আজ ২৬ শে ডিসেম্বর। আজকের দিনেই পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘Really Existing’ থেকে ইতিহাসের পাতায় স্থান নেয়। এই ঘটনাটা আজ প্রায় তিন দশক পরেও এতই পীড়াদায়ক বামপন্থীদের কাছে, এমনকি যারা সোভিয়েত বিরোধী বামপন্থী তাঁদের কাছেও যে এটা নিয়ে তাঁরা খুব একটা আলোচনা করেন না, আর দক্ষিণপন্থীরা তো আরও আলোচনা করেন না, কারণ তাঁরা জানেন ভেতরে ঢুকে আলোচনা করতে গেলেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়বে যে মুক্ত গণভোটে প্রায় ৭০% মানুষ ইউনিয়ন বজায় রাখতে রায় দিয়েছিল এবং তাকে অমান্য করেই ইয়েলেতসিন অসংসদীয় ভাবে ইউনিয়ন ভেঙে দেন। যাই হোক, এইসব উঁচু স্তরের রাজনীতি নিয়ে আমি খুব একটা আগ্রহী নই। আমি আগ্রহী প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে। বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ এই দিক থেকে খুবই ভাগ্যবান। প্যাট্রিস লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সেরিনা জাহান তাঁর অনবদ্য রচনা ‘ধূসর মস্কো’ পতনের সময় ফুটিয়ে তুলেছেন আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক একই কাজ করেছেন ‘ইতিহাসে স্বপ্নভঙ্গ’ তে। বিরাট কিছু লেখার পরিসর ফেসবুক নয়। কিন্তু আমি চাই বাম-দক্ষিণ সকল মানসিকতার মানুষ এই বই দুটো পড়ুন। ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ অপেক্ষাকৃত পরিচিত। তাই ‘ধূসর মস্কো’ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে স্বপনভঙ্গের দিনগুলোকে আমরা যারা সোভিয়েত দেখিনি, যারা এই যুগের ২০০৮ পরবর্তী ‘নিউ লেফট’, তাদের কাছে বিশেষ করে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা করে ইতিহাসের ছাত্রের দায়িত্ব শেষ করছি।
‘ধূসর মস্কো’
————–
‘পৃথিবীর মানচিত্রের এক-ষষ্ঠাংশ জুড়ে যে লালরঙা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে দেশ ছিল, তার লাল রংটা গেল উবে। শুধু রঙ বদলই নয়, গোটা দেশটাই উধাও হয়ে গেল। যে বিশ্বাস, যে আদর্শকে ভিত্তি করে একাধিক সোভিয়েত প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল, তা উত্তরসূরিরা পরিত্যাগ করল, পুরোনো মোজার মত। ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘কমরেড’ শব্দগুলি রুশ ভাষায় গালাগালের সমার্থক হয়ে উঠল ! সময় এমনই শক্তিমান…সোভিয়েত শিশু, তাদের বাবা, মা মামা-মাসি, দিদিমা দাদু সকলকে এক ভোগী জীবনের লোভ দেখানো হল। পুনর্নির্মানের তোড়ে পুরোনো যা ছিল ভেঙে দেওয়া হল, জীর্ণ বলে উপহাস করল সকলে। অস্বীকার করল পুরোনো নীতি আদর্শের প্রয়োজনীয়তাকে।…সোভিয়েত কিশোররা তখন সাবওয়ে আর মেট্রো স্টেশনের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকত, গায়ে জোর খাটিয়ে দু-দশ ডলার রোজগারের ধান্দায়, সোভিয়েত কিশোরীরা তখন বিদেশী ছাত্রদের হস্টেলে ঘুরে বেড়াত। কারণটা একই- ডলার রোজগার। তবে এক্ষেত্রে গায়ের জোর খাটিয়ে নয়, দেহের মোহে কাবু করে। আর এইসব ছেলেমেয়ের মায়েরা তখন দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।…একে একে সমস্ত জিনিস দোকান থেকে তখন উধাও হয়ে যাচ্ছে। চিনি, দুধ, দুগ্ধজাত সামগ্রী, পাউরুটি, চাল, ময়দা, আলু, পেঁয়াজ, ডিম, মাংস, সাবান, জুতো, জামাকাপড়, বাসনপত্র-সবই তখন অমিল। দোকানে তখন নিত্যনতুন ‘চমক’। আজ থেকে দুধের সরবরাহ অনিয়মিত। মাংসের সাপ্লাই নেই।…’সায়ুজ সোভিয়েতস্কিখ সাৎসিয়ালিস্তিচেস্কিখ রিসপুবলিক’। ইংরেজি অনুবাদে – ইউনিয়ন অফ সোভিয়েট সোসালিস্ট রিপাবলিকস। পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক নিরক্ষর নয়-সর্বজনীন শিক্ষানীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন। মেট্রোতে, এসকালেটোরে, দোকানের লাইনে, সবজায়গায় তাঁরা বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে। ধৈর্যশীল, মার্জিত, শিক্ষিত এই সোভিয়েত নাগরিকরা আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে পালটে গেল। চারপাশের পরিস্থিতি তাদের পালটে যেতে বাধ্য করল। এক টুকরো মাংসের ওপর দশ-বারোজন হামলে পড়ত। কুকুরের মতো টানাটানি করত। খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে ছাত্র-শিক্ষক ধাক্কাধাক্কি করত।…সকালবেলায় নয় নম্বর ব্লকের পাশের রাস্তাটা দিয়ে ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি। দেখলাম, একজন বৃদ্ধা আস্তাকুড়ের ওপর উপুড় হয়ে কি যেন খুঁজছেন। পেনশনের সামন্য কটা রুবলে তাদের চলে না, তাই এদিক ওদিক খুঁটে খুঁটে একটু উপরি রোজগারের চেষ্টা। নিচু মুখে বৃদ্ধা ময়লা ঘাঁটছেন। হঠাৎ বৃদ্ধা মুখ তুলে সোজাসুজি আমার দিকে তাকালেন। আমি একে চিনি। আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস পড়াতেন। লজ্জার হাসি হেসে কেমন সংকুচিত ভাবে তিনি মুখটা আবার নিচু করে নিলেন। সেদিন আর ক্লাস করতে পারলাম না। হস্টেলে ফিরে এলাম।…তারপর লেনিনের রশিয়ায় নিষিদ্ধ হল কমিউনিস্ট পার্টি। জারের রাশিয়ায় যেমন নিষিদ্ধ ছিল কমিউনিস্ট পার্টি, ৯১ -এ সেই একই সিদ্ধান্ত নিলেন বরিস নিকোলায়েভিচ ইয়েলৎসিন।…নতুন রাশিয়ায় নতুন বছর। নতুন নতুন চমকে ভরপুর। অধিকাংশ জিনিসপত্রের ওপর থেকে মুল্য নিয়ন্ত্রণের লাগাম তুলে নেওয়া হল। জিনিসপত্রের দাম একলাফে ৩০০ গুণ বেড়ে গেল। দোকান প্রায় শূণ্য। সামান্য যা জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছিল তা কেনার সামর্থ্য তখন অধিকাংশেরই নেই।…ক্রেমলিনের কর্তারা তখন ভিক্ষার ঝুলি হাতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মস্কোর দোকানে দোকানে ফাঁকা তাকগুলো ভরে উঠল তখন বিদেশী মদের বোতল, বিদেশী সিগারেটের প্যাকেট, বিদেশী টিনফুড, বিদেশী পেপসি, কোকাকোলায়। …মেট্রো স্টেশনের সুড়ঙ্গে বিদেশী জামাকাপড়ের স্তুপ থেকে মস্কোবাসী ছোঁ মেরে পোশাক কিনতে লাগল। এতদিনে পশ্চিমিদের মতো সাজগোজ করে একটু ভদ্রস্থ হওয়া যাবে। মস্কোর ফুটপাথ ভরে উঠল কিয়স্কে। সেই কিয়স্কে রকমারি বিদেশী পণ্য। মস্কোবাসীর কেনার সাধ্য না থাকলেও দুচোখ ভরে দেখেও সুখ, একটু ছুঁয়েও সুখ। শুধু খাবার দাবার, জামাকাপড়ই নয়, পশ্চিম থেকে আসা শস্তা পর্ণো ও খেলো ডিটেকটিভ বইয়েও মস্কো ভরে গেল। রূশ চিরায়ত সাহিত্য বা আধুনিক রুশ সাহিত্যিকের বই প্রায় উধাও হয়ে গেল বাজার থেকে। লোকজন তখন গোগ্রাসে পর্ণোগ্রাফি বা তৃতীয় শ্রেণীর ডিটেকটিভ বই গিলছে। মস্কোর প্রেক্ষাগৃহগুলিতেও তখন অতি নিচুমানের মার্কিনি ছবির ছড়াছড়ি। রুবলের অভাবে রুশ পরিচালকরা হাত-পা গুটিয়ে বসে। সেইসব মার্কিন ছবি দেখতে লাগল রুশ কিশোর কিশোরী, যুবক-যুবতীরা। মস্কোর রাস্তায় ফিল্মি ধাঁচের ছিনতাই, মারপিট, ধর্ষণের সংখ্যা এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল।ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানে ঢোকার জন্য তখন বিশাল লাইন। সেই লাইনের ছবি তুলতে আসত সিএনএন, বিবিসির লোকেরা – দেখো রাশিয়ার আজ কি দশা ! মস্কোর লোকেরা ম্যাকডোনাল্ডসের দৌলতে তাও এতদিনে খেয়েদেয়ে বাঁচার সুযোগ পাচ্ছে। ইরিনা আর আমি এক বিকেলে গিয়েছি ম্যাকডোনাল্ডসে। যথারীতি লম্বা লাইন। পাশের রাস্তাটা দিয়ে এক মাতাল রুশি বুড়ি যাচ্ছিল। লাইনের কছে এগিয়ে এসে বলল, ‘মূর্খের দল, বাড়ি গিয়ে পাউরুটি আর সসেজ কিনে খাও। ওই একই খাবার কায়দা করে খাওয়ার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে, লাইনে দাঁড়িয়ে এত কষ্ট পোয়ানোর মানেটা কি ?’…..সমাজতন্ত্রী তথা কমিউনিস্টরা ইতিমধ্যে নড়েচড়ে বসেছেন। ইয়েলৎসিন তার কিছুদিন আগেই রাশিয়াতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন কমিউনিস্ট পার্টিকে। সেই নিষিদ্ধ পার্টির নাছোড় কিছু সদস্য মে দিবস বা নম্ভেম্বর বিপ্লবের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বেরিয়ে পড়লেন পথে। তাঁদের অধিকাংশেরই জন্ম স্তালিন জমানার প্রথমভাগে। কোনো লাভের আশায় বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাঁরা সিপিএসইউ এর সদস্যপদ গ্রহণ করেননি। কমিউনিজম ছিল তাঁদের বিশ্বাস, স্বপ্ন, জীবনযাপনের অঙ্গ। একের জায়গায় দশজন ইয়েলৎসিনের কোনো হুমকি তাঁদের সেই বিশ্বাসকে কেড়ে নিতে পারেনি। লেনিনের, স্তালিনের ছবিওয়ালা প্ল্যাকার্ড হাতে দৃঢ় পায়ে শোভাযাত্রা করে তাঁরা এগিয়ে গেছেন রেড স্কোয়ারের দিকে, ১ মে বা ৭ নভেম্বর, যেমন যেতেন আগে বরাবর, ঠিক তেমনই।’
ছবি – মস্কোর রাস্তায় এক তরুণ বিক্ষোভকারী
✍ অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত



