হাততালি আর কন্ঠস্বর এক নহে। হাততালি যখন অধিক হয় তখন বুঝিতে হইবে কন্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হইতেছে।
সক্রেটিসকে শতসহস্র হাততালির মাঝে হেমলক( বিষ )পানে মৃত্যুবরণে বাধ্য করা হইয়াছিল। সক্রেটিসের অপরাধ ছিল, আথেন্সের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের কদর্য দিকগুলিকে জনসমক্ষে আনয়ন করা। প্লেটো তাহার ভাষ্যে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়াছেন। জনগণ যখন তাহাদের ভুল বুঝিলো তখন কয়েকশত বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে। তখন হাততালি কন্ঠস্বরে পরিণত হইল।
গ্যালিলিও খ্রীস্টান সমাজের ‘বেদে’র বিরুদ্ধে গিয়া বিজ্ঞানের নূতন ধারা উন্মোচন করিয়াছেন। পরিণতিতে তাহাকে লক্ষ করতালি সহযোগে নরক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইলো। জনতা যখন বুঝিলো তখনও কয়েকশত বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে। কন্ঠস্বর সেদিন জোরালো হইলো।
জার্মানির হিটলারের নির্বাচনে জয়ের একটি রূপরেখা-
1933 মার্চ- মোট আসন 647
হিটলার পান 288 টি
1933 নভেম্বর – মোট আসন 631
হিটলার জয়ী 631 টি
1936 সাল- মোট আসন 741 টি
হিটলার জয়ী 741 টি তে
1938 সাল- মোট আসন 813 টি
হিটলার জয়ী 813 টি তেই।
তারপর শুরু হইল বিশ্বযুদ্ধ। বাকিটা ইতিহাস। হিটলার যখন ইহুদিদের খুঁজিয়া খুঁজিয়া হত্যা করিত তখন জনতা করতালিতে ভরাইয়া দিত। তাহার একমাত্র পুঁজিই ছিল জার্মান জাতীয়তাবাদ। সত্যভাষণকারী আইনস্টাইনকেও দেশ ছাড়িয়া পলায়ন করিতে হইয়াছিল। পরিণতিতে কয়েক লক্ষ জার্মান নাগরিকের প্রাণের বিনিময়ে একটা যুগের অবসান ঘটিলো।
সুতরাং জনসমর্থন সর্বদাই জ্ঞান বা সত্য অপেক্ষা শত যোজন পশ্চাতে অবস্থান করিয়া থাকে। যে জনগণ রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত নহে তাহার সমর্থন বা অসমর্থন কোনোটারই কোনো মূল্য নাই। আর যেটুকু মূল্য রহিয়াছে তাহা ধ্বংসাত্মক বই অন্যকিছু নহে। তাহার উপরে রহিয়াছে শাসকের জয়ী হইবার কৌশলের উপর প্রশ্ন।
অতএব জনগণ রাজনৈতিক ভাবে যতদিন না শিক্ষিত হইতেছে ততদিন তাহার সমর্থন আদায়ের মূল্য যাহা, অনাদায়ের মূল্যও তাহাই। কারণ একবার করতালি দিবার পর আর কিছুই তাহার হাতের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে না। চাতকের ন্যায় সুদীর্ঘ কাল তাহাকে অদৃষ্টের দিকেই তাকাইয়া থাকিতে হয়। এই করতালি যতদিন না কন্ঠস্বরে রূপান্তরিত হইতেছে ততদিন জনগণের মুক্তি নাই।
@COLLECTED



