎকারিত্ব আর মহত্ত্ব বেশি’।

জীবনযাপনের এই অস্বাভাবিক ধরন এবং ক্লান্তিকর মননক্রিয়ার ধকল সামলাতে তাঁর শারীরিক গঠনকে রীতিমতো জোরদার হতে হয়েছিল। বস্তুত তাঁর শারীরিক গঠন ছিল শক্তিশালী। তিনি ছিলেন গড়পড়তা লোকের চেয়ে বেশি লম্বা, কাঁধ দুটো ছিল বেশ চওড়া, বুকটা সুগঠিত, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুসমঞ্জস যদিও ইহুদিদের ক্ষেত্রে প্রায়ই যেমন দেখা যায় তেমনই পা দুটোর চেয়ে তুলনার তাঁর মেরুদণ্ড ছিল কিছুটা বেশি লম্বা। অল্পবয়সে যদি ব্যায়ামচর্চা অভ্যাস করতেন মার্কস তাহলে রীতিমতো শক্তিমান পুরুষ হয়ে উঠতে পারতেন। একমাত্র যে শারীরিক ব্যায়াম নিয়মিতভাবে সারা জীবন চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি তা হল পায়ে হাঁটা: অনবরত কথা বলতে বলতে আর চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে কিংবা টিলার চড়াই ভাঙতে পারতেন তিনি, অথচ বিন্দুমাত্র ক্লান্ত হতেন না। বলা যেতে পারে, এমন কি ঘরের মধ্যেও হাঁটতে হাঁটতে কাজ করতেন মার্কস আর হাঁটার সময়ে যা ভাবতেন তা লিখে ফেলার জন্যে মাঝে-মাঝে অল্প একটুক্ষণ বসতেন। কথা বলার সময়েও তিনি পায়চারি করতে ভালোবাসতেন, কেবল ব্যাখ্যাটা যখন বেশি প্রাণবন্ত কিংবা কথাবার্তা গুরুগম্ভীর হয়ে উঠত তখন থেকে থেকে দাঁড়িয়ে পড়তেন।

বহু বছর ধরে হ্যাম্পস্টেড হীথে আমি ছিলুম তাঁর সান্ধ্য ভ্রমণের সঙ্গী। ওই সময়ে মাঠে-মাঠে তাঁর পাশে পাশে পায়চারি করার ফাঁকে ফাঁকে অর্থশাস্ত্রে আমার হাতেখড়ি হয়। ‘পুঁজি’ বইটির প্রথম খণ্ড লেখার সময়ে এইভাবে গোটা খণ্ডটির যাবতীয় বিষয়বস্তু আমার কাছে ব্যাখ্যা করে বোঝান। তিনি যে লেখার পরিকল্পনা আগে থেকে ফাঁস করে দিচ্ছেন সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল না তাঁর।

বাড়ি ফেরার পর সর্বদাই যা শুনেছি তা আমার সাধ্যমতো লিখে রাখতুম তখন। মার্কসের গভীর ও জটিল যুক্তিধারা অনুসরণ করা প্রথম প্রথম আমার পক্ষে কঠিন হত। দুঃখের বিষয় ওই মূল্যবান লেখাগুলো পরে আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়, কারণ প্যারিস কমিউনের পর প্যারিসে ও বোর্দোয় আমার যাবতীয় কাগজপত্র পুলিশ তছনছ করে দেয়।

ওই সময়ে এক সন্ধেয় মার্কস তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বহুবিধ প্রমাণ ও বহুমুখ বিবেচনার ফোয়ারা ছুটিয়ে মানবসমাজের ক্রমবিকাশ-সম্পর্কিত তাঁর চমৎকার তত্ত্বটির যে ব্যাখ্যা দেন সে সম্পর্কিত আমার নেওয়া নোটগুলোও গেছে হারিয়ে আজ এই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ। সেদিন মনে হয়েছিল যেন আমার দিব্যচোখ খুলে গেল। বিশ্ব-ইতিহাসের বিকাশের অন্তর্নিহিত যুক্তিসঙ্গতি সেই প্রথম স্বচ্ছভাবে চোখে পড়ল আমার, এবং সমাজ ও মতাদর্শের বিকাশের সঙ্গে তাদের বৈষয়িক উৎসের সম্পর্কের মতো অমন একটা আপাত বিরোধী ব্যাপার ধরা পড়ল আমার কাছে। যেন একেবারে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমার। এই অনুভূতি বহু বছর পর্যন্ত আমার মধ্যে জীবন্ত হয়েছিল।

মাদ্রিদের সমাজতন্ত্রীদের মনের অবস্থা ঠিক ওই একই হয়েছিল যখন আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্যে যতদূর কুলিয়েছিল সেই অনুযায়ী তাঁদের কাছে মার্কসের এই সবচেয়ে চমকপ্রদ তত্ত্বটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলুম। বলা বাহুল্য, মানবমস্তিষ্কে এ পর্যন্ত যত ভাবনাচিন্তার উদয় ঘটেছে এই তত্ত্বটি তাদের মহত্তমদের মধ্যে একটি।

ইতিহাস ও প্রকৃতিবিজ্ঞান থেকে সংগৃহীত তথ্যের অবিশ্বাস্য সম্ভারে ও দার্শনিক তত্ত্বসমূহের হাতিয়ারে ঠাসা ছিল মার্কসের মস্তিষ্কের তৃণীর। বছরের পর বছর ধরে মানসিক শ্রমসঞ্জাত এই জ্ঞান ও নিরীক্ষাকে কার্যক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহারে অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর। যে কেউ যে কোনো সময়ে আর যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করে তাঁর কাছ থেকে আশ মিটিয়ে যতদূর সম্ভব বিশদ উত্তর পেয়ে যেত, আর সর্বদাই উপরিপাওনা হিসেবে ওই উত্তরের সঙ্গে জড়িত থাকত সাধারণীকৃত নানা দার্শনিক ভাবনা। বন্দরে যাত্রার জন্যে তৈরি যুদ্ধজাহাজের মতো মার্কসের মস্তিষ্ক ছিল চিন্তার যে কোনো পারাবারে পাড়ি জমাতে একেবারে কোমর বেঁধে প্রস্তুত।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ‘পুঁজি’ বইটি আমাদের কাছে এমন একটি মনের স্বরূপ উদঘাটিত করে দেয় যে মন আশ্চর্য প্রাণশক্তি ও উন্নততর জ্ঞানের অধিকারী। কিন্তু আমার কাছে, এবং মার্কসকে যাঁরা অন্তরঙ্গভাবে জানতেন তাঁদের সকলের কাছেই, কি ‘পুঁজি’ বইটি কি তাঁর অন্য কোনো রচনা কোথাওই তাঁর প্রতিভার বিরাটত্ব কিংবা তাঁর জ্ঞানের বহুবিস্তৃত পরিধি পুরোপুরি প্রতিফলিত নয় বলে ঠেকে। নিজের সৃষ্টির চেয়েও তিনি ছিলেন বহুগুণে উন্নততর, মহত্তর।

