Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

পুঁজিবাদী সমাজে টাকা-পঙ্কজ ধর চৌধুরী।

বনাম সমাজ-এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে তৈরি হয় শিল্প। একজন শিল্পী সমাজের মানুষের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে চায়, যাতে তার আপন প্রকাশ গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্পীর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা। কিন্তু আজকের এই বাজারি সমাজের অনুশাসন গ্রাস করে নিতে চায় শিল্পীর এই সত্তাকে। তাই একজন শিল্পীকে লড়াই করে যেতে হয় ক্রমাগতভাবে নিজ ব্যক্তিসত্তা এবং সমাজের সঙ্গে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন তার কড়াল গ্রাসে পৃথিবীকে মুষ্টিবদ্ধ করছিলো, বাজারি সমাজ যখন পরিণত হতে শুরু করেছে, প্রায় সেই সময়ে চলচ্চিত্র নামের নবতম শিল্প-মাধ্যমটির আবির্ভাব। আর আবির্ভাবের শুরুতে এই মাধ্যমটি ভৌত কাঠামো ‘সত্য’ নির্মাণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। এই কারণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও শাসক সমাজ এই মাধ্যমটির আবির্ভাব সুনজরে নিয়েছিলো। নিজেদের মতো করে বাস্তব নির্মাণে এর চেয়ে আর ভালো কিছু তাদের কাছে ছিলো না।

তাই তারা প্রথমেই মাধ্যমটির নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে ব্যবহার শুরু করলো নিজেদের মতো করে। কিন্তু বাধ সাধলো শিল্পীরা। কেনো মেনে নেবেন তারা এই নিয়ন্ত্রণ? তারা স্রষ্টা, আর স্রষ্টা চান নিজের মতো করে সৃষ্টি করতে। এর ফলে শুরু হয় নিয়ন্ত্রণ এবং সৃষ্টির স্বাধীনতা-এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব; আর এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় চলচ্চিত্রের ইতিহাস।

এই ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, অনেক শিল্পী বাধ্য হয়ে সরাসরি এই অবস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করে গেছেন। আবার অনেকেই সেই প্রচলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদ করেছেন; স্বাধীনভাবে নির্মাণ করতে চেয়েছেন চলচ্চিত্র, কিন্তু তারা পেরে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাদের শিল্প-সৃষ্টিই বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ অন্যান্য শিল্পের চেয়ে এই শিল্প-মাধ্যমটির একটি মূল পার্থক্যের জায়গা হলো, অর্থনৈতিক ও পরিবেশনের দিকটি। এর প্রোডাকশনে যেমন অর্থ জড়িত, আবার পরিবেশনের সঙ্গে শাসকের অনুমতি জড়িত। একজন  চলচ্চিত্র-শিল্পী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে হয়তো চলচ্চিত্র তৈরি করতে পারেন। কিন্তু পরিবেশনের সময় রাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন পড়ে। আর একজন শিল্পী তার সৃষ্টিকে সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতে না পারলে সৃষ্টির মূল্য থাকে না।

চলচ্চিত্রে এমন চিন্তাধারার একদল  চলচ্চিত্র-শিল্পী ছিলেন যারা প্রচলিত অবস্থার মধ্যে থেকে বের হননি, বরঞ্চ নিজের শিল্পকে ব্যবহার করে ভাঙ্গার চেষ্টা করেছেন প্রচলিত ব্যবস্থাকে। সমাজ পরিবর্তনে শিল্পকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে রাষ্ট্র কাঠামো কখনও বুঝতে পারেনি, আসলে তারা সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। যে-মানুষগুলো এই চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে চ্যাপলিন একজন। যাকে কখনই প্রচলিত সমাজ-কাঠামোকে লাথি দিয়ে এর বাইরে এসে কাজ করতে দেখা যায়নি; বরঞ্চ তার মধ্যে থেকে দরকষাকষি করতে দেখা গেছে। কারণ তিনি বুঝেছিলেন সমাজ বিচ্যুত হয়ে কোনো আন্দোলন করা যায় না। এই চিন্তা-চেতনার অনুবর্তী হয়ে তিনি সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্র, আর তার মধ্য দিয়ে পরিচিত হয়ে রয়েছেন বিশ্বে।

১.

১৯১৪ সালে মেকিং এ লিভিং দিয়ে চলচ্চিত্র-জীবন শুরু করেন চ্যাপলিন। চলচ্চিত্র-জীবনের শুরু থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত নির্মিত চলচ্চিত্রে মূকাভিনয় দিয়ে মানুষকে হাসিয়ে বিমোহিত করলেন চ্যাপলিন। মার্কিন দর্শক নিজেদের হাস্যকর এবং সরল অসহায় রূপ দেখলো এই সময়ের চলচ্চিত্রগুলোতে। কোনো ঘটনাকে দেখার ক্ষেত্রে তার শিশুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি যেমন মানুষকে একদিকে বিমোহিত করলো, পাশাপাশি নেশাও তৈরি করলো তার চলচ্চিত্রের প্রতি। এই সময়ে নিউইয়র্কের ক্রিস্টাল হলে তার চলচ্চিত্র ছাড়া কারও চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো না। কিন্তু শুধু মানুষকে হাসিয়ে আর  কতোদিন; জীবনতো শুধু হাসি আর আনন্দের নয়, জীবনে আছে দুঃখ, কান্না, বেদনা, প্রতিবাদ আরও কতো কী! ১৯২৪ সাল। গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে মানুষের হিংসা, ক্ষোভ, লোভ এই বিষয়গুলোকে নিয়ে চ্যাপলিন তৈরি করলেন গোল্ডরাশ। তিনি নিজে এই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বলেন, ‘গোল্ডরাশ ছবির মাধ্যমে আমি স্মরণীয় হয়ে থাকতে চাই।’ আছেনও বটে; এখন পর্যন্ত পৃথিবীর প্রথম দশটি চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি ধরা হয় গোল্ডরাশ-কে।

১৮৯৮ সালে আলাস্কা, ইউকন ও চিলকুটের পাশে একটি বরফের মরুভূমিতে সোনা পাওয়া যাচ্ছে-এমন একটি গুজবের ঘটনাকে নিয়ে চ্যাপলিন নির্মাণ করেছিলেন গোল্ডরাশ-এর কাহিনী। বরফের মরুভূমিতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে নিজেদের সঙ্গীর মাংস, কুকুরের মাংস, এমনকি জুতা সিদ্ধ করে খেয়েছিলো। গোল্ডরাশ নামের সেই চলচ্চিত্রটির দার্শনিক ভিত্তি ছিলো অন্তরালে লুকিয়ে থাকা একজন  ব্যক্তি-মানুষের ভিতরের সমস্যা; যেমন লোভ, হিংসা, ভালোবাসা, ক্ষুধার মতো পরিবর্তনীয় বিষয়গুলো। সেখানকার অবস্থান, পরিস্থিতি, পরিপ্রেক্ষিত-এই তিনে মিলে একটি সময়ে ওই মানুষের স্বরুপ কেমন হতে পারে তা সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন চ্যাপলিন। আমার এই আলোচনা মূলত গোল্ডরাশ-কে নিয়ে এগোবে, সঙ্গে থাকবে চ্যাপলিনকে বোঝার চেষ্টা। পাঠক তার আগে চ্যাপলিনের অন্যান্য চলচ্চিত্রের দিকে একটু চোখ ফিরিয়ে আসি।

১৯৩৬ সালে মডার্ন টাইমস-এ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৈষম্য, যান্ত্রিকতা, একাকিত্ব, অমানবিকতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আর অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটালেন। সমাজের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ আর  অসন্তোষতো আর  একদিনের নয়, সেই ছেলেবেলা থেকে যার শুরু। পাগলাগারদে বন্দি মা আর  অনাথ দুই ভাই কখনও অন্নের জন্য খেয়েছেন হোটেল থেকে ফেলে দেওয়া পঁচা খাবার। আবার কখনও মানুষকে কুকুর-বিড়ালের ডাক শুনিয়ে মিটিয়েছেন পেটের ক্ষুধা। এমনি কষ্টের স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন চ্যাপলিন।

মডার্ন টাইমস নির্মাণের চার বছর পর ১৯৪০ সালে নির্মাণ করলেন গ্রেট ডিকটেটর। হিটলার, মুসোলিনীসহ ফ্যাসিবাদিরা যখন ধ্বংস করতে যাচ্ছিলো মানবসমাজকে; তখনই ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে গিয়ে এর মাধ্যমে মানবতার জয়গান গাইলেন। আর এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সাত বছর না যেতেই ১৯৪৭ সালে অস্ত্রসজ্জিত খুনি রাষ্ট্রের সঙ্গে মঁসিয়ে ভার্দুকে লড়াই করিয়ে ‘ভেঙ্গে’ দিতে চাইলেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। একজন মানুষের সমাজ থেকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান না থাকলে এতো গভীরতায় গিয়ে শিল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। আইজেনস্টাইন তার এই দুরদর্শিতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তার (চ্যাপলিনের)চোখ কী দেখে? এই দুই অসাধারণ চোখ কী দেখছে? যে চোখ আধুনিক কালের অনায়াস লঘুময়তার রূপের আড়ালে দান্তের গভীর নরক দর্শনকে বা গয়ার ছন্নছাড়া চমৎকারিত্বকে প্রত্যক্ষ করতে পারে।’

২.

অনেক মানুষের মতো স্বর্ণের সন্ধানে বরফের মরুভূমিতে ছুটে চলেছে এক ভবঘুরে। সেখানে বরফ-ঝড় শুরু হলে এক বাড়িতে আশ্রয়কে কেন্দ্র করে ভবঘুরের পরিচয় হয় ব্ল্যাক লারসন ও জিম মাক্‌কে’র সঙ্গে। লটারিতে দাগী আসামী ব্ল্যাক লারসনের দায়িত্ব পড়ে খাবার জোগাড়ের। ক্ষুধার্ত ভবঘুরের আর পেট মানে না, শেষ পর্যন্ত জুতা রান্না করে ক্ষুধা মেটায় দুইজন। ব্লাক লারসন খাবার না নিয়ে ফিরে এলে পরের দিন বিদায় নেয় মাক্‌কে ও ভবঘুরে। পথিমধ্যে স্বর্ণখনির দলিল নিয়ে দেখতে পায় লারসনকে। তা নিয়ে মারামারি শুরু হলে মাথায় আঘাত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে জিম। কিছুদূর না যেতেই লারসন বরফের পাহাড় ভেঙ্গে মারা যায়। ওইদিকে স্বর্ণ খনি খুঁজতে গিয়ে পথ ভুলে লোকালয়ে গিয়ে ভবঘুরেটি প্রেমে পড়ে গায়িকা জর্জিয়া’র। সেখানে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় কাহিনী। একদিন আঘাতপ্রাপ্ত ‘পাগল’ জিম মাক্‌কে’র সঙ্গে ভবঘুরের দেখা হলে সে স্মৃতিশক্তি ফিরে পায়। তারা আবার স্বর্ণ অভিযানে বের হয়, অবশেষে অভিযান সফল হয়। এরপর ভবঘুরে (ধনী) তার প্রেমিকাকে খুঁজে না পেয়ে সারাদিন মনোকষ্টে ভোগে। শেষ পর্যন্ত কাকতালীয়ভাবে একটি জাহাজে ধনী ভবঘুরের সঙ্গে জর্জিয়া’র দেখা হয়। এভাবেই শেষ হয় চলচ্চিত্রটি।

চলচ্চিত্রটির এই কাহিনী কেবল ওই সময়ের, ওই মানুষগুলোর কিংবা ওই স্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওই মানুষগুলোর মতো অগণিত ভাগ্যপরিবর্তনকামী মানুষ এই ‘সুন্দর পৃথিবীতে’ আজও   বিরাজমান। শুধু তাই নয়, জ্যামিতিক হারে পরিবর্তিত হয়ে বেড়েছে তাদের সংখ্যা, সময়, স্থানিক সীমানার ব্যাপ্তি। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে,আজ  আমরা নিজেদেরকে ‘সভ্য’ বলছি। কিন্তু সেই সমাজের চেয়ে আজকের সমাজের চেহারা আরও  ভয়াবহ হয়েছে! আজও  একদল  মানুষ সৌভাগ্যের আশায় ছুটতে গিয়ে সম্পদের অদৃশ্য চোরাবালিতে আটকা পড়ছে। নিঃস্ব হয়ে কেউ ফিরে আসছে, আবার কারও থেমে যাচ্ছে জীবনের উজান। আজ  থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে নির্মিত দ্য গোল্ড রাশ-এর কাহিনী যেনো চিরন্তন-বর্তমানকালেরই পাঠ।

চ্যাপলিনের এই চলচ্চিত্রটিকে যেমন একটি দার্শনিক ভিত্তিতে দেখা যায়, আবার সেই সময়ে সামাজিক অবস্থার প্রতীকী রূপ হিসেবেও দেখার একটি জায়গা রয়েছে। একটি টেক্সট্‌কে যেহেতু অনেকভাবে দেখা যায়, তাই নতুন একটি জায়গা থেকে চলচ্চিত্রটি দেখার চেষ্টা করা যাক। সে-ক্ষেত্রে আমরা চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন সিক্যুয়েন্স ও শট ধরে সমাজের রূপ উন্মোচনের চেষ্টা করবো।

৩.

গোল্ডরাশ-এর প্রথম দৃশ্যতেই হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলতে দেখি স্বর্ণের সন্ধানে। পরের শটে এক ভবঘুরে চলতে থাকে বরফের মরুভূমিতে। পিছনে ভাল্লুক, কিন্তু সেই দিকে কোনো খেয়াল নেই; মোহের মধ্য দিয়ে পথ চলতে থাকে ভবঘুরেটি। কোথায় সম্পদ, শুরু হয় জীবনসংগ্রাম; প্রথমেই বরফ-ঝড়ের মধ্যে জীবন বাঁচাতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়তে হয় ভবঘুরেকে। চমৎকার এই সিক্যুয়েন্সটি আসলে সমাজ বাস্তবতায় একজন  মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র। তৎকালীন ওই সমাজের মানুষগুলোকে এই রকম লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়েছিলো, যা আজও  হচ্ছে। ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সামন্ততান্ত্রিক অবস্থা ভেঙ্গে আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়ায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার দ্বারা পুঁজিবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। আর  এসব অঞ্চলের গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে থাকে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়কে কেন্দ্র করে।

বিংশ শতকের শুরুর দিকে সামন্তবাদী সমাজ ভেঙ্গে যখন বাজারি সমাজ পরিণত অবস্থায়; মানুষের শহরমুখীতা ক্রমে বেড়ে চলছিলো। তখন মোহগ্রস্থ মানুষ না বুঝে ছুটে চলেছিলো পুঁজিবাদী ‘স্বপ্ন’ দুনিয়ায়, যেখানে ছিলো মিথ্যা সম্পদের হাতছানি। গ্রাম থেকে শহরে আসা এসব মানুষ নিজের অজান্তেই ঢুকে পড়ছিলো শ্রম-শোষণের বাজারে। সেখানেই শুরু হয় তাদের জীবনসংগ্রাম। আজকেও আমরা দেখতে পাই প্রতিদিন আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলে শহরের দিকে। আর সেখানে শুরু হয় মানুষের নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম। চ্যাপলিন ওই দৃশ্যর মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজচিত্র তুলে ধরেছেন। চ্যাপলিনও নিজের জীবন-জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আমেরিকায়। আর  পুঁজিবাদের বিরোধিতা করায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পুঁজিবাদী দেশ থেকে একসময় বিতাড়িতও হয়েছিলেন।

৪.

পরিত্যক্ত একটি বাড়ি। কে হবে এই বাড়ির মালিক? জিম মাক্‌কে নাকি ব্ল্যাক লারসন। এই নিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে নামে তারা, বন্দুক নিয়ে হাতাহাতি শুরু করে দুইজন। আর এই লড়াইয়ে বন্দুকের নল ঘুরতে থাকে দর্শক ভবঘুরের দিকে। ভীত-সন্ত্রস্ত্র ভবঘুরেটি কখনও টেবিলের নিচে কখনও টেবিলের উপর উঠে চেষ্টা করে বন্দুকের নলের বাইরে যেতে, কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকের দেখে মনে হতে পারে এটি ঠাট্টা বা হাসির একটি দৃশ্য। কিন্তু চ্যাপলিনের বিশেষত্ব অন্যখানে, তিনি মানুষকে হাসাতে হাসাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেন। আজকে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন লড়াই, অরাজকতা দেখি, সেটি রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার লড়াই। এই লড়াইয়ে মারা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবঘুরের মতো সাধারণ মানুষ। কেউ এর প্রতিবাদ করবে তারও উপায় নেই, বন্দুকের নল যে তার মাথার উপর অনবরত ঘুরতে থাকে।

আফগানিস্তান,ইরাক আমাদের কাছে এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। আবার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে হরতাল, জাতিগত দাঙ্গা-সে-গুলোতেও থাকে ক্ষমতার লড়াই। সমাজে ক্ষমতার এই লড়াই শুধু আজকের নয়, যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে। দাস সমাজে এক গোষ্ঠীর সঙ্গে আরেক গোষ্ঠীর লড়াই, সামন্ততান্ত্রিক সমাজে এক রাজার সঙ্গে আরেক রাজা,আর পুঁজিবাদি সমাজে কখনও নিজ রাষ্ট্রের ভিতরে আবার কখনও অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই। যুগ-যুগ ধরে শাসকদের লাভ-ক্ষতির হিসাব এভাবেই মেলাতে হচ্ছে জনগণকে। অথচ সবার মুখে বুলি গণতন্ত্রের! পাঠক, চ্যাপলিন একটি সিক্যুয়েন্স দিয়ে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে দেখালেন যুগ-যুগ ধরে ঘটে যাওয়া সমাজের বাস্তবচিত্র।

৫.

প্রচণ্ড বরফ-ঝড়ের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা হিসেবে ভবঘুরে নিজের জুতা সিদ্ধসহ যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করে। কিন্তু খাবার বণ্টনের সময় ভবঘুরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেশি অংশটা নিয়ে নেয় জিম। বাধ্য হয়ে কোনোরকম প্রতিবাদ ছাড়া কম অংশটা খেতে হয় ভবঘুরেকে। কারণ, ইতোমধ্যে ব্ল্যাক লারসনের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হয় জিম, আর সেই ক্ষমতার কাছে বাধ্য হয়ে ‘নত স্বীকার’ করে ভবঘুরেটি। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলেও প্রতিবাদের কোনো ক্ষমতা তার কাছে থাকে না। বাজারি এই সমাজের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঠিক একই চিত্র দেখতে পাই। পৃথিবীতে কোটি-কোটি শ্রমিক তাদের শ্রমের বিনিময়ে মানুষের জন্য পণ্য উৎপাদন করে চলেছে। কিন্তু দিন শেষে তাদের নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যে-চাহিদা তাও মেটাতে পারছে না।

শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিককে যে-মজুরি দেওয়া হয় তা মূলত শ্রমশক্তির মূল্যের রূপান্তরিত ধরন বলা হলেও বাজারি সমাজের মালিকরা শ্রমের এই রূপান্তরিত ধরনে তৈরি করে চরম বৈষম্য। আর এই বৈষম্য থেকে যে উদ্বৃত্ত-শ্রম তৈরি হয় তা থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে পুঁজি। এর ফলে মালিকরা আরও ধনী হয়, আর শ্রমিকরা আটকে থাকে শোষণের জালে। মার্কস এটিকে বর্ণনা করলেন এভাবে, ‘যে বুর্জোয়া চিন্তা কারখানার শ্রমবিভাজন, আজীবন একটি খন্ডিত কর্মকান্ডে মানুষকে আটকে রাখা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য শ্রমকে সংগঠিত করবার কথা বলে তাকে পুঁজির সম্পূর্ণ অধস্তন করে রাখার অবিরাম প্রশান্তি করে, সেই একই বুর্জোয়া চিন্তা একইরকম  জোর গলায় উৎপাদনকে সামাজিকভাবে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করবার বিরোধিতা করে। পুঁজিপতির অনিয়ন্ত্রিত কর্মকান্ড অব্যাহত রাখবার জন্য তারা সম্পত্তির ওপর অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি অজুহাত তুলে শোরগোল করে। তারা কারখানার শৃঙ্খলের পক্ষে, কিন্তু সমাজকে পরিকল্পিত বিন্যস্ত করবার পক্ষে নয়।’শ্রমিকরা সমাজকে বিন্যস্ত করার দাবিতে, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কখনও প্রতিবাদ করে কারখানা বন্ধ করে দেয়। তাদের শ্রম ছাড়া যেহেতু আর কোনো সম্পদ নেই, তাই বাধ্য হয়ে আবার তাদের ফিরে আসতে হয় সেখানেই। আর এ-দুর্বলতা থেকেই পুঁজি সবসময় শ্রমিকদের অবিরাম অবাধ্যতা মোকাবিলা করে।

আমরা কয়েক মাস আগে দেখেছি কীভাবে আর্জেন্টিনার শ্রমিকরা বন্ধ কারাখানার তালা ভেঙ্গে তাদের কারখানা আবার চালু করেছিলো। হয়তো-বা এখান থেকেই শুরু। পুঁজিবাদি সভ্যতা যেহেতু আজ  পরিপূর্ণ, শ্রমিকদের শুধু কাজের মধ্যে বুদ করে রাখা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি বাড়াচ্ছে শ্রমিকদের দক্ষতা। আর এই দক্ষতা থেকে তাদের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হতে পারে। মার্কস যেমন বলেছিলেন, ‘মানুষের চরিত্র এমন যে, যতই সে দক্ষ হয়ে ওঠে ততই সে নিজের ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সবকিছুর ওপর বড় ক্ষতি করতে পারে।’

৬.

রুশোর একটা উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।’ এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও তীব্রভাবে মানুষের ইতিহাস বুঝি আর ব্যক্ত করা যায় না।কারণ মানুষ মানুষের কাছেই পরাধীন। একদল মানুষ যুগ-যুগ ধরে এসব সাধারণ মানুষদের বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছে; আজও করছে। ক্ষমতাধররা মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটা সময় গড়ে তোলে কারাগারের মতো প্রতিষ্ঠান; ধোঁয়া তোলে ‘অপরাধী’ সংশোধন করার। এক সময় ছিলো যখন ‘অপরাধী’দের শাসকরা শাস্তি দিতো শারীরিকভাবে; মাথা কেটে ফেলা, হাত কাটা ইত্যাদি ছিলো শাস্তির নানা ধরন। কিন্তু যখন আমরা নিজেদের সভ্য বলতে শুরু করেছি, পুঁজিবাদ বিকাশ করে ‘গণতন্ত্রের’ দিকে ঝুঁকেছি, তখন এই চিন্তা পরিবর্তন করে তাকে কারাগারে পুরে রাখার ব্যবস্থা শুরু হলো। সঙ্গে-সঙ্গে এই কারাগার সিস্টেমে গড়ে ওঠে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা। যেখানে এমন এক পদ্ধতি চালু হয়, মানুষের কর্মকাণ্ডকে একরকম নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল-সবকিছুই এই সিস্টেমের আওতাভূক্ত হয়ে পড়লো। সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু কারাগার আর  আইন  নয়, আরও  কিছু জায়গা দরকার পড়লো ডিসিপ্লিন শেখাতে; এই চিন্তা থেকে তৈরি হলো বিদ্যালয়ের। আমরা যদি আধুনিক বিদ্যালয়ের ইতিহাস দেখি, সতের শতকে শিশুদের গোল্লায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিলো; উদ্দেশ্য ছিলো এক ধরনের ডিসিপ্লিন-এর মধ্যে রাখা। ছাত্ররা ময়লা পোশাক পরলে, আচরণ ঠিক না হলে এ-গুলো এক ধরনের দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেব দেখা হতো। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়া হতো, কিন্তু আচরণ কেনো এমন হয়-এসব বিষয় কখনও মাথায় রাখা হতো না। ফুকো এই বিদ্যালয়গুলোকে বলেছিলেন ‘ছোট আদালত’।

আধুনিক কারাগার ব্যবস্থা দার্শনিক জেরমি বেন্থামের সূত্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তিনি শাস্তিকে সংশোধনের পথ হিসেবে দেখেছিলেন। তা এমন হতে হবে যাতে অপরাধী অপরাধ সম্পর্কে সজাগ হয়ে অপরাধ-প্রবৃত্তি পরিহার করতে পারে। যদি আমরা এই সূত্রের আলোকেও কারাগারকে দেখি, তবুও দেখবো বর্তমান কারাগারপ্রথা ষোড়শ শতকের সেই সিস্টেমেই রয়ে গেছে। আজও   আবুগারিব বা গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বন্দিত্বের নামে নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা চালানো হয়। এ-রকম ঘটনা হয়তো আমাদের সামনে কোনোভাবে এসেছিলো বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু পৃথিবীর কোটি-কোটি বন্দিদের নির্যাতনের খবর আমাদের কাছে আসে না।

চার্লিও হয়তো তখনই বুঝতে পেরেছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের নির্মম আচরণ। তাই বিচলিত হয়েছেন। মানুষের এই শাস্তির ব্যবস্থা হিসেবে বন্দিত্ব মেনে নেননি চার্লি। তাইতো চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্যে এই চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পাই। ভবঘুরেটি তার প্রেমিকা জর্জিয়াকে একদিন ডিনারের আমন্ত্রণ জানান তার আশ্রিত বাড়িতে। কিন্তু ডিনার করানোর মতো টাকা-পয়সা তার নেই। টাকা আয়ের জন্য মানুষের বাড়ির সামনে বরফ পরিষ্কারের দায়িত্ব নেয় ভবঘুরেবেশী চার্লি। বাড়ির বরফ পরিষ্কার করতে গিয়ে পাশের বাড়ির দরজায় আবার বরফ জমা করতে থাকেন। এই  ধারাবাহিকতায় তিনি একপর্যায়ে বন্ধ করে দেন আধুনিক কারাগারের দরজা।

৭.

সমাজে প্রতিটি মানুষ সমান হলেই সমাজে সুখ আসবে-চার্লি নিশ্চয় এমন দর্শনে বিশ্বাস করতেন। এটা কেনো বলছি, সে-কথায় আসছি একটু পরে। স্বর্ণের খনি পাওয়া ধনী ভবঘুরেটিকে সুখী করতে পারে না অর্থবিত্ত। জীবনের এই প্রাপ্তির মাঝেও তার প্রেমিকা জর্জিয়ার অপ্রাপ্তি তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তাই জাহাজ ভ্রমণে বের হলে ভবঘুরেটিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় জর্জিয়ার ছবির দিকে। এরপর একজন ফটোগ্রাফার ছবি নিতে আসে ভবঘুরের। ছবি ওঠার জন্য ভবঘুরেটি অভিজাত পোশাক ছেড়ে হাজির হয় চিরচেনা ছেঁড়া পোশাক আর একপায়ে জুতা পরিহিত অবস্থায়। ছবির পোজ ঠিক করতে গিয়ে নিচের ডেকে পড়ে যায় ভবঘুরে। আর  সেখানেই দেখা মেলে জর্জিয়ার; অবসান হয় দীর্ঘ হতাশার। পাঠক একটু ভেবে দেখুন, ধনী ভবঘুরের সঙ্গে চ্যাপলিন কিন্তু জর্জিয়ার মিলন ঘটালেন না। ঘটালেন দরিদ্র ভবঘুরের সঙ্গে। খুব সচেতনভাবে চ্যাপলিন উঁচু থেকে ভবঘুরেকে সেই চিরচেনা পোশাকে নিয়ে আসলেন জর্জিয়ার কাছে। এর মধ্য দিয়ে বৈষম্য ভেঙ্গে গাইলেন সাম্যের ‘গান’।

৮.

বাইরে প্রচণ্ড তুষার ঝড়। খাবার নেই, পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা-এরকম পরিস্থিতিতে জিম মাক্‌কে তার মানবিক সত্তা হারিয়ে ফেলে। ভবঘুরেকে (চার্লি) দেখতে পায় মুরগীর মতো; খাবার ভেবে হত্যা করতে যায় তাকে। মানুষের চরিত্রই এমন-যখন পেটের ক্ষুধা নিবারণের তথা জীবনধারণের কোনো পথ থাকে না, তখন সে তার মানবিক সত্তা হারিয়ে ফেলে। ভালো-মন্দের সব যুক্তি ফেলনা মনে হয় তার কাছে। ফলে এর জন্য যেকোনো কাজ করতে আর  সে দ্বিধা করে না। পুঁজিবাদী সমাজ সম্পদের যে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা তৈরি করে, তার কারণে সৃষ্টি হয় ক্ষুধা, দারিদ্র, বেকারত্ব। আর এর ফলে সমাজে অপরাধ বেড়ে যায়, অভাবের তাড়নায় অপরাধমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হয় অনেক মানুষ। পুঁজিবাদী সমাজ একদিকে বৈষম্য করে সমাজে যেমন ‘অপরাধী’ তৈরি করে চলেছে, আবার তারাই এই মানুষগুলোকে কারাগারে বন্দি করে রাখছে। চার্লি মানুষের মানবিক সত্তা হারানোর কারণটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন; আঙ্গুল তুলেছিলেন পুঁজিবাদী সমাজের দিকে। মানুষের ক্ষুধা কীভাবে অপরাধ তৈরি করে তার উপযুক্ত দৃষ্টান্ত চার্লির এই সিকোয়েন্সটি। চার্লির মৃত্যুর পর তার লাশ নিয়ে ঘটা একটা পরিস্থিতির কথা এখানে না বলে পারছি না।

১৯৭৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর চ্যাপলিন মারা গেলে তাকে সুইজারল্যান্ডের বেভিতে সমাধিস্থ করা হয়। দুই মাস পর হঠাৎ কে বা কারা সমাধি থেকে তুলে জিম্মি করে চার্লির লাশটি। পরবর্তী সময়ে জিম্মিকারীরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা আসলে পেশাদার কোনো চোর নয়, নিতান্ত সাধারণ বেকার যুবক। এই ধরনের কাজ করার কোনো ইচ্ছে তাদের ছিলো না। কিন্তু অভাবের তাড়নায় খাবারের টাকা জোগাড় করার জন্য তারা মহান এ-শিল্পীর লাশ জিম্মি করতে বাধ্য হয়েছে। জীবিত চার্লি মানুষের অসহায়ত্বের এই কথাগুলোই সিনেমায় বারবার বলতে চেয়েছিলেন।

৯.

মানুষের লোভ, ক্ষুধা, রাগ এ-গুলো সহজাতভাবেই থাকে। কিন্তু এর বহিঃপ্রকাশ নির্ভর করে অবস্থান, পরিস্থিতি ও পরিপ্রেক্ষিতের ওপর। যদিও মানুষ নিজ চেষ্টা দ্বারা কিছু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে। এই তিনটি কারণে উন্নত দেশে মানুষের আচার-আচরণ, লোভ, রাগ একরকম, আবার আমাদের দেশে অন্যরকম। চার্লিকে শুধু একজন স্ল্যাপস্টিক শিল্পী হিসেবে যারা দেখতে চান, তারা ভুল করেন। তার সবকিছুর প্রকাশভঙ্গি যদিও হাসির মধ্য দিয়ে, কিন্তু দেশকাল ভেদে মানুষকে বুঝতে, শোষণকে বুঝতে তা এতোটুকু সমস্যায় ফেলে না। এই জায়গাতেই চ্যাপলিন অনন্য হয়ে রয়েছেন, যুগ-যুগ ধরে থাকবেনও বটে।

চ্যাপলিন সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটকের একটি মূল্যায়ন দিয়ে এই আলোচনা শেষ করতে চাই। ‘শিল্পের যত সুষ্ঠু প্রয়োগই হোক, সম্পর্কের অভিনবত্ব প্রকাশের যত মাধুর্যময় ভঙ্গীই হোক, আঙ্গিকের অবকাশকে বাড়িয়ে তোলার সম্ভাবনা প্রকট করে না তুললে কিছুতেই এক্সপেরিমেন্টের পর্যায়ে ফেলতে আমি রাজি নই। এত দ্বারা লজ্জা পেয়ে যাবার কোনো কারণ নেই। চার্লি চ্যাপলিনকে কেউ এক্সপেরিমেন্টাল বলে অপবাদ দেয় না। এক্সপেরিমেন্টের ফলিত প্রয়োগে তিনি স্বার্থকতম। শিল্পের নব আবিষ্কার করতে তার বাধা ছিলো না। কিন্তু করেননি। তাতে তিনি কিছু ছোট হয়ে গেছেন কী?

বৈশ্বিক পুঁজিবাদে মজুরি নির্ধারণের রাজনৈতিক অর্থনীতি

শিল্পে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কথা বহু আগে থেকেই বলা হচ্ছে। কেবল পোশাকই নয়, সমগ্র শিল্পে এ ধরনের মজুরি নির্ধারণ করার রীতি কেবল বাংলাদেশে নয়; সকল সভ্য দেশেই রয়েছে। এ ধরনের আইনের যুক্তি অনেকটাই স্বতঃসিদ্ধ। কেননা যে কোনো শ্রমিককে কর্মে নিয়োজিত করার পূর্বশর্ত– শ্রমিকের শ্রমশক্তি পুনরোৎপাদনের জন্য যা ‘ন্যূনতম’ তা তাকে প্রদান না করলে শ্রমশক্তির সরবরাহ চলমান থাকবে না।

পুঁজিবাদী সমাজে ‘ন্যূনতম’ মজুরির এই শর্তটির সুস্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন কার্ল মার্কস ‘পুঁজি’র প্রথম খণ্ডে। প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিটি হচ্ছে–

মার্কসের মডেলে মালিকশ্রেণি (যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের মালিক) শ্রমশক্তির মূল্য বাবদ এতটুকু দেওয়ার পর এর উপরে শ্রমের যে বর্ধিত উৎপাদনশীলতা ও উদ্বৃত্ত থাকে সেটি গ্রহণ করবে। সেটি হবে মুনাফা। সে মুনাফা থেকে মালিকের ক্রমশ উন্নতি হবে।

এই উন্নতির দুই রকম বহিঃপ্রকাশ সম্ভব। একটি হচ্ছে বিলাসী ভোগব্যয়। আরেকটি হচ্ছে ওই উদ্বৃত্তের একটি অংশ উৎপাদনশীলভাবে বিনিয়োগ করে কারখানার আয়তন বৃদ্ধি তথা ক্রমাগত পুঁজির কেন্দ্রীভবন। যার ফলে আবার শ্রমিকদের বর্ধিত কর্ম নিয়োজনের মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণিরও আয়তন বৃদ্ধি তথা কেন্দ্রীভবন ঘটবে।

মার্কসের এ বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের দেশে এখন সত্যে পরিণত হয়েছে। তবে আমাদের দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এই দেশের পুঁজিবাদী বিকাশে নেতৃত্ব দিচ্ছে শ্রমঘন রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প।

এ ধরনের উৎপাদনশীল পুঁজিবাদে শোষণ রয়েছে বটে, তবে তার একটি উৎপাদনশীল চরিত্রও রয়েছে। এ কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে উৎপাদনের স্বার্থেই শ্রমিককে সে তার ন্যূনতম পাওনাটুকু দিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু আমাদের মতো অনুন্নত পুঁজিবাদে প্রথম প্রজন্মের পুঁজিপতিরা উৎপাদনের চেয়ে বেশি আগ্রহী মুনাফায়।

এরা কেউ কেউ ধাপে ধাপে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের চেয়ে এক লাফে সমস্ত মুনাফা পেতে ইচ্ছুক। এদের অনেককেই সেই লোভী কৃষকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যারা রাজহংসকে জবাই করে তার পেটের সবগুলো সোনার ডিম একসঙ্গে পেতে চায়।

এ ধরনের পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের ন্যূনতম প্রাপ্তির অধিকার স্বীকার করেন না বা করলেও সেটি যেন না দিতে পারলেই তারা খুশি হয়। এদের ভোটের উপর প্রধানত নির্ভরশীল ইএগঊঅ নেতৃত্বও তাই ‘ন্যূনতম’ মজুরিটুকুও না দেওয়ার জন্যই সচেষ্ট থাকে সবসময়। আমরা জানি, দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যায়।

তবে কোনো বিশেষ শিল্পের কোনো বিশেষ কারখানার যদি সেই ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকে তারা তখন কিন্তু বাজারে টিকতে পারে না। তারা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। ক্রমশ অবলুপ্ত হয়ে যায়।

বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে— এটাও পুঁজিবাদেরই নিয়ম। পুঁজিবাদে সব কারখানাই যে টিকবে, এ কথা সত্য নয়। কোনো কোনো কারখানা মুনাফা করবে, কোনোটি করবে না। মুনাফার শর্ত– শ্রমিকদের দিয়ে উৎপাদন করানো। আর শ্রমিকদের দিয়ে উৎপাদন করানোর পূর্বশর্ত হচ্ছে, তাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম মজুরি দেওয়া। এ ন্যূনতম শর্ত যে সকল কারখানা পূরণ করতে পারে না তাদের বাজারে টিকে থাকারও কোনো যৌক্তিকতাও নেই এবং তারা থাকেও না। এটিই অবাধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিষ্ঠুর নিয়ম।

এখন বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে যেটি হয়েছে সমস্ত অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা উঁচুতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মজুরি অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কারণে সেখানে মুনাফার হারও কমে এসেছে । সেখানে যে সব পণ্য উৎপাদন করছে সেগুলো অত্যন্ত পুঁজিঘন, শ্রমঘন নয়।

কেননা শ্রমঘন পণ্য উৎপাদন করতে গেলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা অনিবার্যভাবে হ্রাস পাবে এবং তখন শ্রমের মূল্য বাবদ যে দাম পরিশোধ করতে হয়, তা দেওয়ার পর মুনাফা অস্বাভাবিক স্তরে ( সুদের হারের চেয়ে নিচে!) নেমে যায়। একটি উপায় হচ্ছে নিজস্ব তৈরি পোশাকের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু তাদের বাজারে সেটি সাধারণ ভোক্তারা অত দামে কিনতে রাজি নয়।

এ কারণে বিদেশি পুঁজিপতিরা নিজেদের দেশে শ্রমঘন পণ্য আর উৎপাদন করছে না। সেটি উৎপাদন করলে একদিকে ক্ষতি। অন্যদিকে সে ক্ষতি পোষানোর জন্য শ্রমিকের মজুরিও তারা কমাতে পারছে না। এখানে উন্নত অর্থনীতির সাপেক্ষে শ্রমের উৎপাদন-পুনরুৎপাদনের খরচের মধ্যে এমন অনেক বিষয় ঢুকে গেছে যেগুলো নৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে তারা মেনে নিতে বাধ্য।

যেমন– আমেরিকার একজন শ্রমিককে পোশাক, খাদ্য, চাহিদা, যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও অন্যান্য বিনোদনের সুযোগ করে দিতেই হবে। এখন আমেরিকান পুঁজিপতি সে দেশের শ্রমিককে বাংলাদেশের মজুরি দিয়ে উৎপাদন করাতে পারবে না।

এক কথায়, খুব শ্রমঘন পণ্য উৎপাদন যে প্রযুক্তি দিয়ে করা হয় সেটি আর উন্নত পুঁজিবাদী দেশে সম্ভব নয়। তারা এখন কী করছে? উন্নত বিশ্বের সকল পুঁজিপতি আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন তৈরি করছে। সেই শ্রম বিভাজন অনুযায়ী শ্রমঘন পণ্যগুলো তুলনামূলক কম মজুরি যেখানে, একই সঙ্গে ন্যূনতম মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করার সক্ষমতাও যাদের রয়েছে, সে সব দেশে স্থানান্তরিত করে উৎপাদনের জন্য দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বায়নের এই সুযোগটি গ্রহণ করে কোনো কোনো দেশ রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্পায়নের পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এরাই বর্তমানে উন্নয়ন লিটারেচারে ‘উদীয়মান ব্যাঘ্র’ বা ‘মধ্যআয়ের দেশ’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে কিছু উন্নত ব্রান্ডের পোশাকও তৈরি হচ্ছে। এই মাঝারি মাত্রা এতদিন দখল করে রেখেছিল মধ্যআয়ের দেশ বা আমাদের চেয়ে একটু উন্নত দেশ অর্থাৎ চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ার মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশ।

কিন্তু যে ব্রান্ডের পোশাকগুলো আরও নিম্নস্তরের অর্থাৎ যেগুলি তৈরিতে আরও বেশি শ্রমিক লাগে এবং সেই শ্রমিক নিয়োগ করতে যে ব্যয় হয়, সেটি চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়ায় পোষায় না, সেগুলির কী হবে? তারা যেটা করতে পারে সেটা হচ্ছে আরও অনুন্নত, আরও শ্রমঘন, আরও কম মজুরির দেশে সেই উৎপাদনগুলি স্থানান্তরিত করা।

এ কারণেই বাংলাদেশকে সবচেয়ে নিম্নমানের পোশাক তৈরি দিয়ে শুরু করতে হয়েছে। এটি তৈরি করতে বাংলাদেশ তখন রাজি হয়েছে এই কারণে যে, এ দেশের কৃষিখাতে তখন মজুরি ছিল খুব কম। সুতরাং এর চেয়ে সামান্য বেশি মজুরি দেওয়ায় শ্রমিকের অভাব হয়নি।

আর বিশেষ করে এ খাতটিতে যেহেতু নারীরা কাজ করছে, সুতরাং নারীদের অপারচুনিটি কস্টের (সুযোগ ব্যয়) ওপর নির্ভর করছে এ মজুরির সীমা কত নিচুতে ঠেলে দেওয়া হবে। যেহেতু নারীদের অপরচুনিটি কস্ট প্রায় শূন্য, চাকরিই ছিল না অতীতে, অধিকাংশ সময়ে গৃহকাজই করতে হত।

অর্থাৎ যে তরুণীরা পোশাক খাতে কাজ শুরু করেন, সেই তরুণীরা আগে বাবার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন; আর রান্নাবান্না কিংবা ঘর-গেরস্থ সামলাতে মাকে সাহায্য করতেন। সুতারাং তাদের কাছে যে কোনো মজুরিই প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। তাদের কাছে তখন এটি কেবল মজুরিই নয়; গৃহের কষ্টদায়ক শ্রম থেকে মুক্তিও বটে। সুতরাং প্রথম দিকে এই পোশাক শিল্প মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছে। তবে স্বল্পতম মজুরি ও তীব্রতম শোষণের মাধ্যমেই তা সম্ভব হয়েছিল।

উন্নত দেশগুলির শ্রমিকদের আগের ইতিহাসে যদি যাওয়া হয়, দেখা যাবে, সেখানেও নারী ও শিশু শ্রমিকদের মানবেতর মজুরি দিয়ে প্রথমে শোষণ করা হয়েছে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের পুঁজিবাদী শোষণের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা প্রায় দুই দশক অর্থাৎ আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশক অতিক্রম করেছেন। পুঁজিবাদের গতিশীলতা এ রকম রক্তাক্তভাবেই অর্জিত হয়েছে। কিন্তু ২০০০ সালের পরে আমাদের অপেক্ষাকৃত সাবালক পুঁজিবাদকেও তার মজুরি বাড়াতে হবে!

কেন তা অনিবার্য সেটাই এখন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। এই গতিশীল ব্যাখ্যার যুক্তিটা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের বিস্তৃতি ঘটছে অসমভাবে। সর্বত্র সমানমাত্রায় তা বিকশিত হচ্ছে না। সবচেয়ে ওপরে ছিল আমেরিকা। তার সঙ্গে রয়েছে সমপর্যায়ের গুটিকয়েক পুঁজিবাদী দেশ। তারপর রয়েছে মাঝামাঝি কয়েকটি মধ্যআয়ের দেশ। এরপর রয়েছে বাংলাদেশের মতো কতগুলো নিম্নআয়ের দেশ।

এখানে স্বল্পআয়ের দেশের তুলনায় মধ্যআয়ের দেশে মজুরি বেশি। আবার মধ্যআয়ের তুলনায় আমেরিকার মতো দেশে মজুরি বেশি। এরূপ পরিস্থিতিতে শ্রমবিভাজন হবে নিম্নরুপ– সবচেয়ে শ্রমঘন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে বাংলাদেশে, মাঝারি শ্রমঘন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে। আর সবচেয়ে কম শ্রমঘন প্রযুক্তি থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে।

অপেক্ষাকৃত শ্রমঘন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে যে উচ্চ মুনাফা হয়, সেটি যদি জাতীয়ভাবে সে দেশেই পুনঃনিয়োগ করা হয় তাহলে সেখানেও পুঁজির ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এজন্যই জাতীয়তাবাদী চীন এবং ভারত চিরকাল মাঝারি স্থানে থাকবে না। তারা উচ্চ আয়ে যেতে চাইবে। বিষয়টি পরিযায়ী পাখির মডেলের সাহায্যে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

‘ফ্লাইংগিজ মডেল’ অনুসারে, সবচেয়ে উপরে থাকে একটি পাখি, মাঝে দুইটি আর নিচে চারটি। দ্বিতীয় স্তরে যার অবস্থান, সে চায় প্রথম স্তরে যেতে। আর প্রথম অবস্থানে কোনো সংকট তৈরি হলে ওই স্তরের সদস্য নিচে নেমে যায় এবং সেখানে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করে দ্বিতীয় স্তরের কেউ।

’৯০-এর পর বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বপুজিবাদী কেন্দ্রগুলিতে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশে সেই সুযোগগুলো তৈরি হচ্ছে। উচ্চআয়ের দেশগুলোর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় মধ্যআয়ের দেশগুলো উচ্চআয়ের দিকে যেতে চাচ্ছে। ‘ইকোনমিস্টে’র মতো আমেরিকাপন্থী পত্রিকা বলতে বাধ্য হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দী হবে চীন কিংবা এশিয়ার শতাব্দী।

তার মানে আমেরিকার পুঁজিবাদ এতটাই পরিপক্ক পর্যায়ে চলে গেছে যে, সেখানে মুনাফার পতন হচ্ছে। এই পুঁজি হয় চীন, ভারত, নয়তো বাংলাদেশে আনতে হবে অথবা তাদেরকে বাজারে জায়গা করে দিতে হবে। ঠিক তাই হয়েছে! চীন আমেরিকার বাজার দখল করে নিয়েছে।

এ কারণে চীন ধীরে ধীরে মধ্য পর্যায়ের পণ্য রেখে উচ্চ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। চীন যতটা ওদিকে যাবে, ততটাই ওদের মজুরি বেড়ে যাবে। চীনে মজুরি বাড়বে যেই পরিমাণে, সেই পরিমাণে তাকে শ্রমঘন পণ্য তৈরি ছাড়তে হবে। তখন ওই জায়গায়ও শূন্যতা তৈরি হবে। তখন বাংলাদেশের মতো নিচের দেশগুলিকে সেই শূন্যতা পূরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ যদি সেখানে যায়, তবে আগে যে মজুরি ছিল, সেটি ধাপে ধাপে বাড়বে। নব্বই সালের পর বাংলাদেশে সে সুযোগটা তৈরি হয়। ভিয়েতনাম-পাকিস্তান-কম্বোড়িয়ার মতো বাংলাদেশের সমপর্যায়ভুক্ত দেশগুলিতে এখন ন্যূনতম মজুরি বেড়ে ৮০ ডলার হয়ে গেছে। ৭৭ টাকা=১ ডলার ধরলে এটির পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় হবে ছয় হাজারের চেয়ে একটু বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ৫৩০০ টাকার চেয়ে একটু বেশি।

এখন আমরা চীনের বাজার দখল করব বলে ভাবছি এবং চীনে ন্যূনতম মজুরি ১৬৮ ডলার অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার টাকা। ভারতেও মজুরি প্রায় ৮০০০ টাকার সমান। এই অবস্থায় এখন চীন ও ভারতের বাজার দখল করতে ওর চেয়ে কম মজুরি রেখে একই প্রযুক্তি আনতে পারলে আমরা যেমন প্রতিযোগিতা করতে পারব, তেমনি শ্রমিকদের শ্রমের বর্ধিত দামও দিতে পারব।

এ সুযোগটা আগে ছিল না, এখন হয়েছে। ‘ফ্লাইংগিজ মডেল’ অনুসারে এ সুযোগটা এসেছে। এই সুযোগ পুঁজিপতিদের কেউ কেউ ধরতে পেরেছেন। তবে সবাই না। যারা ধরতে পেরেছেন, তারা মজুরি বাড়াতে দ্বিমত পোষণ করবেন না। হয়তো আট হাজার দিতেও রাজি হবেন। কিন্তু যারা সুযোগটা ধরতে পারেনি বা ধরারই যাদের উপায় নেই, তারা ন্যূনতম মজুরি ৬০০০ টাকার উপরে দিতে রাজি হবেন না। কেননা এটি দিতেতে হলে পণ্য হালনাগাদ ও পুঁজি বাড়াতে হবে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মাধ্যমে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শ্রমিককে বেশি মজুরি দিয়ে, মুনাফা বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই প্রণালীকে কার্ল মার্কস বলেছিলেন ‘আপেক্ষিক শোষণ’। বাংলাদেশের অধিকাংশ মালিক এই প্রণালী গ্রহণ করেননি। তাদের নিজস্ব নিয়মে তারা চরম শোষণ করে চলেছেন। ‘চরম শোষণ’ হচ্ছে মজুরি স্থির রেখে ওভারটাইম বা খাটুনি বাড়ানো অথবা মূল মজুরিটা কমিয়ে রাখা।

বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকা নিয়ে শ্রমিকদের আপত্তিটা এই জায়গাতে বলে তারা আমাকে জানিয়েছেন। মূল মজুরিটা সব গ্রেডেই সম অনুপাতে বাড়ানো হোক এবং সোয়েটার কারখানাগুলোর ‘পিস রেট’ টাইম রেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্থির করা হোক এটুকুই তাদের মূল দাবি।

এখন এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব, যারা এই ন্যূনতম মজুরি প্রদানে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি, তাদের এভাবে বোঝানো যে, একজন শ্রমিক যদি কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকে (এখন মেয়েরাও কৃষিকাজে নিয়োজিত, এমনকি অধিক হারে অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তারা অংশগ্রহণ করছেন) তবে সে দিনে ৩০০ টাকা করে পায়। অর্থাৎ মাসে তার আয় ৯ হাজার টাকা ; যদি সারা মাস কাজ থাকে। যদি ২০ দিন কাজ থাকে তবে পাবে ছয় হাজার টাকা।

এখন আরেকটি ঘটনা ঘটছে। যেহেতু এখন চুক্তিভিত্তিক শ্রমপদ্ধতি এসেছে, ফলে শ্রমিকরা একটি কাজ ভাড়া নেয়। যেমন তারা চুক্তি করে এক বিঘা জমির ধান কেটে দেবে। কতদিনে কাটবে সেটি তাদের বিষয় এবং পরিবারের সকলকে নিয়ে কেটে দিলে পুরো টাকাটা নিজে পাবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের একটি ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেখানে সে ভালো উপার্জন করতে পারে। এসব সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে এখন আর মধ্যবিত্তদের গৃহকর্মে লোক পাওয়া যায় না। এসব চাপ পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এখন আমাদের লক্ষ্য মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হওয়া। লক্ষ্য যদি তা-ই হয়, এটা বুঝতে হবে সেই পুঁজিপতিদের, যারা এর নেতৃত্ব দেবেন বলে দাবি করছেন, এরা হবেন তারা যারা আপেক্ষিক শোষণের পথে যেতে রাজি। যে পুঁজিপতিরা চরম শোষণের পথ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন, তারা অর্থনীতি পেছনের দিকে টেনে রাখতে চাচ্ছেন। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এ কথা অবশ্য ঠিক, আমাদের এখানে সাব-কন্ট্রাক্টিং সিস্টেম খুব চালু। আরেকটি বিষয়ও সত্য, আমাদের এখানে যেভাবে টোটাল প্রাইসের বণ্টন হয়, সেটি সমানভাবে সব কারখানা সত্ত্বাধিকারী পায় না। একটা বড় অংশ, যাকে বলি দুই-তৃতীয়াংশ ভোক্তা মূল্য (কনজিউমার প্রাইস) বা চূড়ান্ত মূল্য অর্থাৎ একজন আমেরিকান ক্রেতা যে শার্টটি ১০০ ডলারে কিনছেন, সেটির ৭৫ শতাংশ নিয়ে নিচ্ছে বায়ার ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা; উৎপাদনে কোনো রকম অংশগ্রহণ ছাড়াই। মাত্র ২৫ ডলার পাচ্ছে আমাদের উৎপাদকরা। এর মধ্যে যদি সাব-কন্ট্রাক্টিং থাকে, তবে এই ২৫ ডলার সাব-কন্ট্রাক্টরদের ভাগে গিয়ে ১৫ ডলারে পরিণত হবে! তখন তো আর তার পক্ষে বেশি মজুরি দেওয়া সম্ভব নয়।

ফলে এ ক্ষেত্রে সরকারকে যেটি করতে হবে– এই ২৫ ডলার শেয়ারও বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন করতে হবে। ভারত-চীনও করেছিল এটি। আমেরিকায় নিজেদের বিনিয়োগ থাকতে হবে। আমরা দাবি করছি, আমরা দ্বিতীয় বৃহৎ উৎপাদক। এ স্থানটি ধরে রাখতে পণ্যে বৈচিত্র্য এনে আরও উচ্চপর্যায়ে নিতে হবে। ওদের পোশাক বাজার নিয়ে গবেষণা করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। পোশাক শিল্পকে আধুনিকীকরণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে হবে।

আমাদের পুঁজিপতিদের কাছে এখন যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্ত টাকা রয়েছে। তারা বিদেশে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতিস্থাপিত করার জন্য বিনিয়োগ না করে সেখানে বাড়ি কিংবা অন্যান্য সম্পদ কিনছেন। তারা যদি চীন ও ভারতের মতো একটু জাতীয়তাবাদী হতেন, তাহলে ওখানে নিজেদের আউটলেট নিজেরাই খুলতেন।

উৎপাদন বাড়িয়ে উভয়ই লাভবান হওয়ার এ দৃষ্টিভঙ্গিতেও শোষণ রয়েছে। তবে এটি আপেক্ষিক শোষণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে তাদের যত অনাগ্রহ। এটি নিতে পারলে মজুরি ছয় থেকে আট হাজার কিংবা তার চেয়ে বেশি নেওয়া কঠিন হবে না। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত ছিল, এ ক্ষেত্রে আট হাজার দেওয়াই শ্রেয়। কেননা অতীতে ওদের ওপর এতটাই শোষণ হয়েছে যে, এটা দিলে মালিকের ক্ষতি হবে না। কেবল মুনাফা কিছুটা কমবে।

তবে এও ঠিক, কিছু কারখানা এটি দিতে নাও পারতে পারে। ওই কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের মজুরি ভর্তুকি দিতে হবে। যেমন, শ্রমিকদের রেশন ও বাসাভাড়া ভর্তুকি দেওয়া। আর কোনো কারখানাকে সাব-কন্ট্রাক্টিং নয় বরং তাদেরকে আরও আপগ্রেড করতে হবে। তাহলে সকল কারখানা, সকল মালিক, সকল শ্রমিক ও দেশ– সবারই মঙ্গল হবে।

সমগ্র শিল্প ও শ্রমিকের স্বার্থে, সরকার, বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মালিক ও শ্রমিক এক টেবিলে বসে সমঝোতা করতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ মালিক এটি করতে রাজি নয়। আবার সরকারও এদের উপর ভীষণ নির্ভরশীল। কারণ নির্বাচনের সময় এদের কাছ থেকেই অর্থ নেয় সরকারি দল।

শ্রমিকরা মাঠে সংগ্রাম করছেন বটে। তবে তাদেরও রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। নইলে বিক্ষোভ করতে গিয়ে তারা কেন গাড়ি ভাঙচুর করবে! সংঘবদ্ধ শ্রমিকরা এভাবে কখনওই সংগ্রাম করে না। সঙ্গত কারণেই তাই সংঘবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন প্রয়োজন, অনেকটাই বিজিএমইএ’র মতো পাল্টা শ্রমিকদের সংস্থা। মাঝে রেফারি হিসেবে থাকবেন সরকার।

এসব কিছু হলে বাংলাদেশের মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নপূরণ সহজেই সম্ভব হবে।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা

কোটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক অর্থনীতির তত্ত্ব পর্যন্ত দুর্নীতি একটি বহুল পরিচিত এবং আলোচিত বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমনের চটকদার ও সস্তা জনপ্রিয় বিষয়কে সামনে রেখে এক-এগারোর পরিবর্তন দুর্নীতিকে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো ও বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্রকে সামনে রেখে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তথাকথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার মৌখিক বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করার সম্ভাবনা, আর ড. ইউনূসের ৫০ শতাংশ সুদের ব্যবসার মাধ্যমে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর বক্তব্য সমগোত্রীয়। সমাজের দরিদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মুনাফা লাভের হাতিয়ার বানিয়ে দারিদ্র্যকে স্থায়ী রূপ দেয়ার প্রক্রিয়াকে যেমন সোস্যাল বিজনেসের চটকদার নামে ডাকা হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিপরীতে আন্তর্জাতিক মহলের তল্পিবাহী শাসকশ্রেণী তৈরির বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়াকে ‘দুর্নীতি বিরোধী অভিযান’ নামকরণ করা হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্ব অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তেমনি সন্দেহাতীত সত্য হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ও উন্নত বিশ্বও যথেষ্ট পরিমাণ দুর্নীতিগ্রস্ত। বরং উন্নত বিশ্বে দুর্নীতিকে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে এবং দুর্নীতি করার অধিকারও কেবল সমাজের ওপরতলার যথেষ্ট পয়সাওয়ালা মানুষদের জন্য সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঘুষ দেয়ার প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক লবিংয়ের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। অফিসের কেরানীর ঘূষ খাওয়ার পরিবর্তে তারা করপোরেট দুর্নীতির অভিজাত কালচার সৃষ্টি করেছে মাত্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফান্ড ডোনেট করার মাধ্যমে নীতি-নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করার প্রক্রিয়া অভিজাত ও আনুষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয় বস্তাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুঁজি সংগ্রহের উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বারা। সমাজের শ্রমিক শ্রেণী চরমভাবে শোষিত হয়ে ক্রমাগত দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে থাকে আর সম্পদশালী বুর্জোয়া শ্রেণী শ্রমকে Exploit করে ক্রমাগত সম্পদশালী হতে থাকে। মুনাফা তৈরীর সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা আর জীবনকে উপভোগ করার একমাত্র সংস্কৃতি পুঁজির যে গঠন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে কোনক্রমেই বৈধ বলা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস বলে আদি পুঁজির সঞ্চয় ঘটে দৃর্বৃত্তায়ন, লুটপাট আর শোষণের মাধ্যমেই।

শ্রমিকের শ্রমের কারণে যে মূল্য তৈরি হয় তাকে পুঁজি করেই মানুষ সম্পদ তৈরি করতে শেখে। আদিম দাস সমাজব্যবস্থায়, সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ও আজকের আধুনিক সময়েও প্রলেতারিয়েত মানুষকে শোষণের সেই একই ইতিহাস বিদ্যমান। কেবল রূপ পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। একটি সমাজের অভ্যন্তরীন শোষণ যখন পূর্ণ হয় তখন মুনাফা ও বাজারের লোভে সে সৃষ্টি করে উপনিবেশ, নতুন সম্পদ, নতুন বাজার আর সস্তা শ্রমিক মিলে নতুন শোষণের ইতিহাস। আজকের আধুনিক ইউরোপের প্রতিটি ইঞ্চিতে জড়িয়ে আছে আফ্রিকার দাসদের ঘাম, রক্ত আর এশিয়ার উপনিবেশ থেকে চুরি করা ও লুট করা সম্পদরাজি। দুর্বৃত্তায়নের মধ্য দিয়ে তৈরি করা এই সম্পদ জন্ম দিয়েছে আধুনিক সভ্যতার, যার পাদপিঠে দাঁড়িয়ে এখন আইন, সমাজ আর নীতির তত্ত্ব জন্ম নিয়েছে বিস্তর। এই অসভ্য প্রক্রিয়ায় সম্পদ আহরণের ইতিহাসকে সভ্যতার চাদরে ঢেকে দিয়ে তারা এখন আমাদের শেখাচ্ছে কিভাবে গণতন্ত্র অর্জন করতে হবে, কিভাবে আরো বেশি সভ্য হতে হবে। ওরিয়েন্টাল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তারা এখনো মনে করে পৃথিবীকে বিশেষ করে কালো চামড়ার এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষদের গণতন্ত্র ও সভ্যতা শেখানো তাদের এক মহান দায়িত্ব। তৃতীয় বিশ্বের সরকারব্যবস্থাকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করে তারা তাদের এই পবিত্রতম ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মাত্র।

পুঁজিবাদী শোষণের অমানবিক প্রক্রিয়াকে স্থায়িত্ব দিয়েছে সম্পদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আজন্ম লোভ, জীবনকে বস্তুগত উপভোগের উদগ্র আকাঙ্খা আর পৃথিবীকে জাগতিক ও পার্থিব দৃষ্টিতে বিচার করার বস্তুগত দর্শন। যে সমাজ টাকার জন্য শরীরের নগ্নতাকে ব্যবসার পণ্য বানায়, যে সভ্যতা ব্যবসা করার জন্য যুদ্ধ বাঁধায়, যে ‘মহান’ মানবরা মানুষের রক্তের হোলিখেলার মধ্য দিয়ে সভ্যতার চাকা ঘোরানো তেল জোগাড় করে, সে সভ্যতা হঠাৎ করে কোনো এক দিন সকালে সূর্যের আলোয় দুর্নীতিমুক্ত চরিত্রবান হয়ে যাবে- এতটা অবাস্তব আহম্মকি আশাবাদ ব্যক্ত করতে আমাদের বুদ্ধিতে বাঁধে। দুর্বৃত্তায়নের মধ্য দিয়ে যে অর্থনীতির জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা তার মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন বাদে কোনো আলাদিনের চেরাগের আলোয় দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে- এটা বিশ্বাস করা কষ্টকর। একটি বস্তুবাদী সমাজে, একটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিকব্যবস্থায় দুর্নীতি তাই চিরকালের সত্য। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ইউটোপিয়াই মাত্র।

অসংগতির সমাজ পাল্টাতে হবে

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে তার বাস। যে সমাজে সে বসবাস করে, তার থাকে কতগুলো বৈশিষ্ট্য। সেই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে অবয়ব পায় বিদ্যমান সমাজের চেহারা ও চরিত্র।

সমাজ বাস্তবতায় পরিপূর্ণ সংশ্লেষিত হয়ে বসবাস করা সত্ত্বেও সব মানুষ তার সমাজের চেহারা-চরিত্রের অনেক কিছুই পূর্ণভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবন করে উঠতে পারে না। আমাদের দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বর্তমানে যে পুঁজিবাদী সমাজ বিদ্যমান, সেই সমাজে বিরাজ করে এমন অযৌক্তিক অমানবিক কুিসত সব বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উপাদান, যা সমাজ বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য ও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হওয়া সত্ত্বেও তা মানুষের উপলব্ধি ও অনুধাবনকে এড়িয়ে যায়। অরণ্যের মাঝে যার পরিপূর্ণ বসত তার যেমন অরণ্যের স্বরূপ সম্পর্কে পূর্ণ অনুধাবন-অক্ষমতা স্বাভাবিক, অনেকটা তেমনি, চারপাশের অস্তিত্বমান বৈপরীত্যের মাঝে বসবাস করে সেই বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সার্বিক উপলব্ধি মানুষের বোধে আসতে পারাটাও কিছুটা কষ্টকর। তবে বাস্তবের অভিঘাত এতোই অমোচনীয় যে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে একটু সজাগ করে দিলেই তা অতি সহজেই উপলব্ধির মর্মে এসে স্থান করে নেয়। ক্ষুব্ধ চমকে তখন জেগে ওঠে উপলব্ধির আলো! সমস্ত অন্তরাত্মা চিত্কার করে বলে ওঠে, সত্যিই তো, এমনইতো সমাজের আসল চেহারা!

অনেকেই ছোট-ছোট বাণী, উপমা, দৃশ্যবর্ণনার সাহায্যে সমাজের সেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। যেমন, কবিতার চয়নে লেখা হয়েছে, আমরা এমন এক সমাজ বাস্তবতায় বসবাস করি যেখানে—

‘ডাক্তার মরে রোগীর অভাবে, আর রোগী মরে ডাক্তারের অভাবে।’

মনে মনে অবস্থাটি ভাবুন! পাস করা ‘দামি’ ডাক্তার সাহেব সদর রাস্তায় স্থাপিত তার চেম্বারের বাইরে ‘কনসালটেশন ফি: ২০০ টাকা’ লেখা-সহ সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে ভেতরে টেবিল-চেয়ার পেতে রোগীর অপেক্ষায় বসে আছেন। বাইরে হাজার হাজার দরিদ্র-রুগ্ন রোগীর দল। সকলেরই প্রয়োজন ডাক্তারের কাছে যেয়ে কনসালটেশন করার। কিন্তু ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ নিরন্ন দরিদ্র এ মানুষগুলো কোথায় পাবে কনসালটেশন ফি-র টাকা। ডাক্তারখানার দরজা থেকে তাদেরকে চিকিত্সক পরামর্শ ও ওষুধপত্র ছাড়াই অব্যাহত রুগ্ন জীবন কিম্বা বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুকে মেনে নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। এভাবে তাই ‘রোগী মরে ডাক্তারের অভাবে’! এদিকে ফি-র টাকা না থাকায় ডাক্তারের সম্ভাব্য পেশেন্টরা যেহেতু তার কাছে ভিড়তে পারে না, তাই ডাক্তারের পকেটও খালি হয়ে থাকে। ডাক্তারের কাছে রোগী না আসতে পারার অর্থ হলো, ডাক্তারেরও অভাবে মরা! তাই, ‘ডাক্তার মরে রোগীর অভাবে’। যে সমাজে চিকিত্সা-সেবাকে সামাজিক দায়িত্বের বদলে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক ও বিনিময়যোগ্য বাজারি-পণ্যে পরিণত করে রাখা হয়, সেখানে এরূপ অমানবিক বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটা অবধারিত। ডাক্তার ও রোগীর মাঝে যে অদৃশ্য ও দুর্ভেদ্য দেয়াল দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, সেটিই ‘পুঁজিবাদ’। এ দেয়াল না ভাঙ্গত পারলে এরূপ অসংগতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার ‘মুখুজ্যের সঙ্গে আলাপ’ কবিতায় এক জায়গায় লিখেছেন, বিদ্যমান সমাজে—

‘যার হাত আছে তার কাজ নেই,

যার কাজ আছে তার ভাত নেই,

আর যার ভাত আছে তার হাত নেই।’

অর্থাত্ আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে যারা হাত দিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ ও দেশের সম্পদ সৃষ্টিতে সক্ষম তাদের অনেকেই কর্মহীন বেকার জীবন কাটাতে হয়। হাত থাকলেও তাদের কাজ নেই! আবার যাদের কাজ আছে তারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও তাদের শ্রমের উপযুক্ত দাম পায় না। তাই, কাজ থাকলেও তাদের ‘ভাত’ নেই! অন্যদিকে সমাজের ‘পেট ভরে খাওয়া’ মানুষরা হাত দিয়ে কাজ না করেই অন্যের শ্রমের ফসল দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে। তাদের থাকে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েসী জীবন কাটিয়ে দেয়ার সুযোগ। তাদের নেই কোন দয়ামায়ার ‘হাত’। আছে শুধু পা দিয়ে লাথি মারার প্রবৃত্তি ও শোষণের লালসা।

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে সমাজতন্ত্রের প্রথম পাঠ নেয়ার দিনগুলোতে আমার পঠিত প্রখ্যাত ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রী জন স্ট্র্যাচির একটি বইয়ে বর্ণনা করা একটি উপাখ্যানের কথা আমি এখনো ভুলি নাই। লেখক সেখানে ইংল্যান্ডের যে অঞ্চলটি কয়লার জন্য বিখ্যাত, সেই নিউক্যাসল এলাকার একজন খনি শ্রমিকের বাসায় শ্রমিকের স্ত্রী ও তার শিশু পুত্রের মধ্যে কাল্পনিক কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরেছেন। হাড় কাঁপানো শীতের সংঘাতে তাদের মধ্যে চলা কথাবার্তা হলো এরকম।

ছেলে : মা, বাড়িতে আজ ঘর গরম করার চুল্লিতে কয়লা জ্বালাওনি কেন? ঠাণ্ডায় তো মরে যাচ্ছি।

মা : বাবা, কয়লা জ্বালাবো কি করে? বাসায় যে এক খণ্ড কয়লাও আর নেই। আমাদের সব কয়লা যে শেষ হয়ে গেছে।

ছেলে : কয়লা শেষ হয়ে থাকলে বাজার থেকে কয়লা কিনে এনে রাখোনি কেন, মা?

মা : কয়লা কিনতে যে টাকা লাগে, বাবা। কিন্তু হাতে যে আমাদের কোনো টাকা-পয়সা নেই।

ছেলে : কোনো টাকা-পয়সা নেই কেন, মা?

মা : তোমার বাবা যে বেতন পায়নি। তার চাকরি যে চলে গেছে। তাই হাতে আমাদের কোনো টাকা-পয়সা নেই।

ছেলে : বাবার চাকরি চলে গেছে কেন, মা?

মা : বাজারে কয়লার মজুদ যে বেশি হয়ে গেছে। সেজন্য তোমার বাবার চাকরি গেছে। চাকরি নেই, তাই হাতে টাকা নেই। টাকা নেই, তাই কয়লা কেনা যায়নি। বাজারে কয়লার পরিমাণ ‘বেশি’ হয়ে যাওয়ার কারণে আজ আমাদের ঘরে কয়লা ‘কম’।

এভাবেই পাশাপাশি ‘বেশি’ ও ‘কমের’ বৈপরীত্যমূলক বাস্তবতার যুগপত্ অবস্থান দ্বারা পণ্যনির্ভর পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির অমানবিক ও কুিসত বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।

আজকাল ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘কলাণে’ ফেইসবুকের পাতায় অনেক মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়। এসব মন্তব্যের মধ্যে অনেক গভীর চিন্তার খোরাক থাকে। সেদিন একজন বন্ধুর স্ট্যাটাসে যে পোস্টিংটি চোখে পড়লো, তাতে নিম্নলিখিত বয়ানটি লিপিবদ্ধ ছিল।

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি যেখানে—

১. পিত্জা ডেলিভারির গাড়ি এ্যাম্বুলেন্স কিম্বা পুলিশ আসতে পারার আগেই উপস্থিত হয়ে যায়।

২. বিলাস গাড়ির জন্য ১৮ শতাংশ হারসুদে ঋণ পাওয়া গেলেও, শিক্ষা ঋণের জন্য ৪০ শতাংশ সুদ দিতে হয়।

৩. মোটা চালের দাম কেজি প্রতি ৪০ টাকা, কিন্তু মোবাইল ফোনের সিম কার্ড ফ্রি পাওয়া যায়।

৪. জুতা বিক্রি হয় দেয়াল ও কাঁচে ঘেরা এসি রুমে, কিন্তু সবজি, ফল-ফলারি ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য বিক্রি হয় খোলা আকাশের নিচে, এমনকি ফুটপাতে।

৫. আমরা খাই কৃত্রিম লেবুর রস, আর আসল লেবুর রস দিয়ে করা হয় ‘ফেইসওয়াস’।

৬. ভুয়া ডিগ্রীধারীরা টাকার জোরে সমাজের মাথা হয়, আর সত্যিকার মেধাবীরা থাকে কর্মহীন।

আমাদের চতুর্দিকে নিত্যদিন পদে পদে এ ধরনের অসংগতি, বৈপরীত্য আরো ভূরি ভূরি ঘটনা আমরা দেখতে পাবো। রুটিন জীবনের গত্বাঁধা ছন্দের মধ্যে থাকায় হয়তো সেসব আমাদের মনযোগ এড়িয়ে যায়। কিন্তু একটু চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করলেই সেসবের দেখা পাওয়া খুবই সহজ।

আরেকটি ফেইসবুক পোস্টিং-এ যে ইংরেজি বার্তাটি চোখে পড়েছিল তার বাংলা রূপান্তর হবে অনেকটা এরকম।

‘প্রথম শ্রেণীতে’ যারা পাস করে তারা অধিকাংশই টেকনিক্যাল কাজ পায়। তারা হয়ে ওঠে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ইত্যাদি।

‘দ্বিতীয় শ্রেণীতে’ যারা পাস করে তারা একটি অতিরিক্ত এমবিএ ডিগ্রী নিয়ে হয়ে ওঠে ‘পরিচালক’ এবং তারা তখন ‘প্রথম শ্রেণী’ অর্জনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করে।

‘তৃতীয় শ্রেণীতে’ যারা পাস করে তারা ‘রাজনীতিতে’ প্রবেশ করে এবং উপরোক্ত উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করে।

সর্বশেষ, কিন্তু যা অবজ্ঞা করার বিষয় মোটেও নয় তা হলো, যারা ‘ফেল’ করে তারা ‘অপরাধ জগতে’ প্রবেশ করে এবং উপরোক্ত প্রত্যেককেই নিয়ন্ত্রণ করে।

আর যারা একেবারেই স্কুলে যায় না, তারা হয়ে ওঠে ভন্ড গুরুজী, পীর ইত্যাদি এবং সকলেই হাজিরা দেয় তাদের কাছে!

ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে দায়িত্ব শেষ করার পর আশির দশকের শুরুতে ক্ষেতমজুর সমিতি প্রতিষ্ঠা করে সেই আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। তখন আমাকে গ্রামে গ্রামে চষে বেড়াতে হতো। ক্ষেতমজুর ও কৃষকদের মাঝে বড় সভায় হোক বা সন্ধ্যার ‘খুলি (উঠান) বৈঠকে’ হোক, অনেক রকম গল্প মিশিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে হতো। স্বপ্ন ও বাস্তবতার অসাম্যঞ্জস্য ও বৈপরীত্য বোঝানোর জন্য এই গল্পটিও মাঝে মাঝে বলতাম বলে এখনো মনে আছে।

এক গরিব কাঠুরিয়া জঙ্গল থেকে লাকড়ি কেটে এনে বাজারে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এ কাজ খুব পরিশ্রমের। কাঠ কেটে লাকড়ি বানাও। তারপর তার ভারি বোঝা কাঁধে বয়ে নিয়ে বাজারে যাও। জোয়ান বয়সে এতো পরিশ্রম সম্ভব হলেও বার্ধক্য আসার পর তা কাঠুরিয়ার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠলো। জঙ্গল থেকে ফেরার সময় প্রায়ই সেই এলাকার দারোগা সাহেব ঘোড়ার পিঠে চড়ে হনহনিয়ে তার পাশ দিয়ে ছুটে যেতো। কাঠুরিয়া কেবলই ভাবতে থাকলো যে, ঘোড়ার কাঁধে লাকড়ির বোঝা চাপিয়ে এবং পিঠে নিজে সওয়ার হয়ে যদি জঙ্গলে আসা-যাওয়াও করতে পারতাম তাহলে কতো আরাম হতো! সে প্রতিদিন প্রার্থনা করতে শুরু করলো, ‘আল্লাহ! তোমার কাছে শুধু একটি প্রার্থনা, আমাকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাওয়ার তৌফিক দাও।’

একদিন লাকড়ির বোঝা কাঁধে নিয়ে শহরে ফেরার পথে কাঠুরিয়া দেখে যে, দারোগা সাহেব পথে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে তার ঘোড়াটি। সেটি আসলে ছিল একটি মাদী ঘোড়া। সদ্য একটি বাচ্চা প্রসব করেছে। সদ্য প্রসূত ঘোড়ার বাচ্চাটি পাশে মাটিতে রয়েছে। দারোগা কাঠুরিয়াকে পেয়ে ধমক দিয়ে তাকে হুকুম দিল, ‘কাঁধের বোঝা নামিয়ে রেখে ঘোড়ার বাচ্চাটি পিঠে নিয়ে থানায় পৌঁছে দিয়ে আয়।’ কাঠুরিয়া নিরুপায়। দারোগার ধমক ও হুকুম। ভয়ে থরো থরো হয়ে সে ঘোড়ার বাচ্চাকে পিঠে তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকলো। হাঁটতে হাঁটতে মনের দুঃখে সে আপন মনে বলতে থাকলো, ‘আল্লাহ! আমি চেয়েছিলাম ঘোড়ার পিঠে চড়তে, আর এখন কিনা উল্টা ঘোড়া আমার পিঠে উঠে বসেছে।’

বাস্তব জীবনেও জনগণের আর ঘোড়ার পিঠে চড়া হয়ে ওঠে না। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়ার জন্য তার আশা জাগে। শক্তি উজাড় করে সেজন্য সে প্রয়াস চালায়। আশায় চোখের তারা চক্ চক্ করে ওঠে। কিন্তু হায়! পরিশেষে দেখে সবই মরীচিকা। ঘোড়ার পিঠে সে চড়বে কি, ঘোড়াকে তার পিঠে চাপিয়ে দেয়া হয়।

যে সমাজের অসংগতি, বৈপরীত্য, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের স্বরূপ এ ধরনের, সে সমাজ ব্যবস্থাকে কি বহাল থাকতে দেয়া যায়? না, তাকে কোনমতেই বহাল থাকতে দেয়া যায় না! তাইতো, এ সমাজ ভাঙ্গতে হবে, নতুন সমাজ গড়তে হবে। এই আওয়াজকে আজ আরো বুলন্দ করতে হবে!

পুঁজিবাদী আগ্রাসনে বঞ্চিত শ্রমিক সমাজ                                                                   সরকারকে মনে রাখতে হবে দেশ ও জাতির উন্নয়ন চাইলে শ্রমিকের মর্যাদা অবশ্যই দিতে হবে। শুধু মে দিবসে বাণী দিয়েই সে মর্যাদা আদায় হবে না। শ্রমিকের মর্যাদা না দিলে সে দেশ ও জাতির কোনোদিনও উন্নয়ন সাধিত হবে না। স্বাধীনতাউত্তর রাষ্ট্রনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সে কথা উপলব্ধি করতে পেরেই এদেশের শ্রমিক ও কৃষকের মূল্যায়ন করেছিলেন। আমরা সে রকম মূল্যায়ন দেখতে চাই।                                      শামস সাইদ http://www.jjdin.com/images/rpt.gif                                                                           সমগ্র পৃথিবী আজ পুঁজিবাদ আগ্রাসনে গ্রাস হয়েছে। পুঁজিবাদ মানে হচ্ছে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের সম্পদ পাহাড় পরিমাণ গড়ে তোলা। সে আমাদের দেশেই বা কী! আর পৃথিবীর অন্যসব দেশেই বা কী। সবখানেই শ্রমিকরা শ্রমের মর্যাদা হারাচ্ছে। অথচ এ শ্রমিকদের জীবনবাজি রাখা শ্রমের বিনিময় তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। আমাদের সমাজের এ প্রথা নতুন কিছু নয়। সমাজের সর্বত্রই শোষণের শিকার হচ্ছে কম বিত্তশালী মানুষ। অথচ আমরাই বলে থাকি শ্রম ছাড়া কখনো ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। আমাদের ধর্মেও একথা রয়েছে যে, একমাত্র শ্রমই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। যারা রাতদিন শ্রম দিচ্ছেন তারাই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ এই শ্রমিকের শ্রমের টাকায় মালিকপক্ষ রাজকীয় জীবনযাপন করছে। প্রতিনিয়তই মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে জীবনমানের পার্থক্য বাড়ছে। আর সব সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের হাতে। যার ফলে সমাজের চিত্রও তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।
১ মে, শ্রমিকদিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে বহুদিন আগ থেকে। কিন্তু এই দিবস পালনের মধ্যদিয়ে শ্রমিকদের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেখা যাচ্ছে এইদিন যারা বড় গলায় শ্রমিকদের পক্ষে বক্তৃতা দেন। নানা বাক্যে নীতির কথা বলেন। পরের দিন তারাই আবার জোঁকের মতো শ্রমিকের রক্ত চুষে খাচ্ছেন। এই যদি হয় আমাদের সমাজের চিত্র, তাহলে শ্রমিকরা তাদের শ্রমের মর্যাদা কী করে পাবেন? শ্রমিক বঞ্চিত হওয়ার পেছনে অনেকেই দায়ী করেছেন পুঁজিবাদ আগ্রসনকে। গত বছরের মধ্যসময়ে খোদ আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাদ বিরোধী বিক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল। তাদের এই আন্দোলনের নাম ছিল ওয়াল স্ট্রিটবিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলনে শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই রাজপথে নামেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও নেমেছিলেন। এ আন্দোলন শুধু নিউইয়র্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর অনেক দেশেই। মার্কিনীদের দাবি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ধনী মানুষের সংখ্যা শতকরা একভাগ, আর বাকি ৯৯ ভাগ মানুষই হচ্ছে গরিব। এই ৯৯ ভাগ মানুষ ওই একভাগ মানুষের কাছে এক প্রকার জিম্মি। এরা কখনো ওই ধনীদের ওয়াল টপকিয়ে ধনী হতে পারছে না। আর বর্তমান পুঁজিবাদ পৃথিবীতে প্রত্যেক দেশের সরকারও কাজ করছে পুঁজিবাদীদের পক্ষে। সরকার এসব ধনী মানুষগুলোকে আরো ধনী হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে এরা ঠিকমতো কর দিচ্ছে না, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে ছেড়েছে। তারপর আবার সেই লোন সঠিক সময় পরিশোধ করছে না। পরে দেখা যায় নানা ছল-চাতুরি করে সে ঋণ মওকুফের পাঁয়তারা করে। এক সময় মাফ পেয়েও যায়। কারণ সরকারকে ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব পুঁজিপতিরা বিভিন্ন সময় অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন। তাই রাজনৈতিক দলগুলো এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের হাতে। পরে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা সেই সরকারের সহায়তায় দেশ ও জাতির সম্পদ লুটপাট করে নিরাপদে পার পেয়ে যায়।
পৃথিবীর সবদেশেই এমন চিত্র বিরাজমান। তবে এবার আমরা একটু নিজ দেশের দিকে তাকাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদি শতকরা একজন ধনী হন, তাহলে আমাদের দেশে লাখে একজন ধনী ধরা যায়। এ সংখ্যা এর বেশি হবে বলে মনে হয় না। এই ষোলশ’ জনের কাছে আজ ষোল কোটি বাঙালিসহ সরকারও এক প্রকার জিম্মি। এ কারণেই আমাদের দেশের শ্রমিকরা আরো বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। শোষণের শিকার হচ্ছে। এই সমাজের এ শোষণ কোনোদিনও দূর করা সম্ভব হবে না বলে আমার ধারণা। কেননা যারা এই সমাজ পরিবর্তন করবেন, তাদেরকেই যদি ধনী হওয়া ওই লোকগুলো দখল করে ফেলতে পারে। তাহলে কিভাবে সমাজের পরিবর্তন আসবে? নিউইয়র্কে, মেলবোর্নে তো সেদেশের জনগণ পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে রাস্তায় নামতে পেরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তাও সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের অর্থ এক সময় খুঁজে পেলেন না। তা রাঘব-বোয়ালরা গিলে ফেলল। সরকার তাদেরকে ধরার জন্য জালও পেতেছিল। জনগণকে দেখানোর জন্য জাল পাতলেও সরকারই আবার তাদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
যার ফলে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের টাকা চলে গেছে কয়েকজন প্রভাবশালী পুঁজিপতিদের হাতে। তারা তো এভাবেই মানুষ মেনে অন্যের পকেটের টাকা ছিনতাই করে সম্পদের মালিক হয়েছেন।
কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের খেলাপিঋণ উত্তোলন ও ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এখানেও দেখা যাবে পুঁজিপতিরা জামাইয়ের মতো সম্মানে পার পেয়ে যাবেন। আর গ্রেপ্তার হবেন গ্রামের করিমউদ্দি, রহিম উদ্দির মতো খেটে খাওয়া বরগা চাষীরা। দুই হাজার টাকা ঋণের দায়ে অথবা তাদের সামান্যতম জমি জিরাত বিক্রি করে ওই সম্পদ ফেরৎ দানে বাধ্য করা হবে। অথচ যারা হাজার হাজার কোটি ঋণ টাকা নিয়ে ব্যাংককে অর্থ সঙ্কটে ফেলে দিয়েছেন, তাদের ঋণ কোনোদিন আদায় হবে না। উল্টো তার যদি আরো ঋণের জন্য আবেদন করেন, তাদেরকে ব্যাংক ঋণ দিতে বাধ্য। রাষ্ট্রচালিত ব্যাংকগুলোতে শ্রমিক কর্মকর্তা কর্মচারী যারা রয়েছেন তাদের বেতনভাতা না বাড়লেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকে যেসব পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে, তারা নিয়োগের বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, লোনবাণিজ্যসহ যত প্রকার বাণিজ্য আছে সব করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে, ধনীদের আরো ধনী হওয়ার সুযোগ সরকারই সৃষ্টি করে দিচ্ছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই তারা শ্রমিকদের উপরও অন্যায় অবিচার করছে। বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে শ্রমিকের শ্রমের মূল্য দেয় না। কারণ বাংলাদেশে জনসংখ্যা যেমন মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে, তেমনি বেকারের লাইনও প্রতিনিয়ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আর এই সুযোগটা গ্রহণ করেছেন মালিকপক্ষ। তারা শ্রমিকদের এক প্রকার অসহায় করে ইচ্ছামতো বেতনভাতা দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে দেখা যায় নির্দিষ্ট সময়ের চেয়েও অতিরিক্ত সময় শ্রম খাটিয়ে রাখেন। বিশেষ করে এই সুযোগটা মালিকপক্ষ বেশি পেয়ে থাকেন গার্মেন্ট সেক্টরে। গার্মেন্ট বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম একটা মাধ্যম। আর এ অর্জনের ক্ষেত্রে অনেকটাই নির্ভর করে শ্রমিকদের ওপর। অথচ দেখা যায় এই শ্রমিকরা রাতদিন পরিশ্রম করেও সঠিক বেতনভাতা পাচ্ছে না। আবার বেতনভাতা যাই পাক, তা আবার মাস শেষে সঠিক সময় পাচ্ছে না। অতীব দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, এই পরিশ্রমের টাকা পেতে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়। আন্দোলন করতে নেমে রাজপথে পুলিশের গুলিতে প্রাণও দিতে হয়। পুঁজিবাদপ্রথা বিশ্বের অনেক দেশে থাকলেও শ্রমিকদের এমন অবমূল্যায়ন চোখে পড়ে না। শুধু গার্মেন্ট সেক্টরে নয়; বাংলাদেশের সবকিছুই আজ পুঁজিপতিদের কাছে জিম্মি। গণতন্ত্রের অন্যতম বাহক সংবাদপত্র। তাও গিয়ে শেষ পর্যন্ত এদের হাতে ধরা পড়েছে। শুধু সাংবাদিক নয়; গোটা বুদ্ধিজীবী মহল আজ সংবাদপত্রের মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে আজ তারা জ্ঞানী লোকের জ্ঞান হরণ করছে। আগে শোনা যেত জ্ঞান বুদ্ধি হাটে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না।
এখন দেখা যাচ্ছে জ্ঞানের ফেরিওয়ালার অভাব নেই। পুঁজিপতিরা অর্থের বিনিময় জ্ঞানীদের মাধ্যমে যা ইচ্ছে তা লেখাচ্ছেন। আর নিজের মনোভাবই পূর্ণ করছেন। আবার দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি শ্রমিক বা সাধারণ মানুষের পক্ষে লিখেন তা মালিকপক্ষ কিংবা মালিকপক্ষের একান্ত লোকদের পছন্দমতো না হলে প্রকাশ হবে না। তাই গরিবের গান গেয়েই বা কী লাভ। এ গানতো কেউ শোনে না। পুঁজিপতিরা যখন সংবাদপত্রকে জিম্মি করতে পেরেছেন তখন তারা নিশ্চিন্তে যত রকম অনিয়ম আছে সব করতে পারেন। আর তাই করে যাচ্ছেন। তবে এই পুঁজিপতিদের হাত থেকে সাংবাদিক মহল ও ছাড়া পাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে তারাও সঠিকভাবে তাদের বেতনভাতা পাচ্ছেন না। আবার মালিকপক্ষ যখনতখন চাকরি থেকে বিদায় করে দিতে পারেন।
এভাবে প্রতিটা সেক্টরই আজ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে জিম্মি। তবে এই পুঁজিবাদপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেও কোনো লাভ হবে না। কেননা গোটা পৃথিবীই আজ পুঁজিপতিদের হাতে। পুঁজিবাদ প্রথা বাতির করতে গেলে অর্থাৎ মানুষ যদি অর্থের অট্টালিকা গড়তে না পারে তখন আর সে অর্থের পেছনে ছুটবে না। আর অর্থের পেছনে না ছুটলে শিল্প কারখানা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলবেন না। ফলে কর্মসংস্থান দিন দিন আরো কমবে। যা উপলব্ধি করতে পেরেছে সমাজতান্ত্রিক দেশ চীন।
তবে সরকারকে পুঁজিবাদ বান্ধব না হয়ে শ্রমিকবান্ধব হতে হবে। কেননা গণতান্ত্রিক দেশে অধিকাংশ মানুষের সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এ জন্য শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার যাতে তারা পায় এমন একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও করা জরুরি। এমন কঠোর আইন থাকতে হবে যে, শ্রমিক নীতিমালা অমান্য করলে কিংবা কোনো শ্রমিক কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে লেবার কোর্টের মাধ্যমে তার বিচার হবে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির লাইসেন্স কোর্টের হাতে থাকবে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে দেশ ও জাতির উন্নয়ন চাইলে শ্রমিকের মর্যাদা অবশ্যই দিতে হবে। শুধু মে দিবসে বাণী দিয়েই সে মর্যাদা আদায় হবে না। শ্রমিকের মর্যাদা না দিলে সে দেশ ও জাতির কোনোদিনও উন্নয়ন সাধিত হবে না। স্বাধীনতাউত্তর রাষ্ট্রনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সে কথা উপলব্ধি করতে পেরেই এদেশের শ্রমিক ও কৃষকের মূল্যায়ন করেছিলেন। আমরা সে রকম মূল্যায়ন দেখতে চাই।

———————————————————————————————————————–বাংলাদেশের সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করবে মার্কিন ডঃ ইউনুসের মাধ্যমে , আর সেটা শুরু হয়ে গেছে । দেশবাসী সাবধান সতর্ক হন , ইউনুস যেন দেশ এবং দেশের সম্পদ মার্কিনীদের হাতে তুলে না দিতে পারে , দেশ রক্ষার দায়িত্ব আমার আপনার সকলের ।

গ্রামীণ ব্যাংক আজ বাংলাদেশে বহুল পরিচিত একটি নাম । যার প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডঃ ইউনুস । ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর্থ সামাজিক উন্নয়নের মডেল হল গ্রামীণ ব্যাংক । যার মাধ্যমে ডঃ ইউনুস সমগ্র বিশ্বে পরিচিত লাভ করেছেন । এটা বিশ্বে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ সামাজিক উন্নয়নের মডেল হিসাবে স্বীকৃত ।
মুনাফা এবং পুঁজি এ কথা টার সাথে শোষণ জড়িত । পুঁজি বিনিয়োগ না করলে মুনফা অর্জন সম্ভব নয় আর মুনফা অর্জন করতে হলে অবশ্যই শোষণ করতে হবে । যারা শোষণ করে তারাই শোষক আর যারা শোষক শ্রেনীর শোষণের শিকার তারাই হল শোষিত শ্রেনী । আমাদেরকে দেখতে হবে ডঃ ইউনুস কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে ? পুঁজিবাদী সমাজ রক্ষা করা , পুঁজিবাদী সমাজের প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও কর্তব্য । আজ পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশ্ব মন্দা তৈরী করেছে তাঁতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা হুমকির সন্মুখিন । পৃথিবীতে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থা অভাব, অনাহার , অপরের সম্পদ লুণ্ঠন , দেহ ব্যবসা , সহ বিভিন্ন অপকর্মের জন্ম দিয়াছে । আজ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী শুধু তাদের দেশের মধ্যে শোষণের প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখেনি, সমগ্র বিশ্বে তাদের থাবা গ্রাস করেছে । বিশ্ব পুঁজিবাদের এজেন্ট মার্কিন সাম্রজ্যবাদ আজ চিন্তিত । লেটিন আমেরিকার দেশ গুলোতে একের পর এক পুজিবাদ বিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উটছে । সেখানে আজকের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার একটি নতুন কৌশল মাত্র । যেটা বাংলাদেশের মতো দেশে খুবই সফলতা লাভ করেছে। কিভাবে করেছে সেটা বলা দরকার।

নতুন এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির মুল প্রক্রিয়া হল সমস্যার মুল থেকে সমাধান না করে , সমস্যা কবলিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোন রকমে পুঁজিপতিদের অধীনে বাঁচিয়ে রেথে ব্যাপক মুনাফা অর্জন করা । যাহাতে শোষিত সম্প্রদায়ের মনন মেধা অন্য দিকে বিকাশ লাভ না করতে পারে।
আজকের সমাজের আমরা সবাই অবগত আছি যে সমাজে আগে জোরদার মহাজন দের সুদের ব্যবসা প্রচালিত ছিল। সেখানে জোরদার মহাজন রা দরিদ্র নিপিড়িত মানুষের দারিদ্রতার সু্যোগ নিয়ে ঋণ প্রদান করে, ঋণ পরিশোদ না করতে পারার কারনে আস্তে আস্তে তার সমস্ত সম্পদ নিজের বলে ঘোষণা করত। কালের প্রবাহে সে প্রথা পুরান হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সেটা সমাজে অগ্রহণ যোগ্য হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে , রাষ্ট্র অনেক আইন করেছে এবং আধুনিক হয়ে উঠেছে তাই ঐ প্রক্রিয়া অচল হয়ে গেছে। সুদখোর জোরদার এবং মহাজনী ব্যবসার আধুনিক সংস্কার হল আজকের গ্রামীণ ব্যাংক , ব্র্যাক সহ বিভিন্ন এন জি ও ।
আমি ১৯৯৪ সালে কোন ভাবে ব্রাকের সহকারী প্রগ্রামার হিসাবে বরিশালের বাবুগজ্ঞ অফিসে যোগদান করি । আমি যোগদান করার তিন মাস আগে এই অফিসের কার্যক্রম শুরু হয় । সেখানে গ্রামীণ ব্যাংকের ও কার্যক্রম ছিল । তাই মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে যেয়ে আমার যে বাস্তব অভিজ্ঞাতা হয়েছে এবং তারা গ্রামীণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কোন প্রকারে তাদের আওতায় নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে কিভাবে তাদের সাথে ঋণ কার্যক্রম পরিচলনা করে জানার সুযোগ আমার হয়েছে ।
প্রথমে এলাকা জরিপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী নির্ধারণ করা হয়, যাহাদের মাধ্যমে সমিতি গঠন করা সম্ভাব । সাধারণত নারীদেরকে নিয়ে সমিতি গঠন করা হয় । কমপক্ষে বিশ থেকে ত্রিশ জন মহিলা সদস্য নিয়ে একটা সমিতি গঠন করা হয় । সমিতিতে একজন সভানেত্রী , একজন সাধারন সম্পাদিকা , একজন ক্যাশিয়ার ও প্রতি পাঁচজনে একজন ক্ষুদ্র দলনেত্রী নির্বাচন করা হয় । এই হল সমিতি পরিচালনা কমিটি । পরিচালনা কমিটি সমিতির প্রত্যেক সদস্যের হাজিরা সহ সপ্তাহিক সঞ্চয় ও ঋণের কিস্তির দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে । যদি কেহ সপ্তাহে সঞ্চয় কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে পরিচালনা কমিটিকে ঐ টাকা সমিতির মিটিং এ পরিশোধ করতে হবে ।
পরিচালনা কমিটি যদি ঐ টাকা পরিশোধ করতে না পারে তাহলে তাদের বলা হয় এই সমিতি ঋণ পাওয়ার যোগ্য নয় । তাই ঋণ পাওয়ার যোগ্য প্রমানের জন্য পরিচালনা কমিটি যে কোন উপায়ে সঞ্চয় এবং ঋণের কিস্তি সংসিলিস্ট প্রতিষ্ঠান কে পরিশোধের চেষ্টা করে । নিয়ম আছে যে নারীরা বেশী লেখাপড়া জানে তাদেরকে এবং যে পরিবার সচ্ছল তাদেরকে সমিতির সদস্য না করা । তাদের কে জিজ্ঞাসা করা হয় যে আপনারা সমিতির মাধ্যম দিয়ে যে ভাবে টাকা পয়সা লেনদেন করছেন এই ভাবে কি এর আগে করেছেন এবং আপনাদের কেমন লাগছে ? অধিকাংশ নারী উত্তর দেয় তাহাদের ভাল লাগছে এবং তারা বেশ ক্ষমতার সুখ অনুভাব করছে ।
সমাজের এই দরিদ্র নারীদের বলা হয় আপনারা প্রকল্প গ্রহণ করেন এবং সেই প্রকল্প মতাবেক ঋণ প্রদান করা হবে । কিন্তু দরিদ্র নারীদের প্রকল্প গ্রহণের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন সেই পরিমাণ অর্থ তাদের কখন ও দেওয়া হয় না । যার কারনে তারা অধিকাংশ সময় ঋণের টাকা দিয়ে চাল , ডাল বাজার করে খেয়ে ফেলে । যেমন গোবাদি পশু ক্রয় । বাংলাদেশে প্রায় ঘরে ঘরে গোবাদি পশু পালন করে থাকে । ঋণ নিয়ে পরের সপ্তাহে নিজের পালন কৃত পশু থেকে দেখায় যে আমি গোবাদি পশু ক্রয় করেছি । তখন মাঠ কর্মী অন্য সকলকে ডেকে দেখায় যে ছবিরন , রহিমন কিম্বা মজিনা এই গরুটা ক্রয় করেছে । তখন মাঠ কর্মী ও তার কিস্তির টাকার নিশ্চয়তা পায় । মহিলাদের যদি ভ্যান ক্রয় করার জন্য ঋণ প্রদান করা হয় , তাহলে কি সে ভ্যান ক্রয় করে ভ্যান চালাবে ? না তার স্বামীকে দেবে কিস্তির টাকা তার স্বামীকে ই দিতে হবে । ঋণ প্রদানের পরের সপ্তাহ থেকে ঋণের টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে হয় । কাউকে যদি গাভী ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদান করা হয় তাহলে কি তার গাভী পরের সপ্তাহে উৎপাদনে যেতে পারে ? সে ক্ষেত্রে ঐ ব্যাক্তিকে ঋণের টাকা ভেঙ্গে কিস্তির টাঁকা পরিশোধ করতে হয় । যে ব্যাক্তি এই সপ্তাহিক কিস্তির শর্তে ঋণ গ্রহণ করে প্রত্যেক সপ্তাহে তার সংসারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কেনা বন্ধ রেখে কিস্তির টাঁকা পরিশোধ করতে হয় , তাহা না হলে সমিতির সকল সদস্য একত্রিত হয়ে তার বাড়িতে হামলা করে যাহা পায় তাহা বিক্রয় করে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করে । অনেক ক্ষেত্রে ঋণের টাকা পরিশোধ না করতে পেরে গ্রাম থেকে পরিবার সহ অন্যত্র চলে যায় , স্বামীর নিকট সহ পাড়া প্রতিবাসীর নিকট লাঞ্চিত হয়ে আত্যহত্যার পথ বেছে নেয় । এই নারীরা অনেক সময় দেহ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে । ইহাতে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক অবক্ষয়ের জন্ম নেয় ।
এখানে শোষিত শ্রেণী দিয়ে শোষিত শ্রেণীকে শোষণ করা হয় আর এই শোষণের সম্পূর্ণ অর্থ কৌশলে শোষক শ্রেণীর নিকট জমা হয়ে যায় । শোষক শ্রেণী সম্পূর্ণ নিরাপদে থেকে উন্নয়নের বুলি দিয়ে বৃহত্তর জন গোষ্ঠীকে শোষণ করতে পারে । এখন ও পৃথিবীতে ঘরের বাহিরে যেয়ে পুরুষরা কাজ করে তাই নারীদের সাধারণত প্রায় সব সময় বাড়িতে পাওয়া যায় । সে ক্ষেত্রে নারীর নিকট থেকে ঋণের টাকা আদায় করার সুবিধা বেশী । যেটা আমাদের দেশে এক সময় ইংরেজরা নীল চাষের জন্য কৃষকের ঋণ দিয়ে সেই ঋণের টাকা যখন কৃষক পরিশোধ না করতে পারত তখন তার স্ত্রী অথবা যুবতী মেয়েকে নীলকুঠিতে ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করত । তখন কৃষক বাধ্য হত ঋণের টাকা পরিশোধ করতে । আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এটা তার নব্য রুপ । ঐ সমাজে শোষক সরাসরি জড়িত ছিল এখানে শোষক শ্রেনী নিরাপদে থেকে শোসিত শ্রেনী দিয়ে শোষিত শ্রেনীকেই শোষণ করা হয় ।
আজ সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ডঃ ইউনুস যে শান্তির বাত্রা বহন করে নিয়ে এসেছে তাহা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও হতাসা কাটবে । এই প্রক্রিয়ার মাধ্যম দিয়া শোষিত নির্যাতিত মানুষেরা তাদের চেতনা কে বেশী দূর নিতে পারবে না । কারন তারা একেবারে বাচবে না আবার মরবে না । কোন রকমে শরীরের মধ্যে জান রেখে তাকে শোষণ করা যাবে বছরের পর বছর । ডঃ ইউনুস বিশ্ব পুজিবাদের মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু পুজিবাদের জন্য যে মডেল দাড় করিয়েছে তাঁহাতে তাঁকে অবশ্যই নবেল পুরুস্কার দিতে হবে । সে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থার একজন রক্ষক । তার মডেল এখন বিশ্বের অন্য দরিদ্র দেশও শোষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে ।
শোষকের কোন জাত নেই , ধর্ম নেই। তার একটাই পরিচয় সে শোষক । পৃথিবীর সমস্ত পুঁজিবাদীরা এক জোট । তাই Hugh sinclair (হিউসিন ক্লেয়ার ) নামের এক পশ্চিমা মাইক্রোফাইনান্স বিশেষজ্ঞ তার একটি নিবদ্ধ ঢাকায় নিউএজে এ ২৯ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে । তিনি স্পষ্ট বলেছেন , ‘ বিশ্ব পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থ ও আধিপত্যের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের নাড়ির যোগ ফলে বাংলাদেশ গ্রামীণ ব্যাংকের সরকার হস্তক্ষেপ করায় এই নাড়ির যোগে টান পড়েছে এবং গোটা বিশ্বের কায়েমি স্বার্থ ও ইউনুসকে রক্ষার মার মার শব্দে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে ।
আপনারা অবগত আছেন ১৯৭৬ সালে ডঃ ইউনুস যে ঋণ বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের প্রদান করেন তার মধ্যে ৫.৩ মিলিয়ন ঋণ গ্রহীতার মধ্যে ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান করেন । এই পরিমাণ অর্থ তিনি কোথায় পেয়েছিলেন ? এই পুরা অর্থের যোগান দিয়েছিল পুঁজিবাদী বিশ্বের মড়ল ঐ মার্কিন । আবার এই কাজের জন্য নবেল পুরস্কার ও দিয়েছে ঐ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর এর মদদে । ডঃ ইউনুসের নবেল প্রদানের মাধ্যম দিয়ে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তৈরী করতে চায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ । তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করবে মার্কিন ডঃ ইউনুসের মাধ্যমে , আর সেটা শুরু হয়ে গেছে । দেশবাসী সাবধান সতর্ক হন , ইউনুস যেন দেশ এবং দেশের সম্পদ মার্কিনীদের হাতে তুলে না দিতে পারে , দেশ রক্ষার দায়িত্ব আমার আপনার সকলের ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Work Experience

Technologies

Creating