
ইতিহাসের পাতায় ১৯৪৭ সালের আগস্ট সাধারণত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর রঙে আঁকা থাকে। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা লুকিয়ে ছিল সাধারণ মানুষের হৃদয়ের যন্ত্রণা, সাহস এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে। কলকাতায় সেই চেতনা এক ঐতিহাসিক ও গভীর আবেগঘন মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল রেড রোডের বুকে অনুষ্ঠিত এক ঈদের নামাজে—যা ছিল যেমন এক ধর্মীয় অনুশীলন, তেমনই এক অবিভক্ত দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার ঘোষণা।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ছিল স্বাধীনতার সূচনা এবং সেই দিনটি এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বহন করেছিল। ঐতিহাসিক সেই শুক্রবার ছিল ‘আলবিদা জুম্মা’—রমজানের শেষ পবিত্র জুম্মা। আর মাত্র তিন দিন পরে, ১৮ আগস্ট, এসেছিল ঈদ-উল-ফিতর। কিন্তু দেশভাগের বিভীষিকায় সেই ঈদের আনন্দ মিশে গিয়েছিল শোক, বিভাজন ও মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে। ভারতীয় মুসলমানরা আবারও এক গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন—যে সংকট বহু বছর ধরে তাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল।
সেই সময় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো অক্টারলোনি মনুমেন্টের (বর্তমান শহিদ মিনার) বিশাল ময়দানে। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী ঈদের জামাত যত বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ হয়, ততই তা কাম্য। সেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো অগণিত মানুষের দৃশ্য যেন সব ভেদাভেদকে মুছে দিত।
কিন্তু দেশভাগের তিক্ত বাস্তবতা সৃষ্টি করেছিল এক গভীর অস্তিত্বের সংকট। বহু দেশপ্রেমিক মুসলমান, যারা ভারতের বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরা এক কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন—
কীভাবে তাঁরা সেইসব মানুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াবেন, যারা দেশের বিভাজনকে সমর্থন করেছিল?
কীভাবে তাঁরা এমন এক ইমামের পিছনে নামাজ পড়বেন, যার খুতবায় হয়তো নতুন সীমান্তের জন্মকে সমর্থন জানানো হবে?
এই দেশপ্রেমিক মুসলমানদের কাছে ধর্ম ও দেশপ্রেম আলাদা কিছু ছিল না—দুটোই ছিল এক ও অভিন্ন। বিভেদের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা তাঁদের কাছে ছিল অসম্ভব।
দুটি জামাত, এক দেশ–
এইভাবেই ইতিহাস এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। ১৯৪৭ সালের ঈদে কলকাতায়, এবং সম্ভবত সমগ্র ভারতেই, প্রথমবারের মতো দুটি পৃথক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
একটি ছোট অংশ ঐতিহ্যবাহী অক্টারলোনি মনুমেন্টের মাঠে নামাজ আদায় করলেও, বিপুল সংখ্যক দেশপ্রেমিক মুসলমান বেছে নিয়েছিলেন অন্য এক স্থান—রেড রোড।
সেই আর্দ্র আগস্টের সকালে হাজার হাজার মুসলমান রেড রোডের বিস্তীর্ণ পথে তাঁদের জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যখন তাঁরা কিবলামুখী হয়ে সিজদায় নত হলেন, তখন তা শুধু ধর্মীয় কর্তব্য পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ছিল ভারতের মাটির সঙ্গে নিজেদের অটুট সম্পর্ককে পুনর্নিশ্চিত করার এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। তাঁদের সেই নামাজ ছিল বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ বজ্রনিনাদের মতো প্রতিবাদ—এক ঘোষণা যে তাঁদের পরিচয় চিরকাল ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী ভারতের বুনোটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকবে।
এক ঐতিহ্যের সূচনা-
পরের বছর ঈদের নামাজ আবার শহিদ মিনারের ময়দানে ফিরে যায়। ফলে ১৯৪৭ সালের রেড রোডের ঈদের নামাজ ইতিহাসে এক অনন্য ও উজ্জ্বল মুহূর্ত হয়ে থেকে যায়।
এটি আজও সেই লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মুসলমানের দৃঢ় অবস্থানের স্মারক, যারা দেশভাগকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাঁদের বিশ্বাস ও ধর্মচর্চার মাধ্যমেই। রেড রোডের ঈদের নামাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভারত শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দেশ নয়; এটি সেইসব মানুষের বেছে নেওয়া, রক্ষা করা এবং দোয়া ধারণ করা দেশ, যারা কখনও তাঁদের ধর্মকে দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হতে দেননি।
পুনশ্চ: ইসলামী চান্দ্র বর্ষপঞ্জি সৌর বর্ষপঞ্জির তুলনায় প্রায় ১০-১১ দিন ছোট হওয়ায়, যখনই ঈদের সময় বর্ষাকালের সঙ্গে মিলে যেত এবং শহিদ মিনারের মাঠ জলমগ্ন হয়ে পড়ত, তখন অস্থায়ীভাবে রেড রোডে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো।
পরবর্তীকালে অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেন আবুল হাসান ও খিলাফত কমিটি। হাশিম আব্দুল হালিম, আহমেদ সাঈদ মালিহাবাদি-র সহায়তা এবং জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে রেড রোডে স্থায়ীভাবে ঈদের নামাজ পুনরায় চালু করা হয়।
লেখক:- ডাঃ ফুয়াদ হালিম
@freemang2001gmail-com