মার্কসের সঙ্গে একত্রে কাজ করেছি আমি, অর্থাৎ আমি ছিলুম কলম পিবিয়ে, তিনি বলে যেতেন আর আমি লিখতুম মাত্র। তবু ওরই ফলে আমার সুযোগ মিলেছিল তাঁর চিন্তনের ও লেখার ধরন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার। বই লেখার কাজ তাঁর পক্ষে যেমন সহজ ছিল তেমনই একই সঙ্গে ছিল কঠিনও। কাজটা সহজ দিল এই কারণে যে সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য ও বিচার-বিবেচনা সমগ্রভাবে করায়ত রাখা

কিছুমাত্র কঠিন ছিল না তাঁর মনের পক্ষে। আবার অনুধাবনের ওই সামগ্রিকতাই তাঁর ধ্যানধারণার প্রকাশকে করে তুলত দীর্ঘ ও কঠিন পরিশ্রমসাধ্য।…

কোনো বিষয়ের উপরিতলটুকুই শুধু দেখতেন না মার্কস, বিষয়ের সারমর্মও বুঝে নিতেন, উপরিতলের নিচে নিহিত কী আছে তাও খুঁটিয়ে দেখতেন। পারস্পরিক ক্রিয়া ও পারস্পরিক বিক্রিয়ায় রত অবস্থায় প্রতিটি বিষয়ের সকল মূল উপাদান বা অংশ একত্র পরীক্ষা করে দেখতেন তিনি; আবার ওই প্রত্যেকটি উপাদানকে পৃথক করে নিয়ে তার বিকাশের ইতিহাসও অনুধাবন করতেন। তারপর বিষয়টি থেকে তার পরিপার্শ্বের পর্যালোচনায় রত হতেন এবং বিষয় ও পরিপার্শ্ব উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতেন। আলোচ্য বিষয়ের সূচনা, তার ক্রমিক পরিবর্তনসমূহ, বিবর্তন ও আমূল পরিবর্তনের যে যে স্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে সে তার সবকিছু অনুধাবনের শেষে বিষয়টির সুদূরতম ক্রিয়াগুলির পর্যালোচনায় রত হতেন। কোনো বস্তুকে এককভাবে, পরিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে, শুধুমাত্র তারই মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে এবং নিছক বিষয়টির জন্যেই বিষয়ের পর্যবেক্ষণ তাঁর ধাতে ছিল না: অবিরাম গতিশীল অবস্থায় অত্যন্ত জটিল এক জগৎ ছিল তাঁর পর্যবেক্ষণের বিষয়।

মার্কসের ইচ্ছে ছিল সেই জগতটাকে সমগ্রভাবে, তার বহুবিধ ও অনবরত পরিবর্তনশীল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পটভূমিতে উন্মোচিত করে দেখানো। ফ্লবেয়র ও গঁকুরদের ধারার লেখকরা এই মর্মে অনুযোগ করে থাকেন যে যা চোখে দেখা যায় তার হুবহু প্রতিচিত্রণ বড়ই কঠিন কাজ; অথচ যা তাঁরা প্রতিচিত্রিত করতে চান তা নেহাতই উপরিতলের ব্যাপার, বস্তুটি সম্পর্কে তাঁদের নিছক একটা ধারণা মাত্র। এই ব্যক্তিদের সাহিত্যকর্ম মার্কসের সৃষ্টিকর্মের তুলনায় ছিল নেহাতই ছেলেখেলা: বাস্তবতাকে আয়ত্ত করা এবং যা তিনি দেখছেন ও অন্যদের যা দেখাতে চান তার প্রতিচিত্রণের জন্যে মার্কসের ক্ষেত্রে চিন্তনের অসামান্য সক্রিয় শক্তির প্রয়োজন পড়ত।

লিখে কখনও সন্তুষ্ট হতেন না মার্কস সব সময়েই দেখা যেত কাটাকুটি করে লেখাটা আরও ভালো করার চেষ্টা করছেন। সব সময়েই তাঁর মনে হত যে ধারণাটি বাক্ত করতে চাইছেন তার প্রকাশ তার চেয়ে নিকৃষ্ট স্তরের হয়েছে।

মার্কসের ছিল প্রতিভাবান চিন্তাবিদের দুটি গুণই। যে কোনো বস্তুকে তার মৌল উপাদানগুলিতে ব্যবচ্ছিন্ন করার মতো অতুলনীয় প্রতিভা যেমন ধরতেন তিনি, তেমনই ওই উপাদানগুলি বাদ দিয়েই আলোচ্য বস্তুটিকে তার বিকাশের বিভিন্ন রূপের সব কটি সই পুনর্নির্মাণে এবং তাদের মধ্যেকার পরস্পর-সম্পর্কের আবিষ্কারেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণগুলিও বিমূর্ত ছিল না-অথচ তাঁকে ঠিক এই অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন সেই সব অর্থশাস্ত্রী যাঁরা নিজেরাই ছিলেন চিন্তাশক্তিতে অপারগ। পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে সংজ্ঞাগুলিকে আহরণ করে মীমাংসায় উপনীত হবার সময়ে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে থাকে জ্যামিতির যে পদ্ধতি মার্কসের পদ্ধতি মোটেই তার অনুযায়ী ছিল না। ‘পুঁজি’ বইটিতে বিচ্ছিন্ন সংজ্ঞা বা বিশ্লিষ্ট সূত্রের সন্ধান মিলবে না; সে বইয়ে পাওয়া যাবে সবচেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের এমন একটি অনুক্রম যা সবচেয়ে চোখ এড়ানো সূক্ষ্ম রঙফেরা আর সবথেকে ছলনাময় মাত্রাবিন্যাসকে পর্যন্ত প্রকট করে তোলে।

