Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

কেন আমি নাস্তিক? —ভগত সিং

 হঠাৎ একটা নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে। সে কি এই কারণে যে, সর্বশক্তিমান, সর্বত্র বিরাজমান, সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের অস্তিত্বে আমার বিশ্বাস নেই? না, এর মূলে রয়েছে আমার অহংমন্যতা?

ভাবিনি, এমন একটা প্রশ্নের সম্মুখীন আমাকে হতে হবে!

কিছুটা আমার সংস্পর্শে এসেছেন এমন কয়েকজন বন্ধুর কথা বলা যায়, যদিও তাঁদের বন্ধুত্বের প্রতি আমার খুব একটা দাবি নেই। আমার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের ধারণা হয়েছে যে, ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করাটা আমার পক্ষে খুবই বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আর এ বাড়াবাড়ির মূলে রয়েছে অহংমন্যতা। হ্যাঁ, সমস্যাটা গভীর বটে। আমি যাবতীয় মানবিক দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, এমন দাবি করি না। আমি মানুষ, তার বেশি কিছু নই। এর অধিক দাবিও কেউ করতে পারেন না।

কমরেডদের মধ্যে অনেকেই আমাকে স্বেচ্ছাচারী বলেন। এমনকি আমার বন্ধু বি. কে. দত্ত-৬ কখনো কখনো আমার সম্পর্কে ঠিক এই কথাটাই বলে থাকেন। কোনো কোনো ব্যাপারে আমাকে স্বৈরতন্ত্রী বলেও ধিক্কার দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বেশ জোরের সঙ্গেই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন যে আমি নাকি, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও, আমার বক্তব্য অন্যের ওপরে নেহাৎ জোর করেই চাপিয়ে দিই এবং আমার মতামতটাই তাঁদের দিয়ে গ্রহণ করিয়ে নিই।

এ অভিযোগ কিছুটা যে সত্য, তা অস্বীকার করি না। এটাই হয়তো এক ধরনের ‘অহংমন্যতা’ বা

‘ অহংবাদ’।

কিংবা এটি হয়তো বা আত্মশ্লাঘারই নামান্তর। এই আত্মশ্লাঘা আমার নিজের মধ্যে যতটা আছে, ততটাই আছে আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মধোও। কারণ, আমাদের এ মতাদর্শ অন্যান্য তথাকথিত জনপ্রিয় মতাদর্শের বিরোধী।

তাই, এটা ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপার নয়। হয়তো এটা আমাদেরই, রাজনৈতিক মতাদর্শেরই, এক ন্যায়সঙ্গত অহংবোধ, অহেতুক কোনো দম্ভ নয়। কারণ, দন্ত হলো কোনো ব্যক্তির একান্ত নিজের ভিতরকার অহেতুক গর্বের আধিক্য, সংক্ষেপে বলতে গেলে ‘অহঙ্কার’।

এই ধরনের কোনো অহেতুক গর্বই আমাকে নাস্তিক্যবাদের পথে নিয়ে গেছে, না, এ বিষয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবা রণদীর সিং ১৯৩০-৩১ সালে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী ছিলেন। তিনি নিজে ঈশ্বর বিশ্বাসী ধর্মভীরু মানুষ। ভগৎ সিং ঈশ্বর-বিশ্বাসী নন জেনে তিনি খুবই ব্যথিত হন। নির্জন ফাঁসি সেলে সুযোগ করে তিনি ভগব সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপনের অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি ভগৎ সিংকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘খ্যাতিমান হয়ে তোমার মাথা ঘুরে গেছে। তাইতো তোমার আর ঈশ্বরের মধ্যে এক কালো পর্দার ব্যবধান সেই মন্তব্যের প্রত্যুত্তরেই ভগৎ সিং এই ক্ষুদ্র নিবন্ধটি লেখেন।

অনেক সযত্ন পঠন এবং যথেষ্ট সতর্ক বিচার-বিবেচনার পরই আমি ঈশ্বরে অবিশ্বাস করা শুরু করেছি জানি না।

আজ সেই প্রশ্ন নিয়েই কিছু বলতে চাই। প্রথমেই স্পষ্ট করে বলা যাক যে আত্মশ্লাঘা ও অহঙ্কার এক বস্তু নয়।

প্রথমত আমি সত্যিই বুঝতে পারিনে কী করে অহেতুক অহঙ্কার বা আত্মশ্লাধা ঈশ্বর-বিশ্বাসের অন্তরায় হতে পারে।

জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিলাভের যোগ্য না হয়েও, অথবা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য গুণাবলী না থাকা সত্ত্বেও যদি আমি কিছু পরিমাণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেই ফেলি, তবেই হয়তো বা আমি সত্যকার কোনো মহৎ ব্যক্তির মহন্ত অগ্রাহ্য করতে পারি।

এ পর্যন্ত না হয় কেঝা গেল। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারিনে কী করে একজন সত্যকারের ঈশ্বর-বিশ্বাসী ব্যক্তি শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অহংমন্যতার কারণেই অবিশ্বাসী হয়ে যেতে পারেন?

এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে।

১. হয় তিনি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেন

২. নয়তো, নিজেকেই তিনি ঈশ্বর বলে মনে করেন

কিন্তু তাই বলে কোনোভাবেই তাঁকে খাঁটি নাস্তিক বলা চলে না। কারণ, প্রথম ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি,

দ্বিতীয় ক্ষেত্রেও তিনি স্বীকার করছেন যে এক চিন্ময় সত্তা দৃষ্টির অন্তরালে অদৃশ্য থেকে বিশ্ব-

প্রকৃতির যাবতীয় গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত করে চলেছেন।

তিনি নিজেকে পরম সত্তা রূপেই ভাবুন কিংবা সেই পরম সত্তা থেকে নিজেকে পৃথক করেই ভাবুন, আমাদের কাছে তার কোনোই গুরুত্ব নেই। নন। মূল প্রশ্নটা এখানেই এবং তাঁর বিশ্বাসের ভিভিটা এখানেই। কেননা কোনক্রমেই তিনি নাস্তিক

এই তো আমি রয়েছি। আমি কিন্তু প্রথম দলেও পড়ি না, দ্বিতীয় দলেও নয়। কেননা ‘সর্বশক্তিমান’ ‘পরম সত্তায়’ আমার কোনোই বিশ্বাস নেই। কেন নেই সে কথায় পরে আসছি।

এখানে একটা কথা পরিস্কার করে বলে নিতে চাই। আমি কিন্তু আদৌ অহঙ্কারের দ্বারা চালিত হয়ে নাস্তিক্যবাদ গ্রহণ করিনি। কারণ আমি ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা ঈশ্বরের অবতার নই। আমি সোহং বা স্বয়ং ঈশ্বরও নই।

তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল যে আমার এই জাতীয় চিন্তাধারার মূলে কোনো অহঙ্কার নেই। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরসন কল্পে কয়েকটা ঘটনা বিচার করে দেখা যাক। আমার পূর্ব-কথিত বন্ধুদের মতে দিল্লি বোমার মামলা ও লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় আমার অপ্রত্যাশিত খ্যাতি-অর্জনই নাকি আমার এই অসার অহঙ্কারের হেতু।

দেখা যাক, তাঁদের এ অনুমান ঠিক কি না। আমার নাস্তিক্যবাদের উন্মেষ সাম্প্রতিক কালের ব্যাপার নয়। আমার জীবনে ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাসের সূত্রপাত নিতান্ত তরুণ বয়সেই। তখন তো আমি নেহাতই এক অখ্যাত ব্যক্তি। আমার বন্ধুরা সে-সম্পর্কে (আমার জীবনের সেই পর্ব সম্পর্কে) কিছুই জানেন না।

এক অখ্যাত কলেজ-পড়ুয়া তরুণ ছাত্রের মনে এমন কোনো অহেতুক অহঙ্কার থাকতে পারে না, যার ফলে সেকি না নাস্তিক হয়ে যেতে পারে। যদিও আমি কয়েকজন অধ্যাপকের খুবই প্রিয় ছিলাম, আমার কয়েকজন অধ্যাপক আমাকে খুবই অপছন্দ করতেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়র কোনোদিনই আমি খুল কোনো সুযোগই আমার জ্বিল জীবিকা সম্পর্কে আমার নাস্তিক নই যাই হোক নাস্তিক নন। তবে রেসানকার স্কুল-বোর্ডি যোগ দিতে হতো। ভাহাড়র সময় আমি ছিলাম পুরো তাঁর যতই নিষ্ঠা থাক, মান উঠেছে দেশের কাজে আ বিশ্বাস ছিল অটুট। তিনি আম

এইভাবেই আমি বা ইত্যাদি করতে শিখলাম। নিয়েও আলোচনা কদর্য্যাত শিষ পরবর্তীকালে আ তিনি আমাকে ঈশ্বরে বিশ্বাস ক সাহস করেননি আনত প্রতি করো, যত ইল্যা ঈশ্বরের কাছে থেকেই তিনি প্রববাদাতে ইশ্বরে হয়েছে তা যে তাঁর চিয়া-কেন বিরুদ্ধে আনীত মামলার স ভারত জুড়ে যে বিপ্লবী ইয়াহর। শ্রমের ফল। সেই ইস্তাহারের প লীলার প্রশস্তি। এ হলে পুরেশ্বরী চাইছি তা হলো, উদ্ধারের প্রতি। গড়ে ওঠেনি। আমি ঈশ্বরে অবিশ্বাস করা শুরু করেছি

আদ্রতার বা আত্মশ্লাযা ঈশ্বর-বিশ্বাসের নাপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ও নপ্রিয়তা অর্জন করেই ফেলি, তবেই করতে পারি।

পারিনে কী করে একজন সত্যকারের সাদেরই আবিশ্বাসী হয়ে যেতে পারেন?

