আগুনে পুড়ে ছাই বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহৃত ৪০০০ ইভিএম
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি’র অভূতপূর্ব জয়ের ঠিক এক মাস সাত দিন পরে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল প্রায় ৪০০০ ভোটিং মেশিন। ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার (১০ জুন)। গত বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহার করা এই মেশিনগুলি রাখা ছিল কলকাতার আলিপুরে জেলা পরিষদ অফিসের নয় ও দশ তলার ঘরে। প্রথমে আগুন লাগে ১০ তলা বাড়িটির তিন অথবা চার তলায়। সেখান থেকে আগুন ছড়ায় বাড়িটির নয় ও দশ তলায়। আশ্চর্যের বিষয় হল ছয়, সাত এবং আট তলায় কোনও আগুন লাগে নি। চার তলা থেকে আগুন কিভাবে ছয়, সাত এবং আট তলাকে টপকে সরাসরি নয়-দশ তলায় পৌঁছল, তার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি রাজ্যের সদ্য নিযুক্ত দমকল মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরি।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে মন্ত্রী বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে যে, আগুন প্রথমে লেগেছিল তিন অথবা চার তলায়। সেখান থেকে নয় ও দশ তলায় ছড়িয়েছে। মাঝের ছয়, সাত এবং আট তলায় কেন আগুন লাগে নি তা ফরেন্সিক পরীক্ষার আগে বলা যাবে না।“
আগুন লেগেছিল বুধবার সকাল ৯.৫০ মিনিট নাগাদ। ঘটনার পরে ২৪ ঘন্টা কেটে গেলেও ফরেন্সিক টিম কেন নয় ও দশ তলায় পৌঁছতে পারল না, সে বিষয়ে দমকল মন্ত্রীর ব্যাখ্যা, “বাড়িটি এখনও গরম হয়ে রয়েছে। তাই ফরেন্সিক টিম ঢুকতে পারে নি।“ দক্ষিন ২৪ পরগণা জেলার ১০ টি বিধানসভা কেন্দ্রে পুড়ে যাওয়া এই ইভিএম মেশিনগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল।
রহস্য ১ঃ
আগুন কিভাবে ছয়, সাত এবং আট তলাকে টপকে নয় ও দশ তলায় উঠে পড়ল, ঘটনার ৪৮ ঘন্টা পরেও তার কোনও সরকারি ব্যাখ্যা মেলেনি। দক্ষিন ২৪ পরগণার কোন কোন বিধানসভা কেন্দ্রে ওই ৪০০০ টি ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই কেন্দ্রগুলিতে কোন রাজনৈতিক দল জিতেছিল, সেই বিষয়েও সরকারি তরফে এখনও পর্যন্ত কিছু বলা হয় নি।
রহস্য ২ঃ
সংবাদ সংস্থা পিটিআই -এর খবর পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি দৈনিক সংবাদপত্র ব্যবহার করে। অথচ এত বড় একটি খবর এই রাজ্যের কোনও সংবাদপত্রের কাছে গুরুত্ব পেল না। এমনকি গত ১৫ বছরে যে দুটি বাংলা দৈনিক প্রায় তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপত্রে পরিণত হয়েছিল, তারাও খবরটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নি। এই দুটি পত্রিকাই অবশ্য এখন কায়মনোবাক্যে বিজেপি’র গুণগ্রাহী!
রহস্য ৩ঃ কিছু প্রয়োজনীয় স্মৃতিচারণঃ
তৃণমূল সহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র জয়ের পিছনে ভোটিং মেশিনে কারচুপি করার অভিযোগ এনেছিল, সেই খবর এখন বাসি হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের দুই অফিসার যে ভোটের পরেই বিজেপি সরকারের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন, সেই খবরও এখন পুরনো। প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যে বিজেপি’র জয়ের অন্যতম কৌশল ছিল, তা নিয়েও অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ কম হয় নি।
কিন্তু একটি বিষয় আলোচনায় কম এসেছে, যা সরজমিন পত্রিকার পাঠকদের কাছে তুলে ধরা জরুরি। একজন ভোটার যখন ভোট কেন্দ্রে যান, তখন তিনি কতগুলি ধাপ পেরিয়ে তবে ভোট দিতে পারেন। প্রথমে হয় আইডেন্টিটি ভেরিফিকেশন, ফর্ম ১৭এ পুরণ করা, সই অথবা আঙ্গুলের ছাপ দেওয়া, আঙ্গুলে কালির দাগ লাগানো। এরপর ভোটিং মেশিনের কন্ট্রোল ইউনিট চালু করা হয়। এরপর ভোটিং মেশিনের কাছে হেঁটে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীর সিম্বল খুঁজে বার করে বোতাম টিপতে হয়।
এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে কত সময় লাগতে পারে? অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত গতিতেও যদি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করা হয়, তাহলেও অন্তত এক মিনিট অর্থাৎ ৬০ সেকেন্ড সময় লাগার কথা। অন্তত সাধারণ বুদ্ধি তাই বলে। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতি বলা হল এই কারণে যে, ধরে নেওয়া হচ্ছে ভোট কর্মীরা আলোর গতিতে হাত চালাবেন। তারা ক্লান্ত হবেন না। ভোটিং মেশিনেও কোনও গোলমাল হবে না। একটি সেকেন্ডও নষ্ট হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যের প্রথম দফার ভোটে সকাল ৭ টা থেকে ৯ টার মধ্যে একজন ভোটারের ভোট দিতে গড়ে সময় লেগেছে মাত্র ৪৭.২ সেকেন্ড! সকাল ৯ টা থেকে ১১ টার মধ্যে একজন ভোটারের সময় লেগেছে ৩৯.৭ সেকেন্ড; বেলা ১১ টা থেকে ১ টায় ৪২.২ সেকেন্ড; ১ টা থেকে ৩ টে ৫৩.৫ সেকেন্ড! বেলা ৩ টের পর থেকে থেকে অবশ্য ভোটদানের এই ম্যাজিক গতি কমে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। প্রতি ভোটারের ভোট দিতে গড়ে সময় লেগেছে ৮০ সেকেন্ড। বিকাল ৫ টার পরে লেগেছে ১৩৯.৫ সেকেন্ড। অবাক কান্ড!
দ্বিতীয় দফার ভোটেও একই চিত্র। সকাল ৭-৯টা একজন ভোটারের ভোট দিতে সময় লেগেছে গড়ে ৫০ সেকেন্ড; ৯-১১ টায় ৪২.৫ সেকেন্ড; বেলা ১১-১ টায় ৪৩.৪ সেকেন্ড; বেলা ১-৩ টেয় ৫২.১ সেকেন্ড! দ্বিতীয় দফার ভোটেও বেলা ৩ টের পর থেকে ভোট দানের ম্যাজিক হার স্বাভাবিক হয়েছে। ৩-৫ টার মধ্যে সময় লেগেছে ৮১.১ সেকেন্ড এবং বিকাল ৫ টার পরে ২৭২.৭ সেকেন্ড।
কেউ বলতে পারেন, ভোটাররা সকাল সকাল ভোট দিয়েছেন। তাই সকালের দিকে দ্রুতগতিতে ভোট হয়েছে। একথা মেনে নিলেও প্রশ্ন থাকে। ভোটারের আইডেন্টিটি ভেরিফিকেশন, ফর্ম ১৭এ পুরণ করা, সই অথবা আঙ্গুলের ছাপ দেওয়া, আঙ্গুলে কালির দাগ লাগানো, ভোটিং মেশিনের কন্ট্রোল ইউনিট চালু করা, ভোটিং মেশিনের কাছে হেঁটে যাওয়া এবং তারপর পছন্দের প্রার্থীর সিম্বল খুঁজে বার করে ভোট দেওয়া – এতগুলি প্রক্রিয়া মাত্র ৪২ সেকেন্ড বা ৪৩ সেকেন্ডে করা আদৌ সম্ভব কি?
দুই দফার ভোট দান মিলিয়ে দেখলে যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তা হল পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে একজন ভোটারের ভোট দিতে সময় লেগেছে গড়ে ৫৩.৭ সেকেন্ড! নিঃসন্দেহে এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড! ইংলন্ডে ২০২৪ সালের নির্বাচনে এক জন ভোটার ভোট দিতে গড়ে সময় নিয়েছিলেন ১০২.২ সেকেন্ড; ব্রাজিলে ২০২২ সালে এই গড় ছিল ১২৩.১ সেকেন্ড; দক্ষিন আফ্রিকায় ২০২৪ সালে ব্যালট পেপারে ভোট দিতে সময় লেগেছিল গড়ে ১২৩.১ সেকেন্ড। ঘরের পাশের ভুটানে ২০২৪ সালে ১০৬.৭ সেকেন্ড। এই বছর অন্ধ্রপ্রদেশে রাত ২ টো পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করে ভোট পড়েছিল ৮০.৬৬ শতাংশ। আর পশ্চিমবঙ্গে সন্ধে ৬ টার মধ্যে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ!
একথা অনস্বীকার্য যে, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলের দুর্নীতি, স্বজন পোষণ, দাদাগিরি,মহিলাদের নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি বহু কারণে অনেক ভোটার এবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে ভোট দানের এই ম্যাজিক গতির কোনও সম্পর্ক নেই। গত বুধবার আলিপুরের সরকারি দপ্তরে ৪০০০ ইভিএম মেশিন পুড়ে যাবার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে কি? আশা করি পাঠকরা ভাববেন।
—— সংগৃহীত <This message was edited>
@freemang2001gmail-com