বই শুরু করেছেন মার্কস এই স্পষ্ট তথ্যটি দিয়ে যে উৎপাদনের পুঁজিবাদী পদ্ধতিশাসিত সমাজের সম্পদ পণ্যের বিপুল সঞ্চয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে; অতএব, যা নাকি গাণিতিক বিমূর্তন নয় পরন্তু বিশেষরকম মূর্ত একটি পদার্থ, সেই পণ্য হল গিয়ে পুঁজিবাদী সম্পদের মূল উপাদান বা কোশ। মার্কস অত:পর আষ্টেপৃষ্ঠে পাকড়ে ধরেছেন এই পণ্য পদার্থটিকে; এটিকে উল্টেপাল্টে এর ভিতরবার অন্ধিসন্ধি তল্লাস করে একটার পর একটা এমন সব গুপ্ত তথ্যের সুলুকসন্ধান খুঁজে বের করেছেন তিনি রীতিসিদ্ধ অর্থশাস্ত্রীরা যাদের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবহিত ছিলেন না, অথচ ওই সব গুপ্ত তথ্য ক্যাথলিক ধর্মের গোপন রহস্যগুলির চেয়ে যেমন সংখ্যায় বেশি তেমনই গভীরতর তাৎপর্যের দ্যোতকও। পণ্যকে তার সকল দিক ও অবস্থা থেকে পরীক্ষা করার পর বিনিময়ের ক্ষেত্রে সহপণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তার পর্যালোচনা করেছেন মার্কস। অত:পর তিনি আলোচনা করেছেন পণ্যের উৎপাদন ও সেই উৎপাদনের ঐতিহাসিক পূর্বশর্তগুলি নিয়ে। পণ্য যে নানা আকার ধারণ করে থাকে তাও বিবেচনা করেছেন তিনি এবং দেখিয়েছেন কীভাবে একটি থেকে আরেকটি আকারে তার রূপান্তর ঘটে, কীরকম আবশ্যিকভাবে একটি থেকে আরেকটি প্রকার জন্মলাভ করে। বিশ্ব-ব্যাপারের বিকাশের যুক্তিগ্রাহ্য ধারাটিকে এমন নিখুঁত কৌশলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি যে মনে হতে পারে এ বুঝি তাঁর স্বকপোলকল্পনা। অথচ এ কিন্তু বাস্তবতারই সৃষ্ট ফল, পণ্যবস্তুর বাস্তব দ্বান্দ্বিকতারই ফসল এ।

নিজের সৃষ্টিকর্মের ব্যাপারে মার্কস ছিলেন সর্বদাই পরম বিবেকী। সবসেরা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যা সমর্থিত ছিল না এমন একটিও তথ্য বা সংখ্যা তিনি কখনও সংকলিত করতেন না। হাত ফেরতা পরোক্ষ তথ্যে কখনও সন্তুষ্ট থাকতেন না তিনি, সর্বদাই তার উৎসের সন্ধান করতেন, তা সে প্রক্রিয়া যতই ক্লান্তিকর হোক না কেন। গৌণ কোনো তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্যে সোজা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে চলে গিয়ে বই ঘাঁটতে পর্যন্ত কসুর করতেন না। ফলে তাঁর সমালোচকরাও কখনও প্রমাণ করতে পারেননি যে লেখার ব্যাপারে তাঁর যত্নের অভাব ছিল কিংবা এমন সব তথ্যের উপর ভিত্তি করে তিনি যুক্তিতর্কের অবতারণা করেছেন কড়া পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যা অপারগ।

সব সময়ে একেবারে উৎসে পৌঁছনো পর্যন্ত না ছাড়ার অভ্যাসের ফলে তাঁকে এমন সব লেখকের রচনা পড়তে হত যাঁরা ছিলেন নিতান্তই স্বল্পপরিচিত এবং তিনিই ছিলেন একমাত্র যিনি ওই সব লেখকের রচনা উদ্ধৃতিযোগ্য মনে করেছিলেন। ‘পুঁজি’ বইটিতে স্বল্পপরিচিত লেখকদের রচনা থেকে এত বেশি সংখ্যায় উদ্ধৃতি লিপিবদ্ধ আছে যে মনে হতে পারে বইটিতে মার্কস বুঝি দেখাতে চেয়েছেন তাঁর পড়াশুনো কত বহুব্যাপক। আসলে তাঁর উদ্দেশ্য মোটেই তা ছিল না। মার্কস বলতেন, ‘ঐতিহাসিক দিক থেকে ন্যায়বিচার করতে চেয়েছি আমি। যার যা প্রাপ্য তাই তাকে দিয়েছি।’ তিনি মনে করতেন, যে লেখক সর্বপ্রথম সবচেয়ে সঠিকভাবে কোনো একটি ভাবনাকে প্রকাশ করেছেন কিংবা সূত্রবদ্ধ করতে পেরেছেন তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে তিনি দায়বদ্ধ, তা সে লেখক যতই তুচ্ছ ও স্বল্পপরিচিত হন না কেন তাতে কিছু যায় আসে না। ০৩ Flowe সাহিত্যগত বা রচনা-পদ্ধতির দিক থেকে যতখানি বিবেকবান ছিলেন মার্কস, ঠিক ততখানিই ছিলেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিচারেও। সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লেখার ক্ষেত্রে তিনি যে কোনো তথ্যের উপর নির্ভর করতেন না তাই নয়, আদ্যন্ত পড়াশুনো না করে কোনো বিষয় নিয়ে মৌখিক আলোচনা করতেও ছিলেন নারাজ। বারবার সংশোধন করতে করতে যতক্ষণ না তিনি লেখার সবচেয়ে উপযুক্ত ধরনটি পেয়ে গেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো একটা রচনাও প্রকাশ করেননি। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে প্রস্তুত না হয়ে জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ তাঁর কাছে অসহনীয় ঠেকত। শেষবারের মতো কারিকুরি করে লেখাটা মনোমতো না হওয়া পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি কাউকে দেখানো তাঁর পক্ষে ছিল যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। এ ব্যাপারে তাঁর মনোভাব এত অনমনীয় ছিল যে কথায় কথায় একদিন আমাকে তিনি বলেছিলেন পাণ্ডুলিপিগুলো বরং পুড়িয়ে ফেলবেন তাও ভালো তবু তা অসম্পূর্ণ রেখে যাবেন না।

মার্কসের কাজ করার এই ধরন তাঁর উপর এমন গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করত যে পাঠক তার ব্যাপ্তি কল্পনা করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘পুঁজি’তে ইংলণ্ডের ফ্যাক্টরি-আইন সম্বন্ধে পাতা বিশেকের মতো লেখার জন্যে তিনি ইংলণ্ড ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন কমিশনের ও ফ্যাক্টরি-ইনস্পেক্টরদের লেখা কার্যবিবরণী সমন্বিত এক লাইব্রেরি ‘ব্লু বুকেই পড়ে শেষ করেছিলেন। রিপোর্টগুলিতে মার্কসের দেওয়া পেন্সিলের দাগ দেখে বোঝা যায় সেগুলি আদ্যোপান্ত পড়েছিলেন তিনি। পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির অনুধাবনে ওই রিপোর্টগুলিকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিবেচনা প্রসূত দলিল হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ওই সব রিপোর্ট লেখার ভার ছিল যাঁদের উপর তাঁদের সম্পর্কে এমনই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন মার্কস যে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে ‘ইংলণ্ডের ফ্যাক্টরি ইনস্পেক্টরদের মতো অত সুদক্ষ, পক্ষপাতশূন্য ও প্রত্যয়ী মানুষ’ পাওয়া যাবে কিনা সে সম্পর্কে পর্যন্ত সন্দিহান ছিলেন। ‘পুঁজি’ বইটির মুখবন্ধে ওই ইনস্পেক্টরদের উদ্দেশ্যে উল্লিখিত সপ্রশংস উক্তিটি তাঁরই।

আলোচ্য ‘ব্লু বুক’গুলো থেকে বাস্তব তথ্যভিত্তিক সংবাদাদির রীতিমতো এক সম্ভার আহরণ করেছেন মার্কস। ওই বইগুলো যাঁদের মধ্যে বিলি করা হয় পার্লামেন্টের সেই সদস্যদের অনেকেই ওগুলোকে একমাত্র চাঁদমারির নিশানা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, গুলিতে যে ক’খানা পাতা ফুটো হয় তাই দিয়ে পিস্তলের শক্তির বিচার করেন তাঁরা। অন্যেরা বইগুলো বিক্রি করে দেন ওজনদরে। ওগুলো নিয়ে অন্য কিছু করার চেয়ে এ কাজটা অবশ্য খুবই যুক্তিসঙ্গত, কারণ এরই ফলে পুরনো কাগজ বিক্রিওয়ালাদের কাছ থেকে সন্তাদরে বইগুলো কিনতে পেরেছিলেন মার্কস। পুরনো বই ও কাগজপত্র নেড়েচেড়ে দেখার জন্যে ওই কাগজ বিক্রিওয়ালাদের দোকানে মার্কস প্রায়ই যেতেন। অধ্যাপক বীজলি বলেছেন, মার্কসই ছিলেন সেই লোক ইংলন্ডের সরকারি তদন্তের রিপোর্টগুলি যিনি সকলের চেয়ে বেশি করে কাজে লাগিয়েছিলেন এবং সেগুলো সেই প্রথম বিশ্বের গোচরে এনেছিলেন। অধ্যাপক অবশ্য জানতেন না যে ১৮৪৫ সালের আগেই ইংলণ্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা সম্পর্কে বই লিখতে গিয়ে এঙ্গেলস ওই সব ‘ব্লু বুক’ থেকে বহুবিধ দলিল সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।    

পণ্ডিতাগ্রগণ্য মার্কসের বুকের মধ্যে যে হৃদয় স্পন্দিত হত তকে জানতে ও ভালোবাসতে হলে তাকে দেখার দরকার ছিল সেই সময়টাতে বই আর নোটবইগুলো বন্ধ করার পর তিনি যখন পরিবৃত হয়ে থাকতেন স্বীয় পরিবারের লোকজনের দ্বারা কিংবা রবিবারের সন্ধ্যেগুলোয় থাকতেন বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে। তখন তাঁকে দেখা যেত হাসিঠাট্টা আর রসিকতায় ভরপুর সবচেয়ে আনন্দদায়ক সঙ্গী হিসেবে, হৃদয় থেকে সরাসরি উৎসারিত হাসির ফোয়ারা ছোটাতেন তখন তিনি। ঝাঁপালো বাঁকা ভ্রূর নিচ থেকে তাঁর কালো চোখ দুটো জ্বলজ্বল করত তখন আনন্দে, আবার কখনও বা কোনো সরস উক্তি কিংবা মুখের মতো রসালো জবাব শুনে দুষ্টুমি ভরা কৌতুকে। পিতা হিসেবে মার্কস ছিলেন স্নেহপ্রবণ, মৃদুস্বভাব ও ছেলেপিলেদের প্রশ্রয়দাতা। তিনি বলতেন, ‘বাপ-মাকে শিক্ষা দেবে ছেলেপিলেরাই’। মেয়েদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়ণ পিতৃত্ববোধের চিহ্নমাত্র ছিল না, তাঁর মেয়েদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়ণ পিতৃত্ববোধের চিহ্নমাত্র ছিল না, তাঁর প্রতি মেয়েদের ভালোবাসাও ছিল অসামান্য। মেয়েদের কখনও হুকুম করতেন না তিনি, বরং যখন যা তাঁর দরকার হত তখন তাঁদের কাছে এমনভাবে তা চাইতেন যে মনে হত তিনি যেন তাঁদের আনুকূল্যের প্রার্থী; কিংবা মেয়েদের যে কাজ তাঁর কাম্য ছিল না তাও এমনভাবে জানিয়ে দিতেন যে কাজটা করতে যে নিষেধ করা হচ্ছে সেটা মোটেই হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিতেন না তাঁদের। অথচ তাঁর মেয়েদের মতো অত বশ্য বাধ্য সন্তান অন্য কোনো পিতার ছিল কিনা সন্দেহ। মেয়েরা তাঁকে গণ্য করতেন বন্ধু হিসেবে, আচরণ করতেন তাঁর সঙ্গে সমকক্ষ সঙ্গীর মতো: তাঁরা ওঁকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন না, রসিকতা করে বলতেন ‘নূর’- গায়ের ময়লা রঙ আর ঘনকৃষ্ণ চুল আর দাড়ির জন্যে এই ডাকনাম পেয়েছিলেন তিনি। অপরদিকে, তাঁর বয়স যখন তিরিশ বছরও হয়নি তখনই- ১৮৪৮ সালের আগেই কমিউনিস্ট লীগের সদস্যরা তাঁকে ‘মার্কস-বাবা’ বলে ডাকতেন।…

বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন মার্কস। মস্ত একটা জলের গামলায় নৌযুদ্ধ আর কাগজের তৈরি নৌবহরে আগুন লাগানোর কথা এখনও মনে আছে ওঁদের। কাগজের জাহাজগুলো মেয়েদের জন্যে বানাতেন মার্কস আর সেগুলোয় আগুন দিয়ে ওদের প্রচুর আনন্দ দিতেন।