ছোটবেলায় ঠাকুর্দার কাছে বড়ো হয়েছি। তিনি ছিলেন গোঁড়া আর্যসমার্জী। অর্থসমাজীরা আর যাই হোক নাস্তিক নন। প্রাথমিক শিক্ষা নেবার পর আমি লাহোরের ডি.এ.ভি. স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানকার স্কুল-বোর্ডিং-এ পুরো একবছর ছিলাম। রোজ সকালে ও সন্ধ্যায় নিয়মিত প্রার্থনা সভায় যোগ দিতে হতো। তাছাড়া, সেই সময় রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি গায়ত্রীমন্ত্র জপ করতাম। সেই সময় আমি ছিলাম পুরোমাত্রায় ভক্ত ও ঈশ্বর বিশ্বাসী। এর পর বাবার কাছে চলে এলাম। ধর্ম সম্পর্কে তাঁর যতই নিষ্ঠা থাক, মনে প্রাণে তিনি ছিলেন উদারপন্থী। তাঁর শিক্ষার প্রভাবই আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে দেশের কাজে আত্মোৎসর্গের আকাঙ্ক্ষা। নিজে কিন্তু তিনি নাস্তিক ছিলেন না, ঈশ্বরে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটুট। তিনি আমাকে প্রত্যহ প্রার্থনা করতে বলতেন।

বিষয় আনে অহঙ্কারের দ্বারা চালিত হয়ে উপায়ের অবতার নই। আমি সোহং বা জাতীয় চিন্তাধারার মূলে কোনো কয়েকটা ঘটনা বিচার করে দেখা ও লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় আমার উলদের ডম্মেষ সাম্প্রতিক কালে নিতান্ত তরুণ বয়সেই সেই। তখন আমার জীবনে বনের সেই পর্ব সম্পর্কে) অন্য অহেতুক অহঙ্কার থাব রে না, থাকতে পারে ধ্যাপকের খুবই কয়েকজন অধ্যাপ খুবই প্রিয় ছিল ছলাম, কিন্তু তখন পর্যন্ত ঈশ্বরে। আমার বিশ্বাস দ্বিতীয় যে নেতার সংস্পর্শে এলাম তিনি ছিলেন পরম ঈশ্বর-বিশ্বাসী। তাঁর নামটা বলি- তিনি শ্রদ্ধেয় কমরেড শচীন্দ্রনাথ সান্যাল। কাকোরী যড়যন্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে তখন তিনি দীপান্তর-সাজা ভোগ করছেন। তাঁর বিখ্যাত এবং একমাত্র গ্রন্থ ‘বন্দী-জীবন’ এর প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই তিনি প্রবলভাবে ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনে পঞ্চমুখ। এই চমৎকার বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ পৃষ্ঠায় মরমী দৃষ্টিতে- সম্ভবত বেদান্তবাদের প্রভাবেই ঈশ্বরের উদ্দেশে যে প্রশস্তিবাণী বর্ষিত হয়েছে তা যে তাঁর চিন্তা-চেতনার উৎস থেকেই উৎসারিত তা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়। আমাদের বিরুদ্ধে আনীত মামলার সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায় যে ১৯২৫ সনের ২৮ জানুয়ারি সারা ভারত জুড়ে যে বিপ্লবী ইস্তাহার বিলি করা হয়েছিল সেটি ছিল তাঁরই মস্তিষ্ক-প্রসূত তাঁরই বৌদ্ধিক শ্রমের ফল। সেই ইস্তাহারের পুরো একটি অনুচ্ছেদ জুড়েও হিল সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের আনন্দময় লীলার প্রশস্তি। এ হলো পুরোপুরি রহস্যময়তা বা মিস্টিসিজমের প্রতি আত্মসমর্পণ। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস-জনিত কোনো ধারণাই তখন পর্যন্ত কোনো বিপ্লবী দলেই গড়ে ওঠেনি।

এ হলো এক ধরনের সাহস-বর্জিত নাস্তিকতা। কারণ নাস্তিকতা গ্রহণ করার পক্ষে যেটুকু সাহস ও দৃঢ়তা থাকা দরকার তা এখানে নেই।

পরবর্তীকালে আমি বিপ্লবী দলে যোগ দিই। এই দলে এসেই প্রথম যে-নেতার সংস্পর্শে এলাম তিনি আমাকে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে না পারলেও নিজে কিন্তু তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করাতে সাহস করেননি। আমার প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা ও কৌতূহলের জবাবে তিনি শুধু বলতেন, ‘প্রার্থনা করো, যত ইচ্ছা ঈশ্বরের কাছে শুধু প্রার্থনা করে যাও।’

এইভাবেই আমি বড়ো হয়েছি। অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে আমি জাতীয় বিদ্যালয়ে (ন্যাশনাল কলেজে) পড়তে এলাম। এখানে এসেই আমি স্বাধীনভাবে ভাবনা-চিন্তা তর্ক-বিতর্ক সমালোচনা ইত্যাদি করতে শিখলাম। যাবতীয় ধর্মের নানা সমস্যা ও প্রশ্ন নিয়ে এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়েও আলোচনা করতে শিখলাম। তখনও আমি পুরোপুরি ঈশ্বর বিশ্বাসীই ছিলাম। সে-সময় আমি না-ছাঁটা দাড়ি ও না-বাঁধা লম্বা চুল রাখতাম। কিন্তু শিখধর্মের বা অন্য কোনো ধর্মেরই তত্ত্বকথা, কল্পকথা, পুরাণ-কথা বা ধর্মীয় মতবাদে আমার বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না।

কোনোদিনই আমি খুব একটু পড়ুয়া বা পরিশ্রমী ছাত্র নই। অহঙ্কারে গা ভাসিয়ে দেবার মতো কোনো সুযোগই আমার ছিল না। উপরন্তু আমি ছিলাম খুবই লাজুক প্রকৃতির ছেলে। ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই নেতিবাচক ও নৈরাশ্যমূলক। তখনও আমি পুরোপুরি নাস্তিক নই। বিখ্যাত কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলায় যে চারজন ব্যক্তি শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের শেষ দিনগুলো তাঁরা ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রার্থনা করেই কাটিয়ে গেলেন। এঁদের মধ্যে রামপ্রসাদ বিসমিল ছিলেন গোঁড়া আর্যসমাজী। আর সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা থাকা সত্ত্বেও রাজেন লাহিড়ি প্রকাশ্যেই উপনিষদ ও গীতার শ্লোক আবৃত্তি করতেন। এঁদের মধ্যে একজনকেই জানি যাঁকে কখনো প্রার্থনা করতে দেখিনি। তিনি বলতেন, দর্শন হলো মানুষের চিত্তের দুর্বলতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ফল। তিনি তখন যাবজ্জীবন দীপান্তর-দণ্ড ভোগ করছিলেন। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তিনিও ঈশ্বরের অস্তিত্ব একেবারে অস্বীকার করতে পারেননি বা অস্বীকার করতে সাহস করেননি।

সেই সময় পর্যন্ত আমি ছিলাম এক ভাববাদী, রোমান্টিক বিপ্লবী। তখন পর্যন্ত আমরা শুধু নেতার নির্দেশই পালন করে যেতাম। তারপর একটা সময় এল যখন সমস্ত দায়িত্ব-কর্তব্য কাঁধে তুলে নিতে হলো। পার্টির মধ্যে কতকগুলি অপরিহর্তব্য ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ কিছুকালের জন্য আমাদের পার্টির অস্তিত্বই প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ল।

অত্যুৎসাহী কমরেডরাই শুধু নয়, অনেক নেতাই আমাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগলেন এবং টিটকারী দেওয়া শুরু করলেন।

কিছুদিন তো বেশ ভয়ে ভয়েই কাটল এই ভেবে যে, আমাদের পার্টির কর্মসূচীর অসারতার ফলেই কি আমি পার্টির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছি?

‘পড়ো, আরও পড়ো, আরও পড়া চাই’-আমার মনের কোণে তখন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল এই কথা। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ও যুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নিজেকে প্রস্তুত করা চাই, তারজন্য পড়া চাই, শুধু পড়া চাই। পড়া চাই নিজের বিশ্বাসের সপক্ষে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্যেই। আমি, তাই দিনরাত পড়তে শুরু করলাম। আমার পূর্বতন ধারণা ও বিশ্বাস একটা উল্লেখযোগ্য বিরাট পরিবর্তনের স্তর পার হয়ে এল।

একমাত্র সহিংস পন্থার যে রোমান্টিক ভাবালুতা আমার পূর্বসূরিদের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, তার জায়গায় আমার মধ্যে জেগে উঠল গভীর ভাবনা ও তত্ত্ব। এখন থেকে আর রহস্যময়তা নয়, আর অন্ধবিশ্বাস নয়। বস্তুবাদই হোক আমাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শের কেন্দ্রভূমি।

একমাত্র বিশেষ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেই এবং অপরিহার্য প্রয়োজনেই সহিংস বলপ্রয়োগ মেনে নেওয়া যেতে পারে। নইলে অহিংস পন্থাই যাবতীয় গণ আন্দোলনের মূল ও অপরিহার্য পথ।

বিপ্লবের পন্থা সম্পর্কে এই হলো মোদ্দা কথা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে আদর্শের জন্য আমাদের এই সংগ্রাম সে সম্পর্কে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা চাই। যেহেতু সে-সময় প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ক্ষেত্রে আমাদের হাতে তেমন কোনো কাজ ছিল না, সেহেতু, সেই সময় আমি বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনের বিভিন্ন ও বিচিত্র ধারা সম্পর্কে জানবার আগ্রহে প্রচুর বইপত্র পড়বার সময় ও সুযোগ পেয়েছিলাম। নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক লেখক বাকুনিনের লেখা পড়লাম। কমিউনিজমের জন্মদাতা কার্ল মার্কসের কিছু লেখা এবং প্রচুর পরিমাণে লেনিন ও ট্রটস্কির লেখাও পড়ে ফেললাম। এছাড়া, যাঁরা নিজেদের দেশে বিপ্লবের কাজ সার্থকভাবে সম্পন্ন করেছেন তাঁদের অনেকের লেখা অনেক বই-ই পড়ে শেষ করলাম।

বাকুনিনের ‘ঈশ্বর ও রাষ্ট্র’ যদিও খুব গোছানো ও সংহত লেখা নয়, তবু পড়তে ভালোই লাগলো। বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। হঠাৎ একটা বই হাতের কাছে এল। বইটার নাম ‘Common Sense’, লেখক নিরালম্ব স্বামী। বইটার বিষয় একধরনের রহস্যময় নাস্তিক্যবাদ। এটি একসময় আমার খুব প্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছিল।

১৯২৬ সনের শেষাশেষি আমার স্থির বিশ্বাস হলো যে সর্বশক্তিমান এমন কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই যাঁর হাতে রয়েছে এই বিশ্বের আমার এই অবিশ্বাসের কথা অ আলোচনা প্রত্যালোচনা হতো। এই তার কী মানে, তা একটু পরেই কল ১৯২৭ সনের মে মাসে লাহোত পুলিস যে আমাকে খুঁজছে তা আমা দেখলাম চারদিক থেকে পুলিস আম সংযত ছিলাম। আমার কোনরকম। আমাকে পুলিস হাজতে আনা শ্র এখানে আমাকে পুরো একমাস থানা বেশ কয়েকদিন ধরে পুলিসের কাকোরী ষড়যন্ত্রকারীদের ও অন্যান কাছে খবর আছে। তারা বলল যে করেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারপর তাঁদের অনুমোদনের পর। ১৯২৬ সনের দশেরা উপলক্ষে যে মি ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা আরো জান সম্পর্কে কিছু তথ্য জানিয়ে একটা। মুক্তি দেওয়া হবে ও পুরস্কৃত করা হিসাবে আদালতে হাজিরাও দিতে।

প্রস্তাবটা শুনে আমি খুব জোরে যারা পোষণ করে তারা কি কখনো।

একদিন সকালে তৎকালীন বি কাছে এলেন। আমার প্রতি অনেক অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানালেন যো কাকোরী ষড়যন্ত্রীদের সঙ্গে সংযোগান নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আ তিনি আরও জানালেন যে আম আসামী হিসাবে আমার ফাঁসি পর্যন্ত আমি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও অ তাই করতে পারে। সেই দিনই কয়ে সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে দুবেলএখন তো আমি নাস্তিক। এই ও সুখের দিনগুলিতেই কি নিজেকে দুঃখের দিনগুলিতেও, আমার নীতি অনেক গভীর বিচার-বিবেচনা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা-নিবেদন।

এ আমার এক সত্যিকার কঠিন কয়েছিলেন, তাঁদের শেষ দিনগুলো যে রামপ্রসাদ বিসমিল ছিলেন গোঁড়া জাশোনা থাকা সত্ত্বেও রাজেন লাহিড়ি মহলে একজনকেই জানি যাঁকে কখনো জের দুর্বলতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও ঈশ্বরের এত সাহস করেননি।

আমার এই অবিশ্বাসের কথা আমি প্রকাশ্যেই বলে বেড়াতাম। বন্ধুদের সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আলোচনা প্রত্যালোচনা হতো। এইভাবেই, স্পষ্টতই তার কী মানে, তা একটু পরেই বলছি। আমি একজন স্বঘেয়ত নাস্তিক বনে গেলাম।

এক বিপ্লবী। তখন পর্যন্ত আমরা শুধু যখন সমস্ত দায়িত্ব-কর্তব্য কাঁধে তুলে অক্রিয়ার ফলস্বরূপ কিছুকালের জন্য। আমাদের পার্টির কর্মসূচীর অসারতার নর কোণে তখন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত রোধ গড়ে তুলতে নিজেকে প্রস্তুত করা খাদের সপক্ষে নিজেকে প্রস্তুত করার তন ধারণা ও বিশ্বাস একটা উল্লেখযোগ্য সুদিদের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, এ। এখন থেকে আর রহস্যময়তা নয়, মর্শের কেন্দ্রভূমি

প্রয়োজনেই সহিংস বলপ্রয়োগ মেনে ভালানের মূল ও অপরিহার্য পথ। ও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে-আদর্শের জন্য যেহেতু সে-সময় প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সামায় আমি বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনের পড়বার সময় ও সুযোগ পেয়েছিলাম। মিউনিজমের জন্মদাতা কার্ল মার্কসের। ডে ফেললাম। এছাড়া, যাঁরা নিজেদের নাকের লেখা অনেক বই-ই ই-ই পড়ে শেষ স্বেত লেখা। নয়, তবু পড়তে ভালোই mon Sense, লেখক নিরালম্ব স্বামী। আমার খুব প্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছিল। বশক্তিমান এমন। কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই যাঁর হাতে। য়ছে এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি, চলনা ও নিয়ন্ত্রণের ভার।

১৯২৭ সনের মে মাসে লাহোরে হঠাৎ আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো। গ্রেপ্তারটা বড়োই বিস্ময়কর। পুলিস যে আমাকে খুঁজছে তা আমার জানা ছিল না। হঠাৎ একটা বাগানের পাশ দিয়ে যাবার সময় আমি অভাবিত রকমের শান্ত ও দেখলাম চারদিক থেকে পুলিস আমাকে ঘিরে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে সংযত ছিলাম। আমার কোনরকম অনুভূতি বা উত্তেজনা কিছুই ছিল না।

আমাকে পুলিস হাজতে আনা হলো। পরদিন আমাকে এনে তোলা হলো রেলওয়ে পুলিস হাজতে। এখানে আমাকে পুরো একমাস থাকতে হয়েছিল।

বেশ কয়েকদিন ধরে পুলিসের কর্তাদের সঙ্গে অনেক বাদানুবাদের পর আমার ধারণা হলো যে কাকোরী ষড়যন্ত্রকারীদের ও অন্যান্য বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে আমার যোগসূত্র আছে বলে তাদের কাছে খবর আছে। তারা বলল যে মামলা চলাকালীন সময়ে আমি লক্ষ্ণৌ গিয়েছিলাম, পরিকল্পনা করেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম এবং বিপ্লবীদের মুক্তির জন্য কিছু পথ বাংলে দিয়েছিলাম, তারপর তাঁদের অনুমোদনের পর কিছু বোমা সংগ্রহ করেছিলাম এবং সেগুলো পরীক্ষা করার জন্য ১৯২৬ সনের দশেরা উপলক্ষে যে মিছিল হয়েছিল, তখন জনতার ভিড়ে সে বোমা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম-ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা আরো জানালো যে আমার নিজের স্বার্থে যদি আমি বিপ্লবীদের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু তথ্য জানিয়ে একটা বিবৃতি দিই, তবে আমাকে বন্দী করে রাখা তো হবেই না, উপরন্তু মুক্তি দেওয়া হবে ও পুরস্কৃত করা হবে। এমনকি আমাকে ‘অ্যাগ্রোভার’ বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হিসাবে আদালতে হাজিরাও দিতে হবে না।

প্রস্তাবটা শুনে আমি খুব জোরে হেসে উঠলাম। যত সব বজ্জাতি! আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যারা পোষণ করে তারা কি কখনো তাদের নিজের দেশের নির্দোষ লোকের ওপর বোমা ছুঁড়তে পারে। একদিন সকালে তৎকালীন সি-আই ডি র সিনিয়ার সুপারিনটেনডেন্ট মিঃ নিউম্যান আমার কাছে এলেন। আমার প্রতি অনেক সহানুভূতি দেখিয়ে অনেক দরদী কথাবার্তার পর (তাঁর পক্ষে) অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানালেন যে আমি যদি তাঁর চাহিদা অনুযায়ী কোনো বিবৃতি না দিই, তবে কাকোরী ষড়যন্ত্রীদের সঙ্গে সংযোগসূত্রে একজন আসামী হিসাবে দশেরা উৎসবের দিন বোমা মারা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে তাঁরা বাধ্য হবেন।

তিনি আরও জানালেন যে আমার বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ তাঁদের হাতে আছে, যার ফলস্বরূপ আসামী হিসাবে আমার ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে।

আমি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও আমি জানতাম যে দেশের তৎকালীন পরিস্থিতিতে পুলিস যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সেই দিনই কয়েকজন পুলিস অফিসার আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন যে রোজ

সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে দুবেলা আমি যেন ভগবানের নাম করি। এখন তো আমি নাস্তিক। এই তো সময়, এখনই এই প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। শুধু শান্তি ও সুখের দিনগুলিতেই কি নিজেকে নাস্তিক ভেবে গর্ববোধ করব, না, জীবনের এহেন কঠোর-কঠিন দুঃখের দিনগুলিতেও, আমার নীতিগুলোকে কি আমি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারবো?

অনেক গভীর বিচার-বিবেচনার পর আমি স্থির করলাম যে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস-স্থাপন বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা-নিবেদন- কোনোটাই আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়।

এ আমার এক সত্যিকার কঠিন পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষায় আমি কৃতকার্য হলাম। জীবনে কোনদিন আমি কোনকিছুর বিনিময়ে নিজের ঘাড় (প্রাণ) বাঁচাতে চাইনি। কাজেই, আমি মনেপ্রাণে অবিশ্বাসী এবং আজও তাই-ই আছি। সেদিন নিজের বোঝাপড়ার পরীক্ষাটা নেহাত সহজ ছিল না। জানি যে, বিশ্বাস দুঃখের কঠোরতাকে অনেকখানি মোলায়েম করে আনে, এমনকি অনেকসময় তাকে মধুর ও প্রীতিপদ করে তুলতে পারে। জানি যে ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করে মানুষ পরম শান্তি ও সান্ত্বনা খুঁজে পায়। কিন্তু ঈশ্বর ছাড়া মানুষকে নিজের ওপরেই আস্থা রাখতে হবে। জীবনের ঝড়-ঝঞ্ঝায় নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ানো নেহাৎ ছেলেখেলা নয়। আত্মশ্লাঘা বা অহংকার যদি কিছু থেকেও থাকে তবে এধরনের কঠিন পরীক্ষার সময় তা উবে যায় এবং প্রচলিত বিশ্বাসকে সে তখন একেবারে অগ্রাহ্যও করতে পারে না। তবে বুঝতে হবে যে তার মধ্যে এমন কোনো শক্তি আছে যা নিছক অহংকার নয়। বরং অন্য কিছু। পরীক্ষার এই তো উপযুক্ত সময়। আদালতে বিচারের রায় যে কী হবে তা তো জানাই আছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই সে রায় ঘোষণা করা হবে। আমি যে দেশের জন্য একটি মহৎ কাজে প্রাণ উৎসর্গ করতে যাচ্ছি, এছাড়া কী সান্ত্বনা আছে আমার জীবনে? ঈশ্বরবিশ্বাসী, কোনো হিন্দু হয়তো মনে করতে পারেন যে পরজন্মে তিনি রাজা হয়ে জন্মাবেন, আবার একজন মুসলমান বা খ্রিস্টান ভাবতে পারেন যে, এই ধরনের আত্মত্যাগের মূল্যে মৃত্যুর পর স্বর্গ রাজ্যে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে পরম ভোগসুখের প্রাচুর্য, কিন্তু কী আছে আমার আশা করবার?

আমি জানি যে-মূহূর্তে ফাঁসির দড়ি আমার গলায় এঁটে বসবে, পায়ের তলা থেকে পাটাতন সরিয়ে নেওয়া হবে, সেই হবে আমার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত, আমার জীবনের সর্বশেষ ক্ষণ। ‘আমি’ বা সংক্ষেপে (দার্শনিক পরিভাষায়) আমার ‘আত্মা’-সেখানেই চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। সব শেষ। আর কিছু নেই। এক অতি সংক্ষিপ্ত সংগ্রামী জীবনের কীর্তিহীন, গৌরবহীন, মাহাত্মাহীন পরিসমাপ্তি!-যদি এইভাবে সাহসের সঙ্গে মেনে নিতে পারি- তবে সেটিই হবে আমার জীবনের সর্বোত্তম পুরস্কার। সব শেষ। ইহলোক বা ‘পরলোকে’ পুরস্কৃত হবো এমন কোনো স্বার্থগত বাসনা বা অভিসন্ধি নেই। নিতান্ত নিঃস্বার্থভাবে আমি আমার দেশের মুক্তির জন্যে আমার এই জীবন উৎসর্গ করে গেলাম, কারণ, এ ছাড়া আমার আর কিছু দেবার ছিল না।

যেদিন আমরা দেশে যাবো যে, এক বৃহৎ সংখ্যক নরনারী এই মনোভাব নিয়ে দলে দলে মানব জাতির সেবায় এগিয়ে আসছে, নিপীড়িত ও দুর্গত মানবাত্মার মুক্তি ছাড়া যাদের জীবনের অন্য কোনো কাজ থাকবে না, সেদিনই আমার মতো মানুষের জীবনদান সার্থক হবে। শুরু হবে সত্যিকার মুক্তির দিন। মৃত্যুর পর ‘স্বর্গে’ গিয়ে বা ‘পরের জন্মে’ রাজা হতে নয়, ইহলোক কোনো পুরস্কার লাভের জন্যেও নয়, নির্যাতনকারী যত শোষক দস্যুদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে অনুপ্রাণিত হয়েই এবং সেইসঙ্গে সমগ্র মানবজাতির স্কন্ধ থেকে দাসত্বের জোয়াল ঝেড়ে ফেলে দিতেই এবং স্বাধীনতা ও শান্তির পথ নির্মাণ করতেই তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত আত্মধংসী পথে নিজেদের মহৎ প্রাণ বলিদান করে গেছেন এবং এই পথটাই হলো গৌরবময় জীবনের পথ। এই মহৎ কাজের যে গৌরব ও মাহাত্ম্য তাকে কি শুধু ‘অহঙ্কার’ বলে খাটো করা যায়? তার কোনো অপব্যাখ্যা হয় কি? এই ধরনের ঘৃণ্য বিশেষণ যদি কেউ ব্যবহার করেন, তবে বলবো যে হয় তিনি নির্বোধ, নয়তো শয়তান।

এই মহান আত্মত্যাগের মধ্যে যে অনুভূতির প্রগাঢ়তা, যে ভাবব্রতা, যে উদ্দীপনা যে মহত্ত্ব ও বিশালতা আছে তা অনুধাবন করতে না পারার জন্য আসুন, সে মানুষ ক্ষমা করা যাক। কারণ তার হৃদয় মৃত ধ্বংসস্তূপের মতো, তার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ ভিন্নতর কোনো স্বার্থের আবরণে তার হৃদয় চাপা পড়ে আছে। আত্মবিশ্বাসকে প্রায়শ আতান্তরিতা বলে ভুল করা হয়। এটা যেমন দুঃখজনক, তেমনি শোচনীয়। কিন্তু কিছু করার নেই। যান দেখি, কোনে প্রার সর্বদাই যাঁকে এক অভ্রান্ত পুর দাড়িক বলে হেয় প্রতিপন্ন কা এটি আসলে এক গ্যাে অপরিহার্য গুণ। যেহেতু নীতি শাস্ত্রই হোক, তাঁর তাই বঙ্গে আপনাকে কি-বায় নিয়ে যেরে পারে না।শ্রীশ কারণ, আমাদের পূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস ৈ হযার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রেলেন। নেওয়া হবে স্বধর্ম-চ্যুত বা அ করা না যায় তবে বলা হয়ে আপনাকে চিত্রিত করা কি লাভ। পুরো ব্যাপারটা শো সর্বপ্রথম সর্বস্যাল্যারণের সামনে হচ্ছে বলেই এত কথার অবতা

১. প্রথমে প্রশ্ন প্রসঙ্গে, আ আমার অহঙ্কার আমাকে নাজিন বরুত্ব বিশ্বাস্য কি অবিশ্বাস।

আমি আনি যে, বার্ত আরও মসৃণ হ্যারা, সহজ হতে অবিশ্বাস সবকিছু কেমন যেন কঠোরতর হয়ে উঠবে। একটু এ কিন্তু আমি আমার জীব চাইনা আমি বস্তুবাদী আমিত এ ব্যাপারে আমি যে সব সময় পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার ও

২. দ্বিতীয় প্রশ্নের ব্যাপারে বা বিশ্বাসহীনতার নিশ্চয়ই কেয়া

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এর দেখায়ের প্ররিমাপ যুক্তিবোধ এবং তর্ক পারিবার্শ্বিকতাকে বিচার করতে এসে জায়গা জুড়ে বসে আমিন করতে, সাধারণ সমালোচনার বাইরে রেখে যান দেখি, কোনো প্রচলিত বিশ্বাসে। জসের বিরোধিতা করে সর্বদাই যাঁকে এক অভ্রান্ত পুরুষ হিসাবে উধে উধের্ব সমালোচনা করুন তো দেখি! অমনি অগণিত দাম্ভিক বলে হেয় প্রতিপন্ন করতে। তুলে ধরা হয়, এমন কোনো বীর নায়ক বা মহাপুরুষকে হয় দল বেঁধে তেড়ে আসবে আপনাকে আত্মম্ভরী গত লোক দল এটি আসলে এক ধরনের বন্ধ্যাবস্থা। স্বাধীন সমালোচনা, চিন্তা ইত্যাদি হলো যে-কোনো বিপ্লবীর অপরিহার্য গুণ। যেহেতু মহাত্মাজী বিরাট পুরুষ, অতএব কেউ তাঁর সমালোচনা করতে পারবে না এবং যেহেতু তিনি সকলের ঊর্ধ্বে, তাই তিনি যা কিছু বলবেন, তা রাজনীতি হোক, ধর্মনীতি হোক, নীতি শাস্ত্রই হোক, তাঁর সবই নির্ভুল? সব ঠিক? তাতে আপনি বিশ্বাস স্থাপন করুন বা না-ই করুন, তাই বলে আপনাকে কি বলতে হবে, হ্যাঁ, এটাই ঠিক? এই মনোভাব মানুষকে কখনো প্রগতির পথে নিয়ে যেতে পারে না। এটা স্পষ্টতই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিরই নামান্তর।

কারণ, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা ‘পরম সত্তা’ বা ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ সম্পর্কে এমন একটা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস তৈরি করে গেছেন যার ফলে, কোনো ব্যক্তি যদি সেই প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা সেই ‘পরম সত্তার’ বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানান, তবে তাঁকে আখ্যা দেওয়া হবে স্বধর্ম-চ্যুত বা দলত্যাগী বিশ্বাসঘাতক হিসাবে।

যদি আপনার যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো বক্তব্যকে বিরুদ্ধবাদী কোনো যুক্তি দিয়েও খণ্ডন বা পরাভূত করা না যায় তবে বলা হবে যে, ‘তোমার ওপর পরম আত্মার অভিশাপ নেমে আসবে’। এবং আপনাকে চিত্রিত করা হবে এক অসার আত্মম্ভরী রূপে। কাজেই, এ বিষয়ে অহেতুক আলোচনা করে। কি লাভ? পুরো ব্যাপারটা খোলাখুলিভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করা যাক না। কারণ, ব্যাপারটা এই সর্বপ্রথম সর্বসাধারণের সামনে এসে পড়েছে এবং নেহাৎ সাদামাটা কাঠখোট্টা পদ্ধতিতে আলোচিত হচ্ছে বলেই এত কথার অবতারণা করতে হলো।

১. প্রথম প্রশ্ন প্রসঙ্গে, আমার মনে হয় আমি পরিষ্কার করে বলতে পেরেছি যে, আর যাইহোক। আমার অহঙ্কার আমাকে নাস্তিক্যবাদের পথে নিয়ে যায়নি। আমার যুক্তির পদ্ধতি ঠিক কি ভুল, আমার বক্তব্য বিশ্বাস্য কি অবিশ্বাস্য, তার বিচার করবেন পাঠকরাই, আমি নই।

আমি জানি যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে পারলে আমার জীবন হয়তো আরও মসৃণ হতো, সহজ হতো, আমার বোঝা হয়তো আরও হালকা হতো। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস সবকিছু কেমন যেন শুদ্ধ, নীরস ও কঠোর করে তুলেছে। এবং এ-অবস্থাটা হয়তো ক্রমশ কঠোরতর হয়ে উঠবে। একটু রহস্যময়তা হয়তো একে খানিকটা কাব্যিক সুষমায় ভরে তুলতে পারতো। কিন্তু আমি আমার জীবনের কঠিনতম পরিণতির সম্মুখীন হতে এ ধরনের কোনো মাদক দ্রব্য চাই না। আমি বস্তুবাদী। আমি আবার মধ্যেকার প্রবৃত্তিকে জয় করতে চাই একমাত্র যুক্তি-বুদ্ধি দিয়েই। এ ব্যাপারে আমি যে সব সময় সফল হয়েছি তা বলার না, কারণ সাফল্য নিভর করে সুযোগ, সময়, পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর।

২. দ্বিতীয় প্রশ্নের ব্যাপারে বলি যে, যদি আমার এটা অহঙ্কার না-ই হয় তবে সুপ্রাচীনকাল থেকে এতাবৎ-প্রচলিত ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের’ অস্তিত্ব সম্পর্কে যে বিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত, তার বিরুদ্ধে অনাস্থার বা বিশ্বাসহীনতার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। হ্যাঁ, সেই প্রসঙ্গেই আসছি।

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এর (ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসহীনতার) কারণ আছে। আমার মতে যে-ব্যক্তির কিছু পরিমাণ যুক্তিবোধ এবং তর্ক-বিতর্কের ক্ষমতা আছে, সব সময়েই তিনি চান যুক্তি দিয়েই তাঁর পারিবার্শ্বিকতাকে বিচার করতে এবং জয় করতে। যেখানে প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুপস্থিত, সেখানেই দর্শন এসে জায়গা জুড়ে বসে। আমি আগেই বলেছি যে, জনৈক বিপ্লবী বন্ধ প্রামাই বলতেন, ‘দর্শনের জন্ম বুঝোনাক, তেমনি শোচনীয়। প্রতি, যে উদ্দীপনা নাজমা করা ত্ত্বও যে মহত্ত্ব। যাক। কারণ তার না জখের আবরণে তার হৃদয়।

অন্যাভাব নিয়ে নিয়ে দলে দলে দলে দ মানব * ছাড়া যাদের জীবনের অন মকি হবে। গুরু হবে সত্যিকার লোক কোনো পুরস্কার জানাতে অনুপ্রাণিত হয়েই স্বাধীনতা দিতেই এবং স্বাধী নিজেদের মহৎ প্রাণ বলিদান এই মহৎ কাজের যে গৌরব ও অপব্যাখ্যা হয় কি? এই ধরনের। তো শয়তান।

তিন শায়ের তলা থেকে পাটাত মামি’ সানের সর্বশেষ ক্ষণ। ‘আমি কে শেষ হয়ে যাবে। সব শেষ। মায়াহীন পরিসমাপ্তি।-আজীবনের সর্বোত্তম পুরস্কার। স্বার্থগত বাসনা বা অভিসন্ধি এই জীবন উৎসর্গ করে গেলাম মনেপ্রাণে অবিশ্বাসী ই, আমি মনে হাত সহজ ছিল। না। জানি যে, এক অনেকসময় তাকে মধুর। পরম। ও শান্তি ও সান্ত্বনা খুঁজে জীবনের ঝড়-ঝঞ্ঝায় নিজের থেকেও থাকে তবে যদি কিছু। সে তখন একেবারে রে অগ্রাহ্যও আছে যা নিছক অহংকার নয় যে কী হবেতা তো জানাই জন্য একটি মহৎ কাজে প্রাণ বলিদাস, কোনো হিন্দু হয়তে একজন মুসলমান বা খ্রিস্টান তাদের জন্য অপেক্ষা করছে হয়েছে মানুষের দুর্বলত। থেকে।’ আমাদের পূর্বপুরুষেরা বিশ্বসৃষ্টির রহস্য, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, তার ‘কি’, ‘কেন’ ও ‘কোথা থেকে তার উৎপত্তি’ ইত্যাদি প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবার যথেষ্ট অবকাশ পেতেন। তাঁরা প্রত্যক্ষ প্রমাণের নিতান্ত অভাববশত প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতেন। এই কারণেই আমরা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমতের মূলে বড়ো রকমের পার্থক্য দেখতে পাই। সেগুলো কখনো কখনো বৈরিতামূলক কখনো বৈপরীত্য-ধর্মী, কখনও বা সংঘাতমূলক হয়ে ওঠে। শুধু যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে পার্থক্য আছে, তা-ই নয়, প্রত্যেক দর্শনের মতাদর্শগত পরিমণ্ডলের মধ্যেই নানা ধরনের মতানৈক্য (বা মতের ভিন্নতা) রয়ে গেছে। প্রাচ্য জগতের ধর্মসমূহের মধ্যে মুসলিম ধর্মমত হিন্দু ধর্মমতের সঙ্গে আদৌ তুলনীয় ও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ভারতে একে তো বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে পৃথক্, তার ওপর আবার রয়েছে পরস্পর-বিরোধী আর্য সমাজ ও সনাতন ধর্ম। প্রাচীন যুগের দার্শনিকদের মধ্যে চার্বাক আবার নতুন এক দার্শনিক মতাদর্শের প্রবক্তা, সেই প্রাচীন কালেই তিনি ঈশ্বরের প্রভুত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এই সমস্ত ধর্মমত মূল প্রশ্নের ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী এবং প্রত্যেকেই মনে করে যে একমাত্র তার মতটাই একেবারে অভ্রান্ত।

এখানেই রয়ে গেছে সমস্যা। এটা দুর্ভাগ্যজনক। প্রাচীন ঋষি ও চিন্তানায়কদের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা ও বাণীসমূহকে অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন-সংগ্রামের কাজে লাগিয়ে এই জগতের রহস্যভেদ করার কোনো চেষ্টা বা বিচার-বিবেচনা না করেই শুধু আলস্য-বিলাস-ভরে আমরা এতকাল ‘বিশ্বাস’ ‘বিশ্বাস’ নিয়েই চিৎকার করে এসেছি এবং তাঁরা যা বলে গেছেন, নির্বিচারে শুধু তার প্রতিই অবিচলিত, অন্ধবিশ্বাস পোষণ করে এসেছি। ফলে, মানবসমাজের প্রগতিকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আমরা অপরাধী হয়ে রইলাম। কিন্তু সত্যিই যদি কোনো ব্যক্তি সমাজ ও সভ্যতার প্রগতির পক্ষে থাকেন, তবে অবশ্যই তাঁকে সমালোচনা ও অবিশ্বাস করতে শিখতে হবে, জানতে হবে এবং প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় ধরে ধরে তাঁকে আলোচনা ও বিচার-বিবেচনা করতে হবে, প্রয়োজনবোধে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। প্রচলিত মত-বিশ্বাসের প্রতিটি আনাচে-কানাচে তন্নতন্ন করে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণ বিচার-বিবেচনার পর যদি তিনি আন্তরিকভাবে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো মত-বিশ্বাসকে বরণ করে নিতে চান, তবে তাঁর বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাকে স্বাগত জানাতে হবে। তাঁর যুক্তি-বিচার-পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে, তিনি বিপথগামী হতে পারেন, তাঁর বিচার কখনো বা ভ্রান্তিমূলক হতে পারে, তবু তাঁকে ভ্রান্ত পথ থেকে ঠিক পথে আনা যায়, কারণ, একমাত্র বিচার-বিমর্ষই হলো জীবনের লক্ষাপথের সঠিক দিক-নির্দেশক ধ্রুবতারা। কিন্তু শুধুমাত্র বিশ্বাস- অন্ধবিশ্বাসই বড়ো বিপজ্জনক, তা মানুষের বৃদ্ধিকে ভোঁতা করে দেয় এবং স্বভাবতই তাঁকে করে তোলে প্রতিক্রিয়াশীল।

নিজেকে যিনি বস্তুবাদী বলে দাবি করেন তাঁকে যাবতীয় প্রাচীন বিশ্বাসের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। যদি তিনি যুক্তির ধার ও ভার এবং তার আক্রমণ সহ্য করতে না পারেন, তবে তিনি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবেন। কাজেই তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজ হলো যা কিছু জীর্ণ ও পুরাতন তাকে চূর্ণ করে নতুন মতাদর্শের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরা।

এটা অবশ্য এক হিসাবে নেতিবাচক কথা। কারণ এখানে শুধু ভাঙার কথাই বলা হয়েছে। এর ইতিবাচক দিক হলো কোনো কোনো সময় পুরাতনের মধ্যে যা কিছু ইতিবাচক দিক আছে, তাকে গ্রহণ করে নতুন করে নির্মাণ ও ব্যবহার করতে হয়। পুরাতনের পুনগ্রহণ ও পুনর্নির্মাণ সমাজের প্রগতির স্বার্থেই প্রয়োজন।

আমার নিজের সম্বন্ধে বলতে গেলে জানাতে হয় যে, আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এ ব‍্যাপারে আমি খুব একট খুব ভালো করে পড়ব, ি আমি মনে মনে ছিল আমি ঠিকই করেছ। পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কে ছিলাম রানা কিন্তু প্রকৃতির অপর অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটেমা বা চৈতন্য-শক্তির অভিন্ন।

এটাই আমাদের দর্শন নৈতিবাচক দিক থেকে আম আমি আপনারা তো বিখ্যা করেছেন। এখন বল

গেলেন? তাহলে আমার প্রশ্না? কেন ২) যে-বিশ্ব এত সুখে-তাখে ও অস্থিরতা, একটি মানুষও দোহাই, দয়া করে বলবেন। দ্বারা তিনিই যদি বাঁধা পড়ে একজন দসে মাত্র।

অয়্যাদয়া করে বলবেন না যদিও খুব কম লোকই মারা। জন্যই। আজ ইতিহাসে তাঁরা যাবতীয় বিষাক্ত বিশেষণই নি ভর্ৎসনামূলক কটূক্তিতে কল আলোচেঙ্গিস খান তো কয়েক তাঁর নামটা শুনলেই তো আম মিনি মানুষের জীবনে এতকাল প্রতিদিন, প্রতিমিনিট প্রতি ঘণী নীরে বা চেঙ্গিস খানকে অপ আবার কলছি কেন, কে কাণ্ড-কারখানা? কেন নি এইসব কথার সণক্ষে আছে, এবং সেখানে তো নির্দে ভালো ভালো আর কতা ব্যাপারে আমি খুব একটা পড়াশোনা করে উঠতে পারিনি। আমার খুব ইচ্ছা ছিল যে প্রাচ্যদেশীয় দর্শন খুব ভালো করে পড়ব, কিন্তু এ জীবনে আর তার সুযোগ ও সময় পেলাম না।

আমি মনে মনে স্থির-নিশ্চয় যে, প্রাচীন ধর্ম-বিশ্বাসের গভীরতা ও দৃঢ়তা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে আমি ঠিকই করেছি।

এক ‘চিৎ-স্বরূপ’ বা ‘পরম সত্তা’ প্রকৃতির মধ্যে নিত্য ক্রিয়াশীল থেকে প্রকৃতির গতি প্রকৃতি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে চলছে বলে যে বিশ্বাস প্রচলিত, সে-সম্পর্কে এককালে আমিও বিশ্বাসী ছিলাম।

কিন্তু প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের ফলেই যে মানব-সভ্যতার যাবতীয় অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটে চলেছে, আমরা সেই প্রকৃতিকেই বিশ্বাস করি। এর পেছনে কোনো দৈবী শক্তি বা চৈতন্য শক্তির অস্তিত্ব নেই। এটাই আমাদের দর্শন

নেতিবাচক দিক থেকে আমরা ঈশ্বর-বিশ্বাসীদের কাছ থেকে কয়েকটা প্রশ্নের জবাব চাই:

১. আপনারা তো বিশ্বাস করেন যে, সর্বশক্তিমান সর্বত্র বিরাজমান ও সর্বজ্ঞ ঈশ্বর এই বিশ্বসৃষ্টি করেছেন। এখন বলুন তো দেখি, কেন খামোকা তিনি এই পৃথিবী ও বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করতে গেলেন?

তাহলে আমার প্রশ্ন? কেন এই বিশ্বসৃষ্টি

২. যে-বিশ্ব এত দুঃখ-তাপে পরিপূর্ণ, যে-বিশ্ব এক মোক্ষম নরক, যেখানে প্রতিনিয়ত চলছে অশান্তি ও অস্থিরতা, একটি মানুষও যেখানে পুরোপুরি সুখী বা পরিতৃপ্ত নয়, সেখানে কেন এই বিশ্বসৃষ্টি? দোহাই, দয়া করে বলবেন না যে, এটা তাঁর বিধান। তাই যদি হয়, অর্থাৎ বিশ্ববিধানের নাগপাশের দ্বারা তিনিই যদি বাঁধা পড়ে থাকেন তবে তো তিনি সর্বশক্তিমান নম; তিনি আমাদের মতোই আর একজন দাস মাত্র।

দয়া করে বলবেন না যে, এটা তাঁর ‘আনন্দ’ বা ‘লীলা’। নীরো রোম নগরী পুড়িয়েছিলেন। যদিও খুব কম লোকই মারা গিয়েছিলেন আর এই ট্রাজেডি তিনি ঘটিয়েছিলেন তাঁর চূড়ান্ত প্রমোদের জনাই। আজ ইতিহাসে তাঁর স্থান কোথায়? ঐতিহাসিকেরা আজ কীভাবে তাঁর নামোল্লেখ করেন? যাবতীয় বিষাক্ত বিশেষণই কি তাঁর উদ্দেশে বর্ষিত হয় না? ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো কি তাঁর বিরুদ্ধে ভৎসনামূলক কটূক্তিতে কলঙ্কিত হয়ে নেই?

চেঙ্গিস খান তো কয়েক হাজার লোকের প্রাণের বিনিময়ে আনন্দে উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নামটা শুনলেই তো আমাদের মনে ঘৃণার উদ্রেক হয়। তাহলে আপনাদের ‘সর্বশক্তিমান্ নীরো’ যিনি মানুষের জীবনে এতকাল ধরে সংখ্যাহীন ট্রাজেডি ঘটিয়ে এসেছেন এবং এখনো ঘটিয়েই চলেছেন-প্রতিদিন, প্রতিমিনিটে, প্রতি ঘন্টায় যাঁর হত্যাকাণ্ড চেঙ্গিস খানকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে- সেই চিরকালীন নীরো বা চেঙ্গিস খানকে আপনারা সমর্থন করছেন কী করে?

আবার বলছি কেন, কেন তিনি এই বিশ্বসৃষ্টি করলেন? যে বিশ্বে চলেছে সাক্ষাৎ নরকের কাণ্ডকারখানা? কেন তিনি মানব সৃষ্টি করলেন? সৃষ্টি না করার ক্ষমতাও তো তাঁর ছিল।

৩. এইসব কথার সপক্ষে আপনাদের কী যুক্তি আছে? আপনারা কি বলতে চান যে পরলোক আছে, এবং সেখানে তো নির্দেষ ব্যক্তিরা পুরস্কৃত হবেন, আর দোষীরা শাস্তি পাবেন?

ভালো, ভালো, আর কত সাফাই গাইবেন? এ যেন আপনার দেহে আঘাত করে তারপর কেউ নর স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এ বু ভান্ডার কথাই বলা হয়েছে। এর দুইতিবাচক দিক আছে, তাকে গ্রহণ জন ও পুনর্নির্মাণ সমাজের প্রগতির ান বিশ্বাসের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানাতে হতে না পারেন, তবে তিনি ভেঙে জীর্ণ ও পুরাতন তাকে চূর্ণ করে চিন্তানায়কদের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা আমের কাজে লাগিয়ে এই জগতের জন্য বিলাস-ভরে আমরা এতকাল খেছেন, নির্বিচারে শুধু তার প্রতিই এর প্রগতিকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সমাজ ও সভ্যতার প্রগতির পক্ষে হতে হবে, জানতে হবে এবং প্রাচীন ও বিচার-বিবেচনা করতে হবে, ভিটি আনাচে-কানাচে তন্নতন্ন করে চনার পর যদি তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাকে হবে তিনি বিপথগামী হতে পারেন, থেকে ঠিক পথে আনা যায়, কারণ, নির্দেশক ধ্রুবতারা। কিন্তু শুধুমাত্র ভোঁতা করে দেয় এবং স্বভাবতই প্রত্যেকেই মনে করে যে একমাত্র পুষ্টির রহস্য, তার অতীত-বর্তমান-এটি প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবার শত প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো ভিন্ন ধর্মমতের মূলে বড়ো রকমের কখনো বৈপরীত্য-ধর্মী, কখনও বা ও আছে, তা-ই নয়, প্রত্যেক দর্শনের মতের ভিন্নতা) রয়ে গেছে। প্রাচ্য আলে তুলনীয় ও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তার ওপর আবার রয়েছে পরস্পর-নর মধ্যে চার্বাক আবার নতুন এক দূর নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। এসে সে-দেহের ক্ষত স্থানে মলম লাগাচ্ছেন!

প্রাচীন গ্রীসের গ্লাডিয়েটর বা মল্লবীরদের সমর্থকরা ক্ষুধাতুর হিংস্র সিংহের মুখে মানুষ ছুঁড়ে দিত, তারপর যদি সে মানুষটা কোনক্রমে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরত তবে তাকে ভালোভাবে সেবাযত্ব করে সারিয়ে তোলা হতো। এতো অনেকটা সেই রকম। এটা কি আদৌ সমর্থনযোগ্য?

তাই তো আমার জিজ্ঞাসা কেন আপনাদের ‘চৈতন্যময় পরমসত্তা’ এই জগৎ সৃষ্টি করতে গেলেন, আর কেনই বা তাতে মানুষ সৃষ্টি করলেন? তাঁর আনন্দের জন্য। তা হলে তো তাঁর এবং রোমসম্রাট নীরোর মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই।

হিন্দু-দর্শন হয়তো এ প্রশ্নের জবাবে অন্য ধরনের এক যুক্তি খাড়া করবে, কিন্তু মুসলমান ও খ্রিস্টান বন্ধুগণ, আপনারা তো শুনি পূর্বজন্মে ও পরজন্মে বিশ্বাস করেন না। হিন্দুদের মতো আপনারাও কি বলবেন যে, এ জন্মে মানুষ যে কষ্ট ভোগ করছে তা তার পূর্বজন্মের দুষ্কৃতির ফল?

৪. আপনাদের জিজ্ঞাসা করি, কেন আপনাদের সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ৬দিন ধরে অনেক মেহনত করে শুধু বাকা দিয়ে এ দুনিয়া তৈরি করতে গেলেন আর তৈরি করেই বললেন, যে, সব কিছুই বহুত আচ্ছা, সব কিছুই সুন্দর, সব কিছু একেবারে ঠিকঠাক তাঁকে ডেকে আনুন, জগতের ইতিহাসটার কী হাল হয়েছে একবার তাঁকে ডেকে এনে দেখান, বর্তমান অবস্থাটাও দেখতে বলুন। দেখি তো তিনি কী করে বলেন, ‘সব কিছু ঠিকঠাক চলছে?’

তাঁকে ডেকে এনে একবার দেখান জেলখানার অন্ধকূপ থেকে শুরু করে বস্তিতে বস্তিতে আর প্রতিটি কুঁড়েঘরে কী করে লক্ষ লক্ষ লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে, তা’ একবার তাঁকে দেখে যেতে বলুন! তাঁকে ডেকে এনে দেখান, শ্রমিকরা কীভাবে দিনের পর দিন শোষিত হচ্ছে, তাঁকে ধৈর্য করে অথবা সহানুভূতি নিয়ে একবার দেখতে বলুন, কীভাবে রক্তচোষা পুঁজিবাদীদের শোষণে তাদের রক্ত শুষে নেওয়া হচ্ছে, দেখতে বলুন, কীভাবে মানুষের শক্তিসামর্থ। দিনের পর দিন অপচিত হচ্ছে। যা দেখে একজন সাধারণ বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ভয়ে শিউরে ওঠার কথা। তাঁকে দেখান, কেমন করে রাশি রাশি উদ্বৃত্ত শস্য তারা উৎপাদনকারী গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন না করে সমুদ্রের জলে ফেলে দিচ্ছে। তাঁকে একবার দেখান কীভাবে মৃত মানুষের হাড়ের স্তূপের ওপর রাজপ্রাসাদ গড়ে উঠছে, তিনি নিজে এসে একবার চোখ মেলে দেখুন। নিজের চোখে দেখে তিনি একবার বলুন দেখি, ‘সব ঠিকঠাক চলছে’।

কেমন করে, কী করে এবং কোথা থেকে সব ঠিকঠাক থাকলো? এই হলো আমার প্রশ্ন, আপনারা চুপ কেন? বেশ, তাহলে আমিই বলে যাই।

৫. আর, আপনারা? যারা হিন্দু, তাঁরা বলে থাকেন যে এই জগতে যারা কষ্ট পাচ্ছে তারা গতজন্মে দুষ্কর্ম করেছিল বলেই ইহজন্মে তার ফল ভোগ করছে। ভালো, জানি, আপনারা তো বলবেন যে, বর্তমানে অত্যাচারীরা গতজন্মে ছিল সাধুপুরুষ, তাই তারা এ জন্মে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তার সুফল ভোগ করছে।

আমাকে তাহলে বলতেই হবে যে, আপনাদের পূর্বসূরিরা বড়ই ধূর্ত ও ধড়িবাজ ছিলেন। তাঁরা অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে চমৎকার সব তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন কীভাবে এই সব যুক্তি ও অবিশ্বাসকে দাবিয়ে রাখা যায়।

তাই, বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা যাক তাঁদের এই সব যুক্তি কতখানি ধোপে টেকে।

প্রখ্যাত আইনজীবী বা জুরিদের মতানুযায়ী অপরাধের দণ্ডবিধান কেবলমাত্র তিনটি বা চারটি

দিক থেকে সমর্থনযোগ্য।

১. মৃত্যুদণ্ড জাতীয় শাস্তিমূলক

২. চরিত্র সংশোনীম

অ্যাভয় দেখিয়ে বা নিক এবার বিচার করে দেখা যাক

২. ভরা বেষিয়ে নির্জী ৩. একমাত্র সংশোধনী আজ বিবেচিত হচ্ছে। কারণ সমাজের মূল গোতে ফিরিয়ে

০২. তাহলে এ জগতে অ নতুনটা কীরকম। আপনা হিসাবে জন্মগ্রহণ করাতে পারি চুরাশি লক্ষ বার তাকে নাকি

৭. এখন আমার লোককে আপনারা দেখেছেন হয়ে জন্মেছি।’ না, একটা দৃষ্টা

ন্যয়া করে আপনাদের। এখানে জোনাই অবকাশ নেই

আপনারা জানেন কি সা দারিলাই শাস্তি।

৮.আমি জানতে চাই, প্রস্তাবসমূহ যা মানুষকে আরও অপরাধী ব্যক্তি পরজন্মে গো আরও অপরাব করে যাবে-আইনপ্রণেতারা দিতেন, তাহা আপনাদের ঈশ্বর এমবা শিখতে হবে। আজ মানবজাতি

৯. তাহলে কলুন যে, এক যারে), তার জীবনের পরিণতির জন্মগ্রহণের ফলে যারা নিজো অবজ্ঞা ও উপেক্ষার পাত্র। ফ সমাজের কাছ থেকে পাওয়া বক কঠোর করে তুলেছে। বরুন যে একটা অন্যায় সমাজের বিশ্বচ্ছনেরাত প্রিয় বন্ধুগণ, এ হলো সু স্বত্বই কায়েম করে অশেষ ঋন চেয়েছে।

২. চরিত্র সংশোধনীমূলক

৩. ভয় দেখিয়ে বা নিরস্তীকরণমূলক

এবার বিচার করে দেখা যাক:

১. শাস্তিমূলক প্রাণদণ্ড আজকাল অগ্রসর দেশ ও চিন্তা-নায়কদের দ্বারা নিন্দিত ও পরিত্যক্ত এরমত্তা এই জরাৎ সৃষ্টি করতে জন্য? তা হলে তো তাঁর এবং হয়েছে।

২. ভয় দেখিয়ে নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কেও অনেকটা তাই।

৩. একমাত্র সংশোধনী-তত্ত্বই মানুষের অগ্রগতির পক্ষে প্রয়োজনীয় ও অপরিহর্তব্য শর্ত বলে আজ বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এর দ্বারা অপরাধীকে এক সুস্থ, স্বাভাবিক, শান্তিপ্রিয় যোগ্য নাগরিকরূপে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা যায়।

৬. তাহলে এ জগতে আমরা যাদের অপরাধী বলে মনে করি তাদের প্রতি ঈশ্বরের দণ্ডবিধানের নমুনাটা কীরকম? আপনারা বলবেন তিনি তাদের পরজন্মে গোরু বিড়াল গাছ ঝোপঝাড় বা পণ্ড হিসাবে জন্মগ্রহণ করতে পাঠিয়ে দেবেন। আপনারা নিজেদের মতো একটা হিসাব করে বলেছেন যে, চুরাশি লক্ষ বার তাকে নাকি মনুষ্যেতর প্রাণী বা বৃক্ষরূপে জন্মাতে হবে।

খাড়া করবে, কিন্তু মুসলমান ও প্রাক-না। হিন্দুদের মতো আপনারাও জাগোর সুদ্ধতির ফল ঈষায় ৬দিন ধরে অনেক মেহনত রেই বললেন, যে, সব কিছুই বহুত আনুন, জগতের ইতিহাসটার কী লোতে বলুন দেখি তো তিনি কী

৭. এখন আমার প্রশ্ন: এর ফলে এদের ওপর সংশোধনী পদ্ধতির প্রয়োগ করা হলো কি? কজন লোককে আপনারা দেখেছেন যারা বলবেন যে, ‘গতজন্মের কৃতকর্মের ফলে আমি পরের জন্ম গাধা হয়ে জন্মেছি?’ না, একটা দৃষ্টান্তও দেখাতে পারবেন না। দয়া করে আপনাদের পুরাণের গল্প-কাহিনী যেন টেনে আনবেন না। পুরাণ-প্রসঙ্গ তোলার এখানে কোনই অবকাশ নেই।

আপনারা জানেন কি সবচেয়ে বড়ো পাপ হলো এ জগতে গরিব হয়ে জন্মানো। দারিদ্র্যই পাপ, দারিদ্রাই শাস্তি।

৮. আমি জানতে চাই, অপরাধ-বিজ্ঞানী, আইনজীবী বা আইনপ্রণেতাদের তৈরি শাস্তিদানের প্রস্তাবসমূহ যা মানুষকে আরও অপরাধপ্রবণ করে তোলে- তাকে আপনারা কতদূর সমর্থন করবেন? অপরাধী ব্যক্তি পরজন্মে গোরু-ভেড়া হয়ে জন্মাবে যার ফলে অপরাধীরা অবধারিতভাবে আরও অপরাধ করে যাবে ধরুন, এই শাস্তি বিধানই যদি অপরাধ-বিজ্ঞানী, আইনজীবী ও আইনপ্রণেতারা দিতেন, তাহলে আপনারা তাকে কতটা সমর্থন করতেন?

আপনাদের ঈশ্বর এসব কথা ভেবে দেখেছেন কি? না, তাঁকেও চরম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখতে হবে? আজ মানবজাতি যে অবর্ণনীয় দুঃখবহন করে চলেছে, সেই অভিজ্ঞতার মূল্যেই কি? ১. তাহলে বলুন যে, একজন মানুষ গরিব বা মূর্খ হয়ে যে জন্মাচ্ছে (ধরুন, চামার বা ঝাড়ুদারের ঘরে), তার জীবনের পরিণতি কী হবে? সে দরিদ্র, তাই লেখাপড়া করতে পারেনি সমাজে উচ্চবর্ণে জন্মগ্রহণের ফলে যারা নিজেদেরকে এদের চেয়ে উঁচু জাতের বলে মনে করে, তাদের কাছে এরা ঘৃণা, অবজ্ঞা ও উপেক্ষার পাত্র। সকলেই এদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে। এদের অজ্ঞানতা, এদের দারিদ্র্য এবং সমাজের কাছ থেকে পাওয়া ব্যবহারই সমাজের প্রতি এদের মনোভাবকে স্বভাবতই বড়োই বিরূপ ও কঠোর করে তুলেছে।

এক শুরু করে বস্তিতে বস্তিতে আর ভা’ একবার তাঁকে দেখে যেতে। দিন শোষিত হচ্ছে, তাঁকে ধৈর্য করে পুঁজিবাদীদের শোষণে তাদের রক্ত দিনের পর দিন অপচিত হচ্ছে। যা কথা। তাঁকে দেখান, কেমন ময়ন্ত বণ্টন না করে সমুদ্রের জলে জ্বলের ওপর রাজপ্রাসাদ গড়ে খে দেখে তিনি একবার বলুন দেখি, নকলের। এই হলো আমার প্রশ্ন, জগতে যারা কষ্ট পাচ্ছে তারা ভাজানি, আপনারা তো বলবেন এজমে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তার বড়ই বৃর্ত ও ধড়িবাজ ছিলেন। তাঁরা কীভাবে এই সব যুক্তি ও অবিশ্বাসকে কতখানি ধোপে টেকে। অভাবিতান কেবলমাত্র তিনটি বা চারটি ছিদ্রে সিংহের মুখে মানুষ ছুঁড়ে জিনাত তবে তাকে ভালোভাবে এটি কি আনে সমর্থনযোগ্য?

ধরুন সে একটা অন্যায় কাজ করল, তার ফলভোগ কে করবে? ঈশ্বর? না, সে নিজে? না সমাজের বিদ্বজ্জনেরা? চেয়েছে।

প্রিয় বন্ধুগণ, এ হলো সুবিধাভোগীদের আবিষ্কার। এই তত্ত্ব খাড়া করে তারা তাদের দখলদারি স্বত্বই কায়েম করে অশেষ ক্ষমতা, অতুল ধনসম্পদ ভোগের অধিকার ও প্রভুত্বই বজায় রাখতে বিখ্যাত লেখক আপটন সিনক্লেয়ার সম্ভবত কোনো একস্থলে বলেছিলেন যে মানুষকে একবার অমরত্বে বিশ্বাসী করে তুলতে পারলেই তার হাত থেকে ধনসম্পদ ও তার যাবতীয় স্বত্নসামগ্রী খুব সহজেই কেড়ে নেওয়া যায়। ধর্ম-প্রচারক ও ক্ষমতাবানদের যৌথ উদ্যোগেই সমাজে আনা হয়েছে জেল, ফাঁসি, বেত, চাবুক, আর সেইসঙ্গে ধর্মমোহের জনচিত্তহারী তত্ত্বসমূহ।

১০. আমি জানতে চাই সমাজে কোনো ব্যক্তি যখন কোনো অন্যায় কাজ করছে, তখন আপনাদের ‘সর্বশক্তিমান’ ঈশ্বর তা বন্ধ করছেন না কেন? তিনি তো ইচ্ছা করলে অনায়াসেই তা করতে পারেন। কেন তিনি দুনিয়ার যত যুদ্ধবাজদের হত্যা করছেন না? কিংবা তাদের ভিতরকার জঙ্গী মনোভাব বা যুদ্ধোন্মাদনা, যুদ্ধের প্রকোপ ও প্রচণ্ডতাকে দমিত করছেন না? যে বিশ্বমহাযুদ্ধের ফলে পৃথিবীর বুকে ভয়ঙ্কর সর্বনাশ নেমে এসেছে, কেন সেই যুদ্ধ তিনি বন্ধ করছেন না? কেন যুদ্ধবাজদের তিনি হত্যা করছেন না? এবং এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের মানব সভ্যতার যে সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে, কেন তাকে প্রতিহত করছেন না? তিনি তো শুনি ‘সর্বশক্তিমান’, তবে একটু শক্তি করে কেন তিনি ব্রিটিশদের অন্তরে সামান্য একটু আবেগ-অনুভূতি সঞ্চারিত করছেন না যাতে তাঁরা পরাধীন ভারতকে মুক্ত করে রেখে যায়?

১১. কেন তিনি যাবতীয় পুঁজিবাদীদের অন্তরে একটুখানি পরহিতৈষণার উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলছেন না যাতে তারা তাদের যাবতীয় উৎপাদন যন্ত্রের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা-স্বত্ব ছেড়ে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীকে- না, শুধু শ্রমিকশ্রেণীকে কেন, সমগ্র মানবসমাজকেই পুঁজিবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করছেন না।

আপনারা সমাজতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার বাস্তবতা ও সম্ভাব্যতা নিয়ে তর্ক তুলতে চান। বেশ তো, আপনাদের সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ওপরেই তার রূপায়ণের ভার তুলে দিচ্ছি। তিনিই সে ব্যবস্থা বলবৎ করুন না। জনসাধারণ সাধারণভাবে যেমন জনকল্যাণ চায় তেমনি সমাজতন্ত্রের ইতিবাচক দিকগুলিকেও তুলে ধরতে চায়। আর আপনারা চান একে অসম্ভব ও অবাস্তব বলে এর বিরোধিতা করতে। আপনাদের ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ এসে তাহলে সব ঠিকঠাক করে দিয়ে যান না। তাই বলে দয়া করে ঘোরানো-প্যাঁচানো কোনো প্রশ্ন তুলবেন না। এখানে তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক।

আমি সোজাসুজি বলতে চাই যে, এই যে এদেশে ব্রিটিশ-শাসন চলছে, তা কিন্তু আপনাদের ঈশ্বরের ইচ্ছায় নয়, বরং চলছে ব্রিটিশরা শক্তিধর জাতি বলে এবং আমরা তাদের বিরোধিতা করতে সাহস করিনি বলেই। একথা ঠিক নয় যে ঈশ্বরের সাহায্যেই তারা আমাদের পদানত করে রেখেছে। বরং তা করতে পেরেছে রাইফেল গুলি বন্দুক ও পুলিস-মিলিটারির সাহায্যে, অধিকন্তু আমাদের স্বভাবগত উদাসীনতা, অলসতা ও মজ্জাগত নিশ্চেষ্টতার কারণেই। এসবের সুযোগ নিয়েই তারা সমাজের বুকে একের পর এক অন্যায় ঘটনা শোচনীয়ভাবে ঘটিয়ে যাচ্ছে, এবং জঘন্যতম নিষ্ঠুর এক শোষণ-ব্যবস্থার মাধ্যমে একজাতি কর্তৃক আরেক জাতির ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

১২. কোথায় আপনাদের ঈশ্বর? তিনি কি করছেন? মানবজাতির এই সব দুঃখ-দুর্দশা দেখে তিনি কি উল্লাস বোধ করছেন? তাহলে তিনি তো এক ‘নীরো’ বা ‘চেঙ্গিস’। তিনি নিপাত যান। তাঁর বিনিপাত হোক।

আপনারা কি জানতে চান এই জগতের উদ্ভব ও মানুষের সৃষ্টি হলো কি করে? বেশ, ঠিক আছে, বলছি। এ বিষয়ে চার্লস ডারউইন কিছু সন্ধানী আলো নিক্ষেপ করেছেন। তাঁর বই পড়ুন। সেই সঙ্গে সোহং স্বামীর ‘Common Sense’ বইটাও পড়ুন। এই বই দুটোতে আপনাদের প্রশ্নের অনেকখানি জবাব মিলতে পারে।

এ জগৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক ঘটনার ফল। বিভিন্ন বস্তুর আকস্মিক বিমিশ্রণে নীহারিকা আকারে প্রথম এই বিশ্বের উদ্ভব। কখন অবশেষে মানুষের আবির্ভাব ঘা পরবর্তী পর্যায়ে এই জগ সংঘর্ষ ও সংগ্রামে এরা শেষ এই হলো সংক্ষিপ্ততম সম্ভাব্য উ সম্ভবত আপনার আরও কেন অন্ধ বা খড় হয়ে জন্মায়।ি ফলভোগ করছে। কিন্তু এ ব্যাপ জৈব বা প্রাকৃতিক ঘটনা, কোর বর্তায় পিতা-মাতার ওপরেই। সেহেতু শিশুটি বিকলাঙ্গ হয়ে জা সেটি যদিও নেহাৎ ছেলেমানুষী কীভাবে মানুষ তাকে বিশ্বাস কল মানুষ ভূত প্রেত-শিশাচ ও অ হলো এই যে ঈশ্বর-বিশ্বাদে সরী শাস্ত্রও ভালোরকমভাবেই গড়ে কয়েকজন চরমপন্থী প্রগ সম্প্রদায়ের উদ্ভাবন-শক্তির ওপ রাখার স্বার্থে এবং মানুষকে চির। এবং তাঁরই অনুমোদন সাপেক্ষে যদিও এসব ধর্মের মূল উল্লে মত নির্বিশেষে পালাক্রমে যাকা সমর্থকেই পরিণত হয়েছিল। প্রা তাই, ঈশ্বরের উৎপত্তি সম্প মানুষের দুর্বলতা, মানুষের অসন হতে পারেনি এবং সমস্ত বিপদ-এককঙ্কার্মিক উদয়ের সৃষ্টি করে সাম্পানের দিনে তাঁর জজরোধ সে বিয়ান বিচিত্রভাবে চিহ্নিত হয়েছেন মানুহ প্রচলিত সমাজ-কবস্থার শা শক্তির কথা এইজন্যেই বলা হয় আর যখন তাঁর পিতৃসুলভবন্ধুদের যারা প্রতারিত, আ ভেবে, সে শাস্তি ও সান্ত্বনা পান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। ইচ্ছা হলেই তিনি এসে তাকে কি প্রথম এই বিশ্বের উদ্ভব। কখন? ইতিহ তিহাস পড়ে জেনে নিন। এই পদ্ধতি দ্ধতিতেই কালক্রমে প্রাণীজগৎ ও – বলেছিলেন যে মানুষকে একবার প্রদ ও তার যাবতীয় স্বত্বসামগ্রী খুব নব উদ্যোগেই সমাজে আনা হয়েছে তত্ত্বসমূহ।

অবশেষে মানুষের আবির্ভাব ঘটল। ডারউইনের ‘Origin Origin of Species’ পড়ুন।

পরবর্তী পর্যায়ে এই জগতের বিকাশ ও বিবর্তন ঘাটেছে প্রকৃতির সংঘর্ষ ও সংগ্রামে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির উপর মানুষের। এই হলো সংক্ষিপ্ততম সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কৃতির আধিপত্যে। সঙ্গে মানুষের প্রতিনিয়ত । প্রকৃতির রহস্য বিশ্লেষণের ন্যায় কাজ করছে, তখন আপনাদের জলে অনায়াসেই তা করতে পারেন। দের ভিতরকার জঙ্গী মনোভাব বা বিশ্বমহাযুদ্ধের ফলে পৃথিবীর বুকে না। কেন যুদ্ধবাজদের তিনি হত্যা সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে, কেন তাকে শক্তি করে কেন তিনি ব্রিটিশদের তাঁরা পরাধীন ভারতকে মুক্ত করে এর উদ্দীপনা জাগিয়ে পরহিতৈষণার না-স্বত্ব ছেড়ে দিয়ে জিগত মালিকানা একেই পুজিবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত

আ নিয়ে তর্ক তুলতে চান। ভার তুলে দিচ্ছি। তিনিই বেশ নিই সে ব্যবস্থা তেমনি সমাজতন্ত্রের ইতিবাচক নাও অবাস্তব বলে এর বিরোধিতা ককরে দিয়ে যান না। তাই বলে দয়া এতই অপ্রাসঙ্গিক। সন চলছে, তা কিন্তু আপনাদের আমরা তাদের বিরোধিতা করতে আমাদের পননত করে রেখেছে। হরির সাহায্যে, অধিকন্তু আমাদের শই। এসবের সুযোগ নিয়েই তারা যাচ্ছে, এবং জঘন্যতম নিষ্ঠুর এক মানবিক অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। প্রজাতির এই সব দুঃখ-দুর্দশা দেখে ‘জেন্সিস’। তিনি নিপাত যান। তাঁর উহলো কি করে? বেশ, ঠিক আছে, জেছেন। তাঁর বই পড়ুন। সেই সঙ্গে হতে আপনাদের প্রশ্নের অনেকখানি মিশ্রণে নীহারিকা আকারে সম্ভবত আপনারা আরও একটি প্রশ্ন করতে পারেন। হয়তো আপনারা বলবেন যে, কোনো শিশু কেন অন্ধ বা খঞ্জ হয়ে জন্মায়। নিশ্চয়ই পূর্বজন্মে সে কোনো দুষ্কর্ম করে থাকবে, তাই এ জন্মে সে তার ফলভোগ করছে। কিন্তু এ ব্যাপারটা নিয়ে জীববিজ্ঞানীরা আগেই আলোচনা করেছেন। এটা নিছক জৈব বা প্রাকৃতিক ঘটনা, কোনো দৈব ব্যাপার নয়। জীব-বিজ্ঞানীদের মতে পুরো ব্যাপারটার দায় সেহেতু শিশুটি বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাল। স্বভাবতই এই সূত্রে আপনারা হয়তো আর একটি প্রশ্ন তুলবেন। বর্তায় পিতা-মাতার ওপরেই। শিশুটির জন্মের পূর্ব থেকেই শারীরিকভাবে তারাই যেহেতু দায়ী সেটি যদিও নেহাৎ ছেলেমানুষী বা শিশুসুলভ প্রশ্ন। সেটি হলো যদি ঈশ্বর না-ই থাকেন তবে কীভাবে মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করতে শিখল? আমার সংক্ষিপ্ত ও সাফ জবাব হলো, যেমন এককালে মানুষ ভূত-প্রেত-পিশাচ ও অশুভ আত্মায় বিশ্বাস করতে শিখেছে এও অনেকটা তেমনি। তবে তফাৎ হলো এই যে ঈশ্বর-বিশ্বাস সর্বজনীন এক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে এবং তাকে ঘিরে বেশ কিছু দর্শন শাস্ত্রও ভালোরকমভাবেই গড়ে উঠেছে।

কয়েকজন চরমপন্থী প্রগতিবাদী চিন্তাবিদদের মতো আমি এর কারণ অনুসন্ধানে শুধুমাত্র।শোষক সম্প্রদায়ের উদ্ভাবন-শক্তির ওপর আরোপ করতে যাব না- যাঁরা তাঁদের শোষণ-প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবং মানুষকে চির-পদানত করে রাখার জন্যেই এক পরম সত্তার অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁরই অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিশ্বের প্রভুত্ব ও যাবতীয় সুখ-সুবিধা ভোগ করছেন।

যদিও এসব ধর্মের মূল উদ্দেশা নিয়ে বলার কিছু নেই, কারণ যাবতীয় ধর্ম-বিশ্বাস, ধর্ম-তন্ত্র দল-মত নির্বিশেষে পালাক্রমে যাবতীয় শোষণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তথা অত্যাচারী শাসক শ্রেণীর সমর্থকেই পরিণত হয়েছিল। প্রত্যেক ধর্মমতেই রাজার প্রতি বিদ্রোহ পাপ বলে গণ্য হয়েছে।

তাই, ঈশ্বরের উৎপত্তি সম্পর্কে আমার নিজস্ব মত হলো এই যে, মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, মানুষের দুর্বলতা, মানুষের অসম্পূর্ণতা এমন যে, মানুষ সাহসের সঙ্গে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেনি এবং সমস্ত বিপদ-আপদকে সত্যকার মানুষের মতো প্রতিহত করতে পারেনি বলেই সে এক কাল্পনিক ঈশ্বরের সৃষ্টি করেছে, বিপদের দিনে সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে উদ্ধার পেতে এবং সুখ সম্পদের দিনে তাঁর রুদ্ররোষ থেকে আত্মরক্ষা করতেই মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি করেছে।

ঈশ্বর তাঁর স্বীয় বিশ্ব-বিধান এবং পিতৃসুলভ প্রভুত্বের মহানুভবতা নিয়ে এক মহত্তম চরিত্ররূপে বিচিত্রভাবে চিত্রিত হয়েছেন। তাঁর ঐশ্বরীয় শক্তি ও রুদ্ররোষের কথা এই জন্যেই বলা হয়, যাতে মানুষ প্রচলিত সমাজব্যবস্থার পক্ষে বিশেষ বিপদস্বরূপ হয়ে উঠতে না পারে। ঈশ্বরের এই প্রতিরোধক শক্তির কথা এইজন্যেই বলা হয়। আর যখন তাঁর পিতৃসুলভ গুণাবলীর প্রশস্তি কীর্তন করা হয় তখন তাঁকে কখনো পিতা, কখনো মাতা, কখনো-বা ভ্রাতা-ভগ্নী বন্ধু-ব্রাতা রূপেই তুলে ধরা হয়।

বন্ধুদের দ্বারা প্রতারিত, আত্মীয়ের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে মানুষ যখন চরম বিপদে পড়ে, তখন এই ভেবে সে শাস্তি ও সান্ত্বনা পায় যে, এক চিরকালীন পরম বান্ধব আছেন যিনি তাকে দয়ার ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, তিনি ‘সর্বশক্তিমান’ ও ‘বিপত্তারণ’। এবং তিনি ‘ইচ্ছাময়’। ইচ্ছা হলেই তিনি এসে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। প্রকৃতপক্ষে সমাজ সৃষ্টির আদিম যুগে হয়তো এর দরকার ছিল। তখন মানুষের দুঃখ বিপদে ‘ঈশ্বর’ বড়োই এক সহায়ক শক্তি বা চমৎকার দাওয়াই ছিল।

এই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সমাজকে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ বা যুদ্ধ-ঘোষণা করে যেতে হবে। সেইসঙ্গে পুতুল-পূজা বা ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। যখন মানুষ নিজের পায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়াতে শিখবে এবং সত্যকার বাস্তববাদী হবে, তখন তাকে এইসব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সত্যিকার মানুষের মতোই যতকিছু দুঃখ-দুর্দশা ও যাবতীয় প্রতিকূল অবস্থাকেও জয় করতে হবে।

এই হলো আমার বর্তমান অবস্থা। তাই, বন্ধুগণ এ আমার অহঙ্কার নয়, এ হলো আমারই চিন্তার নিজস্ব পদ্ধতি যার ফলে আমি নাস্তিক হয়ে উঠেছি।

যে ঈশ্বর-বিশ্বাস ও প্রাত্যহিক প্রার্থনাকে আমি নিতান্ত স্বার্থপরতা ও নীচতার দৃষ্টান্ত বলে মনে করি, সেই ঈশ্বর-বিশ্বাস ও প্রাত্যহিক প্রার্থনা আমার বর্তমান অবস্থার পক্ষে সহায়ক, না, আরও শোচনীয় রূপে বিপর্যয়কর হবে, তা আমি জানি না।

আমি বই পড়ে জেনেছি যে, নাস্তিকেরা সর্ব বিপদে সাহসের সঙ্গেই রুখে দাঁড়ায়। কাজেই, আমিও যাবতীয় বিপদ তুচ্ছ করে শেষ পর্যন্ত মাথা উঁচু করেই দাঁড়াতে চাই, এমন কি ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও।

দেখা যাক, আমি তা পারি কি না।

——————-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating