Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

সম্পাদকের কলমে

সম্পাদকের কলমে

Form and Content in literary criticism

Every phenomenon or things has a certain content and is manifested in a certain form. Content is the totality of the components

হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ব

‘হিন্দুযুগ হচ্ছে একটা প্রতিক্রিয়ার যুগ-এই যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে সচেষ্টভাবে পাকা করে গাঁথা হয়েছিল। দুর্লঙ্ঘ্য আচারের প্রাকার তুলে একে দুষ্প্রবেশ্য করে তোলা হয়েছিল। একটা কথা মনে ছিল না, কোনো প্রাণবান জিনিসকে একেবারে আটঘাট বন্ধ করে সামলাতে গেলে তাকে মেরে ফেলা হয়।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কালিদাস নাগকে লেখা চিঠি, ৭ আষাঢ় ১৩২৯

‘বুদ্ধিকে না মেনে অবুদ্ধিকে মানাই যাদের ধর্ম রাজাসনে বসেও তারা স্বাধীন হয় না। সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে আমরা অবুদ্ধিকে রাজা করে দিয়ে তার কাছে হাত জোড় করে আছি।… আমাদের লড়াই ভূতের সঙ্গে, আমাদের লড়াই অবুদ্ধির সঙ্গে, আমাদের লড়াই অবাস্তবের সঙ্গে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সমস্যা, কালান্তর

‘বর্তমান কালে হিদুয়ানির পুনরুত্থানের যে একটা হাওয়া উঠিয়াছে তাহাতে সর্বপ্রথম ওই অনৈক্যের ধুলা, সেই প্রাদেশিক ও ক্ষণিক তুচ্ছতাগুলিকেই উড়িয়া আসিয়া আমাদিগকে আচ্ছন্ন করিয়াছে। কারণ সেইটেই সর্বাপেক্ষা লঘু, এবং সেইটেই অল্প ফুৎকারে আকাশ পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতে পারে।

‘কিন্তু এই ধুলা কাটিয়া যাইবে, আমাদের নিশ্বাসবায়ু বিশুদ্ধ হইবে, আমাদের চারদিকের দৃশ্য উদ্ঘাটিত হইবে-সন্দেহমাত্র নাই। আমাদের দেশের যাহা স্থায়ী, যাহা সারবান, যাহা গভীর, তাহাই ক্রমে প্রকাশিত হইয়া পরিবে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,

পরিশিষ্ট, রাজা ও প্রজা, সমূহ

হিন্দুধর্ম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি ধর্ম। কিন্তু হিন্দুধর্মের কোনো প্রবর্তক বা নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ নেই। হিন্দুধর্মের কোনো যিশু বা মহম্মদ বা গৌতম বুদ্ধ নেই। কোনো বাইবেল বা কোরান বা ধম্মপদ নেই। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে বহুরকম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও পরম্পরাকে আত্তীকৃত ও সাঙ্গীকরণ করার মধ্যে দিয়ে এই ধর্ম ক্রমাগত বিকশিত হয়ে উঠেছে। বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, ষড়দর্শন, ভক্তিআন্দোলনের পদাবলী, মরমিয়া সাধকদের গান -এর কোনোটারই গুরুত্ব কম নয়। কিন্তু এককভাবে এর কোনো একটির সাহায্যে হিন্দুধর্মকে জানা-বোঝা সম্পূর্ণ হয় না। আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন তার ‘হিন্দুধর্ম’ বইতে এই ধর্মকে একটি মহীরুহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্পষ্টই বলেছেন, হিন্দুধর্ম একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গড়ে-তোলা বিরাট স্থাপত্যের মতো নয়। আর মহীরুহের মতো বলেই তা ভারতীয় মহাজাতির মতো। তাই হিন্দুদের চিন্তাজগতে বৈচিত্র্যও অশেষ। আবার এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের সবরকম সম্ভাব্য চেষ্টার নিদর্শনও রয়েছে। আর্য আক্রমণের আগেকার দ্রাবিড় সংস্কৃতি, অদ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, আর্য সংস্কৃতি, অন্যান্য আক্রমণকারীদের সংস্কৃতি, সেইসঙ্গে বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্ম ও সংস্কৃতি-সমাজ-বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে ও ধাপে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে হিন্দুধর্মকে প্রভাবিত করেছে, প্রভাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে এক বিশাল মহীরুহ নির্মিত হয়ে উঠেছে। আবার শাখা-প্রশাখাগুলির মধ্যে এক নিঃশব্দ আসঞ্জন প্রক্রিয়াও বিদ্যমান থেকেছে। যার ফলে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ ও ভক্তিবাদীদের দ্বৈতবাদ-এর মতো আপাতবিরোধী দর্শনের মধ্যেও কোনো ভয়ঙ্কর সংঘাত সৃষ্টি হয় না।

হিন্দু ঐতিহোর অন্যতম প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হল চিন্তার স্বাধীনতা। তার ফলে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন আকর গ্রন্থগুলির মধ্যে বহুরকম মতাদর্শগত বৈচিত্র্য বিদ্যমান। উচ্চবর্গ, নিম্নবর্গ ও লোকায়ত স্তরগুলির জীবনযাপনের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তাদের ধর্মীয় জীবনের মধ্যেও এক কাঠামোগত ভিন্নতা ও মতানৈক্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এর সবগুলিকে সমন্বিত করে হিন্দুধর্মকে বুঝতে হবে। তা করতে গেলেই দেখা যাবে এই মহীরুহের মধ্যে একদিকে রয়েছে যেমন অসামান্য বহুত্ববাদ, অন্যদিকে রয়েছে সময়ের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তমান বাস্তবের জায়মান উপাদানগুলিকে সদর্থকভাবে স্বীকার ও আত্তীকরণের ক্ষমতা। বৌদ্ধধর্ম ও ইসলাম ধর্মের (বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যের) বহু উপাদানকে হিন্দুধর্ম অসামান্য দক্ষতায় মুক্ত, সহনশীল ও সৃষ্টিমূলকভাবে সাঙ্গীকরণ করেছিল। মানবজাতি যখনই আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে এসে পৌঁছাল তখন থেকেই মানবিক অস্তিত্ব ও মানবিক বোধের (হিউম্যান এসেন্স ও হিউম্যান এগজিসট্যান্স) জগৎ পৃথক হয়ে গেল। যার ফলে সামনে এসে গেল যাপিত জীবনের অস্তিত্ব ও জীবনবোধের দ্বন্দু। মানুষ কী করে ও তার কী করা উচিত তার দ্বন্দু। প্রত্যেক ধর্মই তার নিজের নিজের মতো করে তার নিজস্ব সন্দর্ভে এই বিরোধকে দেখার ও সমাধানের চেষ্টা করেছে। কয়েক হাজার বছর ধরে হিন্দুধর্মও এই চেষ্টা করতে করতে এক বহু শাখা-প্রশাখা যুক্ত মহীরুহের আকার নিয়েছে।

আচার্য ক্ষিতিমোহন তাঁর নির্ধারক গ্রন্থ ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইতে দেখিয়েছেন: হিন্দু ও মুসলিম ধর্ম উভয়েই মৈত্রী ও সহিষ্ণুতার কথা বলে। তিনি লিখেছেন:

‘বাহির হইতেও ভারতে পরে যে-সব ধর্ম আসিয়াছে তাহারাও এখানে সকলের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়াই ধর্মসাধনা করিয়াছে। ধর্মের সংকীর্ণ আত্মসর্বস্ব ও আত্মসীমাবদ্ধ ভাবটা হইল হালের আমদানি। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে দিন দিন যে তাহাকে ক্রমেই উগ্র করিয়া তোলা হইতেছে তাহাই এই দেশের চিরদিনের প্রকৃতিবিরুদ্ধ।’

‘সমুদ্রে নদীর মতো আগত সব ধর্মই ভারতে সাদরে গৃহীত হইয়াছে। কোনো ধর্মের বৈশিষ্ট ও মহত্বকেই ভারত বাধা দেয় নাই বা নষ্ট করে নাই। সকলে মিলিয়া পাশাপাশি সাধনা করিয়াছে। ইনকুইজিশনের ইতিহাস আমাদের দেশের নহে। তাহা পশ্চিমদেশের। পশ্চিমই আমাদিগকে ধর্ম সম্বন্ধে অনুদার হইতে শিখাইয়াছে।

ক্ষিতিমোহন দেখিয়েছেন প্রথম খ্রিস্টাব্দে একদল উৎপীড়িত খ্রিস্টান ভারতে আসেন ও রাজারা তাদের ভুবৃত্তি দেন। উৎপীড়িত পারসীরা এখানে আসেন, আদর ও আশ্রয় পান। মুসলমান বিজয়ের অনেক আগে মুসলমান সাধকরা এদেশে আসেন, সমাদর ও আশ্রয় পান। জৈন সূত্র থেকে আচার্য দেখিয়েছেন অনুপমা দেবী ৮০টি মসজিদ তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও পাঞ্জাবের হুজবেরি, আজমেরের মৈনুদ্দিন চিস্তি, পাকপত্তনের ফরিদুদ্দিন শকরগঞ্জ তাদের সাধনা করার অভিপ্রায়ে এদেশে আসেন ও নিশ্চিত আশ্রয় পান। চিশতি ও সুরবর্দি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি কাদিরি ও নক্সবন্দী মতের বহু সুফিসাধক ভারতকেই তাদের সাধনাভূমি হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। সুফিরা ছিলেন প্রেম-প্রধান ও অত্যন্ত উদার।”

পাশাপাশি কোরানের বিভিন্ন অংশ উল্লেখ করে আচার্য ক্ষিতিমোহন দেখিয়েছেন: কোরান বলে, ভগবান হলেন বিপদবারন ও শাস্তিস্বরূপ। মৈত্রী ও শান্তিধামই ইসলামের লক্ষ্য। শাস্তিমন্ত্র ছাড়া পরস্পর যেন আর কিছু কানে না শোনেন, কেননা বৃথা বাক্য ও দুষ্ট তর্কজাল যেন মানুষের কর্ণকে দূষিত না করে। কোরান আরও বলে, ভগবান বিভিন্ন দেশের জন্য বিভিন্ন ধর্মগুরু পাঠিয়েছিলেন। হজরত মহম্মদের আগে যে-সব মহাপুরুষ ধর্ম বিষয়ে যা কিছু উপদেশ দিয়ে গেছেন সেইসব সত্যও বিশ্বাস করতে হবে। সেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়েই নিজামুদ্দিন অওলিয়ার দরগার হাফিজ হুসেন নিজামী এক বইতে লেখেন হিন্দুস্থান কে দৌ পয়গম্বর, রাম ওর কৃষ্ণ। সালাম অল্লাহী অলয়হিম।

যুক্ত সাধনার উদাহরণ

আচার্য ক্ষিতিমোহন ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইতে যুক্ত সাধনার অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছেন। চিত্রশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, সাহিত্য, সংগীত, গণসাধনা ইত্যাদি পরিসরে দুই সম্প্রদায়ের সৃষ্টিশীলতার ও মিথস্ক্রিয়ার অসামান্য সব বর্ণনা দিয়েছেন। বল্লভাচার্যের সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবদের মধ্যে ইসমাইলি গুরুরা ধর্মপ্রচারের ফলে খোজা নামে পরিচিত এক সম্প্রদায়ের জন্ম হল। তারা হিন্দু থেকে গেলেও মুসলমান সাধনার সঙ্গে যুক্ত হলেন। সামসী সম্প্রদায়ের লোকেরা গীতাও মানেন, আবার মুসলিম গুরুদের মান্যতা দেন। রসুলসাহীরা তান্ত্রিক যোগসাধনা করেন। মামুদ গজনী ভারত-আক্রমণকারী হিসেবে বিখ্যাত, কিন্তু তাঁর সভায় সভাপণ্ডিতের স্থান পেয়েছিলেন সংস্কৃত শাস্ত্রজ্ঞ অলবিরুনী। মুসলিম রাজারা সংস্কৃত অক্ষরে মুদ্রা ও লিপি ছাপাতেন।

১) কবীর ও দাদু

আচার্য ক্ষিতিমোহনের কবীর (আনন্দ) ও দাদু (বিশ্বভারতী) বিষয়ে প্রন্থদুটি বহু আলোচিত-পঠিত। তিনি ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইতেও মধ্যযুগের ভক্তবাদী ধারার এই দুই সাধকের বিভিন্ন দোঁহা থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তার মধ্যে কয়েকটি হল:

কবীরের দোঁহা: ‘হিন্দুর হিন্দুয়ানী ও মুসলমানের মুসলমানী দুইই দেখিলাম। ইহার কেহই পথের সন্ধান পাইল না। এই দুই পথ যুক্ত করিয়া মধ্য পথই পথ।’ ‘ভগবান বলেন, আমাকে কেন বাহিরে খুঁজিয়া মরিস? আমি তো তোর পাশেই আছি। আমি না থাকি দেবালয়ে, না থাকি মসজিদে, না থাকি কাবায়, না কৈলাশে আমার স্থান।

দাদুর বাণী ‘যে সাধক সম্প্রদায়ভেদ না মানেন সেই সাধকের মতই প্রশস্ত।’ ‘সম্প্রদায়বৃদ্ধি রহিত হইয়া নির্ভয় হও।’ ‘ভগবানের রাজ্যে হিন্দুর দেবালয়ও নাই, মুসলমানের মসজিদও নাই। দাদু বলেন, সেখানে তিনি আপনি বিরাজিত, সেখানে সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িকতার স্থান নাই।

২) চিত্রশিল্প

মোগল সম্রাটদের দরবারে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের চিত্রশিল্পীরা ছিলেন। আকবর-জাহাঙ্গীর-শাহজাঁহা তাঁদের সমাদর করতেন। তাঁরা প্রাসাদগাত্রে ও বইতে ইলাসট্রেশনের কাজ করতেন। চাঙ্গেজনামা, জাফরনামা, রাজমনামা, পারসী রামায়ণ, পারসী নল-দময়স্তির কথা, পারসী পঞ্চতন্ত্র, আয়ার দানিশ ও হামজার ১২ খণ্ডের ১৪০০ শ্লোক সমন্বিত উপাখ্যান এইসব চিত্রের রত্নভাণ্ডার। এইসব শিল্পকর্মে ও বিষয়-নির্বাচনে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো বাছ-বিচার নেই। আকবরের সময়ে যে চারজন প্রধান চিত্রশিল্পীর কথা আবুল ফজলের লেখায় পাওয়া যায় তাঁরা হলেন: মীর সৈয়দ আলী, খাজা আবদুস সামাদ, যশোবন্ত ও বশাওন। প্রথম দুজন মুসলিম ও পরের দুজন হিন্দু।

৩) স্থাপত্যশিল্প

ক্ষিতিমোহন দেখিয়েছেন আহমেদাবাদে হিন্দু মন্দিরের শিল্পের আদর্শেই মসজিদগুলি নির্মিত। সময়ের মধ্যে দিয়ে গৌড়ীয় শিল্পশৈলী ও চালাঘরের বঙ্কিম শোভা মুসলমান রাজাদের পাষাণ মন্দিরে ও প্রাসাদেও প্রভাব বিস্তার করে।১০ মিনার-নির্মাণের ক্ষেত্রেও ভারত ও পারস্যের মধ্যে বিনিময় ঘটেছিল। কুতুব মিনারে হিন্দু শিল্পের প্রভূত ঐশ্বর্য্য দেখা যায়। এই মিনার ভারত-পারসিক যৌথ স্থাপত্য-চেতনার প্রতীক। মোগল যুগের চিত্রশিল্প, বয়নশিল্প, উদ্যান-পরিকল্পনায় পারসিক শিল্পরীতির ছাপ স্পষ্ট। আবার পারস্যের অনা-উ মসজিদে বৌদ্ধগুহা ও চৈত্যশিল্পের প্রভাব দেখা যায়। পারস্যের গম্বুজের চূড়াতে যে বর্তুল অলংকার থাকে তাকে কলসা বলে। ক্ষিতিমোহন বলেছেন, পারসিক ভাষায় কলসার কোনো অর্থ নেই। এই কলসা ভারতীয় মন্দিরচূড়ার কলস ছাড়া আর কিছুই নয়। পারস্যে পদ্মপলাশ রীতির গম্বুজ ভারতেরই প্রভাবে।

৪) সাহিত্য

আচার্য ক্ষিতিমোহন চট্টগ্রামে পণ্ডিত আবদুল করিম মহাশয়ের কাছে একটি পুঁথির নকল দেখেছিলেন। পুঁথিটির নাম হোরান জরিপ। এটাই কোরান শরিফের আসল উচ্চারণ। পুঁথিটির আরম্ভ ভাঙা সংস্কৃতে। তারপরে ঈশ্বর সম্বন্ধে লেখা হয়েছিল:

‘পরমব্রহ্মের তত্ত্ব এব (এবে) শুন সর্বজন

স্ব স্ব ভাবে শুনি হৃদে করহ ধারণ।।

জ্ঞানহ পঞ্চতত্ত্বের রূপ রেখা হয়।

যে সন এসে অনে মোড কর্ণিকা বিস্তৃত

পঞ্চতত্ত্ব বহির্ভূত ঈশ্বর নিশ্চয়।।

সেহি সে চৈতন্যময় রূপ নাহি তার।

নিরূপ সহজ হন সর্বত্রে প্রচার।।১২

আবার দরাফ খাঁ ও আবদর রহিম-এর মতো বহু মুসলিম কবি সংস্কৃতেও লিখেছেন। অপভ্রংশ ভাষাতেও মুসলমানদের লেখা দেখা যায়। ১৭৪৩ সালে পিহানির রাজা আকবর আলি খাঁ নৌষধের অনুবাদ করান।

আচার্য লিখছেন: ‘মালিক মহম্মদ জায়সীর পদ্মাবতী, আলাওলের পদ্মাবতী, আবদুল রহীমের সংদেশ-রাসক প্রভৃতি গ্রন্থ দেখলে বুঝা যায় মুসলমান লেখকরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সে যুগে সংস্কৃত-প্রাকৃত পড়িতেন, শ্রদ্ধার সঙ্গে পুরাণ ও শাস্ত্রাদির আলোচনা করিতেন। কাব্য অলংকার সাংখ্যযোগ প্রভৃতিতে তাঁহাদের যেরূপ গভীর জ্ঞান তাহা এখনকার দিনে অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মধ্যেও দুর্লভ।’

৫) সংগীত

ভারতে সংগীতের জগতে হিন্দ-মুসলমানের যুক্ত সাধনার গভীর বিবরণ দেখা যায় ক্ষিতিমোহনের লেখায়। প্রথমেই মনে রাখা দরকার, মুসলমান শাস্ত্রে সংগীত-কলা নিষিদ্ধ। অথচ বড় বড় ওস্তাদরা প্রায় সবাই মুসলমান। ভারতের পুরানো তন্ত্রীবাদ্য ছিল বীণা। মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞরা তার মধ্যে বহুরকম অদলবদল আনেন। পাশাপাশি সেতার, রবাব, সুরশৃঙ্গার সুরবাহার ইত্যাদি তন্ত্রীবাদ্য মুসলমানরাই ভারতে প্রবর্তন করেন। নহবতের বাদ্যও মুসলমানদের অবদান। নাককাড়ার বহু গৎ সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন। এখনকার পাখোয়াজও ঠিক পুরানো ভারতীয় চেহারায় নেই, তা মুসলমান গুণী মানুষদের হাতে আরো উন্নত রূপ পেয়েছে। রাগ-রাগিনীর ক্ষেত্রেও মুসলমানদের অবদানকে বাদ দিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। অমীর খুসরু পারস্যের রাগ ইমন রাগকে ভারতীয় প্রকরণ দেন। এখন ইমন-কল্যাণ, ইমন-পুরিয়া, ইমন-ভুপালী, ইমন-বেলোয়ালি, ইমন-বেহাগ, ইমন-ঝিঁঝিটি ইত্যাদি রাগগুলি বহুল প্রচলিত। বাহার, আলাইয়া, সরফরদা, সাজগিরি, সাহানা, আড়ানা, সোহিনী, সুহা, সুঘরই রাগগুলি মুসলমানদের সূত্রেই পাওয়া। অমির খুসরু যে রাগগুলির প্রবর্তন করেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে সাজগিরী, ইমন, জিলফ, সরফরদা, ফিরোদস্ত, কৌল, তারানা, কউয়াল, সাহানা, সুহিল ইত্যাদি। তানসেন সঙ্গীতসার ও রাগকলা গ্রন্থদুটি রচনা করেন। তানসেন জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও মুসলমান গুরু ঘৌসের শিষ্য হন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি দুই সংস্কৃতিরই প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

প্রাচীন ভারতে রাজনৈতিক হিংসা

যে কোনো রাষ্ট্রের অবিচ্ছিন্ন অংশ হল হিংসা। রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সাধারণভাবে ও নির্দিষ্ট পরিসরে হিংসা ও বলপ্রয়োগকে যুক্তিসম্মত করে তোলা। প্রাচীন ভারতে বিদ্রোহী ও রাষ্ট্রীয় হিংসার শিকারদের নিজস্ব বক্তব্য ও কণ্ঠস্বরকে, প্রতিসন্দর্ভকে বিশেষ খুঁজে পাওয়া যায় না। হিংসার পাশাপাশি প্রাচীন ভারতের টেক্সট বা বয়ানগুলির মধ্যে শক্তিশালী নৈতিক দর্শনের সন্ধানও পাওয়া যায়। মহাভারতের পাশাপাশি অন্য অনেক বয়ানে রাজনৈতিক-নৈতিক বিষয়গুলিকে, স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে, দার্শনিকীকরণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এই সন্দর্ভগুলি অধিবিদ্যার মোড়কে মোড়া থাকত। ভারতীয় অধিবিদ্যার অনুপমত্ব বোঝা যায়, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের অধিবিদ্যার সঙ্গে তুলনা করলে। প্লেটোর তত্ত্বভাবনায় রাজনীতি, নৈতিকতা ও অধিবিদ্যা মিলেমিশে আছে। ভারতীয় অধিবিদ্যায়, অ্যাবসোলিউট বা চরম অধিবিদ্যা ও কনটেক্সচুয়াল বা প্রসঙ্গ অনুসারী অধিবিদ্যা, দুটিকেই স্বীকার করা হয়। এটার মধ্যে অনুপমত্ব কিছু নেই। প্লেটো নৈতিকতার নীতিসমূহকে অবজেকটিভ বা তন্ময় ও পরিবর্তনীয় বলে মনে করতেন আবার অ্যারিস্টটলের তত্ত্ববিশ্বে কনটেক্সচুয়াল বা প্রসঙ্গ অনুসারী অধিবিদ্যাকে স্বীকার করা হত। পক্ষান্তরে ভারতীয় অধিবিদ্যায় এই দুই ধরনের নৈতিকতার তর্ককে, টেনসন বা আততিকে, দ্বন্দুকে আত্তীকৃত করে ফেলা হয়। এই সন্দর্ভে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হিংসা ও অহিংসার আলোচনা ও তর্কের তীব্রতা ও দীর্ঘায়ত চেহারা। যা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় স্তরেই ব্যাপ্ত হয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে। ১৭ অধ্যাপিকা উপিন্দর সিং প্রাচীন ভারতের রাজত্বগুলিকে সময়ের ক্রম অনুসারে তিনভাগে ভাগ করেছেন।

‘I have identified three overlapping phases of early Indian Kingship foundation (circa/600 BCE 200 BCE), Transition (circa 200 BCE300 CE) and Maturity (circa 300-600 CE), (BCE = Be fore Common Era. CE Common Era. BC Before Christ Common Era is used to make time in the same way BC.) ১৮

এই তিনটি পর্বেই অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ধারণাসমূহ নির্মাণ করা হয়েছিল। যেগুলি রাজনৈতিক হিংসার প্রযুক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই রাজনৈতিক ধারণাসমূহ সময়ের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় হিংস্রতাকে আরও আরও শৃঙ্খলাপরায়ণ ও বিকশিত করে তুলেছিল এবং সুকৌশলে রাষ্ট্রীয় হিংস্রতাকে আড়াল, সহনীয় ও মান্য করে তোলার জন্য নানা ধরনের মুখোশ বানিয়েতুলেছিল। মুখোশগুলি ছিল বিভিন্ন সংরূপের সঙ্গে যুক্ত-কখনও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত, কখনও মতাদর্শগত, কখনও ধর্মীয় বা দার্শনিক, কখনও কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সবগুলিই ছিল নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন।

প্রাচীন ভারতে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ককে পাশ্চাত্য আদরা বা মডেল থেকে, রাষ্ট্র ও চার্চের সম্পর্কের মতো করে, বোঝা সম্ভব নয়। ব্রাহ্মণরা রাজসভায় যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হলেও তারা কখনই কোনো সংগঠিত প্রতিষ্ঠান গঠন করেননি। বৌদ্ধ ও জৈন সংঘগুলিও কখনই পাওয়ার-ব্রোকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি। যা ইয়োরোপে বারবার দেখা গেছে। এমনকি অশোকের সময়ও বৌদ্ধ বিহারগুলির ওপর রাজকীয় নির্দেশগুলিকেই খুব দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হত। প্রাচীন ভারতে ধর্ম কখনই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারেনি। প্রাচীন ভারতে আধুনিক অর্থে জাতির ধারণা ছিল না। হিন্দুরাষ্ট্রও ছিল না। ভারতের বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় পরম্পরাগুলির নৈতিক ও অধিবিদ্যক বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে এমন সব ওভারল্যাপিং বা সমাপতিত পরিসর রয়েছে যে, রাজনৈতিক হিংসার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলি কখনই ধর্মীয় বর্গবিভাগ অনুসারে হয়নি। তার সঙ্গে এটাও লক্ষ করার মতো বিষয় ধর্মীয় আইডিওলগ বা ভাবাদর্শীরা যে বাস্তবে ক্ষমতার প্রয়োগ করা হচ্ছে সেই বাস্তবের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। আবার বৌদ্ধ ও জৈন টেক্সট বা বয়ানগুলিও রাজার শক্তিপ্রদর্শন বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে কিন্তু একমাত্রিকভাবে হিংসার বিরুদ্ধে কথা বলেনি। ওই সব বয়ানগুলিতে, বাস্তব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে, রাজার পক্ষে যে চূড়ান্তভাবে অহিংস থাকা সম্ভব নয়-তা মেনে নেওয়া হয়েছিল। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক সন্দর্ভগুলির সঙ্গে ধর্ম সম্পর্কিত বিমূর্ত ধারণাগুলিই অবিচ্ছিন্ন ছিল। ধর্ম বা ধম্মের এইসব বিমূর্ত ধারণাগুলিই সময়ের মধ্যে দিয়ে আবর্তিত হয়েছে। ব্রাহ্মাণ্য পরম্পরায় ধর্মের ছিল অসংখ্য শিকড়। ‘বর্ণ’ ও ‘আশ্রম’-এর নির্দিষ্ট বিভাজন সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ম ছিল অতলস্পর্শী। ‘মহাভারত’ কখনই আমাদের বলে না যে, ধর্ম হচ্ছে অতীন্দ্রিয় ও দুর্জেয়। অন্যদিকে বৌদ্ধ ও জৈন পরম্পরায় ধর্ম হল অটল ও সবকিছুকে ঘিরে রাখা এমন একটি উপাদান, যার বিষয়ে সংশয়াপন্ন হওয়া যায় না ও প্রশ্ন করা যায় না। এই পার্থক্যগুলিকে অনুধাবন করতে হলে তাকাতে হয় বিভিন্ন সময়ে কিংশিপ বা রাজপদ, ধর্ম। ধন্ম ও প্রত্যাখ্যানের সম্পর্কগুলির মধ্যে দিয়ে যে ভিন্ন-ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত নির্মিত হয়ে ওঠে তার দিকে। বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম একেবারে সূচনা থেকেই খুব স্পষ্টভাবে, দ্ব্যর্থহীনভাবে, ঘোষণা করেছিল যে, রাজপদের তুলনায় জিনা ও বৃদ্ধ ছিলেন উত্তমর্ণ। আবার বিপরীত দিকে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে রাজা ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত জটিল, দ্ব্যর্থক ও অমীমাংসিত। অনেক ব্রাহ্মাণ্য টেক্সট বা বয়ানে ধর্মের উত্তমর্ণতার কথা বলা আছে, কিন্তু সেগুলি অত্যন্ত খণ্ডায়িত এবং তার উৎস হল কোনো কেন্দ্রীভূত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের, বয়ানের ও ডগমার অনুপস্থিতি।

সাভারকরের হিন্দুত্ব

আন্দামানের সেলুলার জেলে কোনো ব্যারাক ছিল না। ৬৯০-টি সেল বা কুঠুরি ছিল। সব বন্দিকে একাকী একটি সেলে বন্দি থাকতে হত। আন্দামানে সর্বপ্রথম ১৮৫৭-তে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে (সিপাহী বিদ্রোহ) অংশ নেবার অপরাধে একদল বন্দিকে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে আলামা ফজলি হক খয়রাবাদী ও মৌলানা লিয়াকত আলী জেলের ভিতরেই মৃত্যু বরণ করেন এবং মীর জাফার আলী থানেশ্বরি কুড়ি বছর জেলে বন্দি ছিলেন। এরপর ওয়াহাবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে অনেককে আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে শের আলী আফ্রিদি আন্দামান পরিদর্শনের সময়ে ভাইসরয় লর্ড মেয়ো-কে ছুরি মেরেছিলেন।

সাভারকরকে সেলুলার জেলে আনা হয় ৪ জুলাই, ১৯১১। তার ৫০ বছর কারাবাসের আদেশ ছিল। কারাবাসের সময়ে তিনি পাঁচবার ক্ষমার আবেদন করেন (১৯১১, ১৯১৩, ১৯১৪, ১৯১৮ ও ১৯২০)। ১৯২১-এর মে মাসে তাঁকে ভারত ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনা হয় ও ৬ জানুয়ারি ১৯২৪ তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয় পুনের ইয়ারওয়াদা জেল থেকে। তখনও শর্ত ছিল তাঁকে রত্নগিরি জেলায় থাকতে হবে ‘will not engage publicly or privately in any manner of political ac-tivities without the concent of the government for a period of five years…’।

তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া শর্ত মেনে কারামুক্ত হন। এই পাঁচ বছরের মধ্যেই তিনি কিন্তু আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেয়ারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। তাঁর কারামুক্তির দুই সপ্তাহ পরেই তাঁর ভাই বাবারাও সাভারকর তাঁরই অনুপ্রেরণায় রত্নগিরিতে হিন্দুসভা প্রতিষ্ঠিত করেন। আবার ওই বছরেরই ২৪ আগস্ট নাসিকে বি এস মুঞ্জে ও এন সি কেলকরের উদ্যোগে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মুঞ্জে ও কেলকর ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবল বিরোধী। ব্রিটিশ সরকার সাভারকরকে ওই অনুষ্ঠানে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রচুর অর্থ দেওয়া হয় ও তাঁর সম্পর্কে বলা হয়:

‘Shankaracharya sent his blessings on the occasion by presenting a dress of Honour to the great Patriot’। তারপরে তিনি আরও কয়েকদিন নাসিকে থাকেন এবং ভাণ্ডর, ট্রিমবাক, ইলা ও নাগপুরে যান। এইসব ক্ষেত্রে তিনি যে তাঁর ওপর আরোপিত শর্তাবলী লঙ্ঘন করছেন তা ব্রিটিশ প্রশাসন দেখেও দেখেননি।

১৯২৩-এ রত্নগিরি জেলে থাকার সময়ে তিনি ‘মারাঠা’ ছদ্মনামে ‘হিন্দুত্ব’ বইটি লেখেন। তিনি হিন্দুত্বের ধারণাকে চার হাজার বছরের পুরানো ধারণা বলে দাবি করেছিলেন। হিন্দুধর্ম হচ্ছে হিন্দুত্বের একটি অংশ মাত্র।

‘The ideas and ideals, the system and societies, the thought and sentiments which have centered round this name are so varied and rich, so powerfull and so subtle, so eilusive and yet to vivid that the term Hindutva defies all attempts at analysis. Forty centuries, if not more, had been at work to mould it as it is. Prophets and poets, law-yers and law-givers, heroes and historians, have thought, lived, fought and died just to have it spelled thus. For indeed, it is not the resultant of countless action now conflicting, now commingling, now cooper-ating of our whole race? Hindutva is not a word but a history. Not only the spiritual or religious history of our people as at times it is mistaken to be by being confounded with the other cognate term hinduism, but a history in full. Hinduism is only a derivative, a frac-tion, a part of Hindutva,

হিন্দুত্ববাদীরা মিল, মেকলে ও মার্কসের বিরোধিতা করেন এই কারণে যে, ভারতের চার হাজার বছর বা তারও বেশি সময়ের ইতিহাস হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে হিন্দুত্বের ইতিহাস। এই চার হাজার বছরের বিভিন্ন পর্বে হিন্দুরা কখনও নিজেরা শাসন করেছে, আর কখনও বিদেশিদের দ্বারা, অহিন্দুদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। কিন্তু ভারতের ইতিহাস সর্বকালে হিন্দুদের ইতিহাস। ঐতিহাসিক জেমস মিল ভারতের ইতিহাসকে অবৈজ্ঞানিকভাবে হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ (ক্রিশ্চিয়ান নয়) -এই তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। বর্তমানে লিবারেল, সাব-অলটার্ন, মার্কসবাদী ও জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা ভারতের ইতিহাসকে প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে ভাগ করে আলোচনা করেন। এই বিভাজন বৌদ্ধিক ও অ্যাকাডেমিক জগতে সর্বজনস্বীকৃত। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি কোনোটিই স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তাহলে ভারতের ইতিহাস আর শুধু হিন্দুদের ইতিহাস থাকে না। আর মেকলে যে ভাবে ভারতীয়দের পাশ্চাত্যকরণ চেয়েছিলেন তাও স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। অন্য ঐতিহাসিকদের কাছেও নয়। মানবজাতির লিখিত ইতিহাস যেহেতু শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস তাই মার্কসবাদী ঐতিহাসিকদের ইতিহাস রচনার পদ্ধতিও হিন্দুত্ববাদীদের কাছে গ্রহণীয় নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবার পরে প্রথম বক্তৃতায় বলেছিলেন বিজেপির এই জয় দু-হাজার বছরের বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি।

আমরা আলোচনার সূচনায় হিন্দুধর্মের যে বহুত্বধর্মিতার কথা বলেছিলাম তা ‘হিন্দুত্ব’-এর সম্পূর্ণ বিরোধী। বর্তমান ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান সংগঠন আরএসএস-তাদের শতাধিক শাখা সংগঠন এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে, রাজনীতি, মন্দির, সেবাপ্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতিকেন্দ্র, গণমাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে যে দুটি মূল চিন্তা ব্যাপ্ত করে তুলতে চাইছে সে দুটি হল: ১) ভারত হিন্দুদের দেশ। হিন্দু সংস্কৃতিই হল ভারতীয় সংস্কৃতি। ২) যে সব ধর্ম, সংস্কৃতি, জনগোষ্ঠী হিন্দু সংস্কৃতির বাইরে আছে তা সঠিক অর্থে ভারতীয় নয় এমনকি তারা ভারতবিরোধীও বটে। দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির নিজস্ব ইতিহাসকে হিন্দুত্ববাদীরা শুধু অবান্তরই মনে করে না, বিপজ্জনকও মনে করে।

হিন্দুত্ববাদীদের ঘোষিত লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ করা। যে-রাষ্ট্রের সংস্কৃতি জগতে অহিন্দুদের কোনো স্থান থাকবে না। তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারও থাকবে না। স্বাভাবিকভাবেই এই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকবে বিভেদ ও হিংসার ওপর। এই বিভেদ ও হিংসা স্বতঃস্ফূত নয়। হিন্দুত্ববাদীরা খুব সচেতনভাবে এক বর্জনমূলক মতাদর্শগত আধিপত্য নির্মাণের মধ্যে দিয়ে এই বিভেদচিন্তাকে লালন করে ও চৈতন্যের সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটায়। তারা বোঝাতে চায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যারা বিরোধী তারা হিন্দুধর্ম বিরোধী। যদিও হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দু ধর্ম সম্পূর্ণ পৃথক। হিন্দুত্ববাদ পুরোপুরি ঔপনিবেশিক ভারতে নির্মিত একটি রাজনৈতিক ধারণা। হিন্দুত্ববাদী নেতাদের একজনও ধর্মবিশ্বাস, ধর্মচেতনা, ধর্মীয় দর্শন, আধ্যাত্মবিশ্বাস ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেন না। তারা রামায়ণের কয়েকটি কাহিনিকে সমগ্র মহাকাব্যের বৃহৎ কাঠামো থেকে ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তার সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, পুরাণকে ইতিহাস বানিয়ে, এমন এক বিচিত্র-বিকৃত বিশ্বাস বানিয়ে তুলেছেন, যার সঙ্গে হিন্দুধর্মের কোনো মিল নেই। রামায়ণের অসংখ্য সংস্করণের মধ্যে, এমনকি বাবরের সমসাময়িক তুলসীদাসের রামায়ণেও, রামমন্দির-মন্দিরের ধ্বংসসাধন-বাবরি মসজিদ ইত্যাদির কোনো প্রসঙ্গই নেই। ১৮৯৩ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘তীর্থমুকুর’ নামে একটি পুস্তিকাতে বলা হয়েছিল: তীর্থযাত্রীরা অযোধ্যাতে যেতেন পিতৃপুরুষের তর্পণ করতে, কারণ রাম সেখানে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই কারণে অযোধ্যার অন্য নাম ছিল রামগয়া। ২৫ ‘হিন্দুত্ব’ বইতে সাভারকর বলেছিলেন যাদের পিতৃভূমি, কর্মভূমি ও পুণ্যভূমি ভারতে, কেবল তারাই হিন্দু। মুসলিম ও ক্রিশ্চিয়ানদের পুণ্যভূমি ভারতের বাইরে বলেই তারা ভারতীয় নয়। পরে আরএসএস-এর দ্বিতীয় সরসংঘচালক গোলওয়ালকার বলেছিলেন নাৎসি জার্মানিতে যেভাবে ইহুদিদের পদানত করে রাখা হয়েছিল ভারতের সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত। সাভারকর মধ্যযুগের ভারতের যে ইতিহাস লিখেছিলেন তাতে শুধু মুসলিম আক্রমণের কথাই বলা হয়েছে। মুসলিমরা শুধু ভারতের জমিই দখল করেনি, সেইসঙ্গে উচ্চবর্ণের নারী ও রানিদের কুক্ষিগত করেছিল। হিন্দুভূমি ও হিন্দুনারী, এই দুইই ছিল তাদের আক্রমণ, দখল, লুণ্ঠন ও অত্যাচারের লক্ষ্য। ২৬ বিপরীত দিকে আমরা আমাদের আলোচনায় দেখেছি: ভারতবর্ষের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা কী গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছে।

‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ইতিহাস সকল দেশে সমান হইবেই, এ কুসংস্কার বর্জন না করিলে নয়।’ ২৭ ১৯৯০-এর দশকে ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় সরকারগুলি নয়া উদারবাদের নীতিগুলি অনুসরণ করার পর থেকেই হিন্দু মৌলবাদের আড়ালে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি বেভাবে সংগঠিত হতে ও শক্তি অর্জন করতে শুরু করেছে তা যেকোনো গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছেই গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদের মূল চরিত্রের মধ্যে কিছু কিছু মিল অবশ্যই দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাস সব দেশে সমান নয় বলেই ওই মিলগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়। জীবন্ত বাস্তব থেকে বিচ্যুত হয়ে ইতিহাস-চর্চা ইতিহাস-চর্চাকেই দুর্বল করে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের ধারাকে নির্ধারণ করে বাস্তব জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন। বর্তমান সময়ে ১৯৩০-এর দশকের মতো গ্রেট ডিপ্রেশনের প্রভাব আমাদের দেশে নেই, আবার শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের চ্যালেঞ্জও শাসক শ্রেণির সামনে নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদের লক্ষণগুলি সংঘ পরিবারের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে, খুব স্পষ্ট। ১৯৩৫-এ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে জর্জি ডিমিট্রভ বলেছিলেন: ‘একটা দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, এমনকি একই দেশের বিভিন্ন সামাজিক স্তরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ফ্যাসিজম তার প্রচারের ধরন ঠিক করে।’ ২৮ ভারতীয় বাস্তবতায় ফ্যাসিবাদের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হল জাতীয়তাবাদ। বর্জনমূলক আরএসএস-এর দ্বিতীয় পরিচালক বা সরসংঘচালক এম এস গোলওয়ালকর তার উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড বইতে জার্মান ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে যে বক্তব্য রেখেছেন ও ভারতে তার প্রয়োজন সম্পর্কে যে মতামত প্রকাশ করেছেন সেগুলি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাংগঠনিক ও মতাদর্শগতভাবে আরএসএস স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই কীভাবে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড বইটি থেকে দেওয়া নীচের উদ্ধৃতিগুলি থেকে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট বোঝা যায়।

‘Race pride at its highest has been manifested here (Germany). Germany has also shown how wellnigh impossible it is for Races and cultures having differences going to the root, to be assimilated into one united whole a good lesson for us in Hindusthan to learn and profit by.

অর্থাৎ জার্মানির যে উগ্র জাতিগত অহংকার, যা ফ্যাসিবাদের অন্যতম ভিত্তি, তাকে গোলওয়ালকর যে শুধু মান্যতাই দিচ্ছেন তা নয়, সেইসঙ্গে হিন্দুস্থানের ক্ষেত্রে তাকে শিক্ষণীয় বলেও মনে করছেন। উক্ত বইতে তিনি আরও লিখছেন:

“From this standpoint, sanctioned by the experience of shrewd old nations, the foreign races in Hindusthan must either adopt the Hindu culture and language must learn to respect and hold in rever-ence Hindu religion, must entertain no idea but those of glorification of Hindu race and culture, ie. of the Hindu nation and must lose their separate existence to merge in the Hindu race, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hindu Nation, claiming nothing deserving no privileges, far less any preferential treatment not even citizen’s right. There is, at least should be, no other course for them to adopt,

অর্থাৎ হিন্দুস্থানে যেসব বিদেশিরা বসবাস করবে তাদের হিন্দুসংস্কৃতি, হিন্দুধর্ম, হিন্দুজাতি ও হিন্দুভাষার আধিপত্য ও গর্বকে প্রশ্নহীনভাবে স্বীকার করে নিতে হবে। নিজস্ব অভিজ্ঞানকে ভুলে গিয়ে তাদের হিন্দুজাতির মধ্যে আত্তীকৃত হয়ে যেতে হবে। অথবা হিন্দুজাতির অধস্তন হিসেবে এই দেশে বসবাস করতে হবে, তারা কোনো সুযোগসুবিধা দাবি করতে পারবে না, এমনকি নাগরিকত্বও দাবি করতে পারবে না। অর্থাৎ সমস্ত নাগরিকরা সমানাধিকার ও ভোটাধিকার পাবে না। গোলওয়ালকর ও সাভারকরের হিটলার-প্রীতি এখন সকলের জানা। হিটলার ক্ষমতায় এসে ইহুদিদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। গোলওয়ালকরের দৃষ্টিভঙ্গি নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাবাদ-সম্পর্কে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। আরএসএস চেয়েছিল ভারতের সংবিধান রচনা করা হোক মনুসংহিতার মডেলে। তাহলে শূদ্র, ম্লেচ্ছ, দলিত-সহ সমগ্র নিম্নবর্ণের মানুষদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। ‘ফরেন রেস’ হিসেবে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব বাতিল করা সম্ভব হবে ও হিন্দুরাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।

‘ফ্রন্টলাইন’ পত্রিকার ২০০০ সালের ২২ জানুয়ারি ০৪ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় পরিচিত হিন্দুত্ববাদী মুখ সূব্রহ্মাণিয়াম স্বামী লিখেছিলেন, ১৯৯৮-এর অক্টোবরে আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সম্মেলনে ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের যে খসড়া পেশ করা হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট (লোকসভা ও রাজ্যসভা) পরিষদীয় ব্যবস্থার বদলে ত্রিস্তরীয় কাঠামো প্রচলন করা দরকার। সার্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে শুধুমাত্র প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের নিয়ে ভোটার তালিকা তৈরি করা হবে। তালিকা বানাবে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক, নির্বাচন কমিশন নয়। রাষ্ট্রপতি গুরুসভার সদস্যদের মনোনীত করবেন। গুরুসভার সদস্য হবেন সাধু ও সন্ন্যাসীরা (ধরে নেওয়া যায় সাধু ও সন্ন্যাসীদের নাম প্রস্তাব করবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) সমস্ত ধরনের আইন ও অর্থ বিল রচনা করবে গুরুসভা। তাদের সম্মতি পাবার পরই তা লোকসভাতে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। গুরুসভা-ই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও মনোনয়ন দেবে ও তাদের ইমপিচ-ও করতে পারবে। গুরুসভা ও লোকসভার মধ্যস্তরে থাকবে রক্ষাসভা। যার সদস্যরা হবেন সামরিক বাহিনীর প্রধানরা ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীরা। যাদের হাতে জরুরি অবস্থা জারি করার অধিকার দেওয়া থাকবে। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন। তাদের ভাবনার ওপর আরএসএস-এর প্রভাব অবশ্যই আছে। এটা অনেকটা ঝুলি থেকে বেড়াল বেড়িয়ে পড়ার মতো ব্যাপার। হিন্দুরাষ্ট্র গঠিত হলে তা কেমন হতে পারে তার অবয়ব আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠনের বক্তব্য থেকে আন্দাজ করা যায়।

ভারতীয় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের আর একটি মৌলিক পার্থক্য হল: ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিস্ট ও নাৎসিরা ক্ষমতায় এসেছিল রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে তাদের উত্থানের এক দশকের মধ্যে এবং তাঁরা তা করেছিলেন মূলত পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাজনৈতিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। কিন্তু ভারতীয় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি ১৯২০-এর দশক থেকে সিভিল সোসাইটি বা জনসমাজকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করে চলেছে। ২০১৪-র আগে লোকসভায় সংঘ পরিবারের সদস্যরা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পায়নি। এই প্রসঙ্গে উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলিতে জনসমাজ ও রাজনৈতিক সমাজের সম্পর্কের পার্থক্য মনে রাখা দরকার। রুশ বিপ্লবের এক বছর পরেই ১৯১৮ সালে লেনিন দেখিয়েছিলেন: রাশিয়ায় বিপ্লব শুরু করা সহজ হলেও তা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কিন্তু অত্যন্ত কঠিন। কারণ জারশাসিত রাশিয়ায় জনসমাজ ছিল অত্যন্ত আদিম ও রাজনৈতিক সমাজের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দানা বাঁধতে অক্ষম। অন্যদিকে পশ্চিমের উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিপ্লব শুরু করা হবে বেশ কঠিন কিন্তু তা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কারণ সেইসব দেশে ধনতন্ত্রের বিকাশের কারণে জনসমাজ ও রাজনৈতিক সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়।৩১ এই সূত্র ধরেই আন্তোনিও গ্রামশি ‘War of Position’ বা ‘অবস্থায়ী সংগ্রাম’ ও ‘War of Maneuver’ বা ‘চলিষ্ণু সংগ্রাম’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেছিলেন। রাশিয়ায় জনসমাজ দুর্বল হবার কারণে এভাবেই বিপ্লব করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর এক্ষেত্রে বিপ্লবকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং কতটা কঠিন ছিল তা সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজের ইতিহাস ভালোভাবে অনুসরণ করলে বোঝা যায়। চলিষ্ণু সংগ্রাম কিন্তু উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে জনসমাজ শক্তিশালী হবার কারণে বহুরকম রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট জনসমাজ-ই প্রতিহত করে দিতে পারে। তাই উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে জনসমাজে শাসক শ্রেণির বিকল্প মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী লড়াই-এর জয়ী হবার আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল সম্ভব নয়। গ্রামশি একেই বলেছেন ‘War of Position’ বা ‘অবস্থায়ী সংগ্রাম’। ৩২ ধনতন্ত্রের বিকাশ ও বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ‘চলিষ্ণু সংগ্রাম’ ধীরে ধীরে ‘অবস্থায়ী সংগ্রাম’-এর দিকে ঝুঁকতে থাকে। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংঘ পরিবারের শাখাপ্রশাখাগুলি (যাদের সংখ্যা ১০০-রও বেশি) ধারাবাহিকভাবে তাদের মতাদর্শগত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একই সঙ্গে জনসমাজ ও রাজনৈতিক সমাজে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে, সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিতভাবে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। নাৎসি পার্টি ও ফ্যাসিস্ট পার্টির ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি-র ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়ার মধ্যে এই পার্থক্য গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নাৎসি পার্টি ও ফ্যাসিস্ট পার্টির সঙ্গে সংঘ পরিবারের আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য হল বিজেপি-র ভোটদাতারা হল সংঘ পরিবারের সবগুলি শাখা-প্রশাখার সদস্যরা, শুধু বিজেপি-র সদস্যরা নন। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপক্ষে মতাদর্শগত আধিপত্য নির্মাণের জন্য জনসমাজের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে সংঘ পরিবারের বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সেবামূলক, পুরোপুরি ধর্মীয়, শিক্ষামূলক, সামাজিক ও জাতিগত, সংবাদমাধ্যম ও সংযোগমূলক, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ধরনের, বিদেশে কর্মরত, শিশুদের মধ্যে সক্রিয় ইত্যাদি বহু ধরনের সংগঠন। ৩৩ পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাজের মধ্যেওসংঘ পরিবার অনুপ্রবেশের চেষ্টা-চালিয়ে যাচ্ছে। মহারাষ্ট্র পুলিশের প্রাক্তন আই-জি এস এম মুশরিফ তাঁর হ কীলড কারকারে বইতে দেখিয়েছেন: আই-বি-তে তাদের নিজেদের সদস্যদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বহুবছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে সংঘ। ৩৪ সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলে ট্রেনিং নেবার পর শিক্ষার্থীরা ন্যাশনাল ডিফেন্স আকাদেমি ও ইন্ডিয়ান মিলিটারি আকাদেমিতে সহজেই প্রবেশ করতে পারে। সেইসঙ্গে ২০১৪-তে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্যে দিয়ে সংঘ পরিবারের লোকজনরা লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পর থেকে খুব ধীরে ধীরে তারা সি বি আই ও আর বি আই-এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে, সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিকে, ভারতের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে, এমনকি বিচারব্যবস্থাকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার ধারাবাহিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। জনসমাজ ও রাজনৈতিক সমাজে একই সঙ্গে কাজ করে সংঘ পরিবার যে ‘War of Position’ বা ‘অবস্থায়ী সংগ্রাম’ চালিয়ে যাচ্ছে তা একান্তভাবেই ভারতীয় ফ্যাসিবাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

মাননীয় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শ্রী রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ৯ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে রামজন্মভূমি বিষয়ক যে রায়- (https://www.thehindu.com/news/national/article29929717.ece/Binary/JUD 2.pdf) দিয়েছিলেন ও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে সিবিআই-এর বিশেষ আদালত বাবরি মসজিদ ধ্বংসসাধন বিষয়ে যে রায় দিলেন সবটা মিলিয়ে ভারতের সমস্ত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ওপর যে গভীর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল তা প্রবল ধাক্কা খেয়েছে। পরবর্তী সময়ে অবসর গ্রহণের পর শ্রী রঞ্জন গগৈ মহাশয় রাজ্যসভার সদস্য হলেন। সুপ্রিম কোর্টেরই প্রাক্তন বিচারপতিদেরও কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার ঘটনার মধ্যে দিয়ে বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বিঘ্নিত হয়েছে। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারও সামগ্রিকভাবে বিচার করে জানিয়েছেন: ভারতবর্ষ ফ্যাসিবাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে ও পরে আমাদের দেশে যুক্তিপূর্ণ বিতর্কের পরিবেশকে সচেতনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে ও হচ্ছে। সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, পার্লামেন্ট, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে ক্রমাগত দুর্বল করা হয়েছে ও হচ্ছে। ২০১৯-এর নির্বাচনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যতিক্রম। নির্বাচনে জয়ের পর আরএসএস-বিজেপির উদ্যোগে কিছু সংবিধান সংশোধন করা হলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, এটা এমন কী ব্যাপার। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর ফলে সাধারণ লিবারেল অ্যাপ্রোচ-তো নষ্ট হচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশেই তো বার বার সংবিধান সংশোধন করা হয়। তাতে কি তাদের লিবারেল অ্যাপ্রোচ নষ্ট হয়? কিন্তু বর্তমান ভারতে সংবিধান সংশোধন করার পাশাপাশি লিবারেল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও ধ্বংস করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভারতীয় বাস্তবে রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতর থেকে আরএসএস-এর মতো একটি সংগঠন তার ফ্যাসিস্ট এজেন্ডাকে সামনে রেখে, তার শাখা সংগঠনের মাধ্যমে, ভারতকে একটি ফ্যাসিস্ট হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে। জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালে ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভারতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রক্রিয়াকে যান্ত্রিকভাবে মেলানোর চেষ্টা করা সঠিক নয়। ভারতের ফ্যাসিবাদের বিকাশের ইতিহাসকে একেবারেই ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে সংলগ্ন করে বুঝতে হবে।

উৎস : হিন্দুত্ববাদ ও ভারতীয় ফ্যাসিবাদ

@freemang2001gmail-com

2 Comments

  • দীপক নাগ

    খুব ভালো লেখা হয়েছে ?

    • Pankaj Dhar Choudhury

      মূল্যবান সমালোচনা কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About

ranjan.254@gmail.com Avatar

Featured Posts

Work Experience

Technologies

Creating