রবিবারগুলোয় মেয়েরা মার্কসকে কাজ করতে দিতেন না, সারা দিনের মতো সেদিনটায় তিনি থাকতেন ওঁদের অধিকারে। আবহাওয়া যদি ভালো থাকত পুরো পরিবার ওইদিন শহরতলিতে হাঁটতে যেতেন। যেতে যেতে পথের ধারের ছোটখাট কোনো সরাইখানায় থামতেন তাঁরা রুটি, পনির আর খানিকটা জিঞ্জার বিয়ার খেয়ে নিতেন। মেয়েরা যখন ছোট ছিলেন লম্বা পাড়িকে তাঁদের কাছে সংক্ষেপ করে তুলতেন তিনি অসংখ্য আজগুবি গল্প শুনিয়ে। গল্পগুলো পথে যেতে যেতেই বানাতেন তিনি, যতখানি পথ যেতে হবে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেনে লম্বা করতেন সেগুলোকে আর গল্পের জটিলতাগুলো ভরিয়ে তুলতেন বেশি বেশি উত্তেজনা দিয়ে যাতে গল্প শোনার আগ্রহে বাচ্চারা পথচলার ক্লান্তি ভুলে থাকতে পারে তাঁর ছিল তুলনাহীন উর্বর কল্পনাশক্তি: কবিতা ছিল তাঁর প্রথম সাহিত্যপ্রচেষ্টা। স্বামীর তরুণ বয়সের লেখা কবিতাগুলি সযত্নে রক্ষা করতেন শ্রীমতী মার্কস, কিন্তু কখনও কাউকে তা দেখাতেন না। মার্কসের পরিবার স্বপ্ন দেখেছিলেন যে ভবিষ্যতে তিনি একজন সাহিত্যিক কিংবা অধ্যাপক হবেন, সমাজতান্ত্রিক প্রচার-আন্দোলন ও রাজনীতি সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের চর্চা করে তিনি নিজের অবমাননা করছেন এই ছিল তাঁদের ধারণা। এই শেষোক্ত বিষয়গুলির চর্চা তখন জার্মানিতে অশ্রদ্ধেয় বলে গণ্য মার্কস তাঁর মেয়েদের কথা দিয়েছিলেন যে গ্রাচ্চি সম্পর্কে তাঁদের একখানি নাটক লিখে দেবেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় কথা রাখতে পারেননি তিনি। যদি পারতেন তাহলে যাঁকে ‘শ্রেণী-সংগ্রামের বীর প্রবক্তা’ বলা হয় সেই মার্কস প্রাচীন জগতে শ্রেণী-সংগ্রামের ওই ভয়ঙ্কর ও চমকপ্রদ ঘটনাটিকে কীভাবে নাট্যায়িত করেন তা দেখা খুবই আগ্রহোদ্দীপক হত। এ ধরনের বহু পরিকল্পনা মার্কসের ছিল, যা কোনোদিন বাস্তবায়িত হয়নি। পরিকল্পিত অন্যান্য রচনার মধ্যে তিনি চেয়েছিলেন দর্শনশাস্ত্রের ইতিহাস ও যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে দুখানি বই লিখতে, অল্পবয়সে এই প্রথমোক্ত বিষয়টি তাঁর ভারি প্রিয় ছিল। তাঁর সমস্ত রচনার পরিকল্পনা কার্যকর করতে ও মস্তিষ্কের মধ্যে নিহিত সম্পদের একাংশ জগতকে দান করে যেতে একশো বছর বাঁচা দরকার ছিল মার্কসের।

কথাটির সবচেয়ে খাঁটি ও সম্পূর্ণ অর্থেই মার্কসের স্ত্রী ছিলেন স্বামীর সারা জীবনের সহকর্মিণী। একেবারে শিশুকাল থেকে পরস্পরের পরিচিত ছিলেন তাঁরা, বড় হয়েও উঠেছিলেন একসঙ্গে। প্রাকৃবিবাহ বাগদানের সময় মার্কসের বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর। ১৮৪৩ সালে বিয়ে হবার আগে দীর্ঘ সাত বছর এই তরুণ দম্পতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বিয়ের পর অবশ্য আর কখনও তাঁরা পরস্পরের কাছছাড়া হননি। স্বামীর মৃত্যুর অল্প কিছু আগে শ্রীমতী মার্কসের মৃত্যু হয়। যদিও এক জার্মান অভিজাত পরিবারে জাত ও লালিত হয়েছিলেন তিনি, তবু সামোর বোধ তাঁর চেয়ে আর কারো মধ্যে বেশি ছিল না। কোনোরকম সামাজিক বৈষম্য বা শ্রেণীগত ছুৎমার্গের অস্তিত্ব ছিল না তাঁর কাছে। দৈনন্দিন কাজের পোশাক পরা শ্রমজীবী মানুষজনকে তাঁর বাড়িতে ও তাঁর খাবার টেবিলে এমনভাবে অভ্যর্থনা ও যত্নআত্তি করতেন তিনি যে মনে হত তাঁরা বুঝি ডিউক কিংবা রাজপরিবারের লোকই। সকল দেশের বহু শ্রমিকই শ্রীমতী মার্কসের আতিথেয়তায় ধন্য হয়েছেন; এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে একজনও স্বপ্নে ভাবতে পারেননি যে অমন স্বচ্ছন্দ ও আন্তরিক সহৃদয়তা নিয়ে যে মহিলাটি তাঁদের গ্রহণ করেছিলেন, মাতৃকুলের দিক থেকে তিনি ছিলেন আগাইলের ডিউকদের বংশোদ্ভূতা এবং তাঁর ভাই ছিলেন প্রাশিয়ার রাজার একজন মন্ত্রী। তার জন্যে শ্রীমতী মার্কসের অবশ্য ভ্রূক্ষেপ ছিল না; তাঁর কার্লের সঙ্গে যাওয়ার জন্যে সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন তিনি এবং কখনও, এমন কি প্রচণ্ড অভাবের সম্মুখীন হয়েও, এর জন্যে কোনোদিন অনুতাপ করেননি।

স্বচ্ছ ও প্রবল সক্রিয় মনের অধিকারিণী ছিলেন তিনি। বন্ধুদের কাছে লেখা তাঁর চিঠিগুলিতে কষ্টকল্পনা বা প্রয়াসের চিহ্নমাত্র নেই, বরং আছে প্রাণবন্ত ও মৌল চিন্তার আশ্চর্য স্বাক্ষর। শ্রীমতী মার্কসের কাছ থেকে চিঠি পাওয়া ছিল রীতিমতো উপভোগ্য ব্যাপার। ইয়োহান ফিলিপ বেকার’ তাঁর বেশ কিছু চিঠি ছেপেওছেন। নিজে নির্মম ব্যঙ্গরচনাকার হওয়া সত্ত্বেও হাইনে মার্কসের ব্যঙ্গবিদ্রূপকে ভয় পেতেন, কিন্তু মার্কস-পত্নীর তীক্ষ্ম সংবেদনশীল মনের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। মার্কস-পরিবার যখন প্যারিসে থাকতেন তখন তাঁদের নিয়মিত দর্শনার্থীদের মধ্যে হাইনে ছিলেন অন্যতম। স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা ও ভালোমন্দের বিচারবোধ সম্পর্কে এতখানি শ্রদ্ধা ছিল মার্কসের যে সকল পাণ্ডুলিপিই তিনি স্ত্রীকে দেখাতেন এবং তাঁর মতামতকে অপরিসীম মূল্য দিতেন। ১৮৬৬ সালে একথা তিনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন। ছাপাখানায় পাঠানোর আগে স্বামীর পাণ্ডুলিপিগুলি শ্রীমতী মার্কস নিজের হাতে কপি

শ্রীমতী মার্কসের বেশ কয়েকটি সন্তান জন্মেছিল। তাদের মধ্যে তিনজন মারা। যায় শিশুবয়সে, ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের পর যে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে মার্কস পরিবারকে দিন কাটাতে হয় সেই পর্যায়ে। ওই সময়ে পরিবারটি দেশান্তরী অবস্থায় বাস করছিলেন লন্ডনের সোহো স্কোয়ারে ডীন স্ট্রিটের দুখানি ছোট ঘরে। আমি অবশ্য ওঁদের তিনটি মেয়েকেই দেখেছিলুম। ১৮৬৫ সালে মার্কসের সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তাঁর ছোট মেয়ে এলিওনর, বর্তমানে যে শ্রীমতী অ্যাভেলিং নামে পরিচিত, সে ছিল হাসিখুশি মেজাজের মিষ্টি এতটুকু মেয়ে। মার্কস বলতেন, তাঁর স্ত্রী যখন এই মেয়েটির জন্ম দিয়েছিলেন তখন ঠিকে ভুলে করে তাকে মেয়ে বানিয়েছিলেন। তাঁদের অপর দুটি মেয়ের মধ্যেও দেখা গিয়েছিল অত্যন্ত আশ্চর্যরকম ও সুসমঞ্জস বৈসাদৃশ্য। বড় মেয়েটির- পরবর্তীকালে শ্রীমতী লোঙ্গের ছিল বাপের মতো শ্যামল ও উজ্জ্বল গায়ের রঙ, কালো চোখ ও কুচকুচে কালো চুল। আর মেজোর পরবর্তীকালে শ্রীমতী লাফার্গের ছিল হালকা রঙের চুল আর গোলাপির আভা লাগা গায়ের চামড়া। তার ঘন কোঁকড়ানো চুলের এমন একটা সোনালি আভা ছিল যে মনে হত অস্তগামী সূর্যের রশ্মি বুঝি জড়িয়ে গেছে চুলে: ও ছিল মায়ের মতো দেখতে।

মার্কস পরিবারের অপর একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন হেলেন ডেমুখ। চাষির ঘরে জন্ম হয়েছিল তাঁর। শ্রীমতী মার্কসের বিয়ের বহু আগে যখন তিনি শৈশব অতিক্রম করেছেন কিনা সন্দেহ তখন থেকেই ডেমুথ তাঁর পরিচর্যায় নিযুক্ত। তাঁর খুদে মনিবানী বড় হবার পর যখন তাঁর বিয়ে হল তখনও হেলেন তাঁর সঙ্গে রয়ে গেলেন এবং আত্মস্বার্থ সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে মার্কস-পরিবারের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করলেন। তাঁর মনিবানী ও তাঁর স্বামী ইউরোপের যেখানে যেখানে গেছেন তিনিও তাঁদের সহযাত্রী হয়েছেন সেইখানেই আর অংশভাক হয়েছেন তাঁদের নির্বাসিত জীবনের সকল দুঃখকষ্টের।

হেলেন ছিলেন সংসারটির ত্রাণকর্ত্রী, অত্যন্ত কঠিন অভাবের মধ্যেও উদ্ধারের একটা না একটা উপায় তিনি সব সময়েই খুঁজে পেতেন। একমাত্র তাঁর শৃঙ্খলাবোধ, মিতব্যয়িতা ও দক্ষতার কারণেই মার্কস পরিবার কোনোদিন অন্ততপক্ষে একেবারে মোটাদাগের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অভাব বোধ করেননি। হেলেন করতে পারতেন না হেন কাজ ছিল না। রান্নাবান্না, সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম, বাচ্চাদের পোশাক পরানো, তাদের জামা কাটছাঁট করা ও সেসব সেলাইফোঁড়াই- শ্রীমতী মার্কসের সঙ্গে মিলে এ সবই করতেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন গৃহস্থালির তত্ত্বাবধায়িকা ও সংসারের বাজার-সরকার। বস্তুত, গোটা সংসারটা পরিচালনা করতেন তিনিই।

বাচ্চারাও তাঁকে মায়ের মতো ভালোবাসত আর তাদের প্রতি হেলেনের মাতৃত্বের ভাব তাঁকে সত্যিকার মায়ের অধিকার দিয়েছিল। শ্রীমতী মার্কস তাঁকে প্রাণের বন্ধু হিসেবে গণ্য করতেন, আর মার্কস তাঁর প্রতি বিশেষরকম বন্ধুত্বের মনোভাব পোষণ করতেন। হেলেনের সঙ্গে তিনি দাবা খেলতেন এবং প্রায়-প্রায়ই হেরে যেতেন।

মার্কস-পরিবারের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা ছিল হেলেনের। তাঁরা যে কেউ যা কিছু করতেন তাঁর চোখে তাই ছিল ভালো, ভালো ছাড়া অন্য কিছু হতেই পারত না। মার্কসের কেউ সমালোচনা করলে তাকে প্রথমে তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হত। মার্কসদের সঙ্গে যারই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠত তাকেই তিনি নিজের মাতৃত্বসুলভরক্ষণাবেক্ষণের অধীন করে নিতেন। এক কথায়, তিনি যেন সকলের গোটা পরিবারের মা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মার্কস ও তাঁর স্ত্রীর চেয়ে বেশিদিন বেঁচে ছিলেন হেলেন, এবং তখন স্থান পরিবর্তন করে এঙ্গেলসের সংসারে রক্ষণাবেক্ষণে অধিষ্ঠিত হন। বালিকাবয়স থেকেই এঙ্গেলসকে চিনতেন তিনি, তাই মার্কস পরিবারের প্রতি তাঁর অনুরাগ সম্প্রসারিত হয়ে অবশেষে এঙ্গেলসকে আশ্রয় করে।

বলতে গেলে এঙ্গেলস ছিলেন মার্কস পরিবারেরই একজন। মার্কসের মেয়েরা তাঁকে পিতৃপ্রতিম জ্ঞান করতেন। তিনি ছিলেন মার্কসের ‘দ্বিতীয় সত্তা’। দীর্ঘদিন ধরে জার্মানিতে এই দুটি নাম কখনও পৃথকভাবে উচ্চারিত হয়নি, আর ইতিহাসে নামদুটি চিরদিন সংযুক্ত হয়েই থাকবে। প্রাচীনকালের কবিরা যে সখ্যের আদর্শ চিত্রিত করে গেছেন আমাদের কালে মার্কস আর এঙ্গেলস ছিলেন সেই সখ্যের মূর্ত প্রতীক। তরুণ বয়স থেকে তাঁরা পরিণত হয়ে উঠেছিলেন একসঙ্গে এবং পরস্পরের সমান্তরালভাবে, মতাদর্শ ও মানস অনুরাগের ঘনিষ্ঠ মেলবন্ধনে যাপন করেছিলেন জীবন এবং একই বৈপ্লবিক আন্দোলনের ছিলেন অংশভাক; যতদিন একসঙ্গে থাকতে পেরেছিলেন দুজনে কাজ করেছিলেন যৌথভাবে।

ঘটনাচক্রে প্রায় বিশ বছর যদি তাঁরা পরস্পরবিচ্ছিন্ন হয়ে না থাকতেন, তাহলে সম্ভবত সারা জীবনই একসঙ্গে কাজ করে যেতেন। কিন্তু ১৮৪৮ সালের বিপ্লব পরাস্ত হওয়ার পর এঙ্গেলসকে চলে যেতে হয় ম্যাঞ্চেস্টারে, আর লন্ডনে থেকে যেতে বাধ্য হন মার্কস।

তবু, তা সত্ত্বেও, যৌথ মানস-জীবন যাপন করে চলেন দুজনে প্রায় প্রতিদিন পরস্পরকে চিঠি লেখার মধ্যে দিয়ে, রাজনৈতিক ও বিজ্ঞানক্ষেত্রের ঘটনাবলী এবং পরস্পরের রচনা সম্পর্কে মতবিনিময়ের সূত্রে। বাধ্যতামূলক কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই এঙ্গেলস ম্যাঞ্চেস্টার থেকে দৌড়ে চলে এলেন লগুনে, তাঁর প্রিয় মার্কসের বাসা থেকে মাত্র দশ মিনিটের পথের ব্যবধানে বাসা নিলেন। তারপর, ১৮৭০ থেকে বন্ধুর মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন এই দুটি মানুষ কখনও এঁর কখনও বা ওঁর বাড়িতে পরস্পর মিলিত হননি। এঙ্গেলস যেদিন মার্কসদের জানালেন যে ম্যাঞ্চেস্টার থেকে পাট উঠিয়ে চলে আসছেন তিনি, সেটি ছিল মার্কস পরিবারে উৎসবের দিন। তখনও পর্যন্ত অনিশ্চিত তাঁর আগমন নিয়ে পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল বহুদিন আগে থেকেই, আর যেদিন সত্যিসত্যিই আসার দিন এল মার্কস সেদিন এত অস্থির হয়ে রইলেন যে সারাদিন কাজই করতে পারলেন না। দুই বন্ধু সেদিন সারারাত্রি ধূমপান সহযোগে তাঁদের শেষ দেখা সাক্ষাতের পর যা যা ঘটেছিল সে সমস্তের আলোচনা করে কাটালেন।

অন্য যে কোনো লোকের থেকে এঙ্গেলসের মতামতকে বেশি মূল্য দিতেন মার্কস, কারণ তিনি মনে করতেন এঙ্গেলসই হলেন সেই লোক যিনি তাঁর সহযোগী হবার যথার্থ উপযুক্ত। তাঁর কাছে একা এঙ্গেলস ছিলেন পুরো একটি সভার শ্রোতৃমণ্ডলীর সমতুল্য। যুক্তি প্রমাণ প্রয়োগ করে এঙ্গেলসকে বুঝিয়ে স্বমতে আনার উদ্দেশ্যে কোনো প্রয়াসই মার্কসের কাছে অতিরিক্ত বেশি বলে গণ্য হত না। যেমন, একটা উদাহরণ দিই: আলিগোয়নের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় যুদ্ধ সংক্রান্ত ব্যাপারে আলোচনার সময়ে আমার ঠিক মনে নেই কোনো একটা গৌণ বিষয়ে এঙ্গেলসের মতের পরিবর্তন ঘটানোর উদ্দেশ্যে তাঁর পক্ষে প্রয়োজনীয় একটা তথ্যের সন্ধানে মার্কসকে আমি কয়েকখানা গোটা বই বারেবারে ফিরে ফিরে পড়তে দেখেছি। মত পরিবর্তন করিয়ে এঙ্গেলসকে স্বমতে আনাটা মার্কসের পক্ষে মস্ত একটা কৃতার্থতার আনন্দের ব্যাপার ছিল।

এঙ্গেলসকে নিয়ে গর্ব ছিল মার্কসের। একে একে এঙ্গেলসের সব কটি নৈতিক ও বুদ্ধিগত গুণের তালিকা আমার কাছে বিশদ করে আনন্দ পেতেন তিনি। একবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ম্যাঞ্চেস্টার যান বিশেষ করে এঙ্গেলসের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

এঙ্গেলসের জ্ঞানের বহুমুখিতার প্রশংসা করতেন মার্কস, পাছে এঙ্গেলসের সামান্যতম কোনো বিপদ ঘটে এই ভয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকতেন।

এ প্রসঙ্গে একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘শিকারে গিয়ে পাছে ওর কোনো বিপদ আপদ ঘটে এই ভয়ে সর্বদাই কাঁপি আমি। এত দূরন্ত স্বভাব ওর; মাঠঘাটের ওপর দিয়ে রাশ আলগা করে সজোরে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে, কোনোরকম বাধার পরোয়া করে না’। যতখানি স্নেহপ্রবণ স্বামী ও পিতা ছিলেন মার্কস ঠিক ততখানিই ছিলেন শুভানুধ্যায়ী বন্ধু। তিনি যে স্তরের মানুষ ছিলেন তার উপযুক্ত ভালোবাসার পাত্র-পাত্রীও খুঁজে পেয়েছিলেন স্ত্রী ও মেয়েদের মধ্যে, হেলেন আর এঙ্গেলসের মধ্যে।

র‍্যাডিকাল বুর্জোয়ার নেতা হিসেবে সমাজ-জীবন শুরু করেছিলেন মার্কস। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল তিনি সকলের পরিত্যক্ত, আর যেই কমিউনিস্ট হয়ে দাঁড়ালেন অমনি আগের মিত্ররা সকলেই তাঁর শত্রু হয়ে উঠলেন। তুমুল নিন্দাবাদ ও মিথ্যা কুৎসা রটনার পর নির্যাতন করে জার্মানি থেকে তাঁকে বহিষ্কার করে দেওয়া হল, আর তারপর তাঁর ও তাঁর সৃষ্টিকর্মের বিরুদ্ধে শুরু হল একেবারে চুপচাপ থাকার একটা ষড়যন্ত্র। মার্কস যে ১৮৪৮ সালের একমাত্র ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিবিদ, যিনি ১৮৫১ সালের ২ ডিসেম্বরের ক্যুদেতার কারণ ও ফলাফলগুলির প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছিলেন ও তা উদ্‌ঘাটিত করে দিয়েছিলেন- এই সত্যটি যাতে প্রমাণিত হয়েছে সেই ‘আঠারোই ব্রুমেয়ার’ বইটিকে চুপচাপ থেকে বেমালুম উপেক্ষা করা হল। সৃষ্টিকর্মটির জলজ্যান্ত অস্তিত্ব সত্ত্বেও একটিও বুর্জোয়া সংবাদপত্র তার উল্লেখ পর্যন্ত করল না।

‘দারিদ্র্যের দর্শন’-এর১০ জবাবে ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ এবং ‘রাজনীতি সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ নামের বইদুটিও একইভাবে উপেক্ষিত হল। দীর্ঘ পনেরো বছর স্থায়ী হবার পর নৈঃশব্দ্যের এই ষড়যন্ত্র ভাঙতে সমর্থ হল প্রথম আন্তর্জাতিক ও ‘পুঁজি’ বইয়ের প্রথম খণ্ডটি অত:পর মার্কসকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব হল না: আন্তর্জাতিক ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে লাগল আর তার কীর্তির গরিমায় পূর্ণ করে তুলল জগতকে। যদিও মার্কস নিজে নেপথ্যে থেকে সংগঠনে অন্যদের কাজ করতে দিতেন তবু পশ্চাদ্‌ভূমির সেই আসল লোকটি যে কে তা শিগগিরই ধরা পড়ে গেল।

জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির প্রতিষ্ঠা হল এবং তা রীতিমতো এক শক্তিতে পরিণত হল, যাকে আক্রমণ করার আগে বিস্মার্ক১১ তার প্রণয়যাচ্ঞা করলেন পর্যন্ত। লাসালের ১৯ জনৈক অনুসারক ভাইট্সার ‘পুঁজি’ বইটিকে শ্রমজীবী জনসাধারণের গোচর করার উদ্দেশ্যে পর্যায়ক্রমে কতগুলি প্রবন্ধ প্রকাশ করলেন। অত:পর, ইয়োহান ফিলিপ বেকারের উত্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিকের কংগ্রেস থেকে গৃহীত এক নির্দেশনামায় ‘শ্রমিক শ্রেণীর বাইবেল’ এই আখ্যা দিয়ে ‘পুঁজি’ গ্রন্থটির প্রতি সকল দেশের সমাজতন্ত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল।

১৮৭১ সালের ১৮ মার্চের অভ্যুত্থানের পর (যার মধ্যে লোকে আন্তর্জাতিকের কার্যকলাপ সন্ধানের চেষ্টা করেছিল) এবং কমিউনের পরাজয় ঘটার শেষে (এই কমিউনের পক্ষ সমর্থনের দায়িত্ব নিজের স্কন্ধে নিয়েছিল প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদ, সকল দেশের বুর্জোয়া সংবাদপত্রের উন্মত্ত ক্রোধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে) মার্কসের নাম সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্ববিদ এবং প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি। ‘পুঁজি’ হয়ে দাঁড়াল সকল দেশের সমাজতন্ত্রীদের সারগ্রন্থ। সকল সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক শ্রেণীর সংবাদপত্রে ওই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ প্রচারিত হতে লাগল। ওই সময়ে নিউ ইয়র্কে একটা মস্ত বড় ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। সেই ধর্মঘটের সময় ‘পুঁজি’ বইটি থেকে নানা অংশবিশেষ প্রচারপত্রের আকারে ছেপে প্রকাশ করা হয় শ্রমিকদের সহনশীলতা বাড়িয়ে তোলার ও তাঁদের দাবিদাওয়া যে কত ন্যায্য তা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে।

প্রায় সব প্রধান-প্রধান ইউরোপীয় ভাষায় ‘পুঁজি’ বইটি অনূদিত হল। ইউরোপ ও আমেরিকায় বিরুদ্ধবাদীরা যতবার চেষ্টা করেছে এ বইয়ের তত্ত্বসমূহ খণ্ডন করতে ততবারই সঙ্গে সঙ্গে তার সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিসম্মত জবাব পেয়ে তাদের মুখ গেছে বন্ধ হয়ে। আন্তর্জাতিকের কংগ্রেস থেকে একদা যেমনটি বলা হয়েছিল ‘পুঁজি’ আজ সত্যিই তাই। অর্থাৎ ‘শ্রমিক শ্রেণীর বাইবেল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিকে ও মোটের উপর শ্রমিক আন্দোলনে মার্কসকে যে পরিমাণে অংশ নিতে হত তাতে বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিকর্মে তাঁর সময়ে ঘাটতি পড়ে যেত। স্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী লোঙ্গের মৃত্যুও এ ব্যাপারে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মার্কস দম্পতি গভীর পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। স্ত্রীর রূপলাবণ্য ছিল মার্কসের গর্ব ও আনন্দের উৎস। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী হিসেবে ঘটনাবহুল জীবনযাপনের ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপে সঞ্জাত তাঁর দুঃখকষ্টের গুরুভার স্ত্রীর শান্তস্বভাব ও একনিষ্ঠতার গুণে বহুপরিমাণে লাঘব হয়ে গিয়েছিল।

যে অসুখে জেনি মার্কসের মৃত্যু ঘটে সেই অসুখ তাঁর স্বামীর জীবনেও ছেদ টানে। স্ত্রীর দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক রোগভোগের সময়ে রাত্রি-জাগরণজনিত শ্রান্তিতে, ব্যায়াম ও মুক্ত বাতাসের অভাবে এবং মানসিক দিক থেকে জীর্ণ হয়ে গিয়ে মার্কসও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেন। সেই অসুখই কাল হল তাঁর।

১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর শ্রীমতী মার্কস প্রয়াত হলেন। যেমন সারা জীবন তেমনই মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত তিনি রয়ে গিয়েছিলেন কমিউনিস্ট ও বস্তুবাদী। মৃত্যুতে ভয় ছিল না তাঁর। যখন অনুভব করলেন যে তাঁর অন্তিমকাল উপস্থিত তখন শুধু বলেছিলেন, ‘কার্ল, আমার শক্তি ফুরিয়ে আসছে।’

এই কথাগুলিই ছিল তাঁর শেষ সুবোধ্য উক্তি। ৫ ডিসেম্বর তারিখে হাইগেট সমাধিক্ষেত্রের মন্ত্রপূত না করা জায়গায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর ও মার্কসের জীবনযাপনের ধরনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রীমতী মার্কসের অন্ত্যেষ্টির দিনটিকে সর্বসাধারণের গোচর করা হয়নি এবং কেবলমাত্র কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুই তাঁর এই শেষ যাত্রায় শবানুগমন করেন। মার্কসদের পুরনো বন্ধু এঙ্গেলস শ্রীমতী মার্কসের সমাধিপার্শ্বে অন্ত্যেষ্টিভাষণ দেন।…

স্ত্রীর মৃত্যুর পর মার্কসের জীবন হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণাভোগের এক অনুক্রম। সে সবই বরণ করে নিচ্ছিলেন তিনি অপরিসীম বীরোচিত সহনশীলতার সঙ্গে। কিন্তু এর এক বছর পর জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী লোঙ্গের আকস্মিক মৃত্যুতে যন্ত্রণার এই আগুন দ্বিগুণ প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। এবার একেবারে ভেঙে পড়লেন তিনি, আর সামলে উঠতে পারলেন না।

১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তারিখে কর্মরত অবস্থায় মহাপ্রয়াণ ঘটল মার্কসের।

১. পোল লাফার্গ (১৮৪২-১৯১১)- ফ্রান্সের এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতা, ফরাসি শ্রমিক পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কস ও এঙ্গেলসের বন্ধু ও প্রিয় শিষ্য এবং লারা মার্কসের স্বামী। লাফার্গের লেখা এই স্মৃতিচিত্রটি প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালে।

                                                           চলবে

@freemang2001gmail-com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating